হাসনাত আবদুল হাই >> কালচার কার্নিভাল >> সংস্কৃতি

0
213

কালচার কার্নিভাল

উপক্রমণিকা

কিছুদিন থেকেই তীরন্দাজ  অনলাইন পত্রিকার উদ্দীপনাপূর্ণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বিশেষ কোনো বিষয়ের শিরোনামে একটি সিরিজ লেখা যায় কিনা। এক্ষেত্রে সমস্যা ছিল আমার পক্ষেই। একদা ইংরেজি-বাংলা উভয় ধরনের পত্রিকাতেই দু’হাতে লিখলেও আজকাল লোন রেঞ্জারের মতো স্বাধীনচেতা মানুষ হয়ে ধরা-বাঁধা নিয়মের বাধ্যবাধকতার বাইরেই থাকতে বেশি পছন্দ করি। ফ্রিল্যান্স লেখক হয়ে থাকাটাই আমার এখনকার পছন্দের ভূমিকা।
তীরন্দাজ সম্পাদকের সৌজন্যবোধ এবং আগ্রহের আন্তরিকতায় অভিভূত হয়ে শেষ পর্যন্ত সম্মত হলাম। এবার সমস্যা দেখা দিল সিরিজটির নামকরণ নিয়ে। ঠিক হলো মূলত শিল্প-সাহিত্যের বিষয় নিয়েই আমি লিখব, হুইচ ইজ মাই কাপ অব টি। কিন্তু বিষয়টা ওপেন-এন্ডেড না রেখে একটা নির্দিষ্ট নামের বন্ধনীতে রাখার প্রয়োজন অনুভূত হলো। কয়েকটি সম্ভাব্য শিরোনাম বিবেচনার পর “কালচার কার্নিভাল” নামটি দু’জনেরই মনঃপুত হলো।
পাবলিক ডোমেইনে আসার পর কর্তব্য হলো কী বলতে চেয়েছি আমরা এই শব্দ দুটি দিয়ে, তা পাঠকদের জানানো। কালচারের অর্থ নিয়ে অস্পষ্টতা নেই, তবে এর ব্যাপ্তি জীবনযাপনের সমগ্রতাকে ধারণা করে, কেবল শিল্প-সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটা প্রথমেই বলে নেয়া ভালো। এর মধ্যে শিল্পকলা ও সাহিত্য যেমন থাকবে, পাশাপাশি স্থান পাবে রন্ধনশিল্প এবং ফ্যাশনের মতো বিষয়আশয়ও।
এবার প্রয়োজন হলো কালচারের সঙ্গে কার্নিভালের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার। তার আগে কার্নিভালের অর্থ পরিস্কার করা উচিত মনে করি। এর আভিধানিক অর্থের শরণাপন্ন হলাম। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিধান অনুসারে “কার্নিভাল”-এর অর্থ হলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশ্য স্থানে বিনোদনের আয়োজন৷ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিধান খুব সংক্ষেপে লিখেছে : কোনো আনন্দময় উৎসব। শব্দটির বুৎপত্তি পড়ে দেখা গেল এর ধর্মীয় এবং সেকুলার, উভয় পরিপ্রেক্ষিতই রয়েছে। ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীরা তাদের পবিত্র লেন্ট ঋতুতে রাজপথে যে আনন্দ মিছিল বার করে, সেটি কার্নিভাল নামে পরিচিত। এরপর শব্দটির যে সেকুলার অর্থ যুক্ত হয়েছে, সেখানে নির্জলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনন্দ উৎসব উদ্যাপনের কথা বলা হয়েছে। যেমন দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, ব্রাজিলে কিংবা নিউ অরলিন্সে মার্দিগ্রা রাজপথে নারী-পুরুষের নাচ-গানের তুমুল উৎসবের কথা। এর মাঝখানে রয়েছে বিভিন্ন দেশের অসংখ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যা সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ্যে হওয়ার জন্য কার্নিভাল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আমরা যে-অর্থে কালচারাল কার্নিভাল বেছে নিয়েছি তার অর্থ হলো, কালচার সব ধরনের এবং জীবন-যাপনের যে-কোনো সময়ের। এর মধ্যে আধুনিক চিত্রকলা যেমন আছে, লক্ষ্মীর সরাও শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। এই কারণে আমাদের সিরিজে সবধরনের সাংস্কৃতিক নিদর্শনের কথাই থাকবে, দেশের এবং বিদেশের। উদ্দেশ্য হবে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেয়া কিংবা আলোচনার সূত্রপাত করা।
হাই আর্ট বলে যা বোঝায় এবং সহজ সরল এবং সর্বসাধারণের উপভোগ্য কালচার আলোচনার যোগ্যতা পাবে তাদের জনপ্রিয়তা ও উপভোগ্যতার নিরিখে। যে বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হোক না কেন, তার জন্য কিছু হলেও সমঝদার থাকতে হবে, সংখ্যায় বেশি হলে তো কথাই নেই। এরপরই শর্ত আরোপ করা হবে, যে-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি কার্নিভালের মোড়কে সবার সামনে উপস্থাপিত করা হয়েছে, তার ফল যেন সবার উপভোগ্যতার যোগ্য হয়। বহু ভাবগম্ভীর বিষয়সূচক কালচারের দৃষ্টান্ত কখনো কখনো কার্নিভালে থাকতে পারে, এই সিরিজের লেখায়। কিন্তু সে-সবের উপভোগ আনন্দময় হতে হবে। অবশ্য এর মানে এই নয় যে আনন্দ-উল্লাসের শর্ত পূরণের জন্য কালচারের নিদর্শনগুলি নির্বাচিত হবে, নির্বাচিত হবে আসলে রুচির নিরিখে। কালচার কার্নিভালে আমরা এর শেষেরটির ওপরই জোর দিতে চাই – এর উপভোগ্যতা এবং আনন্দ-উল্লাস সৃষ্টির ক্ষমতাকে। অন্যভাবে বলতে গেলে কালচারকে কার্নিভালের ঘেরাটোপে আটকে রেখে আমরা তাকে ভোগ্যপণ্যের মর্যাদা দিতে চাই। অবশ্যই এই ভোগ্যপণ্য যতটা উপভোগ্য তবে, তার চেয়ে বেশি আবেদন রাক্ষবে বুদ্ধিবৃত্তির ওপর। কেননা, আমাদের এই সিরিজের উদ্দেশ্য হবে দর্শক-শ্রোতার ক্রমান্বয়ে রুচির উন্নতি সাধন।
এই যে হাই আর্টকে জনসাধারণের কাছে সমাদৃত কালচারের নিদর্শন হিসেবে একত্রিত করে তাদের পরিচিতি দেয়া এবং আলোচনার অবতারণা, এই দিকগুলি অনেক বিশেষজ্ঞের মনঃপুত হয় নি। তাঁরা এর কঠোর সমালোচনা করেছেন। এর পরের পর্বে আমরা সে-বিতর্ক নিয়ে আলোচনা করব। আজ আপাতত এইটুকু। সবাইকে সিরিজটি পড়ার আমন্ত্রণ জানাই।

[চলবে]