স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত > কবিতাগুচ্ছ >> জন্মদিন

0
450
[স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত : কবিতা লিখছেন একুশ শতকের শুরু থেকে। একটু মৃদুস্বরের কবিতা লেখেন তিনি। কবিতার স্বভাবটা নম্র-শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে ক্ষরণটা চলে সেটা বোঝা যায়। কখনও কখনও তাঁর কবিতায় জীবনানন্দের মেদুরতার ছোঁয়া পাওয়া যায়।তাঁর কবিতার তাই নিজস্ব একটা স্বর আছে, আছে ভাষাবুননের নিজস্বতা। স্বর্ণেন্দুর সঙ্গে ২০১৬ সালে আমার পরিচয় হয়েছিল কলকাতা বইমেলায়। উপহার দিয়েছিলেন কবিতার বই ‘পিতার জন্ম হয়’ (২০১৫)। কলকাতার অফট্রাক কিন্তু অভিজাত প্রকাশনী মনফকিরা থেকে বেরিয়েছে। বইটা একটু উল্টেপাল্টে দেখতেই বুঝে ফেলি, অন্যরকম কবি তিনি। মনে হলো নিভৃতচারীও। থাকেনও কলকাতা থেকে দূরে মেদিনীপুরে। আজ স্বর্ণেন্দুর জন্মদিন। এই জন্মদিন উপলক্ষ্যেই মনে হলো তীরন্দাজের পাঠকদের সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিই। জন্মদিনের শুভেচ্ছা স্বর্ণেন্দুকে। – মাসুদুজ্জামান, সম্পাদক, তীরন্দাজ]
পাখি সংস্কার
প্রতিদিন বাম পাশে ফিরে, পাখিসংস্কারে বিশ্বাস করি আমি
নিরাশ্রয়ের গৃহ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার আগে তিনবার বলি পাখি পাখি পাখি
বেলা শেষে, আর কোন প্রাত্যহিকতা নেই, শুধু তার স্মৃতিটুকু
বেজে চলে সন্ধ্যের গানে
নিরুদ্দেশের ঘর জুড়ে আমরা রয়েছি, শূন্যতার অধিকার ভাগাভাগি করে
শুধু অন্ধত্বের প্রশ্নগুলি থাক, যেমন আশ্রয়ের ঠিকানা জুড়ে অন্ধকার
নেমে আসে ঘাস থেকে ঘাসে
প্রতিদিন একবার বামপাশে ফিরে যাই তবু,
চশমাটি খুলে রাখি, তিনবার পাখি পাখি বলে-
গোধূলি কুকুরগুলি
গোধূলি রঙের কুকুরগুলি যৌনস্বভাব নিয়ে বড় হয়
রাস্তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে তারা শুধু পৃথিবীর গন্ধ শুঁকে যায়
গোধূলিকুকুরগুলি গন্ধস্বভাব নিয়ে বড় হয়
ধ্বংসের থেকে দূরে প্রসূতির অন্ধকার ক্রমশ গভীর হতে থাকে
দূরে যদি শঙ্খ বাজে, ঘুমন্ত শব্দের স্বভাব বেজে ওঠে
গোধূলিকুকুরগুলি নতশির, শব্দস্বভাবে বড় হয়
দৃশ্যের শেষে এসে সমাপ্তি নয়
কুয়াশার পথগুলি শেষ হয় রাত্রির মাঝে
তারপরও দৃশ্যের নিশানা নিয়ে পাখি ওড়ে
গোধূলিকুকুরগুলি, পাখার শব্দ শুনে, দৃশ্য স্বভাবে ফিরে যায়
এখানেও বিভীষণপুর
শ্রাবণ দেখা যায়,
শ্যামলপর্ব পেরিয়ে যাওয়ার পর
শ্রাবণের শ্রাবণতাটুকু দেখা যায় শুধু
বৃষ্টির অভিনয় ধরা পড়ে,
ধরা পড়ে ধারাশ্রাবণের শেষ ছবিগুলি…
এখানেও বিভীষণপুর,
দু’একটি ছোট গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ার মতো ললাট রয়েছে
গয়নাবড়ির গায়ে রোদ এসে লাগে
ছায়া দেয়, ছায়া পড়ে বিভীষণপুরে
প্রজাপতি রঙের বাড়িটি
নীল হয়ে যেতে থাকে প্রজাপতি রঙের বাড়িটি
যদিও বিকেলগুলি জানলা খোলার শব্দে শেষ হয় দিন
এ বাড়ির মেয়েরাও বিবাহের ইতিহাস নিয়ে কথা বলে
বিনুনি খোলার কথা, তাদের কথার ফাঁকে, ঘুরেফিরে আসে
তারা দ্যাখে, বিনুনি খোলার আগে, সন্ধের সব পোকা নীল হতে থাকে
রবিনের কথা হলে, শরীরের নীলটুকু মুছে দেয় যেভাবে রবিনা
রাত্রির কথকতা সেভাবে শোনার কথা ছিল না তাদের
বিনুনির অন্ধকারে বাতাস লেগেছে তবু আজ
হেঁসেলের শব্দগুলি অচেনা ঠেকছে তাই আবার আবার…
প্রাচ্যকাহিনি থেকে
একবার মসজিদতলা ঘুরে গেলে
স্বপ্নের মাঝখানে কারো ঘুম ভাঙে নাকো আর
তারপর সব পাখি, বিকেলবেলার মেঘ
ঘুমের ভিতরে ভেসে ওঠে-
প্রাচ্যকাহিনি থেকে বেরিয়ে এসেছে এই পাখিগুলি
মেঘরঙ পাখিগুলি সব
প্রচ্ছন্ন ধুলোর ওপর হেঁটে হেঁটে, তারা আজ
বাতাসের অনেক গভীরে ঢুকে যায়
একবার মসজিদতলা ঘুরে গেলে
মেঘরঙ পাখিগুলি
স্বপ্নের মাঝখানে ডেকে ডেকে ওঠে নাকো আর
রাত্রি ফুরিয়ে যায়
পায়ের ছবির শেষে নূপুরের ছায়া এসে পড়ে
রাত্রি ফুরিয়ে যায়, মুখে মুখে শিবাকার গল্প ফুটে ওঠে
পায়ের পাতার পর পায়ের পাথরে রোদ লাগে
পা কখনও মৃদু হয়, রাস্তার ধার দিয়ে দৃশ্য গড়ে ওঠে
চিলের ঠোঁটের থেকে ঝরে পড়ে খরকুটো, মায়া
রাস্তা দিয়ে চলে গেছে যারা সব ধানের উৎসবে
রাত্রির গভীরতা ধার করে, তারা আজ, ঘুমের শিল্প গড়ে তোলে
এই বাক্যগুলি
কোথা থেকে নেমে আসে এই বাক্যগুলি
তার শাদা, শ্বেতাভ চূড়ায় রাত্রি ছুঁয়ে থাকে
তবু কোথাও রয়েছে এই বাক্যগুলি ঘুমের নীরবে
ছবিখানি ধরা ছিল
ছবির মূর্তিখানি একইভাবে ধরা ছিল তার
এই তার অবহেলা অবযুক্তির ফাঁকে তার বেলাগুলি কাটে
তাকে দেখে মনে পড়ে, ঘর জুড়ে, সে দেখার স্মৃতি রয়ে গেছে
এখানেই অবযুক্তি, এখানেই তার স্নানের গামছাটুকু রাখা ছিল
যেভাবে বৃষ্টি মাখে গাছগুলি, তার চেষ্টাটুকু ঝরে পড়ে পাতায় পাতায়
স্নানের ভিতর
ক্রমশ পুতুল হয়ে ওঠা
ক্রমে ভাঙা, ভেঙে পড়া গানের ভিতর
স্নানের ভিতর, জল নামে, জলের শব্দ হয়
সে এক পাথর, বিপুল খাদের মুখে জমে আছে
তার ডাক, ডাকের নিয়ম, থেমে থেমে বাজে
ঘরে ঘরে, বায়ুপুরাণের প্রহর জুড়ে, ঘর জেগে থাকে
মানুষেরা মাদুর বোনার কাজে গানগুলি ব্যবহার করে
ঘরে তার হাওয়া আসে, ঘরের হাওয়ায় কেঁপে ওঠে বাঁশবনগুলি
পেতলে আঘাত লাগে, সন্ধের পূর্ণিমায়, পেতলের চাঁদখানি চোখে এসে লাগে
মানুষ গানের পাশে বসে থাকে, সব গান একা বেজে চলে…
ভুলের মাহাত্ম্যগুলি
ভুলের মাহাত্ম্যগুলি একইভাবে রয়ে গেছে
ক্রমরাত্রির কথা যেভাবে রয়েছে চেতনার অনেক গভীরে
ভুলক্রম থেকে থেকে ভ্রমের অনুপুঙ্খ হয়ে ওঠে
ভ্রম যেন ভ্রান্তির একপেশে ছায়া, সকালবেলায়
ভ্রান্তিগুলি রাত্রির, ভ্রান্তিগুলি রাত্রির রকমফের বোঝে
ছায়ার স্থাপত্য নিয়ে একটি নাটক,
অভিনয়ের আগে আগে শেষ হবে বলে রচিত হয়েছে
রচনার ক্রম আছে, মানুষের ছায়াময়তা যেভাবে রয়েছে
পথের বিভ্রমগুলি শেষ হলে, এখনো মানুষ ছায়ার স্থাপত্যে মেতে ওঠে
বেড়াল, এরকম একটি ধারণা [এক]
ছায়াকে ভীষণ ভেবে
তার থেকে দূরে থাকবার রীতি
রপ্ত  করেছে বেড়ালেরা
বিকেল পেরিয়ে গেছে
বিকেলের নিজস্ব প্রতীকগুলি রচনা করেছে যারা
চিহ্নকে অপর ভাবার প্রথা, তাদের হাসির গভীরে রয়েছে
মানুষ প্রতীক ভাঙে
চিহ্নের অপরত্বে ভেঙে যেতে থাকে তার পরিণামগুলি
বেড়ালের আজ ঠিক সেভাবে বেড়াল
দিন ও দুপুরবেলা থেকে
তাদের কিছুটা আজ নিমগ্ন মনে হল
কথার প্রচেষ্টাগুলি স্বরবর্ণে রঙিন হয়েছে, দেখা যায়
পিতার জন্ম হয়
একা এই দীর্ঘশ্বাস
একা
অতিরিক্ত ঘুমের ভিতরে
স্বপ্নপূরণের আদিমতম খসড়াগুলি দেখি
কাঠের বাদামগুলি অংশত ভেঙে যেতে যেতে
প্রপিতামহের সন্ধে হওয়া দেখি
প্রাচীনতা এভাবেই স্থিরতাকে ছুঁয়ে দিতে পারে
হাওয়ার আগে, একযোগে ডেকে ওঠে হাওয়ার মোরগ
প্রাচীর উঠেছে, হাওয়ার প্রাচীর
বংশের কলগুলি একে একে খুলে যেতে দেখি
পিতার জন্ম হয়
পিতৃত্বের হাসি
জন্মের ওপরে তার ছায়া ফেলে গেছে
আধুনিকতার ঘরবাড়ি
বিকেলের শেষে তার আধুনিকতার কথা মনে পড়ে
ঘরে ফিরে যেতে চায়, গোধূলির ঘরগুলি
হাঁসের পাখার মতো স্থির হয়ে আছে
বিকেলের শেষে, আধুনিকতার ঘরবাড়ি শূন্য পড়ে থাকে
রাস্তার চারপাশে, অনধিক মাঠের প্রান্তরে, সকালের খুঁটিনাটি
প্রতিদিন একই থেকে যায়
সে শুধু বিশ্রাম খোঁজে, বৃষ্টি ও একটি পুতুল খুঁজে যায়
তবু বিশ্বাস জুড়ে পড়ে থাকে দীর্ঘ শীতকাল
সন্ধের আলোকিত ট্রেন চলে গেলে…
আধুনিকতার পাশে তার দীর্ঘ গৃহস্থালি
সন্ধে নামে
একটি প্রসন্ন কাপ উড়ে চলে যায়