সুধা সেন > রবীন্দ্রনাথ এবং ভারতের জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্ক >> স্মরণ

0
322
[সম্পাদকীয় নোট : আজ ২২শে শ্রাবণ, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণদিবস। এই উপলক্ষে দুর্লভ ও গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাটি প্রকাশিত হলো। প্রাথমিকভাবে লেখাটা, মনে হতে পারে, আমাদের কাছে কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক। কারণ, এই লেখার বিষয় ভারতের জাতীয় সংগীত ও রবীন্দ্রনাথ। ভারতীয় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী, এই ভাবনা থেকেই লেখাটাকে কারো কারো কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু লেখাটা পড়লেই বুঝতে পারবেন যে, রবীন্দ্রনাথকে শুধু বাংলাদেশের কিছু মানুষ নয়, ভারতেও অনেকেই ভুল বুঝেছিলেন। আসলে যাঁরা প্রাগ্রসর চিন্তার মানুষ, তাঁদেরকে সাধারণ মানুষেরা সহজে বুঝতে পারেন না। লোকপ্রচলিত একটা কথা আছে, “কি বললে, এ তো মাথার উপর দিয়ে চলে গেল”, অনেকটা এরকম অবস্থা হয় আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের। এবার আসুন লেখাটা পড়ি তাহলে যে গৌরচন্দ্রিকা করা হলো, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে।]
তখন ব্রিটিশ আমল। অখণ্ড ভারতবর্ষ। এপার ওপার আসা-যাওয়া করতে পাসপোর্ট-ভিসা লাগতো না। কাজেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে শিল্পী-সাহিত্যিক সুদক্ষ অভিনেতারা মাঝে-মাঝেই পূর্ববঙ্গে আসতেন। তাঁদের সমুজ্জ্বল কৃষ্টি ও সংস্কৃতির আলোয় পূর্ববঙ্গ ঝলমল করে উঠতো। অবশ্যই পূর্ববঙ্গ কেবল গ্রহণ করত না, শিক্ষা সংস্কৃতি শিল্প সঙ্গীতে পূর্ববঙ্গের অবদানও ছিল অপরিমেয়।
বিশেষত কুমিল্লা তখন শিক্ষা-সংগীতের জগতে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে ছিল। সুরের গুরু আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব, ওস্তাদ খসরু মিয়া, শচীন দেববর্মন (যদিও তিনি ত্রিপুরার কিন্তু কুমিল্লা তখন ত্রিপুরার অন্তর্গত ছিল এবং শচীন দেবের সংগীতচর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল কুমিল্লা), সুরসাগর হিমাংশু দত্ত, গীতিকার অজয় ভট্টাচার্য, সুবোধ পুরকায়স্থ প্রভৃতি কুমিল্লারই কৃতি সন্তান।
বাংলা ১৩৪৫ সন আর হাজার ১৯৩৯ সালে কুমিল্লার বিদগ্ধ ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে সাহিত্য পরিষৎ কুমিল্লা শাখার উদ্যোগে একটি ঐতিহাসিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সাহিত্য বিজ্ঞান দর্শন শিল্প সংগীত- সমস্ত শাখার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আমন্ত্রিত হয়েছেন এবং তাঁরা এই অধিবেশনে যোগদান করবেন বলে সম্মতিও জানিয়েছেন। সাল-তারিখ সমস্ত ঠিক হয়েছে ঠিক হয়নি শুধু উদ্বোধনী সংগীত কি হবে সেটা।
‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া চলবে না। তাহলে? ‘ধনধান্য পুষ্পে ভরা?’ না, তাও ঠিক উপযুক্ত হবে না এসব বিষয়ে তর্কবিতর্ক চলছিল।
আমার স্বামী দীর্ঘকাল শান্তিনিকেতনে ছিলেন, রবীন্দ্রনাথের প্রিয় শিষ্য। তিনি এবং রবীন্দ্র সংগীত অনুরাগী আরো কয়েকজন অধ্যাপক প্রস্তাব করলেন- ‘জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা’ গানটি গাওয়া হোক। তখন ব্রিটিশ শাসনের কঠিন লৌহশৃঙ্খলের বাঁধন শিথিল হয়ে এসেছে। বন্ধনমুক্তির প্রয়াসে আলোড়িত হচ্ছে জনমানস। বিদ্রোহ জেগেছে প্রাণে-প্রাণে।
কুমিল্লার বিশিষ্ট নেতৃবর্গ প্রবল আপত্তি তুললেন, ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের দিল্লি অভিষেক উপলক্ষে তার স্তুতি করে এই গানটি লেখা হয়েছে। এটি কিছুতেই এই অধিবেশনে খাওয়া চলবে না। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠল সভা। অধ্যাপকদের ক্ষীণকণ্ঠ সেই প্রতিবাদের জোয়ারে কোথায় গেল তলিয়ে। ক্ষুন্ন ক্ষুব্ধ মনে রবীন্দ্র-অনুরাগীরা সভা থেকে সরে এলেন।
অধ্যাপক সেন যখন কবির ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে ছিলেন তখনও আমার বিয়ে হয়নি। কাজেই কবির সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল না। আমি তখন বঁধু মাত্র! হয়তোবা রবীন্দ্র-ভক্তদের পরাভব দেখে আমি স্বামীকে না জানিয়ে স্বয়ং কবির কাছে একটি চিঠি লিখলাম, বয়সোচিত চপলতায়। ‘জন গণ মন’ গানটি সম্বন্ধে এখানকার সমালোচনার কথা জানিয়ে, এই গান কী উপলক্ষে তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর কাছে সেটা জানতে চেয়ে ওই চিঠিটি লিখেছিলাম।
কয়েকদিনের মধ্যেই রেজিস্ট্রি করা চিঠির প্রাপ্তিস্বীকারের রশিদটি ফিরে এলো, এবং পড়বি তো পড় স্বামীর হাতেই। বিশ্বভারতীর ছাপ দেওয়া কবির সেক্রেটারির স্বাক্ষরিত রশিদ।
বিস্মিত সেন মশাই ছুটে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কী এর অর্থ! তখন আর স্বীকার করা ছাড়া উপায় ছিল না। বললাম গোপনে লেখা চিঠির কথা।
অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে স্বামী আমাকে রীতিমত ভর্ৎসনা করলেন- এই ছেলেমানুষি করার কি প্রয়োজন ছিল আমার? বিশ্বকবির মহামূল্যবান সময়ের ক্ষতি করা, সর্বোপরি এইসব ক্ষুদ্র ব্যাপার নিয়ে তাঁর মতো মহামানবকে বিরক্ত করার নির্বুদ্ধিতা আমার কেমন করে হলো! না জানি কী অপরাধ করেছি ভেবে ভীত লজ্জিত আমি চুপ করে রইলাম।
তারপর এক উজ্জ্বল প্রভাতে আমার কম্পিত হাত এলো একটি চিঠি, তাতে বিশ্বভারতীর ছাপ। শিহরিত অন্তরে চিঠি খুললাম। অপরূপ সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা স্বয়ং কবির চিঠি :
“কল্যাণীয়াসু,
তোমার চিঠি পেয়েছি।
‘পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থা
যুগ যুগ ধাবিত যাত্রী
হে চির সারথি তব রথচক্রে
মুখরিত পথ-দিন-রাত্রি”-
যিনি শাশ্বত কালের সারথি, তার বন্দনাগানে আমি কোনও পঞ্চম বা ষষ্ঠ জর্জের স্তব করেছি, আমার সম্বন্ধে যাঁদের এমন অপরিমেয় মূঢ়তা, তাদের প্রশ্নের জবাব দেওয়া আত্মাবমাননা।
ইতি
শুভাকাঙ্ক্ষী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই মহামূল্যবান চিঠি পেয়ে উল্লাস আনন্দে অধ্যাপক সেন অধীর হয়ে উঠলেন, আর তখন? মুহূর্তে দূর হয়ে গেল সকল সংশয় আর ভয়- নাগাল আমার আর পায় কে?
সাহিত্য পরিষদের মিথ্যা বাগাড়ম্বর স্তব্ধ হয়ে গেল। সর্বসম্মতিক্রমে এই গানই নির্বাচিত হলো উদ্বোধনী সংগীত হিসাবে।
১৩৪৫ সনের ২২শে চৈত্র থেকে ২৬শে চৈত্র পর্যন্ত পাঁচদিন বিভিন্ন শাখার অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।  মূল সভাপতি ছিলেন প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সহ-সভাপতি কাজী আবদুল ওদুদ সাহেব, বিজ্ঞান শাখার সভাপতি ডক্টর পঞ্চানন নিয়োগী, ইতিহাস- ডক্টর সুরেন্দ্রনাথ সেন, দর্শন- পণ্ডিতপ্রবর বিধুশেখর শাস্ত্রী। তাছাড়া সাহিত্য শাখার অধিবেশনে যোগদান করেছিলেন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরো অনেকে। সংগীতে ছিলেন কবির ভাগিনেয়ী সরলা দেবী।
কুমিল্লার বিশিষ্ট সাহিত্যিক সংগীত শিল্পীরা এইসব অধিবেশনে তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য রেখেছিলেন।
এতসব গুণীজ্ঞানী বিদগ্ধ ব্যক্তির সমাবেশে সবার উদ্বোধনে যখন ‘জন গণ মন’ গানটি সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হলো, তখন পুলকে আনন্দে গর্বে আমি উদ্ভাসিত হয়ে উঠলাম। কিন্তু তারও যে পর আছে, আছে আরো গৌরব, সে তো জানা ছিল না!
ভারতের স্বাধীনতার পর জাতীয় সংগীতের নির্বাচন নিয়ে ভারতে দেখা দিল বিরাট মতদ্বৈধ।
সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি, সমাধানবিহীন একই সমস্যার পুনরালোচনা। আরম্ভ হল তুমুল আন্দোলন- যে গান ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক উপলক্ষে রচিত, সেই গান দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে কিছুতেই গৃহীত হতে পারে না। প্রবল প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলেন বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ; আনন্দবাজার, যুগান্তর, প্রভৃতি কাগজে আরম্ভ হলো প্রবল বাকবিতণ্ডা। ওই গানের সমর্থনকারীরা ও তাদের দাবি ছাড়তে নারাজ। সেই সময়ে কবি আর জীবিত নন। এই বিভ্রান্তি নিরসনের জন্যে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ তখনই কবির স্বহস্তে লিখিত চিঠির একটি প্রতিলিপি কুমিল্লায় আমাদের কাছে চেয়ে পাঠালেন।
আমরাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সন-তারিখসহ চিঠিটির প্রতিলিপি পাঠিয়ে দিলাম। আমার এই চিঠি এবং দিল্লির এক ভদ্রলোকের কাছে কবির লেখা প্রায় একই ধরনের আরেকটি চিঠির প্রতিলিপি যখন ভারতীয় নেতৃবৃন্দের হাতে পৌঁছাল তখন মুখর প্রতিবাদ স্তব্ধ হলো বিনম্র শ্রদ্ধায়, ভারতের জনগণ তখন যুগ-যুগ ধাবিত রথের চিরসাথীকে বরণ করে নিলেন সানন্দে! ‘জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা’ গানটি ভারতের জাতীয় সংগীত রূপে স্বীকৃতি পেল।
আমার মতো অতি সাধারণ এক গৃহবধুর নির্বুদ্ধিতার ফলশ্রুতি স্বরূপ এই দুর্লভ চিঠিখানি যে একদিন এত বড় ঐতিহ্য ও গৌরবের অধিকারী করবে, তখন কি তা জানতাম!