সুলতানা আজীম > স্মৃতিময় হুমায়ুন আজাদ >> স্মৃতিকথা [পর্ব ২ ও ১]

0
2713
[সম্পাদকীয় নোট : এই লেখাটি একটি ধারাবাহিক স্মৃতিকথা। এর প্রথম অংশটি অনেক আগে তীরন্দাজ-এ প্রকাশিত হয়েছিল। দীর্ঘদিন পরে লেখক আবার এটি লিখতে শুরু করেছেন এবং দ্বিতীয় পর্বটি প্রকাশের জন্য দিয়েছেন। কিন্তু প্রথম অংশটি যেহেতু অনেক আগে প্রকাশিত হয়েছিল, অনেকেই হয়তো, বিশেষ করে তীরন্দাজ-এর নতুন পাঠকেরা সেই পর্বটি পড়েননি মনে করে, এই পর্বের শেষে প্রথম পর্বটি সংযুক্ত করে দেয়া হলো। অর্থাৎ লেখক এখন অব্দি এই স্মৃতিকথার যে দুটি পর্ব লিখেছেন, সেই দুটি পর্বই পাঠকেরা পড়তে পারবেন। লেখক পরবর্তী পর্বগুলিও দ্রুততম সময়ে তীরন্দাজে প্রকাশের জন্য দেবেন বলে আমাকে জানিয়েছেন। আশা করছি, খুব দ্রুতই এই স্মৃতিকথার তৃতীয় এবং পরবর্তী পর্বগুলি প্রকাশ করতে পারবো।] 
সুলতানা আজীম > স্মৃতিময় হুমায়ুন আজাদ [পর্ব ২]
সাজাতে চাচ্ছি, মগজের সেলে জমে থাকা স্মৃতির মুক্তোগুলো। সরে গেলাম তা থেকে দূরে। অনেক দূরে। নির্দিষ্ট বৃত্তে স্থির থাকার মানুষ তো আমি না। বৃত্ত ভাঙার পরে, ফিরে আসা আবার স্মৃতির সীমারেখায়। সীমারেখা? ট্যাবু ভাঙা মানুষও ফিরতে পারেন রেখার বৃত্তে। লিখতে কী পারবো আমি স-ব? সব স্মৃতি? সব সত্য? পারবো না। কেনো? না, বলবো না।
মনে পড়ছে, ফ্রিডরিশ শীলারের কথা। বিস্ময়কর প্রতিভা নিয়ে জন্মানো এই দার্শনিক-কবি, ভুগছিলেন জেনেটিক অসুস্থতায়, জন্ম থেকে। খুব বেশি সময় দেবে না জীবন তাঁকে, বুঝতে পেরেছিলেন। পরিকল্পিত লেখাগুলো শেষ করতে চাচ্ছিলেন, চলে যাবার আগে। পারেন নি। এরপর পেরিয়েছে, প্রায় তিনশ বছর। বেঁচে আছেন আজও। থাকবেন তত দিন, যত দিন থাকবে মানুষ এবং মানুষের সৃষ্টি বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত এবং সব কিছু। মৃত্যুর জন্যে জন্মায় যারা, তাদের বাঁচাতে পারে না কেউ। বেঁচে থাকার জন্যে জন্মান যাঁরা, তাঁদের মারতে পারে না কেউ। চেষ্টা করেও নয়। কখনোই নয়।
বুঝতে পারছিলেন হুমায়ুন আজাদ, বেশি সময় নেই তাঁর। অস্থির হয়েছিলেন, সব কাজ শেষ করতে। সব লেখাও। গভীর গোপন স্বপ্নগুলো সফল হোক, চাচ্ছিলেন। লিখেছিলেন আমাকে অনেকবার। বলেও ছিলেন বার বার। সিরিয়াসলি নেইনি কোন একটি মুহূর্তের জন্য এই আশঙ্কা তাঁর।
রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ ছিল খুবই কম, আমাদের আলোচনায়। তবুও একটি কবিতা (রবীন্দ্রনাথের) মনে করিয়ে দিতেন, মাঝে মাঝে। শেষের দু বছরে। জানেন হয়তো আপনিও কবিতাটি। ’শেষ বসন্ত’ আর্জেন্টিনার রাজধানীতে লেখা। ২১ নভেম্বর ১৯২৪ সালে। চিহ্নিত অংশটুকু, যা বলেছেন অনেকবার হুমায়ুন আজাদ, শোনাতে চাচ্ছি আপনাকে।
আজিকার দিন না ফুরাতে
হবে মোর এ আশা পুরাতে-
শুধু এবারের মতো বসন্তের ফুল যত
যাবো মোরা দুজনে কুড়াতে।
তোমার কাননতলে ফাল্গুন আসিবে বারংবার,
তাহারি একটি শুধু মাগি আমি দুয়ারে তোমার।
বেলা কবে গিয়াছে বৃথাই
এতকাল ভুলেছিনু তাই।
হঠাৎ তোমার চোখে দেখিয়াছি সন্ধ্যালোকে
আমার সময় আর নাই।
তাই আমি একে একে গণিতেছি কৃপণের সম
ব্যাকুল সংকোচভরে বসন্ত শেষের দিন মম।
ভয় রাখিয়ো না তুমি মনে-
তোমার বিকচ ফুলবনে
দেরি করিব না মিছে, ফিরে চাহিব না পিছে
দিন শেষে বিদায়ের ক্ষণে।
চাবো না তোমার চোখে আঁখিজল পাব আশা করি
রাখিবারে চিরদিন স্মৃতিরে করুণারসে ভরি।
রাত্রি যবে হবে অন্ধকার
বাতায়নে বসিয়ো তোমার।
সব ছেড়ে যাবো, প্রিয়ে, সমুখের পথ দিয়ে-
ফিরে দেখা হবে না তো আর।
ফেলে দিয়ো ভোরে-গাঁথা ম্লান মল্লিকার মালাখানি-
সেই হবে স্পর্শ তব, সেই হবে বিদায়ের বাণী।
খুব কম পড়লেও, রবীন্দ্রনাথের অজস্র কবিতা এবং গান, মুখস্থ হয়ে যেতো আমার। ভুলে যেতাম না কখনোই। মুখস্থ ছিলো এই কাবতাটিও। বলতাম তাঁর সাথে। শেষ হলে কবিতাটি, আবার বলতেন তিনি এই অংশটি :
বেলা কবে গিয়াছে বৃথাই
এতকাল ভুলেছিনু তাই
হঠাৎ তোমার চোখে দেখিয়াছি সন্ধ্যালোকে
আমার সময় আর নাই।
মগজের নির্দিষ্ট সেলের তীব্র আর্তনাদ, অনুভব করছি হৃদয়ের রক্তকণায়। যখন লিখছি এই কবিতাটি আজ। যখন লিখছি, এই অংশটি। রক্তের কণাগুলো রুপান্তরিত হলো জলে। দু ’চোখ নির্ভর করে, নেমে যাচ্ছে। অস্পষ্ট দেখছি সামনের মনিটর। বুঝিনি তখন। বুঝি এখন, কেন বলতেন। কেন বলতেন বার বার? লিখেছিলেন কেন চিঠিতে? সময় তো ছিলো না তাঁর। ছিলো না যে, তা তো বুঝলাম পরে। যখন কিছুই করার ছিলো না আর। যখন করার থাকে না কিছুই। ভয়ঙ্কর এই যন্ত্রণা। অসহ্যের চেয়েও কিছু বেশি, যা বহন করছি। করতে হবে শেষ দিনটি পর্যন্ত।
”শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা”- এরকম অস্থির সময়ে লেখা উপন্যাস। পাঠাচ্ছিলেন সাথে সাথে আমাকে, লেখা হলে দুটো পাতা। পড়ছি, কাজের ফাঁকে। জানাচ্ছি মত আমার, তাও কাজের ফাঁকে। এগিয়ে যাচ্ছিল, খুব দ্রুত পাণ্ডুলিপিটি। অবাক হলাম একদিন, কী লিখছেন তিনি? লিখেছেন-
“সে বেঁচে থাকবে কী নিয়ে? কেন বেঁচে থাকবে? কেন সে ভার বয়ে চলবে? কেন সে অসুস্থতার মধ্যে থাকবে? কেন সে বেছে নেবে ব্যাধি? তার কর্মের মধ্যে স্বপ্ন কোথায়? তার জীবনযাপনের মধ্যে স্বপ্ন কোথায়? সে তো নিজের জীবনই যাপন করে নি, যাপন করে এসেছে অন্যের বানানো জীবন, সেটা সে ট্রাউজারের মতো জামার মতো পরেছে, তাকে ঝকঝকে দেখিয়েছে, সেটা তার জীবন নয়।
অন্যের বানানো শার্ট আর ট্রাউজার আর কতকাল পরবো? ওগুলো আর চকচকে নেই; ময়লায়, দাগে ভরে গেছে, ছিঁড়ে গেছে, ফেড়ে গেছে; আমি আর ময়লা, দাগ ভরা, ছেঁড়াফাড়া জীবন পরে থাকতে পারছি না।
আমার জীবনই-বা আর কোথায়?
আমি কি চলে যাবো?
আমি কি ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নিচ্ছি চলে যাওয়ার?
আমার চলে যাওয়ার সময় এসে গেছে?
আমি কি প্রস্তুত?
আমি কি তৈরি?
রেডি?
আমি কি যেতে চাই?
এখনই?
নিরর্থক জীবন আমি বইতে পারছি না?
না কি অন্য কিছু?
দেয়াল দেখে আমি ভয় পাচ্ছি?
অসুখগুলো আমাকে খুব ভাবাচ্ছে?
বার বার মনে পড়ছে অসুখের কথা?
আমি ওগুলোকে ভুলে থাকতে পারছি না?
ভয় তাড়া করছে?
আমি কি সত্যিই মনে করি আমার অসুখ হয়েছে?
একটি নয় অনেকগুলো?
ডাক্তার বলেছে, তাই আমি বিশ্বাস করছি?
ডাক্তার বলার পর আমি বেশি ভয় পেতে শুরু করেছি?
সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেছে?
এজন্যেই কি রাতে আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে?
আমার রক্তে, আমার হৃৎপিণ্ডে একটা প্রেত বয়ে চলছে,
যাতে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে সব কিছু?
একা একা বনানীতে শুয়ে থাকতে কেমন লাগে? আমি শুয়ে থাকতে পারবো? বনানীতে শুয়ে থাকতে কি এখনকার থেকে বেশি একলা লাগবে? আমি কি বনানীতে একলা থাকার ভয় পাচ্ছি? শীত লাগছে? দেহের ওপর মাটির চাপ বোধ করছি? মাটি খুব ভালো লাগলেও মাটির নিচে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোতে ইচ্ছে করছে না? সেখানে কি হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোতে পারবো? সেখানে আমার হাত পা বেঁধে রাখা হবে না?”
‘কী লিখেছেন এসব? কী হয়েছে আপনার?’ আমার প্রতিক্রিয়া ছিল সেদিন এরকম।
‘আমার কথা তো নয়, এসব তো গল্পের চরিত্র বলছে। আর তুই রেগে যাচ্ছিস আমার ওপর।’জবাব ছিল তাঁর।
‘এতো আন্ডারস্টেটিমেইট করতে হয়না পাঠককে। চরিত্রটি কে, সেটা পাঠক বুঝতে পারবে না, তাই না?’ বলেছিলাম।
‘তুই কী আমার পাঠক নাকি?’ হেসেছিলেন।
‘চরিত্র তার চরিত্র পরিবর্তন করে শেষ গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে, কারণ কী?’ ক্ষুব্ধ হই।
‘লিখে শেষ করতে দে আগে, তারপর ঝগড়া করিস’ বলেছিলেন।
কিছু দিনের মধ্যেই শেষ করেছিলেন এই বইটি। বিভিন্ন ধরণের কাজে, বিভিন্ন দেশে আমি তখন। পাণ্ডুলিপির শেষের কিছু অংশ পড়া হয় নি আমার, অতি ব্যস্ততায়। চাপ দেন নি তিনিও। বেরিয়ে এলো বইটি, লেখক আর প্রেসের নিবিড় মনোযোগের মিলনে।
‘পাঠিয়ে দিয়েছি বইটি তোকে। মানসক্রিপ্টতো পড়া আছে তোর। শুধু বলবি, প্রচ্ছদ কেমন হয়েছে।’
হাতে এলে নিজের নুতন বই, পোস্ট করে দিতেন সেদিনই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজির্স্টার্ড বিলডিংয়ের পোস্ট অফিস থেকে। পোস্ট করতেন আরও অনেক কিছু, যখন যা ইচ্ছে হতো। যখন যা ভালো লাগতো, দেখাতে আমাকে। জানাতে আমাকে। কতো কতো কতো পোস্ট যে আসতো তাঁর, নিয়মিত, দশ হাজার কিলোমিটার দূরের ওই দেশ থেকে। ওই পোস্ট অফিসের সিল বয়ে আনতো, প্রতিটি খাম এবং প্যাকেট, দীর্ঘ আকাশপথের ক্লান্তি তুচ্ছ করে। আর সেদিন হাসতো, খুব হাসতো আমার বাড়ির গেটের ভেতরে স্থায়ী হয়ে থাকা, সিলভার কালারের লেটার বক্সটি। অফিসে যাবার সময় নীচে নেমে, প্রথম কাজটি হচ্ছে, লেটার বক্স খোলা।
কী ছিল আমার সেই দিনগুলো। মাস আর বছরগুলো। এতো অপরূপ, এতো ঝলমলে, এতো সমৃদ্ধ, এতো আনন্দ, এতো সুখ। এতো এতো এতো পেয়েছি আমি, ছোট্ট, খুউব ছোট্ট এই একটি জীবনে। ভালোবাসা, ভালোবাসা আর ভালোবাসায় ভরে ছিলো প্রতিটি মুর্হূত আমার। সহজ ছিলো না বহন করা, ভালোবাসার এতো এতো ভার। এতো দায়, আর এতো দায়িত্ব। কঠিনও ছিলো না। থাকলে ভালোবাসা, কঠিন কী হয় জীবন এবং কোন কিছু? ভালোবাসা নিজেই তো শক্তি। সাহস। সুখ। মূল্যবান করে জীবনকে খুব। করে গুরত্বর্পূণ, সহজ এবং সুন্দর।
নির্দিষ্ট কোন অঞ্চল নয়। এলাকা নয়। দেশ নয়। গ্লোবাল একজন মানুষ হতে পারলে, ভালোবাসায় পরিতৃপ্ত করবে পৃথিবীর মানুষ তোমাকে। প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়ে, সুখী করবে তুমিও সবাইকে। ভাবতাম, ভাবতাম তখন। ভাবি এখনো। এভাবেই কেনো সুখী হতে পারে না সবাই? ভালোবাসা পেয়ে এবং দিয়ে। কিছুটা নিঃস্বার্থ হওয়া। উদার হওয়া অনেকটা। সহজ হিসেব। কঠিন কী খুব?
নাহ্, হয় না। পারে না সবাই। জটিল করে তোলে সহজ অঙ্ককে। রক্তাক্ত করে নিজেকে। বিক্ষত করে, জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা অন্যদের। কাছের এবং দূরের। কিন্তু কেনো? কোন গ্যারান্টি কী আছে এই জীবনের, একটি মিনিটের? মৃত্যু? সেতো চলছে তোমার সাথে। থাকছে তোমার পাশে। যখন চলে যাও তুমি, কী যায় সাথে? সব অধিকার তোমার কেড়ে নিতে পারে, কোন দুর্বৃত্ত। অথবা দুর্বৃত্তরা। একটি অধিকার, শুধু একটি অধিকার, কেড়ে নিতে পারে না কেউ। তা মৃত্যু। বলতে পারে না কেউ, তোমাকে মরতে দেবো না আমি। এটাই একমাত্র অ্যাবসলিউট।
যেদিন চলে গেলেন হুমায়ুন আজাদ, মৃত্যু, প্রবেশ করলো আমার হৃদয়ে। তারও আগে, আব্বুর মৃত্যু। জীবনের ভেতরে জড়িয়ে থাকা একজন মানুষ, নাই হয়ে যেতে পারেন, ক’টি মিনিটে, বোঝার বয়স ছিলো না। ছিলো না অভিজ্ঞতাও। হলো ভয়াবহ এই অভিজ্ঞতা। মৃত্যু, ঢুকে গেলো মগজের দরজা খুলে। স্থায়ী হয়ে গেলো মনে, মগজে, জীবনে। ভালোবাসতে শিখলাম আমি তখন। শিখলাম ছড়িয়ে দিতে, ভালোবাসা। স্থির হলো ভালোবাসা, জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে, র্স্বাথবিহীন। এছাড়া জীবন হয় না। সুখ আর সুন্দরের ঝর্ণা, প্লাবিত করে না জীবনকে।
অনেক অনেক অনেক পোস্ট আসতো আমার। আসতো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। কতো কতো কতো ধরনের খামে। প্যাকেটে। লেটার বক্সের পাশেই ছিলো, প্যাকেট বক্সটি। ভরে যেতো, দুটো বক্স। স্ট্যাম্প সংগ্রহ করার হবি ছিলো। কতো সময় লাগতো, স্ট্যাম্পগুলো তুলে, অ্যালবামে সাজাতে। নষ্ট করতাম না একটি স্ট্যাম্পও। তাঁর চিঠি এবং প্যাকেটের স্ট্যাম্প তুলতাম না। ইচ্ছে করতো না, তুলতে। রেখে দিয়েছি ওভাবেই। সাজিয়েছি, তারিখ হিসেবে। আছে, এখনো সেভাবেই। এখন আর তাকাতে পারি না, ওই খাম আর ওই প্যাকেটগুলোর দিকে। এতো কঠিন মানুষ আমি। আর এতো কোমল। বুঝতাম না। বলেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, অনেকবার।
‘দু’টি ব্যাক্তিত্ব তোর। পাশাপাশি নয়। একটির বিপরীতে অন্যটি। কঠিন আর কোমলে মেশানো নয়। অপোজিট।’
‘এতোটুকুই বুঝি, যখন কঠিন হওয়া জরুরি তখন কোমলতা থাকবে কেনো? যখন কোমলতা অনির্বায, কঠিন কেনো হবো তখন?’ বলেছি।
মেনেছিলেন। এতো আক্রান্ত মানুষ, প্রতি আক্রমণ করতেন প্রবল প্রচণ্ড হয়ে। তাঁর স্বভাবের অংশ ছিলো এটা। মেনে নিতেন আমাকে সব সময়, কোন এক অজানা কারণে। হতে পারে, এই একটি এলাকা, যেখানে অশান্ত আর প্রচণ্ড হবার কোন প্রয়োজন অথবা আগ্রহ ছিলো না তাঁর। মতের পার্থক্য হতো আমাদের কখনো কখনো। আর তার সমাধান হতো বিবেচনায়, বুদ্ধিতে, গ্রহণ করে নেয়ায়। মতের বিরোধ কিন্তু, হতো না কখনো। বয়সের ব্যবধান বেশি থাকলেও, অনেক ব্যাপারে অসহিষ্ণু আমি, রেগে যেতাম খুব দ্রুত। বলে দিতাম, যা নির্দেশ দিতো মগজ। এরকমই আমি। ধরে রাখতে চাই না, একটি শব্দও নিজের মনে, মগজে। কিন্তু তিনি সহিষ্ণু ছিলেন, প্রতি মুর্হূতে। এটি, এই আচরণ তাঁর, এখনো বিস্ময়, আমার কাছে।
যেদিন আসতো তাঁর চিঠির খাম অথবা প্যাকেট, অস্থিরতা পৌঁছে যেতো চুড়ান্ত পর্যায়ে। এরকম অস্থিরতা নিয়ে, গাড়ি চালিয়ে অফিসে পৌছাঁনো, তিরিশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে,রিস্কি ছিলো। খুলতাম না তবুও।
*** *** *** ***
‘আমার অবিশ্বাস’ বেরিয়েছিলো বই হয়ে, কুৎসিত ওই ‘হুমায়ুন আজাদের কাছে খোলা চিঠি’র’ পরে। বাংলাদেশে এ ধরণের বই, কটি বেরিয়েছে জানি না। যতোগুলো প্রবন্ধের বই বেরিয়েছে হুমায়ুন আজাদের এটি অন্যতম একটি, মনে করি আমি। (এ বইটি নিয়ে আলোচনা করবো পরে।)
‘আমার বই কিনে, বুক সেলফে সাজিয়ে রেখে, গর্ব করার জন্যে নয়। পড়ে বোঝার জন্যে।’ বলেছেন কথাটি তিনি, অনেক বার।
‘পড়ে বোঝার জন্যে নয়, সঠিক ভাবে পড়ে, বুঝে, শুদ্ধ চেতনা প্র্যাকটিস করার জন্যে।’ বলতাম আমি।
পড়তে হয় তাঁর প্রতিটি বই সঠিকভাবে। বুঝতেও হয় সেভাবে। তাঁর বইগুলো দাবি করে, পড়ে বোঝার মতো মগজ, স্থির আগ্রহ, গভীর মনোযোগ। তা না হলে, সম্ভাবনা থাকবে ভুল বোঝার। ভুল বোঝার শুধু নয়, উল্টো বোঝারও। ঘটেছিলো সেটা। ঘটেছিলো তাঁর লেখক জীবনের শুরু থেকেই। আক্রমণ করা শুরু করে নি তখনও ধর্মান্ধরা। তার আগেই আক্রান্ত হতে থাকলেন তিনি, প্রগতিবাদী এবং প্রতিক্রিয়াশীল অনেক লেখক, পাঠকদের দিয়ে। এঁরা ভুল শুধু নয়, উল্টো বুঝতেন তাঁর লেখা। তাঁকেও। কারণটি কী ছিলো?
সরাসরি এবং সুস্পষ্ট ভাবে, সত্য লেখা এবং বলার জন্যে প্রয়োজন প্রবল মানসিক দৃঢ়তা, সততা, নিজের সাথে নিজের কমিটমেন্ট। কী লিখতে এবং বলতে চাই, তার সঠিক কনসেপ্ট, যৌক্তিক এবং যথার্থ ব্যাখ্যা। নির্দিষ্ট যায়গায় স্থির হয়ে থাকা, ট্যাবু দিয়ে বৃত্তায়িত, ভুলভাবে শিক্ষিত (?) সমাজে প্রয়োজন, আরও একটি অনুভূতির। যা লেখা যায় একটি শব্দে, নির্ভিকতা। কেনো আমি সত্য কথা লিখতে এবং বলতে পারবো না? এই উপলদ্ধি এবং প্রতিজ্ঞা নিয়ে যিনি লেখেন, তাঁকেই তো বলতে হয় নির্ভিক লেখক।
এসব গুণে উজ্জ্বল ছিলেন লেখক, অধ্যাপক আহমদ শরীফ। বলতে এবং লিখতে শুরু করেছিলেন তিনি, পঞ্চাশের দশক থেকে। ভাঙতে শুরু করলেন ট্যাবু, একটির পরে আরেকটি। এসময় এরকম আরো যাঁরা ছিলেন, দুজনের কথা মনে পড়ছে, তাঁদের মধ্যে। (বাংলা সাহিত্য যেটুকু পড়েছি আমি, তা সত্যিই খুব কম। এই দীনতা লজ্জিত করে আমাকে।) শওকত ওসমান এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। চেষ্টা করেছেন এঁরাও কোন কোন ট্যাবুর বিরুদ্ধে লিখতে। সাহিত্যনির্ভর এই প্রচেষ্টার মূল্যায়নও হয়েছে। হচ্ছে। এই দুজন খুব সরাসরি ছিলেন না, যতোটা ছিলেন আহমদ শরীফ। ততোটা স্পষ্ট হতে পারেন নি এ দুজন, যতোটা পেরেছেন, আহমদ শরীফ। আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনিও, বার বার। হাত-বোমা ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিলো তাঁর বাড়িতে। ‘মুরতাদ’ ঘোষণা করা হয়েছিলো তাঁকে। কেয়ার করেন নি কিছুই। ধর্মান্ধদের তো নয়-ই। বিরুদ্ধতা করেছিলেন তীব্রভাবে প্রচলিত, প্রথাগত স্ট্যাবলিস্টমেন্টেরও। শরীফ স্যার ছিলেন, এই অর্থে এনার্কিস্ট।’
এটা সমর্থন করি না আমি। এসব নিয়ে তর্ক হতো শরিফ স্যারের সাথে আমার। ব্যবধান ছিলো বয়সের আমাদের অনেক। তাতে কী? কোনো কোনো সেক্টরে ভুল চেতনা আর নির্দিষ্ট জ্ঞানে স্থির হয়ে থাকা মানুষ, যতো হাজার বই পড়েন না কেনো, তা থেকে তার মুক্তি আসে না। কী ধরনের বই তিনি পড়েছেন, খুবই জরুরি বিষয় এটা। নিয়মিত পরিবর্তিত, সব ধরনের গ্রহণযোগ্য পরিস্থিতির সমান্তরালে, চিন্তা চেতনা মানসিকতায় যিনি এগিয়ে নিতে পারেন না নিজেকে, পিছিয়ে থাকা মানুষ তিনি। ভুল অথবা শুদ্ধভাবে জানার, একটা পর্যায়ে এসে থেমে যাওয়া মানুষ। তর্ক না করে, অনেক কিছুই বোঝানো যায় না তাদের। এঁরা নিজেদের মুক্তচিন্তার মানুষ মনে করলেও, পুরোপুরি তা হতে পারেন না, নির্দিষ্ট যায়গায় স্থির হয়ে যাবার কারণে।
‘এনার্কিজম’ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব যে নয়, তা পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রই প্রমাণ করেছে। এনার্কিজম, সোসিয়ালিজমের দর্শন অথবা চেতনা নয়। তবুও সোসিয়ালিজমের দর্শন কোন কোন ব্যাপারে, এনার্কিজমে প্রভাবিত মনে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের ‘সো কলড’ সোসিয়ালিজম প্রতিষ্ঠার জন্যে, যা কিছু নিরীক্ষা করেছে, তাও ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে, সোসিয়ালিষস্ট ব্লকের বৃত্তে থাকা পূর্ব ইওরোপের দেশগুলোতেও। প্রমাণ করেছে ‘কিউবা’। এর একটি কারণ ছিলো, আমার মতে, মানুষের চরিত্র এবং মানসিকতা নিয়ে তারা কোন নিরীক্ষা করেন নি, যা করেছেন, ক্যাপিটালিস্টরা। পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ তৈরি করা এবং প্রতিটি সেক্টরে তাদের নিয়োগ দিয়ে, সব ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করানো, ক্যাপিটালিস্ট সিস্টেমের অন্যতম জরুরি কাজ এবং ইনভেস্টমেন্ট।
প্রাসঙ্গিক মনে হলে, অথবা না হলেও, প্রসঙ্গ বদলে ফেলার, খারাপ অভ্যেসটি আমার আছে। এ বিষয়গুলোতে আগ্রহী নন যারা, তাদের বিরক্ত করা তো উচিত নয়। তা কী বুঝিনা আমি? কিন্তু, স্বভাব কী এমন জিনিষ, যে বুঝলেই তা বদলানো সম্ভব? বিরক্ত করলেও আপনাকে, আলোচনাটি শেষ করে, ফিরে যাবো অবশ্যই প্রধান বিষয়ে।
গভর্নমেন্ট শব্দটির বাংলা ‘সরকার’ অথবা ‘শাসক’ অথবা ‘শাসনকর্তা’ হয় কীভাবে বলতে পারেন? এটি হতে পারে,‘রাষ্ট্র পরিচালক।’ রাষ্ট্র পরিচালনার যে স্ট্র্যাকচার অথবা কাঠামো, প্রধান সমস্যা সেই কাঠামোতে। দ্বিতীয় প্রধান সমস্যাটি, রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন যারা, তারা কোন স্বভাব, চরিত্র এবং মানসিকতার। প্রধান এ দুটো সমস্যার সমাধানে আগ্রহী আমি। খুব সহজ যে নয়, এর সমাধান করা, বুঝি সেটা। কিন্তু এটা সম্ভব। আমাদের মতো দেশগুলোতে, সব ধরনের শ্রমিক ইউনিয়নগুলো, বুদ্ধিজীবী এবং জনগণের নিয়মিত ধারাবাহিক সুস্থ সঠিক আন্দোলন, এর সূচনা করতে পারে। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথাগত কাঠামো ভাঙার পথে, এগিয়ে যেতে পারে ধারাবাহিকভাবে। দৃঢ়চেতা, যোগ্য নেতৃত্ব আর ঐক্যবদ্ধ জনগণ এর পূর্বশর্ত। বিচ্ছিন্ন এবং সাময়িক আন্দোলন করে তা সম্ভব হয় না। পুলিশী শক্তি প্রয়োগ করে, অনিয়মিত এবং দুর্বল আন্দোলনকে দমন করতে করতে, রাষ্ট্র পরিচালকরা হয়ে ওঠেন দুর্বৃত্ত। এবং নতুন নতুন ডায়মেনশনের ফ্যাসিস্ট।
একমত হয়েছিলেন স্যার আমার সাথে। ‘এনার্কিজমে’একনিষ্ঠ মানুষ, মন থেকে মেনে নিয়েছিলেন কি না, তা জানার কোন উপায় ছিলো না। আমি, কোন ইল্যুশন বা ফ্যান্টাসিতে বাস করা মানুষ যে না, তা বোঝাতে পেরেছিলাম তাঁকে।
শরীফ স্যারের ছাত্র ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। সহকর্মী হয়েছিলেন পরে। প্রভাবিত করেছিলেন আহমদ শরীফ তাঁকে, ছাত্র হিসেবে, তরুণ বয়সে নিশ্চয়ই। পড়তে, বলতে, লিখতে অতিক্রম করেছিলেন হুমায়ুন আজাদ, আহমদ শরীফকে। প্রবেশ করেছিলেন, প্রবলভাবে শুরুতেই ভাঙতে, সব ধরনের সীমাবদ্ধতা। শুরু করলেন ভাঙতে, অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো যা কিছু। ভেঙে ফেলা দরকার যা, তা না ভাঙলে, স্থির হয়ে যেতে হয় সেই জায়গায়। এগোনোর কোন উপায় থাকে না, আর। এগোতে চাইলে, যা করা দরকার, করেছিলেন তার সবই। একটার পরে একটা ট্যাবু ভাঙাই শুধু নয়, ভাংতে শুরু করলেন সব পূজনীয় মূর্তি। নাড়িয়ে দিলেন, আগ্রহী পাঠকদের। সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও।
পড়েছেন হুমায়ুন আজাদ। পড়েছেন অবিরাম। সবচেয়ে বেশি পড়েছেন ইওরোপীয় সাহিত্য রাজনীতি দর্শন বিজ্ঞান শিল্পকলা, সমালোচনা। কী পড়েন নি তিনি? পড়েছিলেন জরুরি যা মনে করেছিলেন, সব, সঠিকভাবে। বুঝেছিলেন যথার্থতায়। ধারণ করতে পেরেছিলেন প্রতিটি দশর্ন, চেতনা, জ্ঞান সেভাবেই। বাঙালি লেখকদের মধ্যে, আর কজন এভাবে, এতোটা সঠিকভাবে, ধারণ করতে পেরেছিলেন, জানি না। জানি না, ধারণ করা শুধু নয়, সেই সত্য, সেই উপলদ্ধি, চেতনা, দর্শন, জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছেন কজন এভাবে লেখায়, কথায়, বক্তৃতায়, আলোচনায়। সবচেয়ে বড়ো যে কাজটি করেছেন তিনি, তা হলো সমালোচনা।
মনে পড়ছে, নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন গুন্টার গ্রাস। ‘গের্হাড শ্রয়ডা’ গুন্টারের ঘনিষ্ট বন্ধু, জার্মানির চ্যান্সেলর তখন। জানতে চাইলেন একজন সাংবাদিক তাঁর মন্তব্য, গ্রাসের নোবেল প্রাইজের ব্যাপারে।
‘ব্যাপারটি আনন্দের। যে কোন বিষয়ের একজন যোগ্য সমালোচক গ্রাস।’ জবাব দিলেন চ্যান্সেলর শ্রয়ডা সেদিন, দুটো মাত্র বাক্যে।
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্ব [১]
সুলতানা আজীম > স্মৃতিময় হুমায়ুন আজাদ >> স্মৃতিকথা [পর্ব ১]
সেদিন সন্ধ্যায়ও কী জানতাম, আর কয়েক ঘণ্টা পরে, তিনি হয়ে যাবেন স্মৃতি। শুধুই স্মৃতি। লিখতে হবে আমাকে, এরকম একটি লেখা, যার শিরোনাম দেবো, ‘স্মৃতিময় হুমায়ুন আজাদ।’কাজটি সহজ নয়। যেসব স্মৃতি ছিলো আনন্দের, সেসব যখন হয়ে গেছে নীল, তীব্রতম বেদনায়, তখন তা সাজানো একটি যন্ত্রে, যার নাম ‘কম্পিউটর।’ অনেক অনেক অনেক কিছু বোঝে এই যন্ত্রটি, যার নেই পরিসীমা। কিন্তু এটি অনুভব করে না, আনন্দ আর বেদনা। যা অনুভব করেন আপনি এবং আমি। করেন, পৃথিবীর সাত বিলিয়ন মানুষ। শুধু কী আনন্দ আর বেদনা? বয়ে যেতে হয় তাও, সব আনন্দ স্মৃতি যখন রূপান্তরিত হয়, অনন্ত বেদনায়। অনুভূতি নেই বলে, সব জমিয়ে রাখা যায়, এই যন্ত্রটির কাছে। তীব্রতর এই বেদনার ভার কী সে নিতে পারতো, যদি তার থাকতো অনুভূতি?
চলে যান যিনি একেবারে, নিয়ে যান না তিনি কিছুই। থেকে যান যারা তাঁর স্মৃতির রাজ্যে, কী থাকে তাদের? যাতনা, কেবলই যাতনা, স্মৃতির। তার কিছুটাও প্রকাশ করা, সহজ কতোটা? করছি তবুও আজ, কঠিন সে কাজ। স্মৃতির রাজ্য থেকে বেছে নেবো কিছু স্মৃতি, আপনার জন্যে। আমার বেদনা স্পর্শ করবে হয়তো আপনাকেও।
বাংলাদেশের যে মানুষেরা জড়িয়ে আছেন আমার জীবনের অংশ হয়ে, তাঁদের নাম যদি লিখতে চাই, সময় লাগবে অনেক। কয়েক জনের নাম বেছে নিচ্ছি, দীর্ঘ তালিকা থেকে। ড. আহমদ শরীফ, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ড. আনিসুজ্জামান, আবদুল মতিন, কবির চৌধুরী, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সালাহউদ্দিন চৌধুরী, বিচারপতি কে এম সোবাহান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, এবং এবং এবং। এতো এতো মানুষ যে আমার জীবনের অংশ হয়েছেন, সে জন্যে কোন অবদান, কোন কৃতিত্ব নেই আমার। যা-কিছু কৃতিত্ব, সবই তাঁদের। একটি বই লিখেছি, ‘আমার জীবনের অংশ যাঁরা।’ এই এতটুকুই।
আর হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে লিখেছি চারটি বই। লিখেছি, তাঁর চলে যাবার পরে। লিখেছি কেনো? যখন তিনি ছিলেন, প্রত্যাশা ছিলো, আমি যেনো লিখি, তাঁর সৃষ্টিশীলতার মূল্যায়ন করে। ওর্য়াকহলিক একজন মানুষ, যাকে লিখতে বলা হলে, দশ থেকে বারো ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকে, তার কাছে এরকম প্রত্যাশা, ভুল ছিলো কতোটা, তা বুঝতে পারেন নি, খুব দূরদর্শী মানুষ হয়েও। ঘুম এ-তো প্রিয় আমার। এই ‘প্রিয়’ কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছুই, আমার জীবন থেকে। একটি বই তাঁকে নিয়ে লিখতে, তাঁর বেঁচে থাকা সময়ে, পারি নি। অনুতাপ? অপরাধ বোধ? খুউব কষ্টের। তা বয়ে বেড়ানো আজীবন? ভয়ংকর। বয়ে তো যাচ্ছি। চারটি বই লিখেও কী, কমাতে পেরেছি অনুতাপ? না।
দশ আগস্ট ছিলো সেদিন, দুহাজার চার সালের। পেরিয়েছে পনেরো বছর। আমি কী পেরিয়ে এসেছি, এতোটা সময়? না। স্থির দাড়িয়ে আছি, সেখানেই। যত কথা হয়েছিলো তাঁর সাথে সেদিন, তিন বার বলেছি আমি, ‘এতো অস্থিরতা খুব ক্ষতি করে শরীরের। স্থির হতে হবে আপনাকে, সব কিছুর আগে।’ একই জবাব দিয়েছিলেন তিন বার। ‘আমার স্থির হতে আর দু’দিন লাগবে।’ ঠিক দু’দিনই লেগেছিল তাঁর, স্থির হতে। এই স্থিরতাই, হলো চিরস্থায়ী। কেড়ে নিলো তাঁকে, অস্থির জীবন থেকে।
বারো আগস্ট, সেদিনের কিছু কথা লিখতে পারি, আপনার জন্যে। মধ্যরাত হলেও, রাত বারোটা মানেই, ইওরোপীয় সম্বোধনে, তা গুড মর্নিং। তখন থেকেই শুরু হয়, পরের চব্বিশ ঘণ্টা, তাই। পরের দিনের শুরু তো, তাই গুড মর্নিং। ফোন এলো তাঁর, সেই মধ্যরাতে।
আমি- গুড মর্নিং।
তিনি- কেমন আছিস? তোর শরীর কেমন? তোরা কী এখন আসতে পারবি?
আমি- আমি কী অসুস্থ না কী যে খবর নিচ্ছেন আমার? এখন কী করে আসবো, ঘুমোতে হবে না? কী হয়েছে আপনার? সকালেই তো আসবো। এখন আসতে বলছেন কেন?
তিনি- তোকে সবকিছু বুঝিয়ে দিতে চাই।
আমি- কালকেই তো বুঝিয়ে দিতে পারবেন। বোঝানোর কী আছে? আমি তো সব জানি।
তিনি- আমার মনে হচ্ছে এখনই বুঝিয়ে দিতে হবে।
আমি- এরকম মনে হচ্ছে কেন? ঘুম আসছে না? কিছুক্ষণ আগে তো শান্ত ছিলেন। এখন আবার অস্থির হয়ে উঠেছেন কেন?
কিছুই বুঝতে পারছি না। পাপ্পু ঘুমাচ্ছে। না ঘুমিয়ে, সাড়ে ছয়শ কিলোমিটার আমি একবারে ড্রাইভ করতে পারবো না। পাপ্পুকেও ড্রাইভ করতে হবে। এইতো আর মাত্র কটি ঘণ্টা, তার পরেই তো আসছি।
তিনি- আমার কেমন যেন লাগছে।
আমি- কীরকম লাগছে? ঘুম আসছে না?
তিনি- ঘুম পাচ্ছে। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।
আমি- তাহলে ঘুমাচ্ছেন না কেন?
তিনি- বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে, তোকে সবকিছু বুঝিয়ে দেয়া দরকার।
আমি- কী কথা হচ্ছে এটা? ঘুম পাচ্ছে, অথচ ঘুমাচ্ছেন না। ঘুমালে তো শরীর সুস্থ হবে। মনও শান্ত হবে।
তিনি- আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু কেমন যেন লাগছে।
আমি- ঘুমান প্লিজ। যদি শরীর খারাপ করে, আমাকে অবশ্যই ফোন করবেন। ‘স্ট্রাসার জুনিয়রের’ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার নেই। তার আগেই আমি মিউনিকে কল করে, আপনার ফ্লাটে ইমারজেন্সি ডাক্তার পাঠানোর ব্যবস্থা করবো।
তিনি- তোরা খুব ভোরে যাত্রা করবি। সকালের ভেতর এসে পৌঁছাবি অবশ্যই। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোকে। তুই সুস্থ থাকিস। ভালো থাকিস।
আমি- ভোর পাঁচটার মধ্যে বেরিয়ে, ন’টার আগেই পৌঁছে যাবো। ব্রেকফাস্ট করবো আপনার সাথে। ঘুমান এখন। ফ্রেশ লাগবে সকালে। এইতো আসছি।
তিনি- তোদের দেখতে পেলে, সব ঠিক হয়ে যাবে। খুব ভালো লাগবে আমার।
হ্যাঁ, ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি তারপর। জেগে ওঠেননি আর। সেদিন। সেই বারো আগস্টে। হার্ট আক্রান্ত হলো তাঁর, রাত দু’টো থেকে ভোর ছ’টার মধ্যে, কোন এক সময়। অচল হয়ে গেলো মগজ। কোন ইনফরমেশন নিতে পারে নি আর। বুঝতে পারেন নি কিছুই। মৃত্যুযন্ত্রনা তো নয়-ই, অনুভব করেন নি, কোনরকম কষ্ট।
জেনেছি কীভাবে? ‘পেন’-জার্মানির সভাপতি ছিলেন তখন মিস্টার ‘স্ট্রাসার।’ পরিচিত ছিলেন তিনি আমার। অফিস টাইমের প্রথম ঘণ্টায় ফোন করি তাঁকে। কী ঘটেছিলো জানতে চাই। আমার চোখের জল, তাঁকেও ভেজায়।
“হ্যাঁ, মিস্টার আজাদকে ওভাবেই পেয়েছি আমরা। নির্দিষ্ট কাজের জন্যে, ডোর বেল বাজিয়ে ডাকা হলে, দরজা খোলেন নি। তখন ডাক্তার এবং পুলিশ এসে, দরজা খুলে ভেতরে ঢোকেন। পরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন, হি ইজ ডেড। ঘুমের ভেতরে মারা গেছেন। কিছুই টের পান নি। এটা ঘটেছে, রাত দু’টো থেকে ভোর ছ’টার মধ্যে। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। বিছানায় শুয়ে ছিলেন তিনি। বন্ধ ছিলো তার দু-চোখ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লেখকেরা আসেন, আমাদের দেশে, বিভিন্ন কারণে। কিন্তু এই প্রথম এমন একটি ঘটনা ঘটলো। কী বলে সহানুভূতি জানাবো আপনাকে। আমি শকড্।”
বিষন্ন কণ্ঠে যা বলেছিলেন মিস্টার ‘স্ট্রাসার’ সেদিন, তার প্রধান বাক্যগুলো লিখলাম। আর তখন, রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো আমার ভেতরে অবিরাম। হয় এখনো। যখন মনে পড়ে সব। স-ব। ঠিক আগের মতো। একটি শব্দও কী ভুলতে পেরেছি আমি, তাঁর সাথে জড়িত থাকা আমার জীবনের? আমাদের জীবনের?
বিষাক্ত বেদনার সমুদ্রে ডুবেও, মনে হচ্ছিলো, কুলাঙ্গার আততায়ী পরিকল্পিত মৃত্যু থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি, কয়েক সেকেন্ডের জন্যে। সেটা ছিলো তাঁর জয়। সেদিনের সাড়ে পাঁচ মাস পরে, চলে যাবার মতো যাতনা অনুভব না করে, স্বাভাবিক নিয়মে চলে যাওয়া কী ছিলো না তাঁর, আরও একটি বিজয়? এই মৃত্যুকে ছোট করেছেন যারা, তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে, কী বলবো তাদের? খুনিদের সিন্ধান্তে মারা যাওয়ার জন্যে জন্ম হয় নি বলেই, মারা যান নি ওভাবে। তারপরেও, রহস্যময় বলছেন যারা তাঁর বিদায়কে, তারা কী মিথ্যে সফলতায় উল্লসিত হবার সুযোগ করে দেন নি, প্রতিপক্ষকে? উচিত কী ছিলো, এরকম ভুল গর্বের সুখে তাদের সুখি করে তোলা?
স্মৃতির রাজ্য থেকে বেছে নিতে চেয়েছিলাম, কিছু স্মৃতি আপনার জন্যে, এই দিনে ১২ আগস্টে। তাঁর বিদায় নিয়ে লিখে, বেদনা বিধ্বস্ত হলাম সূচনাতে। হয়তো, একটু ব্যাথিত করলাম আপনাকেও। স্যরি। প্রবেশ করছি, স্মৃতির পৃথিবীতে এখন।
[এক] অনেক কারণে প্রচণ্ড ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন হুমায়ুন আজাদ। ভুগছিলেন যে, বুঝতে পারছিলেন না। ভয়ংকর অসুস্থতা এটা। স্থায়ী হয়ে গেলে, অতিক্রম করা সহজ হয় না, নিজে থেকে। নিজে না বুঝলে, অতিক্রম করতে চেষ্টা না করলে তো, সম্ভবই নয়। দরকার, যোগ্য সাইক্রিয়াটিস্ট এবং খুব কাছের কোন প্রিয়জনের প্রতিদিনের সহযোগিতা। নিজের পছন্দ মতো কিছু বাংলা আর ইংরেজি গান পাঠিয়ে দিলাম একদিন। এটা হয়তো সাহায্য করবে তাঁকে, এই সময়ে। মনে হয়েছিলো।
ফোন করলেন, গানগুলো শোনার পরে।
“কী বলে কৃতজ্ঞতা জানাবো তোকে। কখনো শুনি নি এই গানগুলো। এই যে, ‘আকাশ মেঘে ঢাকা, শাওন ধারা ঝরে’- এর কী কোন তুলনা আছে? এতগুলো বই লিখেছি, এরকম একটি গান তো লিখতে পারি নি। কে গেয়েছে এই গানটি বলতো?” বললেন উচ্ছ্বসিত আবেগে।
“জানি না কে গেয়েছেন, মনে করেন আমি গেয়েছি, অসম্ভব তো নয়, না-কি?” স্বভাব অন্তর্গত হিউমার আমার।
“তুই নিয়মিত গান করিস না কেনো বলতো? সম্পূর্ণ অন্যধরনের কন্ঠ তোর। খুব ঈর্ষণীয় হতো।” বললেন।
“আমি যে ফ্লাটারি পছন্দ করি না, সেটা আপনার অজানা নয়।” বলেছিলাম।
আবার ফোন আসলো তাঁর দু-ঘণ্টা পরে।
“জানি, কে গেয়েছে গানটি। ওর সব সিডি কিনেছি একটু আগে। কতো বার যে শুনলাম এই গানটি। খুব আনন্দ হচ্ছে, অনেক দিন পরে।” বললেন।

‘চিত্রা সিনহা’ বা এরকম কোন একটি নাম বলেছিলেন গায়িকার। যে-কবিতাটি পাঠালেন সেদিন সন্ধ্যায়, তার শিরোনাম, সে দিনটিও শ্রাবণ ছিলো।’

নিজে গেয়ে পাঠালেন গানটি, দু’দিন পরে। ক্লান্ত হয়ে গেলাম হাসতে হাসতে, ওঁর গান শুনে। জানতে চাইলেন, কেমন হয়েছে তাঁর গান।
“ভয়াবহভাবে আকর্ষণীয়। প্রথাবদ্ধতা বাতিল করেছেন এখানেও। আর কিছু করতে হবে না, নিয়মিত কনর্সাট করে মুগ্ধ করতে পারবেন, দুই বাংলার বাঙালিদের।” বলেছিলাম, হাসি নিয়ন্ত্রণ করে। একটি অসুস্থতা আছে আমার, যার নাম ‘অসংযত হাসি।’ হাসির মতো কোন ব্যাপার হলেই, শুরু হয় এই অসুস্থতা।
“স্যাটায়ার করছিস? আর র্চচা করবো না?” বললেন অবুঝ বালকের মতো কণ্ঠে।
“অবশ্যই করবেন। প্র্যাকটিস ছাড়া কী, পারফেক্ট হয় কোন কিছু? খুব বেশি প্র্যাকটিসও করতে হবে না আপনাকে। একসপ্তাহের মতো লাগবে হয়তো। শুরু করেন প্লিজ।” বলেছিলাম।
“কঠিন কথাও, এতো সহজ করে বলতে পারিস তুই।” জবাব ছিলো তাঁর।
*** *** ***
[দুই] ‘আমার পাঠানো কবিতাগুলো কী করেছিস?’ জানতে চাইলেন একদিন।

“পড়ে, ডিলিট করেছি। কবিতা লেখে না যে, বোঝে না যে, কী গুরুত্ব তার কাছে কবিতার?” জবাব ছিলো আমার।
“তাই বলে ডিলিট করবি তুই?” অবাক হয়েছিলেন।
“এতো কবিতা পাঠান প্রতিদিন, হার্ডডিস্ক ভরে যায় না?” সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন আমার দুষ্টুমি।
“ঠিক আছে, আর কোন কবিতা পাঠাবো না তোকে।” কণ্ঠে ছিলো অভিমান।

না, ডিলিট করি নি তাঁর পাঠানো কোন কবিতা, কোন লেখা, কোন ছবি, একটি চিঠিও। কপি করে রেখে দিয়েছিলাম সব। যদি কখনো ক্র্যাশ করে হার্ডডিস্ক, এই ভয়ে। আবৃত্তি করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম সেদিন সন্ধ্যায়, তাঁর কিছু কবিতা। হয়েছিলেন ভীষণ খুশী, আর অবাকও। শুরু করলেন আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, আমার সাথে নিয়মিত। যদি পাঠাতাম রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বা অন্য কারো কবিতা আবৃত্তি করে, হয়ে যেতেন অভিমানী। ব্যাতিক্রম ছিলো শুধু একজন কবির ব্যাপারে, তিনি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত।
তাঁর কবিতা আবৃত্তি করলে কেউ, প্রচণ্ড সুখী হতেন। অন্যদের কবিতা পড়লে, হতেন অসন্তুষ্ট।
“হুমায়ুন আজাদের কবিতা কী কম আছে তোর কাছে? এসব কবিতার মূল্য কতোটা, বুঝবি একদিন।” বলেছিলেন।
*** *** ***
[তিন] কীভাবে যেনো প্রতিযোগিতা শুরু হলো আমাদের, ছড়া লেখার। কথায় না বলে বিভিন্ন বিষয় প্রকাশ করতাম আমরা ছড়ায়। সাহিত্য-শিল্প-রাজনীতি স্পোর্টসসহ আরো অনেক বিষয় থাকতো, সেখানে। কত ছড়া যে লেখা হয়েছিলো এভাবে। ছিলো উপভোগের প্রচুর উপাদান, এসব ছড়ায়। মেতে থাকলেন অনেকগুলো দিন এ নিয়ে। উল্লসিত হতেন ছোট্ট শিশুর মতো, প্রতিটি ছড়া পেয়ে এবং পাঠিয়ে।
*** *** ***
[চার] পৃথিবী বিখ্যাত আর্টিস্ট, এবং তাদের পেইনটিং নিয়ে আলোচনা করতাম আমরা। আমি মুড হলে ছবি আঁকি, কখনো কখনো হঠাৎ। এঁকেছি কিছু ছবি এভাবে। সিরিয়াসলি নয় অবশ্যই। কোন বিবেচনাতেই, আর্টিস্ট বলা যাবে না আমাকে। পাঠিয়ে দিলাম একদিন, বেশকিছু পেইনটিংয়ের কপি তাঁকে কিছু না ভেবে। ভ্যানঘগ, পিকাসো, ডালি, দ্য ভিঞ্চি, গঁগা এবং আমার তিনটি। কদিন পরেই এলো বড়ো একটি খাম, বেশ কিছু পেইনটিং নিয়ে তাঁর। আসতে থাকলো এরপর, কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁর আঁকা ছবি। আর্টিস্ট হুমায়ুন আজাদের পেইনটিং দেখতে, আনন্দ পাচ্ছিলাম খুব। প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পেইনটিংয়ের জন্যে, কিনলেন, উৎসাহিত হয়ে। চিত্রশিল্পী হবার মতো প্রতিভা ছিলো না তাঁর। বুঝলেন নিজেই একসময়, এটি তাঁর কাজ নয়। ছেড়ে দিলেন তারপর।
*** *** ***
[পাঁচ] টেনিস আর ফুটবলের ভক্ত ছিলেন তিনি। আমিও। নিয়মিত দেখতাম খেলাগুলো আমরা। বাজি ধরতাম আমি, প্রতিটি খেলায়। হারবে যে, লিখতে হবে তাকে, একটি কবিতা। পাঠাতে হবে তা, সাথে সাথে। হেরে গেলে, কখনোই লিখি নি কবিতা। লিখবো কেন? আমিতো কবি না। দুষ্টুমীতে চঞ্চল স্বভাব যার, সেতো এরকমই করবে, না কী? কিন্তু তিনি, পাঠিয়ে দিতেন তার কবিতাটি ঠিকই। ছোট্ট শিশুর মতো সরল ছিলেন, স্বভাবের কোন কোন এলাকায়। এটা, এতো উপভোগ্য ছিলো আমার। এতো নির্ভরশীল ছিলেন এসব ব্যাপারে। ‘ইমোশনাল ডিপেনডেন্সি’ বলতে হয়।
[বিশ্বাস শব্দটি, কখনো ব্যবহার করি না আমি। বলতে নয়। লিখতেও নয়। কারণটি হচ্ছে, এই শব্দটির যে অর্থ আমি করেছি, তা হচ্ছে- ‘না জানা।’ যে-কোন ব্যাপার, যখন আমি জানি, তখন তা আমাকে বিশ্বাস করতে হয় না। অবিশ্বাসও নয়। যখন জানি না, তখন তা বিশ্বাস করতে বলা হয়। না জেনে, কিছুই আমি বিশ্বাস করতে রাজি না। শুদ্ধ সঠিক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং বোঝার অক্ষমতাও, ভয়াবহ ধরনের অন্ধত্ব। জানতে, তথ্য-প্রমাণ দেখে জানতে চেষ্টা করা, আমার দায়িত্ব। অন্ধের মতো, না দেখে, না জেনে, অন্যদের কাছ থেকে শুনে, যুক্তিতর্কপ্রশ্ন বিহীনভাবে, বিশ্বাস করার চেতনা নিয়ে জন্মাই নি আমি। সত্যিই নয়। ‘আমাকে বিশ্বাস করতেন তিনি’, এরকম বাক্য লিখতে পারি নি, তাই। লিখলাম, ইমোশনাল ডিপেডেন্সি।]
“তুই বাজি ধরিস, কিন্তু শর্ত মানিস না,” বললেন একদিন।
“যত সহজ এ-কাজটি আপনার জন্যে, আমার জন্যেও কী তাই? আমি তো কবি না। ইনফ্যাক্ট, আমি তো কিছুই না। সত্যি সত্যিই না।” বলেছিলাম।
“কবিতার মতো ছন্দময় মেয়েটি, কবিতা লেখে না কেন বুঝি না।” বললেন।
“শোনেন, ফ্লাটারি করবেন না। নিজের যে-কোন ব্যাপারে, সঠিক ধারণা রাখি আমি। যে-কোন নিন্দা, অথবা প্রশংসার কতটুকু গ্রহণ আর কতটুকু বর্জন করবো, সে সিদ্ধান্ত আমার। চাটুকারিতা, স্তাবকতাকে ঘৃণা করি। এরা অতুলনীয় ভণ্ড এবং মিথ্যেবাদী। এই স্তাবকেরা। আপনার বিপদে, প্রয়োজন হলে, এদের অধিকাংশকেই দেখতে পাবেন না। স্বার্থ পূরণের ব্যারোমিটার যত ওপরের দিকে যাবে, এদের স্তাবকতা হবে ততো বেশি। আর স্বার্থ অপূর্ণতায়, ব্যারোমিটার নীচে নামতে থাকলে, কোথায় এরা, তাও জানতে পারবেন না। কবিতা না লিখলেও, কবিতা অকবিতার পার্থক্য বোঝার সামর্থ আছে আমার।” দিয়েছিলাম সেদিন দীর্ঘ জবাব, অন্য অনেক দিনের মতো।
“আমি কখনোই ফ্লাটারি করি না, সেজন্যেই আমার নিন্দুক এবং শত্রু এতো বেশি। এদের ভেতরে আমি এক নিঃসঙ্গ মানুষ।” বললেন।
*** *** ***
হ্যাঁ, নিন্দুক এবং শত্রু ছিল তাঁর অ-নে-ক। যারা ছিলেন তাঁর কাছের একসময়, অধিকাংশই হয়েছিলেন পরে তাঁর বিরুদ্ধবাদী। কী বলেন নি তারা, তাঁর বিরুদ্ধে। কী করেন নি, তাঁর বিপক্ষে। যখন ছিলেন তিনি এই নীল গ্রহে। চলে গেলেন যখন, লিখেছেন এরাই আবার, উচ্ছ্বসিত আবেগে মেশানো প্রশংসায়, তাঁর পক্ষে। চেষ্টা করেছেন মূল্যায়ন করতে তাঁকে, নিজেদের বিবেচনায়। সব কী সত্যি ছিলো? সব কেনো, কিছুটাও কী সত্যি ছিলো? তবুও লিখেছেন তারা। লিখেছেন, কেন? প্রশ্ন করেছি। জবাবও জানা। তবুও লিখবো না জবাব। কতটা সত্য বলা আর লেখা যায়, ট্যাবু এবং জটিল মনস্তাত্বিক অসুস্থতায় আক্রান্ত মানুষের সমাজ রাষ্ট্রে? একটি উদাহরণ তবুও দিতে চাচ্ছি এ ব্যাপারে। প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে, তাই।
“হুমায়ুন আজাদের কাছে খোলা চিঠি” নামে একটি লেখা লিখেছেন, বাংলাদেশেরই একজন লেখক। একপাতার অর্ধেকের বেশি অংশে ছাপা হয়েছিল, লেখাটি। সংযত ছিল না, বিক্ষুদ্ধ ওই লেখকের তীব্র ক্রোধ। একটুও সংযত ছিল না, তার অশালীন ভাষা। শত্রুর আক্রোশে, যে-আক্রমণ তিনি করেছিলেন হুমায়ুন আজাদকে, তা সুস্থ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। ব্যক্তিগত বিষয়ও বাদ পড়েনি, সে আক্রমণের আক্রোশ থেকে। কারণটি কী ছিলো?
“আমার অবিশ্বাস” শিরোনামে দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন তখন হুমায়ুন আজাদ। অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপিটি পড়ার অনুরোধ করেছিলেন ওই লেখক। ইচ্ছে ছিলো না, তবুও দিয়েছিলেন তাকে পড়তে। ওই লেখকের দ্বিতীয় অনুরোধ নয়, দাবি ছিলো, শেষ করার পরে, লেখাটি দিতে হবে তাকে। প্রদীপ ঘোষ, পূর্ব-পশ্চিম বাংলায় যুক্তিবাদ প্রচারের নায়ক। তাঁর (প্রদীপ ঘোষের) পত্রিকায় ছাপাতে দিতে হবে লেখাটি। শেষ করার পরে। প্রদীপ ঘোষ’কে কথা দিয়েছিলেন ওই লেখক, হুমায়ুন আজাদের কাছ থেকে, লেখাটি সংগ্রহ করে দেবার। লিখে শেষ করতে পারলে, দেবেন বলেছিলেন হুমায়ুন আজাদ। লিখতে লিখতে, এই নামে একটি বই বের করার পরিকল্পনা করলেন তিনি। বই হবার আগে, লেখাটির কিছু অংশ কোথাও ছাপাতে দেবেন না, সিন্ধান্ত নিলেন। জানালেন ওই লেখককে। জানিয়ে দিলেন প্রদীপ ঘোষকেও [হুমায়ুন আজাদ আর আমার খুব প্রিয় ব্যক্তিত্ব তিনি।] লেখাটি প্রদীপ ঘোষের কাছে পাঠাতে পারার অহঙ্কার হারিয়ে, উন্মাদ হয়ে উঠলেন ওই লেখক। আগুনে পেট্রল ঢাললেন, অন্য বিরুদ্ধবাদীরা। জন্ম নিলো, বিষাক্ত বীভৎস একটি ‘খোলা চিঠি।’ কোন মানসিকতার মানুষ ছিলেন, ওই পত্রিকার সম্পাদক, যিনি অনুমতি দিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ-আক্রান্ত, এরকম অসুস্থ লেখা ছাপাতে, ভাবতে পারি নি তখন। এখনও।
কুৎসিত ওই ‘খোলা চিঠি’র ক্লিপিং আমাকে পাঠিয়ে, জানতে চেয়েছিলেন, পড়েছি কী না। জবাব দিতে পারি নি, কিছুক্ষণ। অরুচিকর ওই লেখা, পুরো পড়বার রুচি হয় নি আমার।
“দেখবি আমার মৃত্যুর পরে এরাই বলবে, এরাই লিখবে, এরা ছিলো আমার খুব কাছের মানুষ। যারা কখনো আমার কাছে আসার সাহসও করে নি, তারাও বলবে, তারাই ছিলো আমার বন্ধু আর খুব আপনজন। কত মিথ্যে যে বলা এবং লেখা হবে আমার সর্ম্পকে, দেখতে পাবি।” বলেছেন।
“কে কী লিখলো, বললো তার ওপর কিছুই নির্ভর করবে না। যতদিন বাংলা ভাষা টিকে থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবেন আপনি। আপনার অমরত্ব নির্ভর করছে, আপনার কাজের ওপর।” সঠিক সান্ত্বনার প্রলেপ দিতে চেষ্টা করলাম আমি, তাঁর আহত হৃদয়ে।
চলে যাবার পরে তাঁর, ওই লেখক এবং ওই সম্পাদক লিখেছিলেন দীর্ঘ প্রশংসামূলক প্রবন্ধ। কতো প্রিয় এবং কত কাছের মানুষ ছিলেন তারা, সেসব বর্ণনা দিতে কী ভুলে গিয়েছিলেন? না। অবশ্যই না। স্তব্ধ কী হয়েছিলাম? নাহ্, হই নি। পরিচয় আছে যাদের, অধিকাংশ বাঙালি চরিত্রের প্রতিদিনের অসততা, কপটতা আর ভণ্ডামির সাথে, কোন সুযোগ কী অবশিষ্ট থাকে তাদের, স্তব্ধ অথবা হতবাক হবার মতো?
কত কত কত প্রমাণ রয়েছে আমার কাছে, যা দিয়ে লেখা যাবে কয়েকটি বই। কিন্তু? হ্যাঁ, আমাকে থামিয়ে দেয় ছোট্ট, কিন্তু গুরত্বপূর্ণ এই ‘কিন্তু’। প্রমাণিত সত্য, তবুও লিখতে পারবো না। যা-কিছু রাখা আছে, আমার বাড়ির লকারে, কী হবে এসবের? জানি আমি। যখন চলে যাবো, সব ফেলে, একদিন। অর্ডারপ্রাপ্ত কোন একটি কোম্পানির এমপ্লয়িরা এসে, খালি করবে বাড়িটি। সব, স-ব চলে যাবে কোন এক বিশাল ডাস্টবিনে। অটোমেটিক মেশিনে, গুড়ো হয়ে যাবে প্রতিটি জিনিস, যা ব্যবহার করেছি আমি, একজীবনে, সব। সেই ডাস্টবিন থেকে পৌঁছে যাবে, কোন এক অন্ধকারে। অ-নে-ক অপ্রকাশিত সত্য, আর তথ্যের মৃত্যু হবে, আমার মৃত্যুর কিছুদিন পরে। এভাবে।
[পরবর্তী পর্বটি (২) : এই পোস্টের শুরুতে অর্থাৎ উপরেই আছে। দেখুন]