হারুকি মুরাকামি >> জন্মদিনের মেয়ে >> তর্জমা : ফারহানা আনন্দময়ী >> ছোটগল্প

0
1419

হারুকি মুরাকামি >> জন্মদিনের মেয়ে 

যে মেয়েটির কথা বলছি, সে এই রেস্তরাঁর ওয়েটার আর সেদিন ছিল ওর জন্মদিন, ২০তম জন্মদিন। এমনিতে অন্যান্য শুক্রবারগুলোতে সে রেস্তরাঁয় কাজ করে। তবে সবকিছু তার পরিকল্পনা মতো এগুলে, এই শুক্রবারে ওর কাজে না-আসারই কথা। সহকর্মী মেয়েটির সাথে তার সেরকমই কথা হয়েছিল। কে-ই বা চায়, জন্মদিনে পাচকের রক্তচক্ষু দেখে আর চিৎকার শুনতে শুনতে অতিথিদের টেবিলে পাম্পকিন গুচি আর সিফুড ফ্রিটো এগিয়ে দিতে! কিন্তু শেষপর্যন্ত তাই-ই করতে হলো তাকে। সহকর্মী মেয়েটি খুব অল্প সময় আগে জানালো, ১০৪ ডিগ্রি জ্বর গায়ে নিয়ে সে ভুগছে; আর ডায়রিয়ার দুর্বলতায় সারাদিন বিছানায় পড়ে আছে। আসা সম্ভব নয় এই শুক্রবারে।
সহকর্মীটি বারবার দুঃখিত বলে ক্ষমা চাইছে যখন, তখন সে বললো, “এটা নিয়ে তুমি একেবারেই ভেবো না। হলোই বা আমার ২০তম জন্মদিন, তবে আমি এমন বিশেষ কিছুই তো করছি না।”
আর হতাশ হওয়ার মতো তেমন কিছু বাকি ছিল না। আজকের সন্ধ্যায় যাদের সাথে ওর সময় কাটানোর কথা ছিল, তারা তো আর আজ আসবে না। কিছুদিন আগে ওর সেই ছেলেবন্ধুর সাথে তর্কাতর্কি এমনই তুমুল পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ওই কথারাখার সম্ভাবনার সবটুকু শেষ। সেই হাইস্কুলের জীবন থেকে দুজনের সম্পর্ক। কিন্তু সেদিন তুচ্ছ একটি বিষয় নিয়ে বিবাদ এমনই তিক্ততার তুঙ্গে উঠলো, মেয়েটি বাধ্য হলো সম্পর্কটাতে ইতি টানতে। ওর ভেতরের অনুভূতিগুলো কেমন পাথরের মতোন জড়তুল্য হয়ে গেল, এক অর্থে মৃত। আর তারপর থেকেই, না ছেলেটি ওকে ফোন করলো, না মেয়েটিও একবারও যোগাযোগ করলো!
টোকিওর টনি রপোঙ্গি এলাকায় বেশ নামকরা একটি ইতালিয়ান রেস্তরাঁয় সে কাজ করতো। ছয়ের দশকের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত রেস্তরাঁটি তাদের খাবারের মান বজায় রেখে সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখে চলেছে। যারা আসেন অতিথি এবং ক্রেতা হয়ে, তাদের অনেকেই বারেবারে এখানেই ঘুরে ঘুরে আসেন; কোনোদিন কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি তাদের কাছ থেকে। রেস্তরাঁর ভেতরের পরিবেশটাও ছিল খুবই শান্ত আর আরামদায়ক। যেটা আলাদা করে বলার বিষয় তা হলো, তরুণদের চাইতে একটু পরিণত বয়সের মানুষেরাই এখানে সবসময় আসে। তাদের মধ্যে আবার খ্যাতনামা মঞ্চশিল্পী আর লেখকদেরই দেখা যেত বেশি।
দুজন পূর্ণকালীন সময়ের ওয়েটার ছাড়াও সে আর আরেকটি মেয়ে এই রেস্তরাঁয় কাজ করতো খণ্ডকালীন কর্মী হিসেবে; সপ্তাহে তিনদিন, বিকল্প দিনে। আর আছেন একজন ম্যানেজার আর রিসিপশনে একজন মধ্যবয়স্ক নারী বসেন রেস্তরাঁ খোলার শুরুর দিন থেকেই। ভীষণ বিষণ্ণমুখে বসে থাকা নারীটির কাজ হলো, অতিথিদের কাছ থেকে বিলের টাকা বুঝে নেয়া আর ফোনে জিজ্ঞাসার উত্তর দেয়া। চোখে-মুখে এতটাই নির্লিপ্তি যে প্রয়োজন ছাড়া বাড়তি একটি কথাও বলতেন না। আর প্রতিদিনই প্রায় পরে আসতেন কালো রঙের একই পোশাক। তার আচরণে এমন শীতলতা আর কাঠিন্য জুড়ে থাকতো, যেন গভীর অন্ধকার রাতে নারীটিকে সমুদ্রে রেখে আসলে, কোনো জাহাজ তার সাথে ধাক্কা লাগলে, জাহাজটিই ডুবে যাবে।
ফ্লোর-ম্যানেজারের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে। দীর্ঘদেহী চওড়া কাঁধের একজন মানুষ, দেখলে মনে হবে আগে অর্থাৎ তরুণবয়সে তিনি খেলোয়ার ছিলেন হয়তো। কিন্তু এখন মেদ আর মাংস জমে তার পেট আর থুতনির নিচটা অনেক ভারী করে তুলেছে। মাথার চুলও অনেকটা পাতলা হয়েছে বলে ছোট ছোট করে কেটে রাখেন তিনি। গায়ের মধ্যে কেমন একটা বুড়োটে গন্ধও আছে; ড্রয়ারে অনেকদিন ধরে কোনো কাশির ওষুধ কাগজে পেচিয়ে রাখলে যেমন গন্ধ বেরোয়, খানিকটা সেরকম। মেয়েটি বয়স্ক একজন অবিবাহিত চাচার গায়ে ঠিক এই গন্ধটিই পেতো।
এই ম্যানেজারও প্রায় সময়ই কালো একটা স্যুট পরে থাকেন, আর বো-টাই তো থাকেই। এবং তার অহঙ্কারের জায়গাটি হলো, সে আয়না না দেখেই প্রতিদিন বো-টাইটি বাঁধতে পারে; অনেকের মতো আগে-বাঁধা বো-টাই গলা দিয়ে ঝুলিয়ে দেয় না। বেশিরভাগ সময়ে তিনি দরজার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে অতিথিদেরকে স্বাগত জানান, বিদায় দেন। খেয়াল করে মনে রাখেন কোন টেবিল কার নামে সংরক্ষণ করা আছে, এমনকি তাদের নাম তার মুখস্থ, যে অতিথিরা বারবার আসেন। আরো কত কী করেন! অতিথিদের সামান্যতম অভিযোগও যদি থাকে, তা তিনি হাসিমুখে শোনেন, পানীয় পছন্দ করার বিষয়েও তাদেরকে ভালোমন্দ পরামর্শ দেন আর যেটা তাকে সবসময় করতে হয়, তা হলো রেস্তরাঁর অন্য কর্মীদের আচরণ খেয়াল করা, কাজে ফাঁকি দিচ্ছে কিনা সেটাও দেখা। একইসঙ্গে এই রেস্তরাঁর মালিককে রাতের খাওয়াটা তার রুমে পৌঁছে দেয়াটা ম্যানেজারের বিশেষ আরেকটি কাজ। আর এই সমস্ত কাজ তিনি গভীর মনোযোগ আর আনুগত্যের সাথে দিনের পর দিন করতেন।
“এই যে রেস্তরাঁ, এই ভবনেরই ছয়তলায় মালিক থাকতেন, সেটা অফিস বলা যায় কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট বা ওরকম জাতীয় কিছু একটা।” মেয়েটি এই কথাগুলো আমাকে বলছিল, যখন কোনো একটা সময়ে আমরা একসাথে বসে আমাদের নিজেদের জীবনের ২০তম জন্মদিনটা কেমন কেটেছে বা কাটবে, সেটা নিয়ে আলাপ করছিলাম। যে কারো জীবনে কুড়ি বছরে প্রবেশ করা বিষয়টা নিশ্চয়ই বিশেষ কিছু। যদিও মেয়েটি ২০তম জন্মদিন পেরিয়ে এসেছে আজ থেকে দশ বছরেরও আগে!
“তিনি কখনোই রেস্তরাঁয় আসতেন না। এখানকার কেউ তার মুখ পর্যন্ত কোনো দিন দেখেনি। একমাত্র ম্যানেজারই তাকে দেখেছিল। কারণ কেবল তারই অনুমতি ছিল খাবারটা বয়ে নিয়ে ছয়তলার ঘরে মালিককে পৌঁছে দেয়া,” মেয়েটি আমাকে বলছিল ওর রেস্তরাঁর মালিকের কথা।
“তো কী দাঁড়ালো! মালিক তার নিজের রেস্তরাঁ থেকেই খাবার হোম-ডেলিভারি নিতেন!”
“হুম, ঠিক বলেছ। প্রত্যেক রাতে ঠিক আটটা বাজলে ম্যানেজার রাতের খাবার নিয়ে তার ঘরে দিতো যেত। আর ঠিক ওই সময়টাই তো রেস্তরাঁয় সবচেয়ে ভিড়ের সময়, ব্যস্ত সময়। তাই ম্যানেজার তখন ফ্লোরে না থাকলে বড্ড সমস্যায় পড়তাম আমরা। কিন্তু কিছু করার ছিল না। এই নিয়মই প্রথম থেকে চলে আসছিল। রুম সার্ভিসের জন্য যে ছোট চাকাওয়ালা টেবিলটা ছিল, সেটায় করে রাতের খাবার নিয়ে সে প্রতিদিন আটটায় এলিভেটরে চড়ে উপরে যেত। একটু পরে খালি হাতে ফিরতো। আবার ঠিক এক ঘণ্টা পরে উপরে গিয়ে খালি বাসনপত্তর নিয়ে নিচে ফিরে আসতো। এই রীতির কখনো অন্যথা ঘটেনি। প্রথম দিকের দিনগুলোতে কিছুটা বিরক্ত লাগলেও, দেখতে দেখতে আমিও এমনই অভ্যস্ত হয়ে গেলাম, মাঝে মাঝে মনে হতো, এ যেন এক ধর্মীয় প্রথা!” মেয়েটি বললো।
রেস্তরাঁর মালিক মুরগির মাংস খেত প্রতিদিনই। সেই সঙ্গে অন্য খাবার বা সব্জি রান্নায় খানিকটা ভিন্নতা আনা হলেও, প্রধান যে খাবার, সেই খাবারটি প্রতিদিনই একইরকম স্বাদে রান্না করা হতো। রান্নাঘরের এক তরুণ পাচক মেয়েটিকে নাকি একবার বলেছিল, আমরা একট মুরগির মাংসকে কতভাবে, কতরকম মশল্লা দিয়ে রাঁধতে পারি। অথচ মালিকের সেই মুরগির মাংসটা ওদেরকে একইরকমভাবে রাঁধতে হতো। তবে একঘেয়ে এই রান্না খেয়েও মালিক কোনোদিন কোনো অভিযোগ পাঠাননি।
নভেম্বরের ১৭ তারিখ, তার ২০তম জন্মদিন, রেস্তরাঁর কাজ অন্যান্য দিনের মতোই শুরু হলো। সেদিন দুপুরের পর থেকে অঝরে বৃষ্টি ঝরছিল, আর সন্ধ্যা হতেই বাইরে সব জলে থইথই অবস্থা। এরকম দিনে খাবারের তালিকায় বিশেষ কিছু রান্না যোগ হতো। ম্যানেজার বিকেল পাঁচটা বাজতেই সব কর্মীদেরকে একজায়গায় জড়ো করে খাবারের বিষয়ে জানিয়ে দিচ্ছিল। ওয়েটাররা সেগুলো কাগজে লিখে নিতে পারতো না, শুনে মুখস্থ রাখতে হতো। ম্যানেজার একটা টেবিলে বসে ওয়েটারদের কাছ থেকে প্রশ্ন করে জেনে নিতো, অতিথিরা কোন খাবারটা বেশি পছন্দ করে, বেশি অর্ডার করে। সেদিন খাবারের তালিকায় রাখা হলো ভিল মেলানিজ, ক্যাবেজ আর সার্ডিন দিয়ে পাস্তা আর বাদামের মুজ। এরপরে দেয়া হলো ওয়েটারদের খাবারের তালিকা; কারণ এখানে ওয়েটারদেরকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় রেখে টেবিলে অতিথিদের খাবার এগিয়ে দেয়ার চল ছিল না।
সন্ধ্যা ছ’টা বাজতেই রেস্তরাঁ খুললো ঠিকই, কিন্তু অতিবর্ষণের জন্য খুব কম সংখ্যক অতিথি আসছিল, তাও অনেকটা সময় পরপর। এমনও হতে পারে, নারীরা তাদের পোশাক ভিজে নষ্ট হয়ে যাবে বলে হয়তো বেরোতে চাইছিল না সেদিন। অনেক সংরক্ষিত টেবিলের অতিথিরাও তাদের আসার পরিকল্পনা বাতিল করলো। ম্যানেজার এদিক ওদিক ঘুরছে, ওয়েটাররা এর-ওর কথা বলছে, সব কেমন ঢিলেঢালা। মেয়েটিও রেস্তরাঁর এককোণে দাঁড়িয়ে একটা টেবিলের অতিথিদেরকে দেখছিল আর ছাদের মিউজিক-সিস্টেম থেকে মৃদুস্বরে ভেসে আসা সুর শুনছিল। পুরো রেস্তরাঁর ভেতরটায় কেমন ভরে যাচ্ছিল শেষ-হেমন্তের বৃষ্টির গন্ধে।
এসবের মধ্যেই সাড়ে সাতটা বাজতেই ম্যানেজার হঠাৎ অসুস্থবোধ করতে লাগলো। পেটটা চেপে ধরে ঘামতে থাকলো, চেয়ারে বসে পড়লো। নিজে থেকেই বললো, “এখন হাসপাতালে যাওয়াটা খুবই জরুরি আমার জন্য।” এত বছরে একদিনের জন্যও তাকে কেউ অসুস্থ হতে দেখেনি, কোনোদিন সে রেস্তরাঁয় হাজির হয়নি, এমনটা ঘটেনি। বো-টাই পরার মতো এটাও ছিল তার জন্য গৌরবের বিষয়। কিন্তু আজ সে সত্যিই অসুস্থ হয়ে পড়লো। মেয়েটি একটি ছাতা নিয়ে ম্যানেজারকে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিল এবং একজন ওয়েটার কাছের একটা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্যাব ডেকে তুলে নিলো ম্যানেজারকে। ম্যানেজার ক্যাবে বসতে বসতে একটু গলা উঁচিয়ে মেয়েটিকে বলে গেল, “ঠিক আটটা বাজলে খাবার নিয়ে আজ তুমিই যাবে উপরে; রুম নাম্বার ৬০৪। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু বলবে, আপনার রাতের খাবার এনেছি।”
“রুম ৬০৪? আচ্ছা, ঠিক আছে।” সে বললো।
“একদম ঠিক আটটায়। মনে রেখো।” বলেই ম্যানেজার রওনা দিল।
বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছিলো না, তাই অতিথিরাও আসছিল অনেকক্ষণ পরপর এবং দু’চারটা টেবিলের বেশি ভরলোও না। একদিকে ভালোই হলো, এমন সন্ধ্যাবেলার ভিড়ের সময়ে ম্যানেজার আর একজন ওয়েটারের অনুপস্থিতি খুব বেশি সমস্যায় ফেলে দিতো বাকি ওয়েটারদেরকে, যদি আজ আবহাওয়া ভালো থাকতো।
ঠিক আটটার সময়ে মালিকের খাবার প্রস্তুত হলে সে সেই চাকাওয়ালা টেবিলটায় খাবার সাজিয়ে এলিভেটরে উঠে গেল। আধা বোতল রেড ওয়াইন, কেটলিতে কফি, ভাঁপ দেয়া সব্জির সাথে মুরগির মাংস, ডিনার-রোল আর সামান্য মাখন… এই ছিল সে রাতে মালিকের খাদ্যতালিকায়। উপরে উঠতে উঠতে খাবারের গন্ধে আর বৃষ্টির গন্ধে পুরো এলিভেটর ভরে গেল। এলিভেটরে ফোঁটা ফোঁটা জল দেখে সে বুঝে গেল, কেউ হয়তো একটু আগেই বৃষ্টিতে ভিজে বাইরে থেকে ফিরেছে। করিডোরে পৌঁছে খাবারের গাড়িটা ঠেলে সে রুম নাম্বার ৬০৪ এর সামনে এসে দাঁড়ালো। আবার মনে মনে নিশ্চিত হলো, ৬০৪-ই তো বলেছিল! গলাটা একটু কেশে পরিস্কার করে নিয়ে ছোট করে চাপ দিলো দরজার ঘন্টিতে।
বিশ সেকেন্ডের মতো হবে, সে দাঁড়িয়ে ছিল, ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছিল না। যেই না আবার ঘন্টিটা বাজাবে মনে করলো, দরজাটা খুলে সামনে দাঁড়ালো শীর্ণদেহী একজন বৃদ্ধ মানুষ। উচ্চতায় তার চেয়েও ছোট হবে চার/পাঁচ ইঞ্চি। গাঢ় রঙের স্যুট পরনে, ভেতরে ইস্তিরি করা সাদা শার্ট আর হলদেটে একটা টাই বাঁধা, সব মিলিয়ে খুব পরিপাটি সাজ তার। সাদা চুলগুলোও সুন্দর করে আঁচড়ানো। দেখে মনে হতেই পারে, তিনি বোধহয় রাতের কোনো অনুষ্ঠানে যাবেন এখুনি। তার কপালের চামড়াগুলো এমনই ঢেউখেলানো, উড়োজাহাজ থেকে ফটো তুললে মাটির উপত্যকার সারি যেমন দেখায়, ঠিক তেমনই!
“আপনার রাতের খাবার, স্যার।” মেয়েটি বলতে গিয়ে বুঝলো গলাটা ভাঙা-ভাঙা শোনাচ্ছে। আবার কেশে গলাটা পরিস্কার করার চেষ্টা করলো, একটু বিচলিত হলেই ওর গলাটা এমন শোনায়।
“রাতের খাবার?”
“হ্যাঁ, স্যার। ম্যানেজার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় আজকের ডিনারটা আমাকে আনতে হলো।”
“ওহ আচ্ছা”। দরজার হাতলে হাত রেখেই তিনি কথা বলছিলেন। “অসুস্থ হয়েছে, বলছো?”
“তার পেটে হঠাৎ এমন ব্যথা শুরু হলো, তার মনে হয়েছে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা। তাই দেরি না করে হাসপাতালে গেল।”
“ওহ! এটা ভালো কথা নয়।” নিজের কপালে আঙুল বুলাতে বুলাতে বললেন তিনি, “এটা চিন্তার কথা।”
সে গলাটা আবার একটু পরিস্কার করে বললো, “খাবারটা ভেতরে রেখে যেতে পারি, স্যার?”
“আহ, নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই রাখতে পারো, তুমি যদি ইচ্ছে করো।”
তুমি যদি ইচ্ছে করো! কী আশ্চর্য! তার চাওয়ায় কী এসে যায়! এই কথায় সে কী বুঝবে?
বৃদ্ধ লোকটা দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে একটু পথ করে দিল, আর মেয়েটি গাড়িটি ঠেলে নিয়ে ঢুকলো কার্পেটমোড়া ঘরটায়। জুতো খুলে রাখার কোনো জায়গা সে দেখলো না। প্রথম ঘরটা বইপত্তরে সাজানো। পুরো অ্যাপার্টমেন্টটা যতটা না ঘর-ঘর লাগে, তার চেয়ে বেশি কর্মক্ষেত্র মনে হচ্ছিল। জানালা দিয়ে কাছেই টোকিও টাওয়ার দেখা যায়। জানালার পাশে বড় একটা লেখার টেবিল, ল্যাম্পশেড, পাশে সোফা দিয়ে সাজানো। লোকটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সোফার সামনে রাখা প্লাস্টিকে মোড়ানো টেবিলটা। সে সেই টেবিলটার উপরে রাতের খাবারগুলো গাড়ি থেকে নামিয়ে সাজিয়ে রাখলো। রূপার বন্ধনী মোড়ানো সাদা ন্যাপকিন, ওয়াইন গ্লাস, ওয়াইন বোতল, কফিপট, কাপ, ব্রেড-বাটার, মুরগির মাংস, সবই সে গুছিয়ে দিল ওই টেবিলটার ওপরে।
“স্যার, আপনি সময় করে খেয়ে, বাইরে রেখে দেবেন অনুগ্রহ করে। এক ঘণ্টা পরে এসে আমি বাসনপত্তর ফেরত নিয়ে যাবো।”
তার স্বরে কী এমন ছিল, লোকটি তৃপ্তভঙ্গিতে বললো, “ওহ, আচ্ছা। নিশ্চয়ই আমি রেখে দেবো, গাড়িতে করে, বাইরে। একঘণ্টা পরে এসে তুমি নিয়ে যেও, যদি তুমি ইচ্ছে করো।”
সে মনে মনে নিজেকে উত্তর দিলো, আমি কী ইচ্ছে করবো? তারপর বললো, “আমি কি আর কিছু করতে পারি আপনার জন্য, স্যার?”
একমুহূর্ত ভেবে তিনি বললেন, “না। আমার মনে হয় না আর কিছু করার আছে তোমার।” লোকটি কালো একটি জুতো পরেছে, আগাটা চকচক করছে। ওর মনে হলো, লোকটি বেশভূষায় দারুণ আধুনিক, একই সাথে অভিজাত! এবং দাঁড়ানোর ভঙ্গি বয়সের তুলনায় যথেষ্ট শক্ত আর ঋজু।
“আচ্ছা, স্যার। এবার তাহলে আমি কাজে যাই। এক ঘণ্টা পরে এসে নিয়ে যাবো।”
“না। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করো।”
“স্যার?”
“তোমার পক্ষে কি আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দেয়া সম্ভব? আমার তোমাকে কিছু কথা বলার আছে।”
তার অনুরোধটুকু এতটা মার্জিত আর কোমল ছিল, সে একটু লজ্জাই পেল। সে বললো, “আমার মনে হয়, কোনো সমস্যা হবে না, স্যার। আমি পাঁচ মিনিট থাকতেই পারি।” যাই হোক, সে তার কর্মচারী। সে ভাবলো, প্রতি ঘণ্টা কাজ করার জন্য এমনিতেই তিনি আমাকে বেতন দিচ্ছেন। তার মধ্যে থেকে পাঁচ মিনিট তিনি চাইতেই পারেন। আর বড় কথা, এখানে চাইবার বা দেবার কোনো অবকাশ নেই। আর তাকে দেখে মনেও হচ্ছে না, তিনি একজন মন্দ লোক এবং তার সাথে মন্দ কিছু করতে পারেন!
“আচ্ছা, তোমার বয়স কত?” বড় টেবিলটার পাশে দু’হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে, প্রশ্নটি করলেন, সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে।
“আমি এখন বিশ।” সে বললো।
“এখন বিশ!” চোখ দুটো সরু করে কী একটা ভাবলো লোকটি। আবার বললো, “এখন বিশ! এখন মানে কখন?”
“আমি বিশে পৌঁছুলাম মাত্র।” এক মুহূর্ত ভেবে, দ্বিধা কাটিয়ে সে বললো, “আজ আমার জন্মদিন, স্যার।”
“আচ্ছা। আচ্ছা।” নিজের চিবুকটায় হাত বুলোতে বুলোতে বললো, “আজই! আজই তোমার ২০তম জন্মদিন! তার মানে আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগে তোমার জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল।”
“হ্যাঁ, স্যার। ঠিক বলেছেন। এটাই সত্যি।”
“খুব ভালো কথা। তোমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই।”
“অনেক ধন্যবাদ আপনাকে” বলে সে ভাবলো, আজ সারাদিনে এই প্রথম কেউ তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো। মা-বাবা হয়তো শহর থেকে অ্যানসারিং মেশিনে এরকম শুভেচ্ছা জানিয়ে রেখেছে। কাজ শেষে ঘরে ফিরে সেটা সে শুনতে পাবে।
“ওহ! খুব ভালো হলো। আমরা তাহলে জন্মদিনটা উদযাপন করার জন্য রেড ওয়াইন টোস্ট করতেই পারি।”
“ধন্যবাদ, স্যার। কিন্তু আমি পারবো না; এখন আমার কাজের সময়।”
“এটা তোমার কাজের সময় খুব একটা নষ্ট করবে না। ওয়াইনের একটা ছোট চুমুকে কত সময়ই বা যাবে! আর আমি বলছি, এটার জন্য তোমাকে কেউ অভিযুক্ত করবে না।”
লোকটি কর্ক দিয়ে ওয়াইনের বোতলটি খুলে ওয়াইন গ্লাসে মেয়েটির জন্য খানিকটা ঢাললো আর কেবিনেট থেকে সাধারণ একটা গ্লাস বের করে নিজের জন্য নিলো। চিয়ার্স বলে তাকে শুভেচ্ছা জানালো। বললো, “শুভ জন্মদিন। আমি চাইছি তুমি ধনী, উজ্জ্বল আর সফল একটি জীবন যাপন করো। কোনো অন্ধকার ছায়া যেন তোমার গায়ে এসে না পড়ে।”
শুভেচ্ছা জানানোর এতকিছু ছেড়ে অন্ধকার ছায়া যেন না লাগে এই কথাটা তিনি কেন বললেন সেটা নিয়ে সে একটু অবাকই হলো।
“আজ দিনটি তোমার জন্য সত্যিই বিশেষ। ২০তম জন্মদিন তোমার জীবনে একবারই আসবে। এটা আর ফিরে আসবে না। আর এমন একটা তাৎপর্যপূর্ণ দিনে তুমি এসেছো আমাকে খাবার দিয়ে যাওয়ার কাজটি নিয়ে। কী সহৃদয় পরীর মতো কাজ করেছ তুমি!”
“না, স্যার। এটা আমার কাজের অংশ।”
তিনি তখন ডেস্কের পাশের চামড়ার চেয়ারটায় বসে, মেয়েটিকে বললো সোফায় বসতে। হাতে ওয়াইনের গ্লাসটা নিয়ে সে একটু দ্বিধা নিয়েই বসলো, নিজের স্কার্টটা টেনে ঠিক করলো। তাকিয়ে দেখলো জানালায় বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে আর ঘরটা কেমন নৈঃশব্দ্যে ভরে যাচ্ছে। বৃদ্ধ লোকটি আবারো ওকে মনে করিয়ে দিল, এমন একটা বিশেষ দিনে সে কাজে এসেছে, খাবার বয়ে আনার মতো একটা ঝামেলাপূর্ণ কাজও করলো। অথচ আজ দিনটা তার জন্য আরো সুন্দর করে কাটানোর কিছু হতে পারতো।
তিনি শার্টের কলারের কাছে হাত দিয়ে টাইটা ঠিক করতে করতে বললো, “আমার মনে হচ্ছে তোমার এই বিশেষ দিনে তোমাকে একটা দারুণ উপহার দেয়া উচিত আমার। মিস, আজকের দিনে এটা তোমার প্রাপ্য।”
“না, স্যার। এই উপহার নিয়ে আপনি আর নতুন করে কিছুই ভাববেন না। আর খাবার পৌঁছে দেয়ার কাজটা আমার জন্য নির্দেশ করা ছিল।”
বৃদ্ধ মানুষটি দু’হাত সমান করে বাড়িয়ে দিল মেয়েটার সামনে, বললো, “না, উপহার নিয়ে আমি তেমন বেশি কিছুই ভাবছি না। তোমাকে এমন কিছু দিচ্ছি না যার মূল্যতালিকা উপহারের গায়ে লেগে থাকবে। আমি তোমাকে অন্যরকম একটা উপহার দিতে চাই।” তিনি হাতটা নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখলেন, দীর্ঘ একটা শ্বাস নিলেন, এবার আবার বললেন, “তুমি কিছু একটা চাও, যা তোমার ইচ্ছে; যা তোমার মনে চায়; একটা ইচ্ছে।”
“একটা ইচ্ছে?” মেয়েটি অবাক হয়ে বললো।
“হ্যাঁ। একটাই ইচ্ছে। তোমার নিজের জন্য যা তুমি চাও, যা তোমাকে আনন্দিত করবে, এরকম কোনো কিছু। আমি একটা ইচ্ছেই কেবল পূরণ করতে পারবো। খুব ভেবে বোলো। একবার যা চাইবে, আর বদলানো যাবে না। ফিরে গিয়ে অন্য কিছু চাইতে পারবে না।”
সে কথা হারিয়ে ফেললো বিস্ময়ে। একটাই ইচ্ছে? তার বিস্ময়ের সীমা নেই। কী চাইবে সে! শনশন করে হাওয়া বইছে, জানালার শার্শিতে বৃষ্টির জল গড়াচ্ছে। সে চুপ করে আছে। আর তিনিও নীরব চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত ছন্দে পড়তে লাগলো সেই সময়টুকুতে। “আমাকে একটি ইচ্ছেই চাইতে হবে? এবং তা পূরণ হবে বলছেন?”
লোকটি নিরুত্তর রইলো। তাকিয়ে রইলো স্থির ও শান্ত চোখে। হাত দুটো টেবিলের পাশে রেখে মৃদু হাসলো; কী সাবলীল, কী অনায়াস ছিল সেই হাসি!
“মিস, তুমি কি চেয়েছো নিজের জন্য কিছু, নাকি কোনো কিছু ইচ্ছে করোনি?” বৃদ্ধ লোকটি আন্তরিকতার সাথে বললো।
“আমার ইচ্ছেটা সত্যিই পূরণ হয়েছিল।” আমার দিকে তাকিয়ে সে বললো, “আমি কিছু বানিয়ে বলছি না”।
আমি জানি সে আষাঢ়ে গল্প বলার মেয়ে নয়। বললাম, “নিশ্চয়ই নয়। কেন গল্প বানাবে? আচ্ছা বলো তো, তুমি কী চেয়েছিলে সেদিন?”
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকালো, বললো, “আমাকে ভুল বুঝো না। বিশ বছর বয়স রূপকথার জগতে ঘুরে বেড়ানোর বয়স নয় নিশ্চয়ই। আমি তার কথা খুব গুরুত্বের সাথে নিইনি প্রথমদিকে। তবু তার মিটমিট করে জ্বলে ওঠা চোখের তারায় এমন কিছু ছিল, আমারও ইচ্ছে করেছিল তার কথায় কিছুটা খেলতে। আর সেদিন যদি এটা তার ক্ষণিকের এক তামাশাও হতো, সেটাও কিন্তু আমাকে আপ্লুত করেছিল। ওদিন ছিল আমার ২০তম জন্মদিন। আমিও চাইছিলাম বিশেষ কিছু ঘটুক, মনে রাখার মতো কিছু। এটা শুধুই বিশ্বাস করা বা না-করার বিষয় ছিল না সেদিন।
কিছু না বলেই মাথা নাড়লাম আমি।
“তুমি একবার ভেবে দেখো, কেমন লাগছিল সেদিন সন্ধ্যায় আমার! আমার ২০তম জন্মদিনের মতো একটা বিশেষ আনন্দের দিন শেষ হতে চলেছে, অথচ কেউ আমাকে শুভেচ্ছা জানায়নি। রেস্তরাঁর অতিথির টেবিলে এনকোভি সস মাখানো টরটেলিনি এগিয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছু করার বা ঘটার ছিল না।”
মাথাটা আবার নেড়ে আমি বললাম, “আমি তোমার মনের অবস্থাটা অনুভব করতে পারছি।”
“সেই সন্ধ্যায় আমি সত্যিই একটা জিনিস চেয়েছিলাম!”

বৃদ্ধ লোকটি স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকলো। হাত দুটো টেবিলের ওপর এমনভাবে মেলে দিয়ে রাখলো, যেন মনে হচ্ছিলো, সবুজ আলোর ল্যাম্পশেড, গণিতের বই, ক্যালেন্ডারের মতোই চিকন হাত দুটোও টেবিলের আসবাব। বৃষ্টির ঘনত্ব বাড়ছিল জানালার বাইরে; টোকিও টাওয়ারের আলোগুলো জানালার কাচে এসে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিলো। দুই ভ্রুর মাঝখানে আরেকটু যেন গাঢ় হলো লোকটির কপালের কুঞ্চন, একটুপরে বললো, “তাহলে এই ছিল তোমার ইচ্ছে?”
সে বললো, “হ্যাঁ, এটাই আমি চাইলাম। কেন? ইচ্ছেটা ভালো হলো না?”
“না, না, আমি তা বলিনি। তবে এই বয়সের একটা মেয়ের ইচ্ছে সাধারণত এরকম হয় না। তারা আরো ধনী, আরো সুন্দর, আরো খ্যাতি চায়। তুমি এসবের ধারেপাশেও যাওনি। এটা একটু অবাক করা তো বটেই। তবে তুমি তোমার চাওয়া নিয়ে যদি নিঃসংশয় থাকো, তাহলে ঠিক আছে।”
সে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “আমি অবশ্যই আরো সুন্দর, আরো ধনী, আরো সপ্রতিভ হতে চাই। কিন্তু এগুলো যদি সত্যিই আমি হয়ে যাই, আমি ঠিক জানি না এরকম হলে জীবনটা কীভাবে যাপন করতে হবে। আমি হয়তো পারবো না সেই যাপনের সাথে মানিয়ে চলতে। কারণ জীবনটাই আসলে কী, সেটাই তো জানি না।”
“আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে,” বৃদ্ধ বললো। মেয়েটি জানতে চাইলো, তার ইচ্ছেটা পূরণ হতে কোনো সমস্যা আছে কিনা। বৃদ্ধ আবার বললো, “না। আমার দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই।”
বৃদ্ধ লোকটি এবার শূন্যে তার দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলো, যেন শূন্যে একটা বিন্দু দেখলেন তিনি। কপালের কুঞ্চনের ফাঁকে ফাঁকে ফুটে উঠলো, তার মাথার ভেতরে কী ভাবনা চলছে তার ছবি; তিনি যেন শূন্যের সাথে আলাপে মত্ত এমন। চেয়ার থেকে নিজেকে তিনি সামান্য উপরে উঠিয়ে হাত দুটোকে বাতাসে ভাসিয়ে দিলো, মুহূর্তপরে হাত দুটো আবার জড়ো করে তালি বাজানোর মতো করলো। এরপর চেয়ারে বসে কপালে কী যেন ঘষলো, নিজের আঙুলের ডগা দিয়ে। কুঁচকানো ভ্রূ দুটো সমান হয়ে গেল। স্মিত হেসে তিনি এবার বলে উঠলেন, “তোমার ইচ্ছের আবেদন অনুমোদন পেল।”
সে অবাক হয়ে বললো, “এরইমধ্যে পেয়ে গেল?”
“হ্যাঁ, মিস। তোমার জন্মদিনে তোমার ইচ্ছের আবেদন অনুমোদন পেয়ে গেল। তুমি তাই-ই পাবে, যা তুমি চেয়েছ। যাও, এবার তোমার কাজে ফিরে যাও। খাওয়া শেষ হলে বাইরে খাবারের গাড়িটা রেখে দেবো; এসে নিয়ে যেয়ো।”
মেয়েটি খালি হাতে নিচে নেমে এলো, তার কেমন সব হালকা লাগছে। রেস্তরাঁয় ঢুকতেই আরেকজন ওয়েটার ওকে দেখে বললো, “তুমি কি ঠিক আছ? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি যেন অন্য গ্রহের বাসিন্দা।” মেয়েটি বললো, সে ঠিক আছে। “মালিককে কেমন দেখলে?” এই প্রশ্নের উত্তর এড়াতে সে বললো, “আমি আসলে ঠিক তার দিকে তাকাইনি।”
এক ঘণ্টা পরে সে উপরে উঠে দেখলো খাবারের গাড়িটা বাইরেই রাখা আছে। ঢাকনা উঠিয়ে দেখলো পাত্রে মুরগির মাংস বা সবজি কিছুই নেই। কফির কেটলিও খালি, ওয়াইনের বোতলটাও। সে খানিকক্ষণ ৬০৪ নাম্বার ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলো, ভেতর থেকে দরজাটা হঠাৎ কেউ খোলে কিনা! এরপর নিচে নেমে বেসিনের দিকে এগিয়ে গিয়ে গাড়িটা রেখে দিলো। রান্নাঘরের পাচক নিজের মনে মাথা নাড়তে নাড়তে, প্রতিদিনের মতোই দেখলো, পাত্রের সব খাবারই শেষ।
“আমি এরপরে আর কোনোদিনই মালিককে দেখিনি। ম্যানেজার সুস্থ হয়ে কাজে যোগ দিল; জটিল কিছু তার হয়নি। এর ক’মাস পরে আমিও সে বছর নিউ ইয়ার্সের ছুটিতে রেস্তরাঁর কাজ ছেড়ে দিলাম। আর কখনোই ওদিকটায় যাইনি আমি। মাঝেমাঝেই ভাবি, ২০তম জন্মদিনের সন্ধ্যায় যা যা ঘটেছিল, তা ছিল শুধুই এক কল্পনা। এই ভাবনাটা আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করছে যে, যা ঘটেছে বলে আমি ভাবছি, তার কিছুই ঘটেনি সেদিন। কিন্তু আমি জানি, বুঝতে পারি, সেদিন সত্যিই এই আশ্চর্যজনক ঘটনা আমার সাথে, আমার চোখের সামনেই ঘটেছিল। আমি সেই ঘরের প্রত্যেকটি আসবাবপত্র আজও স্পষ্ট দেখতে পাই। আর সবচেয়ে বড় সত্য যেটা তা হলো, যা ঘটেছিল তা আমার জীবনের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।” আমি একমনে ওর কথা শুনে যাচ্ছিলাম।
এরপর দুজনে খানিকক্ষণ চুপচাপ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম কথা না বলে। আমরা যে যার পানীয় পান করছিলাম আর যে যার ভাবনা ভাবছিলাম।
কিছুক্ষণ পরে আমি প্রশ্ন করলাম, “আমি যদি একটা জিনিস জানতে চাই, তুমি উত্তর দেবে? একটা নয়, ধরো দুটো।”
সে বললো, “আমার যতদূর মনে হচ্ছে, আমি সেদিন কী চেয়েছিলাম ইচ্ছেপূরণের জন্য, তুমি সেটাই জানতে চাইবে।”
“কিন্তু তোমাকে দেখে ধারণা করছি, তুমি এর উত্তর দিতে চাও না।”
“তাই”? শুনে আমি মাথা নাড়লাম একটু। সে গ্লাসের ঢাকনাটা নামিয়ে রেখে স্থিরভাবে সেদিকে তাকিয়ে রইলো, যেন কিছু খুঁজছে।
“তুমি সেই সন্ধ্যায় কী চেয়েছিলে তা আসলে কোনোদিনই কাউকে বলা উচিত নয়।” বললাম আমি। “আর আমিও তোমার ভেতর থেকে সেটা বের করতে চাই না। তবে এটা কি বলা যায়, তুমি যা চেয়েছিলে, তা কি সত্য হয়ে এসেছিল তোমার জীবনে? তোমার কি কখনো আফসোস হয়, এটা না চেয়ে অন্য কিছু চাইলে হয়তো আরো ভালো হতো?”
“তোমার প্রশ্নের উত্তর একইসাথে হ্যাঁ এবং না। আমার জীবনে অনেককিছুই এখনো করার বাকি রয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত কী হবে আমি জানি না এখনো।”
“তো, তুমি বলতে চাও যা চেয়েছ, তা পূর্ণ হতে সময় নেবে?”
“বলতে পারো এরকমই কিছু। সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”
“রান্না চুলায় চড়িয়ে অপেক্ষা করার মতো?”
সে মাথা নাড়লো। আমি দেখতে পেলাম, যেন বড়ো একটা পাত্রে বিশাল আকারের একটা পাই প্রস্তুত হচ্ছে, ধীরে ধীরে, অল্প আগুনের আঁচে।
“আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা দাও। তোমার কি আফসোস হয় একবারও?”
কিছুক্ষণ নীরবতার পরে সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, “আমি এখন বিবাহিত। আমার চেয়ে তিন বছরের বড় একজন সিপিএ-কে বিয়ে করেছি। দুটো সন্তান আছে আমার, একটি মেয়ে, একটি ছেলে। অডি গাড়ি চালাই আমি। আমাদের একটা পোষা আইরিশ সেটারও আছে। বন্ধুদের সাথে সপ্তাহে দুদিন টেনিস খেলি আমি… এই আমার জীবনধারা।”
“শুনতে খুব ভালো লাগলো।”
“যদিও অডির বাম্পারে দুটো ঘষা দাগ আছে!”
“এই বাম্পার বানানোই হয় ঘষা লাগার জন্য!”
আমি বললাম, “এটা কিন্তু ভালো একটা স্টিকার হতে পারে; বাম্পার তৈরিই হয় ঘষা লাগার জন্য!”
সে তখন কানের দুলটা নাড়তে নাড়তে বললো, “আসল কথা কী জানো? যতই তুমি কিছু চাও, সেটা পেতে যতদূরেই তুমি যাও না কেন, মানুষ ভেতরে যা, তার বাইরে সে কিছু হতে পারে না।”
আমি হেসে বললাম, “তোমার এই শেষ কথাটাও ভালো একটা স্টিকার হতে পারে।”
সে-ও জোরে হেসে উঠলো। টেবিলের ওপর কনুইটা রেখে এবার সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা, এবার আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো; আমার জায়গায় তুমি হলে, কী চাইতে?”
“মানে? আমার ২০তম জন্মদিনে?”
“হুম,” সে বললো।
আমি খানিকটা সময় ভেবে বললাম, “ভেবে কিছু পাচ্ছি না চাইবার মতো। আর জন্মদিনও আসতে অনেক দেরি।”
“তবু একটা জিনিস তো চাইতেই পারো।”
“একটা! একটা! না! কোনো কিছু আমার মনে আসছে না চাইবার মতো!”
সে বললো, “কোনো কিছুই পাচ্ছো না?”
“না, না, একটাও না।”
সে আমার দিকে তাকালো, সোজাসুজি আমার চোখের দিকে, তাকিয়ে বলে উঠলো, “একটাও না! তার মানে কী জানো? তোমার ইচ্ছে আগেই পূরণ হয়ে গেছে।”