হামীম কামরুল হক >> খুঁটিবিরোধী লোক >> ছোটগল্প

0
405

খুঁটিবিরোধী লোক

দিনটা শুরু হয় খুব বিচ্ছিরিভাবে, তাও ভাগ্যিস তরীর দেখা পাওয়া গেল, নইলে কী যে বিপদ হতো, লোক হিসেবে সে যে কেবল রাঙামূলাই নয়, এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় তারও যে সামান্য হলেও দরকার আছে, এটা আজ নতুন করে টের পেয়েছে সে, প্রতিদিনের মতো আজকে সকালে উঠেই লেবুর ঘ্রাণ নিয়েছে, এটা না পেলেই বলে খবর হবে, পেয়েছে যখন মানে এখনও সে ঠিক আছে, ধরেনি, নইলে কী দিন শুরু হয়েছিল আলীবাহারের, ওই সময়ে রাগে আর সে এদিক ওদিকও তাকানোর কোনো দরকার বোধ করেনি, সোজা গিয়ে দেয়ালে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে জিপার খুলে ছরছর করে মুততে শুরু করেছিল, বিড়বিড় করে গালি দিচ্ছিল, খানকির পোলা তোদের মারে চুদি খানকির পোলা, বাঞ্চোৎ; ঘটনা সামান্যই, এতে এত গালি দেওয়ার মতো কিছু ছিল না, যে-পথ দিয়ে তার মেসে যাওয়া সবচেয়ে সোজা, হঠাৎ করে বাঁশ দিয়ে আটকে দেওয়া হলো, কাউকে যেতে-আসতে দিচ্ছে না, মাস্ক ছাড়া বেরিয়ে তো মহামুশকিলে পড়া গেল; একটা মাস্ক কিনতে গেলেও তো কমপক্ষে দশটা টাকা দরকার, যদি এখন রাস্তার মাঝখানে, পাশে, কোনাকাঞ্চিতে এখানে ওখানে পড়ে থাকা মাস্কের ছড়াছড়ি, চাইলে একটা একটু পরিষ্কার মতো মাস্ক খুঁজে নিয়ে চালিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু তাতে আবার ভয়, যদি কিছু হয়; কদিন আগেই তো, তাদের বসের রুমে ফাইল নিয়ে যাওয়ার সময় বসের সামনে বসা লোকটা বলছিল, তার সেরে উঠতে তিন লাখ টাকা গেছে; শুনে আরেকটু হলে আলীবাহারের হাত থেকে ফাইলটা পড়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল, কিন্তু এখন কী করে, ভিক্ষা করে দশটা টাকা জোগাড় করবে নাকি? কিন্তু তাতেও তো কতগুলি মুশকিল, একে তো সে প্যান্টশার্ট পরা, তার ওপর চেহারাটা নুরানি, অফিসের পিয়ন বলে বোঝার কোনো কায়দা নেই, কেবল গলার স্বর ছাড়া, কথা বলতে শুরু করলেই বোঝা যায় স্বরে কোনো গাঢ়তা নেই, ভারিক্কি নেই, সে শুধু সল্প শিক্ষিত লোকই না, গলার স্বরের ভেতরে ধরা পড়ে সে ‘কিছু না’, ‘কেউ না’, টাকা নাই, পয়সা নাই, মানে ব্যাংকে কিছু জমা করা নাই, বাপ মা আর বোনকে রেখে কোথায় চলে গেছে আর ফিরে আসেনি, আলীবাহারের তখন কত আর বয়স, দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবন এলাকার কাছাকাছি এক জেলায় অনেক গহীনগ্রামে তার ভিটেবাড়ি, আজকাল আর অজপাড়াগাঁ বলার কোনো সুযোগ নেই, এখন তো সেই গ্রামের দোকানে দোকানে সিডি পাওয়া যায়, বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন, কম্পিউটার – কী নেই, সঞ্জয় দত্ত-অনিল কাপুর-সামিরা রেড্ডির ‘মুসাফির’ সিনেমাটা প্রথম দেখিয়েছিল সেই দোকানের গিট্টুমিয়া, তার ছোটবেলার বন্ধু, জন্ম থেকেই ওই নাম, একেবারে বাপমায়ের দেওয়া নাম গিট্টুমিয়া, সামিরাকে দেখে খুব গরম খেয়েছিল সেদিন, ‘ইসক কাভি কারিয়ো না’ আর ‘দূরসে পাস বোলানে আয়ে’ মনে পড়লে এখন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে সে, সিডিতে প্রথম দেখা সিনেমা, গিট্টু কইছিল, জাদু জাদু, সারা দুনিয়া এহন জাদুনগর হইয়ে গেছে, জাদুনগর থেকে জাদুনহর বইতিছে, বুঝতে পারিছো? আর তার নিজের মধ্যে কি জাদু আছে কে জানে, অফিসের অনেকেরই না করে দেওয়া হয়েছে, বা বলা হয়েছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পর আবার কাজে আসতে, ততদিন… কিন্তু তার বেলায় হয়নি, যদিও সামান্য বেতনের চাকরি, মেস ভাড়া দিয়ে, খাওয়া দাওয়ার পর মাত্র যে কটা টাকা থাকে – মা-বোনের জন্য পাঠিয়ে দেয়, দামু নামে ওদের মেসের একটা লোক ছিল, পার্কের মাগি লাগানোর ওস্তাদ, গত জানুয়ারি পর্যন্তও শ-খানিক হয়ে গেছিল, বলত, এক জিনিস দুবার লাগাই না, লাইফ ইজ ফর ওয়ান টাইম ইউজ; এখন চাকরি নেই, তাই সোজা গ্রামে ফিরে গেছে, সেখানে এখন আবার পানি বাড়ছে, ফোন করে সেদিন বলে, জলে কুমির ডাঙায় বাঘ অবস্থা, না খেয়ে মরার দশা, কটা টাকা বিকাশ করলে বড় উপকার হয়; তাকেও পাঠিয়েছিল শ পাঁচেক টাকা, এতে অবশ্য একটা কাজ হয়েছে, আর মেসের আরো দুজন চাইলে দামুর উছিলায় কিছু শুনিয়ে দেয়; তারা বলে, ভাই আপনার তো তাও চাকরিখান আছে, আমাগের কী হবে কন তো? কোথায় যাই? এসব বললে সে যে-ভাষায় উত্তর দেয়, তাতে তার আসল অবস্থা বোঝা যায়, মুখ খারাপের জন্য অফিসের আয়া সমিরনের কাছে একবার শুনতে হয়েছিল, চেহারায় রাজপুত্তর আর ব্যবহারে ফকিন্নির পুত; এই চেহারাটা নিয়ে ছোটবেলা থেকে বড় জ্বালা, মাদ্রাসায় পড়ার সময় এয়াকুব মোল্লা কিছু হলেই তার পাছার মাংস খাবলা দিয়ে ধরে পিষত, আর একজন তো রাতের বেলা ছাদে নিয়ে গিয়েছিল, কোনোমতে কান্নাকাটি করে রেহাই পেয়েছিল সে, এই চেহারা নিয়ে সে এখন ভিক্ষাও করতে পারবে না, করতে পারলে কটা টাকা জোগাড় করে একটা মাস্ক কিনে মেসে যেত, চেনা কাউকে বলতেও পারে না, একবার মনে হয়েছিল ফোন করে দামুকে বলে, টাকা পাঠাতে, আবার মনে হয়, টাকা তো পাবেই না শুধু শুধু ফোনের টাকা খরচ হবে, কিন্তু উপায় তো একটা বের করতে হবে, কেন আজকে বহুদিন পর মাত্র সিগারেট টানার ইচ্ছার জন্য বেরিয়েছিল, তারপর এককাপ রঙচা মেরে দিল, কীসে পেয়েছিল তাকে আজ! সে কি নবাব, হ্যাঁ, এইটুকু খরচ করাও তার কাছে নবাবি, এসব ফুটানিমারার কিছু নাই, টাকার অভাবে বিয়েটাও করা হলো না, বয়স বেড়ে যাচ্ছে, তার নিজের এই সুন্দর মুখ ধুয়ে তো আর পানি খাবে না, ‘‘পকেট গরম না হলে কোনো মাগি শরম তোলে না,” দামুর কথাটা মনে পড়ে, তুমি বিয়ে করতে যাও, আর বিয়ে ছাড়া লাগাতে যাও, ইয়োর পকেট সুড বি হট, দেন ইয়ু ক্যান হিট অ্যা হুকার; হুকার কী দামু ভাই? হুকার হইল হেই মাগি জো তুমসে পুকারতি হু, আও মেরে পাস, মেরা বডি কারো চাষ; বলে হো হো হাসি দামু ভাইয়ের, আপনে কী সব ইংরেজি কন! কোতথে পান, বুঝি না, ওইদিন একটা কী কইলেন, দিস ইজ অবনকশাস, বাপের জন্মে শুনি নাই ‘অবনকশাস’; দামু একটা সওদাগরি অফিসের হিসাব বিভাগে কাজ করে, আলীবাহারে বড় শখ হলো বুঝে না বুঝে ইংরেজি কাগজ পড়ার চেষ্টা, আর দামু ভাই রাজ্যের যত অখাদ্য বাংলা ম্যাগাজিন কোথা থেকে কিনে নিয়ে আসে, প্রচ্ছদে নারী-পুরুষের জড়াজড়ি আর কামড়াকামড়ির উৎকট ছবি; লক ডাউনের কামড়াকামড়িতে এখন দামুকেও কিছু বলা যাবে না, আশেপাশেও কাউকে চেনে না, পাড়ার চা সিগারেটের দোকান বা লন্ড্রি কোথাও তার কোনো লেনাদেনা যাওয়া-আসা কিছুই নেই, যে, কাউকে গিয়ে বলবে, ভাই দশটা টাকা দেন, একটু পরে দিয়ে যাচ্ছি, রিশকাভাড়া দিমু, ভাংতি নাই, – এমন পরিস্থিতিতে কোনোদিন পড়েনি, আর কী এক বালের অসুখ শুরু হইল, শালা তিনটা মাস হইয়া গেল, কোনো চ্যাটের কিছু করতে পারতেছে না কোনো হালায়, এত রাগ ওঠে, রাগ করার মতো লোক সে ছোটবেলায় একদমই ছিল না, রাগ দেখানো বাতিক ওঠে মাদ্রাসা থেকে পালানোর পর যতন ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার সময়, যতন ভাই তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল, ক্লাস ফোর ফাইভ পাস করে সিক্সে ওঠার পর তার চোখ ফুটতে শুরু করে, দামু ভাই কয়, ‘‘ধোনখাড়াইবো তো মনও দাঁড়াইবো” , যতনরা এমন ফুটফুটে বালককে বেছে নিয়েছিল আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির খরব দেওয়া-নেওয়ার কাজে, কিন্তু এ কাজ তার বেশি দিন ভালো লাগেনি, মারাও পড়তে পারত, তারপর আরেক দফা পালানো, এবার সোজা ঢাকা, ঢাকায়ও বেশি খোঁজ করা লাগেনি, দুম করে কাজ জুটে গিয়েছিল এক হোটেলে, তবে হোটেল বয়ের কাজ তার বেশি দিন ভালো লাগেনি, লাল টুকটুকে চেহারাই শুধু নয়, নিজেকে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার একটা বাতিক আছে তার, কেউ কেউ বলেছে যে তার বলে শূচিবাই আছে, আগে কোনো কিছু ধরার আগে, ধরার পর, বার বার হাত ধোয়ার অভ্যাসটা তার ছিল, এখন লোকজনকে দেখে এত দুঃখেও তার মজাও লাগে, এখন কেমন, হু! বলতে ইচ্ছা করে, আর এর জোরেই সে মনে করে তাকে ধরবে না কোনো রোগে, দামু ভাই বলে, আপনি মিয়া বাঁচবেন অনেক দিন, একশ না হলেও নব্বই তো হেসে খেলে; সে বলত, বেঁেচ আর কী হবে? এখন পর্যন্ত বিয়ে করতে পারলাম না, পিরিতটিরিত তো দূরের কথা; দামু বলে, এজন্যই তো বলি, চলেন আমার সঙ্গে, তরী…, থুক্কু, তরী না, অন্য কারো কাছে নিয়ে যামুনে, আর আপনের যা রসালো চেহারা না, ইস, বিউটি-চাঁদনিরা পাইলেই তো… আহা; এই চেহারা আর পরিষ্কার থাকা নিয়ে আরও কী কী করা যায় বলত দামু, কিন্তু ভিক্ষা তো করা যায় না, অবশ্য কেউ কেউ বলে, সুন্দর টিপটপ হয়ে কারো কাছে ধার চাইলে যত সহজে পাবেন, আলুথালু জামাকাপড় পরে, মুখে বাসি দাড়ি রেখে কারো কাছে ধার চাইলে তত সহজে পাবেন না, কিন্তু ভিক্ষা করতে হলে তো আলুথালু কাপড়চোপড়েই মানাবে; কিন্তু এখন করি কী; রাগে গা জ্বলে যাচ্ছিল তার, মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে, রাস্তায় কেউ নেই, তার মেসের লোকরা সবাই চলে গেছে গ্রামের বাড়ি, মেসবাড়িটা ছিল আগে সারভেন্ট কোয়াটার, পাকিস্তানি আমলে কোন বিহারি ব্যবসায়ীর করা, স্বাধীনতার পর এক নেতা বাড়িটা দখল করে, আগের দোতলা ভেঙে পাঁচ তলা হয় এরশাদের আমলে, তার আগে নেতা পার্টি বদল করেছিল, এখন পুরোবাড়িটাই ভাড়া দেওয়া, নেতা চলে গেছে গুলশান, এরশাদ বিদায়ের পর নেতাও বলে রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছে, বুড়াও হয়ে গেছে, ছেলেমেয়ে বলে সব বিদেশে, ঢাকায় কয়েকটা বাড়ি আছে নানান জায়গায়, সেইসব বাড়ির ভাড়াই বলে এখন তার সম্বল, নইলে আগে গেটে দারোয়ান থাকত, কত শান ছিল, শওকত ছিল লোকটার; মেসটা একতলার, দুটো কামরা, একপাশে রান্নাঘর, আর পেছনের দিকে আলাদা করে দুটো পায়খানা আর গোসলখানা, একটা ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের মতো ধরন বাড়িটার, কেন কোন কারণে পেছনের এই জায়গটায় মেসবাড়ি এতদিনেও রয়ে গেছে উত্তরে জেনেছিল, একবার স্বাধীন হওয়ার পর পর শুরুর দিকে মালিকের বাড়িতে ডাকাত পড়লে মেসের তরুণ ছেলেরা এক সাথে হয়ে তাদের ধরেছিল, ছেলেগুলির মধ্যে দু-তিনজন ছিল মুক্তিযুদ্ধফেরতা, আগে বাড়ির লোকেশানটা ছিল সামনের দিকে, এখন সামনে পেছনে পাশে বাড়ি উঠে ভেতর দিকে চলে গেছে, সদর রাস্তায় থাকলে কে ঠেকাত আলীবাহারকে, লোক তো সে দেখতে এমন ভদ্র, তাও পাত্তা দিল না, কেবল মাস্ক নেই বলেই ঢুকতে দিল না, কখন তার এলাকা রেডজোন না ডেঞ্জার জোন ঘোষণা করেছে Ñ তাও তো জানে না, রুমে একটাই টিভি ছিল, সেটা বেচে ঘরের ভাড়া শোধ করছে সবাই, সবাই চাঁদা তুলে কিনেছিল, আগামী আরো দুতিন মাস মেসটা তাদের থাকতে হতে পারে, তারপর মালিক কী করবে কে জানে, জনপ্রতি মাত্র দেড় হাজার টাকায় তিনটা বিছানায় ছয়জন থাকে এ মেসে: মিন্নাত-বাকির-সাকের-খসরু-দামু আর সে, এক কোণে একটা ফ্রিজ, সেটাও সবাই মিলে কিনেছে গতবছর, আলীবাহারের চাকরি থাকার পরও, ছুটি পাওয়ার পরও সে এবার ঈদে বাড়ি যায়নি, টাকা বাঁচানোটাই এখন তার সবচেয়ে বড় কাজ, এর আগে টাকার দাম সে কোনোদিন টের পায়নি, কানে ছড়ার মতো শোনে :‘‘চাকরি করলে সরকারি/ ব্যবসা করে তরকারি/ দোকান করলে ফার্মেসি আর গ্রোসারি/ প্রেম করলে পাশের বাড়ি,’’ আলীবাহার হাঁটতে হাঁটতে ফার্মগেটে চলে আসে, পকেটে টাকা থাকলে গাবতলি গিয়ে বাসে ওঠার কথাও একবার মাথায় ভেসে উঠে ডুবে যায়, টাকাই নাই তো নড়া কীভাবে সম্ভব, দামুকে তরী (তরী আসলে তাদের কাছে একটা রূপকথার নারী, প্রাচীনকালের কামধেনু, যে সব আশা পূরণ করে, সব বেদনা নিরাময় করে, এত শুনছে তরীর কথা, যেন মনে হতো দেখতে পাচ্ছে) বলত, টাকা না থাকলে টোকাও দেওয়া যায় না; তরীর স্বামী গার্মেন্টেসে আগুন লেগে মারা যায়, দুটো ছেলে নিয়ে সে অকূলপাথারে পড়ে, তখন দামু বলে তাকে বাঁচায়, সে তার অলিখিত স্বামী, ছেলে দুটো প্রাইভেট পড়তে গেলে সময়বুঝে তাদের শুরু হয়ে যায়, সেই বর্ণনা দামু খুব রসিয়ে আলীবাহার আর খসরুকে শোনায়; তারা দুজনে তরীর ছবি দেখতে চেয়েছিল, দামু দেখায়নি, খসরু তো বলে, চাপা মারে বুঝছ মিয়া, আমাগোরে মুরগি বোঝায়, ইস, ওয়ানটাইম ইউজের গল্প মারে, হালায় বাল একটা; ভাবলে ভাবো, চাপা, আমার কী! তাদের তো কিছু যায় আসেই, তাদের ভেতরে একমাত্র দামুই বিবাহিত, তাও তার কত খাঁই, পালোয়ানের মতো পেটানো শরীর, তাল তাল মাংস, কিন্তু চর্বিহীন, আর সে কত জায়গার কী সব ভ্রাম্যমাণ মেয়েমানুষ জোগাড় করে, ফার্মগেট থেকে প্রায় নিয়ে আসে যখন কেউ বাসায় থাকে না, ফার্মগেট হলো মুরগি ধরার আসল জায়গা, দামু বলত; আলীবাহার আনমনেই হাঁটতে হাঁটতে ফার্মগেটের দিকেই চলে আসে, ব্রিজে উঠে কিছুক্ষণ ওপরে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর আবার যেদিক দিয়ে এসেছিল সেদিকেই নেমে যায়, আর এবার যন্ত্রচালিতের মতো নিজের বাসার দিকে হাঁটা দেয়, চোখে ফাঁকা দৃষ্টি, একটু খেয়াল করলে মনে হবে লোকটা অন্ধের মতো হাঁটছে, তখন আবছ কী একটা অবয়ব তার ঠিক মাথা বরাবর দাঁড়িয়ে রীতিমতো পথ আটকায়, আলীবাহারের ঝাপসা চোখে আস্তে আস্তে অবয়বটা স্পষ্ট হয়, সে অস্ফুটে মুগ্ধ উচ্চারণে বলে, তরী! সামনে দাঁড়ানো ঘোমটাওয়ালা বড়সড় মহিলাটিও একটু ভ্যাবাচ্যাকা খায়, তাকে এমন আদর লাগা স্বরে কেউ কোনোদিন ডাকেনি, আপনে বাহার ভাই? আলীবাহার আগে কোনোদিন তরীকে দেখেনি, তরীরও কোনোদিন আলীবাহারের সঙ্গে দেখা হয়নি, কিন্তু আলীবাহার জানে না তরীর কাছে আলীবাহারের ছবি পাঠিয়েছে দামু, দমিরুদ্দিন দামু নামে ফেসবুক আছে দামুর, আর তরী খাতুন নামে তরীর, সেসবও আলীবাহারের জানা নেই, সে কোনোমতে বলে, হ্যাঁ; তারপর দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে, আলীবাহারের রক্ত ঝমঝম বাজতে থাকে, কী বলে কথা শুরু করবে বুঝে পায় না, সামনে দাঁড়ানোর সময় তরী তার মাস্ক খুলে ফেলেছিল, আর আলীবাহারের তো কোনো মাস্কই নেই, পাশাপাশি হাঁটতে দুজনকেই মনে হচ্ছিল Ñ কে কার সঙ্গে কী বলবে প্রথমে বুঝে উঠতে পারছে না, দামু তরীর যে বর্ণনা তাদের দিয়েছিল, তাতে সে এক মহাখেলুড়ে মাল, সেসব শুনতে যত পুলক জেগেছিল, সামনাসামনি তরীকে দেখে, সেই পুলকটা ততই মুছে যেতে থাকে, শান্ত বড় বড় চোখের ভরাট মুখের অতি সাধারণ নারী সে, তরীই কথা শুরু করে, আজকে সে কাজে যাবে না, আজকে সে বের হয়েছে আলীবাহারের খোঁজে, মেসবাড়িতে গিয়ে পায়নি বলে ফেরত আসছিল, আলীবাহারের ফোন যে-রাতের বেলায় নীরব করা ছিল, তাই সে তরীর এতগুলি ফোনের একটাও বুঝতে পারেনি, তরী যখন বলে, সকাল থেইকা আপনারে অনেক বার রিং দিসি? ধরেন নাইযে! তখনই আলীবাহারের বিষয়টা খেয়াল হয়, তাই তো, সে ফোন বের করে দেখে, একটু লজ্জিতও হয়, কিছু না পেয়ে বলে, আপনি আমারে চিনলেন কী কইরে? উল্টো তরীর বলে, আপনেও তো চিনলেন, দামু সাহেব কি আপনারে আমার ছবি দেখাইছিল কোনোদিন; কী করে বলে, ছবির বদলে যা দেখিয়েছে কথা দিয়ে তা তরীকে কী বলা যায়, একনজরে যেটুকু বুঝেছে তা হলো সুতির শাড়ি পরলেও তরীর ভরাট গড়ন গঠনটা আড়ালে পড়ে যায়নি, সে বলে, তো আমার খোঁজে ক্যান? আপনি আমারে আগে আপনার মেসে নিয়ে চলেন, তারপর কমুনে; এমন সহজ সাবলীলভাবে কথা বলে তরী যেন অনেকদিন না হলেও আলীবাহারের সঙ্গে তার আগেও বেশ কয়েকবার আলাপ হয়েছে, এবং সেই আলাপের সূত্রে সে মানুষ হিসেবে আলীবাহারকে ও আলীবাহারও তরীকে পছন্দ করেছে, সেইসঙ্গে এমন একটা ভাব আছে বলবার ধরনে যেন আগেও তাদের মেসে গিয়েছে অনেকবার; তরী কি জানে দামুর বৌ আছে, একগাদা ছেলেমেয়ে আছে, তারপরও দামুর ওপর অনেক টান কথার ধরনে সে বুঝতে পারে, আলীবাহারের এবার মনে হয় মেস তো দূরের কথা, সে তো এলাকায়ই ঢুকতে পারছে না, আপনে মেসে গেছেন, আপনারে আটকায় নাই? হ, আটকাইছেতো, আমি কইছি, আমার বুইনের বাড়ি এহানে, আমার কথার দমকে দিলো তো ছাইড়া; আলীবাহার বুঝতে পারে তরীর কথায় সত্যি একটা জোর আছে, যেটা একেবারে খাঁটি, ভেতর থেকে আসা জোর, আলীবাহার বলে, আমি ঘর থেকে খালি পকেটে বারাইছিলাম, সিগারেটের নেশা চাপছিল, একটা ধরিয়ে আর সঙ্গে চা খেয়ে দেখি পকেটে যে টাকা আসে তা দিয়া মাস্ক কেনা যায় না, আর আমারে যে আটকান দিলো, কোনো কথাই শুনল না, উল্টা কয়, মাস্ক ছাড়া বাইরাইছেন, ভালো চান তো দ্রæত ভাগেন, নইলে বিপদ হইব কিন্তু; হঠাৎ তরী বলে, খাড়ান; বলেই সে দেখে তরী একটা ফার্মেসির দিকে যায়, আর দুটো মাস্ক কিনে ফিরে আসে, নেন; বলে দুটো মাস্কই তার হাতে দেয়, এবার আর সমস্যা হইব না; তারা যখন মেস বাড়িতে আসে, তখন আলীবাহারের পেটটায় খিদার চোঁ চোঁ ওঠে, সে বলে, আপনি নাস্তা করছেন? হ, কিন্তু আপনি তো করেন নাই, তাই না, চিন্তা নাই, আমি যখন আইসা পড়ছি, আপনার আর চিন্তা নাই; তরী খুব সহজে তার সঙ্গে মেসবাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে, দরজার তালা খুলে আগে তরী ভেতরে যায়, তারপর ঢোকে আলীবাহার, জীবনে প্রথম কোনো ঘরে একলা কোনো নারীর সঙ্গে সে, কেমন একটা খচখচ করতে থাকে, তরী কি সুন্দর ঘরে কোনায় রাখা খাটটায় গিয়ে বসে, আলীবাহার বলে, ওই খাটটাই দামু ভাইয়ের; জানি; কেমনে? ছবি পাঠাইছে না, আজকাল কিছু চিনতে হইলে গিয়া দেখতে হয় নাকি, সব কিছু তো ছবি হয়ে করা যায়; তাই তো, আলীবাহারের নিজেকে একটু বোকা বোকা লাগে, তরী কী অবলীলায় রান্নাঘরে যায়, কোনখানে কী আছে তাও যেন সব জানা, আলীবাহারকে বলে, আপনি হাতমুখ ধুইয়া আসেন, আলীবাহার সকালে গোসল করে, তাই সে গোসলে যায়, গোসল শেষে সে যখন খালি গায়ে আসে, অনেকক্ষণ খেয়ালই করেনি তার পরনে লুঙ্গি ছাড়া কিছু নাই, তরী একটা বিছানায় খবরের কাগজ পেতে খাবারের পাত পাতে, কী সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়া সব, এতে আলীবাহারের খিদে আরো বেড়ে যায়, তরী গিয়ে দামুর বিছানায় বসে, তারপর বলে, তো যে-জন্য আসা, তরী খুব স্পষ্ট গলায় বলে, তার স্বর যেন পুরো বদলে গেছে, শুদ্ধ বাংলার টানটা হঠাৎ কোথা থেকে তার কণ্ঠে ভর করে টানটান হয়ে ওঠে, যেমন করে আলীবাহারের বস কথা বলে তেমন বাংলায়, সেটা হলো, এই খাটের নিচে একটা ট্রাংক আছে, তার চাবি আমার কাছে, আমি দামু সাহেবের কাছে কিছু টাকা রেখেছিলাম, সেটা তিনি আমাকে নিয়ে যেতে বলেছেন, কিন্তু মেসের চাবিও আমার কাছে ছিল, ডুপ্লিকেট চাবি, কিন্তু আপনাকে না বলে এ ঘরে ঢোকা আর টাকা না নিয়ে চলে যাওয়া খুব বাজে দেখায় বিধায় কাজটা করিনি, তাছাড়া হঠাৎ আমাকে দেখে কেউ তো চোরও মনে করতে পারে; আলীবাহার ঠিক বুঝতে পারে না, দামু তো বলেনি এরকম কিছু, তখন আলীবাহার আরো কিছু শুনতে পায়, জানতে পারে, কয়েক বাসায় কাজ করে অনেক টাকা আয় করে তরী খাতুন, তার রান্না যে খেয়েছে, কোনোদিন আর অন্য কারো রান্না সে লোকের মুখে রুচবে না, তরীর কাছে জানতে পায়, কদিন আগে নয়, বরং লকডাউনের শুরুতেই দামুর চাকরি চলে যায়, তখন সে মেসের লোকের সঙ্গে যেটা করত তা হলো অভিনয়, সে যেতো আসলে তার কাছে; নয়াটোলা পাগলামাজারে একটা ঘর ভাড়া করে দুই ছেলে নিয়ে তরী থাকে, বারোয়ারি ঘর, দুপাশে পর পর তিনটা একরুমের ঘর, শেষ দিকে দুপাশে তিন-তিনটা মানে মোট ছটা ঘরের জন্য দুটো দুটো করে দুটো টয়লেট-দুটো বাথরুম, সেখানেই সময়টা কাটাতো দামু, লোকটা নামেও দামু, কাজেও দম অনেক, খুব খোলামেলা বলতে থাকে তরী, আলীবাহার বিহ্বল হয়ে শুনতে থাকে, শুনতে শুনতে হঠাৎ বলে, আপনি জানেন, দামুর বৌ আছে, চারটা ছেলেমেয়ে আছে? জানব না কেন? যা আছে তারা তার জায়গায় আছে, আমার স্বামী পুড়ে মারা যাওয়ার সময় কেমন করে যে দামুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, খোদার রস্তে, নইলে কোথায় যে ভাইসা যাইতাম! তরীর গলাটা হঠাৎ ধরে আসে, লোকটার মনটা খুব বড়, জানেন, আমার জন্য সে অনেক করেছে, শুধু তো টাকা দিয়েই মানুষের পাশে দাঁড়ায় না, আমার থেকে সে অনেক টাকা নিছে কিন্তু কেন নিছে জানেন, আমাকে কিন্তু বলেনি, আমার টাকা সে দেশের বাড়িতে পাঠাইছে, আমি জানি, ওর বৌর অনেকদিন ধরেই শরীর ভালো না, বড় মেয়েটাই মায়ের মতো কইরা তিনটা ভাইকে দেখাশোনা করতেছে, মায়েরও সেবা করে, দামু আপনাদের এসব হয়ত কোনোদিন কয় নাই, কিন্তু আমি জানি, আমারে সে সব কয়, আমাকে সে অনেক বিশ্বাস করে; একটু আনমনা হয়ে যায় তরী; আর তুমি করো না তারে? হঠাৎ আলীবাহার ‘তুমি’ বলে ফেলে, আর তাতে তরীও কিছু মনে করে না, আলীবাহারেরও কিছু মনে হয় না, তরী বলে, করি বলেই তো এতগুলি টাকা আমি তার কাছে রাখতে দিছি, আর ট্রাংক খুললেই বুঝবেন, সে আমাকে কত বিশ্বাস করে; আলীবাহার দেখেছিল এই ট্রাংকটা একটা শেকল দিয়ে খাটের একটা পায়ার সঙ্গে বাধা, রট আয়রনের খাটের পায়ার সঙ্গে একটা নকশার ভেতরে কায়দা করে শেকলটা দেওয়া, আজ বুঝতে পারে কেন; নাস্তা খেয়ে উঠলে তরী সব নিয়ে গুছিয়ে রান্নাঘরে যায়, তারপর থালাবাটি ধুয়ে ভাত চড়িয়ে দিয়ে আলীবাহারকে নিজেই টাকা দেয়, বাজারে যান, সে তাকে গরুর গোস আনতে পাঠায়, হাতে এতগুলি টাকা পেয়ে প্রথমে একটু চমকে ওঠে, তরী বলে, গরিব হইতে পারি, ছোটলোক নই, বলেই খিলখিল করে হাসে, বাংলা সিনেমার ডায়লগ বললাম, না! নিয়ে আসেন, আজই আপনাকে আমার হাতের মাংসভুনা খাওয়াইয়া তারপর যামু, কেমন, পারলে একটু শসা আর টোমেটু আইনেন, সালাদ করমু; দিনটা হঠাৎ কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যায়, এমন দিন কোনোদিন তার জীবনে আসেনি, আলীবাহার বুঝতে পারে না সে বিবাহিত না অবিবাহিত, তরী যেন ঠিক তার বিয়ে করা বৌ, একবার ভাবে দামুকে ফোন করে বিষয়টা জানায়, আসলে ঠিক কিনা, কিন্তু ওই যে তরীর কণ্ঠে এমন জোর আছে, অবলীলায় তাকে বিশ্বাস করা যায় কিনা বলা পুরোটা না গেলেও যে কাউকে সম্মত করার ক্ষমতা রাখে তার কণ্ঠস্বর, আবার তাতে একেবারেই কোনো হুকুমদারির লেশমাত্র নেই; ফিরে এসে দেখে ডাল রান্না হওয়ার পথে, আর মাংস রান্নার জন্য পেয়াজ রসুন আদা জিরা গরমমশলা এলাচ দারুচিনি দিয়ে মশলা তৈরি করে ফেলেছে পাটানোড়াতে, সত্যিই একদম বৌ; বাজার থেকে ফিরে আলীবাহারের অনেক ঘুম পায়, ঘুম থেকে উঠে দেখে তরী সুন্দর করে সেজেছে, ট্রাংক খুলে তা থেকে কয়েকটা শাড়িও বের করে বিছানায় রাখা, আলীবাহারের মনে হয়, সব কিছু কেমন অচেনা লাগছে, একটা ভালো লাগা আর ভয় মিশে কী যেন একটা অবস্থা, ঠিক বলার মতো না, মুখে তাকে কেমন লাগছে জানাতে না চাইলেও আলীবাহার বলেই ফেলে, একদম ঘরের বৌ বৌ লাগছে; শুনে প্রথমে খুব খুশি দেখায় তরীকে, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আর বৌ, আর বিয়া; হঠাৎ আলীবাহারের একেবারে ঠোঁটেই এসে পড়ছিল, আমাকে বিয়ে করো তরী; কিন্তু আলীবাহার নিজেকে সামলায়, হাতমুখে পানি দিতে ঘরের পেছনে বাথরুমে যায়, সেখানে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবার বোঝে, সে খালি গায়েই আছে, কিন্তু তার কোনো শরম জাগে না, ফিরে এসে দেখে সকালের মতোই বিছানায় সুন্দর করে খবরের কাগজ বিছিয়ে পাত পেতেছে তরী, আলীবাহার বিছানায় উঠে আসনপিঁড়ি করে বসে, তরী তাকে বেড়ে দিতে থাকে, মাংসের গন্ধ নাকে এসে লাগে, তুমিও বসো? আপনি খেয়ে নেন; আলীবাহারকে কতনা যতœ নিয়ে খাবার বেড়ে দেয়, বাইরের যে কেউ তাদের দেখলে স্বামী-স্ত্রী ছাড়া কিছু মনে করবে না, ঠিক এসময় ফোনটা বেজে ওঠে, দামুর ফোন, আশ্চর্য! আলীবাহার বাম হাতে ফোনটা ধরে কথা বলে; দামু রাজ্যের কৌতুক এনে জানতে চায়, কী পাত্রী পছন্দ হইছে? উত্তর দিতে গিয়ে আলীবাহার বলেই ফেলে, না হয়ে উপায় কী! সে খেয়াল করে না ততক্ষণে সারা ঘর জুড়ে বিচিত্র রঙের নানান জাতের সব পাখি উড়তে শুরু করেছে, আলীবাহারের দুই কাঁধ ততক্ষণে ডানা, তরীও পরি, দুজনে সব ফেলে, লকডাউনের সব বাধা ভেঙে উড়াল দেয় এমন এক আকাশে, যে-আকাশের খোঁজ তারা কেউ জানত না।