সুবীররায় চৌধুরী > পুলিশের চোখে রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ >> প্রবন্ধ

0
160

যোগাযোগের শেষটা বদলাতে চাইলুম। কবি রাজি নন আদৌ। আমি (শিশিরকুমার) বললুম, অপরাজিতা ফুল দিয়ে যে কুমুদিনী স্বামী কামনা করে, সেই চিরকেলে সতীকে বিদ্রোহী করবেন কি করে? কবি বললেন, তুমি আমার কুমুকে মামুলি হিঁদুটি করতে চাও? ওর সমস্ত বিশ্বাসকে ধুলিস্যাৎ করে জীবনের নাড়ীতে এসেছে বিদ্রোহ। এ তোমার সস্তার বিদ্রোহিনী নয়।

It is a please sent pasttime with our police to practice petty annoyances.
– রবীন্দ্রনাথ
স্বাধীন ভারতে একাধিক হাইকোর্ট ‘অভিনয়নিয়ন্ত্রণ আইন (১৮৭৬)’ সংবিধানবিরোধী, অতএব বাতিল বলে রায় দিয়েছেন। প্রফুল্লচন্দ্র সেন মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের জন্য অনুরূপ একটি আইন প্রণয়নে উদ্যোগী হন। কিন্তু নাট্যকর্মী ও অনুরাগীদের প্রবল বিরূপতার দরুন পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বর্জিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে এটি ঐতিহাসিক ঘটনা যে পাঁচের দশকে বিভিন্ন সময়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার চেষ্টা করেছেন এই আইন প্রয়োগ করতে। অবশ্য উচ্চ আদালতগুলির সমর্থন পাননি।
‘অভিনয়নিয়ন্ত্রণ বিল’ ও আইন নিয়ে সম্প্রতি অনেক কাজ হয়েছে। তবে এই গবেষকের প্রধান আগ্রহ আইনটি বিষয়ে সমসাময়িক এবং পরবর্তীকালে কি ধরনের বিতর্ক হয়েছিল তা সংকলনে। কিন্তু আইনটি কীভাবে প্রযুক্ত হত সে বিষয়ে উপকরণ খুব সামান্য। কেননা এই তথ্য সংগৃহীত হতে পারে শুধু পুলিশ রিপোর্টের সাহায্যে। সেগুলি কতটা রক্ষিত হয়েছে জানি না। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রমিলা পন্থে জাতীয় মহাফেজখানা থেকে ‘চা-কর দর্পণ’ এবং ‘হীরকচূর্ণ’ বা ‘গাইকোয়ার দর্পণ’ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা দপ্তরের মন্তব্যসহ পুলিশকৃত নাটক দুটির অনুবাদ প্রকাশ করেছেন Suppression of Drama in 19th Century Indian নামে।
আমরা অনুমান করতে পারি বিশ শতকের প্রথম চার দশকে এই আইনের প্রয়োগ খুব জোরদার হয়েছিল। দুঃখের বিষয় নিষিদ্ধ পালা বা নাটকের তালিকা সংগ্রহ করা গেলেও পুলিশের ফাইলে কী ধরনের মন্তব্য থাকতো তা আমরা জানি না। শ্রী পি.কে. সেন পুলিশ কমিশনার থাকাকালে তিনি কলকাতা পুলিশের পুরানো রেকর্ডস থেকে ‘বিসর্জন’ নাটকের পাণ্ডুলিপি বিশ্বভারতীকে দান করেন। ‘নাট্যমন্দিরে’র তরফ থেকে শিশিরকুমার ভাদুড়ী প্রমুখ ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন ‘বিসর্জন’ নাটক ‘নাট্যমন্দিরে’ (১৩৮ কর্নওয়ালিস স্ট্রীট) মঞ্চস্থ করবার অনুমতি চেয়ে পুলিশ কমিশনারকে পত্র দেন। আলোচ্য ফাইলটি সেই সংক্রান্ত। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর বিশ্বভারতীর তৎকালীন উপাচার্য কালিদাস ভট্টাচার্য শ্রী পি.কে. সেনের কাছ থেকে সরকারিভাবে এই মূল্যবান রিপোর্টটি গ্রহণ করেন। (রবীন্দ্রসদন অভিলেখাগারে পাণ্ডুলিপি নম্বর ৪২১ এবং গভর্নমেন্ট অফ বেঙ্গলের ফাইল নম্বর ৪৯।
‘নাট্যমন্দিরে’ শিশিরকুমার রবীন্দ্রনাথের চারটি নাটকের প্রযোজনা করেন। সেগুলি হল : ‘বিসর্জন’ (প্রথম অভিনয়, জুন ১৯২৬), ‘শেষরক্ষা’ (প্রথম অভিনয় ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯২৭), ‘চিরকুমার সভা’, (প্রথম অভিনয় ২১ জুলাই ১৯২৯) এবং ‘তপতী’ (প্রথম অভিনয় ২৪ ডিসেম্বর ১৯৩৬)। ‘রক্তকরবী’ নাটক ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পূর্বেই তিনি মঞ্চস্থ করার অনুমতি পেয়েছিলেন, যদিও তা শেষ পর্যন্ত প্রযোজিত হয়নি। এ ছাড়া রাধারানী দেবীর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় যে ‘ঘরে বাইরে’ মঞ্চস্থ করার জন্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী নরেন্দ্র দেবকে নাট্যরূপ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। নরেন্দ্র দেব রূপান্তরের কাজ সম্পূর্ণ করলেও শেষ পর্যন্ত তা অভিনীত হয়নি। যাই হোক, আশা করা যায় শিগগিরই পুলিশ এবং বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে অন্যান্য পাণ্ডুলিপিগুলো উদ্ধার করা যাবে। ততদিন পর্যন্ত ‘বিসর্জন’ পুলিশি রবীন্দ্রসাহিত্য সমালোচনার একমাত্র নিদর্শন হয়ে থাকবে।
‘বিসর্জন’ নাটক মঞ্চস্থ করার অনুমতি চেয়ে ‘নাট্যমন্দির লিমিটেড’-এর পক্ষ থেকে ভাদুড়ী অ্যান্ড কোং তৎকালীন কমিশনার অফ পোলিসকে পত্র দিয়েছিলেন এই মর্মে :
[NAT] YA MANDIR LTD.
Phone No 1717 B B
68 Beadon Street
Calcutta 23rd June, 1926
To
The Commissioner of Police
Calcutta
Sir,
Herewith the copy of the well known play by Tegore’s Bisharjan (Sacrifice) which we are staging on Board the Natyamandir at 138 Cornwallis Street lately known as the Cornwallis theatre. Your kind permission is solicited.
It may be noted that this Book has already been publicly staged at Calcutta and elsewhere.
We have the honor to be
Sir,
Your most obedient servants
For & n behalf of Natya Mandir Ltd.
Bhadhuri and Co.
ভাদুড়ী অ্যান্ড কোং-এর তরফ থেকে লেখা চিঠিতে স্পষ্টই বলা হয়েছে যে ‘বিসর্জন’ নাটকটি পূর্বেও কলকাতায় এবং অন্যত্র অভিনীত। হয়তো তিন বছর আগে এম্পায়ার থিয়েটারে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্রযোজিত ও অভিনীত ‘বিসর্জন’-এর প্রতি ইঙ্গিত আছে। এই অভিনয় দেখেই রসরাজ অমৃতলাল ‘ইন্ডিয়ান ডেইলি নিউজ’-এ (৪ সেপ্টেম্বর ১৯২৩) আবেগপূর্ণ প্রশস্তি লেখেন যা পড়ে শরৎচন্দ্র অভিভূত হয়েছিলেন। পূর্বোক্ত প্রযোজনায় জয়সিংহের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন রবীন্দ্রনাথ এবং রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন গগনেন্দ্রনাথ (গোবিন্দমাণিক্য), তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় (নক্ষত্রমানিক্য)। সাহানা দেবী সঙ্গীতে অংশগ্রহণ করেন। এই তালিকা হেমেন্দ্রকুমার রায়ের বই থেকে সংগৃহীত। ‘রবীন্দ্র জীবনী’কার প্রভাতকুমারের মতে, রথীন্দ্রনাথ গোবিন্দমাণিক্যের ভূমিকা করেন। অভিনয়ের পূর্বে এই নাটকটির পাণ্ডুলিপিও নিশ্চয় পুলিশ-দপ্তরে জমা দিতে হয়েছিল? এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে তার কোন হদিস পাওয়া যায় না। যাই হোক, আগেই বলা হয়েছে যে শিশিরকুমার ভাদুড়ী নির্দেশিত ‘বিসর্জন’-এর প্রথম অভিনয় রজনী ২৬ জুন ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ। কিন্তু আপত্তিকর অংশ বাদ দিয়ে নাটকটি অভিনয়ের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে ১২ জুলাই (আগে তারিখ ছিল ৯ জুলাই, পরে নিচে ১২ জুলাই লেখা), ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে। তবে কি পুলিশের বিনা অনুমতিতেই এই নাটকটি প্রথম দিকে অভিনীত হয়েছিল? ‘নাট্যমন্দিরে’র ম্যানেজিং এজেন্টদের লেখা ডি.সি.ডি.ডি.-র চিঠিটি নিচে সম্পূর্ণ উদ্ধৃত হলো :
GOVERNMENT OF BENGAL
Office of Commr. of Police, Calcutta
D. D.
Department
…….. Group
Branch
To,
The Managing Agent (পরে লাল কালিতে s যোগ করে বহুবচন করা হয়েছে)
Natya Mandir Ltd.
138 Cornwallis St.
No. 2820 dated the 9th/12th July 1926
With reference to his (লাল কালিতে কেটে their করা হয়েছে) letter dated the 23rd June submitting a manuscript copy of the play entit[led] ‘Bisarjan’ the Managing Agent (লাল কালিতে s যোগ করা) of the Natya Mandir Ltd. is (লাল কালিতে is কেটে are করা) that the Commr. of Police Calcutta
notes that the above play is intended to be staged at the Naty[a] Mandir Ltd. Calcutta shortly, subject to the deletions signed by him. (লাল কালিতে কেটে করা them).
স্বাক্ষর অস্পষ্ট
12/7
L. N. M.
D. C. D.D.
ডি.সি.ডি.ডি-র চিঠি থেকে বোঝা যায় নাটকটির ইতিমধ্যেই যে একাধিক অভিনয় হয়ে গেছে, সে বিষয়ে তিনি অবহিত নন। ‘অভিনয়নিয়ন্ত্রণ আইন’ কি এরকম দায়সারাভাবে প্রযুক্ত হতো? নাকি রবীন্দ্রনাথ এবং শিশিরকুমার ভাদুড়ীর নাম যুক্ত থাকায় পুলিশ কর্তৃপক্ষ উদার মনোভাব অবলম্বন করেছিলেন? নাট্যাচার্যের নাম যে তাদের কাছে খুব পরিচিত ছিল এমন প্রমাণ অবশ্য সরকারি রিপোর্টে নেই। একবারও কোথাও তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে সমকালীন সাময়িক পত্রের সাক্ষ্য থেকে বলা যায় যে ডি.সি.ডি.ডি.-র আগেই ‘বিসর্জন’ নাটকের অভিনয় শুধু নয় সমালোচনাও বেরিয়ে যায়। ‘নাচঘর’ পত্রিকার চারটি সংখ্যায় ‘বিসর্জন’ নাটক বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা বেরিয়েছিল। প্রথম কিস্তি প্রকাশের তারিখ ১৭ আষাঢ় ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১২ জুলাই, ১৯২৬-এর আগে। সমগ্র আলোচনাটি ‘বহুরূপী’ পত্রিকার ‘শিশিরকুমার সংখ্যা’য় (৪৫ সংখ্যা; শম্ভু মিত্র সম্পাদক, এই সংখ্যার সম্পাদক চিত্তরঞ্জন ঘোষ) পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। ‘নাচঘর’-এর প্রতিবেদক প্রথম দুদিনের অভিনয়েরই বিশদ আলোচনা করেন। কেননা বিভিন্ন চরিত্রে অভিনেতার বদল হয়েছিল। প্রথম রজনীতে চরিত্রলিপি ছিল এইরকম :
রঘুপতি : শিশির কুমার ভাদুড়ী
জয়সিংহ : রবীন্দ্রমোহন রায়
গুণবতী : চারুশীলা দেবী
গোবিন্দমাণিক্য : মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য
অপর্ণা : শ্রীমতি ঊষা দেবী
চাঁদপাল : অমিতাভ বসু।
এছাড়া ভিখারির চরিত্রে কৃষ্ণচন্দ্র দে অবতীর্ণ হন। মঞ্চ নির্দেশক ছিলেন অবনীন্দ্রশিষ্য শিল্পী রমেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। পরের অভিনয়ে বিভিন্ন ভূমিকায় কিছু পরিবর্তন হয়। যেমন জয়সিংহ করেন শিশিরকুমার ভাদুড়ী এবং রঘুপতি নরেশচন্দ্র মিত্র। শেষোক্তজনের ভূমিকাটি বদলে রবীন্দ্রমোহন রায়কে দেওয়া হয়।
কর্নওয়ালিস থিয়েটারে যখন ‘বিসর্জনে’র অন্তত দুরাত্রি অভিনয় হয়ে গেছে তখন তৎকালীন ডি.সি.ডি.ডি. (স্বাক্ষর এ আদ্যক্ষর আছে এল.এল.বি) বাংলা প্রাদেশিক সরকারের হোম পলিটিক্যাল বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি এ.ই. পোর্টার আই.সি.এস-কে নোট পাঠাচ্ছেন :
No. 2821 (কালো কালিতে কেটে 4050 DPP) dated the 9/12th July 1926 (নীল কালিতে পুরোটা কেটে অস্পষ্টভাবে তারিখ লেখা।
My dear Portar,
Copy together with copies of the enclosures forwarded to I.B.C.I.D. Bengal for information and Publication in the Bengal Police Abstract.
(স্বাক্ষর অস্পষ্ট)
D.C.D.D.
A.E. Porter Esqr. I.C.S. Under Secy. To the Govt. of Bengal Police Department
I send herewith an extract from the Commr’s Register of dramas regarding replay entitled ‘Bisharjan’ submitted by the the Managing Agents, of [পরে কালো কালিতে কেটে দেওয়া] the Natya Mandir Ltd. Calcutta, on the 23rd. June 1926 (পরে নীল কালিতে তারিখটা কেটে দেওয়া)।
There were some objectionable messages in the play which have been deleted by the Managing[g] Agents (s কেটে দেওয়া) a copy of which is attached hereto.
The Managing Agents Avadi theatre have been informed as usual that the Commr. of Police notes dirty adverb play is intended to be staged at his theatre shortly. (পরে কালো কালিতে শেষ শব্দটি কাটা)
An extract from the Drama Register, together with a copy of the passages deleted, is been forwarded to I.B.C.I.D. Bengal for information and publication in the abstract.
Yours sincerely,
(SD.) L.N.B.
D.C.D.D.
এই নোটে ১০/৭, ১২/৭ এবং ১২?/৭-এ স্বাক্ষরিত আরও তিনজনের সই আছে।
‘বিসর্জন’ নাটক বিষয়ে পুরো নোটটি তৈরি করেছিলেন জনৈক জি.এস. রায়। তারই ভিত্তিতে ডেপুটি কমিশনার অভিনয়ের অনুমতি দেন। এই জি.সি. রায়ের প্রতিবেদন পড়ে মনে হয় না যে তিনি রবীন্দ্রসাহিত্য বিষয়ে খুব একটা ওয়াকিবহাল ছিলেন। শুরুতে তিনি ‘বিসর্জন’ বিষয়ে লিখছেন ‘A play dramatised from Dr Rabindranath Tagore’s Novel …Rajarshi.’ এই উক্তিতে এমনিতে হয়তো অসঙ্গতি নেই, কিন্তু নাট্যরূপ দিয়েছেন কে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ না নাট্যদলটি তা স্পষ্ট হয় না। যাই হোক, নাটকটির বক্তব্য বিষয়ে তার অভিমত,
The central theme of the drama deals with the horrors of animal sacrifices in time of worship. It is a pleading against this religious custom.
Senes of the dramas are laid in the capital of the kingdom of Tripura (now callef Tipperah) of ancient days.
এরপর সংক্ষেপে নাটকের কাহিনী কি বলা হয়েছে। উপসংহারে পাণ্ডুলিপির দু জায়গায় তার কাছে আপত্তিকর মনে হয়েছে। ৩৭ পৃষ্ঠায় আছে :
অক্রূর। যদি পেয়ে থাকে তা কোন মুসলমানের ভূতে পেয়েছে, নইলে বলি উঠিয়ে দেবে কেন?
এই বিষয়ে প্রতিবেদকের অভিমত তার ভাষাতেই বলি :
This suggests that a Hindu cannot stand against animal sacrifice to gods and goddesses. Search violation of Hindu religious practices is only possible of a Musalman. Bhut (ghost) is generally used as a term of hared i.e. to mean a creature without common sense.
In these days when the communal feeling between Hindus and Musalmans all running very high I suggested to the Manager to omit the word Musalman and he has done it.’
শেষ অংশটি কাল পেন্সিলে ক্রস করা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এর দ্বারা সম্মতি অথবা অসম্মতি জানাচ্ছেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না। সরকারি দপ্তরে সাধারণত ক্রসচিহ্ন দিয়ে অসম্মতিই বোঝানো হয়।
প্রতিবেদক আরো বলেছেন :
Though this is jokeously said still considering the present tension of the communal feeling the Manager has deleted the passage at my instance. There is nothing objectionable in it from political moral or social point of view. This may be passed.
Submitted to D.C. for order.
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় পুলিশের অতি সাবধানতার কারণ বোঝা যায়। কিন্তু পুলিশ কর্তৃপক্ষের এই আপত্তিকর কথা শিশিরকুমার কি কখনো রবীন্দ্রনাথকে জানিয়েছিলেন? নাকি নির্দেশরূপে তিনি একাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? ‘বিসর্জন’ হিন্দু বিরোধী নাটক এরকম অভিযোগ বহুবার উঠলেও রবীন্দ্রনাথের ওই নাটকের কোন অংশ মুসলমান সম্প্রদায়কে ক্ষুন্ন করতে পারে একথা কোন মহলেই কখনো শোনা যায়নি। আসলে দ্বিধা ছিল স্বয়ং শিশিরকুমারের মনে। পুলিশ থেকে যেটুকু বদলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল’সামগ্রিক নাটকের বিচারে তা হয়তো নেহাতই তুচ্ছ।
শিশিরকুমার স্বয়ং তার চেয়ে ঢের বেশি বদল করেছিলেন তার নাটকে। পরবর্তীকালে `যোগাযোগ’ উপন্যাসের নাট্যীকরণেও তিনি যতটা স্বাধীনতা নিয়েছিলেন তা থেকে বোঝা যায় শিশিরকুমার সমসাময়িক রক্ষণশীল হিন্দু মানসিকতার কাছে একাধিকবার আত্মসমর্পণ করেছিলেন। একজন নির্দেশক বা অভিনেতা যেভাবে একটি নাটককে উপস্থাপিত করেন, তার মধ্য দিয়ে তার মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়। শিশিরকুমারের নাটক-নির্বাচন এবং সম্পাদনাতেও তা পাওয়া যাবে। প্রসঙ্গটি বিশদভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।
একটা সময় বহু হিন্দুর কাছে ‘বিসর্জন’ নাটকে বিশেষ আপত্তিকর অংশ ছিল নাটকের শেষে রঘুপতি কর্তৃক দেবী প্রতিমা গোমতীর জলে নিক্ষেপ। হেমেন্দ্রকুমার রায় তাঁর ‘সৌখিন নাট্যকলায় রবীন্দ্রনাথ’ (১৮৮১ শকাব্দ) গ্রন্থে একাধিকবার এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। যেমন :
‘বিসর্জন’-এর মধ্যে ছিল জনপ্রিয়তার প্রভূত উপাদান, কিন্তু তার প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য দেখে পাছে গোড়া হিন্দুর প্রাণে আঘাত লাগে সেই ভয়ে বাংলা রঙ্গালয়ের কর্তৃপক্ষ তাকে মঞ্চস্থ করতে অগ্রসর হন নি।
….
কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, আমাদের সাধারণ রঙ্গালয় কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা সত্ত্বেও ‘বিসর্জন’-এর দিকে হাত বাড়াতে পারেন নি। একাধিক ব্যক্তির মুখে তার কারণও শুনেছিলুম। ‘বিসর্জন’-এর শেষের দিকে একটি দৃশ্য আছে, ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ রঘুপতি কালীপ্রতিমাকে দূরে নিক্ষেপ করছেন। এ দৃশ্য বাদ দেওয়াও চলে না এবং থাকলেও সাধারণ রঙ্গালয়ের শ্রেণীবিশেষের দর্শকরা ক্ষেপে উঠে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারত। ফলে পেশাদার রঙ্গালয়ে ‘বিসর্জন’-এর প্রবেশ হয়েছিল নিষিদ্ধ। নট-নাট্যকার অমৃতলাল বসুর মুখেও আমি এই কথা সত্য বলে শুনেছিলুম।
এখন প্রশ্ন ওঠে শিশিরকুমার কি তাঁর প্রযোজনায় দেবী বিসর্জনের অংশটি দেখাতেন? ‘রবীন্দ্রভবনে’ রক্ষিত পাণ্ডুলিপিটি কিন্তু সংশয় জাগায়। ওখানে ৭২ পৃষ্ঠায় ‘লঘু হোক/ জগতের বক্ষ’র পরে বন্ধনীর মধ্যে ‘গোমতীর জলে নিক্ষেপ’ নির্দেশটি কাটা। পুলিশ-কর্তৃপক্ষ যদি এটি আপত্তিকর মনে করতেন, তাহলে নিশ্চয় তাদের রিপোর্টে এর উল্লেখ থাকতো। অন্যদিকে ‘রবীন্দ্রভবনে’ ‘বিসর্জন’ নাটকের আরেকটি অভিনয়ের মঞ্চ নির্দেশনার খাতা রক্ষিত আছে। এটি হলো স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পরিচালিত ১৩৩০ বঙ্গাব্দের প্রযোজনা সংক্রান্ত। কাল এক্সারসাইজ খাতার ডান দিকে নীল কালিতে লেখা : Stage direction of the Performance in 1330 B.S. ওখানে প্রয়োজনীয় অংশে ‘মূর্ত্তিফেলা’, তারপরে বন্ধনীর মধ্যে ‘মূর্ত্তিফেলার আওয়াজ’ স্পষ্টভাবে লেখা আছে।
‘নাচঘর’ পত্রিকায় শিশিরকুমার ভাদুড়ী প্রযোজিত ‘বিসর্জনে’র বিজ্ঞপ্তি থাকত এইরকম :
এই বিসর্জন অধুনা প্রচলিত বিসর্জন নাটককে ভাঙিয়া গড়িয়া প্রস্তুত হইয়াছে। আকারে প্রকারে যথেষ্ট নতুনত্ব দেওয়া হইয়াছে। কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথের অনুগ্রহপূর্ণ আদেশ ও তাঁহার সুনিপুণ নির্দেশ নাট্যমন্দিরের অভিনয়ার্থ এই নাটক পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হইয়াছে। রবীন্দ্রনাথের অনেক নুতন গান সংযোজিত হইয়াছে। দৃশ্যাবলীর সংস্থানেও অনেক পরিবর্তন করা হইয়াছে। কাজেই এই বিসর্জনে নূতনত্বের অভাব হইবে না। কবির সুর ভাণ্ডারী শ্রীযুক্ত দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের সুশিক্ষায় এই নাটকের গান গুলি সঠিকরূপে তৈরি হইয়া প্রাণবন্ত হইয়া উঠিয়াছে। নাটকে ভাবোপযোগী দৃশ্যপট রূপদক্ষ শিল্পীর দ্বারা প্রস্তুত হইয়াছে। রবীন্দ্রনাথের পুরাতন নাটক নূতন হইয়াছে, বিসর্জন নাটকের এই নূতন রূপ দেখিবার জন্য সুধীবৃন্দকে সাদরে আহ্বান করিতেছি।
(‘বহুরূপী শিশিরকুমার সংখ্যা’)
কয়েকটি গানের সংযোজনের কথা বলা যায়। যেমন ‘এ বন্ধনে/ জয়সিংহে পারিবি না বাঁধিয়া রাখিতে’- অপর্ণার এই উক্তির পর বাঁ দিকে একটি গানের উল্লেখ আছে ‘কে বলে যাও যাও, আমার যাওয়া তো নয় যাওয়া’। তাছাড়া ‘কাঙাল, আমারে কাঙাল করেছো’, ‘আমার যাবার বেলায় পিছু ডাকে’ গানগুলিও যোগ করা হয়েছে।
কিন্তু আমাদের কৌতূহলের নিরসন এখনো হয়নি। সমসাময়িক কোন স্মৃতিচারণে আমি এ পর্যন্ত কোনো উল্লেখ পাইনি যাতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় নাটকের অভিনয়ে ‘দেবীমূর্তি নিক্ষেপে’র অংশটি বর্জিত। অথচ পাণ্ডুলিপিতে কাটা চিহ্ন আছে এবং ডি.সি.ডি.ডি-র চিঠিতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে ‘subject to the deletions sign by him/them.’
তবে জনরুচির খাতিরে শিশিরকুমার রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের যে গুরুতর পরিবর্তন করছেন তার প্রমাণ আছে। যেমন ‘ষোড়শী’ নাটক এ জীবানন্দের মৃত্যু ঘটনোয় শরৎচন্দ্রের সম্মতি ছিল না। জিতেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন :
জীবানন্দের মৃত্যু নিয়ে শরৎবাবু বললেন, ‘উপন্যাসে জীবানন্দের মৃত্যু নেই। তুমি মৃত্যু ঘটাবে কেন?’
শিশিরবাবু বললেন, ‘যেহেতু উপন্যাস আর নাটক এক নয়। আমাকে দর্শক মনোরঞ্জন করতে হবে পাঠক-মন নয়। জীবানন্দের মত একটা বীভৎস চরিত্র মৃত্যু ছাড়া দাঁড়াতে পারে না স্টেজে।’ অনেক তর্ক হয়। শরৎবাবু বিরুদ্ধ হয়ে চলে গেলেন। শিশিরবাবু অটল হয়ে রইলেন। অবশেষে শরৎবাবু ফিরে এলেন। জীবানন্দের মৃত্যু সংঘাত হলো। মঞ্চে সফল হল নাটক।
(‘শিশির-মূল্যায়ন’, ‘বহুরূপী শিশিরকুমার সংখ্যা’)
‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের নাট্যরূপ নিয়েও রবীন্দ্রনাথের প্রবল আপত্তি ছিল। বস্তুত নাটকের পরিসমাপ্তি যেভাবে দেখানো হয়েছে তাতে উপন্যাসের মূল বক্তব্য বিকৃত হয়েছে। এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ-শিশিরকুমারের কথোপকথন উল্লেখযোগ্য :
যোগাযোগের শেষটা বদলাতে চাইলুম। কবি রাজি নন আদৌ। আমি (শিশিরকুমার) বললুম, অপরাজিতা ফুল দিয়ে যে কুমুদিনী স্বামী কামনা করে, সেই চিরকেলে সতীকে বিদ্রোহী করবেন কি করে? কবি বললেন, তুমি আমার কুমুকে মামুলি হিঁদুটি করতে চাও? ওর সমস্ত বিশ্বাসকে ধুলিস্যাৎ করে জীবনের নাড়ীতে এসেছে বিদ্রোহ। এ তোমার সস্তার বিদ্রোহিনী নয়।
আমি তখন বললুম, তাকে একবার মধুসূদনের ঘরে যেতে তো হবে। শুনে কবি খুব ক্ষেপে গেলেন। বললেন, তা তো যাবে। যাবে কি থাকবার জন্য। যাবে ফিরে আসার জন্য।
আমি বললুম, ঐ মধুসূদনের ঘরে তার পায়ে গড় হয়ে প্রণাম করবে কুমুদ। দৃশ্য শেষ হবে। কথাটায় আরো উগ্র হয়ে কবি বললেন, কখখনো নয়, তা হবে না। হতে পারে না। আমি বললুম, তাই যদি হয় তবে সমগ্র দর্শক সমাজ খুশি হবে।
আমি দক্ষিণাটা ভালো পাব। শুনে কবি যেন অতলগম্ভীর হলেন। বললেন, তুমিতো খুব দুষ্ট লোক হে। তারপর বললেন, যা খুশি করো গে। তোমার যোগাযোগ লোকে কদিন মনে রাখবে? আমার যোগাযোগ বরাবর থাকবে। (রবীন্দ্রচর্চার ষান্মাষিক সংকলনে উদ্ধৃত)
এই সব ঘটনা থেকে তিনটি জিনিস উপলব্ধি করা যায়। পেশাদার রঙ্গমঞ্চে নাট্যনিয়ন্ত্রণ আইনের বোঝার সঙ্গে সঙ্গে সিন্দাবাদের বুড়োর মতো জনরুচির ভয়ও ঘাড়ে চেপেছিল। বস্তুত শিশিরকুমার, নরেশচন্দ্র মিত্র মঞ্চে এবং চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের রচনার ব্যাপারে যে স্বাধীনতা নিয়েছিলেন, তা পরবর্তী যুগের শম্ভু মিত্র, সত্যজিৎ রায় প্রমুখের পক্ষে অকল্পনীয়।
বাংলা রঙ্গালয়ের সামগ্রিক ইতিহাস যখন লেখা হবে, তখন দেখা যাবে যে ‘অভিনয়নিয়ন্ত্রণ আইনে’র পরেই নাট্যশালার সবচেয়ে ক্ষতি যা করেছে তা হল জনরুচির দোহাই। অথচ অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে দর্শককূল নতুনকে আহ্বান করতে সব সময়ে উন্মুখ। তাঁরা যদি কিছু প্রত্যাখ্যান করেন তা হলো দ্বিধাকে, বিকৃতিকে।
[‘বিসর্জন’ নাটক বিষয়ে পুলিশের ফাইল বিশ্বভারতীর ‘রবীন্দ্রভবনে’ রক্ষিত আছে।]