আশান উজ জামান >> ফুলকা জুড়ে কানকোর গান >> ছড়ানো ছিটানো গদ্য >> গদ্য

0
460

ফুলকা জুড়ে কানকোর গান

অমন সুখের বৃষ্টিতে ভেজা, অমন মধুর সময় কাটানো বাবার সঙ্গে আমার, আর হয়নি কোনোদিন। মাছ ধরতে না, চিরদিনের এই স্মৃতিটুকু বুকে ধরে রাখব বলেই যেন গিয়েছিলাম সেদিন।

লমাতৃক গ্রাম আমাদের, তিনপাশে বিল আরপাশে বাঁওড়। কাপড় ধোয়া, পাট জাগ দেয়া, রান্না করার পানি নিয়ে যাওয়া, পানিতে নামার উপলক্ষ্যের শেষ নেই। শেষ নেই মাছেরও। একসময় নাকি এমনও ছিল, কাজ সেরে ডাঙায় উঠতেই দেখা যেত কাপড়ের ভাঁজে আটকে আছে মাছ। সত্যিকার অর্থেই তাই মাছে-ভাতে বাঙালি আমরা। তবে বিলগুলো তো বাঁধা পড়েছে ভেড়িবাঁধের শেকলে, মাছভাতের সমীকরণ মেলাতে হলে তাই কিনে খেতে হয় এখন। একেবারেই বাঁওড়পারের (আমরা বলি `বাঁওড় কান্দা’) মানুষ যারা, তাদের কথা আলাদা। কোনো একবেলা হয়তো ভাত জুটলো না তাদের, কিন্তু মাছ না খাওয়ার উপায় নেই!
বাঁওড়টা এখন বন্ধকী মালিকানায় মাছচাষের ক্ষেত, পাহারার ব্যবস্থা আছে। তাতে কী? স্নানে যাওয়ার সময় হাতে করে কেউ খ্যাপলা জাল নিয়ে নেয়, গার্ডের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুই এক বার বেয়ে নিলেই হলো। কেউ নেয় ছিপ বরশি, ঘণ্টাখানেক বসে থাকলেই উশুল। তবে তা দেখা যায় দূর থেকে, ঘড়ঘড়েই তাই নিরাপদ বেশি। ঘড়ঘড়েও এক ধরনের ছিপ, দেখতে যা ছিপের মতো না কোনোভাবেই। ছোট্ট একটা কাঠির গায়ে নাইলোনের বহুদূরগামী সুতো পেঁচিয়ে রাখা হয়। সে সুতোর ডগায় জুড়ে দেওয়া থাকে আরো কটা সুতোয় বাঁধা চারপাঁচটা বরশি। সেগুলোতে কেঁচো বা আটা ময়দার চার গেঁথে ছুঁড়ে দিতে হয় গভীর পানিতে, কিংবা সাঁতার কাটতে কাটতে গিয়ে ফেলে আসা হয়। তারপর গা ডলো, মাথা ধোও, আর খেয়াল রাখো গাঁটে গোঁজা ঘড়ঘড়ের হাতলে। তাতে টান পড়লেই বোঝা যাবে ক্ষুধার্ত মাছ এবার স্বীকার করেছে তাকে। শিকারের খবর ছুটে আসতেই হাত-পা ডলা বাদ। গুঁটিয়ে নাও সুতো আর তা প্যাঁচাতে থাকো ঘড়ঘড়ের গায়ে। বরশি থেকে মাছ(গুলো) ছাড়িয়ে নিয়ে লুকিয়ে ফ্যালো। তারপর আধার গেঁথে আবার ছুঁড়ে দাও বরশি কটা। কিংবা যথেষ্ট হয়েছে মনে হলে লুঙ্গি বা শাড়ির ভেতর তা পেঁচিয়ে নিয়েই এগোও বাড়ির দিকে। সাবধান, তাড়াহুড়া না, হেঁটে যাও স্বাভাবিক। গার্ডের চোখে সেটা যেন স্নানসারা ঘরমুখো মানুষের মতোই স্বাভাবিক মনে হয়। নইলে মাছ তো নেবেই, কেড়ে নিয়ে যেতে পারে জাল ছিপ ঘড়ঘড়েও। সঙ্গে গালমন্দ আর তিরস্কারের মতো কেলেঙ্কারি তো আছেই।
ওই কেলেঙ্কারির ভয়েই আমার কোনোদিন মাছ ধরা হয়নি ওভাবে। তাই বলে কি একেবারেই নিরামিষ কেটে গেছে গ্রামে থাকা আমার ষোলো সতেরো বছর? না, কিছুটা আমিষ তো লেগেছেই গায়ে মুখে। সেগুলোই বলব আজ।
মায়ের কাছে খুব মার খেলাম সেবার। এত কষ্ট করে পড়াচ্ছেন তারা, আর আমি বাঁদরামো করে বেড়াই, স্কুল ফাঁকি দিই, খেলি সারাক্ষণ। না পড়িয়ে আমাকে কাজে দিলেও তো রোজগার হয় কিছু। অকারণ এই পড়ার বাবার শ্রাদ্ধ আর করতে পারবেন না তিনি। রাগের গায়ে জ্বর ওঠে না শুনলে? তা চোখের জলে যে তাপ কমাবো, সে-সময় পার করে এসেছি ততদিনে। মার খেয়ে তেতে ছিলাম, বকা খেয়ে তাই জ্বলেই উঠলাম একেবারে। সে যে কী আগুন, ঘুমের প্রলেপ দিয়েও নেভানো গেল না। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, এতই যখন সমস্যা তখন পড়বই না আর। কিন্তু ছেলে তো আমি গোল পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে টলতে থাকা মানুষ, কোনো কিছুতেই স্থির থাকতে পারি না। তাছাড়া প্রায় একই যন্ত্রণায় ঘর ছাড়তে উদ্যত সহপাঠী মোরশেদও জুটে গেল সঙ্গে। আর আপনারাই তো বলেন যে এক মাথার চেয়ে দুই মাথা ভয়ংকর বেশি। বিকেল হতেই তাই বদলে গেল সিদ্ধান্তু- পড়ব ঠিকই, তবে নিজের খরচ এখন থেকে নিজেরাই জোগাবো।
মানুষ সাধারণত দুই প্রকারে কাজ করে। উদ্যোক্তা ধরনের যারা, খেটেখুটে তারা তা-ই করে যা তারা করতে চায়; আর আমার মতো প্রায় গাধা হলে তা-ই করে যা করার সুযোগ পায়। তখন তো আরও গাধা ছিলাম। অনেক খুঁজে বুঝে দেখা গেল, সহজ রোজগারের জন্য জোনে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাবার কাছে ভাত বয়ে নিয়ে যাওয়া, একটা গরু একটা ছাগলের জন্য ঘাস কাটা, আর ঘর বানানোর মাটি কাদা করা ছাড়া বিশেষ কাজ তো করিনি কখনো, মাঠে মাঠে ধান রোয়া কাটা বাঁধা মাড়াই করার ধকল সইবো কেমন করে? তাতে জানাজানি হওয়ারও ভয় সমূহ। তারচেয়ে বরং পানিতে যাই, তাপ কম, চাপও কম। বড় বড় নৌকায় ইয়া লম্বা জাল ফেলে মাছ ধরে জালাছিরা। যা মাছ ওঠে তা বিক্রির টাকা কর্তৃপক্ষ পায় কিছু, কিছু পায় যার জাল সে। সেখান থেকে ভাগ পায় কর্মীরা। বাজারে যাওয়ার পথে খালপাড়, সেখানে জেলেপাড়া। পরিচিত অপরিচিত অনেকেই জালাছি হিসেবে কাজ করে। খোঁজ খবর নিয়ে আমরা চলে গেলাম তখনকার সবচেয়ে বড় জালওয়ালা আশ্রাফালি চাচার কাছে। তারপর শরত শেষের এক বাতাসি সন্ধ্যায় শুরু হলো আমাদের `বিপ্লবী‘ জালাছি-জীবন।
ভোরবেলা জাল নামবে, উপস্থিত হতে হবে তার আগে – ভোর চারটে সাড়ে-চারটেয়। তা অত রাতে বাড়ি থেকে বের হবো কী করে? ধরা পড়লেই তো তারপর ধাবড়া হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপ বসবে পিঠে। এতদূর পথ ভূতের চোখ এড়িয়ে আসবই বা কোন সাহসে? না, তারচেয়ে বরং সারারাত ওই বাঁওড় কান্দায়ই থেকে যাই, আশ্রাফালি চাচার মাছ কেনাবেচার ছাউনি তো আছেই। ‘মিলন ভাইদের বাড়ি যাচ্ছি’ নাকি ‘আজমদের বাড়ি’ কোন মিথ্যাটা বলে বিদায় নিলাম মায়ের কাছ থেকে, ভুলে গেছি। গায়ে শার্ট আমাদের, পরনে লুঙ্গি, আর মাছ ধরার সময় মাথায় বাঁধব বলে নিয়ে নিয়েছি গামছা। তা গিয়ে দেখি ছাউনিই আছে শুধু, বেড়া নেই; ভেতরে বাঁশের চটার বেঞ্চ দুটো, আর টেবিল একটা। বানের পানির মতো অবিরাম সকাতর বাতাসে তারপর সারারাত দু’জন কাঁপলাম শীতে। আর নাচলাম মশা মারতে মারতে। তারপর যখন ভোর, যখন জালটানা, চোখ তখন জ্বলছে ঘুমে।

জালাছিরা এবার জাল গুছাতে গুছাতে এগোবে একসঙ্গে। এই জাল টানার সময়েই বোঝা গেল দৌড় আমাদের। আনাড়ি হাতে জাল ধরছি দু’জন দুই নৌকায়। ভুলভাল হচ্ছে, আর টিটকিরি শুনছি জালাছিদের।

লম্বা চওড়া জালটা দুটো নৌকায় রাখা হবে। মাঝে বেশ খানিকটা জায়গা বেড় দিয়ে নৌকা দুটো এগিয়ে যেতে থাকবে দুদিকে। যত যাবে, জাল বাবাজি নিজে থেকেই নেমে ছড়িয়ে যাবে তত। সম্ভব সর্বোচ্চ পানি এভাবে সে গোল করে পুরে দিতে থাকবে জালের পেটে। আমাদের কাজ হলো বৈঠার আঘাতে দিয়ে নৌকার পাটাতনে অবিরাম শব্দ করতে থাকা। নৌকা যেহেতু উল্টো দিকে যাচ্ছে, তার আওয়াজে কাছকাছি থাকা মাছ পালাতে গেলেই আগে ফেলে আসা জালে আটকাবে। তারপর যখন ফিরবে তারা, ততক্ষণে জালের দু’প্রান্ত নিয়ে নৌকা দুটো এক হয়ে গেছে, এবং সেখানে শব্দ তখনও। জালাছিরা এবার জাল গুছাতে গুছাতে এগোবে একসঙ্গে। এই জাল টানার সময়েই বোঝা গেল দৌড় আমাদের। আনাড়ি হাতে জাল ধরছি দু’জন দুই নৌকায়। ভুলভাল হচ্ছে, আর টিটকিরি শুনছি জালাছিদের। ‘গায় যত গোশত, কেটে ভাগায়ে দিলি সারাগিরামের লোক খেয়ে পারবে না, জোর নেই ক্যান তা!’ ফুটবল খেলতে গিয়ে বারবার ধপাস ধপাস পড়তাম বলে এমনধারা কথা শোনার অভ্যাস আমার ছিল। তবে চড়চড় করে রোদ উঠে গেছে বলেই হয়তো রাগের পারদও চড়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে আবার মাছ উঠছে না। ‘সিজেন শেষের দিকি তো, মাছ আর আগের মতোন নেই।’ তা সিজন শেষ হওয়ার আর সময় পেলো না!
বাড়ি ফিরে সে-দুপুরে খেলাম না, নিজের টাকা হাতে পেয়ে খাবো। রাতের বকেয়া ঘুমটুকু চেপে বসেছে চোখের পাতায়, ভারিদুটো চোখ নিয়েই বিকেলে গেলাম টাকা আনতে। ভেজা জাল মেলে দেওয়া হয়েছে সেখানে, সবুজ ঘাসের ওপর গাবরাঙা খয়েরি জালের নকশার ওপর বসে আছি। পশ্চিম আকাশের হলুদ রঙ বদলে গিয়ে কমলা, তারপর লাল, তারপর ছায়া ছায়া হয়ে গেল। তখন শুনলাম, টাকা দেয়নি মহাজন, কাল পাওয়া যাবে।
সে-রাতে আর ভুল হলো না, বাতাস ও মশার বিরুদ্ধে জবরদস্ত ব্যবস্থা নিয়েই চলে গেলাম বাঁওড়ে। ঠান্ডা কম, মশা কম, ঘুম হলো মোটামুটি। মাছও পড়ল আগের দিনের তুলনায় ভালো। ফলে টিটকিরি শুনতে হলো কম। শেষ খ্যাপটা ফেললাম আমরা ডাক্তারবাড়ির ঘাটে। সেখানেই আমাদের স্নান চলে, চলে যাবতীয় কাজ। টানতে টানতে দেখি ঘাটে এলো মা। ভয়ে তো আমার দফা রফা, এই অবস্থায় দেখলে আমাকে এই লোকভরা বাঁওড় থেকে নিয়ে যাবে কান ধরে, ভেজা গা থেকে টুপটাপ ঝরে পড়বে অসহ্য অপমান। তা মানীর মান তো আল্লাই রাখে, নাকি? মা আমাকে দেখলেনই না, নাকি দেখেও চিনলেন না কে জানে, উঠে গেলেন লক্ষ্মী মেয়ের মতো। ঘরে ফিরে নিজেও আমি চিনতে পারলাম না নিজেকে। এমনিতে যথেষ্ট পাকা রঙ আমার, কোনো কিছুতেই হেরফের হয় না তেমন। কিন্তু টানারোদে তপ্তপানির ওপর বসে জাল টানার ক্লান্তি আর দু’রাতের না হওয়া ঘুম দস্তুরমতো লেপ্টে আছে মুখে। তা হোক, কাজের বিনিময়ে ওটুকু তো নিতেই হবে। তারপর আবার বিকেল, আবার টাকার জন্য অপেক্ষা। খেলার সাথীরা খেলছে মাঠে। কিন্তু কখন সে-লোক আসে না আসে, এসে যদি চলে যায় না পেয়ে, ভয়ে আমি খেলতে নামতেও পারছি না। পরপর দু’বিকেল অমন না খেলে বসে থাকার অসম্ভব ত্যাগ আর সেই চামড়া পোড়ানো খাটুনির ফলে আমার হাতে উঠে এলো বিশটাকার একটা ভেজা ভেজা নোট। এইটুকুর জন্য এত খাটলাম? এরচেয়ে তো ঠিকমতো পড়াশোনা করার ‘পরিশ্রম’ও আরামের।
ঘরের পেছনে মাঝারি একটা পুকুর আমাদের। কালে কালে মজে গিয়ে সে-পুকুর তখন কুয়ো, আমরা বলি কো। শুকনো মৌসুমে খটখটে; তবে বর্ষা এলেই কানায় কানায় ভরে যায় কুয়োটা – ধান সিদ্ধ করা হাঁড়ির মতো। শীতের ঝরাপাতার গন্ধ আসতে আসতেই সে-পানি আবার শুকিয়ে যাবে। তাও তো প্রায় পাঁচ মাসের ফ্যারা, বর্ষার শুরুতেই বড়আব্বা সেখানে মাছ ছাড়েন। জিয়ল সরপুটি তেলাপিয়া জাপানি। আর কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয় মাছধরা আমার। বরশি ফেলি, তেলাপিয়ার কালচে আর সরপুটির চকচকে সাদায় ভরে ওঠে মাছের ডালা।

বারবার নামা আর ওঠার কারণে পিছল ঘাটে জমে যেত তুমুল ‘স্লাইডিং’। আর বিকেলের মতো শান্ত ঘাটে আমরা দাঁড়িয়ে পড়তাম ছোট্ট ছিপ নিয়ে। তারপর বরশি নাচিয়ে নাচিয়ে বেলে পুঁটি চ্যাঙ ধরা।

এক সন্ধ্যায় মা আমাকে একটা ভাড় ধুতে পাঠালেন কুয়োয়। ধুতে ধুতেই হাত ফসকে সেটা ডুবে গেল পানিতে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চারপাশে থোকা থোকা বাঁশঝাড়, তার গায়ে-পিঠে আঠালো আঁধার। ওই অবস্থায় সেটা তুলতে গেলেই কেউ এসে ঠেসে ধরে যদি! যদি মটকে দেয় ঘাড়? বড়আব্বা গাছ কাটেন, খেজুরের রস আনেন, গুড় জ্বালান – বাড়িতে ভাড়ের অভাব নেই। আরেকটা খুঁজে নিয়ে কাজ চালালাম; ডুবে যেটা আছে ওটা না হয় ভোরের দিকে তুলে ফেলব। তা সেই তুলতে গিয়েই হলো আমার সুখের খনি আবিষ্কার। ডাঙায় তুলে ভাড় উপুড় করতেই দেখি চিত উপুড় লাফাচ্ছে চকমকি জিয়ল, আর তেলাপিয়া পুঁটি! তারপর আর যায় কোথায়। প্রতি সন্ধ্যায়ই ভাড় বা কলস কিংবা ডাবর ডুবিয়ে রাখি কোমরপানিতে নেমে। ভোরবেলা তুলে আনি। তারপর তিড়িং বিড়িং লাফাতে থাকে সুখ!
শরৎ যখন শাদা মেঘের শাড়ি প’রে হাসতে থাকে বিলধারে, কুয়োর পানি শুকোতে শুরু করে তখন। পাড়ের কাছাকাছি ঢালটুকু বেশ খানিকটা সমতল। মাঝখানে ডুবোপানি হলেও ঢালের ওপর হাঁটু ডোবে না। পরিস্কার থাকলে নিচের মাটি দেখা যায়। ফলে ঘুরঘুর করতে থাকা তেলাপিয়া কিংবা জাপানি মাছের ঝাঁকও দেখি। দেখেই তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাই কুয়োর কোণার দিকে। থরে থরে সেদিকটায় দাঁড়িয়ে আছে পচতে থাকা আগাছাসমগ্র। তেলাপিয়া চালাক বেশি, পালিয়ে গেছে, বোকা জাপানিগুলো ঢুকে পড়েছে ওই আগাছার মধ্যে। কিন্তু পা আর হাতের ঢেউয়ে যে পানি আমি নিয়ে তুলেছি সেখানে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ফিরে যেতেই ভুল বুঝতে পারে মাছগুলো – আরে এদিকে যে পানি নেই, কেন এলাম! আর সেই সাদারঙের কমলা ঝটপটানিই যেন বাজতে থাকে বুকের ভেতর। হাতের ভেতর জ্যান্তু মাছের কাঁপাকাঁপি, ডানা ঝাপটানো, লিখতে লিখতে এই এখনো অনুভব করছি যেন।
বিলেও একসময় মাছ ধরেছি অমন। যখন কোনো ভেড়ি সেঁচে ফেলত মালিকপক্ষ, তাদের মাছ ধরা শেষ হলেই নেমে পড়তাম আমরা। আলু তুলে নিয়ে যাওয়ার পরও যেমন কিছু এড়িয়ে যাওয়া আলু পাওয়া যায় আলুক্ষেতে, তেমনভাবে হাঁটু ডুবে যাওয়া কাদা হাতড়ে হাতড়েও পেয়ে যেতাম চ্যাং উল্কো পাকাল বাইম। একবার বাইম মনে করে সাপ তুলে আনলাম হাতে। তারপর কি রেহাই আছে আর? পৃথিবীজুড়ে সাপের ভয়ে তটস্থ থাকে যারা, তাদের একটা দল করা হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমি সভাপতি হবো। দেখা তো দূরের কথা, সাপের নাম শুনলেও গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়! ফলে সেই শেষ; পরিচিত অপরিচিত লোকজন এত এত মাছ পাচ্ছে দেখেও আমি নামতাম না আর। মাছ উঠবে ভালো কথা, কিন্তু সাপ যদি ওঠে!
শুকনো মৌসুমে ওই সাপের মতোই চিকন আর লম্বা শুকনো ডাঙা জেগে ওঠে বাঁওড় কান্দায়। গ্রামে কোনো খেলার মাঠ না থাকায় ওই সময়টায় হাতির পাঁচ পা দেখি আমরা। সারাদিন খেলা আর খেলা। গরম লাগলে ঝুপ করে বাঁওড়ে ঝাঁপ আর উঠে এসে আবার খেলা। সর্দি লাগে, পড়াশোনা হয় না। তো অতীষ্ট বাবা মায়ের অনুরোধেই হোক, কিংবা মারের ভয়ে, বর্ষায় বর্ষায় বাঁওড়টা গিলে খেতো মাঠটুকু। তা নাচতে যারা জানে, এবড়োখেবড়ো উঠোন হলেও কি তাদের নাচা থামে? ডাঙা ছুঁই ছুঁই পানিতে আমাদের লাফঝাঁপ চলত নতুন উদ্যোমে। বারবার নামা আর ওঠার কারণে পিছল ঘাটে জমে যেত তুমুল ‘স্লাইডিং’। আর বিকেলের মতো শান্ত ঘাটে আমরা দাঁড়িয়ে পড়তাম ছোট্ট ছিপ নিয়ে। তারপর বরশি নাচিয়ে নাচিয়ে বেলে পুঁটি চ্যাঙ ধরা। কেশর মেলে দেওয়া সিংহের সৌন্দর্য্য যেমন, কানকো ফোলানো বেলে তারচেয়েও সুন্দর। তবু, বড় বড় রুই কাতল কি ধরব না একবারও? বাঁওড়ের কাছে বাড়ি হয়ে তাহলে লাভ কী হলো?
মায়ের না-বোধক বাঁকা ঘাড়, সোজা হয় না একবারও। ‘চুরি করা যাবে না।’ তা সবাই যে করে! ‘করুক, কিন্তু তুই করবিনে।’ তবু ঘ্যানর ঘ্যানর থামে না। না পেরে একবার রাজি হলেন বাবা। বললেন, মাছ আমরাও ধরব, তবে চুরি করে না, অনুমতি নিয়ে। আমাকে বাঁশি বাজানো শেখাবেন, পছন্দের জামাটা পরেরবার কিনে দেবেন, সারারাত গান গেয়ে শোনাবেন – অমন কত কথাই তো বাবা দিতেন আমাকে। ফলে বিশ্বাস ছিল মাছ ধরাটাও বাকির খাতায়ই থেকে যাবে, হালখাতা আর খোলা হবে না। কিন্তু না, সত্যিই আমাদের এক শুক্রবার রাঙা হয়ে উঠল ঝলমলে সূর্যের আলোয়। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছেন বাবা, গার্ডেরা কিছু বলবে না। যত খুশি মাছ ধরতে পারব, সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়। বাবার এক বন্ধুর কাছ থেকে চেয়ে আনা হয়েছে ছিপ ও মাছের চার। সাইকেল ধুয়ে, গরুকে স্নান করিয়ে, তৈরি হতে থাকা আমার ঘরের দেয়াল পিটিয়ে, দুপুরের পরপরই আমরা গিয়ে বসেছি ডাক্তারবাড়ির ঘাটে। দুজনে আমরা তিনটা ছিপ নিয়ে বসে পড়লাম, পাশাপাশি। বাঁশের বাঁশির মতো শক্ত বাবা আমার তুলোর মতো নরম সুরে কথা বলছেন মাছ যেন ভয় না পায়, কাঠের কাজ করে করে পাথর হয়ে যাওয়া হাতে ছিপ ফেলছেন আমার জন্য, সারাক্ষণ চিন্তা আটকে থাকা গলায় তার গুনগুনিয়ে উঠছে লালন হাছন… এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! এই যে এটুকু লিখতে লিখতেই যেমন চোখ ভরে উঠল আমার, এমন ভরবে জানত বলেই হয়তো আকাশ সেদিন কাঁদল খুব। দুটো বিড়াল আর একটা কুকুর একসঙ্গে বেঁধে ফেলে রাখলেও ভেসে যাবে – এমন বৃষ্টি ঝরল অবিরাম। তার ভেতর কী দায় পড়েছে মাছের যে তারা বরশি গিলতে আসবে? তবু ‘আরেট্টু দেকি’ ‘আরেট্টু দেকি’ করতে করতে বোকা বাবা বোকা ছেলে আমরা বসে থাকলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। মাছ রাখব বলে বালতি নিয়ে গিয়েছিলাম, একবালতি বিশুদ্ধ বৃষ্টি জমল শুধু। বৃষ্টিসরল কী দারুণ ব্যর্থতা বুকে ভরেই না ফিরে এসেছিলাম শূন্য হাতে আমরা! পেছনে তাকিয়ে দেখি, সেই ব্যর্থতাই ভরে রেখেছে বুকটা আমার আজও। অমন সুখের বৃষ্টিতে ভেজা, অমন মধুর সময় কাটানো বাবার সঙ্গে আমার, আর হয়নি কোনোদিন। মাছ ধরতে না, চিরদিনের এই স্মৃতিটুকু বুকে ধরে রাখব বলেই যেন গিয়েছিলাম সেদিন।

Share Now শেয়ার করুন