সুলতানা আজীম > স্মৃতিময় হুমায়ুন আজাদ >> ধারাবাহিক স্মৃতিকথা

0
2078

পর্ব ১

সেদিন সন্ধ্যায়ও কী জানতাম, আর কয়েক ঘণ্টা পরে, তিনি হয়ে যাবেন স্মৃতি। শুধুই স্মৃতি। লিখতে হবে আমাকে, এরকম একটি লেখা, যার শিরোনাম দেবো ‘স্মৃতিময় হুমায়ুন আজাদ।’কাজটি সহজ নয়। যেসব স্মৃতি ছিলো আনন্দের, সেসব যখন হয়ে গেছে নীল, তীব্রতম বেদনায়, তখন তা সাজানো একটি যন্ত্রে, যার নাম ‘কম্পিউটার।’ অনেক অনেক অনেক কিছু বোঝে এই যন্ত্রটি, যার নেই পরিসীমা। কিন্তু এটি অনুভব করে না, আনন্দ আর বেদনা। যা অনুভব করেন আপনি এবং আমি। করেন, পৃথিবীর সাত বিলিয়ন মানুষ। শুধু কী আনন্দ আর বেদনা? বয়ে যেতে হয় তাও, সব আনন্দ স্মৃতি যখন রূপান্তরিত হয়, অনন্ত বেদনায়। অনুভূতি নেই বলে, সব জমিয়ে রাখা যায়, এই যন্ত্রটির কাছে। তীব্রতর এই বেদনার ভার কী সে নিতে পারতো, যদি তার থাকতো অনুভূতি?
চলে যান যিনি একেবারে, নিয়ে যান না তিনি কিছুই। থেকে যান যারা তাঁর স্মৃতির রাজ্যে, কী থাকে তাদের? যাতনা, কেবলই যাতনা, স্মৃতির। তার কিছুটাও প্রকাশ করা, সহজ কতোটা? করছি তবুও আজ, কঠিন সে কাজ। স্মৃতির রাজ্য থেকে বেছে নেবো কিছু স্মৃতি, আপনার জন্যে। আমার বেদনা স্পর্শ করবে হয়তো আপনাকেও।
বাংলাদেশের যে-মানুষেরা জড়িয়ে আছেন আমার জীবনের অংশ হয়ে, তাঁদের নাম যদি লিখতে চাই, সময় লাগবে অনেক। কয়েকজনের নাম বেছে নিচ্ছি, দীর্ঘ তালিকা থেকে। ড. আহমদ শরীফ, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ড. আনিসুজ্জামান, আবদুল মতিন, কবীর চৌধুরী, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সালাহউদ্দিন চৌধুরী, বিচারপতি কে এম সোবাহান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, এবং এবং এবং। এতো এতো মানুষ যে আমার জীবনের অংশ হয়েছেন, সে জন্যে কোন অবদান, কোন কৃতিত্ব নেই আমার। যা-কিছু কৃতিত্ব, সবই তাঁদের। একটি বই লিখেছি, ‘আমার জীবনের অংশ যাঁরা।’ এই এতটুকুই।
আর হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে লিখেছি চারটি বই। লিখেছি, তাঁর চলে যাবার পরে। লিখেছি কেন? যখন তিনি ছিলেন, প্রত্যাশা ছিলো, আমি যেন লিখি, তাঁর সৃষ্টিশীলতার মূল্যায়ন করে। ওয়ার্কহলিক একজন মানুষ, যাকে লিখতে বলা হলে দশ থেকে বারো ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকে, তার কাছে এরকম প্রত্যাশা, ভুল ছিলো কতোটা, তা বুঝতে পারেন নি, খুব দূরদর্শী মানুষ হয়েও। ঘুম এ-তো প্রিয় আমার। এই ‘প্রিয়’ কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছুই, আমার জীবন থেকে। একটি বই তাঁকে নিয়ে লিখতে, তাঁর বেঁচে থাকা সময়ে, পারি নি। অনুতাপ? অপরাধ বোধ? খুউব কষ্টের। তা বয়ে বেড়ানো আজীবন? ভয়ঙ্কর। বয়ে তো যাচ্ছি। চারটি বই লিখেও কী, কমাতে পেরেছি অনুতাপ? না।
দশ আগস্ট ছিলো সেদিন, দু-হাজার চার সালের। পেরিয়েছে পনেরো বছর। আমি কী পেরিয়ে এসেছি এতোটা সময়? না। স্থির দাঁড়িয়ে আছি, সেখানেই। যত কথা হয়েছিলো তাঁর সাথে সেদিন, তিন বার বলেছি আমি, ‘এতো অস্থিরতা খুব ক্ষতি করে শরীরের। স্থির হতে হবে আপনাকে, সবকিছুর আগে।’ একই জবাব দিয়েছিলেন তিন বার। ‘আমার স্থির হতে আর দু’দিন লাগবে।’ ঠিক দু’দিনই লেগেছিল তাঁর, স্থির হতে। এই স্থিরতাই, হলো চিরস্থায়ী। কেড়ে নিলো তাঁকে, অস্থির জীবন থেকে।
বারো আগস্ট, সেদিনের কিছুকথা লিখতে পারি, আপনার জন্যে। মধ্যরাত হলেও, রাত বারোটা মানেই, ইওরোপীয় সম্বোধনে, তা ‘গুড মর্নিং’। তখন থেকেই শুরু হয়, পরের চব্বিশ ঘণ্টা, তাই। পরের দিনের শুরু তো, তাই গুড মর্নিং। ফোন এলো তাঁর, সেই মধ্যরাতে।
আমি- গুড মর্নিং।
তিনি- কেমন আছিস? তোর শরীর কেমন? তোরা কী এখন আসতে পারবি?
আমি- আমি কী অসুস্থ নাকি যে খবর নিচ্ছেন আমার? এখন কী করে আসবো, ঘুমোতে হবে না? কী হয়েছে আপনার? সকালেই তো আসবো। এখন আসতে বলছেন কেন?
তিনি- তোকে সবকিছু বুঝিয়ে দিতে চাই।
আমি- কালকেই তো বুঝিয়ে দিতে পারবেন। বোঝানোর কী আছে? আমি তো সব জানি।
তিনি- আমার মনে হচ্ছে এখনই বুঝিয়ে দিতে হবে।
আমি- এরকম মনে হচ্ছে কেন? ঘুম আসছে না? কিছুক্ষণ আগে তো শান্ত ছিলেন। এখন আবার অস্থির হয়ে উঠেছেন কেন?
কিছুই বুঝতে পারছি না। পাপ্পু ঘুমাচ্ছে। না ঘুমিয়ে, সাড়ে ছয়শো কিলোমিটার আমি একবারে ড্রাইভ করতে পারবো না। পাপ্পুকেও ড্রাইভ করতে হবে। এইতো আর মাত্র কটি ঘণ্টা, তারপরেই তো আসছি।
তিনি- আমার কেমন যেন লাগছে।
আমি- কীরকম লাগছে? ঘুম আসছে না?
তিনি- ঘুম পাচ্ছে। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।
আমি- তাহলে ঘুমাচ্ছেন না কেন?
তিনি- বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে, তোকে সবকিছু বুঝিয়ে দেয়া দরকার।
আমি- কী কথা হচ্ছে এটা? ঘুম পাচ্ছে, অথচ ঘুমাচ্ছেন না। ঘুমালে তো শরীর সুস্থ হবে। মনও শান্ত হবে।
তিনি- আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু কেমন যেন লাগছে।
আমি- ঘুমান প্লিজ। যদি শরীর খারাপ করে, আমাকে অবশ্যই ফোন করবেন। ‘স্ট্রাসার জুনিয়রের’ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার নেই। তার আগেই আমি মিউনিকে কল করে, আপনার ফ্লাটে ইমারজেন্সি ডাক্তার পাঠানোর ব্যবস্থা করবো।
তিনি- তোরা খুব ভোরে যাত্রা করবি। সকালের ভেতর এসে পৌঁছাবি অবশ্যই। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোকে। তুই সুস্থ থাকিস। ভালো থাকিস।
আমি- ভোর পাঁচটার মধ্যে বেরিয়ে, ন’টার আগেই পৌঁছে যাবো। ব্রেকফাস্ট করবো আপনার সাথে। ঘুমান এখন। ফ্রেশ লাগবে সকালে। এইতো আসছি।
তিনি- তোদের দেখতে পেলে, সব ঠিক হয়ে যাবে। খুব ভালো লাগবে আমার।
হ্যাঁ, ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি তারপর। জেগে ওঠেননি আর। সেদিন। সেই বারো আগস্টে। হার্ট আক্রান্ত হলো তাঁর, রাত দু’টো থেকে ভোর ছ’টার মধ্যে, কোন একসময়। অচল হয়ে গেলো মগজ। কোন ইনফরমেশন নিতে পারে নি আর। বুঝতে পারেন নি কিছুই। মৃত্যুযন্ত্রণা তো নয়-ই, অনুভব করেন নি, কোনরকম কষ্ট।
জেনেছি কীভাবে? ‘পেন’-জার্মানির সভাপতি ছিলেন তখন মিস্টার ‘স্ট্রাসার।’ পরিচিত ছিলেন তিনি আমার। অফিস টাইমের প্রথম ঘণ্টায় ফোন করি তাঁকে। কী ঘটেছিলো জানতে চাই। আমার চোখের জল, তাঁকেও ভেজায়।
“হ্যাঁ, মিস্টার আজাদকে ওভাবেই পেয়েছি আমরা। নির্দিষ্ট কাজের জন্যে, ডোরবেল বাজিয়ে ডাকা হলে, দরজা খোলেন নি। তখন ডাক্তার এবং পুলিশ এসে, দরজা খুলে ভেতরে ঢোকেন। পরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন, হি ইজ ডেড। ঘুমের ভেতরে মারা গেছেন। কিছুই টের পান নি। এটা ঘটেছে, রাত দু’টো থেকে ভোর ছ’টার মধ্যে। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। বিছানায় শুয়ে ছিলেন তিনি। বন্ধ ছিলো তার দু-চোখ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লেখকেরা আসেন, আমাদের দেশে, বিভিন্ন কারণে। কিন্তু এই প্রথম এমন একটি ঘটনা ঘটলো। কী বলে সহানুভূতি জানাবো আপনাকে। আমি শক্‌ড্।
বিষন্ন কণ্ঠে যা বলেছিলেন মিস্টার ‘স্ট্রাসার’ সেদিন, তার প্রধান বাক্যগুলো লিখলাম। আর তখন, রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো আমার ভেতরে অবিরাম। হয় এখনো। যখন মনে পড়ে সব। স-ব। ঠিক আগের মতো। একটি শব্দও কী ভুলতে পেরেছি আমি, তাঁর সাথে জড়িত থাকা আমার জীবনের? আমাদের জীবনের?
বিষাক্ত বেদনার সমুদ্রে ডুবেও, মনে হচ্ছিলো, আততায়ীর পরিকল্পিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি, কয়েক সেকেন্ডের জন্যে। সেটা ছিলো তাঁর জয়। সেদিনের সাড়ে পাঁচ মাস পরে, চলে যাবার মতো যাতনা অনুভব না করে, স্বাভাবিক নিয়মে চলে যাওয়া কী ছিলো না তাঁর, আরও একটি বিজয়? এই মৃত্যুকে ছোট করেছেন যারা, তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে, কী বলবো তাদের? ওইভাবে মারা যাওয়ার জন্যে জন্ম হয় নি বলেই, মারা যান নি ওভাবে। তারপরেও, রহস্যময় বলছেন যারা তাঁর বিদায়কে, তারা কী মিথ্যে সফলতায় উল্লসিত হবার সুযোগ করে দেন নি, প্রতিপক্ষকে? উচিত কী ছিলো, এরকম ভুল গর্বের সুখে তাদের সুখী করে তোলা?
স্মৃতির রাজ্য থেকে বেছে নিতে চেয়েছিলাম, কিছু স্মৃতি, আপনার জন্যে, এই দিনে ১২ আগস্টে। তাঁর বিদায় নিয়ে লিখে, বেদনা বিধ্বস্ত হলাম সূচনাতেই। হয়তো, একটু ব্যাথিত করলাম আপনাকেও। স্যরি। প্রবেশ করছি, স্মৃতির পৃথিবীতে এখন।
[এক] অনেক কারণে প্রচণ্ড ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন হুমায়ুন আজাদ। ভুগছিলেন যে, বুঝতে পারছিলেন না। ভয়ঙ্কর অসুস্থতা এটা। স্থায়ী হয়ে গেলে, অতিক্রম করা সহজ হয় না, নিজে থেকে। নিজে না বুঝলে, অতিক্রম করতে চেষ্টা না করলে তো, সম্ভবই নয়। দরকার, যোগ্য সাইক্রিয়াটিস্ট এবং খুব কাছের কোন প্রিয়জনের প্রতিদিনের সহযোগিতা। নিজের পছন্দ মতো কিছু বাংলা আর ইংরেজি গান পাঠিয়ে দিলাম একদিন। এটা হয়তো সাহায্য করবে তাঁকে, এই সময়ে। মনে হয়েছিলো।
ফোন করলেন, গানগুলো শোনার পরে।
“কী বলে কৃতজ্ঞতা জানাবো তোকে। কখনো শুনি নি এই গানগুলো। এই যে, ‘আকাশ মেঘে ঢাকা, শাওন ধারা ঝরে’- এর কী কোন তুলনা আছে? এতগুলো বই লিখেছি, এরকম একটি গান তো লিখতে পারি নি। কে গেয়েছে এই গানটি বলতো?” বললেন উচ্ছ্বসিত আবেগে।
“জানি না কে গেয়েছেন, মনে করেন আমি গেয়েছি, অসম্ভব তো নয়, না-কি?” স্বভাব অন্তর্গত হিউমার আমার।
“তুই নিয়মিত গান করিস না কেন বলতো? সম্পূর্ণ অন্যধরনের কণ্ঠ তোর। খুব ঈর্ষণীয় হতো।” বললেন।
“আমি যে ফ্লাটারি পছন্দ করি না, সেটা আপনার অজানা নয়।” বলেছিলাম।
আবার ফোন আসলো তাঁর দু-ঘণ্টা পরে।
“জানি, কে গেয়েছে গানটি। ওর সব সিডি কিনেছি একটু আগে। কতবার যে শুনলাম এই গানটি। খুব আনন্দ হচ্ছে, অনেক দিন পরে।” বললেন।
‘চিত্রা সিনহা’ বা এরকম কোন একটি নাম বলেছিলেন গায়িকার। যে-কবিতাটি পাঠালেন সেদিন সন্ধ্যায়, তার শিরোনাম, ‘সে দিনটিও শ্রাবণ ছিলো।’
নিজে গেয়ে পাঠালেন গানটি, দু’দিন পরে। ক্লান্ত হয়ে গেলাম হাসতে হাসতে, ওঁর গান শুনে। জানতে চাইলেন, কেমন হয়েছে তাঁর গান।
“ভয়াবহভাবে আকর্ষণীয়। প্রথাবদ্ধতা বাতিল করেছেন এখানেও। আর কিছু করতে হবে না, নিয়মিত কনসার্ট করে মুগ্ধ করতে পারবেন, দুই বাংলার বাঙালিদের।” বলেছিলাম, হাসি নিয়ন্ত্রণ করে। একটি অসুস্থতা আছে আমার যার নাম ‘অসংযত হাসি।’ হাসির মতো কোন ব্যাপার হলেই, শুরু হয় এই অসুস্থতা।
“স্যাটায়ার করছিস? আর চর্চা করবো না?” বললেন অবুঝ বালকের মতো কণ্ঠে।
“অবশ্যই করবেন। প্র্যাকটিস ছাড়া কী পারফেক্ট হয় কোন কিছু? খুব বেশি প্র্যাকটিসও করতে হবে না আপনাকে। একসপ্তাহের মতো লাগবে হয়তো। শুরু করেন প্লিজ।” বলেছিলাম।
“কঠিন কথাও, এতো সহজ করে বলতে পারিস তুই।” জবাব ছিলো তাঁর।
*** *** ***
[দুই]  ‘আমার পাঠানো কবিতাগুলো কী করেছিস?’ জানতে চাইলেন একদিন।
“পড়ে, ডিলিট করেছি। কবিতা লেখে না যে, বোঝে না যে, কী গুরুত্ব তার কাছে কবিতার?” জবাব ছিলো আমার।
“তাই বলে ডিলিট করবি তুই?” অবাক হয়েছিলেন।
“এতো কবিতা পাঠান প্রতিদিন, হার্ডডিস্ক ভরে যায় না?” সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন আমার দুষ্টুমি।
“ঠিক আছে, আর কোন কবিতা পাঠাবো না তোকে।” কণ্ঠে ছিলো অভিমান।
না, ডিলিট করি নি তাঁর পাঠানো কোন কবিতা, কোন লেখা, কোন ছবি, একটি চিঠিও। কপি করে রেখে দিয়েছিলাম সব। যদি কখনো ক্র্যাশ করে হার্ডডিস্ক, এই ভয়ে। আবৃত্তি করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম সেদিন সন্ধ্যায়, তাঁর কিছু কবিতা। হয়েছিলেন ভীষণ খুশী, আর অবাকও। শুরু করলেন আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, আমার সাথে, নিয়মিত। যদি পাঠাতাম রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বা অন্য কারো কবিতা আবৃত্তি করে, হয়ে যেতেন অভিমানী। ব্যতিক্রম ছিলো শুধু একজন কবির ব্যাপারে, তিনি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত।
তাঁর কবিতা আবৃত্তি করলে কেউ, প্রচণ্ড সুখী হতেন। অন্যদের কবিতা পড়লে, হতেন অসন্তুষ্ট।
“হুমায়ুন আজাদের কবিতা কী কম আছে তোর কাছে? এসব কবিতার মূল্য কতোটা, বুঝবি একদিন।” বলেছিলেন।
*** *** ***
[তিন] কীভাবে যেন প্রতিযোগিতা শুরু হলো আমাদের, ছড়া লেখার। কথায় না বলে বিভিন্ন বিষয় প্রকাশ করতাম আমরা ছড়ায়। সাহিত্য-শিল্প-রাজনীতি স্পোর্টসসহ আরো অনেক বিষয় থাকতো, সেখানে। কত ছড়া যে লেখা হয়েছিলো এভাবে। ছিলো উপভোগের প্রচুর উপাদান, এসব ছড়ায়। মেতে থাকলেন অনেকগুলো দিন এ নিয়ে। উল্লসিত হতেন ছোট্ট শিশুর মতো, প্রতিটি ছড়া পেয়ে এবং পাঠিয়ে।
*** *** ***
[চার] পৃথিবী-বিখ্যাত আর্টিস্ট, এবং তাদের পেইনটিং নিয়ে আলোচনা করতাম আমরা। আমি মুড হলে ছবি আঁকি, কখনো কখনো হঠাৎ। এঁকেছি কিছু ছবি এভাবে। সিরিয়াসলি নয় অবশ্যই। কোন বিবেচনাতেই, আর্টিস্ট বলা যাবে না আমাকে। পাঠিয়ে দিলাম একদিন, বেশকিছু পেইনটিংয়ের কপি তাঁকে কিছু না ভেবে। ভ্যানঘগ, পিকাসো, দালি, দ্য ভিঞ্চি, গঁগা এবং আমার তিনটি।
কদিন পরেই এলো বড়ো একটি খাম, বেশ কিছু পেইনটিং নিয়ে তাঁর। আসতে থাকলো এরপর, কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁর আঁকা ছবি। আর্টিস্ট হুমায়ুন আজাদের পেইনটিং দেখতে, আনন্দ পাচ্ছিলাম খুব। প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পেইনটিংয়ের জন্যে, কিনলেন, উৎসাহিত হয়ে। চিত্রশিল্পী হবার মতো প্রতিভা ছিলো না তাঁর। বুঝলেন নিজেই একসময়, এটি তাঁর কাজ নয়। ছেড়ে দিলেন তারপর।
*** *** ***
[পাঁচ] টেনিস আর ফুটবলের ভক্ত ছিলেন তিনি। আমিও। নিয়মিত দেখতাম খেলাগুলো আমরা। বাজি ধরতাম আমি, প্রতিটি খেলায়। হারবে যে, লিখতে হবে তাঁকে, একটি কবিতা। পাঠাতে হবে তা, সাথে সাথে। হেরে গেলে, কখনোই লিখি নি কবিতা। লিখবো কেন? আমিতো কবি না। দুষ্টুমিতে চঞ্চল স্বভাব যার, সেতো এরকমই করবে, নাকি? কিন্তু তিনি, পাঠিয়ে দিতেন তার কবিতাটি ঠিকই। ছোট্টশিশুর মতো সরল ছিলেন, স্বভাবের কোন কোন এলাকায়। এটা, এতো উপভোগ্য ছিলো আমার। এতো নির্ভরশীল ছিলেন এসব ব্যাপারে। ‘ইমোশনাল ডিপেনডেন্সি’ বলতে হয় একে।
[‘বিশ্বাস’ শব্দটি, কখনও ব্যবহার করি না আমি। বলতে নয়। লিখতেও নয়। কারণটি হচ্ছে, এই শব্দটির যে অর্থ আমি করেছি, তা হচ্ছে- ‘না-জানা।’ যে-কোন ব্যাপার, যখন আমি জানি, তখন তা আমাকে বিশ্বাস করতে হয় না। অবিশ্বাসও নয়। যখন জানি না, তখন তা বিশ্বাস করতে বলা হয়। না-জেনে, কিছুই আমি বিশ্বাস করতে রাজি না। শুদ্ধ সঠিক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং বোঝার অক্ষমতাও, ভয়াবহ ধরনের অন্ধত্ব। জানতে, তথ্য-প্রমাণ দেখে জানতে চেষ্টা করা, আমার দায়িত্ব। অন্ধের মতো, না দেখে, না জেনে, অন্যদের কাছ থেকে শুনে, যুক্তিতর্কপ্রশ্ন বিহীনভাবে, বিশ্বাস করার চেতনা নিয়ে জন্মাই নি আমি। সত্যিই নয়। ‘আমাকে বিশ্বাস করতেন তিনি’, এরকম বাক্য লিখতে পারি নি, তাই। লিখলাম, ইমোশনাল ডিপেডেন্সি।]
“তুই বাজি ধরিস, কিন্তু শর্ত মানিস না,” বললেন একদিন।
“যত সহজ এ-কাজটি আপনার জন্যে, আমার জন্যেও কী তাই? আমি তো কবি না। ইনফ্যাক্ট, আমি তো কিছুই না। সত্যি সত্যিই না।” বলেছিলাম।
“কবিতার মতো ছন্দময় মেয়েটি, কবিতা লেখেনা কেন, বুঝি না।” বললেন।
“শোনেন, ফ্লাটারি করবেন না। নিজের যে-কোন ব্যাপারে, সঠিক ধারণা রাখি আমি। যে-কোন নিন্দা, অথবা প্রশংসার কতটুকু গ্রহণ আর কতটুকু বর্জন করবো, সে সিদ্ধান্ত আমার। চাটুকারিতা, স্তাবকতাকে ঘৃণা করি। এরা অতুলনীয় ভণ্ড এবং মিথ্যেবাদী। এই স্তাবকেরা। আপনার বিপদে, প্রয়োজন হলে, এদের অধিকাংশকেই দেখতে পাবেন না। স্বার্থপূরণের ব্যারোমিটার যত ওপরের দিকে যাবে, এদের স্তাবকতা হবে ততো বেশি। আর স্বার্থ অপূর্ণতায়, ব্যারোমিটার নীচে নামতে থাকলে, কোথায় এরা, তাও জানতে পারবেন না। কবিতা না লিখলেও, কবিতা-অকবিতার পার্থক্য বোঝার সামর্থ আছে আমার।”  দিয়েছিলাম সেদিন দীর্ঘ জবাব, অন্য অনেক দিনের মতো।
“আমি কখনোই ফ্লাটারি করি না, সেজন্যেই আমার নিন্দুক এবং শত্রু এতো বেশি। এদের ভেতরে আমি এক নিঃসঙ্গ মানুষ।” বললেন।
*** *** ***
হ্যাঁ, নিন্দুক এবং শত্রু ছিল তাঁর অ-নে-ক। যারা ছিলেন তাঁর কাছের একসময়, অধিকাংশই হয়েছিলেন পরে তাঁর বিরুদ্ধবাদী। কী বলেন নি তারা, তাঁর বিরুদ্ধে। কী করেন নি, তাঁর বিপক্ষে। যখন ছিলেন তিনি এই নীল গ্রহে। চলে গেলেন যখন, লিখেছেন এরাই আবার, উচ্ছ্বসিত আবেগ মেশানো প্রশংসায়, তাঁর পক্ষে। চেষ্টা করেছেন মূল্যায়ন করতে তাঁকে, নিজেদের বিবেচনায়। সব কী সত্যি ছিলো? সব কেনো, কিছুটাও কী সত্যি ছিলো? তবুও লিখেছেন তারা। লিখেছেন, কেন? প্রশ্ন করেছি। জবাবও জানা। তবুও লিখবো না জবাব। কতটা সত্য বলা আর লেখা যায়, ট্যাবু এবং জটিল মনস্তাত্বিক অসুস্থতায় আক্রান্ত মানুষের সমাজে রাষ্ট্রে? একটি উদাহরণ তবুও দিতে চাচ্ছি এ ব্যাপারে। প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে, তাই।
“হুমায়ুন আজাদের কাছে খোলা চিঠি” নামে একটি লেখা লিখেছেন, বাংলাদেশেরই একজন লেখক। একটা দৈনিকে একপাতার অর্ধেকের বেশি অংশে ছাপা হয়েছিল, লেখাটি। সংযত ছিল না, বিক্ষুদ্ধ ওই লেখকের তীব্র ক্রোধ। একটুও সংযত ছিল না, তার অশালীন ভাষা। শত্রুর আক্রোশে, যে-আক্রমণ তিনি করেছিলেন হুমায়ুন আজাদকে, তা সুস্থ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। ব্যক্তিগত বিষয়ও বাদ পড়েনি, সে আক্রমণের আক্রোশ থেকে। কারণটি কী ছিলো?
“আমার অবিশ্বাস” শিরোনামে দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন তখন হুমায়ুন আজাদ। অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপিটি পড়ার অনুরোধ করেছিলেন ওই লেখক। ইচ্ছে ছিলো না, তবুও দিয়েছিলেন তাকে পড়তে। ওই লেখকের দ্বিতীয় অনুরোধ নয়, দাবি ছিলো, শেষ করার পরে, লেখাটি দিতে হবে তাকে। প্রদীপ ঘোষ, পূর্ব-পশ্চিম বাংলায় যুক্তিবাদ প্রচারের নায়ক। তাঁর (প্রদীপ ঘোষের) পত্রিকায় ছাপাতে দিতে হবে লেখাটি। শেষ করার পরে। প্রদীপ ঘোষকে কথা দিয়েছিলেন ওই লেখক, হুমায়ুন আজাদের কাছ থেকে, লেখাটি সংগ্রহ করে দেবার। লিখে শেষ করতে পারলে, দেবেন বলেছিলেন হুমায়ুন আজাদ। লিখতে লিখতে, এই নামে একটি বই বের করার পরিকল্পনা করলেন তিনি। বই হবার আগে, লেখাটির কিছু অংশ কোথাও ছাপাতে দেবেন না, সিদ্ধান্ত নিলেন। জানালেন ওই লেখককে। জানিয়ে দিলেন প্রদীপ ঘোষকেও [হুমায়ুন আজাদ আর আমার খুব প্রিয় ব্যক্তিত্ব তিনি।] লেখাটি প্রদীপ ঘোষের কাছে পাঠাতে পারার অহঙ্কার হারিয়ে, উন্মাদ হয়ে উঠলেন ওই লেখক। আগুনে পেট্রল ঢাললেন, অন্য বিরুদ্ধবাদীরা। জন্ম নিলো, বিষাক্ত বীভৎস একটি ‘খোলা চিঠি।’ কোন মানসিকতার মানুষ ছিলেন, ওই পত্রিকার সম্পাদক, যিনি অনুমতি দিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ-আক্রান্ত, এরকম অসুস্থ লেখা ছাপাতে, ভাবতে পারি নি তখন। এখনও।
কুৎসিত ওই ‘খোলা চিঠি’র ক্লিপিং আমাকে পাঠিয়ে, জানতে চেয়েছিলেন, পড়েছি কী না। জবাব দিতে পারি নি, কিছুক্ষণ। অরুচিকর ওই লেখা, পুরো পড়বার রুচি হয় নি আমার।
“দেখবি আমার মৃত্যুর পরে এরাই বলবে, এরাই লিখবে, এরা ছিলো আমার খুব কাছের মানুষ। যারা কখনো আমার কাছে আসার সাহসও করে নি, তারাও বলবে, তারাই ছিলো আমার বন্ধু আর খুব আপনজন। কত মিথ্যে যে বলা এবং লেখা হবে আমার সর্ম্পকে, দেখতে পাবি।” বলেছেন।
“কে কী লিখলো, বললো তার ওপর কিছুই নির্ভর করবে না। যতদিন বাংলা ভাষা টিকে থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবেন আপনি। আপনার অমরত্ব নির্ভর করছে, আপনার কাজের ওপর।” সঠিক সান্ত্বনার প্রলেপ দিতে চেষ্টা করলাম আমি, তাঁর আহত হৃদয়ে।
চলে যাবার পরে তাঁর, ওই লেখক এবং ওই সম্পাদক লিখেছিলেন দীর্ঘ প্রশংসামূলক প্রবন্ধ। কতো প্রিয় এবং কত কাছের মানুষ ছিলেন তারা, সেসব বর্ণনা দিতে কী ভুলে গিয়েছিলেন? না। অবশ্যই না। স্তব্ধ কী হয়েছিলাম? নাহ্, হই নি। পরিচয় আছে যাদের, অধিকাংশ বাঙালি চরিত্রের প্রতিদিনের অসততা, কপটতা আর ভণ্ডামির সাথে, কোন সুযোগ কী অবশিষ্ট থাকে তাদের, স্তব্ধ অথবা হতবাক হবার মতো?
কত কত কত প্রমাণ রয়েছে আমার কাছে, যা দিয়ে লেখা যাবে কয়েকটি বই। কিন্তু? হ্যাঁ, আমাকে থামিয়ে দেয় ছোট্ট, কিন্তু গুরত্বপূর্ণ এই ‘কিন্তু’। প্রমাণিত সত্য, তবুও লিখতে পারবো না। যা-কিছু রাখা আছে, আমার বাড়ির লকারে, কী হবে এসবের? জানি আমি। যখন চলে যাবো, সব ফেলে, একদিন। অর্ডারপ্রাপ্ত কোন একটি কোম্পানির এমপ্লয়িরা এসে, খালি করবে বাড়িটি। সব, স-ব চলে যাবে কোন এক বিশাল ডাস্টবিনে। অটোমেটিক মেশিনে, গুড়ো হয়ে যাবে প্রতিটি জিনিস, যা ব্যবহার করেছি আমি, একজীবনে, সব। সেই ডাস্টবিন থেকে পৌঁছে যাবে, কোন এক অন্ধকারে। অ-নে-ক অপ্রকাশিত সত্য, আর তথ্যের মৃত্যু হবে, আমার মৃত্যুর কিছুদিন পরে। এভাবে।

[চলবে]