আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও মহাশ্বেতা দেবী >> জন্মদিন >> শ্রদ্ধাঞ্জলি

0
291

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও মহাশ্বেতা দেবী >> শ্রদ্ধাঞ্জলি

[সম্পাদকীয় নোট : সীমান্তের এপার-ওপারের দুই কথাসাহিত্যিক- মহাশ্বেতা দেবী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তবে দু-জনেরই জন্ম বাংলাদেশে। মহাশ্বেতা দেবীর ঢাকায় আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গাইবান্ধায়। বয়সের এই ব্যবধান সত্ত্বেও সৃষ্টিশীলতার সূত্রে পরস্পরের মধ্যে ছিল সুগভীর মমত্ব, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার সম্পর্ক। পরম্পরিত এই সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে দু-জনের দুটি রচনা এখানে প্রকাশ করা হলো। বলা বাহুল্য, ১৪ জানুয়ারি ছিল মহাশ্বেতার জন্মদিন আর ১২ ফেব্রুয়ারি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের। তীরন্দাজের পক্ষ থেকে এই দুই কথাসাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছি।]

চিঠি
মহাশ্বেতা দেবীকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

“আপনি এখন কী লিখছেন? এখানে আপনার অনুরাগী পাঠক অনেক, তাদের মধ্যে আমিও একজন। আপনার কি ঢাকায় আসতে ইচ্ছা করে না? একবার আসুন, দেখবেন খুব ভালো লাগবে।”

১ আগস্ট ১৯৯৬

প্রিয় মহাশ্বেতাদি, আপনার পঞ্চাশটি গল্পের সংকলন ঊর্মি ও সাগর আমাকে দিয়ে গেছেন যথাসময়ে। আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সঙ্গে আমার চিঠি লেখা উচিত ছিল কিন্ত বাদ সাধল বইটিতে আপনার স্বাক্ষরিত পৃষ্ঠায় আমার ‘চিলেকোঠার সেপাই সম্বন্ধে আপনার মন্তব্য। ওটা পড়ে আমি দারুণ উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ি, উচ্ছ্বাসের সঙ্গে থাকে প্রবল উত্তেজনা। অতো উত্তেজনা নিয়ে কিছু লেখা মুশকিল। দিন যায়, উত্তেজনা আস্তে আস্তে থিতিয়ে পড়ে। আপনার মন্তব্য তখন হয়ে ওঠে প্রেরণা। প্রায় ছয় মাস পর আমার বহুকালের প্ল্যান করা উপন্যাসটি লিখতে শুরু করি। এই প্রেরণার জন্যে আপনি আমার সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানবেন।
এই উপন্যাসের লোকজন যেখানে বাস করে ওই জায়গাটি আপনার চেনা, ‘এককড়ির সাধ’-এর নায়কের বাড়িও সেখানেই। মহাস্থান আমার বাড়ি থেকে মাত্র ছয় মাইল। ছেলেবেলা থেকেই প্রাচীন পুণ্ড্রনগরীর বিশাল ধ্বংসাবশেষের প্রায় সবটাই আমি চষে বেড়াচ্ছি, বেশির ভাগ সময় একা, মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে। বগুড়া শহরের উত্তরে সুবিল বলে একটা জায়গা আছে, পুণ্ড্রনগরীর শুরু বলতে গেলে সেখান থেকেই। তারপর গোকুল, সেখানে বিশাল একটা বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসস্তূপ, গোকুল পেরিয়ে মহাস্থান। ওখানে এখন একটা মিউজিয়াম, মিউজিয়ামের সামনে দিয়ে আরো মাইল ছয়েক গেলে শিবগঞ্জ, সেটাও কিন্তু প্রাচীন পুণ্ড্রনগরীর অংশ। আপনার এককড়ি করতোয়ার জলে মহাস্থানের ভাঙাচোরা প্রাসাদের লাল ইটের ছায়া দেখেছিল, মনে আছে? আমার উপন্যাসের লোকজন বাস করে সেই করতোয়ার তীরে। তবে ওই লাল ছায়া কতবার যে কায়া পেয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সেই দিব্যোক আর ভীমের কৈবর্ত বিদ্রোহের আমল থেকে মজনু শাহের ফকির বিদ্রোহ এবং শেষ পর্য়ন্ত ১৯৭১-এর সআধীনতা যুদ্ধে অজস্র মানুষের রক্তে করতোয়া ভেসে গেছে মানুষের রক্তে। এমন কি, শুনেছি যে, বৌদ্ধদের অহিংসা ধর্ম প্রচারের সসময় এখানে কয়েক হাজার জৈন সন্ন্যাসীকে হত্যা করা হয়েছে।
ওইসব জায়গায় অনেক ঘুরেছি। দেখেছি, কি করে একটা গল্প পরিণত হয় মিথে। এই গল্পটা একটু বলি? – গোকুলের বৌদ্ধ বিহারের বিশাল ধ্বংসাবশেষকে ওখানকার মানুষ মনে করে বেহুলার শ্বশুরবাড়ি, লখীন্দরকে সাপে কাটে ওখানেই। এটা একেবারেই গল্প। কিন্তু এই গল্পের সঙ্গে খাপ খাওয়াবার জন্যে ওখানে একটি হাটের নাম চাঁদ সওদাগরের হাট। আবার বিলের নাম কালিদহ সাগর, সেখানে নাকি অনেক সাপের বসবাস, আবার একটি টিলা, সেটা খুঁড়লে প্রাচীনকালের কিছু না কিছু পাওয়া যাবেই। ওই টিলাকে বলা হয় ধন্বন্তরির বাড়ি এবং পাশের একটি ভাঙাচোরা বাড়ি হয়ে গেছে ধন্বন্তরির ওষুধের কারখানা। গোটা এলাকার মানুষ এখন পর্য়ন্ত সাপ তাড়াবার জন্যে ধন্বন্তরির ভিটে থেকে মাটি নিয়ে ছড়িয়ে দেয় নিজেদের বাড়ির চারপাশে।
আমি অবশ্য থাকতে চাই ১৯৭১-এর যুদ্ধের মধ্যে। কিন্তু তা হলে কি জায়গাটিকে ইজ্জত করা হবে? তাই বড়ো বিপদে পড়েছি। উপন্যাস লেখার আগে আমি মেলা নোটটোট নিই, স্কিমও একটা করে ফেলি। কিন্তু একবার লিখতে শুরু করলে সব ওলটপালট হয়ে যায়, চরিত্ররা বাহাদুর হয়ে ওঠে, আমার শাসন মানতে চায় না। আর একটা মুশকিল হয়েছে। লেখার সময়, মানে লিখতে লিখতে ওই জায়গাটায় আমাকে বার বার যেতে হবে। আরো মানুষের মুখের গল্প শুনতে হবে। কিন্তু এই মার্চে ক্যানসারের উৎপাত থেকে রেহাই দিতে ডাক্তাররা আমার ডান পায়ের গোটাটাই কেটে ফেলেছেন। এখন ক্রাচে ভর করে হাঁটি। কিন্তু এভাবে কি ওখানকার উঁচু নিচু জায়গাগুলো পেরুতে পারব? বলতে কি, ওখানে যাবার জন্যেই আমি প্রাণপনে ক্রাচে হাঁটা রপ্ত করার চেষ্টা করছি। মাস দুয়েক পর বগুড়া যাবো, তখন মহাস্থানে গিয়ে দেখব কতটা হাঁটা যায়।
এবার কলকাতা গিয়ে পুরো তিন মাস ছিলাম। সবটা সময় কেটেছে শুয়ে শুয়ে, কখনো পার্ক সার্কাসে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে, কখনো কোনো নার্সিং হোমে। তবে কলকাতার পুরনো ও নতুন বন্ধুরা প্রত্যেকদিন আমার কাছে আসতেন। খুব আড্ডা দিয়েছি, প্রাণ খুলে কথা বলেছি। কিন্তু কোথাও যাওয়া হয়নি।
আপনি এখন কী লিখছেন? এখানে আপনার অনুরাগী পাঠক অনেক, তাদের মধ্যে আমিও একজন। আপনার কি ঢাকায় আসতে ইচ্ছা করে না? একবার আসুন, দেখবেন খুব ভালো লাগবে। আশা করি ভালো আছেন। সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানবেন।

ইতি
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

উৎসর্গ
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে মহাশ্বেতা দেবী

“…আমি যাকে চিনি সে লেখক আখতারুজ্জামান এবং আমি বিশ্বাস করি, কি পশ্চিম বাংলা কি বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস লেখক। আমার চেয়ে অনেক বড় লেখক।”

১৯৯৬ জ্ঞানপীঠ পুরস্কার দেবার কথা জানিয়ে শ্রী দীনেশ মিশ্র এটাও জানালেন যে, এই সঙ্গে তাঁরা আমার একটি পাণ্ডুলিপি হিন্দীতে অনুবাদ করে পুস্তাকাকারে ছাপতে চান। ‘মাস্টার সাব’ ১৯৭৯ সালে শারদীয় ‘প্রমা’ কাগজে বেরোয়। বইটির ওপর আরো কাজ করার ইচ্ছা ছিল। সম্ভব হয়নি। শ্রী দীনেশ যখন লিখলেন, তখন মনঃস্থির করতে দেরি হয়নি। কেননা ‘মাস্টার সাব’ বইটি দিতে মনে যেটুকু বাধা ছিল, তা সরিয়ে দিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।
৪ জানুয়ারী ৯৭ তিনি মারা গেলেন ৫৩ বছর বয়সে। এই বই নিয়ে আমাদের অনেক কথা হয়েছে। কথাবার্তায় লেখা পড়ে মনে হয়েছে, আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তিও এক। অবশ্যই আমি যাকে চিনি সে লেখক আখতারুজ্জামান এবং আমি বিশ্বাস করি, কি পশ্চিম বাংলা কি বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস লেখক। আমার চেয়ে অনেক বড় লেখক। এ কথা আমি বারবার ‘বাংলাদেশ’ বিষয়ক চারটি লেখায় লিখেছি, যা ‘আজকাল’ কাগজে বেরোয়।
‘মাস্টার সাব’ প্রকৃত অর্থেই জীবনী-উপন্যাস। ৭০ দশকের আন্দোলন বিষয়ে আমার সমর্থন আমি কখনও অস্বীকার করিনি। বিহারে আরা জেলা ১৯৫৭-৫৮ সালের বীর কুনোয়ার সিংহের জেলা। ৭০-এর দশকে জগদীশ মাস্টার, ধনী মালিকদের দ্বারা হরিজন মেয়েদের যথেচ্ছ ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। ‘হরিজনিস্তান’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। আরা শহরে এক মশাল মিছিল বের করেন। যাতে নারা ছিল ‘হরিজনিস্তান লে লিয়া করেঙ্গ।’ এটাও ছিল কায়েমী ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ জানানো। আর এখানেই মাস্টার সাব ৭০-এর দশকে থেমে থাকলে পারেন না। তাঁর চেতনা তাঁকে নিয়ে যায় কৃষি-বিহারের নকশাল আন্দোলনে। মাস্টার সাব, রাথর আহীর, এসব নাম আজ ইতিহাস।
ইতিহাসকে তো আমি গণবৃত্তেই দাঁড়িয়েই দেখি। রাজবৃত্তের ইতিহাস লেখেন ঐতিহাসিক। আমি খুঁজি নাম নেই, ঠিকানা নেই সেইসব মানুষকে। যারা শোষণ সহ্য করতে করতে একদিন বিদ্রোহ করে। হয়তো জেতে না, মরেও যায়। তাদের সমাধি বা শ্মশানে কোন স্তম্ভ বা ফলক থাকে না। তবু ভারতের ইতিহাসে বারবার দেখি, কোন পরাজয়, জয়ের চেয়ে অনেক মহান হয়ে ওঠে। সে ১১ শতকে বাংলার কৈবর্তবিদ্রোহ হোক, বা ১৮৫৭-৫৮-এর মহাবিদ্রোহ, ১৮ শতাব্দী ও ১৯ শতাব্দীর সাঁওতাল-মুণ্ডা কৃষক বিদ্রোহ হোক, বা এই শতকে ভারতীয় নৌ-বিদ্রোহ।
মাস্টার সাবের কাহিনীই আখতারুজ্জামানকে উৎসর্গ করা যেত। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ যে ঘটে, তার পিছনে ঢাকা শহরে ও সুদূর গ্রামে গরিবরা কী ভূমিকা পালন করে, তাই নিয়েই তিনি লেখেন ‘চিলেকোঠার সেপাই’। এ এক নতুন বাংলা ভাষা, শহরের ধুলো-কাদা-মবিল-আবর্জনা হঠাৎ ধনীর বর্বর অসভ্যতা আস্তাকুঁড়ের মানুষদের বারুদ হয়ে ওঠার ভাষা। শহরের নিচুতলার সমাজের মানুষের বাংলা ভাষা এমন ইজ্জত পায়নি সাহিত্যে। যেমনে দেখার চোখ, তেমনি স্বচ্ছ ও কঠিন রাজনীতিক বিশ্বাস, তেমনি ধারালো হিউমার।
উপন্যাস তো দুটি, ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’। কলম যাঁর অস্ত্র, সেই যোদ্ধার লেখা বটে। তিনি আমার মতোই জানতেন, লড়াই কখনো ফুরোয় না। লেখককে লড়তেই হয়, রাষ্ট্র ও সমাজের ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে, মৌলবাদের বিরুদ্ধে, মস্তিষ্ককে বিকিয়ে দেবার বিরুদ্ধে। লেখককে জেগে থাকতে হয়, তার কাজ অন্ধকার যেখানে, সেখানে আলো ফেলা, অবিবেচককে কষাঘাত করা।
নিজেও ছিলেন অক্লান্ত সৈনিক। ২০-১১-৯৬ ঢাকায় প্রথম দেখলাম। হাড়ে ক্যান্সার, ডান পা ঊরু থেকে কাটা। মৃত্যু সামনে, আখতার হো হো করে হাসছেন, ভারতের অন্য ভাষার লেখকদের পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত, আড্ডা দিচ্ছেন, গান শুনছেন, এমন একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব আর দেখিনি। যেন হাসপাতালে ক্যান্সার রোগী নয়। ৪-১-১৯৯৬ মারা গেল যুধ্যমান এক সৈনিক, যার অস্ত্র ছিল কলম।
আমাকে যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁরা তো আমার লেখার জন্যই ভালোবাসেন আর জানেন। আমি মানুষের জন্য সাধ্য মতো লড়াই করি। আপনারা বুঝবেন কেন এ বই আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে দিয়েছি। এ বই আর কাকে দেওয়া যেত? যোদ্ধা যোদ্ধাকেই শ্রদ্ধা করে। আর সাহিত্য সংস্কৃতি জ্ঞান এ সবের সামনে কোন সীমান্তের বাধাবন্ধ নেই। এ এক উন্মুক্ত প্রান্তর। আকাশে কি কোন সীমান্ত থাকে? সে তো উন্মুক্ত। আখতার আমাকে শিখিয়ে গেছেন, শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য কাজ করে যেতে হবে, আবার কলম থামানো চলবে না। এত বড় দায়িত্ব পালন করতে চাই, জীবন ও সময় যদি আমাকে সময় দেয়।

Share Now শেয়ার করুন