হাইকিং-ভ্রমণ [পর্ব ৪] > মঈনুস সুলতান >> সিপ্লেনে কাসকেইড রেঞ্জ অব্দি উড়ে যাওয়া

0
151

এই প্রথম হাইকিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেন মঈনুস সুলতান


 

সারা পৃথিবীর উঁচু পাহাড়গুলির অন্যতম হচ্ছে ওয়াশিংটনের মাউন্ট রেনেয়ার। এই পাহাড়েই ভ্রমণ করছেন মঈনুস সুলতান।  পড়ুন এই পর্বে ভ্রমণের সিপ্লেনে রোমাঞ্চকর ভ্রমণের কথা। পরে আসছে আরো কয়েকটি পর্ব। 
মাউন্ট রেনেয়ারের তুষারাবৃত চূড়া
“আমি নীলাভ আকাশের প্রেক্ষাপটে স্বচ্ছ তুষারের শুভ্রতায় আমাদের সিপ্লেনের পরিষ্কার প্রতিফলন দেখি। মাইক্রোফোনে আবার পলের ভয়েস, ‘তামাম দুনিয়ার একুশটি পাহাড়ের অন্যতম- মোট ১৩,২১১ মিটার উঁচু মাউন্ট রেনেয়ার হচ্ছে ওয়াশিংটন রাজ্যের সবচেয়ে উঁচু পর্বত।’…”

মাউন্ট রেনেয়ার ও রত্নময় রঙধনু ট্রাউট
সিপ্লেনে কাসকেইড রেঞ্জ অব্দি উড়ে যাওয়া

শুকতারার কল্কঙকার নামের বুড়ো শেভ্রলে গাড়িটি সিয়াটল শহরের কাছাকাছি টাকোমা ফেরিঘাটে এসে থামে। আমি ও স্কারলেট নীরবে নেমে যাই। সকাল থেকেই মুড অফ হয়ে আছে, তাই এই যে মাইল পঞ্চাশেক ড্রাইভ করে আমাদের লিফ্ট দিয়ে শুকতারা নামিয়ে দিলেন, তাকে থ্যংক-ইউ বলার মতো মেজাজও আমাদের ছিলো না। মাউন্ট রেনেয়ারে হাইক করার প্রিপারেশনের বিষয়টা আমার ঠিক মাথায় ঢুকছে না। সাতসকালে স্কারলেট তাঁবুর টিউবের মতো ব্যাগটি আমার হাতে দিয়ে বলে- খুলে চেক করে দেখো এতে সবগুলো শিক্, জিপারের চেইন ইত্যাদি কাজ করছে কিনা? আমার ওপর এ কাজ গছিয়ে দিয়ে সে টাইটস্ পরে রোদে মাদুর পেতে ইয়োগা করতে শুরু করে। আমি জিন্দেগিতে কখনো তাঁবু খাটাইনি, তাই তা খুলতে গিয়ে নানা আকারের শিক, ডান্ডা ও দড়িতে তালগোল পাকিয়ে ঠিক বুঝতে পারি না কি করবো? সমস্যাটি তাকে বলি। সে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না। মাথা ও কাঁধের উপর ভর দিয়ে দু’পা আসমানের দিকে তুলে বিচিত্র কোন আসনের ভঙ্গি করতে করতে স্কারলেট অতঃপর বলে, ‘ও-কে, টেন্ট আমি পরে চেক করবো। তুমি হাইকিংয়ে তোমার কী কী লাগবে তার একটি চেকলিস্ট করো ফেলো।’ কিন্তু মূল হাইকিংয়ে তো যাওয়াই হলো না, না গেলে বুঝবো কিভাবে কখন কি ঘোড়ার ডিম লাগবে? ইয়োগা খালাস হতে না হতেই কল্কঙকারে সওয়ার হয়ে টাকোমা ফেরীঘাটে আসা কেন? মাউন্ট রেনেয়ার তো এদিকে না। তবে আমরা আজ যাচ্ছি কোথায়? খুব কনফিউশন নিয়ে গাড়িতে ঝিম ধরে বসে ছিলাম।
একটু ঝিমানির মতো আসছিলো। মনে হচ্ছিলো- আমাদের মামার বাড়ি ফুলবাড়ি গ্রামে চলে গেছি। ছোটবেলা মন খারাপ হলে মামাবাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে যেতাম পাশের জঙ্গলাকীর্ণ টিলায়। কালচে রঙের পাষাণের গায়ে শত ছিদ্রওয়ালা চোখপাথর বলে এক আগ্নেয়শিলার উপর বসে তাকিয়ে থাকতাম, টিলার হাশিয়ায় খোঁড়া শিয়ালের গর্তের দিকে। গুহার চারদিকে সদ্য খোঁড়া লালচে গোলাপি ও সোনালি রঙের মাটি। মাঝেমাঝে একটি বাচ্চা শেয়াল গুহা থেকে উঁকি দিয়ে আমাকে দেখতো। তারপর হাঁটতে হাঁটতে ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে চলে যেতাম লোহার লাল-পুলের কাছাকাছি। নিচে বিলের থির জলে কচুরিপানার থোকা থোকা বেগুনি ফুল। মাছ ধরার বাঁশের ত্রিকোণা জালের কাঠামোর নিচে বাঁধা মামাবাড়ির মাঝি মতলিব ভাইয়ের নৌকা। বিলের নির্জনতায় তার পাটাতনে শুয়ে তাকিয়ে থাকতাম, উপরে লাল-পুলটির কাঠামোর দিকে। তার নিচের সিমেন্টের পলেস্তারায় একটি বোলতা মৃদু গুঞ্জনে চাক বাঁধতো।
গ্যাস-স্টেশনে পেট্রল নেয়ার জন্য কল্কঙকারটি থামে। স্কারলেট নেমে যায় পে-ফোনে কয়েন ফেলে পল বলে এক পাইলটের কাছে টেলিফোন করার জন্য। তা হাইকিংয়ের সাথে পাইলটের সম্পর্ক কি? তাঁবু চেক করতে ব্যর্থতা ও হাইকিংয়ের প্রিপারেশনের অন্ধিসন্ধি বুঝতে না পারার গ্লানি যেন বোলতার মতো গুঞ্জন করে মগজের কোষে বাঁধছে বাসা। এ-ট্রিপে আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। ইচ্ছা হয় টিলার পাশে নির্জনে চোখপাথরের উপর বসে শুনি ঝিঁঝির ডাক।
তো ঘাটে এসে ফেরির ঝাঁ-চকচকে বিশাল জাহাজ দেখে বেশ অবাক হয়ে তাতে সওয়ার হই। নীরবে তিনতলার ডেকে উঠলে স্কারলেট বলে, ‘কাম, লেটস্ লুক অ্যাট দ্য ওয়াটার টুগেদার। মে বি উই উইল সি সাম ডলফিনস্ জামপিং।’ ডেকের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পিজিট-সাউন্ডের পানিতে ডলফিনের নৃত্য দেখতে আমার ইচ্ছা হয় না একেবারে। আমি পেছনের দিকে সেঁধিয়ে অন্ধকার এক বেঞ্চে বসতে বসতে বলি, ‘আই ডোন্ট থিংক আই ওয়ান্ট টু হাইক মাউন্ট রেনেয়ার এনি মোর। আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। হাইকিং আর করবো না। লেট মি গো ব্যাক হোম।’ স্কারলেট খুব খুঁটিয়ে তাকিয়ে আমার ভেতরে কী হচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করে বলে, ‘আই হোপ ইউ উইল চেঞ্জ ইয়োর ডিসিশন। আমরা এখন একটি দ্বীপে যাচ্ছি। উই উইল ডু সামথিং টুগেদার অ্যান্ড আই অ্যাম শিওর ইউ উইল লাইক ইট।’ আমরা একত্রে দ্বীপে আজ কী করবো তার বিস্তারিত বিররণ না দিয়ে সে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখে রহস্যময় হাসি। বুঝতে পারি সামনে খানিক সারপ্রাইজ আছে, তাতে আমার মেজাজ আবার খাট্টা হয়ে ওঠে।
ফেরি থেকে দ্বীপে নেমে আমরা সামান্য হেঁটে চলে আসি নীলাভ এক লেগুনের সামনে। ওখানে কাঠের জেটির পাশে জলে ভাসমান শৌখিন বৈমানিক পলের সাদা ডানার প্রান্তে লাল রঙের রেখা-টানা ছোট্ট সি-প্লেন। স্কারলেটকে পল উচ্ছ্বসিত হয়ে ‘ওয়ান্ডারফুল টু সি ইউ ডারলিং’ বলে জাপটে ধরে চুমো খায়। অযত্নে বর্ধিত খয়েরি রঙের দাড়িওয়ালা পাইলট শর্টস্ পরে কী সব যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। সে আমাকে ‘ওয়েলকাম জেন্টেলম্যান’ বলে গ্রীট করে। তারপর স্কারলেটকে তার হাতের সেলুলার ফোন দেখিয়ে বলে, ‘এ টেলিফোনটি মাত্র বাজারে এসেছে, এতে কর্ড-ফর্ড কিছুর ব্যবহার নেই একেবারে। আমি সিপ্লেন নিয়ে স্কাউট করে দেখি, সমুদ্রের কোথায় ভাসছে ঝাঁক বাঁধা মাছের স্কুল। তারপর এ ইনফরমেশন বিক্রি করি মাছধরা ট্রলারদের কাছে। এখন থেকে আর জলে ল্যান্ড করে ভাসমান ট্রলারকে খবর জানাতে হবে না। এই সেলুলার ফোন থেকেই তাদেরকে রিং করা যাবে।’ সে স্কারলেটকে ফোন দিয়ে টেস্ট ফোন করে দেখতে বলে। স্কারলেট তার জানাশোনা কাউকে রিং করলে ওপাশ থেকে অ্যানসারিং মেশিনের ভয়েস শোনা যায়। তাই সে ফোন রেখে পলের সাথে কাজের কথায় আসে। পল দেড়শ-দেড়শ মোট তিনশ ডলারের বিনিময়ে সিপ্লেনে আমাদের জয়-রাইড দিতে রাজি হয়। টাকা গুনে নিতে নিতে সে বলে, ‘ইউ গাইজ গিভ মি হাফ-এন-আওয়ার, আমি ট্যাংকিতে ফুয়েল ভরে নেই, দেন উই উইল ফ্লাই স্ট্রেইট।’
জেটি ছেড়ে আমরা সময় কাটানোর জন্য লেগুনের পাড় ধরে হাঁটি। এদেশে আসার পর আমি ইউনিভারসিটির অ্যাডাল্ট এডুকেশন প্রগ্রামে মাত্র হপ্তা কয়েক কাজ করেছি। আমার হাতে সঞ্চয় খুবই সল্প। স্কারলেটের সাথে আমি এ ট্রিপের কস্ট শেয়ার করছি। আরো দেড়শ ডলার ব্যয় হবে- এই ভাবনা করোটিতে বিষাক্ত বোলতার মতো গুঞ্জন করে। কীভাবে যেন আমার দুশ্চিন্তা আঁচ করতে পেরে সে হাত ধরে বলে, ‘লুক অ্যাট মি। আমি জানি হানড্রেড অ্যান্ড ফিফটি ডলার ইজ আ লট অব মানি ফর ইউ। তোমাকে কিন্তু জয়-রাইডের কোন কস্ট্ শেয়ার করতে হবে না। এটা আমার আইডিয়া, সুতরাং এ খরচ আমি তোমাকে গিফ্ট হিসাবে দিচ্ছি। উইল ইউ নট অ্যাকসেপ্ট দিস?’ আমি আজকে প্রথমবারের মতো তার দিকে গাঢ় চোখে তাকাই। সবুজ স্কার্টের সাথে ম্যাচ করে সে মাথায় স্কার্ফ পরেছে। লেগুনের লিলুয়া বাতাসে তার চূর্ণকুন্তলের পাশে খেলা করে কচি কলাপাতার তাজা রঙ। ইচ্ছা হয় তার খুব কাছে যেতে, কিন্তু কোথায় যেন বাধো বাধো ঠেকে, তাই নামিয়ে নেই চোখ।
সে পাড়ে বসে পানি ছুঁয়ে বলে, ‘লেটস্ চেক দ্য ওয়াটার, আগের বার আমি যখন পলের সিপ্লেনে জয়-রাইড নিয়েছিলাম, ঠিক টেকঅফের আগে জলে ভেসে উঠেছিল তিনটি সিলমাছ।’ পায়েসের বাটিতে পোকা পড়ে যাওয়ার মতো মনে ধক করে উঠে- স্কারলেট কার সাথে ফ্লাই করেছিলো? ‘লুক্, হাউ লাকি আই অ্যাম টুডে,’ বলে সে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আমি দেখি, লেগুনে ভাসছে কয়েকটি সিন্ধুঘোটক। সে বাচ্চা মেয়ের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে বলে, ‘দেয়ার আর সেভেন সী-হর্সেস, আমি তো নেপচুনের জাতিকা, সেভেন ইজ মাই লাকি নাম্বার। উই উইল এনজয় দ্য রাইড টু-ডে।’ কোথায় যেন কী হয়ে যায়, আর তার তাড়নে আর্দ্র হয়ে ওঠে আমার ভেতরটা। আমি মৃদু স্বরে বলি, ‘আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট স্কারলেট… টু মেক দিস রাইড এনজয়এবোল।’ গাঢ়ভাবে তাকিয়ে কী যেন পরখ করে সে খুশি হয়ে আমার দিকে তুলে ধরে তার মুখ। মনে হয় তার জোড়া ঠোঁট যেন ফুটে উঠেছে ফুলের পাপড়ির মতো। আমার হৃৎপিন্ডে দীপ্ত হয়ে ওঠে প্রজাপতি-প্রবণ বাসনা।
জেটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো শর্টস-টিসার্ট পরা পাইলট পল। তার পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে তেলকালি মাখা ছোট্ট তোয়ালে। রোদচশমার সাথে উস্কোখুস্কো চুলে লাল পট্টি বেঁধেছে, তাই তাকে শ্লোগানে রাজপথ সরগরম করা বিপ্লবীর মতো দেখায়। সে খুব উষ্ণভাবে ‘ইয়োর হোম মাস্ট বি ক্লোজ টু হিমালায়াজ’ বলে আমাকে হাত ধরে সিপ্লেনে তুলে দেয়। তারপর স্কারলেটের কোমরে হাত দিয়ে গালে চুমো খেতে খেতে বলে, ‘থ্যাংকস মাই প্রিটি গার্ল ফর ব্রিংগিং সামওয়ান ফ্রম ওরিয়েন্ট।’ তাদের অন্তরঙ্গতা দেখে আবার যেন আমার পায়েসের বাটিতে টুপ করে পড়ে কালো চটচটে একটি পোকা। মাইক্রোফোন কানে লাগিয়ে মুখ আমসি করে সিপ্লেনের সিটে বসি।
গুলিখাওয়া রাজহাঁসের মতো নীল জল তোলপাড় করে প্রশান্ত মহাসাগরের পিজিট-সাউন্ডের ঢেউয়ে মুখ তুবড়ে পড়তে পড়তে সিপ্লেন টেকঅফ করে। মিনিট তিনেকের মাঝে দেখি, আমরা উড়ে যাচ্ছি ছোট্ট দ্বীপটির প্রান্ত ঘেঁষে। নিচে সামুদ্রিক চ্যানেলে ভাসছে অনেকগুলো বোট, জেটিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছে লোকজন। আমাদের নিয়ে আসা ফেরি জাহাজটিকে দেখি- ফিরে যাচ্ছে মেইনল্যান্ডের ট্যাকোমা ঘাটে। নিচু হয়ে কিছুক্ষণ পাইনবনের উপর দিয়ে উড়ে আমরা চলে আসি পাথরের খয়েরি লালচে পাহাড়ের উপর। নিচে পাষাণ কুঁদে চলমান জলের চালচিত্র এঁকে ছুটছে নিসকোয়ালি নদী পিজিট-সাউন্ডের দিকে। মাইক্রোফোনে ভেসে আসে পাইলট পলের ধারা বিবরণী, ‘মাউন্ট রেনেয়ারের সাদার্ন স্লোপের তুষারময় গ্লেসিয়ারে জন্ম এ-নদীর। মূল পর্বত থেকে পিজিট-সাউন্ড অব্দি এর দীর্ঘতা মোট ৮১ মাইল।’ নদী অতিক্রম করতেই আমরা দেখতে পাই মাউন্ট রেনেয়ারের তরঙ্গময় প্রোফাইল। পলের বাচনে, ‘ইউরোপীয় অভিযাত্রিকদের মধ্যে কাপ্তেন জর্জ ভ্যানকুভার ১৭৯২ সালে পিজিট সাউন্ড দিয়ে পাল তুলে ভেসে যাওয়ার সময় জাহাজের ডেক থেকে পয়লা মাউন্ট রেনেয়ারের তুষারময় সুরত দেখেন। তখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ফ্লিটের রিয়ার অ্যাডমিরাল ছিলেন পিটার রেনেয়ার। পরে তার নামেই এ-পাহাড়টি দুনিয়াজোড়া পরিচিতি পায়।’ সিপ্লেন স্পষ্টত মেঘের স্তর অতিক্রম করে উঠছে আসমানের অনেক উঁচুতে। দু’কানে মাধ্যাকর্ষণের অস্বস্তিকর অনুভূতি হতেই দেখি, যেন জাদুবলে আমরা চলে এসেছি একদম মাউন্ট রেনেয়ারের সামিটের উপরিভাগে।
নিচে পুঞ্জপুঞ্জ মেঘের বর্ণাঢ্য বারিদ-বহরে ভাসছে তুষারের শ্বেতশুভ্র আচানক স্থাপত্য। স্কারলেট পাশ থেকে আমার হাত তার মুঠোয় তুলে নেয়। আমি নীলাভ আকাশের প্রেক্ষাপটে স্বচ্ছ তুষারের শুভ্রতায় আমাদের সিপ্লেনের পরিষ্কার প্রতিফলন দেখি। মাইক্রোফোনে আবার পলের ভয়েস, ‘তামাম দুনিয়ার একুশটি পাহাড়ের অন্যতম- মোট ১৩,২১১ মিটার উঁচু মাউন্ট রেনেয়ার হচ্ছে ওয়াশিংটন রাজ্যের সবচেয়ে উঁচু পর্বত।’
প্রবলবেগে ঝাঁকুনিতে চিন্তাভাবনাকে তছনছ করে দিয়ে পর্বতশ্রেণি ও উপত্যকা অতিক্রম করে সিপ্লেন উড়ে আসে বিপুল এক প্রান্তরের ওপর। নিচু হয়ে ঘাসে মুখ দেয়া এল্ক বলে শিঙ্গাল হরিণের ঝাঁকে হুলুস্থূল বাঁধিয়ে বাঁক নিতে নিতে পল জানায়, ‘দিগন্তে দেখা যাচ্ছে যে শুভ্র ত্রিভুজ- সেটা হচ্ছে মাউন্ট বেকার, তার ওপারে গ্লেসিয়ার পিক বলে আরেকটি পর্বত। স্যরি, এই ছোট্ট সিপ্লেনের তাকদ কম, ওদিকে অত দূর যাওয়া যাবে না, ফুয়েলে কুলাবে না।’ খুব জোশে আরেকটি পর্বতশ্রেণি অতিক্রম করতে সিপ্লেন একটু উপরে উঠে। আমরা এবার অন্যপাশে পরপর বেশ কয়েকটি তুষারময় পাহাড়ের আবছা মতো রূপরেখা দেখতে পাই। প্রপেলারে মেঘ কাটতে কাটতে আবার মাইক্রোফোন সজীব হয়, ‘এ পর্বতশ্রেণিকে বলা হয় কাসকেইড রেঞ্জ। ওয়াশিংটন রাজ্য থেকে অরিগান হয়ে নর্থ ক্যালিফোর্নিয়া অব্দি বিস্তৃত যুক্তরাষ্ট্রের লংগেস্ট রেঞ্জ অব ভলকানিক মাউন্টেইনস্।’ মেঘের পর্দা দূরে সরে গেলে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার সূর্যালোকে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাই, ফাঁকা মাঠে দাঁড়িয়ে আছে পরপর মাউন্ট সেন্ট হেলেনস্, মাউন্ট অ্যাডামস্ ও মাউন্ট হুড।
উলুল-ঝুলুল বাতাসে সিপ্লেন ভয়ানক দোলে। নিচে তরঙ্গময় এক সরোবরে ভাসছে হাজার বিজার আস্ত গাছ। পাড়ে মাউন্ট সেন্ট হেলেনস থেকে গড়িয়ে নেমে এসেছে তাজা লাভাস্রোত। এ-পাহাড়ে বছর কয়েক আগে অগ্নুৎপাতের সাথে ভয়ংকর ভূমিকম্পে ফুটহিলসের আস্ত এক বনানীর তাবৎ গাছপালা সমূলে উৎপাটিত হয়ে উড়ে এসে পড়ে লেকের জলে। সিপ্লেন মাউন্ট সেন্ট হেলেনসের কাছাকাছি উড়ে আসে। আমরা একই সরলরেখায় মাউন্ট রেনেয়ারের সামিটকে ফের দেখতে পাই। মাইক্রোফোনে পল আবার সবাক হয়ে বলে যায়, “রবিবারের খুব সুন্দর এক সকালে আমি সিয়াটল এয়ারপোর্ট থেকে বোয়িং ৭২৭-এ চড়ে ফ্লাই করছি অরিগান রাজ্যের পোর্টল্যান্ডের দিকে। গেল পুরা হপ্তা জুড়ে লকেল নিউজপেপারে মাউন্ট সেন্ট হেলেনসের ভেতরকার ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির সক্রিয় হয়ে ওঠার সংবাদ ছাপা হচ্ছে। এ-পর্বতে ক্রমাগত ট্রেমার হচ্ছে, কিছুক্ষণ পরপর আশপাশ কেঁপে উঠছে হাল্কা ভূমিকম্পে। ক্রেইটারের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে গ্যাস। এসব খবরের কথা ভেবে মাউন্ট হেলেনস্কে আসমান থেকে পরিষ্কারভাবে দেখার জন্য আমি বসেছি প্লেনের উইন্ডো সিটে। আমরা উড়ে যাচ্ছি কলম্বিয়া রিভারের সমান্তরালে। মেঘমুক্ত আকাশে কাসকেইড রেঞ্জের পাহাড়গুলোর চূড়ায় চূড়ায় ঝলমলাচ্ছে সূর্যের রেইনবো ক্রিস্টালস্। মাউন্ট হুডের কাছাকাছি আসতেই বোয়িংয়ের পাইলট কলম্বিয়া রিভার অতিক্রম করে সরাসরি চলে আসে মাউন্ট হেলেনসের উপর। অ্যান্ড দেয়ার ওয়াজ মাউন্ট হেলেনস্- লুকস্ কোয়ায়েট অ্যান্ড সেরেইন… স্নো কভারর্ড। সহসা পাইলটের আনাউন্সমেন্ট… এভরিওয়ান, লুক কুইক্, মাউন্ট হেলেনস ইজ মেইকিং এ স্প্যাকটাকুলার ডিসপ্লে। আমরা সকলে তাকিয়ে দেখি, ঝলমলে নীল আকাশের নিচে বিস্ফারিত হচ্ছে হাজার ফিট উঁচু কালো ধোঁয়ার মিনার। দেখতে দেখতে বলকে বলকে বেরিয়ে আসে ধোঁয়ার একাধিক স্তম্ভ, আর তাদের জড়িয়ে-মড়িয়ে ফুসফুসিয়ে কাঁপে সোনালি সরিসৃপের অগ্নিময় লালচে জিহ্বা।”
পিজিট সাউন্ডে ফেরার পথে আমরা আবার দিগন্তের দেখা পাই, মাউন্ট জেফারসন ও ত্রি-সিস্টার বলে কাসকেইড রেঞ্জের আরো দুটি পাহাড়ের রূপরেখার। এবার সিপ্লেনের ল্যান্ডিং হয় খুব স্মুথ। ছোট্ট হাওয়াই জাহাজ মিথুন উদগ্রীব বলাকার মতো জল কেটে চলে আসে জেটিতে। আমরা নামতেই পল কাঁধে হাত রেখে, ‘কুল গাই, রাইট ফ্রম হিমালায়াস’ বলে আমার দিকে সেলুলার ফোনটি বড়িয়ে দেয়। ‘ইউ ডিড মাউন্ট রেনেয়ার অ্যান্ড এ লিটল বিট অব কাসকেইড রেঞ্জ ফ্রম দ্য স্কাই, দিস ইজ অ্যান ইউনিক থিং। তোমার বন্ধু বান্ধব, প্রেমিকা বা ওয়েল-উইশার কাউকে এ-সংবাদ জানিয়ে টেলিফোন করো। গো অ্যাহেড ইউজ মাই সেলুলার ফোন এন্ড রিং।’ আমি এ ধরনের কর্ডলেস ফোন আগে কখনো ব্যবহার করিনি। কৌতূহল হয়, কিন্তু আকাশপাতাল ভাবি, আমার তো এমন কেউ নেই, যাকে ফোন তুলে বলা যায় ‘হ্যালো’। এদিকে স্কারলেট পল’কে জড়িয়ে ধরে গুডবাই কিস করছে। কেন জানি মন ভরে উঠে নিঃসঙ্গ বিষণ্নতায়।
[চলবে]
ধারাবাহিক এই লেখাটির পূর্ববর্তী পর্বটি (৩) পড়তে হলে নিচের লিংকে ক্লিক করুন

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%ae%e0%a6%88%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%b8-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%89%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%b0%e0%a7%87-2/

পরবর্তী পর্ব (৫) আসছে