আশান উজ জামান | স্বরূপকথা | ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ২)

0
143

এই পর্বটি হাসান আজিজুল হককে স্মরণ করে প্রকাশ করা হলো – সম্পাদক

পর্ব ২

গুহার ভেতরে খেতে বসবে মেয়েরা সবাই, ছেলেরা বাইরে। সেখানে দুই জায়গায় আগুন। একটাকে ঘিরে বসবে সর্দার আর দিনের সেরা শিকারীর দল। তাদের সামনে থাকবে সবচেয়ে স্বাদের মাংস। কলিজা, মগজ, আর পাঁজর। শিকারদিনের এটাই সবচেয়ে সম্মানের মুহূর্ত। খাওয়ার সময় সর্দার ভুলে যায় সে সর্দার। নিজে হাতে মাংস তুলে দেয় সেরা শিকারিকে।

৪.
কারো জন্ম হলে যতটা খুশি এরা, মারা গেলে তারচেয়ে বেশি। খাবারের ভাগ কমল, কমল মুখের সংখ্যা। তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র ভাগাভাগি করে নেওয়া যাবে, পাওয়া যাবে তার সঙ্গী মানুষটাকে। কিন্তু রাত গড়িয়ে তবে তো ভোর! ঝামেলা বাঁধে মৃতের সৎকারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে।

গুহা থেকে বের করে মুমুকে রাখা হলো পাড়ার মুখে। এখন প্রথম কাজই হলো তাজা শিকারের রক্তে তাকে ধুইয়ে নেওয়া। তা এখন এই ভরসন্ধ্যায় তাজা রক্ত কোথায়? সারা গা ধোয়ানোর উপায়ও তো নেই। সকালে মারা সজারুর রক্ত ছিল খানিক। দরকারে অদরকারে লাগে বলে জমিয়ে রাখে পাতায়। জমে শক্ত হয়ে গেছে। পানি মিশিয়ে খানিক ছাড়া ছাড়া আঠামতো যা পাওয়া গেল, তা নিয়েই সর্দার মাখিয়ে দিলো বউয়ের মুখে। তারপর একটা গন্ধকাঠে আগুন ধরিয়ে তার ধোঁয়ায় ভিজিয়ে নিলো লাশটাকে। তারপর শুরু হলো প্রার্থনা।

মেয়েরা এসে যে যার মতো প্রার্থনা করল তার সামনে। বাড়ন্ত মেয়েরা চাইলো তারা যেন মুমুর মতোই রাণীমা হতে পারে। উপযুক্ত মেয়েরা চাইলে লাশের ফেলে যাওয়া জায়গাটা নিতে পারার বর। বুড়িদের মুখে বাজল বড় দেবচাঁদের সঙ্গে তাদের দেখা করিয়ে দেওয়ার আবদার। কিন্তু হু পড়ে গেল বিপদে, কী চাইবে সে?

মা-বাবার পর এই একজনই ছিল, যাকে সে বলতে পারত সবকিছু। অথচ তার জন্যই ওর ওলট পালট হয়ে গেল সব। লুকিয়ে চুরিয়ে পাড়ার অন্যদের মতো এগিয়ে আসত মুমু, এটা সেটা ছুঁতোনাতায় কথা বলবার চেষ্টা করত, কিন্তু সাড়া দেয়নি হু। তা যত শত্রুই হোক, মরেছে তো মানুষ। পায়ে পায়ে তাই এগিয়ে গেল সে। মরামুখটায় কেমন যেন হাসিহাসি ভাব। কালচে রক্তের ছোপও আড়াল করতে পারেনি তা। দেখতেই রাগের পাথর আর অভিমানের বরফ গলে গেল একসঙ্গে। চোখ মুছতে মুছতে সে প্রার্থনা করল- চাঁদের কাছে গিয়ে মুমু যেন হু’র মা-বাবাকে ফেরত চায়। আর যদি সে বাঘ ভালুক বা জলদানো হয়ে ফিরে আসে আবার, মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে যেন হু-কে না খায়। বলে সে চলে এলো তার বেড়ার দিকে। ধোঁয়াকাঠ জ্বালিয়ে ঘরে মশা তাড়ানোর ধোঁয়া দিতে দিতে কাঁদল খানিক। তারপর ভেজাচোখ না মুছেই শুনতে লাগল সকলের সমস্বর প্রার্থনা। ‘যদি ফিরে আসো। যদি বাঘ হও। যদি ভালুক হও। আমাদের খেয়ো না। পাড়ার দিকে এসো না।’

প্রার্থনার সময় সকলেই কিছু না কিছু দিয়ে গেছে লাশের কাছে। গায়ের ওপর জড়ো হয়ে আছে সে-সব ফুলফল লতাপাতা। আলতো করে তা সরিয়ে ফেলল হাবা। পারা রাবা আর অন্য জোয়ান ছেলেরা মিলে কাঁধে তুলে নিলো মুমুকে। নিয়ে চলল দেবগাছের দিকে। পাথর সাজিয়ে একটু উঁচু করে নিয়েছে ওরা। সেখানেই রাখা হলো লাশ। সর্দারের প্রার্থনার সময় এখন। চোখবুজে সে জড়ো করল হাত। দেবগাছ যেন চাঁদকে ডেকে জানায় যে রাণীমার লাশ এসেছে। আর তারপর ঠিকঠাক তাকে তুলে দেয় চাঁদের হাতে।

চাঁদের হয়ে সেটা যে গ্রহণ করল দেবগাছ, এখানেই মৃত ব্যক্তির দিয়ে যাওয়া তৃতীয় সুবিধাটা পায় সবাই। যেহেতু নিজেদেরই একজনকে সমর্পণ করা হলো, পুরো একটা দেহই সেটা, পরপর তিনসূর্য এরপর আর কিছু উৎসর্গ না করলেও চলবে।

তারপর শুরু হলো চাঁদ উঠবার অপেক্ষা। যতক্ষণ না উঠবে, ততক্ষণ লাশের পাশে বসে থাকবে তার আপনজন। তবে অন্যদের লাশ নিয়ে যেহেতু বসে থাকে সর্দার, আভা পারা জারা রাবাও তাই বসে থাকল তার পাশে। বসে থাকল চুপ, দেবচাঁদের উঠে আসার চিন্তায় মগ্ন। তা কথাবার্তা ছাড়া এভাবে কতক্ষণ বসে থাকা যায়? সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্তি জমেছে গায়। ঘুম আর মশার যন্ত্রণাও আছে। ঢুলল তারা, আর চমকে চমকে উঠে ঠাস ঠাস চর মারল গায়ে মুখে। ধোঁয়াকাঠ আনতে লোক পাঠানো যায় কি না আলোচনা চলল ফিসফিসিয়ে। ঘুম তাড়াতে কেউ কেউ শুরু করল গল্প। সেই ফিসফিসানিও কানে গেল আফার। বকা তো দিতে পারবে না, ঠাস ঠাস মারতে লাগল সে। মারের ভয়ে সিঁটিয়ে থেকে, মশা মেরে আর ঢুলে ঢুলে যখন নাজেহাল তারা, বাঁকা একটা পুরু চাঁদ তখন উঠে দাঁড়াল পাহাড়ের মাথায়। তার আলোয় যখন আলোকিত হয়ে উঠল মুমু, আফার ইশারায় হাত বাড়াল সবাই। ধরাধরি করে লাশটাকে দেবগাছের শেকড়ের ভাঁজে রাখল। তারপর চলে এলো পাড়ায়।

চাঁদের হয়ে সেটা যে গ্রহণ করল দেবগাছ, এখানেই মৃত ব্যক্তির দিয়ে যাওয়া তৃতীয় সুবিধাটা পায় সবাই। যেহেতু নিজেদেরই একজনকে সমর্পণ করা হলো, পুরো একটা দেহই সেটা, পরপর তিনসূর্য এরপর আর কিছু উৎসর্গ না করলেও চলবে। যত পারো শিকার করো, কিন্তু তার ভাগ আর দেবগাছকে দিতে হবে না। সারাদিনের ক্লান্তিশেষে এই ব্যাপারটাই স্বস্তির খানিক। সেটুকু পেটে ভরেই ঘুমিয়ে পড়ল তারা।

কদিন ধরে রাতবিরাতে জেগে উঠত মুমু। পেট চেপে ধরে কাঁদত, কঁকাত। তাকে ধরে রাখতে গিয়ে, সাহস দিতে গিয়ে বা কখনো শব্দের কারণেও ঘুম হয়নি সর্দারের। আজ তাই বেশ গাঢ় হলো ঘুমটা তার। এতটাই যে, ঝরনার জল ছুঁয়ে কখন সূর্যের আলো ঢুকে পড়েছে তার গুহায়, কখন তাকে ডেকে ডেকে সাড়া না পেয়ে চলে গেছে পাখপাখালি, খেয়ালই করেনি। তাবার ছেলেটা চিৎকার করে তাকে না ডাকত যদি, ঘুমটা হয়তো ভাঙতোও না এখন। যাহোক, হাঁপাতে হাঁপাতে তুবা যা বলল, তার মানে দাঁড়ায় এই- মুমুকে গ্রহণ করেনি দেবচাঁদ। শুনেই তড়াং করে উঠে বসল সে। আতঙ্কে আধখানা হয়ে ততক্ষণে সেদিকে ছুটতে শুরু করেছে লোকেরা। আফাও গিয়ে দেখলো যেমন ছিলো তেমনই পড়ে আছে লাশ। সারাদিন আবার তার পাহারায় বসে থাকতে হবে ভেবে দমে গেল ওরা তখন। কিন্তু কী করা যাবে, আগের রাতের মতোই তারা গিয়ে বসল আফার সঙ্গে।

হু এসে আবার তার গায়ে ছিটিয়ে গেল ফুল। আফার দিকে চোখ পড়ল একটু। লোকটা ঠিক তাকিয়ে আছে তারই দিকে। দৃষ্টিটা খানিক নরম, রাঙানো চোখে যেমন সে দেখে হু-কে সাধারণত, তেমন না। আহা, একটা মৃত্যু কেমন বদলে দিয়েছে সব! ভেতরে হু’র অস্থির ঝরনাধারা। স্থির হয়েই তবু ঠিকঠাক প্রার্থনা শেষ করল। করল সে আগের দিনের প্রার্থনাই আবার। তারপরই খেয়াল হলো, একটুও বাতাস নেই, ভ্যাপসা গরম আজ। গিয়ে তাই নেমে পড়ল ঝরনায়। পাড়ার মেয়েরা গা ধুচ্ছে আর গল্প করছে। কী নিয়ে যেন খুশি খুব ওরা। তা ওকে নামতে দেখেই চুপ হয়ে গেল। সরেও গেল একপাশে। পানিতে নেমেই হু’র মনে হলো পারার ব্যাপারটা বলবে মেয়েদের। কিন্তু ওদের হাবভাব দেখে আর ইচ্ছে করল না।

রাতে যখন চাঁদ উঠল আবার, সমর্পণ শেষে ক্লান্ত সবাই শ্রান্ত তখন ফিরে এলো পাড়ায়। মেয়েদের ভেতর ততক্ষণে দারুণ শোরগোল। মুমু চলে যাওয়ায় রাণীমা হওয়ার সুযোগ কার হবে এই নিয়ে বচসা। বাচ্চারা আর বয়স্করা ঘুমিয়ে আছে, তাদের ঘুম ভাঙছে, কথার চোটে কেউ এপাশ করছে। আলোচনা থামছে না তবু।

পিচ্চি দুটোর গায়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে পিপি বলল, ‘মোমোকে নেবে না।’ বলে খানিক কথা গুছালো। তারপর জুড়ল, ‘তিবিও ভালো। তিবিকে নিক।’

সিসির মাথায় উঁকুন খুব, এই বিকেলেও বেছে দিয়েছে বিতি, তবু যেন কমেনি একটাও। নিচের ঠোঁট দাঁতে কামড়ে মাথা চুলকাচ্ছে সে। তিবির কথা শুনেই বলল, ‘পাগল নাকি! মোমোকেই নেবে সর্দার। মোমো মুমুর বোন।’ এরপর হাত দিয়ে নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে যা ইশারা করল, তা ধরলে মানতেই হয়, এত সুন্দর মেয়ে নিজের ঘরেই থাকতে সর্দার মোমোকে হাতছাড়া করবে না।

কিন্তু সবার চিন্তা তো আর একদিকে বয় না। বসে বসে এতক্ষণ হাই তুলছিল মিতি। আরেকটা তুলে বলল, ‘আমি চাই না নিক। মোমো ছোট, বিতিও ছোট।’ থেমে থেমে তারপর যা বলল সে, সরল কথায় তার অর্থ দাঁড়ায় এই: উপযুক্ত কোনো একা মেয়ে তো পাড়ায় নেই হু ছাড়া। প্রতিজ্ঞা ভুলে সর্দার হয়তো এবার তাকে নেবে। নইলে হাত বাড়াবে অন্য কোনো শিকারীর মেয়েলোকের দিকে। শুনেই তিতি হাত দিলো বুকে। দু’হাতের হালুতে নিজের দু’স্তন মেপে দেখার ভঙ্গি করতে করতে বলল, ‘আমার কি সুযোগ আছে? উহ, কী বুদ্ধি সর্দারের!’ ঢেউয়ের ওপর আলো পড়লে যেমন খানিক-আলো খানিক-ছায়ার মতো এঁকে বেঁকে আসে তার ছটা, তেমন বাঁকা হয়ে একটু লজ্জা একটু-কৌতুক ভেসে উঠল মুখে তার। উঠতেই হেসে উঠল মিতি। ‘তোর থাকতে পারে।’ তিতির অনুসরণে নিজের বুকে হাত বুলাতে বুলাতে বলল সে, ‘আমার একদম নেই!’ তিতির কথায়ই একপশলা হেসেছে সবাই, মিতির কথায় তার জোর যেন বাড়ল আরো। আর ঠিক তখনই গুহায় এসে ঢুকল লোকেরা।

‘রাণীমা নেই’ ‘কে হবে রাণীমা’ ‘কাকে নেবে সর্দার’- ছিটেফোটা কথা এসব সকাল থেকেই কানে আসছে আফার। নিজেও সে চিন্তিত খুব। তবে ব্যাপারটা নিয়ে বোধহয় একটু বেশিই আলোচনা হচ্ছে। হাসি-তামাশা ভালো, কিন্তু কাজ ভুলে করবে কেন? আজ নাকি গল্প করতে করতে একটা প্রায় শুকানো চামড়া নষ্ট করে ফেলেছে এরা। না, বিহিত শিগগিরই করতে হবে।

নিজের গুহায় শুয়ে এসবই ভাবছে আফা। গুহাটা ছোট, দু’তিন জনেই ভরা ভরা লাগত। আজ কেমন শূন্য, ফাঁকা ফাঁকা। এপাশ ওপাশ করছে সে। যেদিকেই তাকাচ্ছে, সেদিকেই মুমুর ব্যবহারের জিনিসপত্র। কী যত্নই না এসবের করত সে। আজ সব আছে, মানুষটা চলে গেল। আচ্ছা, কাল তো দেবচাঁদ নিলো না মুমুকে আজ যেন নেয়। নইলে যদি গন্ধ ছুটে যায়, তখন তো আরও নেবে না। আচ্ছা, মানুষ তো মুমু ভালোই ছিলো, এত কষ্ট পাচ্ছে কেন তাহলে? এটাসেটা ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল, মরার আগের কদিন খুব সাগো সাগো করছিল সে। তা এই জঙ্গলে সাগো পাবে কোথায় আফা? তবু বলেছিল, বাচ্চা হোক খাওয়াবে।

বাচ্চা তো হলো, এখন খাওয়াক আফা!
বড় একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল সর্দারের।

ওপাশ থেকে বুবার কান্নার আওয়াজ আসছে। এটাসেটা বলে তাকে থামানোর চেষ্টা করছে সিসি। আওয়াজ শোনা যাচ্ছে পিপিরও। তার ছেলেদুটো দুধছাড়ান দেবে দেবে করছে। বুবা’কে নিয়ে গিয়ে তাই সে-ই রেখেছে। খিদের সময় মা-মরা মেয়েটাকে খানিক দুধ তো খাওয়াতে পারবে। তা রাহা লামাকে সামলাতেই তো হিমসিম সে, এই দুধের বাচ্চাকে দেখতে পারবে? মোমোকে তাই বলে রেখেছে পিপির বাচ্চাদের দেখতে, পিপি যেন বুবাকে দেখতে পারে। তা মোমোর যে ঘুম, একবার চোখ বুজলে খোলানো কঠিন।

গুঁড়ো গুঁড়ো ঘুম জড়ো হয়েছে আফার চোখেও। তা মুমুর শোক আর বাচ্চাটার কান্না যেন বিঁধছে বুকে। গা ঝাড়া দিয়ে তাই উঠেই পড়ল সে। বড়গুহার দিকে এগিয়ে দিলো চিন্তিত আগুপিছু পা। একবার মনে হচ্ছে গিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিলেও হবে। আরবার ভাবছে, গিয়ে লাভও বা কী, কীভাবে বাচ্চা কোলে নিতে হয়, তাও কি সে জানে? তা বাবার চিন্তার চোটেই যেন চুপ করল মেয়েটা। ঝুপ করে শান্ত হয়ে গেল পাড়াটা।

একটু আধটু নাক ডাকানো আর গুহার মুখে পাহারার আগুনে পুড়তে থাকা কাঠের পটপট ছাড়া শব্দ নেই কোনো। সেদিকে তাকিয়ে থাকল একটু। রাবা আর ফারা বসে আছে। রাবা না থাকলে হয়তো গিয়ে খানিক বসত তাদের কাছে। অল্প বয়সে পেকে গেছে, ট্যাশট্যাশ করে কথা বলে, ভালো লাগে না। আফার তাই দাঁড়িয়েই থাকল সেখানে। এদিক ওদিক দেখে নিলো পাড়াটা। বলা যায় না, অন্ধকারের ভেতর এখানে ওখানে লুকিয়ে থাকে বিপদ। ঝরনার স্বচ্ছ আঁধারের পাশেই পড়ে আছে হু’র কলাপাতার বেড়া। এতদিন হয়ে গেল, তবু সেই আগের মতোই তেজ মেয়েটার। তা তেজ কি তার নিজেরও কম? ভাবতেই খানিক নরম হয়ে এলো মন। যত যা-ই হোক, ভাইয়ের মেয়ে হু। এভাবে তাকে ফেলে রাখা ঠিক হয়নি। তা না রেখেই বা কী করত?

দীর্ঘ দীর্ঘ শ্বাসে সে ভরে ফেলল ছোট্ট গুহাটা। আর তার ভারেই একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

৫.
হু’র ঘুম ভাঙলো মিতির ঝাকুনিতে। ভাঙতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসল সে। কোনো সমস্যা নাকি? না, তেমন কিছু না। এই কদিন ধরে গায়ে বল পাচ্ছে না মিতি। নাড়িভূড়ি ধোয়া কাটা, হরিণ ভেড়া সজারুর চামড়া গোছানো, বিছানা ঠিক করা – একহাতেই করত সব আগে। আর এখন একটা বেজির চামড়া ছাড়াতেই হাঁপিয়ে ওঠে। সারক্ষণ হাই তোলে আর পড়ে পড়ে ঘুমায়। ‘আচ্ছা’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল হু, ‘মাঝে মাঝে এমন…’ বলে শেষ করার আগেই ভেসে এলো হাবার গলার আওয়াজ। আর ‘এই রে, উঠে পড়েছে।’ বলে ছুটে গেল মিতি। যেতে যেতেই বলে গেল, ‘হাবার খুব গলাব্যথা।’ বলতে বলতে দৌড়ালো এমন, দেখে মনে হলো বাঘভালুকের তাড়া খেয়ে পালাচ্ছে জান নিয়ে।

হাসতে হাসতে বাইরে এলো হু। হাত মুখ ধুয়ে নিলো ঝরনায় গিয়ে। তারপর বসল খেতে।

ওদিকে আফা উঠেছে চিন্তা মাথায় নিয়ে। মুমুকে গ্রহণ করেছে তো দেবচাঁদ? হ্যাঁ, করেছে। খবরটায় খানিক স্বস্তির হাওয়া। টেনে টেনে সে ভরে নিলো বুক। তবু কেমন ওলটপালট লাগছে সব। কেন লাগছে? কী সমস্যা? শিকারের প্রস্তুতি নিতে নিতেই ভাবছিল সে। হঠাৎ আবার মনে পড়ল সাগোর কথা। নাহ, খোঁজ একটু করতেই হবে। মুমু তো আর খেতে পারবে না, ওর হয়ে অন্যরা খাক।

আগের বনে অহরহ পাওয়া যেত। এটা সেটা উপলক্ষ্যে খেতোও মাঝেমধ্যে। শেষের দিকে তো উপলক্ষ্য না থাকলেও খেতে হতো। এখানে আসার পর আর খাওয়া হয়নি। পাওয়া গেলে অবশ্য খাওয়া হতো। মাঝে মাঝেই তো শিকার জোটে না, সাগো থাকলে অন্তত না খেয়ে থাকা লাগত না।

দু’দল শিকারীকেই দাঁড়া করালো আফা। জিজ্ঞেস করল কেউ তারা ওই গাছ দেখেছে কি না। না, কেউই বলতে পারল না যে সে দেখেছে তা। তবু সবাইকে বলে দিলো চারপাশে নজর রাখতে। এত বড় জঙ্গল, এত রকমের গাছপালা চারপাশে, থাকতেও তো পারে।

বলছে, এমন সময় হু কে দেখা গেল।

ছোট ছোট কাঠি সাজিয়ে তার ভেতর দিয়ে লতা পেঁচিয়ে ঘুরিয়ে বোনা ঝুড়িটা নিয়ে বাইরে যাচ্ছে। এমন তো সে প্রায়ই যায়, এদিক ওদিক ঘোরে। তবে শিকারীদের চেয়ে বেশি নিশ্চয়ই ঘোরে না। তাছাড়া জানলেও কি হু বলবে আফাকে? তবু, একবার জিজ্ঞেস করে তো দেখা যায়। ভাবতে ভাবতে দেখল হু চলে যাচ্ছে হন হন। কারো দিকে তাকানো নেই, কাউকে কিছু বলা নেই। আহারে, আবার দীর্ঘশ্বাস পড়ল আফার। কিছুদূর গিয়েই হু’র আলোগাছ। তার সামনে দাঁড়ালো কিছুক্ষণ। চোখ বোজা, কী যেন বলল বিড়বিড়। তারপর পা বাড়াবে এমন সময় ডেকেই বসল আফা। ‘একটু শোন তো হু’। শুনেই চমকে উঠল সবাই। চোখ ছোট আর গোল করে তাকালো আফার দিকে। ঠিক দেখছে তো, আফাই কি ডাকল হু’কে?

আফা তাকে ডাকবে, ব্যাপারটা হু’র কাছেও এত অপ্রত্যাশিত যে খেয়ালই করল না। ঝরনানদী পার হয়ে সে চলে এলো ডানে।

পাহাড়গুলোকে ডানপাশে রেখেই হাঁটছে ও। সতর্ক চোখে বারবার দেখে নিচ্ছে বাঁয়ের গাছগাছালি ঝোপজঙ্গল। মাঝে মাঝে থেমে থেমে দেখে নিচ্ছে সামনে পিছেও। যেখানে গাছ নেই, বা ডানের পাহাড় হঠাৎ চলে গেছে দূরে, সেসব জায়গা পার হয়ে যাচ্ছে দ্রুত, যেন বাঘ ভালুক এসে পড়লে অসহায় হয়ে না পড়ে।

আলোগাছের পরেই কিছুটা জায়গা সমতল। এ গাছ সে গাছ নিয়ে জঙ্গলটা এখানে খানিক ঢুকে পড়েছে পাহাড়ের ভেতর। তারপর ছোট দুটো টিলা। টিলার পর থেকেই বড় বড় পাহাড়। কী মনে করে ওইখানটায় দাঁড়ালো হু। কত যাওয়া আসা এদিক দিয়ে, কিন্তু খেয়াল করে দেখা হয়নি কখনো। আজ তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো ওর দিকে ঢালু হয়ে এসেছে পেছনের পাহাড়, টিলা দুটো না থাকলে তারা যেন ছুটেই আসত আরো। তাদেরকে ওভাবে রেখে আরেকটু এগিয়ে এলে দেখা যায় সত্যিই এগিয়ে এসেছে পাহাড়। ঢাল বলে কিছু নেই আর, সমতল থেকেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে গাছের মতো। নিচে দাঁড়িয়ে তার মাথাও দেখা যায় না। শুধু পাথর আর পাথর, খাঁড়া পাহাড়। মাঝে মাঝে যেটুকু ফাঁকা জায়গা, হু’র সাহস হয় না সেদিকে ঢোকার।

চলার বুদ্ধি করে চলতে বলত বাবা। ‘একপাশে আড়াল রেখো। অন্যপাশে খেয়াল।’ যখন সবার সঙ্গে থাকত, তখন এটা মনেও রাখা লাগেনি। তবে একা হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই কথা মানাটাই সবচেয়ে জরুরি মনে হয়।

পাহাড়গুলোকে ডানপাশে রেখেই হাঁটছে ও। সতর্ক চোখে বারবার দেখে নিচ্ছে বাঁয়ের গাছগাছালি ঝোপজঙ্গল। মাঝে মাঝে থেমে থেমে দেখে নিচ্ছে সামনে পিছেও। যেখানে গাছ নেই, বা ডানের পাহাড় হঠাৎ চলে গেছে দূরে, সেসব জায়গা পার হয়ে যাচ্ছে দ্রুত, যেন বাঘ ভালুক এসে পড়লে অসহায় হয়ে না পড়ে।

প্রথম যেদিন এসেছিল এদিকে, এসেছিল পাহাড়টার শেষ দেখবে বলে। যেতে যেতে বারবার দেখে নিচ্ছিল ফেলে আসা পথ, এ গাছে ও গাছে চিহ্ন দিয়ে রাখছিল আফার মতো, যেন ফিরতে পারে ঠিকঠাক। তারপর যখন রোদ চড়ে গেছে মাথায়, তবু শেষ হচ্ছে না পাহাড়, মনে হচ্ছিল ফিরে যাবে। আবার মনে হচ্ছিল, না, চলুক, এই আর একটু। একটু একটু করে পুরো পাহাড়ই ঘুরে গিয়েছিল সেদিন, পথ ফুরায়নি। পাহাড়টা বাঁক খেয়ে যেখানে চলে গেছে ডানে, তার কিছুটা দূরেই একটা ঝরণা। সেটা পার হয়ে যে জঙ্গল তাতে কাদাপানি আর ঝোপঝাড়। তার ভেতরে গিজগিজে সাপগাছ। সেসব দেখেই ও ফিরেছিল সেদিন। পরের দিন এগিয়ে গিয়েছিল আরো একটু। আর তাতেই মিলেছিল খাবারের খনি। সত্যি বলতে কী, ওই খনিই হু-কে বাঁচিয়ে রেখেছে এতদিন। অবশ্য পাড়ার লোকেরা জানতে পারলে এতদিন কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। তা এদিকে শুধুই পাহাড়, আর কিছু নেই – ভেবে ওরা এদিকটায় আসে না বলেই বাঁচা।

জোর পায়ে হাঁটছে হু। পাহাড়ের গায়ে যেখানে ঝোপঝাড়। হাতের লাঠি দিয়ে সেখানে সপাং সপাং বাড়ি মারছে। সাপ টাপ পেলে ধরবে বলে। একটা আলু লতা দেখা গেল, কিন্তু বড় হয়নি এখনো। কদিন পর এসে এটা তুলে নেওয়া যাবে। কাঁটা গাছের একটা ডাল ভেঙে সে ফেলে রাখল লতাটার সামনে, কেউ এদিকে এসে পড়লেও যেন চোখে না পড়ে। তারপর কিছুদূর হাঁটতেই শেষ হয়ে এলো পাহাড়। এই তো, এসে পড়েছে প্রায়। খুশি পায়ে ডানে মোড় নিলো ও। হাঁটছে পাহাড়ের গা ঘেঁষেই। দারুণ দারুণ ঝোপ দেখা যাচ্ছে এখানে ওখানে। হলুদ পাতায় সাদা ফোট ফোট। আর নীল নীল ফুল। এগুলো কি আগেরবার দেখেছিল? খাওয়া যাবে নাকি এসব? দেখতে দেখতে হাঁটছে। পায়ের তলা ব্যথা হয়ে গেছে। একটু বসবে নাকি? ভাবতেই ঝমঝম আওয়াজে ওকে ডাক দিলো ঝরণাটা।

পাড়ার কেউ যখনই বলত দুর্বল লাগছে, মা তখনই এই পাতা তুলে এনে বেটে খাওয়াত। আগের বনে পাওয়া যেত না এ গাছ, বহু ঘুরে মা চারা নিয়ে এসেছিল একটা। সেটাও বাঁচেনি। আর এখানে দেখো, শেষ নেই যেন এর। আহা, আজই যদি এখানে এসে পড়ে মা, কত যে খুশি হবে!

পাহাড় থেকে নেমে সেটা চলে গেছে ওপাশের সূর্যডোবা আকাশের দিকে। হু’র পথটাকে আড়াআড়ি কেটে নিয়ে সে পথ করে নিয়েছে ঝোপঝাড়ের মাঝখান দিয়ে। লাঠি ডুবিয়ে ডুবিয়ে হু সেদিকেই গেল কিছুদূর। তারপর লাঠিটা যেখানে ডুবল না বেশি, সেখানেই নেমে পড়ল। নামতেই আহা, কী ঠাণ্ডা, কী শান্তি! তবে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। একা একা এমন জঙ্গলে থাকার ভয় আছে। পরনের চামড়াটা একটু একটু গুটাতে গুটাতে ও পার হয়ে গেল নদীটা। তারপর আবার হাঁটা। যত এগুলো, তত ডানে সরে যেতে লাগল পাহাড়, আর তত যেন জড়িয়ে ধরতে লাগল জঙ্গল ওকে। এদিকটায় লতাগাছের বাহার, জট পাকানো চুলের মতো অটুট জড়িয়ে আছে তারা একে অপরকে। তাদের মনমতো এগুতে হচ্ছে, নইলে ধরে বেধে রাখবে। তার মধ্যে প্যাঁচপেচে কাদা নিচে। পা ফেলতেই ডুবে যাচ্ছে পায়ের পাতা। মাঝে মাঝে তো পানি হাঁটু পর্যন্ত। কোমার ছুঁয়ে যাচ্ছে চোখা চোখা ঘাস পাতা। চুলকাচ্ছে, পাতার ধারে কেটেও গেল খানিক। পা পিছলে যাচ্ছে প্রায়ই, হাতের লাঠিটা হু’র তাল সামলাচ্ছে তখন। এসবের মধ্যেই হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে সাপগাছ।

দেখতে সাধারণ কোনো আগাছাই ওটা, নরম সবুজ গোড়া, তার ওপর একটা দুটো পাতা। রঙ বেরঙের ছোপ ছোপ নকশা তার গায়। পাতাগুলো হাতখানেক উঠেই গোল হয়ে যায়। তারপর সাপের ফণার মতো মাথা বাঁকিয়ে পড়ে থাকে চুপচাপ। বেরিয়ে থাকে ছোট্ট চিকন জিব তার, সাপের জিবের মতোই! পোকা মাকড় তার খোড়লে ঢোকে খাবারের আশায়। ঢুকেই আটকে পড়ে ভেতরগায়ের আঠালো হুলে। এতই হালকা পাতা, সেসব পোকা বাইরে থেকেও দেখা যায়। পাড়ার কেউ যখনই বলত দুর্বল লাগছে, মা তখনই এই পাতা তুলে এনে বেটে খাওয়াত। আগের বনে পাওয়া যেত না এ গাছ, বহু ঘুরে মা চারা নিয়ে এসেছিল একটা। সেটাও বাঁচেনি। আর এখানে দেখো, শেষ নেই যেন এর। আহা, আজই যদি এখানে এসে পড়ে মা, কত যে খুশি হবে!

বেশি করে কটা সাপগাছের পাতা তুলে নিলো হু। মিতির তো লাগবেই, লাগবে ওটা হু’রও। তুলতে তুলতেই মনে হলো একটা চারা নিয়ে গেলে ভালো। বাগানে লাগিয়ে দেবে, যার যখন লাগবে খেতে পারবে। থাক, ফিরে যাওয়ার সময় নিলেই হবে। ভেবে এগিয়ে গেল ও। কিছুদূরেই সাগো গাছের বাগান। ঘরে খাবার নেই, একটু শাস তুলে নিয়ে যাবে ভেবেই এগুলো সে। কিন্তু তুলতে তুলতেই মনে পড়ল আফার কথা। ওরা কি সাগো গাছের কথা আলোচনা করছিল না? হ্যাঁ, মুমু পছন্দ করত, হু জানে। তা পাড়ার সকলের জন্য যে পরিমাণ লাগবে, অত সাগো হু নিয়ে যাবে কী করে একা? বিপদেই পড়া গেল তো! বহু ভেবে সে হলুদ গাছের পাতার মতো বড় বড় পাতা ছিঁড়ল কিছু। আর ছিঁড়ল লতা।

ফেরার পথে সে পা বাড়ালো যখন, পিঠে তার পাতায় মোড়া সাগোর শাস, আর সেই শাসপুষ্ট কমলা শুয়োপোকা।

এবার দরকার কিছু ফার্ন পাতা। সারা বনেই তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হাতখানেক লম্বা ডাঁটার দু’পাশে আঙুলের মতো লম্বা চিকন পাতা। প্রান্তে তাদের ছোট ছোট খাঁজকাটা নকশা। প্রথম দেখে বেশ অবাক হয়েছিল হু। অবাক হয়েছিল মাকে এই পাতা ছিঁড়তে দেখে। কী করবে মা এসব? মায়ের যা স্বভাব, উত্তর না দিয়ে হাসতে হাসতে একটা পাতা দিলো ওকে। ‘চিবাও।’ তা চিবিয়ে দেখে, যেমন ভেবেছিল তেমনই, ঘাস ঘাস স্বাদ। থু থু করে ফেলল যখন তা, দেখল নাল নাল হয়ে আছে থুতু। আজও একটা পাতা চিবিয়ে ও আঠালো থুতু ফেলল সেদিনের মতো। তারপর তুলে নিলো যতগুলো দরকার মনে হলো ততগুলো।

আসার সময় ঝরনায় নেমে ধুয়ে নিলো গায়ের কাদামাটি। ঘাসের টানে কেটে কেটে গেছে, জ্বলতে লাগল।
সূর্যও জ্বলছে খুব। আসার সময় সে ছিল পেছনে, হু’র ছায়া পড়ছিল সামনে। এতক্ষণে ঘুরে গেছে রোদের মুখ, ফেরার সময়েও তাই ছায়া পড়ল সামনেই। তবে আগের চেয়ে লম্বা এখনকার ছায়াটা। লম্বা ছায়ার পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে ও যখন পৌঁছল পাড়ায়, আফারা তখন শিকারভাগে ব্যস্ত। সাগোর শাসগুলো ও সেখানেই দেবে, নাকি আগে ঘরে যাবে ঠিক করতে পারল না হু। দোনোমনা হয়ে শেষে আফার পাশেই রাখল বড় বড় পাতায় মোড়ানো শাস, শুয়োপোকা, আর ফার্নপাতা। ফেলতেই আবার সেই চমকে তাকানো সবার। আফাও তাকালো গোল গোল বড় চোখ মেলে। হু ভেবেছিল ওরা নেবে না ওর আনা খাবার। কিন্তু ও যখন একটা মোড়া নিয়ে সরে আসছে ঘরের দিকে, পেছন থেকে শুনল, ‘ঠিকই ভেবেছি। হু-ই জানত হদিস।’ তবে হু পাত্তা দিলো না। সোজা ঘরে এসে সাজিয়ে রাখল সাপগাছের পাতা, সাগো শাস আর যা যা তুলে এনেছে। তারপর গেল গা ধুতে। ফিরে এসে সাপগাছের পাতা বাটল পাথরে পাথরে। একটা নারকোলের মালায় মিতির জন্য অর্ধেক রেখে বাকি অর্ধেক গিলে নিলো নিজেই। তারপর গেল বাগানে। বড় দেখে একটা কলাপাতা ছিঁড়ে বসে গেল রান্নায়।

প্রথমেই আগুন। শুকনো কাঠের আগুন যখন গনগন করছে, তখন তাতে গোল গোল ক’টা পাথর দিলো ফেলে। তারপর তাদের পুড়তে সময় দিয়ে সে বিছিয়ে নিলো কলাপাতা। তারপর পুরু করে ছড়িয়ে দিলো হলুদে সাগোশাস। তার ভেতর ছড়িয়ে দিলো শুয়োপোকা আর ফার্ন। দিলো কিছু পিঁয়াজ আর রসুনের কোয়াও। তারওপর আরেকটা কলাপাতা ফেলে আরেক পরত বিছিয়ে দিলো সব। এবার দুটো কাঠে ধরে তুলে আনল আগুনে পুড়তে পাথর। সেগুলোকে সাজিয়ে দিলো কলাপাতার ওপর। চারপাশ থেকে বাড়তি কলাপাতা মুড়িয়ে নিয়ে বেঁধে দিলো পাথরসহ। ছোট একটা পুঁটলি মতো দেখাচ্ছে সেটাকে এখন। আগুন নিভিয়ে নিলো। গনগনে কয়লাগুলো হা হয়ে আছে আগুনের গর্তে। তার মাঝেই পুঁটলিটাকে এবার বসিয়ে দিলো হু। পুঁটলিটার ভেতরে গরম পাথর আর বাইরে ওই পোড়া কাঠের গরম। কিছুক্ষণ পর একটু উল্টে দিলো পুঁটলাটা সে। তারপর যখন হয়ে গেছে মনে হলো, দুটো লাঠি দিয়ে চেপে ধরে সেটাকে বাইরে নিয়ে এলো হু।

পাতার বাঁধন খুলতেই ভুস করে বেরিয়ে এলো মাটি মাটি মিষ্টি একটা গন্ধ। আহা কতদিন পর! ভাপ উড়ছে, গন্ধ ঘুরছে। কলাপাতার ভেতর আঠালো রঙিন একটা লালচে কমলা আস্তর জমে আছে যেন। দাঁতে কেটে খেতে খেতে আহা উহু করতে লাগল হু।

ওদিকে হৈ হৈ করছে তুবা মোমো আর অন্য বাচ্চারা। দেরি আর সহ্য হচ্ছে না তাদের।

সাগো পোড়ানো শেষ হতেই তা কাটতে লাগল আভা। কলাপাতাসহ ছোট ছোট টুকরোয় ভাগ হয়ে গেল পুটলিটা। এক একটা টুকরো নিয়ে আফা তুলে দিলো বাচ্চাদের হাতে। যে যারটা নিয়ে বাইরের মোড়ানো কলাপাতা সরিয়ে ঢুকতে লাগল ভেতরে। গরম বলে একহাতে রাখা যায় না, হাত বদল করতে করতে ফুঁ দিতে দিতে পাতা উল্টে দেখল তারা। হলদরঙের শাস বেশ একটু লালচে আকার নিয়েছে, আগের মতো তা গুঁড়োগুঁড়োও নেই আর। ফার্নপাতার আঠা তাদের করে তুলেছে আঠালো।

গরম বলে খেতে পারছে না বাচ্চারা। আফা বলল, ‘খেয়ে নাও। ঠান্ডা স্বাদ না। গরমই খাও।’ এ-হাত ও-হাত করতে করতে বড়রাই খাইয়ে দিতে লাগলো ছোটদের। মুখের মধ্যে গরম খাবার নিয়ে হা করে তাপ বের করে দেওয়া আর সুযোগ বুঝে একটু একটু চিবুনো। চলতে লাগলো খাওয়া। একটা টুকরো আফা হু’র কাছেও পাঠালো। তা নিজের পোড়ানো সাগো খেয়ে কেবলই উঠেছে হু। তাছাড়া আফার পাঠানো টুকরোটা দেখেই বুঝল ওতে পিঁয়াজ রসুন নেই। পানসে পানসে লাগবে, তাই রাখলো না ও। বলল, ‘আমার আছে। তোমরা খাও।’

শুনে আফা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আবার। তার মনে আছে, এই খাওয়াও ওদের হু’র মা-ই শিখিয়েছিল। শিকার জুটত না যখন, না খেয়ে থাকার উপক্রম, তখন প্রায়ই এটা বানাত সে। আফার খুব একটা ভালো লাগত না। তবে হু আর মুমুর প্রিয় হয়ে উঠেছিল খুব। কিছু একটা হলেই ওরা সাগো খেতে চাইতো। হু যে কোথায় পেল এর হদিস, জিজ্ঞেস করতে হবে। তবে খাবারটাই নিলো না যখন, তখন কি আর ঠিকানা বলবে মেয়েটা?

খাওয়ার সময় চোখমুখ এমন বাঁকাচ্ছে মোমো, বোঝাই যাচ্ছে খুব একটা পছন্দ হয়নি। তবে খুব মজা করে খাচ্ছে তুবা। খাচ্ছে আর বলছে ‘প্রতিদিন চাই। প্রতিদিন চাই। খুব মজা।’ মোমো বলল, ‘জানিস, মরাগাছের শাস।’ শুনে তো বিশ্বাসই হলো না তুবার। আফা মাথা নাড়ার পরও মনে হলো নিশ্চিত না সে। অনিশ্চিত হয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘মরাগাছ খাচ্ছি কেন?’

ছেলেটাকে নিয়ে আর পারা যায় না। কথায় কথায় প্রশ্ন তার। সাগো বোঝাই মুখ নাড়াতে নাড়াতে চোখ গরম করে শাসালো ওর মা। তবে রাগল না আফা। হাসতে হাসতে বলল, ‘মানুষ মরেছে। তাই মরা গাছ খাই।’

মানুষ মরে কেন?
মানুষ অন্যদের মারে। তাই মানুষও মরে।
রাণীমা তো মারত না। তাও মরল কেন?

শুয়ে পড়লেও কান খাড়া আছে হু’র। ভাবল এবার বকা খাবে তুবা। কথায় কথায় এত প্রশ্ন পছন্দ না আফার। তবে মুমুর জন্যই কি না, মনটা হয়তো নরম হয়ে আছে। বলল, রাণীমা মরেছে অন্য কারণে।

কী সেই কারণ? বলতে গেলে আফাকে টেনে আনতে হলো সেই গল্প, যেটা তার দাদার কাছে শোনা। দাদা নাকি শুনেছিল তারও দাদার কাছ থেকে। ছায়া ছায়া অন্ধকার চারপাশে। পাড়ার মুখে আগুনের চুল্লি। চারপাশে বসে আছে সবাই। কেউ খাচ্ছে, কেউ ভুলে গেছে খেতে। নিজের জন্য রাখা পাথরের উঁচু আসনে বসে আফা বলে চলল গল্পটা।

অনেক কাল আগের কথা। শিকারের মাংস থেকে সর্দার দেবগাছের জন্য আলাদা করে রেখে দিয়েছে একটা কলিজা। তা খিদেয় হোক, বা লোভে লোভে, পোয়াতি এক মেয়ে তা খেয়ে নিয়েছে চুরি করে। খেয়েছে ভালো কথা, সর্দারের সামনে তা আবার স্বীকারও করেছে সে। ফলে তাকে শাস্তি দিয়েছে তাদের সর্দার। দেবগাছের সামনের একটা গাছে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হবে তাকে। স্বীকার করেছে বলে কম, মাত্র দুদিন থাকবে এমন। এই সময়ে তার সব খাওয়া দাওয়া বন্ধ।

এই জায়গায় এসে প্রশ্ন করল তুবা, ‘একটু কলিজার জন্য? এত বড় শাস্তি?’ সর্দার হেসে বলল, ‘খেয়েছে কি যা-তা? দেবগাছের মাথা।’ শুনেই হৈহৈ করে উঠল শ্রোতারা। সত্যিই তো, দেবগাছের জন্য রাখা খাবার চুরি করে খেলে তার শাস্তি তো হবেই।

তারপর শুরু করল নিত্য ভাগের কাজ। দুটো সাপ, ক’টা ছোট বড় ব্যাঙ, আর একটা বেজি- ছোট গুলোকে দিয়ে দেওয়া হলো যারা যেটা শিকার করেছে তাদেরকেই। মাছ আর নাড়িভূড়ির সঙ্গে ফলমূলও গেল মেয়েদের হাতে। তারপর এলো হরিণের পালা।

তা দুদিন অমন টানা ঝুলে থাকলে তো তার মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু দুদিন পর তাকে নামানোর পর দেখা গেল, দিব্যি সে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। ঘটনা কী? এমন তো হওয়ার কথা না। খোঁজ খবর করতেই দেখা গেল, মেয়েটার কষ্ট দেখে মায়া হয়েছে পাড়ার মেয়েদের। পালা করে গিয়ে গিয়ে তারা মেয়েটাকে মাঝে মাঝে সোজা করে ধরে রেখেছে। খাইয়ে দিয়েছে। ‘ব্যাপারটা ভাবো! দেবগাছের খাবার চুরি। তার শাস্তির বরখেলাপ!’ দেবগাছ কি তা মেনে নেবে? সে নালিশ করেছে দেবচাঁদের কাছে। সেই থেকে মেয়েদের গায়ে লেগে আছে দেবচাঁদের অভিশাপ। সেই অভিশাপের জন্যই তো মারা গেল মুমু।’ শুনে আবার গুঞ্জন করে উঠল শ্রোতার দল। কী বলে সর্দার! ‘হ্যা, সেই কারণেই। পোয়াতিকালে এত ভোগান্তি।’ তার আগে নাকি টেরই পাওয়া যেত না কবে কে পোয়াতি হলো, কবে কার বাচ্চা হলো, আর তখন থেকে কাঁইকুঁই শুরু। আবার বাচ্চার সংখ্যাও কম, আগে দুইটা তিনটা করে হতো একেক বারে। ওই ঘটনার পর থেকে একটা হলেই খবর। শুধু কি তাই? বাচ্চা বিয়োনোর সময় মারাও যেতে লাগল মেয়েরা প্রায়ই। যা দু একজন বেঁচে থাকত, তাদের কদর তখন খুব। দিনে দিনে তারাও মরতে শুরু করলেই হলো সমস্যা। তখন নাকি একবার বনমানুষদের উপর হামলা করে তাদের মেয়েদের এনেছিল ধরে। তারপর থেকেই বনমানুষদের শত্রুতার শুরু। আগে যারা ভাই ভাইয়ের মতো ছিল, তারাই এখন মানুষ দেখলেই মেরে কেটে মাংস খায়!

এরপর কি আর গল্প শোনা চলে? ভয়ে সিঁটিয়ে বাচ্চারা গিয়ে ঢুকলো গুহায়। বনমানুষের ভয় তাড়াতে তাড়াতাড়িই জ্বলে উঠল পাহারার আগুন।

৬.
কারো কাছে বনমোরগ, কারো কাছে সাপ। মাছ আর ব্যাঙ ধরেছে কেউ। রাবার দল নিয়ে এসেছে দুটো খরগোশ। খরগোশের মাংস এদের পছন্দ খুব। ফলে বেশ একটা গর্ব নিয়েই সে করে-আসা-শিকারের গল্প করছিল। পারার দলের শিকারের দিকে চোখ পড়তেই অবশ্য বন্ধ হয়ে গেল তা। সর্দারের আসনের সামনেই পড়ে আছে বড় একটা হরিণ। শিকারের মধ্যে সেরা হলো বাইসন। কিন্তু তা তো কখনো মারতে পারেনি এরা। এদের শিকার বড়জোর শুয়োর ভেড়া সজারু। পাকেচক্রে হরিণ জুটলে তাই উৎসব লেগে যায়। ফলে খরগোশ মেরেও যে দাম পাবে না রাবা, তা সে বুঝল ভালোই। তারচেয়েও বড় কথা- হরিণটা মেরেছে পারা। তাই ফুলে থাকা হরিণের পেটটা ছিদ্র করে দিলে যেমন চুপসে যাবে, তেমন করেই যেন দমে গেল রাবাও। মুখটা তার কঠিন হয়ে গেল, দাঁতে দাঁত চাপা। নাহ! এই চেংড়াটার সাথে পারা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। হতাশ রাবা বসে পড়ল টুপ। যে রোদটাকে খুব মিষ্টি লাগছিল কিছুক্ষণ আগে, হঠাৎ সেটাই যেন তীব্র হয়ে উঠেছে। বিড়বিড় করে গালি দিল রাবা। সূর্যকে না পারাকে, তা যদিও বোঝা গেল না।

শিকারভাগের সময় বয়ে যাচ্ছে, সর্দারের দেখা নেই। এই হয়েছে ইদানীং, পড়ে পড়ে ঘুমায় শুধু। হাবা তাই ছোট্ট তুবাকে পাঠালো সর্দারকে স্মরণ করিয়ে দিতে। তবে তাকে গুহা পর্যন্ত যেতে হলো না। তার আগে নিজেই বেরিয়ে এলো সর্দার। ধীর পা, মুখটা পাথরের মতো কঠিন। রোদে পড়ে পড়ে শুকিয়ে যাওয়া মাংস টুকরোর মতো চোখ। শিকারের স্তূপের ওপর হরিণ দেখে সে-চোখে আলো ফুটল খানিক।

দু’হাতে তার মুমুর ব্যবহার্য জিনিসপত্র। দেখেই নড়েচড়ে বসল সবাই।
চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকল আফা। মাথা নিচু। তারপর যখন তুলল মুখ, চোখের কোণে চিকচিকিয়ে উঠল রোদ। তালুর উল্টোপাশের পশম দিয়ে তা মুছে নিলো সে। তারপর শুরু হলো কাজ। বহু আগে পাওয়া এক বাইসনের পায়ের হাঁড় ছিল দুটো, এটাসেটা গুঁড়ো করতে ব্যবহার করত মুমু। সে-দু’টোর একটা গেল হারার বউ মিতির কাছে। আর একটা ঘরেই থাকল, মুমুর বোন মোমোর কাজে লাগবে। পুরোনো চামড়ার জামাটা পেল ফাফার বউ সিসি। আর পাথরের ধারালো অস্ত্রটা, যেটা দিয়ে চামড়া কাটত মুমু, সেটা কাকে দেবে? উৎসুক তাকিয়ে আছে সবাই। আফার চোখ অনুসরণ করে তারা হু-কে পেল।

ঘরের বেড়া ঠিক করতে করতেই হু দেখেছিল বাগানের বেড়াটাও নড়বড়। আরও কিছু ডাল পুঁতে সেটা তাই মজবুত করার চেষ্টা করছে সে। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আফা বলল, ‘একা একা থাকে। একা একা ঘোরে। অস্ত্র তেমন নেই। বিপদে কী করবে? এটা ও নিক।’ ডাকলে হয়তো আসবে না, সিসির হাতে দিয়েই তাই সেটা পাঠিয়ে দিলো। তারপর আরও কিছু খুটিনাটি ভাগ বাটোয়ারা। তবে মুমুর সবচেয়ে দামি যে সম্পত্তি, ভেড়ার চামড়ার জামাটা, সবাই যেটার মালিকানা পেতে মুখিয়ে আছে, সেটা কাউকে দিলো না আফা। ‘এটা থাক। নতুন রাণীমা পাবে।’ বলার সময় হালকা একটু হাসিই যেন ভেসে উঠলো ঠোঁটে তার। সিসির হাত থেকে তার পাঠানো উপহার নিচ্ছে কি না দেখার ছলে চোখদুটোও খানিক স্থির থাকল হু’র দিকে।

ভাগাভাগি শেষ করে আবার নীরবতা। অবসন্ন বসে আছে সর্দার। যেন কাজ নেই, যেন খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে। রাবা তাই তাড়া লাগালো। স্বরে কিছুটা বিরক্তি তার। আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে তাকে থামালো আফা। তারপর শুরু করল নিত্য ভাগের কাজ। দুটো সাপ, ক’টা ছোট বড় ব্যাঙ, আর একটা বেজি- ছোট গুলোকে দিয়ে দেওয়া হলো যারা যেটা শিকার করেছে তাদেরকেই। মাছ আর নাড়িভূড়ির সঙ্গে ফলমূলও গেল মেয়েদের হাতে। তারপর এলো হরিণের পালা।

ছাল ছাড়ানো ছিল আগেই, সেটা পারার ভাগে দিয়ে দিলো আফা। দিতেই সবাই তাকিয়ে পড়ল সর্দারের দিকে। কারও কারও চকিত চোখ দেখে নিচ্ছে পারাকেও। পারা নিজেও কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। মোমো পর্যন্ত হা হয়ে তাকিয়ে আছে। পারাকে যে বেশ পছন্দ করে সর্দার, তা তার কথাবার্তা দেখলেই বোঝা যায়। সুযোগ পেলে ছেলেটার পক্ষও নেয় আফা। কিন্তু এত সাধের হরিণচামড়াটা তাকে দিয়ে দেওয়া কি বেশি হয়ে গেল না? চোখে প্রশ্ন ও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিল রাবা। তা শুধু তাকিয়ে থাকার মানুষ তো সে না। বলল, ‘এমন তো হয় না। নিয়ম ভাঙছো কেন?’ ভেতরের ক্ষোভই যেন তেজ নিয়ে ঝরে পড়ল কণ্ঠে। তার দলের নেতা আভাও যোগ দিলো এবার। কথা বলে উঠল দলের অন্যরাও।

হরিণ বা ভেড়ার চামড়া সাধারণত জমিয়ে রাখার নিয়ম। পাড়ার মেয়েদের কাজ হলো সেটা শুকিয়ে টুকিয়ে ব্যবহারের উপযুক্ত করে রাখা। রাণীমার তত্তাবধানে সর্দারের জিম্মায়ই থাকে তা। সর্দারই তারপর প্রয়োজনমতো একেকজনকে দিয়ে দেয় সেটা। আজকের শিকারের চামড়া তাহলে পারা কেন পাবে?

তার বানানো নিয়মই তাকে শোনাচ্ছে সবাই, শুনতে শুনতে হেসে ফেলল আফা। বলল, ‘নিয়ম বদলাবো। যে-দল শিকার করবে। সে-দল চামড়া পাবে।’
হারা জিজ্ঞেস করল, ‘একটা চামড়া এক দল?’

এক দল মানে তো আর এক দল না, দলের নেতাই পাবে, সে তার ইচ্ছে মতো যাকে খুশি তাকে দেবে। ব্যাপারটা খুব মনঃপুত হলো না মনে হয় কারো। এমন হলে হৈহৈ করা নিয়ম, তেমন উৎসাহও দেখা গেল না। পারা পর্যন্ত চুপচাপ বসেই থাকল চামড়াটা হাতে নিয়ে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যে নিয়ম ভুলে গেছে যেন। ছোট করে একটু হাসবে যে, তাও না। খেয়াল করলেও কিছু বলল না সর্দার। মাংস ভাগ করছিল হাবা, সেদিকেই নজর দিলো সে।

মাংস কেটে কেটে দুটো সমান স্তূপে জড়ো করা হয়েছে। একভাগ ভাগ হয়ে যাবে দেবগাছ, সর্দার, আর জমানো মাংসের খাতে। অন্যভাগ থেকে সবাই পাবে সমান সমান। মেয়েরা পাবে নাড়িভুড়ি হাঁড়গোড় আর লোকেদের ভাগের অংশ থেকে যা বাঁচে তাই।

খাওয়ার আগে দেবগাছের মাংস দিয়ে আসতে হবে। জারা আর তুবাকে পাঠালো সেদিকে। পারার দল থেকে দু’জন আর রাবার দল থেকে দু’জন গেল সঙ্গে। ওরাও একটু ঘুরবে, আর টহল দিয়ে আসবে। তারপরই শুরু হবে ভোজনপর্ব।

গুহার ভেতরে খেতে বসবে মেয়েরা সবাই, ছেলেরা বাইরে। সেখানে দুই জায়গায় আগুন। একটাকে ঘিরে বসবে সর্দার আর দিনের সেরা শিকারীর দল। তাদের সামনে থাকবে সবচেয়ে স্বাদের মাংস। কলিজা, মগজ, আর পাঁজর।

শিকারদিনের এটাই সবচেয়ে সম্মানের মুহূর্ত। খাওয়ার সময় সর্দার ভুলে যায় সে সর্দার। নিজে হাতে মাংস তুলে দেয় সেরা শিকারিকে। হাসি ঠাট্টা করে। এমন এমন গোপনীয় বিষয় বলে যা অন্য সময় কোনোভাবেই জানতে পারে না কেউ। ফলে সময়টা ভীষণ দরকারীও। পরবর্তী শিকারদিনের আগপর্যন্ত এই বিশেষ মর্যাদা ভোগ করতে থাকে শিকারীরা। এর মধ্যে কিছু ঘটলে তাদেরকেই ডাকা হয় প্রথমে। কে না চায় নেতার পাশে থেকে কাজ করতে? হরিণ শিকারের সূত্রে আজ সে সুযোগ পাচ্ছে পারা জারা তাবা আর তাতা। তারা ছাড়া অন্যরা বসবে একটু দূরে, অন্য আগুনের সামনে।

তবে সেই আগুন আর জ্বালাতে দিলো না আফা। সবাইকে ডেকে তার আগুনের পাশেই বসালো সে। বলল, শুধু ভালো শিকারী না, সবাই মিলেই একসঙ্গে খাবে আজ। কিছুক্ষণ আগের মন খারাপ ভুলে সবাই উল্লাস করে উঠল এবার।

তবে রাবার মুখ এখনও ভার। কিছুক্ষণ বসে থেকে ‘এখন খাবো না’ বলে উঠে গেল। যাওয়ার সময় তার বসার পাথরে মেরে গেল এক লাথি।

পাথরে না, লাথিটা যেন লাগল আফার মুখে।

(চলবে)

 

Share Now শেয়ার করুন