স্বকৃত নোমান > ‘মায়ামুকুট’ রচনার গোড়ার কথা >> নিজের বই নিয়ে

0
377

স্বকৃত নোমান > ‘মায়ামুকুট’ রচনার গোড়ার কথা >> নিজের বই নিয়ে

 

“২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এক বিকেলে আমার প্রাক্তন সহকর্মী, তরুণ সাংবাদিক ও গল্পকার হাবিবুল্লাহ ফাহাদসহ শাহবাগ মোড় থেকে আজিজ মার্কেটের দিকে যাচ্ছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে আলাপ করছিলাম পত্রিকার ওই স্ক্রিনশর্টটি নিয়ে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ কল্পচোখে ভেসে উঠল অন্ধকার রাত। গাঢ় অন্ধকারে একটা লোক দৌড়াচ্ছে…দৌড়াচ্ছে। এবং শুনতে পেলাম মাথায় খসখস শব্দ। একটি উপন্যাসের অধ্যায়গুলো আমার মাথায় যেন লেখা হচ্ছে।”
২০১৩ সালে একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে প্রকাশিত দুই কলামের একটি নিউজ পড়ে ‘মায়ামুকুট’ উপন্যাসটির আইডিয়া মাথায় এসেছিল। নিউজটির স্ক্রিনশর্ট আমি মেইলের ড্রাফটবক্সে রেখে দিয়েছিলাম এমন ভাবনা থেকে যে, কোনোদিন হয়ত কাজে লাগবে, কোনোদিন হয়ত এ বিষয়ে একটি উপন্যাস লিখতে পারব। চার বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। কিন্তু লেখা হয় না। কী লিখব কিছুই ঠিক করতে পারি না। এরই মধ্যে বেরিয়ে গেল দুটো উপন্যাস : কালকেউটের সুখ ও শেষ জাহাজের আদমেরা। ২০১৭ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে আবার ‘নিস্তব্ধতার সংলাপ’ নাম দিয়ে একটি উপন্যাস লেখা শুরু করি। কিন্তু উপন্যাসটির বিষয়বস্তু আমাকে খুব একটা টানছিল না। ভেতর থেকে তেমন সাড়া পাচ্ছিলাম না। পরে এটি বাতিল করে দেই।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এক বিকেলে আমার প্রাক্তন সহকর্মী, তরুণ সাংবাদিক ও গল্পকার হাবিবুল্লাহ ফাহাদসহ শাহবাগ মোড় থেকে আজিজ মার্কেটের দিকে যাচ্ছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে আলাপ করছিলাম পত্রিকার ওই স্ক্রিনশর্টটি নিয়ে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ কল্পচোখে ভেসে উঠল অন্ধকার রাত। গাঢ় অন্ধকারে একটা লোক দৌড়াচ্ছে…দৌড়াচ্ছে। এবং শুনতে পেলাম মাথায় খসখস শব্দ। একটি উপন্যাসের অধ্যায়গুলো আমার মাথায় যেন লেখা হচ্ছে। আমি তখন এতটাই বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম যে ফাহাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত বাসায় চলে এলাম। বাসার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে কানে বাজল, কে যেন বলছে, ‘শহরের সমস্ত ফুলের দোকান শূন্য হয়ে পড়েছে, সিটি কর্পোরেশনের তেত্রিশজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী টানা চব্বিশ ঘণ্টা ফুলের স্তুপ পরিস্কার করেও কফিনটির সন্ধান পেল না।’
প্রায় পঁচিশ দিন কেটে গেল। এক ছুটির দিনে পড়ছিলাম আঁদ্রে মারোয়ার ‘লেখকের শিল্পকৌশল’ প্রবন্ধটি। সেখানে তিনি লিখছেন, “বিষয় নির্বাচন শেষ হয়ে গেলেই লিখতে আরম্ভ করা উচিত। পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার সময়ে যেমন কেউ পূর্বাপর ভেবে ঝাঁপ দেয় না, পুস্তক লেখা আরম্ভ করার সময়েও ঠিক তেমনি পূর্বাপর না ভেবে ঝাঁপ দেওয়া উচিত। তীরে দাঁড়িয়ে ভাবনা চিন্তা করলে সাঁতার কাটা কোনোদিনই শেখা যায় না। একবার নেমে পড়লে সাঁতারু স্রোত ও পানির শীতলতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে শেখে। প্রথম করণীয় হলো, কি করতে হবে তা স্থির করা। কেননা এ ছাড়া কোনো কাজই সমাপ্ত হতে পারে না। রচনা একবার আরম্ভ করলে, তার বৈশিষ্ট্য আপনা-আপনি ফুটে উঠবে।”
কথাগুলো আমাকে এতটাই অনুপ্রাণিত করল, সঙ্গে সঙ্গে ‘মায়ামুকুট’ উপন্যাসটি লিখতে বসে গেলাম। মার্চের ১৫ তারিখ ছিল সেদিন। ১৭ তারিখের মধ্যে ২৭ শ শব্দ লিখে মনে হলো কয়েকটি স্থান ঘুরে আসা দরকার। সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর সার্বিক সহযোগিতায় বিষয়সংশ্লিষ্ট কয়েকটি স্থান ঘুরে এলাম। ফিরে এসে আবার শুরু করলাম লেখা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে উপন্যাসটির দুটি অধ্যায় লিখে শেষ করার পর মনে হলো উপন্যাসটি আমি লিখে শেষ করতে পারব।
অবশেষে লেখা শেষ হলো। ২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর, দীর্ঘ কুড়ি মাস ধরে উপন্যাসটি লিখি। উপন্যাসটির বিষয়সংক্ষেপ এই : প্রেমিকা শিউলির সঙ্গে মিলনকালে সাবেক সেনাসদস্য মুলুকের মনে পড়ে যায় পিতৃশাপের কথা। মুহূর্তে উবে যায় তার যৌনশক্তি, নিস্তেজ হয়ে পড়ে তার পৌরুষ। ক্লীব ভেবে তাকে প্রত্যাখ্যান করে শিউলি। মুলুক জড়িয়ে পড়ে পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির গুপ্ত রাজনীতিতে। হয়ে ওঠে দুর্ধর্ষ ডাকাত, ভয়ংকর খুনি। তিরাশিবার তাকে গ্রেপ্তারের ব্যর্থ চেষ্টা করে পুলিশ। তার অস্তিত্ব নিয়ে তৈরি হয় সংশয়। কারণ পুলিশ তো কখনো সরাসরি তাকে দেখেনি, দেখেছে সেনা সদর দপ্তর থেকে সংগৃহীত পাসপোর্ট সাইজের তার একটা সাদাকালো ছবি। ছবির মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে বাস্তবের মানুষটিকে গ্রেপ্তার করা তো দুষ্কর। ফলে মুলুক হয়ে ওঠে কিংবদন্তির মানুষ।
সাংবাদিকের অনুসন্ধানে একদিন বেরিয়ে আসে মুলুকের জীবিত থাকার প্রমাণ। অবশেষে সে গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে মুলুক আবার পালিয়ে যায় আদালত চত্বর থেকে। আশ্রয় নেয় উদারপন্থী প্রয়াত এক বাউলের মাজারে। উদার, বহুত্ববাদী ও সংগীতসাধক বাউল আর সাধু-সন্ন্যাসীদের সংস্পর্শে থেকে বদলে যায় মুলুক। দীক্ষা নেয় মরমীবাদের। যাকে গ্রেপ্তার করাটা গোটা পুলিশ বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, একদিন সেই মুলুক আত্মসমর্পণ করে থানায়। কিন্তু সে আদৌ মুলুক কি না নিশ্চিত হতে পারে না পুলিশ। তৈরি হয় নতুন জটিলতা। পরবর্তীকালে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আটষট্টিটি মামলায় এক শ তেতাল্লিশ বছরের কারাদণ্ড হয় তার। পৃথিবীর সর্বোচ্চ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুলুক হয়ে ওঠে কারাগারের প্রধান জল্লাদ। একাত্তরের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী, পঁচাত্তরের খুনি এবং জঙ্গিসহ কার্যকর করে তেত্রিশজন কুখ্যাত গণশত্রুর ফাঁসি। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে তার নাম। তাকে ঘিরে তৈরি হয় নানা মিথ। তার জীবনকথা নিয়ে গাথা রচনা করেন সংগীতসাধক ভুবন সাধু। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ, শাপলায় হেফাজতের উত্থান, ২০১৩ পরবর্তী জঙ্গিদের ভয়াবহ সব হামলাসহ বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক ঘটনাকে ধারণকারী উপন্যাস ‘মায়ামুকুট’। উপন্যাসের চরিত্র হয়েছেন গণজাগরণ মঞ্চ সংশ্লিষ্ট অনেকে।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মুলুক আর কেউ নয়, পৃথিবীর সর্বোচ্চ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শাহজাহান, যিনি জল্লাদ শাহজাহান নামে পরিচিত। তিনি দেশের প্রধান জল্লাদ। বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। বলে রাখি, জল্লাদ শাহজাহানের বৈচিত্র্যময় জীবন উপন্যাসটির কাহিনিসূত্র মাত্র। শেষ পর্যন্ত উপন্যাসের কাহিনি সর্বাংশে শাহজাহানের বাস্তব জীবন সম্ভূত থাকেনি। শাহজাহান হয়ে উঠেছে আমার একটি কল্পিত চরিত্র। সেই চরিত্রের সঙ্গে বাস্তবের শাহজাহান জল্লাদের জীবনের মিল খোঁজার কোনো অবকাশ নেই। আশা করি উপন্যাসটি পাঠকরা গ্রহণ করবেন।
বইটির তথ্য
মায়ামুকুট (উপন্যাস)
প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ
প্রচ্ছদ : মোমিন উদ্দীন খালেদ
দাম : ৪০০ টাকা