অংশুমান কর | মনে মনে | হাঁটুজল ছোটনদী | নিয়মিত গদ্য

0
365

আমার কেন জানি না মনে হয় যে, এই মনে মনে ভ্রমণ করার ক্ষেত্রে কবিরা বোধহয় অন্য ভাষা-শিল্পীদের চেয়ে একটু বেশিই স্বাধীন। তাঁদের কল্পনা একটু বেশি দূর পর্যন্ত যেতে পারে।

মন মানুষ কি দেখেছেন কখনও যিনি জীবনে কোনওদিন বেড়াতে যাননি? মানে যাঁর জীবনে সেই অর্থে ভ্রমণই নেই! আমি জানি যে, কাকে বলা হবে ভ্রমণ সেই বিষয়টি নিয়ে এখন তাত্ত্বিকদের মধ্যে বেশ তর্ক চলে। ভ্রমণ মানেই কি যাওয়া দূরদেশে? নাকি বাড়ির পাশের রাস্তাটি ধরে যদি আপনি চলে যান একটু দূরের পুকুর পাড়টিতে সেটিকেও বলা হবে ভ্রমণ? এসব নিয়ে তাত্ত্বিকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা চলতেই থাকে। সেই কবেই তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/একটি ধানের শিষের উপরে/একটি শিশিরবিন্দু।” আমি অবশ্য এখানে বেশ গোদা অর্থেই ‘ভ্রমণ’ শব্দটিকে ব্যবহার করছি। মানে, যেভাবে আমরা সাধারণত ভাবি আর কী! ছোটোবেলায় বেড়াতে যাওয়া মানেই ছিল হোল্ড-অলের ভেতরে একটা গোটা সংসারকে পুরে বেরিয়ে পড়া। এই ধরনের ভ্রমণ সারাজীবনে একবারও করেননি এমন লোককে কি কখনও দেখেছেন আপনারা? আমি দেখেছি। আমরা ছোটোবেলায় আমার বাবার উৎসাহে বেড়াতে গিয়েছিলাম সাকুল্যে দু’বার। প্রথমবার দেওঘর। তারপরের বার পুরী। সেই দু’বারই আমাদের পরিবারের প্রায় সকলে হোলড-অলে জিনিসপত্র বেঁধে বেরিয়ে পড়লেও আমার জেঠু যাননি। সত্যি বলতে কী, আমি আমার জীবনে দেখিইনি কখনও যে, আমার জেঠু বেড়াতে যাচ্ছেন। ছিলেন আমাদের গ্রামের হাইস্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক। ছোটোবেলায় যমের মত ভয় পেতাম ওঁকে। বড়ো হয়েও সেই ভয় যে পুরোটা কেটেছিল তা নয়। তবে কথা বলতে পারতাম ওঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে। যাকে ইংরেজিতে বলে ‘ডায়ালগ’ সেই ডায়ালগ সম্ভব হয়েছিল। তো, একবার আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তুমি যে বেড়াতে যাও না, তোমার ইচ্ছে করে না? একটা অদ্ভুত কথা বলেছিলেন জেঠু। বলেছিলেন টিভিতেই তো নানা জায়গা দেখি, আমার বেড়ানো হয়ে যায়। শুনে আমার আবারও মনে পড়েছিল সেই রবীন্দ্রনাথকেই, “কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা/মনে মনে!”

মনে মনে আমার জেঠুর মতো অনেকেই বেড়ান বটে। একে বলে মানসভ্রমণ। যুধিষ্ঠির তো যক্ষরূপী যমকে বলেইছিলেন যে, মন বাতাসের চেয়েও দ্রুতগামী। মন মানে এখানে কী? কল্পনা। তাই নয় কি? মানুষ তো কল্পনার ডানাতে ভর করেই উড়ে যায় দিকশূন্যপুরে। এই যে কল্পনা, এই কল্পনার ক্ষমতা সাধারণ মানুষদের চেয়ে কবি-লেখক-শিল্পীদের একটু বেশিই থাকে। কোলরিজ তো বলেই রেখেছেন যে, এঁদের কল্পনা এমন যে সেই কল্পনা ঘাড় ধরে বাঘ আর গরুকে একঘাটে জল খাওয়াতে পারে। মিলিয়ে দিতে পারে উত্তর আর দক্ষিণমেরুকে। ধরা যাক বিভূতিভূষণের কথাই। আফ্রিকায় না-গিয়েও তো উনি লিখে ফেলেছিলেন “চাঁদের পাহাড়”। ইংরেজি ভাষার বাঙালি লেখক কুনাল বসু একবার আমাকে বলেছিলেন যে, বিভিন্ন ভোগৌলিক স্থান নিয়ে উনি যেসব আখ্যান লিখেছেন তার অধিকাংশ জায়গাতেই উনি কখনও যাননি। পড়াশোনা করেছেন জায়গাগুলি সম্পর্কে এবং সেই পড়াশুনোর ওপর নির্ভর করেই লিখে ফেলেছেন নিখুঁত বর্ণনা, খুঁটিনাটিসহ। এই কথাটি অনেকাংশে বিভূতিভূষণের “চাঁদের পাহাড়” সম্পর্কেও সত্য।

সৃষ্টির সময় একজন শিল্পী যে ইহলোকে থাকেন না–সেকথা আমি মানি। কিন্তু আমার কেন জানি না মনে হয় যে, কল্পনারও এক শীলিত চর্চা দরকার।

আমার কেন জানি না মনে হয় যে, এই মনে মনে ভ্রমণ করার ক্ষেত্রে কবিরা বোধহয় অন্য ভাষা-শিল্পীদের চেয়ে একটু বেশিই স্বাধীন। তাঁদের কল্পনা একটু বেশি দূর পর্যন্ত যেতে পারে। জানি, এই রকম একটা কথা বললেই অনেকেই তেড়ে আসবেন রে রে করে। বলবেন ম্যাজিক রিয়েলিজমের কথা। সাম্প্রতিক কালে বাংলা ভাষায় লেখা কুলদা রায়ের কিছু ছোটোগল্পের কথাও অনেকে বলতে পারেন। বলতে পারেন রবিশংকর বল বা স্বপ্নময় চক্রবর্তীর লেখা বেশ কিছু ছোটোগল্পের কথা। এঁদের নাম মাথায় রেখেও আমি বিনীতভাবে একটি কথা বলতে চাই। মার্কেস যা-দেখেন বোদল্যের তার চেয়ে একটু বেশিই দেখেন না কি? কল্পনার ঘরবাড়িতে কবিরা একটু বেশিই হাত-পা ছড়িয়ে থাকেন। এইসব লিখতে লিখতেই মনে পড়ে গেল বছর কয়েক আগে পড়া সমর রায়চৌধুরীর একটি কবিতার কথা। কবিতাটির নাম ‘ভোলামন’। সমর রায়চৌধুরী লিখছেন :

আমার কিছু করার নেই, মন চায়; আর
ভোলামন চাইলে যখন তখন আমি বিয়ে করে ফেলি
বিয়ে করে ফেলি–অথচ কেউ না, আমার স্ত্রীও না
এমনকি যাকে বিয়ে করি সেও টের পায় না যে –
সে তার অজান্তেই আমার বিবাহিত হয়ে গেছে

সেবার কি হয় ঘাটশিলায় গিয়ে
সুবর্ণরেখা নদীতে অর্ধেক ডুবে থাকা একটা পাথরকে
আমি বিয়ে করে আসি

এরপর হঠাৎ একদিন দারজিলিংয়ের মাথার ওপর ফুরুৎ করে
উড়ে যাওয়া একটা নীল পাখি আমি বিয়ে করে ফেলি
বিয়ে করে বসি একদিন পাপড়খেতির পরিব্যাপ্ত কুয়াশাকে

ভোলামন যে কতকিছুই করতে পারে এই কবিতাটি তার প্রমাণ। কল্পনা যে কী অসম্ভব সব কাণ্ড-কারখানা ঘটাতে পারে তার অজস্র উদাহরণ বাংলা কবিতা থেকে তুলে তুলে দেওয়া যায়। আমি জয় গোস্বামীর একটি বহু-আলোচিত কবিতার কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি পাঠকদের জন্য :

প্রেমিক

তুমি আমকে মেঘ-ডাকবার যে-বইটা দিয়েছিলে একদিন
আজ খুলতেই দেখি তার মধ্যে এক কোমর জল।
পরের পাতায় গিয়ে সে এক নদীর অংশ হয়ে দূরে বেঁকে
গেছে।
আমাকে তুমি উদ্ভিদ-ভরা যে-বইটা দিয়েছিলে
আজ সেখানে এক পা-ও এগোনো যাচ্ছে না, এত জঙ্গল।
গাছগুলো এত বড়ো হয়েছে যে মাটিতে আলো আসতে
দিচ্ছে না।
তুমি আমাকে ঝর্ণা শেখবার যে-বইটা দিয়েছিলে
আজ সেখানে মস্ত এক জলপ্রপাত লাফিয়ে পড়ছে
সারাদিন।
এমনকি তোমার দেওয়া পেজ্‌-মার্কের সাদা পালকটাও
যে-বইতে রেখেছিলাম, সেখানে আজ
কত সব পাখি উড়ছে, বসছে, সাঁতার কাটছে।
মিষ্টি এই প্রেমের কবিতাটিও তো সেই ভোলামনেরই কারসাজি!

 

একটি কথা এইবার একটু সাহস করে বলতে ইচ্ছে করছে। অনেকেই মনে করেন যে, কল্পনা হল নিয়তি/ঈশ্বর-প্রদত্ত এক ক্ষমতা। সৃষ্টির সময় একজন শিল্পী যে ইহলোকে থাকেন না–সেকথা আমি মানি। কিন্তু আমার কেন জানি না মনে হয় যে, কল্পনারও এক শীলিত চর্চা দরকার। তরবারির মতো কল্পনাও অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকলে তাতে মরচে পড়ে। আবারও জয় গোস্বামীরই একটি কবিতার কথা মনে পড়ছে। “ওঃ স্বপ্ন!” কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত এই তিন লাইনের কবিতাটির নাম ‘কিংবদন্তী’। জয় লিখেছেন :

ওঃ স্বপ্ন! তুমি তাহলে সেই বোবা জন্তু–যার
মাথায় ঢুঁসো মারলে আগুন বেরোয়, আর
পায়ে কুড়ল মারলে ঝর্ণা…

জয় গোস্বামী

‘স্বপ্ন’ শব্দটির জায়গায় ‘কল্পনা’ শব্দটি বসিয়ে পড়লেই আমি যা বলতে চাইছি সেই কথাটির অর্থ বোঝা যাবে। কল্পনা তখনই কবিকে আগুন আর ঝরনা উপহার দেয় যখন সেই কল্পনাকে ‘ঢুঁসো’ মারেন কবি। কল্পনার জ্যোর্তিবলয় একজন কি দু’জন ভাগ্যবানের মাথার চারপাশেই জন্মগতভাবে থাকে। বাকিদের তা অর্জন করতে হয়।

 

Share Now শেয়ার করুন