হান ক্যাঙ > নিরামিষাশী >> রাবেয়া রব্বানী অনূদিত ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৩]

0
308

নিরামিষাশী >> ধারাবাহিক উপন্যাস 

[পর্ব ৩]

বরাবরই সে কম কথা বলা মানুষ। এমনিতে এখন ঘরবাড়ি গুছিয়ে রাখে। সপ্তাহ শেষে একসপ্তাহ খাওয়ার মতো মশলাদার সব্জি বানিয়ে রাখে, এমনকি মাংসের বদলে মাশরুম দিয়ে গ্লাস নুডলস স্ট্রিক ফ্রাইও করে। একজন নিরামিষাশী হবার জন্যে যা কিছু সে করছে তার সবকিছুই স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। কিছুই আলাদাভাবে সমস্যা বলে মনে হয়নি। কেবল তার না ঘুমানোটাই ভাবনায় ফেলে দিল।

এখন তার মুখের ভেতরের গর্ত থেকে কোন শব্দ একটু গভীরভাবে বের হলেই মনে হয়, কেউ যেন তাকে বায়ুশূন্য করে রেখেছে। আমি সকালে তার সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করতে গেলেই সে বলে, একটা স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নের প্রকৃতি আমি বিশ্লেষণ করতে যাইনি। সেই অদ্ভুত বাজে স্বপ্নটা সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমাকে কয়েকবার শুনতে হয়েছে।

একটা জঙ্গলের ভেতরে পরিত্যক্ত শস্যাগারে তার ভয় পাওয়া আর রক্তে নিজের চেহারা আর বাকি সব ভেসে যাওয়া; এরকম কিছু আমার জন্য একবার শোনাই যথেষ্ট ছিল। ওই রকম কষ্টদায়ক স্বপ্ন শুনেই আমি চুপ হয়ে গেছি, জানি না কী বোঝার আছে কিংবা হয়ত আমি বুঝতেই চাইনি।

প্রথম দিকে তার শরীর নৃত্যশিল্পীদের মতো শারীরিক অবয়ব পেল। ভাবলাম, সেখানেই হয়ত এর ইতি ঘটবে কিন্তু এরপর সে একটা কঙ্কালের মতো হয়ে যেতে থাকলো। এ-জাতীয় চিন্তা আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেলেই তখন আমি তার পরিবারের ব্যাপারে যা যা জানি ভেবে দেখার চেষ্টা করি। তার বাবা একটা ছোট্ট শহরের স’মিলে কাজ করে, লাঠিতে ভর করে পথ চলে। তার মা-ও একটা দোকানে কাজ করে। আমার শালী আর তার স্বামীও খুব সাধারণ মানুষ, খুব ভদ্রও। আর তাই তাদের পরিবার কোনরকম পারিবারিক স্নায়বিক অসুখ বয়ে বেড়াচ্ছে না, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
আমি তার পরিবারে আমার কাটানো সময়গুলোকে ভাজা মাংস আর পোড়া রসুনের গন্ধ ছাড়া ভাবতেও পারি না। আমার শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে আমার স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে আছে ছোট ছোট পানীয়ের গ্লাসের ঠোকাঠুকি আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা মহিলাদের হাসি ঠাট্টার শব্দ। তারা সবাই বিশেষ করে আমার শ্বশুর কাঁচা গরুর মাংসের একটা পদ খুব উপভোগ করে। আমি আমার শাশুড়িকে একটা আস্ত কাঁচা মাছ খেয়ে ফেলতে দেখেছি।

আমার স্ত্রী আর তার বোন দুজনই কসাইদের মতো বড় দা দিয়ে মুরগি টুকরো করাতে সিদ্ধহস্ত। আমার স্ত্রীর গ্রাম্য পারদর্শিতাও আমার খুব ভালো লেগেছিল। যেভাবে সে ছোঁ মেরে হাতের মুঠোতে তেলাপোকা ধরে ফেলেছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। বিয়ের পর তাকে আমি একজন সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ে হিসাবেই দেখেছি।

যদিও তার তখনকার শারীরিক মানসিক অবস্থা আমার কাছে সম্পূর্ণ অবোধ্য ছিল, তবুও আমি তাকে একজন বিশেষজ্ঞকে দেখানোর সিদ্ধান্ত নিইনি। আমি নিজেকে এই বলে প্রবোধ দিলাম যে, আসলে তার কিছুই হয় নি। এই ধরনের কিছু আসলে কোন সত্যিকারের অসুখ নয়। আমি অন্তর্দৃষ্টি প্রয়োগ করার তীব্র ইচ্ছা দমন করলাম। মেনে নিলাম, এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমার আসলে কিছুই করার নেই।
স্বপ্নটা দেখার আগের দিন আমি বরফজমা মাংস কাটছিলাম। তোমার মনে আছে? তুমি রেগে গেলে। বললে, ধুত্তোর ছাই, এভাবে কেন গুঁতোগুঁতি করছ? এর আগে কখনও তো এত আনাড়ি ছিলে না তুমি?
তুমি যদি জানতে, সবসময় আমি আমার স্নায়ুকে কত কষ্ট করে নিয়ন্ত্রণে রাখি! অন্য কেউ এরকম কিছু হলে হৈচৈ শুরু করে দিত। দ্রুত করা , চালু করা, আরও চালিয়ে কিছু করা, এগুলো আমার জন্য খুবই গোলমেলে ব্যাপার। আমার ছুড়ি দিয়ে ধরা হাতটা খুব দ্রুত কাজ করছিল। কাঁধ গরম হয়ে গিয়েছিল। আমার হাত, চপিং বোর্ড, মাংস, তারপর ছুড়িটা উফ! আমার আঙুলগুলোর ভেতর যেন ঠান্ডা ঢুকে যাচ্ছিল।
প্রথমে কাঁটা জায়গাটা থেকে একফোঁটা রক্ত বের হল। গোল রক্তের আকার আরও গোলাকার হতে থাকলে আমি আঙুলটা মুখে দিলাম। কোন কিছুর মিষ্টি স্বাদ দিয়ে ঢাকা অত্যুজ্জ্বল রঙটা আমাকে আশ্চর্য রকম শান্ত করল।
সেদিনের পর থেকে তুমি বলগগি খেতে খেতে দ্বিতীয় গ্রাস মুখ থেকে বের করে একটা জ্বলজ্বলে কিছু করলে। তারপর চিৎকার করে উঠলে, এটা কি ? ছুড়ির একটা অংশ না?
তোমার উত্তেজিত নাখোশ চেহারার দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম আমি। তুমি বললে, একবার ভাবো দেখি যদি এটা গিলে ফেলতাম তবে কি হত? মরেই তো যেতাম!
কেন জানি সেদিন এই ব্যাপারটাতে আমার ততটা খারাপ লাগেনি যতটা লাগা উচিত ছিল। বরং আমি আরও শান্ত হয়ে গেলাম, আমার মাথায় একটা ঠান্ডা হাতের ছোঁয়া পেলাম। হঠাৎ সবকিছু সরে যেতে লাগল যেন ভাটার টান লেগেছ, বালি আর পানির মতো সবকিছু সরিয়ে নিচ্ছে। ডাইনিং টেবিল, রান্নাঘরের সকল আসবাব, তুমি- সব সরে গেলে। রয়ে গেলাম আমি আর এক অবারিত শূন্যতা।
পরদিন ভোরে সেই শস্যাগারে রক্তের ধারায়, হ্যাঁ, সেখানেই আমি আমার মুখটা প্রতিফলিত হতে দেখলাম।
তোমার ঠোঁট এমন দেখাচ্ছে কেন? মেকআপ কর নি?
আমি আবার জুতো খুলে আমার স্ত্রীকে সামনের ঘর থেকে টেনে ভেতরে আনলাম। সে তখন বাইরে যাওয়ার কোট পরে ফেলেছে।
তুমি কি আসলেই এভাবে বাইরে বের হচ্ছিলে? আবার মেক আপ কর।
আমাদের দুজনকেই ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় দেখা গেল। সে খুব নম্রভাবে আমার হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে তার মেকআপ খুলল। মুখে পাউডারের পাফ বুলালো। পাউডারটা তার মুখের দাগগুলো কিভাবে যেন ঝাপসা করে দিল। সবসময় সে গাঢ় কোরাল রঙের লিপস্টিক ব্যবহার করে। লিপস্টিক দিলে তার অসুস্থ চেহারার বিবর্ণতা কিছু হলেও কমবে, আমি নিজেকে ভাবলাম আমি। তাকে বললাম, দেরী হয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি কর।
এরপর আমি সামনের দরজা খুলে তাকে তাড়াতাড়ি বের করলাম। তার গাঢ় নীল স্নিকার পরা পর্যন্ত অস্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কালো কোটের সাথে যদিও জুতোটা যায় নি, কিন্তু তখন কিচ্ছু করার নেই। কারণ, চামড়া দিয়ে বানানো সকল জুতো সে ইতিমধ্যে ফেলে দিয়েছে।
ইঞ্জিন চালু করেই ট্রাফিক আপডেট শুনতে আমি রেডিও অন করলাম যাতে বসের রিজার্ভ করা কোরিয়ান-চাইনিজ রেস্টুরেন্টের আশেপাশে কিছু ঘটছে কিনা তা জানা যায়। যখনি নিশ্চিত হলাম যে অন্য পথে গেলে এর চেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে না, তখন আমি সিটবেল্ট বেঁধে হ্যান্ডব্রেক ছেড়ে দিলাম। আমার স্ত্রী তার কোট ঠিকঠাক করে কয়েকবার চেষ্টা করে শেষমেশ সিটবেল্ট লাগাতে সক্ষম হল। আমি বললাম, আমি চাই সন্ধ্যাটা যেন ভালোভাবে কেটে যায়। জানোই তো, আজ প্রথমবার বস আমাকে রাতের খাবারে ডেকেছেন।
মেইন রোডে গাড়ি খুব জোড়ে চালানোর কারণে আমরা রেস্টুরেন্টে ঠিকসময়ে পৌঁছুতে পারলাম। সেখানে পৌঁছে আমরা একটা প্রশস্ত গাড়ি বারান্দার সামনে একটি দোতলা দালান দেখতে পেলাম। স্থাপনাটা খুবই অভিজাত মনে হল।
বসন্ত তখনও শীতের দখলে। গাড়ি বারান্দায় পাতলা সোয়েটার গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমার স্ত্রীর ব্যবহার শীতল মনে হল। পুরো রাস্তায় সে টু শব্দ করে নি। কিন্তু তখন আমি নিজেকে প্রবোধ দিলাম, এটা কোন সমস্যা না। চুপ করে থাকার মধ্যে কোন সমস্যা নেই। আমরা কি মেয়েদের কাছ থেকে এইরকম চুপচাপ ও সংযমী আচরণই প্রত্যাশা করি না?
আমার বস, ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর ইতিমধ্যে যার যার স্ত্রীকে নিয়ে চলে এসেছেন। আমাদের উপস্থিত হবার পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেকশন চীফও এসে পড়লেন এবং উৎসবটি আকাঙ্ক্ষিত অতিথিতে পূর্ণ হল। অভিবাদন বিনিময় করতে করতে দেখলাম সব জায়গায় হাসি-আনন্দ আর উচ্ছলতা ছাপিয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের কোট আর টুপি খুলে রাখলাম। আমার বসের স্ত্রী খুবই ভাবগম্ভীর একজন মানুষ। চমৎকারভাবে ভ্রু প্লাক করেছেন তিনি। গলায় ঝুলিয়েছেন জেডের হাড়। তিনি টেবিলের অন্য পাশ থেকে আমাদের পর্যবেক্ষণ করলেন, তারপর একটা বিলাসী ভোজের ফরমায়েশ দিয়ে তিনি টেবিলের একেবারে মাথায় গিয়ে বসলেন। দেখলাম, বাকি সবাই বরাবরের মতো চুপচাপ বসে আছে। আমি খুব সাবধানে নির্ধারিত জায়গায় বসলাম এবং চেষ্টা করলাম যাতে ঐতিহ্যবাহী সেই দালানের ছাদের অনিন্দ্য সুন্দর কারুকার্যের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে না থাকি।

একটা কাঁচের জারে সাঁতরানো গোল্ড ফিশের দিকে আমার চোখ আটকে গেল এবং আমি তা বলতে আমার স্ত্রীর দিকে ঘুরে বসলাম। কিন্তু যা দেখলাম তাতে আমার দম বন্ধ হয়ে যাবার জোগার।

সে খুবই আঁটসাঁট একটা কালো টপস পরে এসেছে। তারচেয়েও বিরক্তিকর ব্যাপার হচ্ছে, জামার ফাঁক দিয়ে তার নিপলসের ধার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম, সে ব্রা না পড়েই চলে এসেছে। এর মধ্যে অন্য অতিথিরা গলা উঁচিয়ে নিশ্চিত হতে চাইল, তারা যা দেখছে তা আসলেই দেখছে কি না। এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের চোখে আমার চোখ পড়ে গেল। আমি মিথ্যা আশ্বস্ততার অভিব্যক্তি দিয়ে তার কৌতুহল, বিস্ময় আর অপমান প্রতিহত করলাম।
বুঝতে পারলাম, আমার গাল লাল হয়ে গেছে। যেখানে লজ্জাটা আমার স্ত্রীর পাওয়ার কথা, আর সে কিনা কোটরে ডেবে যাওয়া চোখ দিয়ে বসে বসে চারপাশ দেখছে এবং অন্য মহিলাদের হাসি-ঠাট্টায় যোগ দেবার কোন চেষ্টা করছে না। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলাম আর ভাবলাম, সবচেয়ে ভালো হয় একটা কাজ করলে। সেটা হচ্ছে স্বাভাবিক থাকা। এতটাই সহজ থাকা যেন কিছুই হয় নি।
আমার বসের স্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, জায়গাটা খুঁজে পেতে কি আপনার কষ্ট হয়েছে?
আমি বললাম, আরে না। আমি এক-দুবার এই বিল্ডিংটার সামনে দিয়েই গেছি। তাছাড়া পরিকল্পনা ছিল নিজেই একবার আসব।
আচ্ছা তাই! বাগানটা কিন্তু বেশ ভালো সাজিয়েছে ওরা। তাই না? আপনি বরং দিনের বেলা আসবেন, তাহলে এখানে বসেই ফুলের বেডটা দেখতে পারবেন।
খাবার পরিবেশনের সময় ব্যবস্থাপনাজনিত একটা ধকল গেল। প্রথমে যে খাবারটি আমাদের সামনে পরিবেশিত হল- মুগ ডাল ও পাতলা মটর ডালের জেলি, মাশরুম আর গরুর মাংস দিয়ে মোড়ানো । ততক্ষণে আমার স্ত্রী কী হচ্ছে না হচ্ছে, তা চুপচাপ দেখছিল। কিন্তু যেই-না পরিবেশক তার পাতে খাবার পরিবেশন করবে, তক্ষুণি সে বলে উঠল, আমি খাব না।
সে এত স্পষ্ট ও জোরালোভাবে কথাটা বলল যে, অন্য অতিথিরা যে যার কাজ বন্ধ করে অবাক দৃষ্টিতে তার কৃশকায় শরীরের দিকে তাকালো। আরও একটু জোরে সে আবার বলে উঠল, আমি মাংস খাব না।

আমার বস জিজ্ঞেস করলেন, ওরে বাবা, আপনি কি নিরামিষাশী না কি? আমি শুনেছি, অন্যান্য দেশের অনেক লোকজনই এখন বেশ কট্টর নিরামিষাশী হয়ে গেছে। এমনকি এখানেও মানুষ মাংস ছেড়ে দিচ্ছে, জানেন? এর মানে হচ্ছে মানুষের আচরণ পালটে যাচ্ছে। এখন প্রায়ই অনেকে দাবি করছে, মাংস খাওয়া খারাপ। যাই হোক, একটা দীর্ঘ জীবনের জন্য কেউ যদি মাংস ছেড়ে দেয় তাতে আমি খারাপ কিছু দেখি না। কি বলেন সবাই?

বসের স্ত্রী হেসে বললেন, কিন্তু মাংস না খেয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব।
ওয়েটার দ্রুত নয় প্লেট খাবার সাজিয়ে দিয়ে গেল। শুধু আমার স্ত্রীর শূন্য প্লেট তখনও চকচক করছে। স্বাভাবিকভাবেই নিরামিষাশ খাওয়া নিয়ে আলোচনা চলতে লাগল। বস বললেন, আপনারা কি নব্য-আবিষ্কৃত মানুষের মমির কথা শুনেছেন? পাঁচ হাজার বছর আগের মমি। তখনও মানুষ মাংসের জন্য শিকারে যেত। বহুকাল আগের কংকাল নিয়ে গবেষণা করে এটা জানা গেছে। আসলে মাংস ভক্ষণ হচ্ছে মানুষের প্রাচীন সহজাত একটা অভ্যাস। সেদিক থেকে ভাবলে, নিরামিষাশী হবার মতবাদই বরং প্রাকৃতিক আচরণ নয়। তাই না? ব্যাপারটা মোটেও ন্যাচারাল না।
বস একটু থেমে আবার বললেন, মানুষ বিশেষভাবে নিরামিষাশী হয়ে ওঠে কিছু চিন্তা-ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। আমি নিজে বেশ কয়েকজন ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম। কিছু টেস্ট করিয়েছিলাম। জানতে চাইছিলাম, এমন কিছু কি আছে যা আমার ইমিউন সিস্টেম সহ্য করতে পারছে না আর সেসব আমার এড়িয়ে চলা দরকার। কিন্তু এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় প্রতিবারই আমাকে ভিন্ন ভিন্ন খাবারের কথা শুনতে হয়েছে। যাই হোক, খাবারের বিশেষ চার্ট অনুসরণ করা আমার কাছে বরাবরই একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার। আমি মনে করি খাবারের ক্ষেত্রে সংকীর্ণমনা হলে চলবে না। কিন্তু দেখবেন, মানুষ ইচ্ছামত এটাওটা বাদ দিয়ে খায়। মানে, কোন রকম এলার্জি নেই বা শারীরিক কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা সমস্যা নেই, তবু কী খাবে, কী খাবে না, বাছবিচার করে। ঠিক এটাকেই আমি বলি খাবারের ব্যাপারে সংকীর্ণতা দেখানো।
এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের স্ত্রী একমত হলেন। এরপর সে আড়চোখে আমার স্ত্রীর বুকের দিকে তাকালো। বলল, একটা সুষম খাদ্য সুষম মন তৈরি করে। আপনার কি তাই মনে হয় না?
এবার সে সোজা আমার স্ত্রীর দিকে আঙুল তুলল। আপনি কি কারণে নিরামিষাশী হয়েছেন, বলবেন একটু? শারীরিক কোন সমস্যা কিংবা ধর্মীয় কোন কারণে?
না।
তার গভীর উচ্চারণ প্রমাণ করল পরিস্থিতি কতটা গুরুতর। সঙ্গে সঙ্গে একটা ভয়ের স্রোত আমার শরীর বেয়ে নামতে থাকলো। কেননা, আমার মনে হতে লাগল তক্ষুনি সে উঠে যাবে, যেন আমি একটা স্বপ্ন দেখছি। তাড়াতাড়ি বললাম, বহুদিন আমার স্ত্রী পেটের সমস্যায় ভুগেছে। এই সমস্যা থেকে তার ঘুমেরও সমস্যা তৈরি হয়েছে। একজন ডাক্তার তাকে মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। জানেন, সেই পরামর্শ অনুযায়ী এখন সে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে।
এরপর সবাই বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল। বস বললেন,
যাক বাবা, বাঁচা গেল। আমি গর্বিত যে একজন স্বেচ্ছা নিরামিষাশীর সাথে আমি খেতে বসি নি। এমন একজন মানুষ যার কাছে মাংস অচ্ছুৎ তার সাথে খেতে আমার খুব খারাপ লাগবে। কেননা, সে কেবল তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই সবাইকে দেখতে চাইবে। তাই না? ভাবুন তো, একবার আপনি একটা কচি অক্টোপাস চপস্টিক দিয়ে বাঁকা করে ধরেছেন এবং খুঁচিয়ে খেতে গিয়ে মেরে ফেলেছেন। আপনার সামনে যে মহিলা বসে আছে, সে এরকমই ভাবছে আর আপনাকে দেখছে। যেন আপনিও একটা প্রাণী। ঠিক এমনটাই লাগবে আমার একজন নিরামিষাশীর সাথে খেতে খেতে।
সবাই হাসিতে ভেঙে পড়ল। আমি প্রত্যেকের প্রতিটা হাসির ব্যাপারে সচেতনভাবে কান পেতে রইলাম। এদিকে আমার স্ত্রী হাসি তো দূরের ব্যাপার, একটু মুখ বাঁকাও করল না। এরপর সবাই যার যার খাবার খাওয়ার চিন্তায় নিবিষ্ট থাকল যাতে নীরবতার ধ্যানে কাউকে বসতে না হয়। তবে এটা স্পষ্ট হলো যে, তখন কেউ আর স্বস্তি বোধ করছিল না।
এর পরের পদ ছিল মরিচ আর রসুনের সসে মাখা মুরগির মাংস আর কাঁচা টুনা। এই সময় সবাই যে যার মতো করে মুখে খাবার ঠুসল, শুধু আমার স্ত্রী স্থির হয়ে বসে রইল। তার দুটো স্তনবৃন্ত জামার সাথে সেঁটে থাকায় দেখতে একজোড়া ওক ফলের মতো মনে হলো। খাবারে ব্যস্ত মুখগুলোর দিকে সে এমন মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে রইল যেন সে তাদের খাবার খাওয়ার প্রতিটা ছোট ছোট দৃশ্য শুষে নেয়াতেই মনোনিবেশ করেছে।

বারোটা অসাধারণ খাবারের পদ শেষ হওয়া পর্যন্ত আমার স্ত্রী সালাদ, আচার আর স্কোয়াশের পাতলা খিচুড়ি ছাড়া কিছুই মুখে দেয় নি। এমনকি সে চালের খিচুড়িও মুখে দেয় নি। কেননা তাতে ভিন্ন একটু স্বাদ আনতে গরুর মাংসের সেদ্ধ পানি ব্যবহার করা হয়েছিল।

এইসব দেখে তখন স্বাভাবিকভাবেই অন্য অতিথিরা তার উপস্থিতি উপেক্ষা করে তাদের গল্প বলাটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে ফেললো । মাঝে মাঝে করুণা করে তারা আমাকেও তাদের আলাপে যুক্ত করল, কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম যে তারা আমাদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছে।
ফল আনার পর আমার স্ত্রী সেখান থেকে একটুকরো আপেল আর এক টুকরা কমলা খেল।
আপনার খিদে পায় নি কিন্তু আপনি তো কিছুই খান নি? বসের স্ত্রী খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সুরে, খুব সুন্দর করে কথাটা আমার স্ত্রীকে বললেন। কিন্তু সহানুভূতি আর দুঃখ প্রকাশের যে সুর তাতে বাজল, তার কোন সদুত্তর আমার স্ত্রীর পক্ষ থেকে এল না। বরং সে কোনরকমের অস্বস্তি প্রকাশ করা ছাড়াই তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ব্যাপারটা সবাই খেয়াল করল। আমি হতবাক হয়ে গেলাম। বুঝলাম পরিস্থিতিটা কী সে বুঝতে পারছে না! তিনি যে একজন মধ্যবয়স্কা সম্ভ্রান্ত নারী, তাও কি সে ভুলে গেছে! তার মনে কি তাহলে অন্য কোন ভাবনা ঘাপটি মেরে আছে? তার মনের গহন-গোপন তলের খোঁজ কি তাহলে আমি এতদিনেও পাই নি?
সেই মুহূর্তে তাকে আমার পুরোপুরি দুর্বোধ্য লাগছিল।
(চলবে)
পূর্ববর্তী পর্বের (পর্ব ২) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%99-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a7%80-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ac/

পরবর্তী পর্বের লিংক আসছে

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%85%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%85%e0%a6%a8%e0%a7%82%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a4-%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8/