সৈয়দ শামসুল হকের অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকার >> “আমার আশাবাদ শুধু সাহিত্য সম্পর্কে নয়, মানুষ, দেশ, মাটি, অনেক কিছু নিয়ে”

0
893
[সম্পাদকীয় নোট >> সন্ধানী প্রকাশনী থেকে ১৯৮৩ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ নামে একটি বই বেরিয়েছিল। সম্পাদনা করেছিলেন আবুল হাসনাত। সম্ভবত সেটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল ছোটগল্পকারদের প্রথম ছোটগল্পের বই। এই বই প্রকাশ উপলক্ষে সাপ্তাহিক সন্ধানী পত্রিকায় একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। মূল প্রতিবেদনটি লিখেছিলেন কবীর চৌধুরী। সঙ্গে ছিল অনেকের সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকের একটি সাক্ষাৎকার। সেই সাক্ষাৎকারটি আজ তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে তীরন্দাজে প্রকাশ করা হলো। উল্লেখ্য, সাক্ষাৎকারটি কোনো গ্রন্থে এখনও অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এই সাক্ষাৎকারে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং সাহিত্য নিয়ে সৈয়দ হক কী ভাবতেন, তার কিছুটা হদিস পাওয়া যায়। এখনো প্রাসঙ্গিক বলে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হলো। উল্লেখ্য, স্বাধীনতা অর্জনের এই মাসেই সৈয়দ হকের জন্ম। আর এই সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। জন্মদিনে তাঁর প্রতি তীরন্দাজের শুভেচ্ছা।]
“বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে অনেক সমালোচনার ব্যাপার আছে। যত্ন, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা, প্রকাশনা, পাঠকসহ বিভিন্ন সমস্যা আছে। তবে তা আগামীতে থাকবে না। প্রথমত, লেখককে লিখতে হবে। শিল্পগুণ ও কালকে অতিক্রম করার মতো লেখা লিখলে তা ব্যাপকতর হবে।”
প্রশ্ন : একটা দেশের মুক্তিযুদ্ধে একজন লেখকের কী দায়িত্ব পালন করা উচিত?
সৈয়দ শামসুল হক : সাহিত্যিক শুধু একজন সাহিত্যিক নয়। দেশের নাগরিক হিসেবে তাঁর ভূমিকা অনেক ধরনের। কোন একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা সাহিত্যিকের থাকে বলে মনে হয় না। যুদ্ধকালীন সময়ে বহু রকম পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। তার সঙ্গে তখন সবাইকে জড়িয়ে যেতে হয়। এক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা গ্রহণের বিষয়টি আসে। তবে সবচেয়ে বড় কথা যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ কিংবা যে-কোনভাবে স্বপক্ষে থাকা প্রকারান্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা রাখা।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে লেখকদের অবদান কতখানি বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের যুদ্ধ যেখানে শেষ হয় নাই সেখানে অবদানের প্রশ্ন পরে। আমরা ধরতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের বৃত্তের মধ্যেই বাস করছি। আমি মনে করি না যুদ্ধ এখনও শেষ হয়েছে, তাই এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব নয়।
১৯৭১ সালের স্মৃতি আপনার মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে?
মুক্তিযুদ্ধের সময় ২২শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় এবং ওই তারিখে লন্ডনের পথে ঢাকা ছাড়ি। বিজয় দিবসেও লন্ডনে ছিলাম। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ ‘বিবিসি’তে আমিই অনুবাদ করে পড়ি। তখন আমি বিবিসিতে কাজ করতাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অবরুদ্ধ ঢাকায় অনেক কিছু দেখেছি। সেই স্মৃতিগুলি আমার বিভিন্ন লেখায় ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে নিয়ে আমার ওই সব লেখা পডলে তা পাওয়া যাবে। আলাদা করে বলার কিছু নেই। আরও ঘটনা আমার জানা আছে, যা আমার পরবর্তী লেখাগুলিতে স্থান দিতে চাই।
“মুক্তিযুদ্ধের গল্প” গ্রন্থে সংকলিত আপনার গল্পের বিষয়ে কিছু বলুন।
আমার নিজের গল্পের নির্মাণ সম্পর্কে সাধারণত আমি আলাপ বা কথা বলি না। এ ব্যাপারে নিজের থেকে কিছু না বলাই ভালো।
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় আপনি আর কি কি কাজ করেছেন? ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরো কাজ করার ইচ্ছা কি আপনার আছে?
সামাজিক কর্তব্য হিসেবে প্রতি বছর অন্তত একটি লেখায় মুক্তিযুদ্ধ কোন না কোনভাবে আসে, এমন বিষয় নিয়ে লিখি। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়আশয় নিয়ে আমার অনেক কাজ আছে। এবং এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শাণিত করতে চাই। আগামীতে একইভাবে লিখে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।
সমকালীন সাহিত্য সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?
এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, সাহিত্যের ব্যাপারে আমি চিকিৎসার অতীত আশাবাদী। আমার আশাবাদ শুধু সাহিত্য সম্পর্কে নয়, মানুষ, দেশ, মাটি, অনেক কিছু নিয়ে। চারদিকে আমরা যা দেখেছি তা দেখে হতাশ হয়ে পড়ার কথা। অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু আমি হই না। নিজের জীবন দিয়ে অনেকে সবকিছু মাপেন। বহুদিন পর আমরা সবেমাত্র সূচনার মধ্যে পা রেখেছি। তা শুধু সাহিত্যের ক্ষেত্রে নয়। সর্বক্ষেত্রে আমরা প্রথম পা রেখেছি এবং চেতনায় প্রবেশ করেছি।
বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে অনেক সমালোচনার ব্যাপার আছে। যত্ন, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা, প্রকাশনা, পাঠকসহ বিভিন্ন সমস্যা আছে। তবে তা আগামীতে থাকবে না। প্রথমত, লেখককে লিখতে হবে। শিল্পগুণ ও কালকে অতিক্রম করার মতো লেখা লিখলে তা ব্যাপকতর হবে। আজ আমরা যে পর্যায়ে আছি তা ১৫ বছর আগে ছিল না। এটি এক বিরাট অগ্রগতি। আগামীতে আরও ভাল হবে।
চারদিকে দেখি ফ্যাশনের মতো অনেকে লিখে যাচ্ছেন। তাদের লেখা পড়ে মনে হয় তারা অন্তর থেকে লেখেন না। তবে একথা ঠিক, একটি ধারা সৃষ্টি হচ্ছে।
আমার সম্পর্কে বলতে চাই, নিজের ইচ্ছা জীবনের শেষ পর্যন্ত লেখার। আমি আরো অনেক দিন বেঁচে থাকতে ও লিখতে চাই। কেন জানি আমার সব সময় মনে হয় আমি জীবনের শেষ পর্যন্ত লিখে যেতে পারব। আয়ুর দিক থেকেই শুধু নয়।
উৎস >> সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানী, ১৮ ডিসেম্বর ১৯৮৩।