হান ক্যাঙ > নিরামিষাশী >> রাবেয়া রব্বানী অনূদিত ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ২)

0
625

হান ক্যাঙ > নিরামিষাশী [পর্ব ২] >> রাবেয়া রব্বানী অনূদিত

পাঠ : রনক জামান

এই শোনা যাবে, যাবে পড়াও।

শোনার জন্য ক্লিক করুন >>

https://www.youtube.com/watch?v=tPzAr4oW4PE&fbclid=IwAR3mLk6bR0kyse267rD0-Fd6c-hJIPDy-TSfQC9xbiaSaCQfc30apnkmVxE

পড়ার জন্য >> নিচে পড়ুন

পরদিন সকাল, আমি চোখ মেললাম। বাস্তবতা তখনও আমার চেতনায় সেভাবে জমাট বাঁধেনি। আনমনে কম্বল মুড়ে শুয়ে রইলাম। পর্দা ভেদ করে আসা শীতের রোদ চেখে নিলাম। এমন বিমূর্ত অনুভূতির মাঝে হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই আমি লাফিয়ে বিছানা থেকে নামলাম। লাথি দিয়ে দরজা খুলে ঘর থেকে বাইরে বের হলাম। আমার স্ত্রী তখন ফ্রিজের কাছে। আমি তাকে বললাম,
মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমাকে ডাকোনি কেন? ক’টা বেজেছে দেখেছ?
পায়ের নীচে কিছু পিষে যেতেই আমি কথার মাঝখানে থেমে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। সে তার রাতের পোশাক গায়ে দিয়েই হামাগুড়ি দিয়ে কিছু ওঠাচ্ছে। তার মুখের চারপাশে অবিন্যস্ত চুল, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চারপাশ, রান্নাঘরের মেঝে প্লাস্টিক ব্যাগ আর এয়ারটাইট কন্টেইনারে এমনভাবে স্তূপীকৃত হয়ে আছে যে, সেখানে পা না ফেলে আমার হাঁটার উপায় ছিল না। শাবো-শাবোর জন্য গরুর মাংস, শুকরের পেটের মাংস, কালো গরুর পায়ের হাড়, এয়ারটাইট ব্যাগে কিছু স্কুইড, বহুদিন আগে গ্রাম থেকে আমার শাশুড়ির পাঠানো টুকরো করা সামুদ্রিক ইল, হলুদ ফিতে দিয়ে বাঁধা কাকের শুটকি, অব্যবহৃত ডাম্পলিংয়ের প্যাকেট, ফ্রিজের একেবারে তলা থেকে বের করা এমন কিছু প্যাকেট যার ভেতরে কী আছে, তখন আর বোঝা যাচ্ছিল না।
এদিকে আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমার স্ত্রী একটার পর একটা প্যাকেট কালো ময়লা ফেলার বাক্সে রাখতে ব্যস্ত। স্বাভাবিকভাবেই তখন আমি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না। চিৎকার করে উঠলাম,
এসব কী ছাতা-মাথা করে রেখেছো?
সে তখন উত্তর না দিয়ে মাংসের প্যাকেটগুলো ময়লার বাক্সে এমন ভাবে ফেলতে লাগল যেন আগের রাতে আমার কথা যতটা গায়ে মেখেছে, এখন তাও মাখবে না। এদিকে মাংস, শুকর, মুরগির টুকরো কমপক্ষে দুই লাখ ইউন দামের সামুদ্রিক ইল- কিছুই সে রাখছে না। সব ফেলে দিচ্ছে।
তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? কী ভেবে তুমি সবকিছু ফেলে দিচ্ছ?
আমি দ্রুত স্তূপ করা প্লাস্টিকের ব্যাগগুলোর মধ্যে পা ফেলে ফেলে পথ করে এগিয়ে গিয়ে তার কব্জি চেপে ধরলাম। তার মুঠি থেকে ব্যাগগুলো ছাড়াতে চাইলাম। কিন্তু আমার কাছ থেকে সেগুলো ছাড়িয়ে নিতে তার ধ্বস্তাধস্তি দেখে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। আমি প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছি দিচ্ছি করেও জোর জবরদস্তি করতে থাকলাম আর তাকে বাগে আনতে সক্ষম হলাম। এরপর তার লাল হয়ে যাওয়া কব্জিটা আলতো করে ঘষে দিতেই সে গতরাতের মতো শান্ত স্বরে বলল,
আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি।
আবারও সেই একই কথা বলে সে আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আর তখনই আমার মোবাইলটা বেজে উঠল।
আমি বেশ বিরক্ত হলাম। আগের রাতে শোবার ঘরের সোফায় রাখা কোটের পকেটে ফোনটা রেখেছিলাম। তাও রক্ষে, আঁতিপাতি করে খুঁজে শেষমেশ ভেতরের পটেকে খুঁজে পেলাম।
আমি খুব দুঃখিত। একটা পারিবারিক ঝামেলায় আটকে গেছি, আসলেই আমি খুব দুঃখিত। আমি যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছে যাব। না, আমি এখনই বের হচ্ছি। এইতো। না, না, আপনাকে তা করতে হবে না। দয়া করে আরেকটু অপেক্ষা করুন। আমি খুবই দুঃখিত। আসলেই এখন কথা বলতে পারছি না।
আমি ফোনটা বন্ধ করে শেভ করার সেলফেই সেটা রেখে দিলাম। আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম,
আমার সাদা শার্টটা ইস্ত্রি করনি?
কোন উত্তর এল না। নিরূপায় হয়ে শরীরে পানি ঢালা শেষ করে, লন্ড্রির ঝুড়িতে শার্টটা খুঁজতে লাগলাম। ভাগ্যক্রমে শার্টটা তখন খুব একটা কুঁচকে ছিল না। এর মধ্যে একবারের জন্যও আমার স্ত্রী উঁকি দিয়ে আমার তৈরি হওয়া দেখেনি। আমি স্কার্ফের মতো টাইটা গলায় ঝুলিয়ে, মোজা পায়ে গলিয়ে, নোটবুক আর ওয়ালেট গুছিয়ে নিলাম। আমাদের পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে সেবারই প্রথম ঘটলো, যখন সে আমাকে আমার জিনিসপত্র গুছিয়ে দিল না আর ঘর থেকে বেরুবার সময় বিদায় জানাতে এল না।

আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। এই কথাটা সে দুবার বলেছে। অন্ধকার টানেলের মধ্য দিয়ে ছুটন্ত ট্রেনের জানালার কাচে তার চেহারা উদ্ভাসিত হল। কিন্তু তখন তার চেহারাটা এত অপরিচিঁত মনে হলো, যেন আমি তাকে প্রথমবার দেখছি।

বের হবার আগে আমি তাকে বললাম,
তুমি একটা পাগল। তোমার মাথা পুরাই গেছে।
তখনকার নতুন কেনা জুতো জোড়া খুব চাপা ছিল, পায়ে খুব লাগতো। আমি দুই পায়ের জুতোয় পা গলিয়ে সজোরে দরজা খুলে বের হয়ে গেলাম। দেখলাম, লিফট একেবারে উপরের তলায় চলে যাচ্ছে। আমি তখন তিন ধাপ করে পার হতে হতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলাম। সেদিন একটু হলেই আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনটা ফসকে যেত। কোনরকমে সেটাতে ওঠার পরই নিজের চেহারার কথা মনে পড়লো। ট্রেনের বন্ধ কালো জানালায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে-দেখে আমি চুলে আঙুল চালালাম, টাই বাঁধলাম, শার্টের কুঁচকে থাকা ভাবটা কমাবার জন্য তাতে হাত বুলালাম। আমার স্ত্রীর অস্বাভাবিক শান্ত চেহারা, তার সাথে বেমানান জোরালো কণ্ঠস্বর আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।
আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। এই কথাটা সে দুবার বলেছে। অন্ধকার টানেলের মধ্য দিয়ে ছুটন্ত ট্রেনের জানালার কাচে তার চেহারা উদ্ভাসিত হল। কিন্তু তখন তার চেহারাটা এত অপরিচিঁত মনে হলো, যেন আমি তাকে প্রথমবার দেখছি। কিন্তু যেহেতু তখন আমার ক্লায়েন্টের কাছে মিথ্যা কিছু সাজিয়ে দেরি হবার কারণটা সত্যে পরিণত করার জন্যে হাতে মাত্র ত্রিশ মিনিট আছে, মিটিংয়ের একটা খসড়া প্রস্তাবনাও গোছানো হয়নি, তাই আমার অতি অদ্ভুত স্ত্রীর ওই আচরণে মাথা ঘামানো স্থগিত রাখলাম। নিজেকে বললাম, যেভাবেই হোক আজ আমাকে অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে (বলতে দ্বিধা নেই, অফিসে আমার নতুন উঁচু পদে উন্নীত হবার পর থেকে কখনই মধ্যরাতের আগে আমি বাড়ি ফিরতে পারিনি) আর তার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করে নিতে হবে।
***

আমার চেহারা নিঃসন্দেহে আমারই। কিন্তু আগে আমি কখনও দেখিনি। কিংবা হয়তো আমার চেহারা কোনো পরিচিত চেহারা নয়। কোন কিছুর মানে খুঁজে পাচ্ছি না। পরিচিত, কিন্তু পরিচিত না। কী প্রগাঢ়, অদ্ভুত, ভয়াবহ ভুতুড়ে এই অনুভূতি!

সে এক অন্ধকার গহীন অরণ্য। কোনো জন-মনিষ্যি নেই। গাছের ধারালো পাতার ডগাগুলোতে লেগে আমার পায়ের পাতা ছড়ে যাচ্ছে। কেটে যাচ্ছে। জায়গাটা মোটামুটি চেনা। কিন্তু কেন জানি আমি হারিয়ে গেছি। ভয় পাচ্ছি। জমে যাচ্ছি। বরফাবৃত গিরিখাতের ওপারে একটি শস্যাগারের মতো বাড়ি। দরজার কাছে মাদুরের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নরম খড়। সেগুলো আমার পায়ে জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
আমি এখন শস্যাগারের ভেতরে প্রবেশ করছি। একটা লম্বা বাঁশের মাথায় বিশাল বড় মাংসের টুকরা বিঁধিয়ে রাখা, সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। জায়গাটা পার হতে চাচ্ছি। কিন্তু মাংসটা, মাংসের যেন শেষ নেই! রক্ত আমার মুখের ভেতর ঢুকে গেছে, আমার পোশাক চুঁইয়ে চামড়ার গায়ে সেঁটে যাচ্ছে।
কোনমতে একটা পথ বের করে আমি দৌড়াচ্ছি। পাহাড় ছাড়িয়ে আরও সামনের দিকে দৌড়াচ্ছি। হঠাৎ করে জঙ্গলের রাস্তাটা দেখতে পেলাম। পাতাবোঝাই গাছগুলোতে বসন্তের সতেজ আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। অনেকগুলো পরিবার পিকনিকে মত্ত। ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে আর আমি খুব মজাদার কিছু একটার গন্ধ পাচ্ছি। অদ্ভুত রকমের প্রাণচঞ্চল সবকিছু। ছুটে-চলা পানির বুদ্বুদের শব্দ। লোকজন বসার জন্য মাদুর ঝাড়ছে, নাস্তা করছে, মাংস পোড়াচ্ছে। গান আর হাসির হল্লা!
কিন্তু ভয় হচ্ছে আমার পোশাক এখনও রক্তে ভেজা। আমি লুকাচ্ছি। গাছের পেছনে লুকাচ্ছি। হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়ছি। কাউকে দেখানো যাবে না- আমার রক্তাক্ত হাত, আমার রক্তাক্ত মুখ। সেই শস্যাগারে আমি কী করেছি, জানানো যাবে না। সেই বিপুল বিশাল পরিমাণের লাল তরল আমার গলায় ঢুকতে দিয়েছি, আমার মাড়ির পেছনে জমতে দিয়েছি। আমার মুখের তালু এখনও লোহিত রক্তে পিচ্ছিল হয়ে আছে।
এমন একটা কিছু চিবুচ্ছি, যা জমাট কিছুর মতো লাগছে। কিন্তু জিনিসটা কি বুঝতে পারছি না। আমার চেহারা আমার চোখের দৃষ্টি… আমার চেহারা নিঃসন্দেহে আমারই। কিন্তু আগে আমি কখনও দেখিনি। কিংবা হয়তো আমার চেহারা কোনো পরিচিত চেহারা নয়। কোন কিছুর মানে খুঁজে পাচ্ছি না। পরিচিত, কিন্তু পরিচিত না। কী প্রগাঢ়, অদ্ভুত, ভয়াবহ ভুতুড়ে এই অনুভূতি!
***

মানুষ নিরামিষাশীতে পরিণত হয় বেশকিছু কারণে; যেমন বংশগতভাবে পাওয়া এনার্জির গতি পাল্টে দিতে কিংবা মাংস খাওয়া প্রাকৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে খারাপ ভাবতে শুরু করলে। অবশ্যই বৌদ্ধ যাজকরা কিছু শপথ নেন, কোন প্রাণীর ক্ষতি করবেন না। কিন্তু কোন যুবতী এরকম সিদ্ধান্ত সহজে নেয় না।

ডাইনিং টেবিলে আমার স্ত্রী লেটুস আর সয়াবিনের ক্বাথ রেখে দিয়েছে। সাথে দিয়েছে সামুদ্রিক আগাছার প্লেইন স্যুপ। কিমচি ছাড়া গরুর মাংস কিংবা ঝিনুক এসব কিছুই নেই। আমি প্রশ্ন করলাম,
এসব কি? তার মানে একটা হাস্যকর স্বপ্নের জন্য তুমি সব মাংস বাইরে ফেলে দিয়েছ? তাও এত দামের জিনিসগুলো?
আমি বসা থেকে দাঁড়িয়ে ফ্রিজ খুললাম। যা ধারণা করেছিলাম, ভেতরে কিছুই অবশিষ্ট নেই। কেবল আছে কিছু মিজো পাউডার, চিলি পাউডার, ঠাণ্ডা কাঁচা মরিচ, আর এক প্যাকেট রসুনকুচি। রেগে গেলেও আমার খুব ক্লান্ত লাগছিল। তাই বললাম, আচ্ছা আমাকে একটা ডিম ভেজে দাও। আমি আজ খুব ক্লান্ত। দুপুরে ভালোভাবে খাওয়া হয়নি।
আমি ডিমও ফেলে দিয়েছি।
কি!
হ্যাঁ, আর দুধও।
বিশ্বাস হচ্ছে না, তুমি আমাকেও মাংস খেতে বারণ করছ?
আমি এসব জিনিস ফ্রিজে রাখতে পারি না। এতে ক্ষতি হবে।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কীভাবে সে এরকম স্বার্থপরের মতো কথা বলতে পারে। তাকে আমি চোখ নিচু করে দেখলাম, তার অভিব্যক্তি, তার ঠাণ্ডা আত্মপক্ষ সমর্থন, সব কিছু তার নীচতারই প্রমাণ দিচ্ছে যেন। আমার সেই মুহূর্তে ঠিক যা মনে হল তা হল, এ তার অন্য এক রূপ, যেখানে ঘনিয়ে ওঠে তার নিজস্ব ভালো লাগা মন্দ লাগা; যা স্বার্থপরতায় রূপ নিচ্ছে। খুব অবাক করা ব্যাপার। কে বিশ্বাস করবে যে তার মতো একজন মানুষ এতটা অবিবেচক হতে পারে!
তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছ এখন থেকে আমাদের বাড়িতে কোন মাংস থাকবে না?
হ্যাঁ। তা-ই বলতে চাচ্ছি। সাধারণত তুমি সকালের নাস্তাটা বাড়িতে কর আর আমার ধারণা বেশিরভাগ সময় তুমি দুপুরে আর রাতে খাবারের সাথে মাছ-মাংস খাও। তার মানে একবেলা আমিষ না খেলে তুমি মরে যাবে না।
কৌশলে দেয়া উত্তরটা সে এমনভাবে উপস্থাপন করল যেন সে যা বলেছে তা খুবই যুক্তিসঙ্গত আর সঠিক। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হায় ঈশ্বর, তার মানে আমাকেই শুধু গণনায় আনছ? কিন্তু তোমার কি হবে? তুমি কি বলতে চাইছ এরপর থেকে তুমি আর কোনদিন মাছ-মাংস খাবে না?
সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ-বোধক ভাব করল।
আচ্ছা, তা-ই? কতদিন পর্যন্ত?
আমি মনে করি জীবনভর।
আমি কথা হারিয়ে ফেললাম। একই সাথে আমার এও মনে হলো, একসময় যে আমিষ খায়, সে খুব সহজে, আজীবন, নিরামিষাশী ধরনের ডায়েট চালিয়ে যেতে পারে না। মানুষ নিরামিষাশীতে পরিণত হয় বেশকিছু কারণে; যেমন বংশগতভাবে পাওয়া এনার্জির গতি পাল্টে দিতে কিংবা মাংস খাওয়া প্রাকৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে খারাপ ভাবতে শুরু করলে। অবশ্যই বৌদ্ধ যাজকরা কিছু শপথ নেন, কোন প্রাণীর ক্ষতি করবেন না। কিন্তু কোন যুবতী এরকম সিদ্ধান্ত সহজে নেয় না। আর আমি যতটুকু জানি, খাবারের পদটদ নিয়ে অতি সচেতনতা আসে সাধারণত ওজন কমানোর জন্য। কিংবা কোন শারীরিক সমস্যা দূর করার জন্য। কিংবা যাদুটোনা বা শয়তানি শক্তি থেকে নিষ্কৃতি পেতে কিংবা বদহজমের কারণে ঘুমের সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে। এছাড়া স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন একটা বায়না ধরা নিছক একগুঁয়েমি ছাড়া আর কি হতে পারে!
কেউ যদি বলত, আমার স্ত্রী মাংস নিয়ে একটু নাক সিঁটকায়, তাহলে আমি নিজেকে বোঝাতে পারতাম। কিন্তু আদতে পরিস্থিতি ছিল এর উল্টো। আমার স্ত্রী বিয়ের পর থেকেই একজন দক্ষ রন্ধনবিদ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে এবং তার রান্না করা খাবার খেয়ে আমি তৃপ্তি পেয়েছি। তাকে একহাতে প্যান আর অন্য হাতে কাঁচি ধরে গরম তেলে চুবানো মাংস কামড়ে খাওয়ার মতো টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলতে দেখেছি। তার হাতের কাজ দেখলেই তার অভিজ্ঞতা আর কুশলতার প্রমাণ মিলতো। শুকরের পেটের মাংস কড়া করে ভাজার আগে সুন্দর গন্ধের জন্য সেগুলোকে সে আদাকুচি আর গ্লুটেন সমৃদ্ধ সিরাপ দিয়ে ভিজিয়ে রাখত। তার সবচেয়ে ভালো রান্না করা পদ ছিল ওয়েফারের আকৃতিতে কাটা মশলা মাখানো মাংস। এটা সে প্রথমে তিল আর কালো গোল মরিচের গুড়ায় মাখাত, তারপর আবার চালের গুড়া দিয়ে মাখিয়ে ভাজত। এরপর তা শাবো-শাবো সুরুয়ায় ভেজাত। সে বিবিমবাপ বানাতে সামান্য অঙ্কুরিত শিম, কুচি করে কাঁটা গরুর মাংস আর আগে থেকে ভিজিয়ে রাখা চাল একসাথে নিয়ে তিলের তেলে স্টিক-ফ্রাই করত। বড় আলুর টুকরো দিয়েও সে একরকম মুরগি বা হাঁসের স্যুপ তৈরি করত। আরেকটা মশলাযুক্ত স্যুপ তৈরি করত ঝিনুক দিয়ে, যা আমি একবসায় তিন বাটি সাবাড় করে দিতে পারতাম। আর এখন কিনা শেষমেশ আমি তার রান্না না করার একটা অজুহাতের সামনে দাঁড়িয়ে!
তার চেয়ারটা আমার দিক থেকে কোণাকুনি করে রাখা। সে প্রথমে সামুদ্রিক আগাছা থেকে চুঁইয়ে পড়া পানির মতো টলটলে স্যুপ মুখে দিল, তারপর লেটুসের পাতায় সয়াবিনের ক্বাথ আর তাতে কিছু ভাত মিশিয়ে পাতাটা মুড়ে নিয়ে হাল্কাভাবে চিবোতে থাকলো।
আমি তাকে বোঝাতে পারলাম না। বুঝতে পারলাম না, এমন বুদ্ধি এই মেয়েটার মাথায় কখন কিভাবে এল!
খাচ্ছ না যে? সে কথাটা এমনভাবে জিজ্ঞেস করল, যেমন করে পৃথিবীর তাবৎ মধ্যবয়স্ক নারীরা তাদের বাড়-বাড়ন্ত ছেলেদের করে। আমি খাবারের ব্যাপারে তার ফালতু অজুহাত শুনে নিরুত্তর বসে রইলাম। একটা কিমচি শব্দ করে খেতে থাকলাম। মনে হলো, শব্দটা যুগের পর যুগ ধরে চলেছে।
***

খুব কমই সে মুখে চামচ ওঠায় কিংবা কিছু খায়। তখন আমাকে যে বিষয়টা সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয় তা হচ্ছে, সে যৌনসংস্রব একেবারেই এড়িয়ে চলছে। আগে সে ইচ্ছা করেই আমার শারীরিক চাহিদা মেটাত এবং মাঝেমাঝে সেই প্রথমে এগিয়ে আসত। কিন্তু এখন এ ব্যাপারে টু শব্দটিও করে না।

বসন্ত চলে এল। আমার স্ত্রী তখনও তার কথা থেকে একচুল নড়েনি। আমি তখন পর্যন্ত তার ঠোঁট দিয়ে একটুকরা মাংস মুখগহ্বরে ঢুকতে দেখিনি। এ ব্যাপারে আমি অবশ্য কিছু বলি নাই। যখন কোন মানুষ এরকম মারাত্মক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে চায়, তখন কারো কিছু করার থাকে না। তখন কেবল কিছু না বলে তাকে তার মতো চলতে দেয়াই ভালো।
সে দিনদিন শুকিয়ে যেতে থাকল। চোয়াল লক্ষণীয়ভাবে উঁচু হয়ে গেল, আর মেকআপ ছাড়া একটা হাসপাতালের রুগীর মতো হয়ে গেল তার চামড়া। যদি ব্যাপারটা একটা মহিলার ওজন কমানো সংক্রান্ত হতো, তবে আমার কিছু যেত আসত না। কিন্তু ব্যাপারটা কোনো নারীর নিরামিষাশী হওয়া পর্যন্ত স্থির ছিল না। আমি বুঝতে পারলাম, এটা সেই স্বপ্নটাকে ঘিরেই ঘটছে আর এসবের মূলে তার সেই স্বপ্নই কাজ করছে। তাছাড়া সে ঘুমানো একরকম ছেড়েই দিয়েছে।
পরিচিত কেউ কখনও বলতে পারবে না, আমার স্ত্রী ঘুম বাদ দিয়ে কখনো কোন কিছু নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। আমি প্রায়ই বাড়ি ফিরে দেখতাম সে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু এখন আমি যদি মধ্যরাতেও ঘরে ফিরি, তারপর হাত-পা ধুয়ে ঘুমুতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই, তখনও সে শোবার ঘরে আসে না, আমাকে সঙ্গ দেয় না। সে বই পড়তে থাকে, ইন্টারনেটে চ্যাট করে কিংবা লেটনাইট টিভি দেখে। এরকম কোনো কিছু আগে ভাবা যেত না, কিন্তু ভাববার মতো এখন একটাই সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে, আর তা হচ্ছে কমিকস বাবলের জন্য সে হয়তো কাজ করে। তবে এজন্যে তার এতটা সময় লাগার কথা না।

আসলে…
কি?
একটা গন্ধ…
গন্ধ?
হ্যাঁ, তোমার শরীর থেকে মাংসের গন্ধ আসে।
আমি ভেবে পেলাম না, এর চেয়ে হাস্যকর আর কী শুনেছি জীবনে!

ভোর পাঁচটা বাজার আগ পর্যন্ত সে শুতে আসত না। তারপরও আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি না পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা সে আসলেই ঘুমায় কী ঘুমায় না। তার মুখ শুকনো থাকে, চুল এলোমেলো। নাশতার টেবিলে সে হয়ত তার সরু লাল চোখ দিয়ে আমাকে পর্যবেক্ষণ করে। খুব কমই সে মুখে চামচ ওঠায় কিংবা কিছু খায়। তখন আমাকে যে বিষয়টা সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয় তা হচ্ছে, সে যৌনসংস্রব একেবারেই এড়িয়ে চলছে।
আগে সে ইচ্ছা করেই আমার শারীরিক চাহিদা মেটাত এবং মাঝেমাঝে সেই প্রথমে এগিয়ে আসত। কিন্তু এখন এ ব্যাপারে টু শব্দটিও করে না। যদি আমার হাতটা তার কাঁধেও পড়ে, সে শান্তভাবে সরে যায়। একদিন আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে বললাম,
আসলে সমস্যাটা কোথায় বলতো?
আমি ক্লান্ত।
ঠিক আছে। এর মানে তোমার কিছু মাংস খাওয়া উচিত আর সেটা কর না বলেই তুমি কোন শক্তি পাচ্ছ না, তাই না? এখন তুমি যা করছো তাতে তো তুমি অভ্যস্ত নও।
আসলে…
কি?
একটা গন্ধ…
গন্ধ?
হ্যাঁ, তোমার শরীর থেকে মাংসের গন্ধ আসে।
আমি ভেবে পেলাম না, এর চেয়ে হাস্যকর আর কী শুনেছি জীবনে! আমি জিজ্ঞেস করলাম,
তুমি কি আমাকে গোসল করতে দেখনি, এখন? তাহলে কোথা থেকে গন্ধ এল, শুনি?
যেখান থেকে তোমার শরীরের ঘাম বের হয়, সেখান থেকে গন্ধটা আসে।
এবার ব্যাপারটা আর হাল্কা-পাতলা হাস্যকর কিছু বলে আমার মনে হল না। আমার মনে হল, হতেও পারে এটা অন্য কোন অসুখের পূর্বলক্ষণ। যদি এটা হিস্টিরিয়া, ডিল্যুশন, দুর্বল নার্ভ বা অন্য কিছুর ইঙ্গিত দেয়, কিংবা সে যা বলছে তা যদি আরও বড় কোন অসুখের খসড়া হয়ে থাকে? হলেও তা হতে পারে।
যা-ই ভাবি না কেন, সব ফলাফল একই দিকে এগুতে লাগল। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হল, আসলেই সে মাথা খারাপের দিকে এগুচ্ছে।
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্বের (পর্ব ১) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%99-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a7%80-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d/

পরবর্তী পর্বের লিংক (পর্ব ৩)

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%99-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a7%80-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ac-2/