স্মৃতিকণা চক্রবর্তী > নজরুলের কোরআন ও পুরাণচর্চা >> প্রবন্ধ

0
297
[সম্পাদকীয় নোট : আজ ‘জাতীয় কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জন্মজয়ন্তী। তিনিই একমাত্র কবি যিনি মুসলিম ও হিন্দু সংস্কৃতিকে আত্মস্থ ও ধারণ করে সাহিত্যচর্চা, বিশেষ করে কবিতা ও গান লিখেছিলেন। বাংলা সাহিত্যে নজরুলের দ্বিতীয় কোনো দৃষ্টান্ত নেই। স্বশিক্ষিত নজরুল ছিলেন মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার দিক থেকে অনন্য প্রতিভার অধিকারী। এই প্রবন্ধে তিনি মুসলিম ও হিন্দু সংস্কৃতিকে কীভাবে একীভূত করে সাহিত্যচর্চা করেছিলেন, পাওয়া যাবে সেই ব্যাখ্যা। আজকে ধর্মকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে হানাহানি, অবিশ্বাস ও ঘৃণা যেভাবে বেড়ে উঠছে, সেই প্রেক্ষাপটে নতুন করে নজরুলের সাহিত্যই হতে পারে মানবিকতার আশ্রয়। এই প্রবন্ধে পাওয়া যাবে সেই ভাবনারই চকমপ্রদ ব্যাখ্যা।]
বিশ শতকের প্রাক-স্বাধীনতাপর্বের বাংলাদেশের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম এক প্রচণ্ড বিস্ময়। দেশটা যখন হিন্দু মহাসভা আর মুসলিম লীগের ধর্মান্ধতার জিগিরে তেতে উঠছে, ফুঁসে উঠছে একে অপরের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে যখন মানুষ নীলকণ্ঠ, সেই চরম দুর্দিনে নজরুল লিখছেন- “মোরা একবৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান / মুসলিম তার নয়ন-মণি হিন্দু তাহার প্রাণ।” শুধু লেখার জন্য লেখা নয়, নজরুল মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, “জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে সে জাতির নাম মানুষ জাতি / একই পৃথিবীর স্তন্যে লালিত একই রবি শশী মোদের সাথি।” ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, ‘অসাম্প্রদায়িক’ শব্দগুলো যে কারণে নজরুলের নিরিখে কেমন যেন ক্লিশে মনে হয়। সাধারণত অপরাপর ধর্মগুলোর থেকে এক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে, তুমি তোমার মতো থাকো আমি আমার মতো থাকি; ঈদে, খ্রিসমাসে, দোলে, দুর্গোৎসবে একযোগে ছুটি উপভোগ করি, এমনটাই তো তথাকথিত সাধারণ মানুষের ধর্মনিরপেক্ষতা। অথচ নিরপেক্ষ হতে গেলে যে প্রতিটি পক্ষকেই ভালো করে জানা চেনা দরকার, প্রতিটি ধর্মের মূল দর্শন এবং তথ্যগুলোকে গভীর অনুধ্যানের সঙ্গে উপলব্ধিতে গ্রহণ করা দরকার, সেটাই মনে রাখি না। ফলে ‘জাতের নামে বজ্জাতি’টা আজও রয়েই গেল। নজরুল এখানেই আলাদা। তিনি মূল থেকে জানতে চেয়েছিলেন হিন্দু মুসলমানকে, কোথায় তাদের মিল, তফাতটাই বা কোথায়। যে কারণে সামাজিক, রাজনৈতিক অন্বেষণের পাশাপাশি দুটি ধর্মের ইতিহাসকেও খুঁজে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। অতএব ইসলামি কোরআন চর্চার পাশাপাশি সমান আগ্রহে হিন্দু পুরাণ অধ্যয়নেও ডুব দিয়েছিলেন নজরুল। তারি অজস্র প্রমাণ মণি-মুক্তোর মতো ছড়িয়ে আছে তাঁর বিপুল রচনাসম্ভারে।
জন্মেছিলেন ১৮৯৯-এ বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের এক দরিদ্র মুসলমান পরিবারে, একদা তালুকদারের আভিজাত্য যাদের গায়ে লেপ্টে, কিন্তু অর্থসামর্থ্য তলানিতে ঠেকেছিল, নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। পিতা মুন্সি ফকির আহমেদ ছিলেন সাদাসিধা ভালো মানুষ। এই ভালোমানুষির খেশারতও তাঁকে দিতে হয়েছিল, জমিজমা যেটুকু ছিল সেটুকুও আত্মীয়বর্গের হাতে খুইয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পীরের দরগায় খাদেমগিরি, মসজিদে ইমামতি আর ভক্তদের বাড়ি বাড়ি মিলাদশরিফ পাঠ করে সংসারের ভাঙা নৌকোটা কোনমতে টানছিলেন, আর নজরুলের মা জাহেদা খাতুন তিনটি ছেলে সাহেবজান, নজরুল, আলী হোসেন আর একটি মেয়ে উম্মে কুলসুমকে নিয়ে কোনরকমে সেই ভাঙা নৌকার হালটা ধরেছিলেন। ফকির আহমেদ সাহেবের আরবি-ফারসির তালিম ছিল, এছাড়াও বাংলা আর উর্দু ভাষার ওপরও দখল ছিল যথেষ্ট। ফলে, সংসারে অভাব অনটন থাকলেও সন্তানদের লেখাপড়ার দিকে তাঁর নজর ছিল। মোটামুটি ইসলামি সংস্কৃতির এই পরিসরেই নজরুলের বেড়ে ওঠা। ১৯০৮ সালে নজরুল যখন ন’বছরের, মারা গেলেন পিতা ফকির আহমেদ। সংসারটা দারিদ্র্যের অকুলপাথারে আছড়ে পড়ল। বড় ভাই কিশোর সাহেবজান আসানসোলের কাছে এক কোলিয়ারিতে কাজ নিল, বসে থাকলেন না নজরুলও। গ্রামের যে মক্তব থেকে নিজে পাস করেছিলেন, সেখানেই মৌলবির পদে বহাল হলেন ছোট্ট নজরুল। মাইনে কম, কিন্তু ছাত্রদের বাড়ির থেকে সিধেতে যে চাল ডাল কলা মূলো জুটতো, তা দিয়ে কোনরকমে দিন চলত। আসলে ওটাকে চলা বলে না। ফলে এগারো বছরের নজরুলকে মসজিদের ইমাম মুয়াজ্জিন অর্থাৎ আজান-প্রদানকারীর কাজটাও নিতে হলো। পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে নামাজ আদায় করা, রোজা রাখার মতো ইসলামি ধর্মানুশীলন করতেন নজরুল। বাবাকে সারাজীবন এসবই তো করতে দেখেছিলেন তিনি। জানতেন, মসজিদের ইমাম হবার পক্ষে তাঁর বয়স আর অভিজ্ঞতা কোনটিই উপযুক্ত নয়। ফলে ভিতরে ভিতরে একটা অস্থিরতা কাজ করতো তাঁর। অতএব নিজেকে উপযুক্ত করে তোলার বাসনা আর সাধনাতে মগ্ন হলেন তিনি।
ছেলেবেলা থেকেই নজরুলের লেখাপড়ার মাথাটা খুব পরিষ্কার। তাঁর প্রথম গুরু পিতা ফকির আহমেদ। তাঁর কাছে ভাষাশিক্ষার প্রথম পাঠ অক্ষর পরিচয় হলো নজরুলের। ভর্তি হলেন পাঠশালায়। সেখানে দ্বিতীয় গুরু কাজী ফজলে আহমেদ। তিনি আরবি ফারসি উর্দু আর বাংলা- এই চারটি ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই নজরুল প্রথম আরবির তালিম নেন এবং মক্তবের পাঠ শেষ করতে করতে তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে কোরআন শরিফ পাঠ করতে শিখে যান। ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে এভাবেই সেই ছেলেবেলা থেকেই তাঁর পরিচয় গাঢ় হয়ে উঠছিল, এমনই ছিল সে পরিচয় যে পিতার মৃত্যুর পর ওই ছোট্ট কিশোরটিকে মসজিদের ইমামের পদে বরণ করতে দ্বিধা করেননি গ্রামবাসীরা। দ্বিধাটা এল নজরুলের নিজের ভেতর থেকে। তাঁর মনে হলো, গ্রামবাসীরা যে সম্মান তাঁকে দিয়েছে, তাঁকে তার যোগ্য হতে হবে। সেই কৈশোরে এমন পরিণত ভাবনা বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তিনি অন্যদের থেকে আলাদা। নজরুলের এক দূরসম্পর্কের কাকা ছিলেন নাম মুন্সি বজলে করিম। তাঁর কাছ থেকে কোরআন-হাদিসের পাঠ নিতে শুরু করলেন কিশোর নজরুল। শুধু তাই নয়, ইসলামি অনুশাসননির্ভর ধর্মকেন্দ্রিক গানও রচনা করতে শুরু করলেন তিনি। এই সময়কার কথা বলতে গিয়ে নজরুল-গবেষক ইন্দ্রজিৎ রায় লিখেছেন, “কিশোর আচার্য নজরুলের সে জীবন তখন মোল্লা প্রভাবান্বিত জীবন। বয়সে নবীন- একেবারে নেহাৎ কচি ও কাঁচা হলেও তাঁর উপর যে কাজের ভার চাপিয়ে দেয়া হয়েছে তা কচি-কাঁচাদের উপযুক্ত নয়। মসজিদের মাননীয় ইমাম তিনি; তাঁর অধীনে বহুলোক নামাজ পড়েন, ‘খুৎবা’ (ধর্ম উপদেশ) শোনেন; আসরে আসরে দুলে দুলে সুর করে তাকে মিলাদ শরীফ পাঠ করতে হয়।” অতএব চটুল গান নয়, তিনি লিখলেন, “নামাজ পড়ো মিয়া, ওগো নামাজ পড়ো মিয়া, / সবার সাথে জমায়েতে মসজিদে গিয়া, / তাতে যে নেকি পাবে বেশি / পর সে হবে খেশি / থাকবে নাকো ঘৃণা, প্রেমে পূর্ণ হবে হিয়া।” এই নজরুলই এর কিছুদিন পরে লিখছেন, “সে নামাজ আর বন্দেগীতে নাই ফল ভাইরে, / যাতে দেহের সাথে দিলের যোগ নাই রে। / মন আছে ক্ষেতে ভূঁইয়ে / তন আছে মসজিদ ছুঁইয়ে / দেহ আর দেল দূরে দূরে দুই ঠাঁই রে। / তার চেয়ে গান গাওয়া ভালো, তারে-নারে নাইরে।”
মাঝের সময়টায় কী এমন হলো যার জন্য এই একশো আশি ডিগ্রি অবস্থান পরিবর্তন নজরুলের? সেই হদিশটা না জানলে বর্ধমান জেলার কোনো এক প্রত্যন্ত অখ্যাত গ্রামের ততোধিক অখ্যাত মৌলবি মুয়াজ্জিন নজরুলের সমগ্র বাংলার চোখের তারা সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে ওঠার কাহিনিটা অসমাপ্ত রয়ে যায়।
কথায় বলে, বাইরের পৃথিবীর ডাক একবার যার কানে গেছে, ঘরের বাঁধন তার ছিঁড়বেই ছিঁড়বে। নজরুলের ক্ষেত্রেও সেটাই সত্য হলো। ততদিনে কোরআন হাদিসের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় নিবিড় হয়েছে। মুন্সি চাচার কাছে ইসলামি শিক্ষাও জোরদার চলছে। এরকমই একসময় নজরুল আবিষ্কার করলেন চাচা তো উর্দু আর বাংলায় কাব্যি করেন। এই দুই ভাষার মিশেলে এক অদ্ভুত সুন্দর কাব্য তৈরি হয়, তার নাম নাকি ‘গজল’। চাচা নিজের লেখা সেই গজলে সুর দেন! সেই সুরের মূর্ছনা নজরুলের কিশোর মনে তখন দোলা দিয়ে যায়। নজরুল আরো জানলেন চাচার সঙ্গে লেটোর দলেরও যোগ আছে। এই প্রথম বাইরের ডাক ঘরে এসে পৌঁছলো। ঘরে তখনও অভাবের হাঁ, দিন কাটে অর্ধাহারে, অনাহারে। ছোট ভাই-বোনদের না-খাওয়া মুখগুলো সদ্য কিশোর নজরুলকে যন্ত্রণা দেয়। একদিকে সংসারের অভাবের গিলতে আসা থাবা, অন্যদিকে বাঁধন-কাটা জীবনোল্লাস। মনে মনে মুক্তি চাইছিলেন কবি। তবু সংসারের দায়-দায়িত্বকে শিরোধার্য করে সবই আল্লাহতালার মর্জি বলে মেনে নিয়েছিলেন।
গাঁ গঞ্জে একদিকে তখন লেটো দলের রমরমা, অন্যদিকে ফি-সন্ধেতে চণ্ডীমণ্ডপের আসর জমে উঠছে কথকতার সুরে। হিন্দু পুরাণকেন্দ্রিক নানা কাহিনি নিয়ে লেটো দলের পালাকারেরা একদিকে গান বাঁধছেন, সুর করছেন, চলছে অভিনয়, অপরদিকে পুরাণ আর লোকপুরাণকে ভিত্তি করে চলছে কথকতা। নজরুল যেন নতুন জীবন খুঁজে পেলেন। কথকতার আসর একদিকে মন মজালো, অন্যদিকে টানতো লেটোর দল।
একদিন গ্রামের লেটোর দলে ভিড়ে পড়লেন, ঢোলটা তুলে নিলেন কোলে, সেদিন থেকেই নজরুলের জীবনের চাকাটা ঘুরে গেল। পিতা ফকির আহমেদ সাহেবের সংসারে মন ছিল না, নজরুল পিতার এই সম্পদটিকে উত্তরাধিকার সূত্রে যথেষ্টই পেয়েছিলেন। নজরুলের আশৈশব অভিন্নহৃদয় বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর নজরুলের স্মৃতিচারণায় লিখছেন, “আমি সেই নজরুলকে চিনি যে নজরুল ইকরা গ্রামের বাবুদের বাড়ি বাসন্তীপুজোর সময় ভাঙা প্রাচীরের উপর বসে যাত্রাগান শুনছে, যে নজরুল ‘লেটো’র দলে বসে ঢোল বাজাচ্ছে, যে নজরুল সুর করে রামায়ণ-মহাভারত পড়ছে। যেখানে সাধু-সন্ন্যাসী, নাঙ্গা ফকির- সেখানেই নজরুল।” বোঝা যায়, সেই ছোটবেলা থেকেই কোনরকম সংকীর্ণতা নজরুলকে গ্রাস করতে পারেনি। তাই কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি পুরাণ শিক্ষাটাও তাঁর আপনাআপনি হয়ে চলেছিল। পুরাণের সঙ্গে পরিচয়টা গাঢ় হলো লেটোর দলের সঙ্গে ঘর ছাড়ার পর। ‘লেটো’ হল যাত্রাগান আর কবির লড়াইয়ের একটা মিশ্ররূপ। এই দলের শ্রেষ্ঠ কবিকে বলা হতো ‘গোদাকবি’। নজরুলের মধ্যে প্রতিভার ঝলক দেখে তাদের গ্রামের গোদাকবি তখনই নজরুলকে শ্রেষ্ঠ কবির পদমর্যাদা দিয়েছিলেন।
প্রমথ চৌধুরী তাঁর এক প্রবন্ধে একদা লিখেছিলেন, “শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। সুশিক্ষিত লোকমাত্রেই স্বশিক্ষিত।” নজরুল এমনই এক ‘স্বশিক্ষিত’ মানুষ। ইসলামি সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ পারিবারিক সংস্কৃতিচর্চা থেকে অর্জিত, রুজির টানটাও ছিল সেখানে। কিন্তু হিন্দু পুরাণ, উপপুরাণ ও মহাকাব্যপাঠ এবং চর্চা নজরুলের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাজাত। কি গভীর অভিনিবেশে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রয়াসে তিনি যে সংস্কৃত ভাষা অধ্যয়ন করেছিলেন তার প্রমাণ তাঁর তেইশ বছরের সারস্বত জীবনের হাজারো লেখাজোখায় ছড়ানো আছে।
১৩২৮ সালে ‘বিজলী’ পত্রিকায় নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে যে শোরগোল উঠেছিল, সে প্রসঙ্গ বহু আলোচিত। এমন কবিতা বাংলাদেশ কখনো লেখা হয়নি। এই কবিতার বিষয়, কবিতার আঙ্গিক, কবিতার ছন্দ, তার আরবি-ফারসি-উর্দু-বাংলা মিশ্রিত
শব্দপ্রয়োগ- সবি হয়ে উঠল আলোচনার বিষয়। যে-বিষয়টি একটু উপেক্ষিত থেকে গেল, সেটি হলো কবিতাটিতে নজরুলের কোরআন ও পুরাণের অসমান্য প্রয়োগকেন্দ্রিক আলোচনা। অবশ্য কবিতাটিতে পুরাণের প্রয়োগ বেশি বলে মুসলিম সমাজে যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছিলেন কবি, তবু একথা মানতেই হয় যে, এই ‘বিদ্রোহী’-তে তিনি কোরআন ও পুরাণে তাঁর অগাধ জ্ঞানের চিহ্ন রেখে গেছেন।
‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম স্তবকে ‘ভূলোক দ্যুলোক গোলক’-এর পরেই তিনি লিখেছেন ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া’। হিন্দুপুরাণ অনুসারে গোলকে ভগবান বিষ্ণুর অধিষ্ঠান, অন্যদিকে কোরআনে (সূরা রা’দ ১৩:২) আরশকে আল্লাহর সিংহাসন বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই কবিতায় তিনি মহাদেবের নানারূপের উল্লেখ করেছেন- নটরাজ, ধুর্জটি, ব্যোমকেশ, ঈশান, পিনাকপাণি এবং প্রতিটি রূপই যথার্থভাবে ব্যবহৃত। “মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস”- পুরাণে আছে, বিশ্বধ্বংসের কালে তাণ্ডব-নৃত্যরত মহাদেবের রূপকে নটরাজ বলা হয়। আবার নজরুল লিখেছেন, “আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।” ব্যোমকেশ অর্থাৎ আকাশ যাঁর কেশ। স্বর্গ থেকে গঙ্গাবতরণ-কালে শিবের জটাসমূহ আকাশময় ব্যপ্ত হয়ে পড়ে, সে কারণে শিবের আরেক নাম ব্যোমকেশ। এখানে গঙ্গার প্রসঙ্গ এনেছেন বলে শিবের ব্যোমকেশ নামটিকে ব্যবহার করেছেন কবি। এনেছেন সমুদ্রমন্থনজাত বিষ পান করে মহাদেবের ‘কৃষ্ণ-কণ্ঠ’ হবার অনুষঙ্গ। তিনি আগের চরণে যদি লেখেন, ‘আমি বজ্র, আমি ঈশানবিষাণে ওঙ্কার’, তো পরের চরণে লেখেন ‘আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার’। লক্ষণীয়, প্রথম চরণে তিনি ইন্দ্রের প্রধান অস্ত্র বজ্রের কথা বলেছেন। ঈশান অর্থে একশত রুদ্রের অন্যতম। তার আহ্বানে অশুভ শক্তিকে বজ্রাঘাতে ধ্বংস করে ইন্দ্র। একইভাবে, ইস্রাফিল হলেন চারজন ফেরেশতার অন্যতম, যিনি শিঙ্গায় ফুঁ দিলে সেই মহাহুঙ্কারে কেয়ামত ঘনিয়ে আসে। সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে হাতে শিঙ্গা নিয়ে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় তিনি আছেন। নজরুল লিখেছেন-
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া স্বর্গ-মর্ত্য করতলে,
তাজী বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার হিম্মত-হ্রেস্বা হেঁকে চলে!
ইসলাম-মতে বোররাক হল সেই অশ্বসদৃশ বাহন যার উপর সওয়ার হয়ে মিরাজের রাতে হযরত মুহম্মদ (স) আল্লাহর আরশে গিয়েছিলেন, আর পুরাণ মতে, সমুদ্রমন্থনকালে সমুদ্র থেকে যে শ্বেতঅশ্ব উঠেছিল, দেবরাজ ইন্দ্র তাকে গ্রহণ করেন। এখানেই কবি বলছেন, “ধরি বাসুকির ফণা জাপটি, / ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি!’ পুরাণ মতে বাসুকি হলেন নাগরাজ। মহর্ষি কশ্যপ ও দক্ষকন্যা কদ্রুর জ্যেষ্ঠপুত্র ইনি। সমুদ্রমন্থনকালে দেবতারা বাসুকিকে মন্থনরজ্জু হিসেবে ব্যবহার করেন। এখানে সেই অনুষঙ্গকেই এনেছেন কবি। অন্যদিকে জিব্রাইল হলেন সেই ফেরেশতা যিনি আল্লাহর দূত হয়ে নবীদের কাছে ওহি অর্থাৎ আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন। কবি অর্ফিয়াসের বাঁশরির পাশেই শ্যামের হাতের বাঁশরি বাজিয়েছেন। সপ্ত নরকের পাশেই এনেছেন হাবিয়া দোজখের কথা। এভাবেই কোরআন-পুরাণ সহাবস্থানের এক স্মারক হয়ে উঠেছে তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি।
এই কবিতার ছত্রে ছত্রে নজরুল যেভাবে পুরাণের প্রাসঙ্গিক ব্যবহার করেছেন, তা বাংলা কবিতার আসরে একমেবাদ্বিতীয়। কখনো পরশুরামের কঠোর কুঠার, কখনো বলরামের কাঁধের হাল, আবার কখনোবা বিদ্রোহী ভৃগুর উল্লেখে চমকে দিয়েছেন পাঠককে।
জীবনের যে কয়টি বছর সুস্থ ছিলেন, সবসময় হিন্দু মুসলমানের এই সম্মিলিত সংস্কৃতির সমন্বয়ের সাধনা করে গেছেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’র রক্তাম্বরধারিণী মা, আগমনী বা ধূমকেতুর মতো কবিতায় যেমন পূরণের প্রসঙ্গ এনেছেন, তেমনি খেয়াপারের তরণী, কোরবানী, মোহররম কবিতায় ইসলামি সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন। কাব্যগ্রন্থ ‘বিষের বাঁশি’তেও একই ছবি। ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ-দহম’ কবিতায় কবি বলেছেন,- “ঈশানে কাঁপিছে কৃষ্ণ নিশান, ইসরাফিলের ও প্রলয় বিষাণ আজ / কাতরায় শুধু! গুমরিয়া কাঁদে কলিজা-পিষানো বাজ! / রসুলের দ্বারে দাঁড়ায়ে কেন রে আজাজিল শয়তান? / তাঁর বুক বেয়ে আঁশু ঝরে, ভাসে মদীনার ময়দান।” আবার সংস্কৃত তোটক ছন্দে লেখা ‘জাগৃহি’ কবিতায় বলছেন, “হর হর হর শংকর হর হর বোম- / একী ঘন রণ-রোল ছায়াচরাচর ব্যোম। / হানে ক্ষিপ্ত মহেশ্বর রুদ্র পিনাক, / ঘন প্রণব-নিনাদ হাঁকে ভৈরব হাঁক।”
১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘কাব্য আমপারা’। কোরআনের অনুবাদে হাত দিয়েছিলেন নজরুল। ৩০টি পর্যায়ে বিন্যস্ত কুরআনে সূরার সংখ্যা ১১৪। নজরুল তার মধ্যে ৩৮টি অনুবাদ করেছিলেন। বইটির ভূমিকা ‘আরজ’ অংশে কবি লিখছেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাধ ছিল পবিত্র কোরআন শরিফের বাংলা পদ্যানুবাদ করা। … কোরআন-পাঠের একটি শব্দ এধার ওধার না করে তার ভাব অক্ষুণ্ণ রেখে কবিতায় সঠিক অনুবাদ করার মতো কাজ আর দ্বিতীয় আছে কিনা জানিনে।” এই কাব্যটির তিনটি সংস্করণ হয়েছিল।
এরই পাশে ‘গীতি-শতদল’, ‘বন-গীতি’, ‘গানের মালা’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে আবার পুরাণ-নির্ভরতা বেশি। নজরুলের লেখা কৃষ্ণের ব্রজলীলাকেন্দ্রিক কবিতা ও গান আজও প্রবল জনপ্রিয়। ‘গোঠের রাখাল বলে দে রে কোথায় বৃন্দাবন’, ‘ব্রজগোপী খেলে হোরি’, ‘মাধব বংশীধারী বনওয়ারী গোঠচারী’, ‘যমুনা-কুলে মধুর মধুর মুরলী সখী বাজিল’, ‘ফিরে আয় ভাই গোঠে কাছে’, ‘সখী, যায়নি তো শ্যাম মথুরায়’, ‘কালা এত ভাল কি হে কদম্বগাছের তল’- অপূর্ব সেসব কবিতা। নজরুল এরই পাশে লিখেছেন অজস্র শ্যামা সংগীত- ‘শ্যামা তুই বেদেনীর মেয়ে’, ‘রাখ রাখ রাঙা পায়’, ‘মহাকালের কোলে এসে গৌরী হলো মহাকালী’, অথবা ‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন’। শ্যাম আর শ্যামাকে নিয়ে এমন হাজারো গান বেঁধেছিলেন কবি।
ইসলামি সংগীত রচনাতেও স্বাভাবিকভাবেই নজরুল ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ‘বন-গীতি’ কাব্যের দ্বিতীয় সংস্করণে প্রচুর ইসলামি গীতি সংযোজিত হয়। যেমন- ‘নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া’, ‘সেই রবিউল আউয়ালের চাঁদ’, ‘হে মদিনার বুলবুলি গো’, ‘পাঠাও বেহেশত হতে’, ‘মোহাম্মদ নাম যতই জপি’, ‘মোহাম্মদ মোর নয়ন-মণি’।
মুড়ি-মিছরির মতো গান আর কবিতা লিখতেন নজরুল। ঠিক যেন এক মেশিন, ফরমায়েশ এল কি হাজির। কবি জসীম উদদীন নজরুল প্রসঙ্গে লিখছেন,”আমি দেখিয়াছি গ্রামোফোন কোম্পানিতে নানান রকমের গানের হট্টগোলের মধ্যে কবি বসিয়া আছেন- সামনে হারমোনিয়াম- পাশে অনেকগুলি পান, আর গরম চা। ছ’সাতজন নামকরা গায়ক বসিয়া আছেন কবির রচনার প্রতীক্ষায়- একজনের চাই শ্যামা সংগীত, অপরজনের কীর্তন, একজনের ইসলামি সংগীত, অন্যজনের ভাটিয়ালি গান- আরেকজনের চাই আধুনিক প্রেমের গান। এঁরা যেন অঞ্জলি পাতিয়া বসিয়া আছেন। কবি তাঁহার মানসলোক হইতে সুধা আহরণ করিয়া তাহাদের করপুট ভরিয়ে দিলেন।” সীমাহীন এই প্রতিভার তল পাওয়া দুঃসাধ্য, পাণ্ডিত্যের তল খুঁজতে যাওয়া নির্বুদ্ধিতা। প্রাণপ্রাচুর্যে টইটম্বুর কবির অমিত জ্ঞানতৃষ্ণা তাঁকে পৌঁছেও দিত প্রার্থিত গুরুর কাছে, অথবা গুরুই খুঁজে নিতেন তাঁকে। নিজের চেষ্টায় জ্ঞানভাণ্ডারের চাবিটি খুঁজে নিয়েছিলেন তিনি। ঘর ছেড়েছিলেন কবি, তাই রানিগঞ্জ সিয়ারসোল স্কুলের ফারসি শিক্ষক হাফেজ নূরন্নবীর কাছে ফারসি সাহিত্যের পাঠ নজরুলের আকাশ-খোঁজা মনটাকে ভরিয়ে দিয়েছিল। এরপর ম্যাট্রিক পরীক্ষা না দিয়ে যখন করাচির ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে গিয়ে পৌঁছলেন কবি, সেখানেও পেয়ে গেলেন ফারসি সাহিত্যে সুপণ্ডিত এক পাঞ্জাবি মৌলবি সাহেবকে। তাঁর কাছেই নজরুলের যথার্থ ফারসি সাহিত্যানুশীলন সম্পূর্ণ হল। নজরুলের নিজের কথায়- “সে আজ ইংরেজি ১৯১৭ সালের কথা।… আমাদের বাঙালি পল্টনে একজন পাঞ্জাবি মৌলবী সাহেব থাকতেন। একদিন তিনি দিওয়ান-ই-হাফিজ থেকে কতকগুলি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। শুনে আমি এমন মুগ্ধ হয়ে যাই যে সেইদিন থেকেই তাঁর কাছে ফারসি ভাষা শিখতে আরম্ভ করি।’ সত্যি বলতে জীবন থেকেও কম পাঠ নেন নি নজরুল। মৌলবিগিরি, মুয়াজ্জিনগিরি থেকে লেটোর দল ঘুরে রানিগঞ্জে খ্রিস্টান রেলগার্ডের বাড়িতে বাবুর্চিগিরি, রুটি-কারখানার শ্রমিক থেকে চায়ের দোকানের বয়গিরি, তারপর ফ্রন্টিয়ারে সৈনিকের জীবন- প্রতিটি অভিজ্ঞতাই নজরুলকে ঋদ্ধ করেছে আর জীবনবীক্ষণকে সম্পূর্ণ করেছে। এমনকি পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর পর যখন তিনি তন্ত্রাচারের দিকে ঝুঁকে লালগোলার বিখ্যাত তন্ত্রাচার্য বড়দা মজুমদারের কাছে ক্রিয়াযোগ শিখতে গেলেন, সেও তো এক অন্বেষণ। এভাবেই নজরুলের স্বশিক্ষার অভিযান চলেছিল, কোরআনে এবং পুরাণে, ইসলাম এবং তন্ত্রে।