কালের কররেখা >> এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবিদের একগুচ্ছ কবিতা

0
644

কবিতাগুচ্ছ

নাসরীন জাহান >> করোনা

শূন্যতা পিঠে জোর ধাক্কা দিলে,
হুমড়ি খেয়ে বাথটাবের কর্নারে,
থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়া। জাদুটান স্যান্ডেল চুম্বক
উড়ালে নৈঃশব্দের চতুষ্কোণ বাথরুমে ত্রিকোণ চক্কর
খাওয়াতে থাকে।
জুয়ারী শূন্যতা বেঘোর মাতালে কাচ্চু খেলার ধান্দায়
জঙ্গল থেকে আনতে থাকে ঝাঁকঝাঁক
শিম্পাঞ্জি। দমবন্ধ অবস্থায় প্যাচ ঘুরাই। কাচ্চুর কার্ড বাটতেই
অঝোর বৃষ্টির স্রোতে রক্তবিদ্ধ হতে হতে অনুভব করি,
জল নয়,কুচিকুচি কাঁচের টুকরো পড়ছে।
জুয়ারি শিম্পাঞ্জিরাও। বাথরুম তো নয়, অনন্ত
উঠোন যেন, হা হা হি হি তে শাওয়ারের গলা ধরে
তারা হেড়ে গলায় রক্তবীজের গান ধরে।
মহাবিরক্ত শূন্যতা চিৎকার ধমক দেয়, চুপ!
পালানোর চেষ্টায় আমার একপা যখন উড়ন্ত,
অমনি ফের বাইরে ধাক্কা দিয়ে আমাকে ভেতরে ঠেলে
এক উদোম লোক, আমূল জড়িয়ে ফিসফিস, এয়ারপোর্টের
লোকেরা আমার সাত্তানাস করে ফেলেছে,কীভাবে যে
পালিয়েছি, বলে হাঁপাতে হাঁপাতে আমাকে পটাতে
আমার রক্তাক্ত দুঠোঁট নিজ মুখে গিলে ফেলে প্রায়,
বাথরুম নয়, যেন-বা গুমটিঘরে কাঁচবৃষ্টি, কৃষ্ণচূড়ার
সিঁদূর সরোবরে মৃত্যুময়তার সাঁতার কাটতে থাকি।
গুমরাতে থাকে লোকটি, আমি তোমারই স্বজন,
আমাকে সুন্দরী সিংহীর কোলে তুলে দিওনা।

এরপরও যখন ছিটকে যাব যাব, ফের তার আকুল
অস্ফুট কন্ঠ, আমি এদেশের ভিনদেশি গো…শুনে করোটির
মধ্যে থেকে কালো বিড়াল বিশাল থাবা বিস্তারিত করে,
হুজ্জৎ ফাঁকে ইথারে কান পাতি,আমার প্রেমিক
দরজার বাইরের কোণে আমার জন্য পাঠিয়ে দেয়
গোপন হাসপাতাল।

চিচিং ফাঁক, চিচিং, দিকভ্রান্তপ্রায় আমার যখন ফের
দরজার বাইরে বধির তালগাছ পা প্রসারিত,
তার মরণ চিৎকারে উবু হয়ে পড়ি
শিম্পাঞ্জিশূণ্যতা জগতে।
লোকটার তরঙ্গিত ধবনি বদ্ধ বাথরুমে ছড়ায়িত,
দরজা লাগিয়ে দাও, বাইরে ছড়িয়ে যাবে,
করোনা! করোনা!

খালেদ হোসাইন >> একজন মুক্তিযোদ্ধা

তোমার দুই চোখে এক বিস্ময়কর জ্যোতি খেলা করছিল
তা কেবলই প্রতিরোধ আর প্রতিশোধের নয়, মূলত ভালোবাসার।
কুপির মিটমিটে লাফানো আলোয় তোমার কপালের ঘাম
খুদে শিশিরের মতো জ্বলজ্বল করছিল-
তোমার স্বজনেরা তোমাকে মধ্যরাতের শিহরনে ঘিরে রেখেছিল,
সবাই আশা করছিল, তুমি কিছু বলবে
অন্তত অনুবাদ করবে তোমার চোখের আলো আর কপালের স্বেদ।
পাশে নামিয়ে রাখা স্টেনগানের চোখগুলো তো বিস্ফারিত হতে চাইছিল।
তোমার মুখে খাওয়া উঠছিল না, হাত-পা যেন নড়তে চাইছিল না
চমকেও উঠছিলে বারবার। যারা দেখছিল তোমার এ আকস্মিক অস্তিত্ত্ব
যা খানিকটা অবিশ্বাস্য
তাদের গালে চোখের জলের দাগ তখনও চিত্রিত।
অন্ধকারে মিশে যাবার আগে একবারও তুমি জানতে চাওনি তোমার
মা ও বাবার কথা, ভাইবোনের নিয়তি।
বরাবরই তুমি মৃদুকণ্ঠ, স্বল্পবাক। কৃষ্ণপক্ষের তমসায়
মিশে যেতে যেতে বললে, সব স্বপ্ন সত্যি হবে।
আজ হোক, কাল হোক। বাঁচি বা না-বাঁচি-
আসতেই হবে, বারবার আসতেই হবে।
দেশ স্বাধীন হলো।
তোমার মা মরলো, বাবা মরলো অপেক্ষায় অপেক্ষায়।
পিষ্ট হলো কতো স্বপ্ন।
তুমি আসোনি। বা তোমার অবনাগমন আমরা আর বুঝতেই পারি না।

শেলী নাজ >> জীবাণুপুষ্প

মহামারি লাগা শহরের মর্মমূলে জেগে আছি
ষড়যন্ত্রমূলক এ অমানিশা, আকাশজানালা
রুদ্ধ, তবু এলো উহানের পাখি, মৃত্যুবীজ ঠোঁটে
সাজি ভ’রে গেছে নৃমুণ্ডুতে, যেন শব উৎসব
সবুজাভ মৃতকোষ ধ’রে আছি শূন্য করপুটে
সশস্ত্র বাহিনী আজ নেমে গেছে, ক্রুদ্ধ পথে পথে
মুখোশে ঢেকেছি মুখ, বাতাসে সঙ্গীত প্রেতিনীর
ব্যর্থ হল পুরুতের শ্লোক, হাত ধুতে ধুতে ক্লান্ত
জীবাণুপুষ্পেই সাজিয়ে তুলছি মৃতের মন্দির
আমার দু ঠোঁট বহুদিন সিলগালা করা, একা
মৃত চুমুগুলো ফের জন্মাক সেখানে, হাত ধুয়ে
মুছে ফেলি পাপ আর শিকারের রক্ত, স্পর্শ লোভে
জেগে থাকি মড়কের রাতে, যেন মরে গিয়ে বেঁচে যাই
এসব জীবাণুপুস্প গুঁজে রাখি রুদ্ধ কবরীতে
আমি যদি নাও থাকি, থেকে যাবে বিশুদ্ধ পৃথিবী
সূর্যের দস্তানা পড়া ভোর জানি শোনাবে ভৈরবী!

অংশুমান কর >> অঙ্ক

তালিকা বানাচ্ছি।
এই দুর্যোগের সময় কী কী লাগবে তার একটা তালিকা।
আর কী কী লাগবে না তারও একটা তালিকা।
বন্ধুর পরামর্শ শুনে তালিকা বানাচ্ছি।
জরুরি। খুব জরুরি। খুবই জরুরি এই পরামর্শ।
এতে কমবে উৎকণ্ঠা।
এই দুর্যোগের সময়ে নিজেকে খানিকটা বাঁচানো যাবে
মজুতদার হওয়া থেকে।
তাই বানাচ্ছি তালিকা।
বানাতে বানাতে বুকের ওপর চেপে বসছে
একটা ধূসর কালো পাহাড়
পর্যটকেরা দূর থেকে সেই পাহাড়কে দেখছে
আর একে ওকে বলছে, ওই দ্যাখো,
ওই হল মধ্যবিত্তের অসহায়তা দিয়ে বানানো
বিষণ্ণতার পাহাড়।
আমি এইসব মন্তব্য পাত্তা দিচ্ছি না।
একমনে তালিকা বানাচ্ছি। দুটো দুরকমের তালিকা।
যারা তালিকা বানাতে পারছে না
মানে যাদের কী কী লাগবে না সেরকম কোনও তালিকাই নেই
সেই ঠেলাওয়ালা আর রিক্সাচালক
দূর থেকে আমাকে দেখছে আর মনে করছে
আমি একটা ছোট লাল ফুল
নিরুদ্বিগ্ন ফুটে রয়েছি
ফ্ল্যাটবাড়ির গ্রিলের থেকে টাঙিয়ে রাখা টবে।

সাচাল সারমাস্ত-এর কবিতা >> রূপান্তর : সৈয়দ তারিক

আমরা হচ্ছি, আমরা হচ্ছি কী?
আমরা জানি না, আমরা হচ্ছি কী।
এই তো আমরা রয়েছি আশীর্বাদে,
এই তো আমরা অভিশাপে বরবাদে;
কখনও আমরা মগ্ন নামাজ-রোজায়,
কখনও আমরা তা করি যা মনে চায়;
এই বলে উঠি, ‘আছি শুধু আমরাই।’
এই বলে উঠি, ‘আমরা আদতে নাই।’
ক্ষণে আমাদের চিত্ত শান্ত যদি,
ক্ষণে কেঁদে গড়ি অশ্রুর ভরানদী;
এই বলে উঠি, ‘আমরা আত্মজ্ঞানী।’
এই বলে উঠি, ‘আমরা কে, তা কি জানি?’
সাচাল, আমরা আসলে
অমনই তো চিরকেলে :
বলো তবে, আর
আছে কিছু করবার?

মুজিব ইরম >> পদকল্পতরু

আমার সোদর ভাই জ্ঞানদাস কান্দে। কিবা রূপে কিবা গুণে মোর মন বান্ধে।। মনের মরম কথা কী করে রচিবো। চিতের আগুন কতো চিতে নিবারিব।। চণ্ডীদাস ভাই মোর আন পথে নিলো। কী মোহিনী আড়বাঁশি অধমেরে দিলো।। যত নিবারিয়ে চাই নিবার না যায়। যেই পথে ধরি পথ পয়ারে হারায়।। আকুল শরীর মোর বেআকুল মন। পয়ারে খুঁজিয়া মরি আপনার ধন।। গোবিন্দ দাসের পদ ভেবেছি সরল। অন্তরে সরল বাঁশি উগারে গরল।। যাঁহা যাঁহা নিকসয়ে তনু তনু জ্যোতি। আমারে করিলো ফানা এই তার রীতি।। জ্ঞাতি ভাই বিদ্যাপতি রাখি যে বিশ্বাস। খনে খনে পদ বলি ছোড়য়ে নিশ্বাস।। পয়ারে মজিয়া থাকি জগত ছাড়িয়া। ভাবি রোজ পেলে তারে না দিমু ছাড়িয়া।। এই কথা ভাবি রোজ এই কথা ভাবি। পয়ারের লোক আমি এই মোর দাবি।।
মুজিব ইরম বলে ভাবিয়া চিন্তিয়া। মনে থাকে পদকর্তা গীতে থাকে হিয়া।। বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস জ্ঞান ও গোবিন্দ। এই চার গীত পড়া প্রভূত আনন্দ।।

আলতাফ শাহনেওয়াজ >> কবিতা নয়, এটি বিজ্ঞাপন

এই কোলাহল, ভীড় আর
ক্রমাগত মৎসবিতান—গণপরিবহনের ভাঁজে
ঘাড় গুজে বহু দিন
রাতের মতো ছোরা হাতে
চলে গেছে—ভার্চুয়াল মেঘবৃষ্টিতে
আমাকে ভিজিয়ে
হাটবাজারে বসিয়ে
রেখে
চলে গেছে
বিনা স্যালুটে ক্রমশ মার্চপাস্টে
হেঁটে
হেঁটে
হেঁটে;
.
নীরবে আমাকে নিয়ে গেছে আমার নিশ্বাস
থেকে, তোমার শরীরী-সিন্দুক থেকেও
দূরে—গোপন এয়ারকুলারের ভেতরে
.
বহুদিন দেখিনি এসব—তোমায় একাকী ফেলে
মনে মনে আমি জাকারবার্গের রাষ্ট্রে
সীমান্ত পাহারা দিচ্ছি!
আর
আমার মুখে প্রবল জমাট রক্ত
ডিটারজেনের বিজ্ঞাপন হয়ে
উড়ছে আকাশে, দেখেছ?

সৈয়দ ওয়ালী >> বিমূর্ত কমল

খেয়ালি বাতাসে ওড়ে
মনোঘুড়ি
নিখুঁত সময় দেয়া সিকো
পড়ে না বাউল
ধানের সোনালি শিষে অভাবকে বুনে রেখে যে পথিক
ছেড়ে যায় ঘর
ফসলের ঘ্রাণ কী করে টানবে তাকে
স্বভাবে বুনো ঘোড়া চলনে ঐরাবতের বেগ
যুগপৎ ভালোবেসে
যে মানুষ
হাসে
ফসল মাড়াই চকে তাকে যে পাওয়া যাবে
এ দিব্যি কে দিয়েছিল
ভানের প্রতিমা খুলে
কুয়াশায় বুঝ দিয়ে যে মানুষ ছেড়ে যায় হাট
ন্যাংটো বনের সাথে
তারই তো জমবে আলাপ
খেয়ালি স্রোতের বুকে ঠাঁই নেয়া মনো-নাঊ
কোথায় যে ফেলবে নোঙর
হিসেবি গণক তার কী করে দেবে উত্তর
খেয়ালি মননে ওড়ে
বিমূর্ত কমল

পিয়াস মজিদ >> বসন্তছন্দের সবুজ রক্ত

বহু
বাউল-বছর পেরিয়ে
তুমি আজ
রাজসভার রক্তপাতে।
তোমাকে যতই ডাকি
আমার দিকে;
তুমি শুধু
মহা
আর মারীর দিকে।
মরচেপড়া স্টেনগান সব;
ক্ষুধাই শাণিত
নীরক্ত এই করবীর কালে।
কত নৃত্যময় রক্তের কল্লোল
জীবনের উজানভাটায় দেখে থাকে—
তোমার হৃদয়হ্রদে
আমার কবিতার এই অক্ষম অক্ষর
ভেসে যায় জলের
আগুন-আকারে।

নীলাব্জ চক্রবর্তী >> নীলগঞ্জ রোড

অজস্র রেফারেন্স আর ক্রস-রেফারেন্সের ভেতর
আমি তোমায় নীলগঞ্জ রোড
স্টিয়ারিং ভাবতে ভাবতে
খুব পার হই
আর
লক্ষ করি
এই মাসের কবিতা পরের মাসে
যে আঙুল ফিরিয়ে দিচ্ছে
ছোট ছোট রঙ
রুটি ও নুনের কাছে ডুবুরী গাছ
অভিমানাহত
কমলা ফিল্টার অবধি এক সিনট্যাক্স
ছেড়ে যাওয়া ভাষার এমন দিনে
শরীর হয়…

হাসান রোবায়েত >> মরে গেলে

মরে গেলে—
কোথাও একটা সাইকেল
থেমে যাবে
হঠাৎ বেলের আওয়াজ
দুপুরের আড়া-জঙ্গল পার হয়ে
ঘুমিয়ে পড়বে
আত্না ফুলের মায়ায়
খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে মনে হবে
আমিকে ভুলিও না, সোনা
যেতে হয় বলেই
মানুষ সাঁকো বানায় নির্জন বিষণ্নতার উপর—

 

রুহুল মাহফুজ জয় >> যে ফুল ধরে ডাকো

নাচিলো বিজু পাহাড়, পা-হীন সন্ধ্যায়
বাজি লাগো-গো হাড়, রতি যায় যায়
যে ফুল ধরে ডাকো এখনও ফোটেনি তার নাম; বাড়ি— আরেকটু সবুর কোরো সুশীলাগর্ভে, পদ্মপাতায় অংশু ঢালিছে মেঘের বদনাম। ডাকোনি নাম ধরে জানো যখন দোজখের অন্য নাম পৃথিবী, একটি ডাকের অপেক্ষায় গোচরেই বুড়ি হৈল পটের পরী।
অপরে খায়, নজর দিয়া ভাবিতেছ আহার
বোতাম খুললেই আহা, বেরোয় না পাহাড়
আলতা গলে পায়ের কাছে দেখা, মুখর দিনে মানুষ থাকে একা। কপাট খোলা বাহির হ’তে কয়ে, চালতা ফুলে কণ্ঠ গেছে রয়ে। মলাটবদ্ধ শাদা শহরে নির্জন এক কবি, তার ভাষারে ডাকে তুহিন আরা অপি।

অনুপম মণ্ডল >> ডাক

আমাদের সমস্ত গান, যেখানে,
খণ্ড খণ্ড নীরবতার ভেতর, নিজেকে বেঁধেছে—চলো,
সেইখানে, সেই নিঝুম কুহকের কূলে,
শুকনো পাতাদের উড়ে যাওয়ার মতো বিষণ্ণতা গেঁথে তুলি—
ভাবি, ওই শিরীষের শাখা, সেইসব গোধূলির সমীপে
বেড়ে ওঠে, যেখানে সুরেরা জেগে উঠে পথ হারিয়ে ফেলেছে—
আর সমুদ্র
গর্জনরত

নাহিদ ধ্রুব >> নিলীন

তীব্র জ্বরে কেঁপে কেঁপে উঠবে বন। জলপটি দেওয়ার নামে সমস্ত রাত ঝরে যাবে শিশির। এমন রাতে কোথাও কোন পাখি ঘুমাবে না বরং গুনগুন করে গাইবে ঘুমপাড়ানি গান। তবু, তুমি ঘুমায়ে প’ড়ো না — এমন রাতে আশ্চর্য বাতাস বহে।
জানালা ভেঙে আচমকা ফিরে আসুক হিম বাতাসের জীবন, তুমি পূর্ণিমাতিথিতে ভেসে যাওয়া প্লাবন। চারিদিকে উত্তাল ঢেউ উঠবে—বান ডাকবে চরাচরে। মরা কাঠ ধরে তুমি ভেসে যেও ধ্বসে যাওয়া হৃদয়ের কাছে। হাল ছেড়ো না—সমুদ্রে আশ্চর্য ঘূর্ণি আছে।
নিলীন হয়ে বসে থাকবে একখণ্ড জীয়ন্ত মেঘ। পাহাড় থেকে গড়ায়ে পড়বে মাটির ব্যথা। বিরান রোদ্দুরে খেলা করবে পাতার সজীবতা। তুমি পরগাছা’র মতো ঝুলে থেকো শেকড় ধরে। এইখানে দুটো গাছের মাঝে না বলা গুঞ্জন থাকে।
সমস্ত দৃশ্য ঢুকবে অন্তরঙ্গ হওয়ার ছলে। ঝিমিয়ে পড়া বাস্তবতা অবাক হয়ে তাকাবে—বিদায় থেকে মুছে যাবে কান্নার রঙ, পড়ে থাকবে শেষ নিঃশ্বাসের আগে মনে পড়া অপূর্ণ বেদনার ছাই—সব মিটিয়ে নিও, যেদিন মনে হবে এ জগতে তুমি ছাড়া আর কেহ নাই…

অনুপমা অপরাজিতা >> স্পর্শ

জনপদে জনপদে উড়ছে অণুবীজ…
তবু মানুষই তোমাকে জয় করেছিল একদিন
হে প্রিয় স্বাধীনতা!
রক্তস্নাত দেশ সুখদ বেদনা
মিলেমিশে ছিল পাখি ও প্রজাপতি
সেই স্বাধীনতা আজ নির্বাসনে

আজ মানুষেরই স্বেচ্ছাচারিতায় অতিষ্ঠ হয়ে
লুকোলে তুমি আড়ালে আঁধারে
তোমার আশ্রয় মমতা প্রেম এখন বিচ্ছিন্ন
একার সাথে করেছো আঁতাত
অলিখিত যুদ্ধে থমকে আছে ফুলের কুঁড়ি
যুদ্ধবাজ সময় থেকে পালাবার পথ নেই
ঘরে ফিরে দেখি দীর্ঘশ্বাসের ফাঁদ
লেগে আছে প্রিয় স্বজনের আলিঙ্গনে
চিবুক ছুঁয়েছে নিষেধের আগুন
অচেনা প্রহর অজানা রাত
অধরে খরস্রোতা নদী
মমতার হাতে নখাগ্রে প্রেমের মৃত্যু
স্তরীভূত পতনের আওয়াজ
স্পর্শের বাইরে জীবন কতদিন
প্রতিবেশির ছাদে দাঁড়কাক

মানুষ আজ আর স্বাধীন নয়
রুদ্ধ পথ, পথে পথে ধুলিচূর্ণ
ছিপ ফেলে বসে আছে ঈগলের নখ!

রিমঝিম আহমেদ >> আশাবাদের হাওয়া

নদীর দিকেই যেতে চাই। ডুবে গেছে বেলা।
নিজের ভেতরে তাই নদী আঁকি, পানি দিই,
ভাসাই সাম্পান। পাখিগুলো উড়ে যায়
ওপারে বনের দিকে, জলঝরা সন্ধ্যাবেলা।
জাহাজে পটের বিবি মুখে মুলতানি মাটি
মেখে বসে আছে উদাস। অদূরে রোদে-পোড়া
পাড়ভাঙা গ্রাম, ভেসে গেছে জন্ম-ঘর।
মেহেদি গাছের মূল…। কালো-শ্লেট খড়িমাটি
পানিতে ভাসায়ে ছায়া, পাখিদের মা ঠোঁটের
আদর নিয়ে পলকে যায় ছানাদের কাছে।
মৈথুন আগলে রেখে, শোকাকুল জামা থেকে
ঝরে যাবে ধুলো! সময়ের মারি, মন্বন্তের

মোস্তফা হামেদী >> অভেদ

মানুষ ফিরেছে মানুষের কাছে।
ভালো মানুষটি সেজে খুনি আপন কারো প্রেমের ডোরে বাঁধা।
পাপী ভীত। প্রার্থনারত।
অবিভক্ত রোদ গায়ে মেখে সকলে খুঁজে চলেছে নিরাময়।
পাখিরা জেগে উঠছে পাতার ফাঁক উজিয়ে। পালকে মুকুলের আঁশ।
সার বেঁধে খাটিয়া রাখা।
ধুয়ে সাফ করে রাখা হলো ঘরদোর।
শুধু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চাইছে একটা ক্লান্ত দুনিয়া।
ক্রমে গুছিয়ে ফেলছে ভেদ।
কারা নত হয়ে চলেছে ঐ অতি ক্ষুদ্রের কাছে?
পরাভূত এক পাতা ভেসে যায় কৃতকর্মের হাওয়ায়।

রোজেন হাসান >> সূচনার কাল

মাঝে মাঝে তোমার হৃদয় ঘরের মধ্যবিন্দুতে
রচনা করে উপকূল, বায়বীয় অগুণিত আয়ূধ। নূহের নৌকো।
ত্রাণর্কতা। রাত্রি। প্রতীক।
সে নৌকোতে দৃশ্যরে প্রতিলিপি। যারা আগওে তা-ই ছিলো।
যে পুরুষ এক নতুন আলোর দিকে
বয়ে চলেছে অজর-অমর প্রতিলিপিদের।
দ্যাখো, তুমি যারা মূল, যারা ফেলে দিয়েছে জ্ঞান।
তারা অজস্র, তারা দ্বৈত, তারা ধ্রুব।
স্বয়ং নূহের ত্যাজ্য পুত্র, শুনো
অনন্তকালব্যাপী উৎসব।

সুবর্ণ আদিত্য >> নীল নকশা

১.
অথচ দক্ষিণের বাতাসকে মিলিয়ে দিতে একজনকে গাছ হতে হয়েছিল
জরুরি সেবা দিচ্ছে এমন এক নদী—তীব্রতর হতে গিয়ে নৌকায় চেপে বসলো
তেমনই এক বিকেল ধীরে ধীরে জড়ো হতে থাকে মখমল স্কুলে—মৃত্যুর আগে বা পরে, মানুষ কী ছিল?
২.
চারদিকে ধানক্ষেত—
এলিয়ে যায় গোমস্তাদের উঠোনে
ধরিবাজ রোদের আলোয় মিস ডায়ানার পোস্টার ভেসে গেলে
বিস্তীর্ণ ঢেঁড়শবনে চাষ হয় গোলটুপির। উত্তরের জানালা খুলে দেখতে পেলে একটা সাদা বক হাতমুখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাদরাসায়—তারপর তাকেও…
৩.
একঝাঁক পাখি মস্ত সরীসৃপের বুকে মাথা রাখবে—
এমন বাণী দিতে দিতে এক অমানুষও ঈশ্বরের কাতারেই আছেন। মৌসুমি লিচু, শুয়োরের মাংসের সাথে খিচুড়ি খেয়ে ঢেকুরটাও ঠিকঠাক তুলতে ভুলে গেলো এক জাদরেল।
৪.
তোমার বাবাই যে তোমার জনক—তা নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নয়।

নুসরাত নুসিন >> একশত চুমুর লণ্ঠন

যেটুকু আয়ত্বে এলো তার প্রণোদনা ও তরঙ্গ আমার।
দূরগমন। দূরব্যঞ্জন। একশত চুমুর লণ্ঠন!
কে অধিক?
এই যে একতারা
এই যে ছায়াধারণা
উহ্য মুদ্রা—এ কেবল আক্রমণ!

কচি রেজা >> সিরিজ কবিতা

১.
কিছু মিথ্যুক সাপ ছাড়া মেয়েটির কান্নার প্রশংসা করেনি কেউ। লুকিয়ে গাওয়া গানও শোনেনি। শুধু বনের ভেতর এক আক্রান্ত জলপাই গাছ শুনেছিল কন্ঠ ছেঁড়া বিনিদ্র শিস। উন্মাদ পাথর যারা সারাক্ষণ পুরোহিতের জন্য কাতর, কবে যেন পেছনে রেখে এসেছে অধিক কাছের নদী, জিজ্ঞেস করেছিল, ছুরিটা কি খয়েরি?
২.
স্বীকার করি সঙ্গীত শিখিনি/ রোদন জমা করিনি। বোতাম ছিঁড়ে গেলে দারুচিনি গাছের কাছে শিখতে চেয়েছি নেশা। গাছেরও আছে ভুরু ভঙ্গি। বিবাহের রাতে আয়নায় এক তিলোত্তমাকে দেখি, পেশোয়াজ পরতে গিয়ে ভেঙ্গে ফেলেছে বাঁকা নখ।
তখন সমুদ্রে যাওয়ার ইচ্ছে হলো, আর যেহেতু জানলো না কেউ কিভাবে এক পাথুরে অচেনা স্টেশনে হারিয়ে গেলাম আমি।

জফির সেতু >> তিনভাগ রক্ত


ভূ-উপগ্রহ থেকে তাকালে
মনে হবে একটি অগ্নিগর্ভ
অথবা মনে হতে পারে
জলপাই-পাতায় ঢাকা স্ত্রী-অঙ্গ
হয়ত এজন্যই উপত্যকাটিতে
জন্ম ও চিৎকার
দুইই চলছে!

পৃথিবীর মানচিত্রে কাশ্মীরটা কোথায়?
আমি যতবার প্রশ্ন করেছি,
আমাকে সবাই দেখিয়েছে একটি হৃৎপিÐ!
আমিও লক্ষ করেছি ওটা বর্তুল আকৃতির কিছু
আর শীর্ষবিন্দুতে রক্তের সূর্য-আঁকা।

কুরুক্ষেত্রের বিস্তার এখানেও।
কুরু আর পাণ্ডবকুলের রক্তে এককালে
ভিজেছিল পৃথিবীর মুথাঘাস
আবারও মেদিনীযুদ্ধে পুড়ছে আকাশ
আর অতি কাছ-থেকে-ছুড়া গুলিতে বিদ্ধ
হচ্ছে বৃদ্ধ-নারী-শিশু ও পুরুষ
জাফরানের খেত ভিজে যাচ্ছে মানুষের রক্তে।

জাফরান ছয় পাপড়িবিশিষ্ট বেগুনি রঙের ফুল
কিন্তু তার গর্ভমুণ্ড সূর্যরঙের
আর পুংকেশর রক্তরং
উপত্যকার লোকের অভিমান এই যে,
হত্যা করা হলে তারা
জাফরান হয়েই জন্মায়!

যুদ্ধ শেষ না আসন্ন?
কুরুক্ষেত্রে এই সংলাপ ছিল রাজা ধৃতরাষ্ট্রের
তিনি অন্ধ ছিলেন
এখন জগতসুদ্ধ সকলেই অন্ধ।
রক্তে ভেসে যাচ্ছে উপত্যকার মাটি
অক্ষৌহিণী সেনাদল চারদিক থেকে চিৎকার করছে
জিতেছি জিতেছি
আর অন্ধেরা প্রশ্নও করছে,
যুদ্ধ শেষ না আসন্ন!

‘লোকেনেতি নিরর্গলং প্রলপতা সর্বং বিপর্য্যাসিতম’
এই সূক্ত-বাণী প্রাচীন এক ঋষিকবির
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়,
অসংখ্য মিথ্যা রটনা করে বৈপরীত্য ঘটানোই রাজধর্ম!

রাজা চিৎকার করেছে,
আমি হিতকামী, আমি হিতকামী
রাজার দাঁতে মানুষের মাংস লেগে আছে
আর হাত দুটোতেও নৃমুণ্ড-ধরা।

বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায় >> কেন এ রন্ধন

এই যে আমি রোজ নিজেকে ভেঙে ভেঙে খাওয়াই
এও কি আমার পক্ষে ভালো?
প্রেম যে অব্যবহার্য সে পরম বুঝে
জাফরিকাটা বেখাপ্পা আসবাব
প্রাচ্যের ফ্ল্যাটে বন্ধ রেখে
পাশ্চাত্যে গিয়েছো
সে কেদারা কাঁদে
বন্ধ ঘরে তার গুমরোনো শুনে ভয় হয়
তুমি তো বসতে শুধু তাতে
কোনোদিন –
আদরও করো নি
তবে কি এত মোহন, এত রোচক সেই ভারটুকু?
এখন যে দাবি করো নারীমাংস সিদ্ধ না হলে
তখনই খাবে না
কুমীরের মতো তাকে পচাবে গর্ত খুঁড়ে তবু
কুসুম কুসুম!
তোমার শরীর নাই?
কুসুম কুসুম!
তার কোন ঊর্ধ্বশ্বাস নাই
কোন আজ নাই, কাল নাই
উৎসেচকের সাথে খাবারে যে খাঁজে খাঁজে মিল
তার কোন খাঁজ নাই, গর্ত নাই
অপূর্ণতা নাই, খিদা নাই
তুই শুধু সপ্তাহান্তে বিনোদন
দিনান্তের স্টু
গ্রীবায় চাঁদের আলো নিয়ে
একলা পুকুর!
দরজা দে
এই অঙ্গহানি
এ’ নিরন্তর রান্নাবাটি
এও কি আমার জন্য ভালো?

নৈরিৎ ইমু >> মানুষ হবার বাকি

স্মৃতিনির্ভর পাতা উল্টাতে থাকি
কোন-এককালে ঝিঁঝিঁপোকাও ছিলাম!
ঝোপঝাড় ফেলে বেরিয়ে এসেই দেখি
পোকা নেই আর, মানুষে রূপ নিলাম!
বসবাস ছিলো পাতার সবুজে মিশে
তথাপি জীবন শিল্প সমুন্নত
আস্ত দানব জেগে ওঠে অবশেষে
আহারের তৃণ করে দিলো মর্দিত
মূলত ডানার ঘর্ষণে ঝিঁঝিঁ বাজে
অতলান্তের বহু খোপ খুলে রাখি
খোপরে খোপরে দেহ আছে ভাঁজে ভাঁজে
সব কীট শুধু মানুষ হবার বাকি!

শ্বেতা শতাব্দী এষ >> যখন হাওয়া আসে

শেয়ানা হাওয়ারা জানে—
ঝিঁঝিরা কীভাবে ইশারায় রাত্রি নামায়,
রাঙা চোখের পথ পার হয়ে ভেসে আসে
ফুলেদের মৌতাত, কোথাও
অপর্যাপ্ত নেই জীবনের নরম আঁধার—
হাফধরা জীবনের প্রেম
ঝুলে থাকে অসুস্থ সাঁকোর ওপরে!
এইসব দৃশ্যরা ঠিকঠাক—
ঝরে যায় সময়ের খয়েরি ত্বক
তিশির ফুলের মতো নীলাভ আকাশে।
নির্মোহ পৃথিবী থেকে লোকেদের
নিবাস উঠে যায়
নিস্তব্ধতা গুনগুন করে সমস্ত চরাচরে—
যেন, কারা খুব গোপনে কাঁদে—
আয়ু মুছে মুছে
পৃথিবীকে বসন্তে সাজায়!

সরোজ মোস্তফা >> অশ্রুমুখী দিনে

সাবানের ফেনা মৃত্যু ঠেকাতে পারে না।
যেখানেই থাকো না কেন
শালিকের ঝাঁকে
কাচের ঘরের মতো ভেঙে যাবে তোমার মুখমণ্ডল!
অশ্রুমুখী দিন কি যাবে না!
মানুষের ফুসফুস খেয়ে ভূমিতে হাঁটছে করোনা।
ভাইরাসের ডরে পুরো শহর লক ডাউন।
কাঁচা বাজার, ঔষধ, মাক্সের দোকান ছাড়া সব বন্ধ।
হাত ধুচ্ছি, মুখ ধুচ্ছি।
প্রতিটি মৃত্যুর পর ধুয়ে নিচ্ছি নিজের খাটিয়া!

তাসনুভা অরিন >> পাতার মর্মরে বাজবে তুমি

কোঁকড়ানো, হলুদ, খয়েরি অথবা পাকা সবুজ-ঝরা
পাতার পথ হয়ে আছি
একটা জীবন আমার উপর দিয়ে হেঁটে যাও
শব্দ হবে
বুকের ভিতর মর্মর করে বাজবে তুমি।
পাতার পতন নিঃশব্দ
গুন গুন করে কাঁদে
মনে হবে গান গাইছে
হেঁটে যেতে যেতে শুনতে পাবে
মৃতদেরও বয়স আছে
রং আছে
মাটি হবার সাধ আছে।
নিঃশব্দে যারা ঝরে যায় তারা আরও বেশি করে বাজে
বাজবে তুমিও তীক্ষ্ণ কামড়ে পাঁজরের কোথাও
তুমি হেঁটে যাও আমার উপর দিয়ে
নগ্ন পায়ে।

কুশল ইশতিয়াক >> কুয়াশারাত

পৃথিবী বাড়ি ফিরছে
নির্জনতার হাত ধরে
নির্জনতাকে দেখাচ্ছে পৃথিবীর মায়ের মতন

কবির হোসেন >> কানের উৎপাত

কর্ণ খাড়া করার মতো মাইক পেতে রাখা হয়েছে, একে একে ধরা দিচ্ছে কথা গোচরে। ব্যক্ত যত কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, ব্ল্যাকহোলে জমা হচ্ছে আকর্ষণে। যে কথা হয়নি বলা এখনো, মুখে লেগে আছে স্বাদের মতো, তাও দৌড়াচ্ছে শ্রুতের দিকে। গোপনাক্রান্ত কথা কিছু—জ্বরের প্রকোপ নিয়ে কাঁথামুড়িতে লুকিয়ে আছে গোপনে, তাও চলে আসছে ছুটে মাইকের ফাঁদে। এতো বড় কানের উৎপাতে কথা কি আর গোপন থাকে? কেউ কেউ তো জানে না, জবা ফুলের মতো এই লোলুপ কানে যা হচ্ছে শ্রুত, তা হবে তার কথা। এতোটা নিগূঢ় টেনে আনে মাইক, কথা উৎপন্নের মেশিনকে ক্লান্ত করে। আর সে-সব কথা তার বেয়ে পৌঁছে যাচ্ছে মাইক্রোফোনে।
মাইক্রোফোন হাতে এক বোবা ও কালা, কুন আইস্ক্রিমের মত চেটে খাচ্ছে কথা আয়েশে।

মন্দিরা এষ >> স্নানমন্ত্র

একটি সবুজ বৃত্তকেন্দ্রে গিয়ে শোও
নোনতা কবাট খুলে ওপরে তাকাও
দেখবে অনেকখানি নীলে তুমি ভাসছো…
যদি দ্বীধাহীন দু’হাতে সহস্র রৌদ্রদহনের পর—
বিকেল মেলে ধর
দেখবে দূরতম যাত্রা শেষে একটা মেঘ তোমার সব’কটি আঙ্গুল ছুঁয়ে যাবে—
আর যাত্রাবৃত্তান্তের একপর্যায়ে তোমাকে বলবে—
হাওয়াই ট্রেনের সবগুলো কক্ষের নামই ‘বৃষ্টি’ নয়
স্নানমন্ত্র জানতে হলে তোমাকে সঠিক কক্ষটি চিনে নিতে হবে
যেকক্ষটির সব’কটি জানালা তোলপাড় জলচুম্বনে
দরজায় জাপটে ধরে অদেখা স্বজন
তার যেকোন একটি আসন তোমার জন্য বরাদ্ধ থাকবে
তবে তার আগে তোমাকে হতে হবে ডানা মেলা যেকোন তুখোড় পাখি
কেন না তারাই হাওয়াই ট্রেনের প্রকৃত যাত্রী…

চাণক্য বাড়ৈ >> রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে গিয়ে

এখানে স্তব্ধ হয়ে আছে তাবৎ চিৎকার
যারা শুয়ে আছে, তারা চেয়েছিল হেঁটে যেতে
ক্ষেতের আল ধরে, পাতার বাঁশি বাজাতে,
কিছুক্ষণ অবাধে সাঁতরাতে স্নিন্ধ জলে—
এ ছাড়া
সারাক্ষণ তাঁদের গোপন পকেটে থাকত
দেশপ্রেম—অদৃশ্য বুলেট…
আর এই সব অপরাধ নাকি
ক্ষমার একেবারেই অযোগ্য ছিল
শকুনেরা এই কথা এখনও বলাবলি করে

রাতুল রাহা >> আমরা আমাদের মুখ চিনে নিবো

অত্যন্ত বোন, কাঠখড় পুড়িয়ে আমি তোর দিকে আসছি রে বোকা
বিকল সূর্যের দিন—
রোদে পুড়ে আমার ফর্সা ত্বকে গাঢ় বাদাম গাছ গজিয়েছে, আমার
জানালা হয়েছে বহুদিন এই পৃথিবীতে বর্ণাতীত তোকে
না পাওয়া আমাকে পেয়েছে, দশদিক থেকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে
আর আমি পারছি না পারছি না বলে;
এই বিন্যস্ত ঘোর জটিলতায়, হাতড়াচ্ছি বাড়িঘর আর অনভ্যাসে
বিদ্যানাশ হচ্ছে আমার। প্রাণপণে আমি আসছি তোর দিকে
চিরহরিৎ বৃক্ষের দেশে, তুই থাকিস, আমি ততোধিক বয়োজ্যেষ্ঠ
তোর, ঘোর বিপাকের দিনে এসে পৌঁছালে আমার
বোন তুই আমার দিকে তাকালে আমরা আমাদের মুখ চিনে নিবো

হামীম ফারুক >> অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট

ভারী বুটজুতোর ফিতেয় আটকে যাওয়া

এক টুকরো কমলালেবুর খোসা
ধোঁয়ার ভেতরে প্রাণপণে খোঁজে
উড়ে যাওয়া নির্বিকার ব্যাজ

লাশের কাছে পড়ে থাকা মাউথঅর্গান

তুলে নিয়ে কেউ, দূরে কাঁটাতারে
গেঁথে যাওয়া রুমালে অশ্রু ছড়ায়

বৃষ্টি ও বারুদে জেগে উঠেছে হেলমেট-
তাঁবুর জানালা আজ খোলা থাকবে সারারাত

কবির কল্লোল >> ইনসমোনিয়া

রাস্তা ধ’রে সোজা সামনের চত্বর পর্যন্ত চ’লে যান। দেখবেন—দুটো ভিন্ন রাস্তা দু’দিকে চ’লে গেছে; সোজা। কিছুক্ষণ ভাবুন, তারপর যেকোনো একটা বেছে নিয়ে হাঁটতে থাকুন। সোজা এগোতে থাকবেন সামনের চত্বর পর্যন্ত। দেখবেন—দুটো ভিন্ন রাস্তা দুদিকে চ’লে গেছে; সোজা। ভাবুন, যদিও ভাববার সময় খুব কম। তারপর যেকোনো একটা বেছে নিয়ে হাঁটতে থাকুন। সকল সোজা রাস্তাই অন্য রাস্তার বেঁকে যাওয়ার কারণ। একটা চত্বর চোখে পড়বে। সেখানেও একাধিক রাস্তা—যার যার মতো সোজা চ’লে গেছে সামনের দিকে। দ্রুত বাছাই করুন। আপনার সামনে পেছনে আরও আরও অনেককেই হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ পাশ কাটিয়ে চ’লে যাচ্ছে আপনার পেছন দিকে। তারা কি পিছিয়ে যাচ্ছে? এক কাজ করুন, আপনিই ওদের কারো মাথার ভেতরে ঢুকে পড়ুন। সে এখন আপনাকে নিয়ে হাঁটছে। কী বুঝলেন? লোকটা আসলে সোজা সামনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে পূর্বের চত্বর পর্যন্ত পৌছানোর পর লোকটা অন্য একটা রাস্তা বেছে নিলো, একটু আগেই আপনি যেটাকে অগ্রাহ্য করেছেন। লোকটা হাঁটছে। সোজা সামনের দিকে। আপনি তার মাথা থেকে নেমে পড়ুন। আপনিও হাঁটুন। রাস্তা ধ’রে সোজা সামনের চত্বর পর্যন্ত চ’লে যান। দেখবেন—দুটো ভিন্ন রাস্তা দুদিকে চ’লে গেছে; সোজা। কী হলো? রাস্তা পাচ্ছেন না? দুঃখিত, আপনি আসলে অসংখ্য আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরোতে পেরোতে যেখানে এসে পৌছেছেন সেখান থেকে ফিরে যাবারও কোনো রাস্তা নেই। বিশ্বাস হচ্ছে না? পেছনে তাকান। পেছন ব’লে আসলে কিছুর অস্ত্বিত্বই নেই। আপনি এখনো সামনেই তাকিয়ে আছেন। কী দেখলেন? হ্যাঁ, আপনি মারা যাচ্ছেন। বিশ্বাস হচ্ছে না তো? প্রথম প্রথম আমারও বিশ্বাস হয়নি। অপেক্ষা করুন, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার ঘুম না ভাঙে। আমিও প্রথম যার স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে পড়েছিলাম সে ছিল এক ইনসমোনিয়াক। এখন আছি এক ঘুমকাতুরে শিশুর স্বপ্নের ভেতর। এখানে আমিই কিছুটা ইনসমোনিয়াক। আসলে শিশুটাকে নিয়ে খুব চিন্তায় থাকি। আমাকে ক্ষমা করবেন, আমি এখন জেগে উঠবো। আপনি বরং অন্য কারো স্বপ্নের জন্য এখানেই অপেক্ষা করুন।

রনক জামান >> নদী

স্রোতভর্তি নদী। স্রোত—
নদীকে নিয়ে যাচ্ছে দূরে দক্ষিণে…
আমি দ্বিতীয় পা ডোবালাম।
ততক্ষণে অন্য নদী।