শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৩০]

0
233

পর্ব ৩০

বাসার সামনে গাড়িটি দেখে ফারুক বারান্দা ছেড়ে ভেতরে চলে যায়। কেউ একজন মনস্বিতাকে নামিয়ে দিতে এসেছে, লোকটির মুখোমুখি হতে চায় না সে। কেন, তা সে নিজেও জানে না। জানালায় তাকিয়ে থাকে। শুভ্রকেশ ভদ্রলোকটির শরীর নিপাট, মেদহীন পিটানো। বয়স কত হবে, আন্দাজ করার চেষ্টা করে। ষাটোর্ধ্ব কী! গাড়ি থেকে নেমে এসে মনস্বিতাকে হাতে ধরে নামতে সাহায্য করেন। মনস্বিতাও যেন কতকালের চেনা আপন মানুষ এমনি করে লোকটির হাত ধরে নেমে আসে। লোকটিকে তার চেনাই তো মনে হয়। ভাবতে থাকে;
-সেই ভদ্রলোকটি না? সেদিন এসেছিলেন? মনস্বিতার মৃত সন্তানটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এই বাড়ান্দায়ই! ওর সাথে মনস্বিতার কী যোগাযোগ? তার মানে হল এই যে, মনস্বিতার সাথে তার পূর্ব-যোগাযোগ রয়েছে। কী ঘটনা রয়েছে এখানে? ঘটনার কী কোনরকম গভীরতা আছে? কেন তিনি বার বার আসছেন? আবার সে নেই ঠিক সেই সময়টিতেই এসে মনস্বিতাকে নিয়ে বের হলেন!
ফারুকের মতো লোকের কাছে বিষয়টি খুব সাধারণ লাগে না। একসাথে অনেক অনেক ভাবনার উদয় হতে থাকে মনের ভেতরে। প্রণয়ঘটিত কোনো বিষয় কি এখানে সম্ভব! বিশেষত মনস্বিতার সাথে! মনস্বিতাতো তেমন মেয়েও নয়। চাইলেই তো কত কিছু করতে পারে ও। কিন্তু ফারুক জানে মনস্বিতা যখন খুশি যা তা করবার মেয়ে নয়। টাকাপয়সা যদি বাদও দেয়া হয় শরীরের লোভ নারীরও কম নয়। আজকাল স্বাধীনচেতা নারী নিজেকে কিভাবে পণ্য করে সে তো তার নিজেরই দেখা। অত্যাচারী স্বামীর দোহাই দিয়ে, স্বামীর নপুংসকতার অভিযোগ তুলে নারী কি নিজের জীবনের সাধ ইচ্ছে কিংবা স্বাধীনতার যথেচ্ছ ব্যবহার করছে না? মনস্বিতা চাইলেই কী তা পারে না! লেখাপড়া জানা সুশ্রী দীর্ঘাঙ্গী মনস্বিতার প্রেমে পড়বার মতো লোকের অভাব নেই। কিন্তু নিজেকে সস্তা বিকিয়ে দেয়া কিংবা হাস্যরসাত্মক হিসেবে প্রকাশ করবার ব্যক্তিত্ব মনস্বিতার নয়। মনস্বিতা কী পছন্দ করে ফারুক তা ঠিকঠাক জানে। তার নিজের প্রচুর পড়াশোনার ঝোঁক। জ্ঞানী বিদ্বান দায়িত্বশীল লেখাপড়া জানা প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী পুরুষ মনস্বিতার পছন্দ। আর মনস্বিতার চরিত্রের বিশেষ দিক হলো তার প্রখর জীবনবোধ। তার রুচি আর চিন্তার বিশেষ সমন্বয়। বিশেষত মনস্বিতার পছন্দের কোনো একটিও তার নিজের মধ্যে নেই। তার উপর বদমেজাজের কারণে দিনে-দিনে মনস্বিতা তার থেকে দূরে সরে চলেছে ভেতরে-ভেতরে এটা ফারুকও যে টের পায় না তা নয়। কিন্তু তবু মনস্বিতাকে ছাড়া সে কোনকিছু ভাবতেই পারে না। নিজের দায়িত্বের বিষয়ে মেয়েটি ভীষণ সজাগ। সামাজিক আর পারিবারিক মান-সম্মান খোয়াতে সে কোনভাবেই রাজি নয়। নিজের মা-বাবার মুখরক্ষা করতেই সে এভাবে নিজের জীবন এই সংসারে দান করে দিয়েছে, এ যে ফারুক টের পায় না তা নয়। তাছাড়া নিজের ইচ্ছেয় ফারুককে বিয়ে করেছে এ দায়ভার সে কাকে দেবে। নিজেকে হয়তো খানিক শাস্তিও দিচ্ছে সে। এ কারণেই এতগুলো বছর সে ফারুকের সাথে বসবাস করছে। তা না হলে কবেই অন্য জীবন বেছে নিত। বিশেষত সে তো মনস্বিতাকে কোনো ধরনের সুখ কিংবা শান্তি কিংবা জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। সাধারণত একজন নারী যা চায় তার কিছুই সে দায়িত্ব নিয়ে পালন করতে পারেনি। চাকরিতে কোথাও সে মানিয়ে নিতে পারে না। দুদিন পরই খটমট লাগে। আর বদমেজাজের কারণে যখন-তখন সেটা ছেড়ে দেয়। মনস্বিতাই তখন সংসারের হাল ধরে। তখন বেশ কিছুদিন ফারুক গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়ায়।
তার জীবনে মনস্বিতা যেন এক বৃক্ষ। বিশাল এক বটবৃক্ষ। যার পাতা সবুজ। কাণ্ড ভীষণ দৃঢ় আর কষ্ট সহিষ্ণু। ঋজু শরীর। অসংখ্য পাতার নিবাসে ছায়াময় তার আচ্ছাদন। সেখানে খুব নিশ্চিন্তে থাকে ফারুক। আর যাই হোক, নিজের ব্যক্তিগত যথেচ্ছ জীবনের জন্য মনস্বিতার মতো একজন ছায়াধারী বটবৃক্ষই তার প্রয়োজন, যার শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। চাইলেই যে শেকড় সরিয়ে অন্য কোথাও স্থানান্তরিতও হতে পারে না। নিজের শিক্ষাদীক্ষার সাথে মনস্বিতার রুচি আর ব্যক্তিত্বের বড় বেমিল। এটা বুঝতে পারলেও ফারুক মেনে নিতে পারেনা। সামন্ততান্ত্রিক কিছু চিন্তাভাবনা তার মাঝে থেকেই যায়। আজন্ম বাপ দাদাদের যা যা করতে দেখেছে মা কিংবা বাড়ির স্ত্রীলোকের সাথে নিজের অজান্তে বেশিরভাগ সময়ই মনস্বিতার সাথে তাই করে বসে। প্রভু মানুষটাকে নিজের ভেতর থেকে গত আট বছরে ঝেড়ে ফেলতে পারেনি সে। অক্ষম আক্রোশে তাই মনস্বিতার উপরই চেপে বসে সেই প্রভুত্ব। মনস্বিতা বন্ধুকামী। প্রেম প্রত্যাশী। অথচ সে আগ্রাসী। পুরুষ কখনো ভুল করতে পারে না। পুরুষ ভুল করেও নতজানু হতে পারে না। এই তুখোর সামন্ততান্ত্রিক চিন্তাভাবনা ফারুকের জীবনে গতি আনে। তাই মনস্বিতা কখনো তার কথায় না বলবে এটা সে মেনে নিতে পারে না। সেও কখনো মনস্বিতার কোনো প্রস্তাবে হ্যাঁ বলবে, এটাও হতে পারে না। মনস্বিতা কেঁদে ফেললে চোখের জল মোছাবে! কস্মিনকালেও নয়। হঠাৎ খারাপ ব্যবহার করে ফেললে পরে নিজের ভুল বুঝে ক্ষমা চাইবে! অ্যাবসার্ড। কিন্তু সে জানে মনস্বিতা ঠিক এমন একজন প্রেমিক পুরুষই মনে মনে কামনা করে।
একজন দীর্ঘ পুরুষ মনস্বিতার কাম্য। যে মানুষ মাটির উপর যতটা দীর্ঘ গভীরে ততটাই গ্রথিত। এ বিষয়টি বুঝতে তার দেরি লাগে না। তাছাড়া মনস্বিতা ভীষণ ট্রান্সপারেন্ট। তার গালের রক্তাভা ঠিক জানিয়ে দেয় কখন সে ভেতরে ভেতরে লজ্জায় সারা। তার উজ্জ্বল প্রখর দৃষ্টি বুঝিয়ে দেয় মনস্বিতার সততার অভিব্যক্তি। তার দৃষ্টির বিক্ষিপ্ততা তাকে জানিয়ে গেছে কখনও সে মিথ্যে বলতে চেয়েও পারেনি। মনস্বিতাকে পড়তে তার লেগেছে দুদিন। কিন্তু সে তো অত দীর্ঘ নয়। সন্তানসম্ভবা হবার পর থেকে তর্ক কথা কাটাকাটিতে আজকাল জড়িয়ে পড়ছিল মনস্বিতা। তার মানে কী এই, ধীরে ধীরে সে একদিন বিদ্রোহ ঘোষণা করবে! আগে ঝগড়া হতে কিংবা ফারুক অপমান করে বসলে মনস্বিতা একা একা নীরবে কাঁদতো। তারপর আবার ঠিক হয়ে যেত। নারীর কান্নার জল মুছিয়ে তাকে আদরে ভুলিয়ে তোলা ফারুকের কাজ নয়। রাগ করে না খেলে তাকে ডেকে আনতে হবে, মুখে তুলে খাইয়ে দিয়ে মান ভাঙাতে হবে, ধুর। পুরুষ মানুষের এসব মানায়! ওসবতো সিনেমায় চলে। তার বাড়িতেও তো দেখেছে বাবা মাকে যা তা বলে বকাবকি করছেন। এসব নিয়ে কখনও তো মাকে দেখেনি বাবার মুখের উপর কোনো উত্তর করতে। মাথা নিচু করে সংসারের কাজ ঠিকমতো করে গেছেন মা। কালে-কালে যখন তারা দুই ভাই বড় হয়েছে তখন তারাও তো মাকে আদেশ নির্দেশ করতে করতেই এতদূর এসেছে। মনে পড়ে ছোট বোনটার ছয় মাস বয়সে ওর পেছনে ছুটতে গিয়ে কোমড়ের হাড় ভেঙে হসপিটালে পড়েছিলেন মা। ঠিকঠাক হলেও দিনে দিনে বয়সের সাথে-সাথে কোমড়ের হাড়ের সংবেদনশীলতা বেড়েছে। সেপ্টেম্বর অক্টোবরের হালকা শীতের আমেজে মা কাবু হয়ে পড়তেন। কোমড়ের হাড় বাঁকা হতে শুরু করতো। নভেম্বর ডিসেম্বর হয়ে জানুয়ারির শীত যেতে যেতে মা কুজো হতে হতে নুয়ে পড়তেন প্রায় মাটির কাছাকাছি। তাও তো কোনোদিন বাবাকে দেখেনি মাকে ধরে কোনো কাজে সাহায্য করতে। তাদের দু ভাইয়েরও কখনো মনে হয়নি মাকে একটু ভার নেয়া দরকার। বিশেষত মার সেই সাহসই ছিল না স্বামীর কিংবা পূর্ণ বয়ষ্ক সন্তানকে কোন ধরনের সাংসারিক কাজে সাহায্যের কথা বলবেন। তাই সেই ন্যুব্জ বয়ষ্ক নারীকেও দেখেছে কোন কথা না বলে হাড়ভাঙা খাটুনির কাজ করে চলেছেন। বিয়ের পর মনস্বিতা প্রায়ই দৌড়ে যেত মায়ের হাত থেকে ভারি কিছু এগিয়ে নিতে। তখন মা খুব লজ্জা পেতেন। দিতে চাইতেন না। মনে করতেন ছেলেরা কি ভাববে? তার স্বামীই-বা কি ভাববেন? এমনি যাপিত জীবনে অভ্যস্ত ফারুকের পক্ষে কী চাইলেই আজ সম্ভব মনস্বিতার সাথে সব কাজে হাত লাগানো? যখন-তখন তাকে কারণে-অকারণে ভালোবেসে প্রেমে ভরিয়ে তোলা। বুড়িগঙ্গার পারে হাওয়া খেতে নিয়ে চলা! এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ টের পায় গাড়িটা মনস্বিতাকে নামিয়ে দিয়ে চলতে শুরু করেছে নিজের গন্তব্যে। ঘরে ঢুকে নিজের ঘরের দিকে এগুলে প্রশ্ন করতে করতে ফারুক আগায় তার সাথে
-কোথায় গেছিলে?
-নদীর ধারে?
-নদীর ধারে?
-কোথায়?
-জানিনা। কাছাকাছি কোথাও হবে।
-আমিতো জানি না।
-কি জানো না? কাছাকাছি কোথাও এমন সুন্দর নদী আছে সেটা?
মনস্বিতা বুঝতে পারে ফারুক কী বলতে চাইছে। কিন্তু সেদিকে যেতে চায় না বলে কথাটা ঘোরাতে থাকে।
-কার সাথে গিয়েছিলে?
-তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী।
-বাহ্ বেশ নাম তো!
ফারুকের কথায় কটাক্ষের সুর ধরা পড়ে মনস্বিতার কানে।
-তা, তিনি কে? সেদিনও বাড়িতে এসেছিলেন, ইনিই তো সেই? যেদিন হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরলে?
-তিনি তোমাকে নদীর ধারে নিয়ে গেলেন?
-তিনি আমাকে তার স্ত্রী আর পুত্রের সাথে দেখা করতে নিয়ে যেতে চাইছিলেন।
-আচ্ছা। তা না করে চলে গেলেন নদীর ধারে!
-হুম। আমিই যেতে চাইলাম। ঘর, চারদেয়াল এসব ভালোলাগে না আমার আর।
-কি বলছ? একদিন ঘুরে এসেই মন পাল্টে গেল?
এতক্ষণ কোনভাবে মনস্বিতা ফারুকের কথার উত্তর দিয়ে চলছিল। শরীর ভালো নয়। মনও। কথা বাড়াতে ইচ্ছে নেই তার। কিন্তু এবার মনস্বিতার নিক্ষিপ্ত দৃষ্টির তীব্র শরাঘাত ফারুক আর অগ্রাহ্য করতে পারে না। দৃষ্টি সরায়, কটাক্ষ করে।
-দেখে তো মনে হল বয়স ষাটের বেশি।
-হুম। তাতে কী?
ফারুক। কিছু একটা অনুমান করে নেয়। বুঝতে পারে কথা বেশি আর আগানো ঠিক হবে না।
চক্রবর্তী গাড়িতে স্টার্ট দিতে না দিতেই বাড়ি থেকে মাধবীর ফোন;
-দ্রুত এসো, টুলটুলকে কারা যেন আটকে রেখেছে। ওর বন্ধু এসে খবর দিয়ে গেল।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব ২৯

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-24/