সুলতানা আজীম > তবুও প্রেম [শেষ পর্ব] >> মুক্তগদ্য

0
1378

দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

হারিয়ে যাচ্ছে পরিশ্রান্ত সূর্যমনি কোন এক অজানায়। রহস্যময়ী সন্ধ্যামেয়েটি বিলিয়ে দেয় নিজেকে, চারপাশের বাগান আর বনানীতে, সবটুকু উদারতায়। দেখি, কীভাবে পালিয়ে যায় মৃদু পায়ে মধুর বিকেল। দেখি, ডানার পালকের নীচে সবকিছু ঢেকে, কী র্নিভয়ে নেমে আসে কোকিল-রঙের রাত। দেখি, কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, প্রিয় প্রিয় বিকেলটি আমাদের। দেখতে দেখতেই, বলে বর্ণালী।
‘আমার পোস্টিং হয় অন্য দেশে। চলে যাই দূরে। অনেক দূরে। অচেনা পৃথিবী। অন্য জীবন। পেরিয়েছে চার মাস। যে কাজটি শুরু করার পরিকল্পনা করেছিল যুবক, শুরু করেছে। পাঠিয়েছে আমাকে তা মেইলে। জবাব লেখা, যত দ্রুত সম্ভব, খুব জরুরি ভদ্রতা। ব্যস্ততা এত, চাইলেও পারছি না লিখতে। অভদ্রতা হচ্ছে না? ফোন করি একদিন, হঠাৎ, কিছু না ভেবে। অবাক কী হলো সে? শুনছে আমার কথা। বলছে কম। শেষ হলো একসময়, আমার কথা। শেষ হলো একসময়, তার শোনা। পেরিয়েছে এরপর আরো তিন মাস।
তুই তো জানিস, গ্রহণ এবং বর্জন এ দুটো ব্যাপারে সচেতন আমি। নিজের জীবনের জন্যে যা জরুরি মনে হয় না, তা যত আকর্ষণীয় হোক, গ্রহণ করি না। সবার মতো হই নি। হতে চেষ্টাও করি নি কখনো। ফেইসবুকিং নির্দিষ্ট ছিলো, আমার প্রফেশনাল কাজের বৃত্তে। কলিগ ফোরামে। স্মার্টফোনে মেইলের জবাব লিখছিলাম একদিন। তা শেষ না করেই, একাউন্ট খুললাম দেশের ফেইসবুকে হঠাৎ। না ভেবে, যে-কটি কাজ করেছি জীবনে, এটি তার একটি। পরিচিতদের অ্যাড করলাম বন্ধুর লিস্টে।
‘ভালো হলো আপনাকে ফেইসবুকে পেয়ে।’ মেসেজটি এলো যুবকের কাছ থেকে।
চ্যাট করছি এই প্রথম। করছি তার সাথে, ভীষণ রকম ইগোইস্ট যে। করছি তার সাথে, খুব রাগ হয়, যার ওপরে আমার। তার সাথেই চ্যাট করছি, বুঝতে পারছি না যাকে।
দুটো দিক রয়েছে ইগোর। পজেটিভ হলে, ইগো থাকা জরুরি। নেগেটিভ হলে, ইগো ক্ষতিকর। সীমাবদ্ধতা, সঠিক অভিজ্ঞতার অভাব এবং আরও কিছু কারণ রয়েছে এর পেছনে। সেটা বুঝতে পারছে না। মনে করছে সে যা জানে এবং বোঝে, সেটাই অ্যাবসলিউট। এও আধিপত্যবাদিতা। বেশি বোঝে, বেশি জানে, বেশি পড়েছে। অনেক বেশি। আরো একটি কারণ রয়েছে, নারী। নারী তো বেশি বুঝতে, বেশি জানতে, বেশি পড়তে পারে না, পুরুষের চেয়ে। কোন কারণেই না। হ্যাঁ, নারীই আমি তার কাছে। সে কী জানে না, নারীই তো তাকে এনেছে পৃথিবীতে। দায়িত্বটি নারীর একার নয়। চাপিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের ওপর। সন্তানকে গড়ে তোলার। যত্ন করার। মেনে নিয়েছে নারী, যথেষ্ট কঠিন এই কাজটি। সেই মানুষদের আন্ডারএস্টিমেট করবে কেন? করছে, সচেতনভাবে নয়। স্বভাবের অভ্যস্ততায়। বুঝতে পারছি।
চ্যাট করতে থাকি তবুও, প্রায় প্রতিদিন। অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে অনুভূতিতে আমার। নতুন ধরনের অস্থিরতা। অন্যরকম অস্থিরতা। বাড়ছে এটা। বেড়েই যাচ্ছে প্রতি মিনিটে। প্রতি ঘণ্টায়। প্রতিদিন। এসব মানায় না আমার স্বভাবের সাথে। নিজের পছন্দে গড়ে তোলা জীবন আমার। চলা? তাও নিজের মতো করেই। কে কী বললো, কে কী ভাবলো, কেয়ার করি নি কখনোই। অন্য অথবা অন্যদের ইচ্ছার জীবন, কেনো যাপন করবো আমি? জীবনটা যদি হয়ে থাকে আমার, কীভাবে তা যাপন করবো, সে সিন্ধান্তও আমার। জানি এটা। মানিও এটাই।
কী হলো আমার? নেশা হচ্ছে। চ্যাট করার নেশা। কাজের ফাঁকে। বিশ্রামের মাঝে। দিনে রাতে। যখন তখন। কাজের ক্ষতি হচ্ছে খুব। সময় হারাচ্ছি অনেক। ঘুমোচ্ছি কম। কী খাচ্ছি তাও ভাবছি না। তবুও। তবুও। নিজের ক্ষতি, ধারাবাহিক ক্ষতি, করে কোন মানুষ? করছি আমি। কিন্তু আমিই তো বলতাম, নেশা সে-ই করে, নিয়ন্ত্রণহীন যে। নিয়ন্ত্রণহীনতা মানে, ব্যক্তিত্বহীনতা। নেশা, তা যে কোন কিছুরই। ব্যক্তিত্বহীনতা, নির্দিষ্ট নেশার ব্যাপারে। নেশা? হ্যাঁ, নেশাই তো। চ্যাট করার নেশা। নিয়ন্ত্রণ করছি না নিজেকে। করছি না কেনো?
পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো দিন। সপ্তাহ। মাস। চ্যাটের ভাষায় যা বুঝছি, কটি শব্দে বললে, যুবকটি এরকম, অহংকারী, ত্যাদোড়, তার্কিক। অন্যমনষ্কতা এবং হেঁয়ালীও রয়েছে ওর আচরণে। নিজেকে বুঝি যতটুকু, কটি শব্দে বললে, জেদি খুব। প্রয়োজনে যথেষ্ট ত্যাদোড়। সহানুভূতিশীল, আত্মমর্যাদা সচেতন। ‘যা হয় হবে’ টাইপ রিস্ক টেকার। যে কোন ব্যাপারে স্বচ্ছ এবং আন্তরিক।
চ্যাট করছি নিয়মিত, এরকম দুজন মানুষ। হচ্ছে এর ভেতরেই, ঝগড়া, অভিমান, রাগ, মতবিরোধ। চ্যাট করছি তবুও আমরা। আক্রান্ত দুজনেই, চ্যাটের ক্ষুধায়, বুঝতে পারি। কিন্তু কেন? তা বুঝতে পারছি না।
অনুভব করি তার ভালোবাসা। অনুভব নয় শুধু, লেখেও সে। বার বার লেখে। এরকম একটি যুবককে কী ভালোবাসা যায়? ভালোবাসা কী ইচ্ছে-অনিচ্ছের অনুভূতি? ভালোবাসা নয়। প্রেম। প্রেম, তৃতীয়বার প্রবেশ করলো, আমার জীবনে। যার সাথে মতপার্থক্য নয়, মতবিরোধ এতো, কী করে ভালোবাসতে পারে তারা, একে অন্যকে? কী করে হতে পারে প্রেম?
এক বিশেষ ধরনের নেশা হচ্ছে প্রেম। এই যে কমাস ধরে চ্যাট করছি আমরা, কিসের নেশা এটা? ভালোবাসার? প্রেমের? কী জানি। প্রেমের নেশার বয়স তো, অন্য যে কোন নেশার বয়সের চেয়ে কম। অনেক কম। আ্যামিন, ইথাইল আর ফিনাইলের জৈব রাসায়নিক নেশা এটা। খুব বেশি ভালো লেগে গেলে কাউকে, খুব আকর্ষণ অনুভব করলে তার জন্যে, মাথা থেকে এই রাসায়নিক জোয়ার, নার্ভের মাধ্যমে রক্তকে নির্ভর করে, প্লাবিত হয় সারা শরীরে। ব্যাকুল হয়ে পড়ে মানুষ, বিপরীত মানুষটির জন্যে। হয়ে পড়ে অধীর, অস্থির। দেখতে চায় তাকে। পেতে চায় কাছে। খুউব কাছে। কেন? আরো একটি জৈব রাসায়নিক, অক্সিটোসিন বলা হয় যাকে, এটি বিভিন্ন পরিমানে মিশে থাকে মানুষের রক্তে। তৈরি করে, শরীর র্স্পশের সুখ। পরের নির্ধারিত গন্তব্য হচ্ছে যৌনতা।
‘আপনি এদেশের মেয়েদের মতো নন। একেবারেই অন্য রকম। সেজন্যেই এতো ভালো লাগে আপনাকে আমার।’ যেদিন বললো সে, রাগ হলো আমার। প্রচণ্ড রাগ।
‘কোন পুরুষ কী দেখেছেন আমার মতো? তুলনা শুধু নারীদের সাথেই হবে কেন? কেন বলতে পারলেন না, আপনার মতো কোন মানুষ দেখি নি আমি এদেশে?’ বলেছিলাম আমি।
‘সত্যিই অন্যরকম একজন আপনি। সব ব্যাপারে ব্যতিক্রমী যুক্তি আছে আপনার।’ বলেছিলো সে।
‘নিজের যুক্তি এবং বুদ্ধি ছাড়া কোন কিছুই গ্রহণ করি না আমি। বর্জনও নয়। কথাটা বলেছি আগেও আপনাকে।’
সহজ সরল স্বাভাবিকভাবে কথা হয় না আমাদের। বেড়ে যায় আমারও, হার মেনে না নেবার টেনডেন্সি। অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিদিনের ব্যাপার হয়ে ওঠে আমাদের সর্ম্পকের ভেতর। চ্যাট যোগাযোগের কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলে, অতিক্রম করি আমরা বৃত্ত। কথা শুরু হয় ফোনে। এটিও হয়ে ওঠে, আর একটি নেশা। ওকে নিতে পারছি না আমি। পারছি না ছেড়ে দিতে।
ওর অনেক কথা, ক্ষুদ্ধ করে আমাকে। আমার কণ্ঠ, কানে না পৌঁছালে, চলে না ওর। আমারও চলে না, ওর সাথে কথা না বললে। এক অভিনব সংকট। এক জটিল সর্ম্পক। দ্বন্দ্ব এখন কেবল ওর সাথেই নয়। নিজের সাথে নিজেরও। কী করবো আমি? ঘুম, এতো এত এত প্রিয় আমার। পালিয়ে যাচ্ছে কেন? প্রেম, দু’বার এসেছিলো জীবনে। এমন তো ছিল না। একরকমও ছিল না। দুটো প্রেম-সর্ম্পক, ছিলো দু রকমের। কিন্তু এমন অস্বাভাবিক তো ছিল না? অস্বাভাবিক সর্ম্পকের মধ্যেও জন্ম নিতে পারে প্রেম? নেয় যদি, কারণ কী তার?
মতবিরোধ হলে যে-কোন বিষয়ে, আহত করতে আমাকে, এক সেকেন্ড ভাবে না সে। এভাবে তো কেউ কথা বলে নি আমার সাথে কখনো, আগে?
‘এভাবে কেউ বলে নি বলেই তো, অতি আত্মবিশ্বাসী তুমি। লিডার হয়ে থাকতে চাও সবসময়।’ বললো সে একদিন। এর মাঝে কোন একসময় ‘তুমি’ বলতে শুরু করেছে। ভালো লেগেছে আমার, ওর এই ‘তুমি’।
কী আশ্চর্য, এভাবে বলে কেউ? যার জন্যে এত অস্থির থাকো তুমি। যাকে ভালোবাসো, এভাবে কেন বলবে তাকে? সেই মানসিকতাই কাজ করছে? সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা। লিডারের অবস্থান থাকবে তোমার। তুমিই প্রভু। বৈষম্য। মানসিক অভ্যস্থতার। প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং প্রতিশোধের সর্ম্পক আমাদের? যদি হয় এমন সর্ম্পক, তা হতে পারে বিয়ের পরে। দুজনের জীবন মিলে, একটি সংসার হলে, অনেক কিছুই প্রবেশ করতে পারে এবং করে, সেই সংসারে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রতিশোধ। ঘৃণা এবং আরও অনেক নেগেটিভ ব্যাপার।
প্রেম সর্ম্পক তো অনন্ত অসীম সর্ম্পক নয়। সীমা-নির্দিষ্ট সর্ম্পক। গড়ে প্রায় চার বছর। এরই মাঝে একঘেঁয়ে আর ক্লান্ত হতে থাকে প্রেম। দুজনের জীবন আর প্রবল প্রেমের জোয়ারে ভেসে থাকে না। কমতে থাকে আকর্ষণ। পুরুষতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র এবং বিয়ের, শক্তিশালী কোন ভূমিকা থাকে না তখন। সুদীর্ঘ সময় একসাথে জীবন যাপন করা মানে, প্রেমের মাধুর্যে-ভেজা জীবন নয়। অনেক জটিল দায় দায়িত্বের শেকলে আবদ্ধ হয়ে, একসাথে থাকার বিরক্তিকর অভ্যাস কেবল। অনেক দেশে, নারী-পুরুষের, দুজনের ওপর দুজনের নির্ভরশীলতাও, একই সংসারের বৃত্তে আবদ্ধ থাকার প্রধান একটি কারণ।
এও সেই জৈব রাসায়নিকের বিপরীত খেলা। তিন থেকে চার বছরের মধ্যে, এই রসায়ন, অ্যামিন, ইথাইল আর ফিনাইল, শরীরের ভেতরে একধরনের টলারেন্স তৈরি করে। দিনে দিনে বাড়তে থাকে। বাড়তেই থাকে। এর সাথে লড়াই করার মতো প্রেমের নেশা শরীর আর তৈরি করতে পারে না। প্রেম অনুভূতি হারাতে থাকে তীব্রতা। টলারেন্স যতো বাড়ে, ততো কমে আসে প্রেম। কমতে কমতে শিথিল হয়ে যায় প্রেম সর্ম্পক। প্রেম-অভিলাষী মানুষেরা, বিচলিত বেদনাহত হয়ে পড়েন। জীবন্ত করে তুলতে পারেন না এই নিস্ক্রিয়তা শিথিলতা।
দুটো সর্ম্পক হারিয়ে যাবার পরে, প্রেম-সর্ম্পক নিয়ে আগ্রহ ছিলো আমার। কাজ করেছিলাম কিছুদিন এর ওপর। দুজন এক হয়ে সংসার করছি না আমরা। দশ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে থাকি। তবু কেন এত জটিলতায় জটিল সর্ম্পক আমাদের? কী করবো আমি? কেন সর্ম্পক রাখবো ওর সাথে? একটা সিন্ধান্তে আসতে হবে এবার। হবেই।
কথা হলো না একদিন। হলো না চ্যাটও। একশো বছর কী কেটে গেলো না আমার?
‘এই তুমি ফোন ধরনা কেন, কী হয়েছে তোমার? কী করেছি আমি? কেন শাস্তি দিচ্ছো? খুন করতে চাচ্ছো আমাকে? কথা বলো। চুপ করে থাকবে না। কথা বলো।’ তার কণ্ঠে প্রচণ্ড ঝড়।
কী বলবো আমি? বলতে গেলেই ওর ক্ষুদ্ধ আচরণের অভিযোগ করতে হবে। জবাব চাইতে হবে। কী জবাব দেবে ও? নিজের পক্ষেই বলবে। যেমন বলে, প্রতিবার। অপরাধ যা তা আমারই। ওর কোন ভুল নেই। অন্যায় আচরণও নেই।
শাটডাউন করতে হবে এবার আমাকে। এরকম যুদ্ধ ও করতে হয় মানুষকে? এতো অচেনা যুদ্ধ? নিজের বিরুদ্ধে, নিজের যুদ্ধ। পারছি না আর। অসুখী মানুষ তো আমি না। জীবনটি তো বেছে নিয়েছি নিজেই। গড়েছি, সাজিয়েছি জীবনকে, সম্পূর্ণ নিজের পছন্দে। আমার জীবনের রিমোট কন্ট্রোল, সে তো আমারই হাতে। কোন কারণে কতোটুকু যাতনা, আর কতটা আনন্দ আমি নেবো, না কী নেবো না, সে সিদ্ধান্ত তো আমার। এভাবেই তো চলছিলো জীবন এত দিন। নিজের সিদ্ধান্তে, নিজের নিয়মে। কী হলো এখন? পালিয়ে যাবো জীবন থেকে? সে মানুষও আমি না। তাহলে?
অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয় অফিস থেকে, মরোক্কোতে কাজ করার। ভালো হলো খুব। যদি স্থির করতে পারি নিজেকে এবার। আকাশের হাইওয়ে, জীবনের পার্টনার আমার। অভ্যস্ত এই পথ। ঘুমিয়ে অতিক্রম করি, আকাশপথের প্রায় পুরো সময়, প্রতিবার। কী হলো এবার? ঘুম কী আসে নি সাথে? গেলো কোথায়? একজনই এসেছে সাথে। সে। সেই তরুণ। না কী যুবক? কোথায় হারাবো আমি? পালাবো কোথায়?
আচ্ছা ও এমন কেন? ও কী স্যাডিস্ট? ও কী প্রিয়জনকে আহত করে আনন্দ পায়? রাগিয়ে দিয়ে অন্যকে, সুখী হয় খুব? ভালোবাসে আমাকে। অনুভব করি। কিন্তু ওর ভালোবাসার চরিত্র কেমন, বুঝতে পারি না। মুড ঠিক থাকলে, ভালোবাসে। ভালোবাসার শব্দ বাক্যগুলো বলে। বার বার বলে। লেখেও। মুড বদলে গেলে, বোঝা যায় না, ওর আচরণের চেহারা। অবাক হবার মতো, অপরিচিত বাক্য বলে, প্রচণ্ড আহত করে আমাকে। যা ঘটে নি কখনো, যা সত্য নয় তাই বলে। হঠাৎ করেই রেগে যায় সে। তখন হারিয়ে ফেলি আমার প্রেম। ওকে চিনতে না পারলে, ভালোবাসি কী করে?
আচ্ছা, ওর সাথে সর্ম্পক যাদের, অন্য সব মানুষের সাথেও কী এরকম আচরণ করে সে? না কী শুধু আমার সাথেই? জানতে চাইলে বলবেনা। অনেক প্রশ্নের জবাব দেয় না। দেয় যদি দু-একটি জবাব, তাও কুয়াশা ঢাকা অন্যমনষ্কতায়। তা দিয়ে কী বোঝা যায় কাউকে? না বুঝলে, খুব কঠিন নয় সে মানুষকে ভালোবাসা? তবুও, তবুও ভালোবাসি তাকে আমি। খুউব ভালোবাসি। কেন? কোন জবাব কী আছে এর?
‘নাদোর’ এয়ারর্পোট পেরিয়ে, হোটেলে রুমে আমি। আগে তো এমন হয় নি কখনো। কত কত দেশেই তো গেছি কাজের জন্যে। হলিডে উপভোগ করতে গেলেও, সে দেশগুলোর মাটি ও মানুষের সাথে মিশেছি। বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে মিশে, বেড়িয়ে, দেশটির সব ধরনের অবস্থা অনুভব করতে চেয়েছি। জানতে চেয়েছি, যা কিছুতে আগ্রহ আমার সঠিক অভিজ্ঞতায়। কত কত কত অভিজ্ঞতা আমার জীবনে।
উৎসাহ পাচ্ছি না কেনো এখন? খুব অচেনা বিষণ্নতা, জোর করে জড়িয়ে রেখেছে আমাকে। আচ্ছা, ও যদি আসতো আমার সাথে এখানে? যদি আমি নিয়ে আসতাম তাকে, একই আচরণ কী করতো আমার সাথে? জানবো কেমন করে?
এই মরোক্কো, অন্য ধরনের একটি দেশ। পরিবেশ-নির্ভর করে তৈরি করা বাড়িগুলোও খুব অন্য রকম। অনেক আগে যখন এসেছিলাম, এমন ছিল না। ওয়েস্ট্রানাইজড এখন বিভিন্নভাবে। উপনিবেশের কারণ ছাড়াও, কয়েক ডিকেড ধরে, কেবল টেকনোলজিক্যাল কারণ নয়, ইনফরমেশন ওয়ার্ল্ডের কারণে, পৃথিবীর সব দেশই পাশ্চাত্যের অনেক অনেক কিছুই গ্রহণ করেছে। করে যাচ্ছে। কিছু ট্র্যাডিশনাল ব্যাপার ছাড়া। এটাই আধুনিকতা। আগেও তাই ছিলো। ধর্মপ্রধান দেশগুলোও তার বাইরে থাকছে না। যদিও ওয়েস্ট্রানাইজড হতে চেয়ে, বিকৃতও করছে অনেক কিছু। সঠিকভাবে বুঝতে না পারার কারণে।
এরপরেও বিপরীত একটি ছবির সাথে পরিচিত আমরা, ‘আল কায়েদা’র উদ্ভবের পর থেকে। ‘আইএস’ ইসলামিক এক্সট্রিমিজমকে ভয়ঙ্কর সব ডায়মেনশন দিয়েছে। তার কিছু প্রভাব রয়েছে এখনও, প্রতিটি দেশে। ড্যামেজ’ড হয়ে যাওয়া মগজের মানুষগুলোর ভেতরে। অদ্ভুত ধরনের কিছু পোশাক পরে বোঝাতে চাচ্ছে,‘ইসলামিক বিপ্লব’ ফ্যান্টাসির বাস্তবতা। এরকমই মনে হচ্ছে আমার। এটাও কমে আসছে, আল কায়েদা আর আইএস-এর পরাজিত অবস্থার পর থেকে।
এই অঞ্চলটি ‘নাদোর’, খুব পছন্দ আমার। বেশ কিছু মরোক্কান বন্ধু থাকে এখানে। পারি দেখা করতে কারো সাথে। বিশ্রাম ছাড়া অন্য কাজ নেই, এই শেষ বিকেলে। ফোন করলে, খুব দ্রুত চলে আসবে, সব কাজ রেখে। নিয়ে যাবে আমাকে তাদের কাছে। ফোন, করতে ইচ্ছে করছে না। করবো কী করে? শান্তি কী দিচ্ছে সে আমাকে? এত এত এত অশান্তি তৈরি করছে আমার জীবনে যে, সে কেন এলো আমার সাথে এখানে? বিষন্নতা ক্লান্তি অস্থিরতা। স্নান ও ডিনার শেষে, আর কোন উপায় থাকে না, বিছানার আহ্বান উপেক্ষা করার।
মনের ক্লান্তি হারিয়ে যায় ঘুমের আদরে। জেগে যাই কোন অজানা কারণে আবার। রাত তখন কত, জানতে ইচ্ছে করে না। ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা হয়েছে যতটুকু, তার জন্যে দায়ী টেলিভিশনের স্ক্রিন। কম ভয়ানক ছিলো না সেটা। কী হচ্ছে আমার? এ কেমন ভূমিকম্প? মাথা থেকে পা। পা থেকে মাথা। ভেঙে যাচ্ছি। ভেঙে যাচ্ছি। হয়ে যাচ্ছি ধংসস্তূপ। বুঝতে পারি, ঢেউ তুলছে ‘অক্সিটোসিন।’ কাঁপাচ্ছে আমাকে। কাঁপাচ্ছে, ভীষণভাবে। কোন কর্তৃত্ব নেই আমার এর ওপর। এ এক প্রচণ্ড টর্নেডো। ঠেকাবো? সে শক্তি কোথায়?
আমি ভালোবাসি। ভালোবাসি আমি। তোমাকেই ভালোবাসি। আমার অনুভূতির প্রতিটি বিন্দু বলছে। বলছে, প্রবল টর্নেডোর তীব্রতায়। আর প্রচণ্ড ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে। সে কোথায়? কোথায় সে এখন? এই ভূমিকম্প, তাকেই চাচ্ছে। তাকেই চাচ্ছে, এই টর্নেডো। আমার ভেতরের যে আমি, তাকে নয়।
মরোক্কোর কাজ সেরে ফিরে আসি। ভূমিকম্প? না শরীরকম্প? অনন্ত অসীম হয়ে কাঁপায় আমাকে। ভালো লাগে না কিছুই। খুউব প্রিয় এই জীবন, আর আমাকে জড়িয়ে থাকা, প্রিয় প্রিয় সবকিছু। যা ছিলো প্রতি মুহূর্তের ভালো লাগা, আর ভালোবাসা। কিছুই আর প্রিয় নয় এখন। সব প্রিয় কী হারাচ্ছি, একটি প্রিয়’র জন্যে? এ অনুভূতিই প্রেম? এই অনুভূতিই সেই ভালোবাসা, যা উন্মাদ করে অস্থিরতায়? কাঁপায় ঘুম ঘুম ক্লান্তিতেও? আর কেউ নেই কেন, আমার পৃথিবীতে, সে ছাড়া?
দেশে যেতে হলো আমাকে, জরুরি কিছু কাজে। ওর কাছে পৌঁছানোই কী সবচেয়ে জরুরি ছিলো না? দেখার নেশা। অল্প দেখা মানুষটিকেই, অনেক দেখার নেশা। ‘তোমায় নতুন করে পাবো বলে’ গানটির লিংক সে পাঠালো আমাকে, আসবো জেনে। শুনলাম। বার বার শুনলাম। রোম্যান্টিসিজমে আক্রান্ত সে? কতটা? ভাবতে ইচ্ছে করলো, হয়তো সে তেমনই হবে, যেমন হওয়া উচিত, আমার সাথে? সেই মানুষটিকেই হয়তো চিনবো এবার, যাকে আমি চাই।
‘ঢাকা এয়ারপোর্টে দেখতে চাই তোমাকে।’ বাক্যটি বললাম হঠাৎ তাকে, অসংযত আবেগে। প্রেম কী অধীর আবেগের, কিছু অধিকার তৈরি করে দেয়? আমার মতো অধিকার সচেতন মানুষকেও? আমি কী এখনও সচেতন? যা কিছু ভাবছি, সচেতন ভাবে? না। আমি কী নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি, স্বপ্নিল অনুভূতি আমার? না। আমি কী চাচ্ছি? না। কেন? চাচ্ছি না কেন? প্রেম, দিতে চাচ্ছি। পেতেও চাচ্ছি। কারণ, মানুষ বাঁচে প্রেমে। কাজে নয়। তাকে খেতে হয়, সেজন্যে বাধ্য সে কাজ করতে। কাজ তাকে বিরক্ত করে। হতাশ করে। অতিষ্ঠও করে। সে ক্লান্ত হতে থাকে কাজে। প্রতিদিন একই কাজে। প্রেম, ভালোবাসা বাঁচায় তাকে। ব্যালেন্স করে। সময় বাড়িয়ে দেয় জীবনের।
দেখা হলো আমাদের বিমানবন্দরে। নয় মাস পরে। নাহ্ তেমন সে ছিল না। মিললো না আমার প্রত্যাশার সাথে। আমার মানসিক প্রস্তুতির সাথেও। জানালো ওর কাজের ব্যস্ততার কথা। জানালো, বিমানবন্দরে আসার কারণে, কত কত কত ক্ষতি হলো তার কাজের। এত প্রিয় তার কাজ? প্রায়োরিটির দিক থেকে তা প্রথম? অবাক হলেও, স্বাভাবিক থাকতেই পছন্দ করলাম। জেদি আমি তা ঠিক। কিন্তু হট টেম্পারমেন্টের মানুষ নই। রেগে সিন্ধান্ত নেই না।
অনেক কিছুই সে করলো আমার জন্যে, যা তার দায়িত্ব মনে করলো। বেশি রাতে বাইরে থাকলে, বাড়িতে পৌঁছে দেয়া। ফোন করে জানতে চাওয়া, কেমন থাকছি প্রতিদিন। দেখা হলে আমাকে খাওয়ানো রেস্টুরেন্টে। সুখময় হলো না তবুও, দেশে থাকা দিনগুলো আমার, ওর সাথে। হলো না প্রেমময়। বাড়তে থাকলো কনফ্লিক্ট। কখনো পৌঁছে গেলো তা, চুড়ান্ত পর্যায়ে। ধারাবাহিক হয়ে উঠলো ওর অভিযোগ, আমার সর্ম্পকে। কেন কাজে ব্যস্ত থাকি এত? দেরী করে এলাম কেন? এখন তার আর সময় নেই আমার জন্যে। কার সাথে ব্যস্ত ছিলাম ফোনে। এরকম অনেক ব্যাপারে। আর অন্তহীন অভিযোগ আমার, ওর অগ্রহণযোগ্য আচরণ সর্ম্পকে।
দেশে থাকা দিনগুলো কষ্টময় এমনিতেও। কোন ব্যবস্থা এবং অবস্থা অনুকুলে নয় আমার। শিশু, অদম্য আগ্রহের বিষয়। যা কিছু পছন্দ করি, ভালোবাসি, শিশু তার মধ্যে অন্যতম। দু তিন বছরের শিশুদের রাস্তায় ভিক্ষে করতে দেখলে, মানবেতর মানুষদের দেখলে, অসহ্য হয়ে ওঠে সবকিছু। অসহ্য মনে হয় নিজের বেঁচে থাকা। সুস্থ সুন্দর একটি জীবনের জন্যেই তো পৃথিবীতে আসে শিশু। কেন থাকবে না তার সেই অধিকার? কোন শিশুই কোন অপরাধ করে না কখনো। তবুও তাদের কেন নিতে হয় নিমর্ম এই শাস্তি? পেরিয়ে গেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর। অর্ধেক শতাব্দী। যথেষ্ট নয়? না কী যথেষ্টর চেয়েও অনেক অনেক অনেক বেশি। কোনো একটি সমস্যা কী বলা যাবে, সঠিক সমাধান হয়েছে যার? অথবা হয়েছে কিছুটাও?
এত এত সমস্যার সাথে যুক্ত হলো এবার, নুতন এক সমস্যা। সমস্যাটি, ভালোবাসার মানুষটির আচরণ। যার জন্যে এত দূর আসা, কী আচরণ সে করছে আমার সাথে? বেদনা বিধ্বস্ত হয়ে নয়, শিল্পিতভাবে যদি বলি, বলতে হবে, অভিনব অভিজ্ঞতা। অন্য কারো কী হয়েছে, এমন অভিজ্ঞতা? জানবো কী করে?
অসুস্থ হয়ে ক্লিনিকে যেতে হলো আমাকে। চেকআপ হোল, চিকিৎসা হলো। কিছুই হলো না আসলে। কম হলো না ক্লিনিক বিলের পরিমান। একজন ডাক্তারও বুঝলেন না, আমার সমস্যা মানসিক। বললাম না আমিও। কথা বললাম না কোন সাইক্রিয়াটিস্টের সাথে, নিজের উদ্যোগে। যে মানসিক সমস্যা আমার, কে পারবে তার চিকিৎসা করতে? এরকম সমস্যার কথা বলবোই বা কী করে? যে দেশে কাজ করি আমি, সম্ভব হতো সেখানে। দুজনকে একসাথে এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে, মানসিক থেরাপি করতেন সাইক্রিয়াটিস্ট। মেনেও চলতে হতো থেরাপি, চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। প্র্যাকটিস করে, বদলে যেত আচরণ আমাদের। ভালোবাসা আর ভালোলাগার প্রলেপে, সুস্থ আর সুন্দর হয়ে উঠতে পারতো জীবন।
অনেক অনেক কিছু ঘটলো তবুও, দেশে থাকার সময়ে। পজেটিভ বলা যাবে না, ঘটনাগুলোকে। বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত, দ্বিধান্বিত আমি। নাহ্, আর নয়। সরে যেতে হবেই আমাকে, এই সর্ম্পক থেকে। দেখা করি না ওর সাথে, ইচ্ছে করেই কদিন। অক্সিটোজিন কী ছেড়ে যায় আমাকে? ছেড়ে কী যায় হ্যারিকেন, টর্নেডো, ভূমিকম্প এবং তার প্রতিক্রিয়া? তবুও। অসহিষ্ণুতা পেরিয়ে যায় তার সবটুকু বর্ডার। উত্তেজিত সে এখন। প্রচণ্ড আচরণ করে উত্তেজনায়। যা বলতে চায় নি হয়তো, বলে তাও। বলে, উত্তেজনার বেপরোয়া আবেগে। কতটা অস্বাভাবিক সে? একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এর। নিশ্চয়ই আছে। সেটা জানার আর বোঝার, চেষ্টা করতে হবে আমাকে। বোঝাই নিজেকে আমি। আমি ভালোবাসি তাকে। এত ভালোবাসি কেন? না ভালোবাসলে, এত কষ্ট পায় কেউ?
দেখা করতে হয় আমাকে, ওর সাথে আবার। হেরে যাই নিজের কাছে। অক্সিটোসিনের কাছে। মধ্যরাতে, ব্যস্ত হয়ে উঠি বাড়ি ফিরতে। ‘আজ এখানেই থাকবো আমরা, ফিরতে হবে না।’ কী যে হোল আমার। কী হোল ওর? কী হলো আমাদের? কী দিল এবং দিল না সেই প্রবীন রাত, সে হিসেব আমি করবো না। এসেছিলো। এনেছিলো, টক-ঝাল-মিষ্টিতে তৈরি অন্য সময়। অনুপম রাত। মধ্য থেকে শেষ রাত। সকাল থেকে দুপুর। দুপুর থেকে সন্ধ্যে। আবার, এবং আবার। বিলীন হয়েছিলাম আমরা প্রবল প্রেমে। বলেছিলো সে আমাকে। বলেছিলো বার বার, ‘ভালোবাসি তোমাকে আমি। অনেক অনেক ভালোবাসি। যদি কোন ঈশ্বর থাকতো বুকে, সে হতে তুমি।’ সে কী তখন কেঁপে উঠেছিলো গভীরতম আবেগে? হয়তো। সে কেঁদেছিলো কেন, তা না হলে?
ফিরে আসার আগে, দেখতে চাইলো আমাকে, আর একবার। এবার কণ্ঠে তার বিনীত আহ্বান। সময় ছিলো না, একেবারেই। উপেক্ষা করবো ওকে, কেমন করে? এত প্রেমময় সে। এত? কয়েক ঘণ্টা পরেই ফ্লাইট আমার। এয়ারর্পোটে যাবার আগে, হিসেব করতে হবে যানযটের। বিরক্ত হলো না সে, আমার ব্যস্ততায়। বললো, বার বার বললো, ‘অনেক ভালোবাসি তোমাকে আমি, অনেক। তুমি চলে যাবে আজ? কী করে কাটবে দিন আর রাত? এত শূন্যতা কী সহ্য হবে আমার?’ আরও কিছু বেদনাহত বাক্য, বললো সে। জল ঝরেছিলো সেদিনও তার দুচোখে। বিষণ্ন হয়েছিলো তার কন্ঠ, দ্রুত এগিয়ে আসতে থাকা বিচ্ছেদের বেদনায়। পরিয়ে দিয়েছিলো আমার গলায়, একটি মালা। জড়িয়ে রেখেছিলো তার বুকে, পেরেছিলো যতক্ষণ। ভরিয়ে দিয়েছিলো, কোমল চুমোয়। উত্তেজনা। দিশেহারা মেজাজ। রাগ, রাগ আর রাগ। যা ইচ্ছে বলা। কিছুই আক্রান্ত করে নি তাকে, সেই সন্ধ্যায়। ভীষণ ত্যাদড় এই যুবকটিকে। কেন? জানি এর জবাব। আজ আর এত কথা বলবো না।’ উঠে গেলো বর্ণালী।
বিকেল থেকে সন্ধ্যে পেরুনোর মাঝে, চার বার বাথরুমে গেলো সে।
‘বায়োলজিক্যাল কোন ডিজঅর্ডার নয়তো?’ জানতে চাইলাম, ফিরে এলে।
‘ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে ভেতরে।’ বললো।
‘মেডিক্যাল হেল্প লাগবে?’ প্রশ্ন করলাম।
নিতে চাইলো না। আজ আমার বাড়িতেই থাকবে ও। প্ল্যান ছিলো আমাদের। ডিনারের প্রস্তুতি ছিলো। তরুণী হয়েছে এরই মাঝে, গাছের ওপরে থাকা পূর্ণ চাঁদ। পাতার আড়াল থেকে পালিয়ে আসা চাঁদের আলো, যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তা বলা যাবে একটি শব্দে, অপরূপ। বারান্দাতে বসলাম এবার, ডিনারের পরে। আজ আমাদের গল্প শোনার দিন এবং রাত। গল্প নয়। বর্ণার জীবনে গড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠা ঘটনাপ্রবাহ। শোনার আগ্রহ ছিলো আমার। তা-ই ওর বলা।
‘অনরবত ফোন আলাপের প্রেমময় মুগ্ধতায়, টেকআপ করলো দেশ ছাড়ার ফ্লাইটটি। টক-ঝাল-মিষ্টি প্রেমের স্মৃতি, আর মুগ্ধ শূন্যতায় দশ হাজার মাইলের দূরত্ব পেরুলাম। সান্নিধ্য অধীরতা, আবার দেখতে পাওয়ার নেশা বিভোরতায়, কাটলো আমাদের কটি দিন। স্মার্ট ফোন দায়িত্ব নিলো, ‘সাত সাগর আর তেরো নদীর’ দুই পাড়ের দুটি প্রেম ব্যাকুল হৃদয়ের মধ্যে ব্যালেন্স করার। সে কী বদলে গেছে? সত্যিই? বদলেছে কী, প্রেমের গুরত্ব অনুভব করে? বদলেছে কী, আমাকে তার প্রয়োজন, তাই? এই বদলানো পজেটিভ। খুউব ভালো লাগছে আমার। হ্যাঁ, ভালোবাসি আমরা। ভীষণ ভালোবাসি। দুজনেই, দুজনকে।
দুটি সপ্তাহ মাত্র। ফিরে গেলো সে তার আগের চরিত্রে, আবার। চমকে উঠলাম। শুরু হলো যুদ্ধ। নিজের আবেগের বিরুদ্ধে নিজের। নিজের অনুভূতির বিরুদ্ধে নিজের। অভিনব এই যুদ্ধ, ক্লান্ত করে তুললো আমাকে। সিদ্ধান্ত নিতেই হবে এবার। যতো রক্তক্ষরণ হোক হৃদয়ে। পারছি না আর। কিসের প্রেম এটা? কীরকম আবেগ? উগ্র মেজাজ, আর উত্তেজিত আচরণ, ভালোবাসা হয় কিভাবে? নাহ্ আর নয়। বন্ধ করে দিলাম যোগাযোগ। কঠিন সময়। তার জন্যে। আমার জন্যে। খুঁজছে আমাকে। খুঁজছে ব্যাকুল হয়ে। অস্থিরতায় উদ্ভ্রান্ত সে। অনুভব করি। স্থির থাকতে হবে সিদ্ধান্তে। খুন করতে হবে, অবাধ্য এই প্রেমানুভূতি। আর নয়। পেরিয়েছে আরো চার সপ্তাহ।
নতুন এক অনুভূতি জন্ম নিয়েছে শরীরে, বুঝতে পারি। ভালো লাগেনা কোথায়ও। অফিসে না। বাড়িতে না। বাইরেও না। খেতে ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে করে না, কোন কাজ করতে। পেরিয়ে গেছে ছয় সপ্তাহ। মিনেস্ট্রেশন হচ্ছে না। ইউরিন টেস্ট করি নিজেই বাড়িতে। পজিটিভ। উল্লসিত হয়ে উঠবো, পারি না। অপেক্ষা করি আরো এক সপ্তাহ। এর মাঝেই এপয়েন্টমেন্ট করি, আমার পারসোনাল গায়নোকোলজিস্টের সাথে। অভিনন্দন জানান তিনি, চেকআপের পরে। নিয়ম অনুযায়ী যা যা দেবার, বুঝিয়ে দেন সব প্যাকেট।
অপূর্ব এই আনন্দের খবর কী দেবো না তাকে? কী বলবে সে? কিছু সময় নিই, বুঝতে। নাহ, দেবো না। একজন মানুষ আসছে পৃথিবীতে। আমার সন্তান সে। সবটুকু অনুভূতি দিয়ে ‘ওয়েলকাম’ করছি তাকে। যা কিছু করা দরকার, তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি করবো। ভ্রূণ থেকে তৈরি হচ্ছে ছোট্ট বাবু। এর চেয়ে বেশি আনন্দ কী হতে পারে এই সময়ে?
কিন্তু এমন হচ্ছে কেন? সে তো আসছে দুজনের জন্যে। দুজনের হয়ে। কেন মি বলতে পারছি না, আমাদের সন্তান। শুধু আমার পরিচয়ে বড়ো হলে সে কী সুখী হবে পুরোপুরি? তাকে তো জানতেই হবে, কে তার বাবা। জানলেই কী হবে? বাবার সাথে নিবিড় সর্ম্পকের প্রয়োজন কী থাকবে না তার। আমি কী বঞ্চিত করবো তাকে, বাবার অধিকার থেকে? বুঝতে পারছি না। কী করবো?
জানাই যদি, কী প্রতিক্রিয়া হবে তার? সে কী প্রস্তুত বাবা হবার জন্যে? অস্বীকার করে যদি? উহ্, কী কঠিন সময়। অপূর্ব এই আনন্দ কেন, এতো বেদনার মনে হচ্ছে আমার? কী করবো আমি?
পেরিয়েছে আরো কটি সপ্তাহ। জটিল এই সংকট রূপান্তরিত হচ্ছে, ভয়াবহ জটিলতায়। বেড়ে উঠছে সোনামনি বাবুটি, ভেতরে আমার। শিশু, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ। সবচেয়ে প্রিয় মানুষও। এত এত এত প্রিয় যে, তাকে কেন ফেলছি আমি, এমন অপ্রিয় সংকটে? আসতে পারছি না কোন সিদ্ধান্তে। শতভাগ মনোযোগী হয়ে উঠি আমার বাবুর প্রতি। আমার শরীরের প্রতি। ভুলে যেতে চাই আর সবকিছু। চাইলেই কী হয়? সমাধান না করলে, নিজে থেকে তো শেষ হবে না সমস্যা।
সমাধান আছে প্রতিটি সমস্যার। সমস্যা আসে আগে। আর সমাধান আসে পরে। সমাধানে না পৌঁছুতে পারার সময়টুকুই আসলে সমস্যা।
ফোন এলো তার একদিন, আবার। সম্ভব হলো না এবার এড়িয়ে যাওয়া। অভিযোগে বিক্ষত করলো আমাকে। বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত সে। বললাম তাকে।
বললাম, ‘কোন দায় অথবা দায়িত্ব নিতে হবে না তোমাকে। ও আমার সন্তান। বলতে চাই নি। তবুও বললাম।’
কোন জবাব এলো না তার কাছ থেকে কিছুক্ষণ। কিছু বললাম না আমিও আর। ডিসকানেক্ট করলাম ফোন লাইন।
ফোন এলো আবার, পরদিন। বললো সে এবার, ‘সত্যি বলছো তুমি? একটি বাবু আসছে আমার?’
‘তোমারও নয়। আমারও নয়। বাবুটি আমাদের। তা তুমি চাইলেও। না চাইলেও।’ বললাম।
‘মানে? এরচেয়ে বেশি সুখ আর কী আছে আমার? একটি জীবন অপেক্ষা করেছি, একটি অথবা দুটি বাবুর জন্যে। আর সে বাবু তৈরি হচ্ছে, তোমার শরীরে, কতোটা আনন্দের আর গর্বের ব্যাপার, তা কী বোঝানো যাবে বলো?’
অনেকক্ষণ কথা হলো সেদিন, অনেক দিন পর। কথা হলো বাবুকে নিয়েই। স্বপ্ন আর আনন্দ মিলে, ভীষণ সুখী হয়ে উঠলাম আমরা। তবুও তুললাম সেই কথা। ওর মেজাজ আর আচরণের কথা। বাবা হবার জন্যে, বাবার চরিত্রও তো গড়তে হবে।
‘বুঝতে পারছি, অনুভবও করছি, এরকম আচরণ করে কারোই হতে পারবো না আমি। না তোমার। না বাবুর। শাস্তিতো কম হয় নি কিছু। তোমাদের দুজনকে ছাড়া চলবে না আমার। তিনটি মাস সময় দাও। দেখো, ঠিক ঠিক বদলে যাবো আমি।’ বললো সে।
অনুভব করলাম তার উপলদ্ধি। মনে হচ্ছে, সে বুঝতে পারছে তার ভুল। নিশ্চয়ই বদলাবে এবার। তোর কী মনে হয় বলতো?’ থামলো বর্ণালী।
আবার বাথরুমে গেলো সে। কী বলবো ওকে আমি? সত্য বলবো? মিথ্যে বলবো?
ওকে কিছু বলার আগে মনে মনে বললাম, মানুষ বদলায় না। তার জীবনের প্রয়োজনে, পরিস্থিতি বাধ্য করলে, বদলাতে চেষ্টা করে। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে, তার চরিত্রেই ফিরে যায় সে। কারণ, নিজের অভ্যাসে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে মানুষ। জন্মগতভাবে পাওয়া, এবং পরিবার সমাজ রাষ্ট্রের গড়ে তোলা চরিত্রই তার নিয়ন্ত্রক আসলে। ব্যতিক্রম আছে অবশ্যই। তবে ব্যতিক্রম কিছু ঘটনা দিয়ে তো আর ইনজেনারেল অবস্থাকে বিচার করা যায় না।
বুঝতে পারছি না কী বলবো আমি বর্ণালীকে। এ্যাবসলিউট কথা কী বলা যায়? না, বলা উচিত?
[সমাপ্ত]
পূর্ববর্তী পর্ব-১
http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ae-%e0%a6%a4%e0%a6%ac%e0%a7%81%e0%a6%93-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae-%e0%a6%ae-2/