হুমায়ুন আজাদ > বেকনের মৌমাছিরা >> সমালোচনা

0
477

হুমায়ুন আজাদ > বেকনের মৌমাছিরা >> সমালোচনা

[সম্পাদকীয় নোট : ১৯৮৫ সালে ‘বেকনের মৌমাছিরা’ নামে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এটি সেই গ্রন্থেরই একটি সমালোচনামূলক লেখা, প্রচলিত অর্থে যাকে বলা হয় বুক রিভিউ। কিন্তু হুমায়ুন আজাদের এই লেখাটি তথাকথিত রিভিউ নয়। পাঠক পড়লেই বুঝতে পারবেন, লেখাটিতে তিনি এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা, একজন লেখকের লেখার সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যকেই চিহ্নিত করে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখার বৈশিষ্ট্যও তিনি এখানে চমৎকারভাবে উন্মোচন করে দেখিয়েছেন। সেদিক থেকে লেখাটি শুধু বুক রিভিউ নয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনার বৈশিষ্ট্য, এখনো ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। নিজের মতাদর্শেও তিনি স্থির রয়েছেন। ফলে, লেখাটির প্রাসঙ্গিকতাও ফুরিয়ে যায়নি।  হুমায়ুন আজাদের এই লেখাটি ‘সমালোচনা’ নামে ১৯৮৫ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়। এটি তাঁর কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি বিধায় একে অগ্রন্থিত রচনা বলে চিহ্নিত করা যায়। লেখাটির বানান পরিবর্তন করা হয়নি।]
আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির ভাষ্যকারদের মধ্যে ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সবচেয়ে সক্রিয়, ও সুখপাঠ্য। তিনি, আক্ষরিকার্থেই, অবিরাম ভাষ্য রচনা করে চলেছেন আমাদের বিড়ম্বিত জীবনের তিন উৎসারণের- সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির; এবং গত দেড় দশকে তাঁর দৃষ্টি ও রচনাকৌশল আয়ত্ত করেছে স্পষ্ট রূপ। তাই এক ধরনের পূর্বধারণা নিয়েই এখন পাঠ শুরু করা যায় তাঁর রচনা ও গ্রন্থ : প্রত্যাশা করতে পারি যে শনাক্ত করবেন তিনি তাঁর আলোচ্য ব্যক্তিত্বের শ্রেণীচরিত্র, উদঘান করবেন শাসক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াশীল চারিত্র্য, প্রগতিশীলতা বিস্তৃত কিন্তু পর্যুদস্ত দেখবেন ব্যাপক জনমণ্ডলীর মধ্যে। ভঙ্গিটি হবে তাঁর মুখোশ-উন্মোচনকারীর। তিনি মূর্তিবিনাশী আইকনোক্লাস্ট নন; তিনি ভেঙে চুরমার করবেন না, শুধু মুখোশ খুলে ফেলবেন সুন্দর সুন্দর ভাবমূর্তির মুখের ওপর থেকে। জাগিয়ে তুলবেন কমল ঘৃণা-অশ্রদ্ধা।  তাঁর রচনানীতি, সৃষ্টিশীলতা ও সাংবাদিকতার সুষ্ঠু মিশ্রণে, হবে রমণীয়; এবং তাঁর রচনা সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির ভাষ্য হ’য়েও সংলগ্ন থাকবে সৃষ্টিশীল সাহিত্যের। এ-সবগুলো বৈশিষ্ট্যই বিধৃত হয়ে আছে ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘বেকনের মৌমাছিরা’ নামক সম্প্রতি প্রকাশিত সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধগ্রন্থে। এ গ্রন্থে সংকলিত ১৩টি দীর্ঘ-নাতিদীর্ঘ-স্বল্পায়তন প্রবন্ধে তিনি পশ্চিমী ও দেশি বুর্জোয়াদের চরিত্র, উনিশ ও বিশ-শতকের বাঙালী মুসলমান লেখকদের শ্রেণীমানস, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা, বাংলাদেশী সমাজের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেছেন; এবং একটি বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন যে আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য, কেননা তার স্বার্থরক্ষা করে শুধু শাসক ও শোষক শ্রেণীর।
এ গ্রন্থের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘বেকনের মৌমাছিরা’ ও ‘পথ কোন দিকে’। ষোল-সতেরো শতকের ইংরেজ দার্শনিক বেকনের ‘মৌমাছি’ রূপকটিকে ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘বেকনের মৌমাছিরা’ প্রবন্ধে, চমৎকারভাবে প্রয়োগ করেছেন বুর্জোয়াদের নির্দেশ করার জন্যে; এবং এ-রূপকের আলোকে উদ্ভাসিত করেছেন পশ্চিমী ও দেশী বুর্জোয়াদের চরিত্র। মৌমাছিরা- পশ্চিমী বুর্জোয়ারা- সংগ্রহ ও সংগঠন করে; সাফল্যই তাদের মূলনীতি। কিন্তু উপনিবেশে মৌমাছিরা হয় সম্পূর্ণ বিপরীত। উপনিবেশে পরাধীন মনগুলো কেবলি ঊর্ণনাভ হয় তাই ভারতবর্ষীয়দের মধ্যে যাদের মৌমাছি হবার কথা তারা দালাল হলো, আমলা হলো। আমাদের দেশে বুর্জোয়া সৃষ্টি না হয়ে যে গাড়লেরা উদ্ভূত হলো, তার কারণ ও প্রক্রিয়া সমাজ ও সাহিত্য থেকে উদাহরণ সংগ্রহ করে ব্যাখ্যা করেছেন ডক্টর চৌধুরী। ‘পথ কোন দিকে’ প্রবন্ধটি সুদীর্ঘ, তথ্যপূর্ণ ও ব্যাখ্যাদীপ্ত;- প্রবন্ধটিতে তিনি উনিশ ও বিশ-শতকের বাঙালি মুসলমান লেখকদের শ্রেণীমানস ও চরিত্র উদঘাটন করেছেন;- দেখিয়েছেন যে তাঁদের মধ্যে সামন্তমানসিকতাই প্রবল। তাই যে মীর মশাররফ হোসেন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছিলেন সামন্তবাদের সঙ্গে তিনিই পরে ‘নীরবে আত্মসমর্পণ করেছেন সামান্যতার কাছে।’ বেগম রোকেয়া প্রথম পর্যায়ে মনে করতেন যে নারীদের অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন’, কিন্তু তাঁকে ওই প্রবন্ধ পুনরায় লিখতে হয়েছিলো, বাদ দিতে হয়েছিলো সামন্তবাদের কাছে আপত্তিকর অংশটুকু। এমনকি বিদ্রোহী নজরুল ইসলামও বন্দী হয়ে পড়েন সামন্তবাদী শেকলে। যেমন মুসলিম লীগ-বিরোধী ফজলুল হক সভাপতি হন মুসলিম লীগের। ডক্টর চৌধুরী লেখক ও সমাজ নিয়ন্ত্রকদের শ্রেণীচরিত্র উদ্ঘাটনের যে রীতি প্রয়োগ করে আসছেন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, সে-রীতির প্রয়োগে ‘পথ কোন দিকে’ প্রবন্ধটি হয়ে উঠেছে একটি মূল্যবান সন্দর্ভ।
এ দুটি থেকে কিছুটা পৃথক ধারার প্রবন্ধ ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা’, ‘ঐক্য, বিচ্ছিন্নতা ও স্বাধীনতা’, ‘ভাষা, জনগণ ও রাজনীতি’, ‘রাগ অনুরাগের কথা’, ‘উদারনীতির বিপক্ষে’, ও ‘সংবাদপত্র পড়ি কেন’। ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘সামন্তবাদের প্রধান সাংস্কৃতিক তাৎপর্য হচ্ছে ধর্মের আধিপত্য’; এবং দেখিয়েছেন যে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশ পর্যুদস্ত হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষতার জন্যে দরকার শক্তিশালী বামপন্থী আন্দোলন। এ ধারার বিভিন্ন প্রবন্ধে শাসকদের সঙ্গে জনজীবন বিচ্ছিন্নতা, আর্থসামাজিক বৈষম্য, প্রতিক্রিয়াশীলতার বিস্তার প্রভৃতি ব্যাপারগুলো তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। তবে ডক্টর চৌধুরী শুধু ব্যাখ্যাকার নন, তিনি প্রচারকও; তাই এ সমস্ত রচনায় প্রগতিশীলতার প্রচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। এ গ্রন্থের শেষ পর্যায়ের কয়েকটি প্রবন্ধ, যেমন ‘মিললেও মিশে না’, ‘মারফত আলীর এপাশ ওপাশ’, ‘জোয়ার জেগেছে কি’ প্রভৃতি রম্য, ব্যক্তিগত প্রবন্ধ জাতীয়, যে ধরনের প্রবন্ধ রচনায় তিনি বাংলাদেশ অদ্বিতীয়। ব্যক্তিতা উপাখ্যান ও সমাজকে জড়িয়ে এ-প্রবন্ধগুচ্ছে আমাদের সমাজের চরিত্র ও অবস্থা তুলে ধরেছেন চমৎকারভাবে। ‘মিললেও মিশে না’ প্রবন্ধে নতুন পুঁজিপতি জানিয়েছে, ‘তার পুঁজি দেশের সমাজব্যবস্থা’; ‘মারফত আলীর এপাশ ওপাশ’ প্রবন্ধে জানা যায় বাংলাদেশে সাফল্যের ডাকনাম এখন ‘মারফত আলী’- তার মাধ্যমে কাজ হয়। ওটাই কাজ তার। যোগান দেয়া, যুগিয়ে দেয়া।’ বাংলাদেশ এখন মারফত আলীদেরই দেশ।
আমাদের সমাজ ভাষ্যকারদের রচনা সাধারণত শিল্পিত নয়; এক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ ব্যতিক্রম ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সুখকর রমণীয় তাঁর গদ্য। তাঁর প্রবন্ধের এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকে স্মরণীয় উক্তি। আকস্মিক তুলনায় ও বিরোধাভাসে শিহরণ জাগান তিনি; পরিহাসে রচনাকে করে তোলেন উপভোগ্য। ‘জাগতিক হতাশায় পারোলৌকিক আশার বাদ‍্য হয়ে… বাজে’, ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা আমাদের সমাজে খরার দিনের ফাটলের মতো ক্রমশ বাড়ছেই’, ‘ধমক খাওয়া মানুষ তার চাষ-করা ধান গাছগুলোর মতোই ম্রিয়মান হয়ে থাকে’, ‘জাল আছে বলেই মাকড়সা অতো রহস্যময়, জাল ছিঁড়ে ফেললে না সে ভয়ঙ্কর, না সে সুশ্রী’, ‘ভদ্রলোকেরা ভদ্র ছিলেন ঠিকই, কিন্তু মানুষ ছিলেন না’, বা ‘শিক্ষাই সাঁতার তোমার’, প্রভৃতির মতো স্মরণীয় উক্তি ছড়িয়ে আছে তাঁর প্রবন্ধগুচ্ছে। ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর ভাষ্যকার ভূমিকার সঙ্গে প্রচারক ভূমিকাকে সবসময়ই জড়িয়ে দেন ব’লে কিছু গৃহীত, যাচাই-না-করা বুলিকে তিনি ধ্রুব বলে মানেন। কিন্তু ওই ব্যাপারগুলোকে এখন নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিচার করা দরকার। তিনি মনে করেন পাকিস্তানের শেষ পর্যায়ে ‘বাঙালিরা ক্রমশ সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে’; বা ‘শ্রমে ও উদ্ভাবনায় এখন যারা নতুন ভূমিকা পালন করতে পারে তারা হচ্ছে শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষ’; বা ‘স্বাধীনতা ও ইহজাগতিকতার প্রশ্নে নিরাপোস মনোভাব এখন বুর্জোয়াদের মধ্যে না খুঁজে শ্রমজীবী শ্রেণীর মধ্যেই খোঁজা ভালো। একাত্তরে ব্যতিক্রম ঘটলো। জয় হলো সাধারণ মানুষের’; বা এক্ষেত্রে (বাংলাদেশের মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে) বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকার চেয়ে অনেক বড় হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা।’ – প্রভৃতি মন্তব্য প্রচলিত-লোকপ্রিয় মতের প্রতিধ্বনি। আমার মনে হয় এগুলোর নৈর্ব্যক্তিক পুনর্বিবেচনা দরকার। বইটি সুমুদ্রিত; তবে একটি মন্তব্য করতে চাই। আজকাল ভুলবশত বই পত্র-পত্রিকায় ক্রিয়ার রূপ ও না-সূচক রূপগুলো (যেমন- ‘না’, ‘নি’) সংযুক্ত মুদ্রিত হয়। যেমন ‘বুঝিনি’, ‘করেনি’, ‘পারলনা’। এ-গ্রন্থে কখনো সংযুক্ত কখনো বিযুক্তভাবে ক্রিয়ারূপ ও না-সূচক রূপগুলো মুদ্রিত হয়েছে। এগুলো বিযুক্তভাবেই মুদ্রিত হওয়া উচিত।
ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘বেকনের মৌমাছিরা’ এ-দশকের একটি উৎকৃষ্ট সমাজ সংস্কৃতি-বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ গ্রন্থ। এটি পাঠককে চিন্তিত ও আলোড়িত করে, সমাজ পরিবর্তনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করে, ক্রুদ্ধ করে; এবং সঙ্গে সঙ্গে বিনোদন করে তার চিত্তকেও।