অমর্ত্য সেন > এ কেবল যুদ্ধ নয়, করণীয় আরও কিছু >> ইলিয়াছ কামাল রিসাত অনূদিত

0
1217

এ কেবল যুদ্ধ নয়, করণীয় আরও কিছু

মহামারির সময়ে সমাজের মধ্যে একে ঘিরে যেসব বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয় আর স্বাধীন গণমাধ্যমে যা বলা হয়, তার ভিত্তিতে সরকারের মহামারি প্রতিরোধ-নীতি গ্রহণ করা উচিত। বিশেষভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দুঃখ-দুর্দশা থেকে দূরে রাখার নীতিমালা গ্রহণ করা জরুরি।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র ও উন্নয়নশীল বিশ্বের সর্বপ্রাচীন গণতন্ত্রের অধিকারী ভারত। এটা আমাদের গর্বের বিষয়। প্রত্যককে তার মতামত প্রদানের সুযোগের পাশাপাশি গণতন্ত্র আমাদের আরো নানা ধরনের ব্যবহারিক সুবিধা দিয়ে থাকে। আমরা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছি কি-না, তা এই বিপর্যয়ের মুহূর্তে সবচেয়ে ভাল বোঝা যাবে, যখন এর দরকার সবচেয়ে বেশি। একটু ইতিহাসের দিকে আলোকপাত করা যাক। ব্রিটিশরাজের সমাপ্তির পর নতুন প্রচলিত ভারতীয় গণতন্ত্র বেশ দ্রুতই তার সরাসরি সুফল ভোগ করতে শুরু করেছিল। তৎকালীন কর্তৃত্বপরায়ণ ব্রিটিশ শাসনামলে যে দুর্ভিক্ষ হয়ে উঠেছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, তা গণতান্ত্রিক ভারত প্রতিষ্ঠার পর একেবারেই থেমে যায়। সর্বশেষ, ১৯৪৩ সালে বাংলায় যে-সময় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সে-সময় আমি শিশু ছিলাম এবং সেই দুর্ভিক্ষই ঔপনিবেশিক শাসনের ইতি টেনে দেয়। এরপর থেকে ভারতে আর কোনো দুর্ভিক্ষের ঘটনা ঘটেনি, স্বাধীনতার শুরুর দিকের দশকগুলোতে দুর্ভিক্ষ হবার আশঙ্কা দেখা দিলেও, শক্তভাবে তা পরাস্ত করা গেছে।
কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছিল? গণতান্ত্রিকব্যবস্থা যে-কোনো সরকারকে কার্যকর প্রণোদনা দিয়ে থাকে কঠোর হাতে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করার। নির্বাচন ও গণআলোচনার কারণে সরকারকে জনগণের প্রয়োজনের নিরিখে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হয়। তবে, নির্বাচন ব্যবস্থা এককভাবে এই কাজের জন্য যথেষ্ঠ নয়। সম্ভবও করে তুলতে পারে না। গণতন্ত্র মানেই শুধু অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা, তা নয়। আসলে নির্বাচন একধরনের অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা, যে-অবস্থায় পূর্বের চেয়ে পরের অবস্থায় বিশাল ব্যবধান লক্ষ্ করা যায়। নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটেই অবস্থার এই পরিবর্তন ঘটে যায়। উদাহরণ স্বরূপ, ১৯৮২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ফকল্যান্ড যুদ্ধের আগে ভোট-জরিপে বেশ পিছিয়ে ছিলেন, কিন্তু যুদ্ধের ঠিক পরে এই চিত্রটা পালটে যায় (ক্ষমতাসীন সরকার এই সুবিধাটা পেয়ে থাকে)। ফলে, ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে তিনি বেশ ভালভাবেই জয়লাভ করেন।
পার্লামেন্টারি সরকার ব্যবস্থায় সাধারণ নির্বাচন বলতে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করাকে বোঝায়। ভোটিং সিস্টেমে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ কিংবা অধিকার নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিয়মনীতি গ্রহণ করা হয় না। এমতাবস্থায়, জনগণ যদি তাদের নিজেদের স্বার্থের জায়গা থেকে সকলে ভোটে অংশগ্রহণ করে, তবে সেই নির্বাচন দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষদের রক্ষা পারে না। বাস্তবে দেখা যায়, সংখ্যালঘু গোষ্ঠী দুর্ভিক্ষের কারণে উপোস থাকে। এসব সত্ত্বেও স্বাধীন গণমাধ্যম এবং জনগণের উন্মুক্ত আলাপ-আলোচনার মধ্য দিযে অতি-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্ভিক্ষপীড়িত দুর্দশার খবর জনসমক্ষে চলে আসে। এর প্রভাবে বেশিরভাগ সরকার জনবিরোধী নীতিগ্রহণ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারে। অন্য দিকে সরকার নিজেও জনগণ আর পার্টির মানবিক সহানুভূতি এবং বোঝাপড়ার জায়গা থেকে তথ্য পেয়ে বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত হতে পারে। সমাজের মধ্যে এইসময় যেসব আলোচনা চলতে থাকে, তা থেকেও সরকার প্রকৃত বাস্তব চিত্র সম্পর্কে অবগত হতে পারে।
দুর্ভিক্ষ বা মহামারির সময় জনগণের ক্ষুদ্র একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সমাজের মধ্যে যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়, সাধারণ মানুষের সেইসব মতামত আর মুক্ত গণমাধ্যমের অবাধ তথ্য-পরিবেশনার কারণে জনগণের বিরাট একটি অংশ প্রকৃত বাস্তবতা কী, সে সম্পর্কে অবগত হতে পারে। ফলে, তারা তখন সরকারের কী করণীয়, সে-ব্যাপারে সরকারকেও সক্রিয় করে তুলতে পারে। সরকার যথেষ্ট মানবিক হলে তার মধ্যে সহানুভূতি জাগিয়ে আর উদাসীন হলে বিরূপ সমালোচনা করে সেই সরকারের আসলে কী করণীয়, সে সম্পর্কে তাদের সক্রিয় করা যেতে পারে। জন স্টুয়ার্ট মিলের গণতন্ত্রের ভাষায়, ‘আলোচনার মাধ্যমে সরকার’-এর ধারণা অনুযায়ী মুক্ত-গণমাধ্যম ও খোলামেলা আলোচনাই ঝুঁকির মুখে থাকা দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে।
সামাজিক মহামারি তাই শুধু যুদ্ধে অংশগ্রহণের মতো নয়, যেখানে যুদ্ধকৌশলের মতো একজন নেতা কোন শলামর্শ ছাড়াই সবাইকে আদেশ দেবেন আর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সবাই তা মেনে চলবেন। বরং মহামারি ঠেকাতে ঠিক তার উল্টোটাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজন অংশগ্রহণমূলক সরকার ব্যবস্থা। মহামারি নিয়ে জনগণের মধ্যে এইসময় আলাপ-আলোচনা জারি থাকাটাও জরুরি।
মহামারি বা দুর্ভিক্ষের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত জনগোষ্ঠী এবং সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত জনগণ রাষ্ট্রের সমৃদ্ধশালী অংশ থেকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে। কিন্তু জনগণ যেসব বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে, পরামর্শ দেয়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা তা থেকে নিজেদের কী করা উচিত, সে সম্পর্কে অবগত হতে পারেন। নেপোলিয়ন শোনার চেয়ে নির্দেশ প্রদানে বেশি দক্ষ ছিলেন। এ-কারণে তার সামরিক সাফল্য ব্যাহত হয়নি (রাশিয়ার প্রসঙ্গ বাদে)। কিন্তু সামাজিক বিপর্যয় মোকাবেলা করতে গেলে ‘শোনা’টা আবশ্যিক। সবচেয়ে জরুরি।
এই জরুরি বিষয়টি মহামারির মতো সামাজিক বিপর্যয় রোধের জন্যও দরকার। ধনী বা সম্পদশালীরা এসময় শুধু রোগের সংক্রমণ রোধ করা গেল কিনা, তাই নিয়ে চিন্তিত থাকেন। কিন্তু যারা গরিব, সমাজের প্রান্তিক মানুষ, তাদেরকে ভাবতে হয় প্রতিদিনের আয়-উপার্জন নিয়ে (রোগের কারণে অথবা লকডাউনের মতো রোগনিরোধী নীতির কারণে তাদের উপার্জন ব্যহত হয়)। অভিবাসী শ্রমিক – যারা বাড়ি ছেড়ে দূরে কাজ করেন, তাদের ভাবতে হয় বাড়ি ফিরে যাবার ব্যবস্থা নিয়ে।
অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাধীন গণমাধ্যম আর সামাজিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাজে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠী বা মানুষদের দুঃখ-দুর্দশা-দুর্ভোগ নিয়ে আলাপ-আলোচনা চালু রাখতে হবে। সরকার এসব আলোচনা শুনে, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মতামত আর শলামর্শের ভিত্তিতে তাদের কী করণীয়, সেইসব নীতি প্রণয়ন করতে পারবে।
করোনা ভাইরাসের কারণে উদ্ভূত মহামারিজনিত পরিস্থিতিতে ভারত সরকার রোগ-সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য সচেতনভাবেই এগুচ্ছে। প্রতিকার হিসেবে ‘সামাজিক দূরত্ব’র মতো নীতিগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ, ভারতের জন্য এই নীতি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এককভাবে রোগ-সংক্রমণ ঠেকানোর নীতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অন্য কোনো নীতি-গ্রহণের সাথে তাহলে এর কোনো পার্থক্য থাকবে না। যেমন এই লকডাউনের ফলে লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষের জীবনে নেমে আসবে ধ্বংস ও বিপর্যয়। তাদের দুঃখ-দুর্দশা কীভাবে রোধ করা যাবে, গৃহীত নীতিমালায় সুরক্ষার এই দিকটি নিশ্চিতভাবেই থাকতে হবে।
গরিব জনগণের মূল চিন্তা হলো তাদের আয়-উপার্জন নিয়ে। নীতি-নির্ধারণের তাই অনস্বীকার্য একটা দিক হলো, এসব বিপর্যস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এরকম পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের সাথে অপর্যাপ্ত আয় ও খাবার কেনার সম্পর্ক আছে।
হঠাৎ গৃহীত লকাডাউনের কারণে লাখ লাখ শ্রমিকের দৈনিক উপার্জন বাধাগ্রস্ত হয় এবং তখন কিছুটা হলেও অনাহারের সম্ভাবনা থেকে যায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো পাঁড় মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো রাষ্ট্রও গরিব ও বেকার জনগোষ্ঠীর জন্যে কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তুকির ব্যবস্থা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক সুরক্ষার এই নীতিটি গ্রহণের পথ তৈরি হয়েছে মূলত জনগণের মধ্যেকার আলোচনার মাধ্যমে। সেখানে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে।
ভারতে গরিব জনগোষ্ঠীকে তাদের বঞ্চনা ও দুর্দশা থেকে রক্ষা করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কর্ম-কৌশলকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি ফান্ডের ব্যবস্থা করা কঠিন ব্যাপার নয় (এর জন্য কেন্দ্রীয় বাজেটে ক্ষুদ্র একটা অংশ ব্যয় হবে)। অন্যান্য যেমন – জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে আহারের ব্যবস্থা করা এবং ভারতের ফুড কর্পোরেশনের অব্যবহৃত ৬০০ লক্ষ টনের মতো ধান ও গম উত্তোলনের মতো ব্যবস্থাও নেয়া যেতে পারে। বিতাড়িত সকল অভিবাসী শ্রমিককে ঘরে ফিরিয়ে নেয়া, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, তাদের রোগনির্ণয় ও স্বাস্থ্যসেবার দিকে নজর দেয়া, ইত্যাদি অনেক চ্যালেঞ্জিং ইস্যু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে। সরকারের উচিত কোন শলাপরামর্শ ছাড়া কঠিন কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে এ সকল ইস্যুর ব্যাপারে সতর্কভাবে সবার কথা শোনা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সামাজিক বিপর্যয় ঠেকাতে হলে সরকারের মূল কাজ হবে সমস্যাগুলো কী তা শুনতে হবে, কীভাবে তা কোন শ্রেণির মানুষকে কতটা আক্রান্ত করছে, ক্ষতিগ্রস্ত করছে, বুঝতে হবে। এ জন্যে গণমাধ্যমের মুখে কুলুপ না এঁটে এবং সমালোচকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে জনগণের মধ্যেকার আলোচনার দ্বারা সরকার দারুণভাবে উপকৃত হতে পারে।
মহামারির সাথে লড়াইটা আসলে যুদ্ধের মতো মনে হলেও তা নানাভাবে সরকারের আরো গভীরে প্রোথিত থাকে।

Share Now শেয়ার করুন