আবদুল্লাহ আল দুররানী >> ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ কি কানে ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছে? >> চলচ্চিত্র

0
437

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ নির্মিত চলচ্চিত্র ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ‘অ্যাঁ সার্তেঁ  রিগার্দ বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের প্রথম কোনো চলচ্চিত্র যা কানের অফিসিয়াল সিলেকশনে জায়গা করে নিয়েছে। প্রদর্শনের পর সিনেমাটি যেভাবে প্রসংশিত হয়েছে, পেয়েছে স্ট্যান্ডিং ওভেশন, তাতে মুভিটি শ্রেষ্ঠ ছবি বা শ্রেষ্ঠ পরিচালক বা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আমাদের প্রত্যাশাও এমনি। এটি যদি পুরস্কার পায় তাহলে তা আমাদের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ইতিহাস হয়ে থাকবে। সেই ইতিহাস কি সৃষ্টি করতে চলেছে সিনেমাটি?

উৎসব শুরু হলো যেভাবে

৬ই জুলাই শুরু হয়েছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর কান চলচ্চিত্র উৎসব ২০২১। এবছর কানে’র ৭৪তম আসরে সেজেছে দক্ষিণ ফ্রান্সের কান শহরের সমুদ্র উপকূলের পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবন। সারা বিশ্ব থেকে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা জড়ো হয়েছেন ফ্রান্সের এই শহরে৷ এবারের উৎসবে দুই পর্বে থাকছে ৪৪টি চলচ্চিত্র৷ উৎসব চলবে ১৭ই জুলাই পর্যন্ত।

পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনের সামনে বসানো হয়েছে এবাবের আসরের থিম পোস্টার। থিম পোস্টারে স্থান পেয়েছেন আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ পরিচালক স্পাইক লি’র প্রতিকৃতি। এই আসরে বিশেষ সম্মান জানানো হয়েছে তাঁকে। পোস্টারে চশমা পরা স্পাইক লি’র কৌতূহলী চাহনি, টুপিতে কানের লোগো, কয়েকটি পাম গাছ আ কিছু গাঙচিলের উড়ে যাওয়া দৃশ্য রয়েছে। এছাড়াও জমকালোভাবে সাজানো হয়েছে বাকি ভেন্যুগুলোও।

বিচারকমণ্ডলী

কান চলচ্চিত্র উৎসব ২০২১-এর জুরি বোর্ডে মার্কিন নির্মাতা স্পাইক লি সহ আরও নয় বিচারকের মধ্যে আছেন পাঁচজন নারী ও চারজন পুরুষ। নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীর পাশাপাশি এবার আছেন সংগীতশিল্পীও। এরা হলেন পরিচালক মাটি ডিওপ, জেসিকা হাউসনার এবং ক্লেবার মেন্ডোনিয়া ফিলোহো; অভিনেতা ম্যাগি গিলেনহাল, ম্যালানি লরেন্ট, সং কঙ্গ-হো এবং তাহার রহিম; এবং গায়ক-গীতিকার মেলান ফার্মার। সেরা চলচ্চিত্রটি বাছাই করতে তাঁদের দেখতে হবে ২৪টি চলচ্চিত্র। কান ইতিহাসের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় জুরি ৭৪তম আসরের জুরি, ব্রাজিল থেকে দক্ষিণ কোরিয়া পর্যন্ত সাতটি দেশের সদস্যদের সাথে মিলে মার্কিন নির্মাতা স্পাইক লি এবারের জুরির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

তিন বিভাগ

কান চলচ্চিত্র উৎসবকে ভাগ করা হয় তিন বিভাগে : ইন কম্পিটিশান, ‘অ্যা সারটেইন রিগার্ড এবং আউট অব কম্পিটিশান। সবগুলো বিভাগই আবার অফিসিয়াল সিলেকশনের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া রয়েছে কান প্রিমিয়ার, স্পেশাল স্ক্রিনিং, সিনে ফাউন্ডেশন, শর্টফিল্ম, কান ক্লাসিকস, সিনেমা ডি এল প্লাজ।

পাম দো’র জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা

বেশ কয়েকজন কানজয়ী পরিচালক এবারের আসরের পাম দ’র অর্থাৎ সর্বোচ্চ পুরস্কারের জন্য একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তাঁরা হলেন জ্যাক অডিয়ার্ড, ন্যানি মোরেটি এবং অ্যাপিচ্যাটপং।

বিচরকমণ্ডলী

এবার ইন কম্পিটিশান বিভাগে প্রায় আড়াই হাজার চলচ্চিত্র থেকে নির্বাচন করা হয়েছে ২৪টি চলচ্চিত্র। নির্বাচিত চলচ্চিত্রগুলো হলো : অ্যানেট (লিওস ক্যারেক্স, ফ্রান্স), দ্যা স্টোরি অফ মাই ওয়াইফ (ইল্ডিকো এনিয়েডি, হাঙ্গেরি), বেনেডেটা (পল ভাহোভেন, নেদারল্যান্ডস), বার্গম্যান আইল্যান্ড (মিয়া হানসেন লাভ, ফ্রান্স), ড্রাইভ মাই কার (রাইসুকে হামাগুচি, জাপান), হা’ বিচ (নাডাভ লাপিড, ইজরায়েল), কাসাব্লাঙ্কা বিটস (নাবিল ইচ, মরক্কো), কম্পার্মেন্ট নাম্বার সিক্স (জুহো কুওসমানেন, ফিনল্যান্ড), দ্যা ওয়ার্স্ট পার্সন ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড (ইয়েলোকিম ট্রেয়ে, নরওয়ে), লা ফ্র্যাকচার (ক্যাথারিন কর্সিনি, ফ্রান্স), দ্যা রেস্টলেস (ইয়েলোকিম লাফাস, বেলজিয়াম), প্যারিস থারটিন ডিস্ট্রিক্ট (জ্যাক অডিয়ার্ড, ফ্রান্স), লিঙ্গুই (মহামত সালেহ হারুন, শাদ), মেমোরিয়া (এপিচ্যাটপং উইরেসেটেকল, থাইল্যান্ড), নাইট্রেম (জাস্টিন কেজেল, অস্ট্রেলিয়া), ফ্রান্স (ব্রুনো ডিমন্ট, ফ্রান্স), পেট্রোভের ফ্লু (কিরিল সেরেব্রেনিকভ, রাশিয়া), রেড রকেট (শন বেকার, আমেরিকা), ফ্ল্যাগ ডে (শন পেন, আমিরকা), দ্যা ফ্রেন্স ডিসপাচ (ওয়েস অ্যান্ডারসন, আমিরকা), টাইটান (জুলিয়া ডিকোনাই, ফ্রান্স), ট্রে পিয়ানি (ন্যানি মোরেটি, ইতালি), ট্যুর সে বিয়ান পাসে (ফ্রঁসোয়াঁ ওজোঁ, ফ্রান্স), এ হিরো (আসগর ফরহাদি, ইরান)। এই ২৪টি চলচ্চিত্রের মধ্যে দুটি চলচ্চিত্র গত বছরের বাছাই থেকে নেয়া হয়েছে যা নির্বাচিত হয়েছিল তবে কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শিত হয়নি। এর প্রথমটি হলো ওয়েস অ্যান্ডারসনের ‘দ্যা ফ্রেন্স ডিসপাচ’। এই চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিল ফ্রান্সের একটি সংবাদপত্র অফিসকে কেন্দ্র করে। দ্বিতীয়টি হলো পল ভাহোভেনের ‘বেনেডেটা’, যা সতেরোশো শতকের সমকামী নানদের গল্প নিয়ে বানানো হয়েছে। এই চলচ্চিত্রগুলো পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনের গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে প্রদর্শিত হবে। আর এর মধ্য থেকেই একটি চলচ্চিত্র জিতে নেবে পাম দ’র বা স্বর্ণপাম।

আঁ সার্তেঁ  রিগার্দ : পুরস্কারের জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা

আঁ সার্তঁ বিভাগের বিচারকমণ্ডলী

কান চলচ্চিত্র উৎসব ২০২১-এর আঁ সার্তেইন রিগার্দ বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে মোট বিশটি চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রগুলো হলো মানিবয় (সিবি ওয়াই, অস্ট্রিয়া), ব্লু বায়ো (জাস্টিন চন, আমেরিকা), ফ্রেডা (গেসিকা জেনাস, হাইতি), হাউস অ্যারেস্ট (আলেক্সি জার্মান জুনিয়র, রাশিয়া), বোনে মেরে (হাফসিয়া হার্জি, ফ্রান্স), নোচে দে ফুয়েগো (তাতিয়ানা হুয়েজো, মেক্সিকো), ল্যাম্ব (ভালদিমার জোহানসন, আইসল্যান্ড), কমিপমেন্ট হাসান (হাসান সেমিহ কাপলনোগলু, তুরস্ক), আফটার ইয়াং (কোগোনাদা, আমেরিকা), লেট দেয়ার বি মরনিং (ইরান কলিরিন, ইজরায়েল), আনক্লানচিং দ্যা ফিস্ট (কীরা কোভালেনকো, রাশিয়া), উইমেন ডু ক্রাই (মিনা মাইলভা ও ভেসেলা কাজাকোভা, বুলগেরিয়া), রেহানা মরিয়ম নূর (আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, বাংলাদেশ), গ্রেট ফ্রিডম (সেবাস্তিয়ান মেইস, অস্ট্রিয়া), লা সিভিল (তেওডোরা আনা মিহাই, রুমানিয়া/ বেলজিয়াম), গায়ে ও’র (না জিয়াজুও, চীন), দ্যা ইনোসেন্টস (এস্কিল ভোগ, নরওয়ে), আন মোন্ডি (লরা ওয়ান্ডেল, বেলজিয়াম)। এই বিভাগে সাধারণত বিকল্পধারার চলচ্চিত্র বা বিভিন্ন দেশের দেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে চলচ্চিত্র ও তরুণ নির্মাতাদের প্রথম নির্মিত চলচ্চিত্র স্থান পেয়ে থাকে। চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শিত হয় প্যালে দে ফেস্তিভাল ভবনের সাল দুবুসি থিয়েটারে।

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ নির্মিত চলচ্চিত্র ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ‘অ্যাঁ সার্তেঁ  রিগার্দ বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের প্রথম কোনো চলচ্চিত্র যা কানের অফিসিয়াল সিলেকশনে জায়গা করে নিয়েছে। প্রদর্শনের পর সিনেমাটি যেভাবে প্রসংশিত হয়েছে, পেয়েছে স্ট্যান্ডিং ওভেশন, তাতে মুভিটি শ্রেষ্ঠ ছবি বা শ্রেষ্ঠ পরিচালক বা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আমাদের প্রত্যাশাও এমনি। এটি যদি পুরস্কার পায় তাহলে তা আমাদের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ইতিহাস হয়ে থাকবে। সেই ইতিহাস কি সৃষ্টি করতে চলেছে সিনেমাটি?

অন্যরকম চলচ্চিত্র

ডে সান ভিভান্ট (এমমানুয়েল বেরকোট, ফ্রান্স), ইমার্জেন্সি ডিক্লেয়ারেশন (হান জা-রিম, কোরিয়া), দ্যা ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ড (টড হেইনস, আমিরকা), ব্যাক নর্ড (সিড্রিকে মেনেজ, ফ্রান্স), দ্যা ভয়েস অফ লাভ (ভালরিলে মেরসিয়া, ফ্রান্স), স্টিল ওয়াটার (টম ম্যাকার্থি, আমেরিকা) চলচ্চিত্রগুলো ‘আউট অব কম্পিটিশান বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। চলচ্চিত্রগুলোরও প্রদর্শনী হবে গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে। তৃতীয় এই বিভাগের চলচ্চিত্রগুলো কোনো ধরনের পুরস্কার না পেলেও অফিসিয়াল সিলেকশনের কারণে বিভাগটি যে সম্মানজনক তাতে সন্দেহ নেই।

এই মহামারীর সময় সাতটি গল্প নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র দ্যা ইয়ার অফ দা এভারলাস্টিং স্টোম। এই চলচ্চিত্রটি সম্মিলিতভাবে পরিচালনা করেছেন জাফর পানাহি, লরা পইট্রাস, উইরেসেটেকেল। এটি এই উৎসবে স্পেশাল স্ক্রিনিং বিভাগে প্রিমিয়ার হয়েছে।

২০০২ সালে প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে প্রয়াত তারেক মাসুদ নির্মিত মাটির ময়না কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টর্স ফোর্টনাইট আয়োজনে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে ফিপরেস্কি আন্তর্জাতিক সমালোচকদের পুরস্কার লাভ করে।

নারী নির্মাতাদের সাফল্য

৭৪তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের একটি বিশেষ দিক হচ্ছে নারী নির্মাতাদের সফলতা। উৎসবে প্রথমবারের মতো ২০ জন নারী নির্মাতার চলচ্চিত্রগুলো তিনটি বিভাগেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

এ বছর ইন কম্পিটিশান বিভাগে চার নারী নির্মাতা পাম দ’র জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর মধ্যে রয়েছেন হাঙ্গেরির নির্মাতা ইডিকো অ্যানিয়াদির সিনেমা দ্য স্টোরি অব মাই ওয়াইফ। পূর্বে তিনি মাই টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি সিনেমা দিয়ে কান উৎসবের আঁ সার্তেঁ রিগা বিভাগ থেকে গোল্ডেন ক্যামেরা জয় করেন।

ফ্রান্সের নারী নির্মাতা মিয়া হ্যান্সেন-লাভ এবার তাঁর বার্গম্যান আইল্যান্ড চলচ্চিত্র নিয়ে পাম দ’র জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর আগেও তাঁর দুটো চলচ্চিত্র কান চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনয়ন পায়। এর একটি আঁ সার্তেঁ রিগাতে পুরস্কার অর্জন করে।

ফ্রান্সের আরেক নারী নির্মাতা ক্যাথরিন কর্সিনি। তিনি এলএ ফ্র্যাকচার চলচ্চিত্রের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন । কুড়ি বছর আগেও তিনি এ পুরস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

নির্মাতা জুলিয়া ডুকুরনো (ফ্রান্স) মনোনয়ন পেয়েছেন টিটান চলচ্চিত্রের জন্য। ২০১১ সালে তিনি ‘জুনিয়র’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিয়ে প্রথম কানে পুরস্কার জয় করেন। বাকি ১৬ নির্মাতা অন্য বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছেন।

মিলনমেলা

কান মানে বিশ্বচলচ্চিত্রের মিলন মেলা। কান মানে চলচ্চিত্র, গ্ল্যামার, রাজনীতি, বিতর্ক। মহামারির কারণে এবারের উৎসবের পরিসর কমানো হয়েছে, আরোপ করা হয়েছে অনেক ধরনের বিধিনিষেধ। তারপরও এই উৎসবের আমেজ কান শহরকে ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। সকল চলচ্চিত্রপ্রেমিক, বোদ্ধারা অপেক্ষা করছেন ১৭ তারিখের পাম দ’র বা স্বর্ণপাম বিজয়ীর নাম ঘোষণার জন্য। বাংলাদেশের মানুষেরা অপেক্ষা করছে সাদের ছবিটি পুরস্কার পায় কিনা দেখার জন্যে।

++++

আপনি এই লেখাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাইলে আমাদের ফেসবুক ভিজিট করুন।

Share Now শেয়ার করুন