সুলতানা আজীম > তবুও প্রেম [পর্ব ১] >> মুক্তগদ্য

0
939

পর্ব ১

[এক] কখনো ওর মুখে, কখনো ওর কাছে শুনে, লিখলাম বর্ণালীর জীবনের কিছু অংশ।
[দুই] সচেতনভাবেই কিছু ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছি, না হলে বোঝাতে পারছিলাম না সঠিকভাবে, মনে হয়েছিল।

ওর নামও সুলতানা। নামটি, ভালোলাগে না আমার। বর্ণালী ডাকি ওকে। এটি খুব পছন্দ ওর। আমারও। কী ধরনের সে, তা যদি লিখতে চাই, বোঝাতে পারবো না ঠিক। লিখছি তবুও। লিখছি, একটুখানি। জন্মের পর থেকে এমনই ছিলো সে। এটি প্রমাণ করে তার সুস্থতা। খুব সুস্থ তাকে বলা যায় না অবশ্যই। বেশি আদরে গড়ে তুললে যা হয়। গড়ে তুলেছেন যারা, তারা নিশ্চয়ই বুঝতেন না, তার জীবনের জন্যে কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে, এভাবে বড়ো করে তোলা। অনেক ধরনের স্পোর্টস করে সে, বডি ফিটনেস ঠিক রাখতে। এসব শুরু করেছে, কিশোরী বয়সে প্রবেশ করে। যখন বুঝতে এবং জানতে পেরেছে, শরীরের প্রতিটি অরগান এবং মাসল যথেষ্ট সবল না হলে, ফিটনেস আসবে না। তবুও শরীরটাই তার প্রধান এবং একমাত্র শত্রু। বিরোধীতা করেছে সবসময়। কতো কতো ধরনের এলার্জি তার। কীসে নেই এলার্জি? এলার্জিটিক শরীর কী শান্তিতে থাকতে দেয় কাউকে? বৃষ্টির জল গায়ে পড়লো, বাইরে গেলো শীত-সন্ধ্যায়, জ্যাকেট ছাড়া। কাশি আর কাশির অবস্থানে থাকবে না। ক্রনিক হয়ে, তা পরিণত হবে ব্রঙ্কাইটিজে। কতদিন যে ভুগবে মেয়েটি। আর কী যে কষ্ট পাবে। ধুলো লাগলো গায়ে, তো, তখনই আক্রান্ত হবে। হাঁচি হাঁচি আর হাঁচি। র‌্যাশ হবে পুরো শরীরে। তা পৌঁছে যাবে নিওরোডিমিট্রিজে। আবদ্ধ ঘর সহ্য করতে পারে না। এয়ারকন্ডিশন নয়, ফ্যানের বাতাসও নয়, থাকতে হবে তাকে প্রাকৃতিক বাতাসে। খুলে রাখতে হবে জানলা। যে-কোন সিজনে। দিনে। রাতেও। প্রতিমুর্হূতে এরকম শরীরী সমস্যা নিয়েও, যেভাবে বেঁচে আছে সে, একটি শব্দে বললে, চমৎকার।
ভালোবাসি আমি ওকে। খুব ভালোবাসি। পরিচিত হলে ওর সঙ্গে, আমি নিশ্চিত, ভালোবাসবেন ওকে আপনি। পছন্দও করবেন। কেন জানেন? ওর সব নেগেটিভ পজেটিভ দিকগুলো মেনে নিয়ে, পছন্দ করা যায় ওকে। ভালোবাসা যায়। যে-কোন বিষয়ে আলোচনা করে ওর সাথে, মনে রাখার মতো সময় কাটাতে পারবেন আপনি। আবার চাইবেন। বার বার চাইবেন ওর সাথে দেখা হোক। আলোচনা হোক। সিরিয়াস সে নয় কোন ব্যাপারেই। কিছু হতেও চায়নি কখনো। যদি জানতে চান, এর কারণ কী? সে বলবে, ‘কিছু একটা হতে চেয়ে, বঞ্চিত হতে চাইনি, অনেক কিছু থেকে। নির্দিষ্ট সাবজেক্টে সমর্পিত জীবন, সীমাবদ্ধ হতে পারে।’

ওর দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতা, নাও মিলতে পারে আপনার সাথে, অনেক ব্যাপারে। প্রথম আলাপের পরেই মনে হবে আপনার, সে অন্যরকম। যে-কোন ঘটনা এবং যে-কোন বিষয়ে, তার উপলদ্ধি অন্য অনেকের মতো নয়। কাউকে দিয়ে প্রভাবিত হতে দেখিনি কখনো।

‘অন্য কাউকে দিয়ে প্রভাবিত হয়ে যদি বলি, চলি, লিখি এবং করি, তাহলে আমি কোথায়? কোথায় আমার নিজের মগজ, অনুভূতি এবং উপলদ্ধি? প্রভাবিত হওয়া মানেই অন্যের চেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং দর্শনে তুমি কনভিন্সড। মৌলিকতার অনুপস্থিতি। মৌলিকতা ছাড়া কী ক্রিয়েটিভ হতে পারে কেউ?’ মনে করে বর্ণালী। আরো কিছু হয়তো বলতে হবে ওর সর্ম্পকে। প্রাসঙ্গিক মনে হলে, পরে।

যুবকটি, দশ জনের মধ্যে একজন নয়, অন্য জন। এমন মনে হয়েছিলো তার। কোন প্রস্তুতি ছিল না। ছিল না অপেক্ষাও। দেখা হলো। প্রথম দিনটিতে, নাহ্ মনে রাখার মতো কোন ঘটনা ঘটেনি। দ্বিতীয় দিনটি, এলোমেলো ছিলো খুব। সন্ধ্যেটি ছিল সোনালি রঙের। শরীর ছুঁয়ে যাওয়া শান্ত বাতাসে, ছিলো বিষণ্নতা। অনেকগুলো অফিসিয়াল কাজের ব্যস্ততায়, কেটেছিল দিনটি। সাহায্য করবে সিস্টেম, কাজগুলো হয়ে যাবে নিয়মের মধ্যে। এরকম একটা ধারণা কাজ করেছিল অবচেতনে, অভ্যস্ততায়। ডিজিটাল দেশ হবে। শুনছে দশ বছর ধরে। হবে হবে হবে। হবে-র পর্যায়েই প্রায় সবকিছু এখনো। এতো জটিলতা প্রতিটি কাজে। এতো সময় হত্যা করা। মন্ত্রণালয়গুলোতে এতো ভিড় কেন বাইরের মানুষের? কটা কাজ হয় ঘুষ ছাড়া? কতো ঘণ্টা কাটে রাস্তার যানজটে প্রতিদিন? নির্দিষ্ট কটি রাস্তা ছাড়া, বাকি রাস্তাগুলোর অবস্থা? উন্নয়ন মানে কী?

সন্ধ্যা কী সোনালি হয়? যেখানে সে গিয়েছিল, আলোময় ছিল জায়গাটা। এতো আলো। বদলে দিল ছাইরঙ সন্ধ্যেকে। সোনালি হলো। খুব এলোমেলো একটা দিনের ক্লান্তি, এখানে এনে পৌঁছালো তাকে। পরিকল্পনা ছিলো না। দেখা হলো তার সাথে আবার। দ্বিতীয় বার। খাবার এলো, দুজনের। অবাক হয়েছিলো বর্ণালী। কখন অর্ডার করলো সে? জানতেও চাইলো না, খেতে চাচ্ছে কী-না অন্যজন। একমিটার দূরত্বে বসেছে দুজন। ‘আপনাকে আমি খুব পছন্দ করি, ভালোও লাগে অনেক।’ নিঃসঙ্কোচ কণ্ঠ যুবকের। বিস্ময় নয়। কিছুই নয়। অভ্যস্ত এসবে বর্ণালী। আলাপ হয়েছিল সেদিন দুজনার, বিভিন্ন বিষয়ে। কোন জবাব দেয়নি ওই বাক্য দুটোর। ধন্যবাদ, বলেছিল অভ্যাসের কারণে। ভদ্রতা করে। ওই পর্যন্তই।

‘কফি তৈরি করি? ক্লান্ত লাগছে। এতো কাজ করেছি সারা দিন।’ বললো বর্ণালী।
‘আমিই তো করতে চাচ্ছিলাম। তোর কথা শুনছিলাম তো, দেরি হলো তাই।’ বললাম আমি।

তৈরি করা ছিলো ফিশ ফ্রিকাডেলি। ব্রাউনি বানিয়েছিলাম সকালে। রং লালচে হলে, তুলে নিলাম ফ্রাইপ্যান থেকে ফ্রিকাডেলিগুলো। বসলাম বাগানে এবার।

আমার বাগানটির কথা বলি এখন। ছোট্ট পুকুরটির নীল-নীল জলের চারপাশে, অন্যরকম চরিত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে এটি। যিনি গার্ডনার তাঁর কৃতিত্ব যতোটা, তার চেয়ে একটু কম কৃতিত্ব আমার। গার্ডনার হয়েছেন তিনি চার বছর কলেজে পড়ে। সার্টিফিকেট পেয়েছেন ভালো রেজাল্ট করে। মালী হয়েছি আমি, হতে খুব ভালোবাসি তাই। আমার বাগান সাজানোর ধারণাগুলো ভালো লেগেছিল শিক্ষিত মালীর। দুজনের ভালো লাগার ঐক্যে সাজলো বাগানটি। এ-বাড়ির অতিথিরা বলেন, খুব সুন্দর, অন্যরকম বাগান। আমি বলি, মনে মনে বলি, রূপসী বাগান। অন্যরকম রূপসী।

মেতে আছে তুষারশুভ্র খরগোশগুলো ছুটোছুটি খেলার ঊল্লাসে এখনো। ডিনার-তৃপ্ত কাঠবেড়ালিরা ফিরে যাবে ঘরে, কিছুক্ষণ পরে। কনর্সাট-ক্লান্ত পাখিরা উড়ে উড়ে উড়ে, পৌঁছে যাবে নীড়ে। সাদা আর নীলের কী উত্তাল মিতালী, একটু ওপরের আকাশে। নেমে আসবে সন্ধ্যে ঢেকে দিতে সব, অতি ধীর শালিকের মতো, কিছুক্ষণ পরে।

জমিয়ে রেখেছিলাম ওর জন্যে, প্রবীণ এই বিকেলটি। মনোযোগী হতে হবে আমাকে এখন। ‘বলো বর্ণা।’ কখনো কখনো সংক্ষেপ করি ওর নাম।

‘আরো একটি দিন এলো, সেদিনের পরে। বৃষ্টির নুপুর বাজলো ক্লান্তিবিহীন, মাসটি শ্রাবণ নয়, তবুও। একটি কাজও হলো না সেদিন। ডিপ্রেশন হয় না আমার। হবার কারণও নেই। একসময় ছিলো। প্রচণ্ড ছিল। কেন ছিল? অন্যদিন বলবো, সে জীবনের কথা। হ্যাঁ, একটি তো নয়, অনেক অনেকগুলো জীবন থাকে মানুষের। সেসব জীবন পেরিয়ে শেষ হয় একদিন, একটি জীবন।

আমাকে নিয়ে বাইরে যেতে চাইলেন এক বন্ধু। বৃষ্টিক্লান্ত দিন শেষের সন্ধ্যেটি ছিল, বৃষ্টিবিহীন। স্পনটিনিয়াস সিদ্ধান্ত নেবো, সে-চরিত্র আমার নয়। তবুও গেলাম। আমার কোন কোন বন্ধুর সন্ধ্যে শুরু এবং শেষ হয় ওখানে। ওখানেই, যেখানে ওই তরুণ অথবা যুবকের সাথে দেখা হয়েছিল আমার। এই বন্ধুটি, যার নাম অনুপম, দুটো বই নিয়ে আলোচনা করতে চায়। যে-দুটো পড়েছে সে ওই সপ্তাহে। যে-কোন বই এবং সাহিত্যের সাথে আমার সর্ম্পক, নর্থ পোল আর সাউথ পোলের। ওর এবং আরো কজন বন্ধুর, সাহিত্য নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করার আগ্রহ, মরুভূমিতে এসে, সমুদ্রস্নান করতে চাওয়ার মতো।

বৃষ্টিধোয়া গাছের পাতারা এতো সুস্থ, আর উজ্জ্বল এতো। ছোট্ট বাগানটির ভেতর বসতে ইচ্ছে করলো আমার। ‘তোর যে রকম কোল্ড এলার্জি, ঠাণ্ডা লাগবে ওখানে বসলে,’ বললো অনুপম। ফিরে যাচ্ছি অন্য জায়গায় বসবো বলে। ‘আমাদের সাথে বসেন কিছুক্ষণ।’ তরুণ অথবা যুবকের আহ্বান। হ্যাঁ সে। খাচ্ছিলো আর কথা বলছিল দুজনের সাথে। হতে পারে তারা ওর বন্ধু। চারটি চেয়ার রয়েছে, একটি টেবিলে। খালি ছিল যেটি, বসলাম সেটিতে। অভদ্রতা হয় তো, না বসলে। শুরু করতে যাচ্ছে, এমন একটি পরিকল্পনার কথা জানালো সে। হলো আরো কিছু কথা। বিরক্ত হতে পারে অনুপম, ফিরলাম ওর কাছে। ক্যানডিড এবং অন্য কিছু গল্প, ভলতেয়ারের, অনুবাদ করতে চায় সে। আমার সহযোগিতা দরকার। উচ্ছ্বসিত আবেগে অধীর অনুপম। কোন পর্যায়ে আমার অসহায়ত্ব তখন, বল? বৃষ্টিস্নিগ্ধ সন্ধ্যেটি শেষ হলো সে দিনের, আমার অসহায়ত্বকে সমীহ না করে। ভালো যে, হলো তবুও।

আবারো দেখা হলো ওর সাথে। ওখানেই। অন্য একদিন। খাবার অর্ডার করার দায়িত্ব, নিজে থেকেই নিলো সে। অন্য তিন বারের মতো। সেদিনই প্রথম আলোচনা হলো, বেশি সময়, বিভিন্ন বিষয়ে। ‘আপনাকে এগিয়ে দেই সামনের দিকে, গাড়ি আসার অপেক্ষায় এতো রাতে একা এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়,’ বললো সে। কথা হয় যেতে যেতে। যেসব বিষয়ে, মতপার্থক্য নয়, মতবিরোধ হয় বেশি। রাগ হয়। ইচ্ছে করে ওয়ানট্র্যাক্ড মানসিকতা ভেঙে দিতে ওর। বলতে ইচ্ছে করে, সীমাবদ্ধতা সংকীর্ণ করে মানুষকে। আত্মকেন্দ্রিক করে। এতো রাগ হয়। এতো বেশি রাগ হয়। বলা হয় না কিছু। কোনোকিছুই। অভদ্রতা হবে ভেবে। শেষ হলো সেদিন, যুবকের সাথে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা। শেষ হলো না, ওর কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা। সে তর্ক করে। তর্ক করতে পছন্দ করে। নিজের ধারণা এবং মতকে চূড়ান্ত মনে করে অধিকাংশ সময়। বলেও সেভাবে। বেশি আত্মবিশ্বাসী। এবং এবং এবং। আধুনিক ভাবে নিজেকে। অহঙ্কারীও অনেক। ফিরে এলাম, অভিজ্ঞতার অস্বস্তি নিয়ে।’
[চলবে]