সেলিনা হোসেন > “লিখি মনেপ্রাণে একজন বাঙালি থাকার বাসনায়”>>> সাক্ষাৎকার

0
483

“লিখি মনেপ্রাণে একজন বাঙালি থাকার বাসনায়”

[সম্পাদকীয় নোট : এটি সেলিনা হোসেনের একটি অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকার। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীতে। এখনো কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত নয়। সাক্ষাৎকারটি কে গ্রহণ করেছিলেন, তার নাম ছাপা হয়নি। সাক্ষাৎকারটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আর অনেকেরই অপঠিত থাকায় আজ সেলিনা হোসেনের জন্মদিনে প্রকাশ করা হলো।]

প্রশ্ন : আমাদের কথাসাহিত্যে ছোটগল্পের স্থান কোথায়?

সেলিনা হোসেন : আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনার শরীরে হাতের স্থান কোথায়, তাহলে কি বলবেন? হাত কি শরীরের কোন বিচ্ছিন্ন অংশ? নাকি অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চাইতে কম প্রয়োজনীয় : এই প্রশ্নের উত্তরটি যেমন স্পষ্ট এবং তীক্ষ্ণ, কথাসাহিত্যে ছোটগল্পের স্থানটিও তেমনি সত্য। তাই এটি একটি জটিল প্রশ্ন। কেননা আমাদের কথাসাহিত্যে ছোটগল্পের স্থান সাহিত্যের সামগ্রিক মানদণ্ডে বিচার্য। যদি আমরা উপন্যাস, কবিতা কিংবা প্রবন্ধে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে না পারি, তবে সেই নৈপুণ্য একা ছোটগল্পের কাছে আশা করলেই কি পাব? না কি আশা করা সঙ্গত? সাহিত্যের কোনো একটি শাখাকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার না করে সামগ্রিক পটভূমিতে বিচার করা বাঞ্ছনীয়। একজন মানুষকে বিচার করতে হলে যেমন সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিচার করতে হয়, অর্থাৎ একজন ব্যক্তি কোনোক্রমেই সয়ম্ভু নয়, তেমনি সাহিত্যও। সব শাখাই সমান। তাই আমাদের কথাসাহিত্যে ছোটগল্পের অগ্রগতি নতুন ফসলের ঐশ্বর্যের সূচনায় ফলবান হচ্ছে। আমরা যতটুকু এগিয়েছি, ঝাড়লে কুলোর আগায় ফাঁস উড়বে, থাকবে দানাটুকু, হতাশার কিছু নেই।

গল্প রচনায় উপাদান সংগ্রহ করেন কিভাবে? অভিজ্ঞতা আহরণ এবং গল্পে তার ব্যবহারই কি যথেষ্ট মনে হয় আপনার কাছে?

জীবনযাপনের পারিপার্শ্বিকতা থেকে, চলতে-ফিরতে বহুজনের মুখোমুখি হয়ে, কখনো নিজেকে নিংড়ে-ছিবড়ে রস বানিয়ে নয়তো অন্যের অভিজ্ঞতা আত্মস্থ করে কল্পনার মিশেলে। না, অভিজ্ঞতা আহরণ এবং গল্পে তার ব্যবহারই যথেষ্ট মনে করিনা। প্রয়োজন শৈল্পিক সৃষ্টি। শুধু আহরণ এবং ব্যবহার শিল্পের শেষ কথা নয়, যদি না তার যথাযথ রূপায়ণ হয়। যিনি ক্ষমতাবান তিনি সহজে রূপায়িত করেন। অন্যদের তুলনায় হয়তো একটু বেশি কষ্ট হয়। সেজন্যই ব্যর্থতার গ্লানিতে আক্রান্ত থাকি। অভিজ্ঞতা আহরণ এবং ব্যবহারই যদি শেষ কথা হতো তাহলে তো অনেক কষ্টই কমে যেত।

গল্প বা উপন্যাস রচনার কাঠামো, বিষয়বস্তু, স্টাইল বা লিপিকৌশল, কোনটা ওপর আপনি বেশি জোর দিয়ে থাকেন?

সবটার ওপরই সাধ্যমতো সমান মনোযোগ দিয়ে থাকি। বিষয়বস্তু যেমন মনোযোগ দাবি করে, কাঠামোও তেমনি। একটাকে ছেড়ে অন্যটাকে জোর দিতে যাওয়া বোকামি। তাতে রচনার সৌন্দর্যহানি ঘটে। তাছাড়া আমি আগেও বলেছি, আমি সামগ্রিকভাবে বিচার করতে পক্ষপাতী। উপন্যাস আমার কাছে কোন খণ্ডাংশের বিকাশ মাত্র নয়। খণ্ডের বহুমাত্রিক সংযোজনই তো সামগ্রিক শিল্পকর্ম।

কেন লেখা? এই প্রশ্নের জবাব আপনার কাছে কি?

অনুন্নত দেশে লেখালেখি জীবনধারণের প্রয়োজনে নয়, নেহায়েতই একজন লেখকের অন্তরের তাগিদ থেকে। কেন লেখা? মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যিই তো কেন লেখা? যে দেশে শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়ে যাবার পাঁচ মাস পরও স্কুলের ছেলেমেয়েরা পাঠ্যপুস্তক পায় না [১৯৮৫ সালের দিকে যখন এই সাক্ষাৎকারটা প্রকাশিত হয় তখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমনটাই ছিল, পরে পরিস্থিতি বদলেছে। – সম্পাদক, তীরন্দাজ], সেখানে এইসব লেখালেখির কথা ভাবতে লজ্জা করে। তবুও তো লিখি, লিখি লজ্জা-শরমের মাথা খেয়েই। তবে লিখে বিশাল দিগবদল ঘটাবো, এমন প্রত্যাশা কখনো করিনা। আগেই বলেছি নেহাত অন্তরের তাগিদ থেকে লেখালেখি। এই টান নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো চেনা সড়কে উঠিয়ে দেয়। তারপর এগোই ঘাস লতা পাতা ফুল পাখি মাটি মানুষ সম্বলিত জনপদের মধ্য দিয়ে নিজস্ব কলা কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্যের পরিমণ্ডলের জগতে অস্তিত্ব রাখার তাগিদে। তাই লিখতে হয়। লিখি মনেপ্রাণে একজন বাঙালি থাকার বাসনায়।

সাহিত্যের কাছে কেন যাবেন পাঠক? আপনার গল্প-উপন্যাসের কাছে? কোন প্রত্যাশা পূরণে?

সাহিত্য একজন মানুষের আত্ম-আবিষ্কার, সেজন্যই পাঠক তার কাছে যাবেন। সাহিত্য ব্যক্তির দর্পণ —  সেখানে তিনি নিজেকে দেখতে পান সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায়, সেজন্যেই যাবেন পাঠক। পাঠক যাবেন তাঁর প্রয়োজনে, তাঁর অন্তরের টানে। আমার গল্প-উপন্যাসের কাছে কেন যাবেন? ভাববার বিষয়। এপর্যন্ত ধ্রুপদী কিছু তৈরি করেছি এ-ধরনের প্রত্যাশার ধৃষ্টতা নেই। আদৌ কিছু হয় কিনা সে বিচারও সময় করবে। শুধু এটুকু বলতে পারি যে, নিজের মাটি এবং ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে দেশীয় চেতনায় আত্মস্থ হই বলেই পাঠক আমার রচনার কাছে আসবেন।

বাংলা কথাসাহিত্য কি বদলাচ্ছে? বদল হলে আপনি কি পিছিয়ে পড়ার বোধ থেকে কখনো গ্লানিবোধ করেন?

পরিবর্তন তো প্রকৃতির ধর্ম। বাংলা কথাসাহিত্য একদম যে বদলাচ্ছে না তা নয়, তবে তার গতি তেমন প্রচণ্ডভাবে অনুভূত নয়। পিছিয়ে পড়ার গ্লানি আমার বিন্দুমাত্র নেই। কেননা যা লিখছি তা আদৌ কিছু হচ্ছে কিনা, এই ব্যাপারটি নিয়েই আমি তাড়িত। পিছিয়ে পড়ার গ্লানিবোধ তো অনেক পরের ব্যাপার।

উৎস

সচিত্র সন্ধানী, ৮ম বর্ষ ১৩ সংখ্যা, রবিবার ১৪ জুলাই ১৯৮৫।