সুফি কবি সুলতান বাহুর কবিতা >> রূপান্তর : সৈয়দ তারিক

0
789

সুফি কবি সুলতান বাহুর কবিতা

[সপ্তদশ শতকে পাঞ্জাবে বিরাজমান ছিলেন শাহ সুলতান বাহু (১৬৩০ – ১৬৯০)। সুফি সাধক, কবি ও লেখক ছিলেন তিনি। তাঁর রচিত পঞ্চাশটির মতো গ্রন্থ পাওয়া যায়। প্রকৃত রচনার সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তাঁর রচনাবলির বেশিরভাগ ফারসি ভাষায় রচিত, আবার পাঞ্জাবিতেও লিখেছেন কিছু। ইসলামধর্ম ও ইসলামের মরমিধারা সুফিবাদ বিষয়ক লেখা আছে তাঁর। সুলতান বাহুর কবিতাবলি জনচিত্তে আনন্দ দিয়ে আসছে কাল হতে কালান্তরে। তাঁর কবিতা সুরারোপিত হয়ে কাওয়ালি, কাফি ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকরণে গীত হয়ে আসছে। তাঁর লেখা শের বা যুগল-পংক্তিমালাও বিশিষ্ট ধরনে গীত হয়। তিনি সুফিদের কাদরিয়া ধারায় দীক্ষিত হলেও সারওয়ারি কাদেরি নামে একটি তরিকার প্রচলন করেন। এই ধারায় তাঁর উত্তরাধিকারীরগণ এখনও অধ্যাত্মসাধন করেন। তাঁর সমাধি পাকিস্তানের পাঞ্জাবে অবস্থিত। সেখানে নিয়মিত ওরস শরিফ অনুষ্ঠিত হয়। দূরদূরান্ত হতে ভক্ত-আশেকেরা এসে এতে সমবেত হন আর মানবিক সুফি-মতাদর্শী ধারায় নিজেদের দীক্ষিত করেন। এখানে তাঁর একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হলো। – অনুবাদক]

প্রত্যেকেই খোঁজে নিখুঁত বিশ্বাস,
খাঁটি ভালোবাসা খোঁজে খুব কম জনেই;
বিশ্বাস চায় তারা, ভালোবাসা নয়,
আমার হৃদয়ে তাই জমে ওঠে রাগ;
দিব্য যে-স্তরে তুমি প্রেমের জোরে পৌঁছে যেতে পার,
বিশ্বাস তার খোঁজও রাখে না।
হে বাহু, ভালোবাসাকে সজীব রেখো,
বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে বলি এই কথা।

প্রভু আমাকে বুঝিয়ে দিলেন,
‘যখনই তোমার প্রভুর কথা ভুলে থাকো অবহেলায়,
তখনই তাঁকে অস্বীকার করা হয়।’
কথাগুলো খুলে দিল আমার চোখ,
আমার সকল মনোযোগ নিবদ্ধ হলো প্রভুর দিকে।
তারপর আমার আত্মাকে সংরক্ষিত রাখলাম,
এই প্রেমই চর্যা করেছি আমার হৃদয়ে।
এইভাবে আমার আত্মাকে তাঁর কাছে সমর্পণ করে,
মৃত্যুর আগেই মরে গেলাম আমি তাঁর মধ্যে বেঁচে থাকতে।
কেবল তখনই আমি জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলাম, হে বাহু।

জেগে ওঠো, চাঁদ, ছড়াও কিরণ আকাশে-আকাশে,
নীরব প্রার্থনায় তারকারা স্মরণ করছে তোমাকে,
তাদের হৃদয় সংবিৎ হারিয়েছে প্রত্যাশায়।
ভিখারির মতো আমরা দুনিয়ার অলি-গলিতে ঘুরে বেড়াই,
অথচ নিজদেশে আমরা মণি-মাণিক্যের সওদাগর।
হায়, কাউকে যেন আপন দেশ ছাড়তে না হয়,
বিদেশ-বিভুঁইয়ে কেউ তো খড়কুটোর সমানও নয়।
এই দুনিয়া থেকে আমাদের তাড়াতে
হাততালি দেবার দরকার নাই,
হে বাহু, আমরা আমাদের সেই-কবে-হারানো
ঘরে ফিরে যেতে এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছি।

সাগরের চেয়েও হৃদয় অনেক গভীর,
কেই-বা এর রহস্য মাপতে পারে?
এর উপর দিয়ে বয়ে যায় ঝড়-ঝঞ্ঝা,
যখন সব জলযান পাল তুলে যায় ভেসে,
নাবিকেরা দাঁড় বায়।
হৃদয়ের মধ্যে আছে চৌদ্দটা মোকাম,
ক্যানভাসের তাঁবুর মতন ছড়ানো।
কেবল যারা জানে হৃদয়ের এইসব ভেদরহস্য,
তারাই জানতে পারে স্রষ্টাকে, ওহে বাহু।

আমার ভিতরে পাঁচটি বিশাল দালান আছে,
পাঁচটিই উজ্জ্বলতায় জ্বলে,
আরেকটি প্রদীপ দিয়ে কী প্রয়োজন আমার?
আমার তো আর হিসাব দেওয়ার কোনোই দরকার নাই
পঞ্চপ্রভু আর খাজনাদারের কাছে,
যারা ভিতরপথের দিকে বাধা হয়ে রয়।
পাঞ্জেগানা নামাজের ইমাম ডাকে বিশ্বাসীদের,
ভিতরেই যে মসজিদ আছে পাঁচখানা সেইখানে জাগে ডাক,
আরেকটা মসজিদ দিয়ে আমি করবটা কী?
প্রভু যদি কল্লাটি চান তোমার,
একটুও দ্বিধা করো না, হে বাহু,
তক্ষুণি নিবেদন করে দিও।

আমার সারা শরীর যদি চোখ আর চোখে ভরা থাকত,
আমি আমার প্রভুর দিকে অপলকে চেয়ে রইতাম
ক্লান্তিবিহীনভাবে।
আহা! আমার শরীরের সবকটা ছিদ্র যদি লাখ-লাখ চোখ হয়ে যেত,
তাহলে কোনো চোখে যদি পাপড়ি পড়ত তো অন্যটি যেত মেলে।
কিন্তু তখনও তাকে দেখবার তৃষ্ণা আমার রয়ে যেত অতৃপ্তই,
আমি আর কী তবে করতে পারি?
আমার কাছে, হে বাহু, প্রভুকে একপলক দেখাটাই
লক্ষ লক্ষবার হজ করবার চেয়ে উত্তম।

আমার গুরু আমার হৃদয়ে আল্লাহর নামের জুঁইফুল বুনে দিয়েছেন। সৃষ্টির সত্যতা অস্বীকার আর একমাত্র বাস্তবতা খোদাকে আলিঙ্গন — এই দুইটি বিষয়ই বীজটিকে পরিচর্যা করেছে।
রহস্যের কুঁড়ি যখন উন্মীলিত হলো দিব্যজ্ঞানে, আমার সমস্ত সত্তা খোদার সৌরভে ভরে গেল।
সম্যক সেই গুরু যিনি আমার হৃদয়ে জুঁই বুনেছেন তিনি অনন্তকাল প্রশংসিত থাকুন, হে বাহু।
অজস্রবার জিকির করেছ তুমি আল্লাহর নাম, মুখস্ত করেছ কোরান, কিন্তু তাতে রহস্যের পর্দা উন্মোচিত হয় নাই।
বরং তোমার বিদ্যা আর পাণ্ডিত্য আরও শাণিত করেছে পার্থিব বিষয়াদির লোভ; সংখ্যাহীন পুস্তকপাঠ তোমার পাশব অহমকে বিনাশ করতে পারে নাই।
আসলে কেবল সাধু-সন্তরাই পারে ভিতর ঘরের ওই চোরটিকে নিপাত করতে — যে কিনা বসতঘরটিরই বিনাশ ঘটায়।
যখন একমাত্র প্রভু আমার কাছে নিজেকে প্রকাশ করলেন, তাঁর মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম আমি। এখন আর নৈকট্যও নাই, মিলনও নাই। এখন আর পরিভ্রমণের কিছু নাই, নাই কোনো গন্তব্য। প্রেমালিঙ্গনে আমার শরীর ও আত্মা এমনকি স্থান-কালের সকল সীমানা আমার চেতনা হতে ঝরে গেছে। আমার বিচ্ছিন্ন সত্তা এখন পূর্ণতায় সাথে একীভূত হয়ে গেছে। হে বাহু, এর মাঝেই তওহিদের রহস্য রয়েছে, সেটিই আল্লাহ।
যখন আমি আল্লাহর একত্ব অনুভব করলাম, তাঁর প্রেমের শিখা উঠল জ্বলে আমাকে পথ দেখানোর জন্য। তীব্র তাপ নিয়ে জ্বলে সেটা আমার হৃদয়ে, আমার সকল পথে তাঁর রহস্য প্রকাশ করতে করতে। প্রেমের আগুন জ্বলে আমার মাঝে, ধোঁয়া নাই তার, প্রেমাস্পদের জন্য আমার ব্যাকুলতাই তার জ্বালানি। ভালোবাসার জনকে আমি নিকটে পেলাম। আমার প্রেমই তাঁর মুখোমুখি করিয়ে দিয়েছে।
সৃষ্টির সময়ে আল্লাহ যখন তাঁর থেকে আমাকে আলাদা করেছিলেন, তখন বলেছিলেন তিনি, ‘আমি কি তোমার প্রভু নই?’ চিৎকার করে জবাব দিয়েছিল আমার আত্মা, ‘নিশ্চয়ই তুমি তা-ই।’ তখন থেকেই আমার আত্মা পুষ্পায়িত।
আপন ঘরে ফিরবার তাড়া আমাকে একটুও অবকাশ দেয় নাই পৃথিবীতে শান্ত থাকবার। দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাক। এইটিই আল্লাহর পথ হতে আত্মাকে কেড়ে নেয়। তাঁর প্রেমিকদের দুনিয়া কখনও গ্রহণ করে না। নিপীড়িত হয় তারা, বেদনায় চিৎকার দিয়ে ওঠে।