স্বকৃত নোমান > আমার বই আমার কথা >> বইমেলা ২০২০

0
1022
একজন সাহিত্যকর্মী হিসেবে বইমেলা এখন আমার কাছে প্রধান উৎসব। একথা সত্যি যে, মেলায় বই প্রকাশিত হবে, সেজন্য লিখি না, লিখি প্রাণের তাগিদে। কিন্তু এই কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই, আমার নতুন সবকটি বই প্রকাশিত হয় মেলাকে কেন্দ্র করেই। ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশ থেকে পাঠকেরা আসেন। প্রিয় লেখকের প্রিয় বইগুলো সংগ্রহ করেন। আমার একটি বই সারা বছর যা বিক্রি হয় তার অন্তত পাঁচগুণ বেশি বিক্রি হয় মেলার সময়। এই একটি মাস আমি লিখি না, পড়িও না; চেষ্টা করি মেলাটিকে উপভোগ করতে। লেখক-প্রকাশকদের সঙ্গে দেখা হয়, পাঠকদের সঙ্গে দেখা হয়। দেখা এবং আড্ডা আমার খুব ভালো লাগে।
এবারের বইমেলা উপলক্ষ্যে নতুন-পুরনো মিলিয়ে আমার চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে। নতুন বইগুলোর মধ্য রয়েছে গল্পের বই ‘বানিয়াশান্তার মেয়ে’ এবং মুক্তগদ্যের বই ‘টুকে রাখা কথামালা’। এ ছাড়া ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘শেষ জাহাজের আদমেরা’ উপন্যাসটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. থেকে। রোদেলা প্রকাশনী থেকে এসেছে ‘মুসলিম মনন ও দর্শন : অগ্রনায়কেরা’ শীর্ষক একটি পুরনো বইয়ের নতুন সংস্করণ।
‘বানিয়াশান্তার মেয়ে’ আমার চতুর্থ গল্পগ্রন্থ। চৌদ্দটি গল্পের সংকলন। যমের ভয়ে জেগে থাকতে থাকতে চরজনমের ক্লান্ত মানুষেরা যখন ঘুমিয়ে পড়ে, অমনি হানা দেয় সমুদ্র। মানুষজন নিয়ে গোটা দ্বীপ তলিয়ে যায় সমুদ্রগর্ভে। বেঁচে থাকে শুধু একজন। কীভাবে বাঁচল? সাজু আটকা পড়ে ট্রেনের বাথরুমে। সে যখন বাঁচার আশা ছেড়ে দেয়, জীবনের মশাল হাতে সামনে এসে দাঁড়ায় স্টেশনের এক বেশ্যা। চর কুকরী মুকরী শাসন করেন মিথের মানুষ কালাপীর। নিশিরাতে মানুষ আর পশুপাখিরা যখন ঘুমায়, বন থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। রাতভর পাহারা দেন চর। একদিন জলের উপর দিয়ে হেঁটে তিনি চলে যান দূর সমুদ্রে। বদলে যায় চরের চালচিত্র। কেন বদলে যায়? ওদিকে বানিয়াশান্তা পতিতাপল্লির আঁখি হাসার সময় সাগরের মনে পড়ে যায় শীতঋতুর পাতা ঝরার দৃশ্য। আঁখিকে বিয়ে করে বাড়িছাড়া সমাজছাড়া হলেও হাল ছাড়ে না সাগর, সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হাঁটতে থাকে গন্তব্যের দিকে। এমনই সব গল্প নিয়ে ‘বানিয়াশান্তার মেয়ে’।
বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার মুক্তগদ্যের বই ‘টুকে রাখা কথামালা’। মৌচাকে কেবল মধু থাকে না, মোমও থাকে। মৌয়ালের কাছে মধুই দরকারি। কিংবা মাড়াইকলে যখন আখ মাড়াই হয়, রসগুলো চলে যায় ভাণ্ডে, ছোবড়াগুলো বাইরে। তাই বলে মোমগুলো কি ফেলে দেওয়া হয়? ছোবড়াগুলো? না, মোমও কাজে লাগে। ছোবড়াও। জ্বালানির কাজে। আমি গল্প-উপন্যাস লিখি। এ দুটি আমার কাজ। দরকারি বিষয়। হাতটাকে চালু রাখার জন্য এর বাইরে আমি প্রচুর লিখি। প্রতিদিনই কিছু না কিছু লেখার চেষ্টা করি। লিখতে হবে এমন কোনো শর্ত আমাকে কেউ দেয়নি। লিখে আনন্দ পাই বলে লিখি। সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন, সমাজ, রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে। ‘টুকে রাখা কথামালা’ নামে কোনোটি ফেসবুকে পোস্ট করি, কোনোটি করি না। এই কথামালাকে মৌচাকের মোম বলা যেতে পারে, কিংবা আখের ছোবড়া। ফেলেও দেওয়া যায়, কাজে লাগালেও লাগানো যায়। সাত বছর ধরে লেখা এই কথামালার মোট শব্দসংখ্যা তিন লাখ একুশ হাজার। বাছাই করা প্রায় ১০০টি লেখা নিয়ে এই বই। বাকিগুলো কম্পিউটার থেকে মুছে দিয়েছি, যাতে আমার মৃত্যুপরবর্তীকালে কেউ এসব লেখা ‘অপ্রকাশিত রচনা’ বলে প্রকাশ করতে না পারে। ওগুলো কোনো কাজের নয়। জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহারের অযোগ্য। এই কথামালায় আমি যা লিখেছি, এগুলো আমার গত সাত বছরের চিন্তার প্রকাশ। সাত বছর পর এই চিন্তায় আমি স্থির নাও থাকতে পারি। কেননা, কোনো মতই চিরন্তন নয়। সত্যের রূপও এক নয়। সত্যের বহুরূপ। আমার কাছে যা সত্য, অন্যের কাছে তা মিথ্যা। এই দেশে যা সত্য, অন্যদেশে তা মিথ্যা। আমি যা লিখেছি তাই সত্য, এর বাইরে আর কোনো সত্য নেই, এমন মনোভাবকেই বলে গোঁড়ামি।
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে এসেছে ২০১৭ সালে প্রকাশিত আমার ‘শেষ জাহাজের আদমেরা’ উপন্যাসটির দ্বিতীয় সংস্করণ। জার্মান দার্শনিক হেগেল বলেছেন, ‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে।’ তাঁর বক্তব্য কিছুটা খণ্ডন করে কার্ল মার্কস বলেছেন, ‘ইতিহাস আপনা থেকে পুনরাবৃত্ত হয়। তবে প্রথমবার যদি তা ট্র্যাজেডি, দ্বিতীয়বার তা হয় প্রহসন।’ আচ্ছা, ট্র্যাজেডির ইতিহাস কি পুনরাবৃত্তিতে ট্র্যাজেডি হতে পারে না? এই প্রশ্ন থেকেই ‘শেষ জাহাজের আদমেরা’ লিখতে শুরু করি। টানা দুই বছরের সাধনার ফসল এই উপন্যাস। নোটবুকে টুকে রাখা তারিখ সাক্ষী দিচ্ছে, ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল উপন্যাসটি লেখা শুরু করেছিলাম। লেখা শেষ করি ২০১৬ সালের ২৯ নভেম্বর। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে বিভিন্ন নৌযানে পনের থেকে কুড়ি হাজার ভাসমান মানুষের সীমাহীন দুর্দশা, খাবারের জন্য কাড়াকাড়ি, মারামারি, হতাহত এবং থাইল্যান্ডের পেদাং বেসার জঙ্গলে আবিষ্কৃত অসংখ্য গণকবর আবিষ্কারের সংবাদ আমাকে বিচলিত করে তুলেছিল দারুণ। এই কারণে এবং অন্য আরো একটি বিশেষ কারণে, বঙ্গ-ভারতের সাংস্কৃতিক ক্লেশ নিয়ে যে উপন্যাসটি লিখব বলে দু-বছর ধরে নোট নিচ্ছিলাম। সেই উপন্যাসটির পরিকল্পনা বাতিল করে ‘শেষ জাহাজের আদমেরা’ লিখতে শুরু করি। আসলে মানুষের কল্পনা বাস্তবতাকে কতটা ছুঁতে পারে, উপন্যাসটির মধ্য দিয়ে এই চেষ্টাটা ছিল আমার। মানবতার চূড়ান্ত পতন, একই সঙ্গে তুঙ্গ উত্থান এবং অনিবার্য মৃত্যু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের মানসিক কী প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, এসব কিছুকে আমি শব্দে আঁকতে চেয়েছি এই উপন্যাসে। এবং চার শ বছর আগে মগ-ফিরিঙ্গিদের মানবপাচার এবং চার শ বছর পরের মানবপাচারকে একটা সুতোয় গাঁথতে চেয়েছি। উপন্যাসটি লেখার সময় একেকবার মনে হতো, না, উপন্যাসটি লিখে শেষ করা আমাকে দিয়ে হবে না। কোনো কোনো দিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত কীবোর্ড সামনে নিয়ে বসে থেকেছি, অথচ একটা শব্দও লিখে উঠতে পারিনি। নিদারুণ এক বিপন্নতা আমাকে আঁকড়ে ধরত তখন। মনে হতো, হায়, আমি বুঝি লিখতে ভুলে গেছি! উপন্যাস লেখা বুঝি আর আমাকে দিয়ে হবে না! বেঁচে থাকাটা তখন নিরর্থক মনে হতো। নিজেকে তখন জগতের সবচেয়ে অপদার্থ মানুষ বলে মনে হতো। কিন্তু আবার যখন লেখা শুরু হতো, টানা চলতে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কী বোর্ডে শুধু ঠকঠক শব্দ উঠত অবিরাম। লিখে আবার সম্পাদনা। শব্দ ধরে ধরে সম্পাদনা। ইতিহাস ও শিল্পের যে বিন্দুকে স্পর্শ করবার আকাঙ্ক্ষায় উপন্যাসটি লিখেছি, জানি না সেই বিন্দুটি স্পর্শ করতে পেরেছি কিনা। সেই বিচারের ভার পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।
অপরদিকে রোদেলা প্রকাশনী থেকে এসেছে ‘মুসলিম মনন ও দর্শন : অগ্রনায়কেরা’ নামে একটি বই। ইসলামের প্রধানত দুটি দিক আছে। শরিয়ত ও মারেফাত। শাস্ত্রগত ও আধ্যাত্মিক দিক। আমার বাবা ছিলেন শরিয়তপন্থি সুফি। অর্থাৎ শাস্ত্রপন্থি অধ্যাত্মবাদী। শাস্ত্র ও অধ্যাত্মবাদের একটা সমন্বয় ছিল তাঁর মধ্যে। ধর্মের মধ্যপন্থাকে অবলম্বন করেছিলেন তিনি। যাপনও করেছেন একধরনের বৈরাগ্য জীবন। তিনি আমার শিক্ষকও। আরবি, ফার্সি, উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের পাঠ মূলত তাঁর কাছ থেকেই নিয়েছিলাম। পারস্যের কবি জালাল উদ্দিন রুমি, ওমর খৈয়াম, হাফিজ, দাকিকি, জামি ও শেখ সাদির অসংখ্য ‘শের’ বা কবিতা ছিল তাঁর মুখস্থ। আমাদের শৈশব-কৈশোরে তিনি মধ্যযুগের মুসলিম কবি ও চিন্তকদের জীবনকাহিনি শোনাতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আমরা, অর্থাৎ আমি এবং আমার বাল্যবন্ধু আমানউল্লাহ ও আশ্রাফ আলী, তাঁর কথা শুনতাম। শুনতে হতো মাথা নিচু করে, ভয়ে তাঁর চোখের দিকে তাকাতে পারতাম না। একবার শুরু করলে সহজে থামতে চাইতেন না। আমাদের গ্রামে দিনে চারবেলা ট্রেন আসত। আমরা সকালের ট্রেন ধরে জেলাশহর যাব, কিন্তু দেখা গেল সকালের ট্রেন চলে গেল, দুপুরের ট্রেনও চলে গেল, অথচ তাঁর কথা শেষই হচ্ছে না। আসলে তিনি চাইতেন আমরা যেন এসব মনীষীর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিই। তিনি প্রায়ই একটি শের আবৃত্তি করে শোনাতেন, ‘মান না গুনজম দর জমিনে আসমা/লেকে গুনজম দর কুলুবে মোমেনা।’ অর্থাৎ, আল্লাহ জমিনে নেই, আসমানে নেই; আল্লাহ আছেন বিশ্বাসীর অন্তরে। কিন্তু তিনি এর অর্থ করতেন, ‘আল্লাহ জমিনে নেই, আসমানে নেই; আল্লাহ আছেন মানুষের অন্তরে। মানুষের অপমান মানে আল্লাহর অপমান। ‘বিশ্বাসীর’ স্থলে তিনি ‘মানুষ’ যুক্ত করে দিতেন। আমরা ভেবে পেতাম না, আল্লাহ কেমন করে মানুষের অন্তরে থাকেন! এ কী করে সম্ভব?
পরবর্তীকালে তাঁরই উৎসাহে আমি পাঠ শুরু করি খ্যাতনামা মুসলিম চিন্তকদের জীবন ও দর্শন। আমার মধ্যে তখন একটা জেদ ছিল, যে করেই হোক এঁদের সম্পর্কে জানতেই হবে। পড়তে পড়তে আবিষ্কার করি, আমার বাবার জীবন ও ধর্মদর্শনে বায়েজিদ বোস্তামি, শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি, ইবনুল আরাবি, জালাল উদ্দিন রুমি, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ প্রমুখের চিন্তাধারার একটা প্রভাব ছিল। রক্ষণশীল চিন্তক আল গাজালির চিন্তার চেয়ে তিনি উদারপন্থি ইবনুল আরাবির সর্বধর্ম সমন্বয়বাদী দর্শনকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এই কারণে তিনি হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন করতেন না। তিনি বলতেন, হিন্দুরা যাতে এই দেশে নিরাপদে থাকতে পারে, এটাও ইসলামের শিক্ষা।
বিস্ময়ের সঙ্গে আমি আরো আবিষ্কার করি, রক্ষণশীল মুসলিমরা বর্তমানে যেসব মুসলিম মনীষীকে নিয়ে গৌরববোধ করে, জীবৎকালে তাঁদের কেউ রক্ষণশীলদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন, কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। দার্শনিক আল কিন্দি ও ইবনুল আরাবিকে কাফের ফতোয়া দেওয়া হয়, ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তারের সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নির্বাসনদণ্ড দেওয়া হয়, ওমর খৈয়ামকে নাস্তিক সাব্যস্ত করে পুড়িয়ে দেওয়া হয় তাঁর ঘর, ইবনে রুশদকে করা হয় অপমান-অপদস্ত, কবি ফেরদৌসীর লাশ মুসলিম গোরস্তানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি, আল রাজিকে অন্ধ করে দেওয়া হয়, মনসুর হাল্লাজ ও শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দিকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড।
পরবর্তীকালে আমি যখন নাট্যকার সেলিম আল দীনের সাহচর্যে আসি, দৈনিক ‘সমকালে’ কীভাবে ফিচার লিখতে পারি, সেই ব্যাপারে আলাপ করার জন্য একদিন তিনি আমাকে পাঠালেন কবি ও গবেষক সাইমন জাকারিয়ার কাছে। তিনি তখন ‘সমকালে’র একটি পাতা সম্পাদনা করতেন। কিন্তু তাঁর পাতায় লেখার সুযোগ ছিল না। তাঁর সুবাদে পরিচয় হয় ‘সমকালে’র সহসম্পাদক মাওলানা হোসেন আলীর সঙ্গে। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল মানুষ, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। অন্ধবিশ্বাস অপেক্ষা যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তিনিই আমাকে অনুপ্রাণিত করেন মধ্যযুগের মুসলিম কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকদের নিয়ে লিখতে। আমি লিখতে শুরু করলাম। মাসে দুটো করে লেখা ছাপা হতে থাকে ‘সমকালে’।
এরই মধ্যে আমি যোগ দিই সেলিম আল দীনের একান্ত সচিব হিসেবে। তিনি সাধারণত দৈনিক পত্রিকা পড়তেন না। কিন্তু যেদিন ‘সমকালে’ আমার লেখা ছাপা হতো সেদিন মনোযোগ দিয়ে লেখাটি পড়তেন। এই বলে উৎসাহ দিতেন, ‘বাহ! খুব ভালো কাজ, লিখে যা।’ মাঝেমধ্যে আমাকে দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগত ছাত্রছাত্রীদের বলতেন, ‘তার লেখা পড়েছিস! দর্শন নিয়ে অনেক ভালো লেখে, পড়ে দেখিস।’ এসব বলে আসলে তিনি আমাকে জ্ঞানকাণ্ডে উৎসাহিত করতেন। তাঁর উৎসাহেই পরবর্তীকালে প্রতীচ্য দর্শন পাঠ শুরু করি।
একদিন ঢাকার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাঙলায়নের প্রকাশক কবি অস্ট্রিক আর্যু প্রস্তাব দিলেন, ‘সমকালে’ প্রকাশিত লেখাগুলো নিয়ে তাঁকে একটা পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে দিতে। তখন সবে আমি লেখালেখি শুরু করেছি। কোন লেখা প্রকাশ করতে হবে আর কোনটি হবে না, এই বিবেচনাবোধ তখনো তৈরি হয়নি। তাঁর প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে প্রাচ্যের ভাবআন্দোলনের গতিধারা নাম দিয়ে একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করে পাঠিয়ে দিলাম তাঁকে। ২০০৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বইটি প্রকাশিত হয়। কেটে গেল এগারো বছর। এবার আমার মনে হলো, পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো দিয়ে বই প্রকাশ ঠিক হয়নি। লেখাগুলোর আরো সংস্কার, পরির্তন ও পরিবর্ধন প্রয়োজন। নইলে ভবিষ্যতের পাঠক আমাকে ভুল বুঝতে পারে। তাছাড়া বর্তমানে মুসলমানরা যেভাবে কট্টর রক্ষণশীলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে, এ সময়ে এই ধরনের বই অনেক বেশি প্রয়োজন। শুরু করলাম সম্পাদনা। কিছু প্রবন্ধ বাদ দিলাম, যুক্ত করলাম নতুন কিছু প্রবন্ধ। পাল্টে দিলাম বইয়ের নামও। নতুন নাম রাখলাম ‘মুসলিম মনন ও দর্শন : অগ্রনায়কেরা’। রোদেলা প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হলো। এখন থেকে প্রাচ্যের ভাবআন্দোলনের গতিধারা বইটি বাতিল বলে গণ্য হবে। এ বইয়ে মোট বাইশজন মুসলিম চিন্তকের জীবন, মনন ও দর্শনের উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি। এমনভাবে করেছি, যাতে সর্বসাধারণ সহজে বুঝতে পারে। দর্শনের জটিল তত্ত¡গুলোকে অধিকতর সহজ করে তোলার চেষ্টা করেছি। বইটি পড়ে একজন পাঠকও যদি অশিক্ষা, কূপমুণ্ডূকতা ও চরমপন্থা থেকে মুক্তি পান, আমার আনন্দের সীমা থাকবে না।