সিলভিয়া প্লাথ > জার্নাল >> তর্জমা : রাজিয়া সুলতানা

0
61

সিলভিয়া প্লাথ > জার্নাল

প্রাসঙ্গিক তথ্য

[সম্পাদকীয় নোট : সিলভিয়া প্লাথ শুধু কবিতা নয়, বিপুল পরিমাণে অসাধারণ সব গদ্য লিখে গেছেন। কী গভীর, দর্শনাশ্রিত আর জীবনভাবনায় সমৃদ্ধ সেইসব গদ্য। নানা বিষয়ে অসাধারণ আবেগপূর্ণ, হৃদয়স্পর্শী, গভীর এইসব গদ্য লিখেছেন জার্নাল আর ডায়েরির আকারে। ভাবলে বিস্মিত হতে হয়, এই লেখালেখিটা শুরু করেছিলেন মাত্র এগারো বছর বয়সে। তারপর প্রায় সারাজীবন ধরে লিখে গেছেন তিনি। সিলভিয়াকে চিনতে এই লেখাগুলো সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। এগুলো পড়লে একজন কবির একেবারে ভেতরটা দেখা যায়, বোঝা যায় তাঁর ব্যক্তিসত্তা, কবিমানস আর ভাবনা কতটা ঋদ্ধ ছিল। গদ্যের হাতটাও যে কী চমৎকার ছিল বোঝা যায় সেটাও। কবিতার পরপরই এই লেখাগুলো তাঁকে বেশি পরিচিতি এনে দেয়। এখানে অনুবাদে যে নয়টা অংশ উদ্ধৃত হলো সেগুলো তিনি আঠারো বছর বয়সে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে কলেজে যাবার আগে এক গ্রীষ্মকালে লিখেছিলেন। সেই সময়ে সিলভিয়া ম্যাসেচুসেট্‌স অঙ্গরাজ্যের একটা গ্রামের ‘লুক আউট ফার্ম’ নামের কৃষিখামারে গ্রীষ্মকালীন কাজ নিয়েছিলেন। অনুবাদক রাজিয়া সুলতানা তাঁর জার্নালের সব লেখাই অনুবাদ শেষ করে এনেছেন। এখানে জার্নালের যে নয়টি অংশ প্রকাশিত হলো, অনুবাদ-নিরাপত্তার কারণে তার সবটা প্রকাশ না করে অংশবিশেষ প্রকাশ করা হলো। তবে এতে প্লাথের ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হতে পাঠকের কোনো বাধা থাকবে না বলেই আমরা মনে করি।]

এক

জুলাই মাস, ১৯৫০ সন। আমি হয়তো-বা কখনই সুখী হবো না, কিন্তু আজ রাতে আমি তৃপ্ত। কর্মক্লান্ত উষ্ণ কুয়াশাময় দিনের শেষে শূন্য বাসায় ফিরে রোদের মধ্যে সারাদিন স্ট্রবেরি রানার্সগুলো (দ্রষ্টব্য টীকা ১) ছাড়িয়ে নিয়ে অন্যখানে লাগানোর পর মিষ্টি একগ্লাস ঠাণ্ডা দুধ আর বাটিতে করে ক্রিমে ডোবানো ব্লুবেরি নিয়ে খেতে বসার মতো আনন্দ আর কিছুতেই নেই। এখন ক্ষেতে কাজ করতে এসে বুঝতে পারছি কীভাবে মানুষ বই ছাড়া, কলেজ ছাড়া বাঁচে। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে ঘুম চাই-ই-চাই। যদিও পরদিন ভোরবেলা আবার সেই একই কাজ – স্ট্রবেরির নতুন চারাগুলো মাটিতে লাগানো, তবুও এভাবেই তো কারও কারও বাঁচা, বাঁচার জন্যই মাটির কাছাকাছি যাওয়া। মাঝে মাঝে ভাবি, এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়াটা আসলে বোকামি…

দুই

ইলো (দ্রষ্টব্য টীকা ২) আজ স্ট্রবেরি ক্ষেতে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল – ‘রাফায়েল, মিকেলঅ্যাঞ্জেলো ওদের আঁকা রেনেসাঁসের ছবিগুলো কি তোমার পছন্দ হয়? পিকাসোর আঁকা ছবিগুলো তোমার কাছে কেমন লাগে? জানো তো ওঁরা প্রথমে একটা বৃত্ত আর বৃত্তের নিচে ছোট্ট একটা বোর্ড যোগ করে দিয়ে পায়ের ছবি আঁকেন? একবার মিকেলঅ্যাঞ্জেলোর কিছু ছবি আমি নকল করে এঁকেছিলাম।’
আজ আমরা দুজন পাশাপাশি সারি সারি স্ট্রবেরি রানার্স লাগানোর কাজে ব্যস্ত ছিলাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর হঠাৎ ইলো অনর্গল কথা বলতে শুরু করল। ভরাট গম্ভীর স্বর আর জার্মান ভাষার টান ওর কণ্ঠে। ইলোর পেশীবহুল সুঠাম দেহ দেখতে ব্রোঞ্জের মতো কঠিন। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জোরে হাসতে শুরু করলে তামাটে বুদ্ধিদীপ্ত মুখায়বয়বে ভাঁজ পড়ে ওর। দেখলাম সোনালি রঙের চুলগুলো মাথার চারপাশে একটা সাদা রুমাল দিয়ে উঁচু করে বেঁধে রেখেছে। ইলো বলল – ‘ফ্রাঙ্ক সিনাত্রাকে কেমন লাগে তোমার? ও খুবই ভাবপ্রবণ আর রোমান্টিক, যেন জ্যোৎস্নাভরা রাত, জানো?’

তিন

হঠাৎ তীর্যক একটা নীলাভ আলো আমার শূন্য ঘরের মেঝেতে এসে পড়ল। আমি জানি এটা রাস্তার আলো নয়। এমন রাতে একজন কুমারীর জন্য এমন স্নিগ্ধ, পবিত্র আর বিশুদ্ধ আর কী হতে পারে?…(ধর্ষিত হওয়া) (দ্রষ্টব্য টীকা ৩)

চার

সবকিছু মিলিয়ে আজকের রাতটা খুবই বাজে আর বিরক্তিকর। ‘গুডবাই মাই ফ্যান্সি’ নাটকে নায়িকাটা রিপোর্টারের ভূমিকায় নর্দমায় নেমে এমন বাস্তব অভিনয় করল! ছেলেমানুষের মতো ভাবতে ইচ্ছে করছে আমি কেন সেই মেয়েটি হলাম না। কেন যে ওই লোকটা এত প্রীতিমুগ্ধ ওর। সে আমাকে বোঝে আর আমিও তাকে বুঝি, তবে কেন সে আমায় ভালোবাসলো না। তারপর সেই যে জ্যাক নামের ছেলেটা, যে আমার সঙ্গে অমায়িক ব্যবহার করে, আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করেছিল। আমি যখন তার উদ্দেশ্য বুঝে ফেলে বলেছিলাম, সে শুধু আমাকে চুমু খাবার জন্য অমন গায়ে-পড়ে কথা বলছিল, তখন সে কষ্ট পেয়েছিল, আহত হয়েছিল। আর সেই অভিজাত কান্ট্রিক্লাবে ডিনার খাওয়া, যেখানে শুধু অর্থের জৌলুস আর ধনাঢ্যদের ওঠাবসা এবং পরে গানের রেকর্ড যখন বাজানো হলো… নাচের জন্য সেই গানগুলো ছিল দারুণ। আমি গানটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। যখন লুই আর্মস্ট্রং গাইতে শুরু করল- ‘আই হ্যাভ ফ্লোন অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন আ প্লেন, সেটেল্ড রেভ্যুলেশনস ইন স্পেইন, দ্য নর্থ পোল আই হ্যাভ চার্টেড, বাট আই ক্যান্ট গেট স্টার্টেড উইথ ইউ’- ‘এই গানটা আগে শুনেছ কখনো?’ জ্যাক আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি হেসে বললাম – ‘হ্যাঁ, শুনেছি তো। সেইসময়ে আমি ববের সঙ্গে ছিলাম।’ পাগলকরা একটা গান, তখনই আমি স্থির জেনেছিলাম আমি ববকে ভালোবাসি। আমি আর বব লম্বা সময় ধরে কথা বলতাম, একে অন্যের কথা শুনতাম, বুঝতাম।

পাঁচ

আজ রাতে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে থিয়েটার হল থেকে লোকজনকে ঠেলে জ্যাক আর আমি যখন বের হয়ে আসছিলাম তখন মেরিকে দেখতে পেলাম। মেরি আমাদেরকে এড়িয়ে চলার জন্য অন্যদিকে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর পরনে ছিল ঘন নীল রঙের জ্যাকেট, মুখে হেভি মেকআপ আর নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল বলে ওকে আমি প্রথমে চিনতেই পারিনি। কিন্তু দেখতে অনেক সুন্দর লাগছিল ওকে। ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম – ‘আমি তো তোমাকে সবখানে খুঁজে বেড়াচ্ছি। আমাকে ফোন কোরো, চিঠি লিখো আমাকে, ঠিক আছে?’ সে একটা হাসি দিয়ে চলে গেল। যে মেরিকে আমি চিনি, এই মেরি সেই মেরি নয়। আমি জানতাম ওর মতো বন্ধু আর কাউকেই পাব না। তবু কেন যে ওর সঙ্গে এমন আচরণ করি আমি! ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে সাদা ড্রেসের ওপরে সাদা একটা কোট চড়িয়ে ধনী একটা ছেলের সঙ্গে বাইরে ঘুরতে বেরুলাম। নিজের এই ভণ্ডামির জন্য নিজের প্রতি ঘৃণা হলো আমার। আমি তো মেরিকে ভালোবাসি। বেট্‌সিও খুব মজার মেয়ে; ধুন্ধুমার মজা করতে পছন্দ করে ও। আর এই মেরিটাই হচ্ছি আমি। ওর মতো ইতালীয় বাবা-মা’র ঘরে লিন্ডেন স্ট্রিটে জন্ম হলে কী করার থাকত আমার। একজন শিল্পীর যা আদর্শ, মেরি তো সেরকমই, জীবনের জন্য যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ও হতে পারে রূক্ষ, রূঢ়, ওর ওপর নির্ভর করা যায় না – কিন্তু ও আমার কাছে চলনসই; অনেক অনেক সুন্দর চেহারার চেয়ে আমার কাছে ওর মূল্য অনেক বেশি – অনেক কৃত্রিম মানুষের চেয়ে তো বটেই। হতে পারে এ আমার ইগো। হতে পারে এ আমার একধরনের অহংকার যে, আমার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না। কিন্তু ওর সঙ্গে মিশতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। সে পতিতা হতে পারে; তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি ওকে বন্ধু হিসেবে কখনই অস্বীকার করব না।

ছয়

আজ পহেলা আগস্ট। একদিকে বৃষ্টি হচ্ছে অন্যদিকে ভ্যাপসা গরম। কবিতা লেখার মুড পেয়ে বসেছে আমাকে। মনে পড়ছে নিষেধের কাগজে লেখা আছে : প্রবল বর্ষণের পর ‘বৃষ্টি’ নামের কবিতাগুলো দেশময় বিষম ঝরে।

সাত

আমি মানুষকে ভালোবাসি। প্রতিটি মানুষকে ভালোবাসি আমি। একজন ডাকটিকেট সংগ্রহকারী যেমন করে ভালোবেসে টিকেটগুলো জমায়, সেরকমই ভালোবাসি আমি মানুষকে। আমার কাছে প্রত্যেক ঘটনা, সংলাপের খুঁটিনাটি আর গল্প হচ্ছে শিল্পের কাঁচামাল। আমার ভালোবাসা যে নৈর্ব্যক্তিক তা বলা যাবে না, আবার সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিকও নয়। আমি প্রত্যেকের মতো হতে চাই – আমি খোঁড়া বা পঙ্গু হতে চাই, যে-মানুষটা মরে যাচ্ছে আমি তার মতো হতে চাই, আমি যৌনকর্মী হতে চাই এবং তারপর লিখতে চাই সেইসব কথা – যখন যে-মানুষটা আমি, সেই অবস্থায় আমার ভাবনা, আবেগ – এসব নিয়ে লিখতে চাই। কিন্তু আমি সর্বদর্শী নই, আমার তো আর সর্বজ্ঞান নেই। তবে একটাই জীবন; তাই আমাকে আমার মতো করে বাঁচতে হবে, নিজের মতো করে যাপন করতে হবে জীবন। কিন্তু জীবনে সবসময় তো শুধু বাস্তব কৌতূহল নিয়ে চলা সম্ভব নয়।

আট

আমার কাছে বর্তমানই চিরন্তন আর চিরন্তন সতত গতিময়, প্রবাহমান যা কেবলই গড়িয়ে যাচ্ছে, বয়ে চলেছে। এই যে এই সেকেন্ড, মুহূর্ত – এটাই জীবন। এই মুহূর্তটা যখনই অতীত হয়ে যাবে, তখন তা মৃত। কিন্তু প্রত্যেক মুহূর্তে জীবনকে নতুন করে শুরু করার উপায় নেই। যা মরে গেছে তাকে দিয়েই বিচার করতে হবে জীবনকে। এ যেন মরীচিকা… শুরু থেকেই নিরাশার চোরাবালি। একটা গল্প, একটা ছবি একটা সংবেদনকে সামান্যই জাগিয়ে দিতে পারে, যা আসলে মোটেও যথেষ্ট নয়। বর্তমান ছাড়া আর কোনোকিছুই বাস্তব নয়। ইতিমধ্যে আমি অনুভব করতে পারছি শতাব্দীর ভার আমার শ্বাস রোধ করে ধরছে। এই যে এখন বেঁচে আছি, শত শত বছর আগের সেই মেয়েটিই যেন আমি, কিন্তু সেই আমি এখন মৃত। আমি এখন বেঁচে আছি, কিন্তু আমিও অতীত হব। এখন তো সেই সময় যখন আমার আত্মা সজাগ রয়েছে কিন্তু জীবন এক অনিঃশেষ মরীচিকা। আমি যে মরতে চাইনে।

নয়

কিছু কিছু বিষয় নিয়ে লেখা অনেক কঠিন। যখন তোমার জীবনে কিছু ঘটে যায়, তুমি তা লিখতে গিয়ে হয় নাটকীয়তার আশ্রয় নাও, নয়তো যা সত্য তার কিছু কম করে লেখো। ভুলগুলো অতিরঞ্জিত হয় আর আসলকথা কম গুরুত্ব পায়। যেভাবেই লেখো না কেন, যেভাবে তুমি লিখতে চাও, ঠিক সেভাবে লেখা হয়ে ওঠে না। আজ বিকেলে কী ঘটেছে তা আমাকে লিখতেই হবে। কিন্তু মাকে এখনই তা বলা যাবে না, কোনোভাবেই না। মা আমার ঘরে এসেছিল। আমার জামাকাপড় নিয়ে অযথা বকবক করছিল। খামোখাই রাগে গজগজ করে কথা বলছিল। থামার নামগন্ধটি পর্যন্ত ছিল না বলে বলতেও পারি নি কিছু। কলম দিয়ে যেভাবেই তা বের হয়ে আসুক না কেন আজ আমাকে সেই ঘটনার কথা লিখতেই হবে।
সারাটা বিকেল ক্ষেত জুড়ে বৃষ্টি ছিল আজ। আমার গায়ে সোয়েটার, সোয়েটারের ওপরে লাল রঙের স্কি জ্যাকেট, মাথায় সিল্কপ্রিন্টের একটা রুমাল। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে তিন বুশেলের মতো বরবটি তুলেছি ক্ষেত থেকে। আমার শীত করছিল। বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে তাই অনেকেই বাড়ি চলে যাচ্ছিল। আমিও বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে গাড়িগুলোর পাশে বসে আমার বাহনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এর মধ্যে ক্যাথি এসে ওর বাইকে চড়ে বসতে বসতে জোরে বলে উঠল – ‘ওই যে ইলো আসছে।’
আমি তাকিয়ে দেখি সত্যিই ইলো, পুরানো খাকি শার্টটা গায়ে দিয়ে সেই সাদা রুমালটা মাথায় বেঁধে রাস্তা দিয়ে এদিকে আসছে। সেদিন স্ট্রবেরি ক্ষেতে আমাদের দু’জনের যেসব কথাবার্তা হয়েছিল, তারপর থেকে সেভাবেই আলাপটা চলছে। কালি আর পেন্সিল দিয়ে ক্ষেতের ডিটেইল একটা স্কেচ এঁকেছে ও। সেটা আমার হাতে দিল। এখন সে অন্য একটা ছেলের স্কেচ করছে।
আমি জিজ্ঞেস বললাম – ‘তুমি কি জনের ছবিটা শেষ করেছ?’
ও হেসে বলল – ‘ও হ্যাঁ, হ্যাঁ। আসো দেখে যাও। এটাই তোমার শেষ সুযোগ।’ ও আমাকে ছবিটা শেষ হলে দেখাবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তাই ওর সঙ্গে আমি খামারবাড়ির দোর অব্দি দৌড়ে এলাম। ও এখানে থাকে। আসার পথে মেরির সামনে দিয়ে এলাম। মনে হলো সে আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছিল, কিন্তু আমি তার চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না। ইলো বলল – ‘হ্যালো মেরি।’
মেরি নির্বিকার স্বরে বলল – ‘হ্যালো, ইলো।’
দেখলাম ট্র্যাক্টরের শেডের নীচে ছোট ছোট কয়েকজন ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে। আমরা জিনি, স্যালির পাশ দিয়ে হেঁটে গেলাম। বাচ্চারা চিৎকার চেঁচামেচি করছিল। আমার নাম ধরে আমাকে নিয়ে একটা গান করছিল ওরা – ‘ওহ সিলভিয়া…।’ আমার কেমন যেন মনে হলো ব্যাপারটা। আমি ইলোকে জিজ্ঞেস করলাম – ‘ওরা আমার সঙ্গে এভাবে তামাশা করলো কেন?’ শুনে ইলো শুধু হাসল। ও দ্রুত হাঁটছিল।
ওয়াশরুম থেকে মিল্টন চিৎকার করে বলল – ‘একটু পরই আমরা বাড়ি যাচ্ছি।’ আমি মাথা নেড়ে সায় জানালাম আর মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে থাকলাম। এরপরই আমরা খামারবাড়িতে পৌঁছে গেলাম। বিশাল জায়গা জুড়ে সেই খামারবাড়ি, ছাদ অনেক উঁচুতে। ঘোড়া আর ভেজা খড়ের গন্ধ। ভেতরে আলো কম। আস্তাবলের অন্যপাশে কাউকে দেখলাম বলে মনে হলো। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারলাম না। কিছু না বলে ইলো অনেক উঁচু একটা কাঠের সরু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
আমি বললাম – ‘এত বড় সিঁড়ি? এখানে তুমি থাকো?’
ইলো একটার পর একটা সিঁড়ি ডিঙিয়ে ওপরে উঠছে। আমিও ওকে অনুসরণ করছি। কিন্তু ওপরে ওঠার পর দ্বিধায় পড়ে গেলাম। দরজা খুলে সে বলল – ‘এসো, ভেতরে এসো।’ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ওর রুমে টাঙানো ছবি দেখলাম একটা। সংকীর্ণ ছোট্ট একটা ঘর, দুটো জানালা, টেবিলভর্তি ড্রয়িংয়ের জিনিসপত্তর, কালো কম্বল দিয়ে ঢাকা একটা বিছানা, আরেকটা টেবিলের ওপর অরেঞ্জ জুস আর রেডিও।’
ইলো ছবিটা তুলে ধরে বলল – ‘এই যে দেখো ছবিটা।’ জনের মাথার একটা সুন্দর পেন্সিল স্কেচ ছিল সেটা। ‘কীভাবে পেন্সিলের ধার দিয়ে এত সুন্দর স্কেচ আঁকো তুমি?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। মনে হলো একথার কোনো গুরুত্ব দিল না ও। মনে পড়ছে ইলো জোরে রেডিও ছেড়ে দিয়ে কীভাবে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। একটা পেন্সিল দেখিয়ে বলেছিল – ‘দেখো, কীভাবে এর ভেতর থেকে যে-কোনো আকারের শীস বের হয়।’ খুব দ্রুত কথা বলছিল ও। দেখলাম ও আমার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি তখন খুব সতর্ক। চেয়ে দেখি ওর নীল চোখে বিস্ময়বিমুগ্ধ এক দৃষ্টি, আমার খুব কাছে, তাকিয়ে আছে আমার দিকে। থেমে থেমে হাসির ঝিলিক খেলে যাচ্ছে সেই চাহনিতে।
আমি বললাম – ‘আমাকে এখন সত্যিই যেতে হবে। আমার জন্য ওরা অপেক্ষা করছে। ছবিটা দারুণ হয়েছে।’ দরজা আর আমার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তখনও ও হাসছে। এবার এগিয়ে এসে আমার দুবাহু জড়িয়ে ধরলো। হঠাৎ দেখি ওর ঠোঁট আমার ঠোঁটের ওপর; লোহার মতো কঠিন বাহুপাশে ও আমাকে বেঁধে ফেলেছে – অনুভব করছি আমার দুই ঠোঁটের মাঝখানে প্রচণ্ড আবেগে ওর জিভ শক্ত আর তীব্র হয়ে উঠেছে। মনে পড়ছে না তখন আমি ফিসফিস নাকি চিৎকার করে ওর নাম ধরে – ‘ইলো, ইলো’ বলে ডেকে উঠেছিলাম কিনা। হাত ছোঁড়াছুঁড়ি করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেও ওর প্রচণ্ড শক্তির কাছে ব্যর্থ হলাম। শেষে আমাকে ছেড়ে দিয়ে ও একটু দূরে সরে দাঁড়াল। আমার ঠোঁট ওর চুমুর আক্রমণে উত্তপ্ত, চূর্ণ, থেঁতলানো তখন। আমি দুহাত ঠোঁটের ওপরে রেখে মুখটা ধরে ভয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলাম। আমাকে কাঁদতে দেখে ইলো বিস্মিত যেন, কৌতুকভরা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এর আগে কেউ আমাকে এভাবে চুমু খায় নি। আমি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, কাঁপছি। ভেতরে তীব্র এক শারীরিক আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে। সেই স্রোতে ভেসে যাচ্ছি। কিন্তু নড়বার শক্তি হারিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম।
‘কেন, কেন?’ আমার প্রতি ওর সহানুভূতি ভরা কণ্ঠ; কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু, ছোট্ট শোনালো সে স্বর। ‘পানি খাবে? পানি এনে দিই?’ বলে ও আমাকে গ্লাসে পানি ঢেলে দিল। আমি খেলাম। ও দরজা খুলে দিল। আমি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে অন্ধের মতো নামছি আর হোঁচট খাচ্ছি। মেয়েবেল, রবার্ট, আফ্রিকান-আমেরিকান বাচ্চাগুলো, যারা বাজে ভাষায় আমাকে গালি দিচ্ছিল, মেরি লুই, ওদের মা যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন – নীরব অন্ধকার উপস্থিতি নিয়ে সবাইকে পার হয়ে বাইরে এলাম। পাশ দিয়ে একটা ট্রাক চলে গেল। সেই ট্রাকে ছিল ওয়াশরুমের সেই ছেলেটা। ওর নাম বার্নি; ভয়ংকর দেখতে ও – খাটো, পেশীবহুল, কুৎসিত। ওর চকচকে চোখে হিংস্র আনন্দ, ভালো করে দেখার আগেই সে দ্রুত ট্রাক চালিয়ে মিলিয়ে গেল। ও কী খামারবাড়িতে ছিল? ইলোকে দরজা বন্ধ করতে দেখেছে? আমাকে বের হয়ে আসতে দেখেছে? নিশ্চয়ই ও দেখেছে। আমি হেঁটে হেঁটে ওয়াশরুম পার হয়ে গাড়ির দিকে গেলাম। বার্নি চিৎকার করে বলল – ‘এই, তুমি কাঁদছিলে কেন?’
আমি কাঁদছিলাম না। কেনি, গ্রেডি ওরাও ট্রাক্টরে চড়ে বসল। আরও একদল ছেলে, ওরা সবাই দলবেঁধে বাড়ি যাচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। একজনের মুখে পরিচিত হাসি। আমাকে জিজ্ঞেস করল – ‘ও কি তোমাকে চুমু খেয়েছে?’ আমার মনে হলো আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আমার সঙ্গে তখন কেউ কথা বলতে চাইলেও বলতে পারলাম না। গলার মধ্যে দলা পাকিয়ে স্বর আটকে গিয়েছিল। মিস্টার টম্পকিন্স পাম্পের কাছে এসে কেনি আর ফ্রেডির স্টকে-রাখা গাড়ি চালানো দেখছিল। আমার সঙ্গে সবাই অমায়িক আচরণ করল। কিন্তু ওরা জানত, অবশ্যই জানত। কী ঘটেছিল। আমাকে লক্ষ করে কেনি বলল – ‘কী যে কিউট তুমি।’ ফ্রেডি বলল – ‘কিউট আর দেবীর মতো দেখতে।’
আমি নিজের শরীর বাহু দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাড়ির ইঞ্জিন ঘোরানো দেখছিলাম। হাসলাম আর এমন ভাব করলাম যেন কিছুই হয় নি। সবকিছু ঠিকঠাক আছে।
মিল্টন বাড়ি যাবার জন্য আমার পাশের নড়বড়ে সিটটার ওপরে বসল। অ্যান্ডি বসল সামনে, ডেভিড গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে চালাতে শুরু করল। খেয়াল করে দেখি সবার চোখে সেই হাসির নাচন। আমার দিকে তাকিয়ে আবার সেই মিটিমিটি হাসি। ডেভিড তার কণ্ঠটাকে মাত্রাতিরিক্তভাবে টেনে টেনে বলছে – ‘আমরা তো সবাই ওয়াশরুম থেকে দেখলাম তুমি খামারবাড়িতে গেলে। সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করছিলে।’
মিল্টন ইলোর আঁকা ছবি সম্পর্কে জানতে চাইল। ছবি আঁকা নিয়ে ওর সঙ্গে সামান্য কথা হলো। সবাই আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করল। আমি যে সামলে নিয়েছি, কাঁদিনি সেজন্য মনে হলো ওরা স্বস্তি পেল। কিন্তু ওরা জানত, ঠিকই জানত কী ঘটেছিল।
আমি এখন বাড়িতে। ধুর! আগামীকাল তো আবার সেই খামারেই কাজ করতে যেতে হবে। হায় ঈশ্বর! ভাবতে ইচ্ছে করছে যা ঘটেছে স্বপ্নে ঘটেছে। যদিও এখন কিছুটা বাস্তবই মনে হচ্ছে। আগামীকাল সবার মুখে মুখে থাকবে আমার নাম। আমি যদি স্মার্ট হতাম, অথবা যদি মিথ্যে বলতে পারতাম! কিন্তু আমার খুব ভয় হচ্ছে। শুধু যদি ও আমাকে চুমু না খেত। এখন আমাকে মিথ্যে বলতে হবে। বলতে হবে ও আমাকে চুমু খায় নি। কিন্তু ওরা সবাই ব্যাপারটা জানে। এতজনের বিপরীতে আমি একা, একজন। এভাবে কী পারা যায়? কী করে সম্ভব…?

টীকা

(১) স্ট্রবেরি রানার্স (Strawberry runners) : জমিতে আনুভৌমিকভাবে ছড়িয়ে যায় এই লতানো নরম ফলের গাছগুলো। এর গিঁটে গিঁটে শিকড় থাকে। সেগুলো কেটে মাটিতে লাগিয়ে দিলে সেখান থেকে আবার চারা গজায়।
(২) ইলো (Illo) : পুরো নাম ইলো পিল। এস্তোনিয়ার এক শরণার্থী, সিলভিয়ার সঙ্গে ফার্মে কাজ নিয়েছিল।
(৩) ধর্ষিত হওয়া : সিলভিয়া প্লাথ পরে অন্য রঙের কালি দিয়ে মজা করার জন্য লিখেছিল ‘ধর্ষিত হওয়া।’