হুমায়ুন আজাদ > এডিনবরা থেকে >> জন্মদিন

0
761

এডিনবরা থেকে

১. বোকাচ্চিও

‘ক্যান্টারবেরি টেলস’ আমি পড়িনি। চসারের বিপুল গুণগান শুনেছি। কিন্তু ইতালির অশিষ্ট, অবৈধ বোকাচ্চিও আমার প্রিয় গল্পকার। গল্পশতক ‘ডেকামেরন’ নিয়ে মেতে থাকা যায়। ওর অশ্লীলতা যৌনতা রৌদ্রে আলোকিত, উষ্ণ। ছবি খুব কম দেখি আমি, আমার যৌবনের প্রারম্ভে যেদিন ঢাকার পর্দা থেকে সুচিত্রা-উত্তম বিদায় নিল, ছবি দেখার সখ আমারও মিটলো। এডিনবরায় ছবিঘর আছে অনেক। অনেকগুলোতে অবিরাম শো চলে। ইচ্ছে হলে আপনি একটার সময় টিকিট কেটে বসলেন, রাত সাড়ে দশটায় হল থেকে বেরিয়ে এলেন। এ সময়ে একটার পর একটা করে অনেকগুলো ছবি দেখানো হলো, এক টিকিটেই। কিন্তু একবার হল থেকে বেরোলে আর ঢুকতে পারবেন না। একটি হলে চসার আর বোকাচ্চিও চলছে। মফিজুল ইসলাম, যিনি একবছর ধরে ভেড়া আর ইঁদুরের প্রসব আর প্রসব বেদনার উপর গবেষণা করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, এবং আমি, ছবি দেখতে গেলাম। চমৎকার ছবিঘর, বিশাল পর্দা, বাইরে ঠান্ডা, কিন্তু পর্দায় উষ্ণতম ছবি। চসার আর বোকাচ্চিও নরনারীর অবৈধ যৌনস্বাদের গল্প বলেছেন। বেশ কয়েকটি গল্পকে গেঁথে দেয়া হয়েছে একসাথে। প্রতি গল্পেই আছে দীর্ঘ যৌনমিলনের দৃশ্য। নায়ক-নায়িকারা খুব নামকরা নয়, কিন্তু নয়নাভিরাম। মেয়েরা যে এত তাড়াতাড়ি কাপড় ছুঁড়ে ফেলে লাফিয়ে পড়তে পারে নগ্ন প্রেমিকের বিছানায়, ভাবতেই পারা যায় না। কিন্তু প্রতিটি গল্প শেষ হয় আকাশ ফাটানো হাসিতে। একটি গল্পের কাহিনী হলো, রাজার এক অমাত্যের স্ত্রী ভয়াবহ সুন্দরী। রাজা তাকে ভোগ করতে চান, এবং সুন্দরীও রাজি। অমাত্য তা জানতে পেরেছে। বউকে ধরার জন্য সে বউকে বলল, আজ রাতে বাড়িতে থাকবে না। চমৎকার বউ রাজাকে খবর দিল। কিন্তু অমাত্য লুকিয়ে রইল বিশাল খাটের তলে। রাত্রি এল এবং রাজা এলেন। বউয়ের ভূমিকার মেয়েটি অদ্ভুত সুন্দরী। বিছানায় অমাত্যের বউ আর রাজা। রাজা প্রেমে পাগল, কবিতার মতো করে বলছে, এই যে মেঘমালার মতো কেশরাজি, এ কার? বউ বলছে, প্রভু, তোমার। রাজা নিচে নামছেন, চমৎকারভাবে খুলে ফেললেন বক্ষবাস, বললেন, এ কার? বউ বলল, প্রভু, তোমার। রাজা আরো নিচে নামলেন, জংঘা, কোমর, ইত্যাদিতে হাত বুলালেন, বললেন, অপার্থিব এই ধন, কার? বউ বলল, প্রভু তোমার। এতক্ষণে খাটের নিচে অমাত্য প্রায় পাগল, কিন্তু উঠতে পারছে না, লোকটি যে রাজা।

এবার রাজা হাত রাখলেন গন্তব্যে, বললেন, এ কার? বউ বেশ ধার্মিক, বলল, এটি আমার স্বামীর!

রাজা উপুর করলেন বউটিকে। বললেন, এটি কার? বউ বলল, প্রভু তোমার। রাজা বৌয়ের পেছনে আদর করে চলে গেলেন। অমাত্য বিছানার তল থেকে উঠলো। বউতো দেখেই মূর্ছা গেল। কয়েক দিন পর রাজার গৃহে অনুষ্ঠান। অমাত্য এবং তার বউ এলো। সবাই হাসা শুরু করল। কারণ কি? অমাত্যের বউ পরেছে মূল্যবান বস্ত্র, কিন্তু তার পেছনে রাজা যে স্থানটিতে আদর করেছিলেন, সে স্থানে স্কার্টটি গোলাকার করে কাটা। রাজা দেখলেন, বুঝলেন। চসার, বোকাচ্চিও এবং অন্যান্য কয়েকজন লেখকের ৮-৯টি গল্প দেখানো হল, সবগুলো প্রায় এরকম। যৌনমিলনের দৃশ্য স্পষ্ট দেখানো হয় না অবশ্য, কিন্তু আর সবই দেখানো হয়। অভিনেত্রীরা সবাই মোহনীয়, অন্তত এবারের বিশ্বসুন্দরীর চেয়ে তো বটেই। কল্পনা করুন তো সন্ধ্যা রায় কি শাবানা হুবহু রূপ দিচ্ছে সমরেশ বসু বা সৈয়দ শামসুল হকের গল্প? আমি কল্পনাও করতে পারি না।

(২) তুষার

দু’বার তুষার পরলো এডিনবরায়। ঘুম থেকে উঠে দেখি, সারা শহর তুষারে ঢেকে গেছে। আমি একাত্তর দেখা বাঙালি, তাই মনে হলো, সারা শহর তুষারে ক্যামোফ্লাজ করেছে। গুঁড়ি গুঁড়ি করে পড়ছে, রাস্তা, বৃক্ষশীর্ষ, চৌদ্দতলা দালানের শিখর, ফুলের চারাগাছ, সবাই প্রসাধিত হয়ে উঠছে তুষারে। এ এক চমৎকার দৃশ্য। আমি সবুজ দেখে অভ্যস্ত, সবুজ সবুজ বলে লোরকার মতো অনেক চিৎকার করেছি, তুষার দেখেও সেই একই অনুভূতি হলো। মনে হলো পাস্তারনাকের কবিতার ভেতর দিয়ে চলছি। আমার হাতের উপর ঝিরঝির করে তুষার পড়ছে, ওভারকোটের পকেটে ঢুকে যাচ্ছে তুষারকণিকা। মুঠো ভরে তোলা যায়, চাপ দিলেই বলের মতো গোল হয়ে যায়, তুষার বল খেলা যায়। এতদিন আমার চোখের সামনেই একটি সবুজ মিডো ছিল, আজ সেটি ধবধবে সাদা, কোনদিন যে এটি সবুজ ছিল, দেখে বোঝা যায় না। আমি বরফ দেখেছি বরফকলে, কিন্তু এখানে দেখছি তুষার। খুব কি শীত। মনে হয় না, সয়ে গেছে। তুষারের উপর দিয়ে হাঁটার অনুভূতিও চমৎকার। শিশুর কাছে শিল কুড়ানোর উত্তেজনা যেমন, তুষারের উপর দিয়ে হাঁটাও তেমনি।

(৩) চুম্বন

এ দেশের লোকেরা কি সবচে বেশি খায়? শুয়োরের মাংস, বিয়ার, পিল, বিজ্ঞাপন?

আমার মনে হয়, ওরা যা সবচে বেশি খায়, তা হলে চুমু। এই একমাত্র বস্তু যার জন্য লাইন দিতে হয় না, স্লটে পয়সা দিতে হয় না। ছেলে-মেয়েরা সারাক্ষণ ওই বস্তুটি খেয়ে চলেছে। এদেশের প্রতিটি ছেলেমেয়ের ঠোঁটে ও পাকস্থলিতে যে কতজনের কত পাইন্ট লালা আছে, কে জানে।

ডাইনে-বাঁয়ে সামনে-পেছনে চুম্বন চলছে। এতে ওরা ফাঁকি দেয় না, মনের সকল আবেগ এবং শরীরের সমূহ তাপ নিয়ে ওরা এটি করে। আমার সামনে এ কাজটি কাউকে করতে দেখলেই মনে হয়, আমি যেন কলাভবনের চারতলায় বা আইবিএ ভবনের তেতলার পূর্ব কোণায় রয়েছি। কোহিনুর নামের শ্যামল একটি মেয়ে আমাকে ওখানেই এই স্বর্গীয় শাস্ত্রের প্রথম পাঠ দিয়েছিল। চুমুতে সব মেয়েই একরকম, ওরা যেন অন্য কোনো কোলাহলহীন ইতিহাসহীন ভুবনে চলে যায়, চারপাশের মানুষ, চেয়ার টেবিল খাট দেয়াল সব অবাস্তব হয়ে ওঠে। এতে শাদায় বা শ্যামলে কোনো তফাৎ নেই। আমার সামনে বসে গতকাল যে মেয়েটি একটি ছেলেকে (ও মেয়েটির বয় নয়) চুমু খাচ্ছিল, আমি দেখছিলাম ওর অবস্থা কিরকম হয়। মেয়েটি যেন হঠাৎ খুলে ফেলল স্বপ্নলোকের দরোজা, ঢুকে গেল স্বপ্নলোকে, আমি অবাস্তব হয়ে উঠলাম, অবাস্তব হয়ে উঠলো আমার মতো আরও দশটি ছেলে, অর্থহীন হয়ে গেল কিসিঞ্জারের ভ্রমণ, সামনের রঙিন টেলিভিশন। দশবারো মিনিট পরে ফিরে এলো ঠান্ডায় শীতে, বাস্তবের কুটীল হিমের মধ্যে। মনে হল, এমনই হতো সেই শ্যামল সামান্য মেয়েটি, আমার চোখে পড়তো ওর ছোট্ট ঠোঁট লাল হয়ে পড়েছে, তারচেয়ে বেশি রক্তিম হয়ে পড়েছে সেই অদৃশ্য ভুবন, যেখানে সে একলা ভ্রমণ করছে। চুম্বনে মেয়েরা কোথায় যায়?
কিন্তু সবচে মজার হলো বুড়োবুড়ির চুম্বন। সেদিন দেখলাম রাত এগারোটায়, এক বুড়ি (৫০) আর এক বুড়োকে (৬০) এক দোকানের দরোজায় চেপে ধরে আছে। দেখেই হাসি পাচ্ছিল, বুড়োটার অবস্থা খুব শোচনীয়, ওর কোনো ইচ্ছে নেই। কিন্তু বুড়ি নাছোড়বান্দা, যে মধু বিষাক্ত হয়ে গেছে, তাকে সে আবার সুস্বাদু করবেই। মেয়েদের পোশাক দেখে আমার সব সময় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি গল্প মনে পড়ে। বেগম ক্লাবে একবার ভাষণ দিচ্ছিলেন ডক্টর শহীদুল্লাহ। তখন আমাদের মেয়েরা কাপড় সংক্ষিপ্তকরণ আন্দোলনে নেমেছে। তিনি বললেন, তাঁর অনন্য ভঙ্গিতে, বোনেরা তোমরা কি দেখাতে চাও, যা আমরা দেখি নাই? আমার মনে হয় তিনি এ প্রশ্নের উত্তর পেতে পারতেন যদি জিজ্ঞেস করতেন এখানকার একটি মেয়েকে। মেয়েটির উত্তর হতো, কি ঢেকে রাখবো ডক্টর যা তোমরা দেখনি!

(৪) ট্রান্সফরমেশনাল ব্যাকরণ

একটি ভাষায় কতগুলো বাক্য আছে? কেউ জানে না, কেননা, প্রতিটি ভাষায় বাক্যের সংখ্যা সীমাহীন। তাছাড়া প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন বাক্য তৈরি হচ্ছে, যে বাক্য আগে কেউ বলেনি শোনেনি লেখেনি। তাহলে আমরা বাক্যগুলো বুঝি কি করে? ফোর স্কোর এন্ড সেভেন ইয়ারস এগো বলে যখন ভাষণ শুরু করেন তখন শ্রোতা ওই অশ্রুতপূর্ব বাক্য বোঝেন কি করে বা বাঙালি পাঠক কি করে অর্থোদ্ধার করে স্বগত বা কুলায় ও কালপুরুষ-এর? ট্রান্সফরমেশনাল ব্যাকরণ বলবে, এর কারণ হলো প্রতিটি ভাষায় বাক্য অসীম হলেও বাক্য তৈরির নিয়ম সসীম। আমরা প্রতিটি বাক্য মনে রাখি না, মনে রাখি ওই নিয়মগুলো, আর ওই নিয়মের ছকে ফেলে লাখ লাখ নতুন বাক্য তৈরি করি। ট্রান্সফরমেশনাল ব্যাকরণের উদ্ভাবক ছটি সম্মানসূচক ডক্টরেট অধিকারী চুয়াল্লিশ বছর বয়স্ক নোয়াম চমস্কি এখন আর ভাষাবিজ্ঞান চর্চা করেন না, তিনি রাজনীতিতে জড়িত এখন। তবে তাঁর আবিষ্কার অসাধারণ। অবশ্য ইউরোপ-আমেরিকায় ভাষা নিয়ে এত গবেষণা হচ্ছে যে চমস্কির সূত্রাবলী ইতিমধ্যেই পুরানো হতে চলেছে।
ট্রান্সফরমেশনাল ব্যাকরণ মূলত বাক্য তৈরির ব্যাকরণ। চমস্কি বাক্য তৈরির বেলায় বাক্যের অর্থকে মূল্য দেন না। তিনি মনে করেন অর্থহীন হয়েও বাক্য ব্যাকরণসম্মত হতে পারে। তাতো আমরা ভালোভাবেই জানি। কয়েকটি বাক্য নেয়া যাক, বাক্যগুলো পরাবাস্তব কবিতার মতো মনে হবে। (১) আমার রিস্টওয়াচ প্রতিদিন চব্বিশটি সোনালি সিগ্রেট খায়, (২) ক্রিয়াপদগুলো সবুজ, (৩) রঙিন নীল ভাবনাগুলো ভয়ঙ্করভাবে ঘুমোচ্ছে। অর্থের বিভ্রাট বাদ দিলে এগুলো বাক্য, বাংলা বাক্য।

যদি বলতাম (১খ) রিস্টওয়াচ প্রতিদিনটি আমার সোনালি খায় সিগ্রেট চব্বিশ, বা (৩খ) নীল রঙিন ভাবে ভয়ঙ্করগুলো ভাবনা ঘুমোচ্ছে, তাহলে এগুলো বাংলা বাক্য হতো না। তাই চমস্কি মনে করেন বাক্য তৈরিতে অর্থ নিরর্থক, বাক্যগঠনের নিয়মগুলি আসল।

ট্রান্সফরমেশনাল ব্যাকরণ তাই বাক্য তৈরির কলাকৌশল আবিষ্কার করতে উন্মুখ। এ ব্যাকরণ চায় একটি ভাষার সমস্ত বাক্যের গঠনকৌশলকে সূত্রবদ্ধ করতে, যাতে ওই সকল সূত্রের দ্বারা অবলীলায় সীমাহীন বাক্য তৈরি করা যায়। মনে রাখতে হবে যে, সূত্র বা নিয়মগুলো হবে সীমিত। তাই দরকার হয় ট্রান্সফরমেশন বা রূপান্তরের। ট্রান্সফরমেশনাল ব্যাকরণের অংশ দুটি, একটি হলো, বাক্য গঠনমূলক অপরটি হলো ধ্বনিগত। বাক্য গঠনমূলক অংশটি আবার দু’ ভাগে বিভক্ত : (এক) ফ্রেজস্ট্রাকচার পর্যায়, (দুই) ট্রান্সফরমেশনাল পর্যায়। ফ্রেজস্ট্রাকচার পর্যায়ের কাজ হলো প্রতিটি বাক্যের অন্তর্গত গঠনকে বর্ণনা করা, এবং ট্রান্সফরমেশনাল পর্যায়ের কাজ হলো বাক্যের অন্তর্গত গঠনের রূপান্তর বর্ণনা করা। দু’ভাগের মিলনই হল ট্রান্সফরমেশনাল ব্যাকরণ। ফ্রেজস্ট্রাকচার অংশের নিয়ম দিয়ে ভাষার সকল বাক্য বর্ণনা করা যায়। কিন্তু এতে নিয়মের সংখ্যা বেড়ে যায়। তাই দরকার হয় ট্রান্সফরমেশনাল পর্যায়ের। এ ব্যাকরণ কেবল বাক্যগঠনের সূত্র দেয় না, প্রতিটি বাক্যের গঠনেরও বর্ণনা দেয়। এজন্য এ ব্যাকরণ মোটামুটি ভাষার সকল বাক্যকে দু’ভাগে ভাগ করে। এক শ্রেণীর বাক্যকে বলা হয় কার্নেল, অন্য শ্রেণীর বাক্যকে বলা হয় নন-কার্নেল।
উদাহরণ দিলে ভালোভাবে বোঝা যাবে। কয়েকটি বাক্য নেয়া যাক। (১) মেয়েরা স্বাধীনতা চায়, (২) মেয়েরা স্বাধীনতা চায় না। (৩) মেয়েরা কি স্বাধীনতা চায়? ট্রান্সফরমেশনাল ব্যাকরণ (এরপর থেকে ট্রাজে ব্যাকরণ) বলবে, এ বাক্যগুলোর মূলে আছে একটি কার্নেল। (১) মেয়েরা স্বাধীনতা চায় বাক্যটি কার্নেল, অপর বাক্যদ্বয় হলো এই বাক্যের রূপান্তর। একটি হলো নঞর্থক রূপান্তর, অপরটি হল প্রশ্নার্থক রূপান্তর। মূলে এরা সবাই এক। ফ্রেজস্ট্রাকচার অংশ কার্নেল বাক্য তৈরির নিয়ম দেয়, ট্রাজে অংশ রূপান্তরের নিয়ম দেয়। ট্রাজে ব্যাকরণে ব্যবহৃত হয় প্রচুর চিহ্ন, সংকেত, এ সবের দ্বারা বর্ণনাকে সংক্ষিপ্ত গাণিতিক করে তোলা হয়। ব্যাপারগুলো বেশ চমৎকার, এ নিয়মের দ্বারা কম্পিউটার অসীম বাক্য তৈরি করতে পারবে।
ব্যাকরণের ফ্রেজস্ট্রাকচার অংশ নানাবিধ নিয়ম বা সূত্র দেয়। ওই সূত্রাবলী একটির পর একটি প্রয়োগ করলে ব্যাকরণসম্মত সমূহ বাক্য তৈরি হবে। ট্রাজে ব্যাকরণে সূত্রাবলী কঠোরভাবে শৃঙ্খলিত, একটু এদিক সেদিক হলে হাজারো কিম্ভুত বাক্য তৈরি হতে পারে। আমি বাড়ি যাই এবং আমি ভাত খাই বাক্য দু’টি দেখতে একরকম, নিয়ম অনেকটা একই রকম, তবু এ ব্যাকরণের নিয়ম সতর্কভাবে প্রয়োগ না করলে আমি বাড়ি খাই এবং আমি ভাত যাই এরকম বাক্য তৈরি হয়ে যেতে পারে।

(৫) জীবনানন্দ

এক পার্টিতে এক তরুণের সাথে আলাপ হলো। সে ল্যাগার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কথা বলছিল। বলল, সে কবিতা লেখে। বললাম, এরকম অকাজ মাঝে মাঝে আমিও করি। বেশ জমে গেল। সে ইংরেজি কবিতা দেখতে পারে না, ইয়েটসের আবৃত্তিভঙ্গি তার কাছে হাস্যকর, ডিলান টমাস ফালতু, পাউন্ড তার প্রভু। স্কান্ডেনেভিয়ান কবিতায় তার উৎসাহ। সে ‘গীতাঞ্জলি’ পড়েছে, অনুভূতি মিশ্র। অনুবাদে সে উৎসাহী। সে বাংলা জানে না। আমার কাছে কবিতার বই আছে তিনজনের, জীবনানন্দের, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের এবং শামসুর রাহমানের। একদিন আমরা অনুবাদে বসলাম, জীবনানন্দের কবিতা। বেছে নিলাম দুটি কবিতা, ‘বনলতা সেন’ আর ‘আকাশলীনা’। আমার ইংরেজিতে গবেষণা চলতে পারে, কিন্তু কবিতা, তাও জীবনানন্দের কবিতা, চলতে পারে না।

কোথায় পাবো সেই হার্দ্র্য, কোমল শব্দ, সহজ কঠিন মিল। কি করে ঢোকানো যাবে ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার’-এর অন্তর্মিল? ‘হারিয়েছে দিশা’র দিশার ইংরেজি কি হবে? ডাইরেকশন, স্টার? কোনোটিই আমার পছন্দ নয়। দু’দণ্ডে’র দণ্ড কি ওই বাজে শব্দ ‘মোমেন্ট’? ‘পৃথিবীর পথে’র পথ কি রোড না পাথ?

বনলতা সেন হাজারবার পড়েছি, কোন দিন অর্থ খুঁজিনি, দরকার হয়নি। তাই শেষ পঙক্তিতে এসে হোঁচট খেলাম, কি বলতে চান এখানে জীবনানন্দ? ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’ এর অর্থ কি কবির সামনে থাকে অন্ধকার এবং বনলতা সেন, নাকি অন্ধকারই বনলতা সেন? অর্থাৎ থাকে শুধু অন্ধকার = (মুখোমুখি বসিবার) বনলতা সেন?
আরো বিপদ হলো ‘আকাশলীনা’ নিয়ে। এ শব্দের অর্থ কি? যে আকাশে লীন হয়ে গেছে? হারিয়ে গেছে, মিশে গেছে? ‘কি কথা তাহার সাথে। তার সাথে?’ ‘তাহার’ এবং ‘তার’ তো এক, কিন্তু এখানে তো এক নয়। কি করে একে ইংরেজিতে আনা যায়? এই ক্ষুদ্র সামান্য কবিতাটি যেন আকাশের সেই রশ্মি, যাকে ধরা যায় না, এ মুঠোতে আসে না, বুকের ভেতরেই থেকে যায়, বাংলা ভাষাতেই থেকে যায়, অন্য ভাষাতে আসতে চায় না। সেই লোকটি, যে সুরঞ্জনাকে ‘ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে, / ফিরে এসো হৃদয়ে আমার’ বলে ডেকেছে বারবার, আমি যেন সেই লোকটির মতো বারবার ডেকেছি, বলেছি, এসো, বুকে এসো, বাংলা ছেড়ে অন্তত একবার ইংরেজিতে এসো। আমার প্রিয়তম কবির প্রিয়তম এই কবিতাদ্বয় ইংরেজিতে শীঘ্রই হয়ত ছাপা হবে, আর আমি ভয় পাচ্ছি তখন আমি ওদের মুখোমুখি কি করে হব, ওরা যে এদের জাদু হারিয়ে ফেলেছে।