আশান উজ জামান | স্বরূপকথা | ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ১)

0
274

আদি মানবগোষ্ঠী হোমো নিয়ান্ডারথাল আর প্রথম দিকের হোমো সেপিয়ানদের নিয়ে লেখা উপন্যাস

পরদিন সারা জঙ্গল ঘুরেও কিছু মাছ ব্যাঙ আর সাপ ছাড়া কোনো শিকারই জোটেনি। পারার দলও সেদিন ফিরে এলো খালি হাতে প্রায়। কিছুই মিলল না তার পরের দিনও। প্রতিদিন শিকারে যায় আর কলার থোড় বাঁশের মোথা শিকড় বাকড় নিয়ে ফিরে আসে। পুড়িয়ে নিয়ে তা মুখে ধরে যখন, গলা দিয়ে নামে না। একদিন দু’দিন তবু তাতে পেট চলে বটে, কিন্তু কতদিন?

চোখা দেখে একটা পাথর খুঁজে নিল জারা। হাতের ভেতর প্রাণপণ মুচড়াতে থাকা সাপের গলাটা চেপে ধরল তার উপর। একহাত তার চেপে ধরেছে সাপটার মুখ, আরহাত গলার নিচে। মাঝখানে পাথর। ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে পারা। হাতে তার লম্বা মতো চোখা একটা পাথর। পাথরের কালচে গায়ে-মুখে শুকনো রক্তের কালচে দাগ। ধারালো সেই দিকটা নিরিখ করে সে আঘাত করলো ঠিকঠিক। গলা থেকে আলাদা হয়ে গেল সাপটার মাথা। যেতেই সেটার শুরু হলো লাফ। লাফাতে থাকা মাথাটা পা দিয়ে চেপে ধরল তাতা। চওড়ামতো একটা পাথর তার হাতে। পা সরিয়ে মাথাটা সেই পাথরে চাপা দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। ওদিকে সাপের লেজটা উঁচু করে কাটাগলা নিচের দিকে ঝুলিয়ে রেখেছে জারা। সাপটা মুচড়ামুচড়ি করল আরো কিছুক্ষণ। আর প্রতিটা মোচড়ের সাক্ষী হতেই যেন এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে পড়ল রক্ত। তারপর তার স্থির হয়ে যাওয়ারও প্রমাণ রেখে গেল একই জায়গায় টানা পড়তে থাকা ফোঁটা ফোঁটা রক্তের জমাটি।

তার ভেতরে ঝিকমিকিয়ে উঠলো আলো। সজীব সবুজ ডাল-পাতার ফাঁক দিয়ে গলে পড়ছে কচি সূর্যের কাঁচা কাঁচা রোদ। কোথাও তা হুমড়ি খাচ্ছে ছড়িয়ে থাকা চোখা-ভোঁতা পাথরে। কোথাও আবার লুকিয়ে পড়ছে পচা পাতা গিলতে থাকা কাদা মাটির নরম বুকে, কোথাও ঢুকছে শুকনো পাতার আস্তরে। রোদভেজা সেই পাতা ও পাথরে মচমচ পচপচ শব্দ তুলে এগিয়ে চলেছে শিকারযাত্রা। সঙ্গে চলছে ঝরণানদীর ধারা। চলমান তার কিলবিল পানিতেও মিশছে খুশির রোদ, নদী তাই ঝিলমিল ঝিলমিল। পাড়া থেকে বেরিয়ে বহুক্ষণ হাঁটল সে এদের সঙ্গে। কালোটিলা পার হতেই যেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে দেবগাছ, খানিক বাঁক নিয়ে সেখান থেকেই সোজা বাঁয়ে চলে গেল নদী। তারও বাঁয়ে যে-পথ কোনাকুনি চলে গেছে তেজপাতা গাছের দিকে, বনের ভেতর দিয়ে সে-পথ ধরল শিকারীরা।

পথটা ওদের নিয়ে যাবে সোজা লালপাথরের এক টিলার কাছে। সেটা পেরুলেই মস্ত মাঠ ওপাশে। কাঁটাঝোপে ভরা বিশাল সেই মাঠ ওই টিলা এই জঙ্গল আর নদী-গাছপালাই শিকারের ক্ষেত।

শিকারীদের হাতে হাতে মাথা ছুঁই ছুঁই লাঠি। লাঠিগুলোর একমুখ চোখা, অন্যমুখ ভোঁতা- দুই মুখই কালো। খালি পা তাদের, কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত একঢালা চামড়া। ওপরের দিকটা খালি। গলায় কারো লতায় গাঁথা বীজের মালা, কারো মালায় পাথর। জারার গলা পেঁচিয়ে থাকা দাঁতের মালার পাশ দিয়ে শুয়ে আছে সদ্য পাওয়া সাপ। পাশেই তাতা, খক খক করে কাশছে। কাশির দমক একটু থামতেই তাকে বলল, ‘আজকের দিনটা ভালো। সাপ মেরে শুরু। ভালো শিকার হবে।’
‘কী জানি ‘ বলল জারা, ‘সেদিন তো হলো না।’

‘সে তো রাবার জন্য’ ঘড়ঘড় গলা খানিক পরিষ্কার করে নিয়ে বলল তাতা, ‘ওরা এসে পড়ল। ভয়ে পালালো ভালুকটা। তাই না, পারা?’

হাতে পেয়েও ভালুকটা ওভাবে হারানোর কষ্ট পারার যায়নি আজও। গত রাতের আসরেও এ ব্যাপারে আপসোস করেছে। এখনও বোধহয় সে-কষ্টেই আছে। শুধু একটু ‘হুম’ করল সে।

বন পেরিয়ে কাঁটাঝোপের চত্বর। দূরে একপাল হরিণ। দেখেই ওরা এগিয়ে গেল যতটা কাছে যাওয়া যায়। সুবিধামতো একটা জায়গা বেছে নিলো। তারপর মাঝখানে পারাকে রেখে ছড়িয়ে পড়ল গোলাকার। সবাই ঠিকঠাক আছে জেনে পারা গোল করল মুখ, টিপে ধরল নাক, তারপর ডাকতে থাকল অদ্ভুত এক ডাক, হরিণের বাচ্চারা বিপদে পড়লে যেমন ডাকে। ডাকটা শুনে ছুটে আসবে মা হরিণ। অমনি নিজেদের গুটিয়ে আনবে শিকারীরা। তারপর কাছে আসতেই ছুটে যাবে বর্শা। বুদ্ধিটা আফার কাছে শেখা। ডাকটাও। তবে ডাকতে ডাকতে ব্যথা হয়ে গেল মুখ পারার, হরিণ এলো না। তবে কি সে ডাকতে পারেনি ঠিকমতো?

তা ঠিকমতো ডাকতে না পারলে কি আসে কেউ? বনের উল্টোপাশেই যেমন একটা খরগোশ ধরেছে আফা। ধরেই সেটা সে এগিয়ে দিয়েছে রাবার হাতে। ‘কামড় দে।’ বলে ইশারা করেছে সঙ্গীদের। অমনি তারা ছড়িয়ে পড়েছে। বর্শা লুকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে গাছ আর ঝোপের আড়ালে। রাবা তারপর কামড় দিয়েছে বাচ্চাটার কানে। দিয়েছে এমন, কান্না তো দূরের কথা, কোনো আওয়াজই করেনি বাচ্চাটা। পরের কামড় আবার তীব্র এত, বেচারার চিরে গেছে গলা। এমন হলে হয়! হাতের বর্শা মাটিতে ফেলে তখন এগিয়ে এসেছে আফা। ‘এই কাজটাও শেখেনি’ বিড়বিড়ানো কণ্ঠ তার, ‘আবার বড় শিকারি!’ এই রাবার ভুলেই কদিন আগে সে দাঁত হারিয়েছে দুটো। যে সে দাঁত না, একেবারে সর্দার আর রাণীমা দাঁত যারা সবার আগে আসে আর আগলে রাখে অন্যদাঁতগুলোকে। তাদের জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে বলেই দাঁতচাপা কথার সাথে থুতুও বেরিয়ে এলো খানিক। সেদিকে ভ্রুক্ষেপমাত্র না করেই রাবার হাত থেকে সে কেড়ে নিলো খরগোশটা। একহাতে আলতো করে তাকে চেপে ধরল বুকের সাথে। অন্যহাতে টানটান ধরে রাখা কানে জায়গামতো বসিয়ে রাখল নিপুণ মাপের কামড়। প্রয়োজনমতো তাতে চাপ বাড়াল কমাল, আর করুণ আর্তনাদে জঙ্গল মাতিয়ে তুলল খরগোশটা।

খালিহাতে ফিরে আসছে পারারা। খিদে চড়ে গেছে মাথায়, তবে পা উঠছে না শিকার না পাওয়ার শোকে। আজও তেমন জুটল না কিছু। খাবে কী পাড়ার সবাই? ভাবতে ভাবতে কাঁটাঝোপের বন ছাড়িয়ে এলো ওরা। তারপর ঝোপজংলার বনে ঢুকতেই দেখে ছোট ছোট গোল গোল লাদি। সামান্য দূরে আরো কয়েক জায়গায় সেটা দেখেই ঠোঁটে আঙুল রাখল জারা। কান খাড়া করে অন্যরাও বুঝতে চেষ্টা করল ব্যাপার। হালকা কিটিকিটি শব্দ আসছে সামনের জঙ্গলের মধ্য থেকে। শুনেই যেন চাঙা হয়ে উঠল ওরা। সবার মনোযোগ মাটিতে, শব্দের উৎস খুঁজতে হবে। পায়ের নিচে পাতা পড়ে যতটা হচ্ছে তার বেশি শব্দ ওরা করবে না এখন। ধীর পায়ে এগুচ্ছে সবাই, হাতে সজাগ বর্শা, অন্যহাত সরিয়ে দিচ্ছে সামনে আসা লতাপাতা। কিছুক্ষণ এভাবে চলেই উঁচু একটা ঢিবির গায়ে গর্ত দেখে দাঁড়ালো পারা। মুখে উজ্জ্বল হাসি তার, চোখে ক্ষিপ্র ইশারা। তা দেখেই দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল অন্যরা।

এ-গাছ ও-গাছ থেকে লাফিয়ে পড়া লতাপাতা আর ছড়িয়ে থাকা পাথর এড়িয়ে তারা খুঁজতে লাগল অমনই গর্ত আরও। একে একে তিন চার মানুষ দূরত্বে দেখা মিলল তাদের। যেতেই যে যার মতো শুরু করল কাজ। পাশেই একটা মরা গাছ, গা ভর্তি তার গোল গোল কালো কালো লেগে আছে কী যেন। যা থাকে থাক, কটা ডাল ভেঙে জারা তার গর্তের মুখে পুঁতে দিলো। তাতা পুঁতল পাথর। যে-যেভাবে পারে বন্ধ করতে লাগল নিজ নিজ গর্তের মুখ। আর শুকনো পাতা ডালপালা কুড়িয়ে গর্তের মুখে জড়ো করল তাবা। পারাই শুধু দাঁড়িয়ে আছে তার গর্তের মুখে, হাতে সতর্ক বর্শা।

প্রত্যেকে এখন তাকিয়ে আছে তার দিকে। একে একে পারাও সবাইকে দেখে নিলো। প্রস্তুত মনে হতেই সে ছোট্ট করে মাথা নাড়ালো। তাবা তখন আগুন ধরিয়ে দিলো জড়ো করা শুকনো কাঠ পাতায়। তা কিছুটা ধরে উঠতেই আবার ভেজা পাতা কাঁচা কাঠ দিয়ে আগুন কমালো সে। ব্যাস, তারপর শুধু একটা কাজ বাকি- ধোঁয়া যত ওঠে, তত তাতে বাতাস করে করে গর্তের ভেতরে পাঠানো।

সারা রাত বনে বাঁদাড়ে ঘুরে ঘুরে সকালে এসে ঘরে ঢুকেছে সজারু সকল। এখন তাদের বিশ্রাম, এখন সংসার সন্ততি। অথচ সেই সময়েই গর্তের মুখে মুখে বিপদ দেখে অস্থির হয়ে পড়েছে সবাই। তবে ওরা জানে, বেরুতে গেলেই ধরা। তারচেয়ে বরং নিশ্চুপ নিঃশব্দ বসে থাকা ভালো। কিন্তু ধোঁয়া এসে তাদের অতীষ্ট করে তুলল যখন, দৌড়ে তখন পালাতেই হবে। তা পালাবে কোন দিক দিয়ে? গর্তগুলোর মুখ বন্ধ। ঘুরতে ঘুরতে ধোঁয়াভর্তি ঘরে দম আটকে আসছে। এখুনি বেরুতে না পারলে মরবে এখানেই। কিন্তু হতাশ হওয়ার আগেই খানিক আলো দেখল মা সজারু। পাহাড়ের দিকের গর্তের মুখটা ফাঁকা। দেখেই দৌড় দিলো ওরা।

এই দৌড়ের অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছে পারা। গর্তের ভেতর থেকে কিটিকিটি শব্দ যত এগিয়ে আসতে লাগল, তত সে তটস্থ হয়ে উঠল। আর সজারুটাকে দেখেই বসিয়ে দিলো নতুন বানানো চোখা বর্শা তার। মা সজারুর পিঠের খানিক লোম আর দুটো কাঁটা ছিঁড়ে নিয়ে সেটা বসে গেল মাটিতে। অবাক চোখে পারা দেখল সজারুটা পালাচ্ছে পায়ের ফাঁক দিয়ে। অমনি দুই পা এক করে সে আটকাতে গেল। ভীত সজারুর ফেঁপে ওঠা কাঁটায় পায়ের কয়েক জায়গা আঁচড়ে গেল শুধু, আটকানো গেল না তাকে। তা না যায় না যাক, ব্যর্থতা নিয়ে বসে থাকার সময় নেই। বর্শাটা তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল আবার। কিন্তু আর কোনো শিকার এলো না বেরিয়ে।

‘পারার বর্শা ফসকে গেল! এমন তো হয় না।’ বলতে বলতে এগিয়ে এলো তাবা।
‘যে জোরে ছুটেছে!’ বলল জারা, ‘ফসকে তো যেতেই পারে।’
‘শশশ!’ ঠোঁটের ওপর আঙুল এনে পারা থামিয়ে দিলো ওদের। ‘ভেতরে আছে আরও।’

আবার সবাই ফিরে গেল যে যার গর্তের মুখে। বর্শা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কিন্তু বহুক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও কোনো সাড়া না পেয়ে পারা বলল, ‘ঢোকো।’ তাতেই হলো কাজ। পারার গর্তের মুখে আধমরা পড়ে আছে একটা। লাঠি দিয়ে বের করে আনল পারা। জারার গর্তের মুখ খুলতেই বেরিয়ে পড়ল আর একটা। বর্শার ডগা মেরে সেটাকে সে গেঁথে ফেলল মাটিতে। ছাই আর আগুন সরিয়ে তাতা মুখ বাড়ালো তার গর্তের ভেতর। যতটা দেখা যায় দেখে জানাল, ‘আর নেই।’

না থাকারই কথা। একই জায়গায় তো বেশি থাকে না ওরা। একটা পালিয়েছে, দুটো ধরা পড়েছে। একটা বিশাল বড়, আরেকটা ছোট। তবে সবাই মিলে খাওয়ার জন্য এ-ই যথেষ্ট।

জন্তু দুটোর পা ধরে উল্টে রাখল জারা। পারা গিয়ে ছিদ্র করে দিলো গলা। গলগলিয়ে পড়া রক্ত তখন গাছের পাতায় ধরে নিলো তাতা। একে একে তারপর মুখ লাগালো সবাই। শুরুটা পারাই করল, যেহেতু শিকারের খোঁজ সে-ই পেয়েছে আগে। এক চুমুক দুই চমুক ঘন গরম রক্ত। তৃষ্ণা মেটানোর জন্য খেতো এরা আগে, এখন খায় অভ্যাসে। খেলে বেশ শক্তিও নাকি আসে।

শক্ত সমর্থ হয়েই করল ফেরার আয়োজন।

মড়াৎ মড়াৎ দুটো ডাল ভেঙে নিয়ে এলো জারা। একটা ডালে একটা সজারু বেঁধে নিলো লম্বালম্বি। তারপর হেইয়ো বলে কাঁধে তুলে নিলো সামনে পিছে দু’জন। বড় সজারুর সামনে তাতা, পেছনে জারা। অন্যটা নিয়েছে তাবা আর পারা। মাঝখানে উল্টো হয়ে ঝুলে আছে শিকার। গলা থেকে উল্টো হয়ে ঝুলে আছে তার মাথাও।

‘খুব খাওয়া হবে আজ!’ ডগমগ স্বর তাতার। কাঁধের লাঠিতে ঝুলে থাকা শিকারের দিকে চোখ। জারা বলল, ‘এত বড়! স্বাদ হবে খুব।’ তবে ছুটে যেটা গেছে, সেটা ধরা গেলে আরও ভালো হতো। অন্তত দুইসূর্য আর শিকারে আসতে হতো না। সেটা ভেবেই তো দীর্ঘ হচ্ছে তাতার শ্বাস। পারার চেয়ে ভালো নিশানা আর কার? দলের অধিকাংশ শিকারই তো ও করে। আজকে যে কী করে এমন হলো..

‘যেটা চলে গেল। ওইটাও কি বড়?’ ছোট সজারু বয়ে নিয়ে চলা তাবা জিজ্ঞেস করল পারাকে। উত্তর দিলো না পারা। যেন শুনতেই পায়নি। তাবা তাই আবার করল প্রশ্নটা। অন্যরাও চুপ করে আছে। উত্তর জানতে চায় যেন। কিন্তু সাড়া নেই পারার। তৃতীয়বার জিজ্ঞাসার উত্তরে সে আস্তে করে বলল, ‘হুম’। তারপর আবার চুপ। শিকার শেষে ফটফট করে কথা বলে যে, গল্পের আসরে ঝড় তোলে, সে কেন চুপ এমন? তা থাক, কিছু হয়তো ভাবছে। নিজেদের কথায়ই আবার ফিরে গেল শিকারীদল। কতদিন হলো এমন ভালো শিকার পায় না ওরা। দারুণ ভোজ হবে, সর্দার খুব খুশি হবে- বলতে লাগল তারা।

পারার কানে অবশ্য ঢুকছে না কিছুই। এমন দারুণ শিকারের পর তার আনন্দ করা উচিত। দলের অন্যদের সঙ্গে যোগ দেওয়া উচিৎ। কিন্তু কিছুতেই কিছু করতে পারছে না। কেমন যেন বিরক্ত সে নিজের ওপর। ‘ধুর! কেন গেলাম ওখানে?’ নিজেকেই প্রশ্ন করল সে। হু-কে দিয়ে বিশ্বাস নেই। একজনকেও যদি বলে দিয়ে থাকে ঘটনা সে, পারার সব শেষ। যত এগিয়ে আসতে লাগল পাড়া, তত পারার ফ্যাকাসে হয়ে উঠল মুখ। তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠল ফোট ফোট ভয় আর মিটিমিটি অস্বস্তি। এত মাংসের সংস্থান হলো, লাফাতে লাফাতে পাড়ায় ফেরার কথা ওর। অথচ ফিরল সে আজ পাথরচাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাসে মুখ নিয়ে।

ফিরতেই চোখ পড়ল হু’র দিকে। চোখে কেমন একটা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। বলে দিয়েছে নাকি সব? পাড়ার মেয়েদের মুখে মুখে চোখ রাখল সে। অস্বাভাবিক কিছু কি আছে? মনে হয় না, ব্যস্ত তারা নিজেদেরই কাজে। বাচ্চারাও তাকিয়ে নেই পারার দিকে। ‘মাংস খাবো’ ‘মাংস খাবো’ উল্লাস করতে করতে তারা এগিয়ে এসেছে পাড়ার মুখে। নিপুণহাতে জারা তখন ছাল ছাড়াচ্ছে বাচ্চা সজারুর। গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তা-ই দেখতে লাগল তারা। হাতের কাজ শেষ করে অন্যরাও এসে জুটল তাদের পাশে।

রাণীমা শুয়ে আছে ছোট গুহায়। কাতরাচ্ছে সে। আন্তরিক স্বরে তার কুশল জানতে চাইলো পারা। উঁচু পেটটা হাত দিয়ে ধরে পাশ ফিরতে ফিরতে কী যেন বলল রানীমা- বোঝা গেল না। কিছুক্ষণ তবু তার কাতরানো শুনল সে। তারপর চলে এলো বড় গুহার দিকে। ‘ব্যথা কমেছে?’ ‘মশামারা কাঠ শেষ, না?’ ‘চামড়া শুকায়নি এখনও?’- দরকারি অদরকারি কথা বলল এর ওর সাথে। একটু হাসলোও জোরে। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে যেন। তারপর এগিয়ে গেল ঝরনার দিকে।

আকাশ সমান উঁচু পাহাড়ের মাথা বেয়ে কল কল ঝরছে পানির নহর। কত যেন ব্যস্ত সে, তীব্রগতিতে ছুটে আসছে নিচে। যেতে হবে বহুদূরের নদীতে। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই অবশ্য গতি কমে তার, শান্ত স্বরে বয়ে যায় কলকল। ঠিক সেখানটায়, পথের বাঁয়ে হা হয়ে আছে বড়গুহাটা, ডানে পাহাড় আর পাথরের ঢিবি। দেখে মনে হবে ঝরণাঝরা পাহাড়টাই খানিক নিচু হয়ে এসেছে, দু’হাত দিয়ে ধরতে চায় নিজেরই ছড়িয়ে দেওয়া জলের ধারা। ডান হাতটা সোজা, নদীর ধারঘেঁষেই এগিয়েছে, সারা গায়ে পাথর। বাঁহাত বাঁকানো, পশমের মতো তাতে গাছ-গাছড়ার বাহার। বাঁকা হওয়ার কারণে বেশ খানিকটা জায়গা বেড় দিয়ে আছে এই হাত, জায়গাটুকু সমতলই বলা চলে। হাতটা শেষ হচ্ছে যেখানে, কবজির ওপর সেখানেই বড় গুহাটা। তারপরই আসা-যাওয়ার পথ, তারপরই নদী। পাহাড়টা যেন মুঠো করে আছে দু’হাত, মুঠো খুললেই সে টিপে ধরতে পারবে নদীটার গলা।

হাতমুখ ধুয়ে ফিরে আসছে পারা। আড়চোখে একটু দেখে নিলো বাঁয়ের দিকে। সেখানে লম্বা ঝাউগাছ। গাছটার গোড়ায় বেড়াঘেরা জায়গা খানিক। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হু, তাকিয়ে আছে পারারই দিকে। চোখে চোখ পড়তেই মনে হলো ধরা পড়ে গেল পারা। অস্বস্তি ঢাকতে একটু হাসলো সে। কিন্তু সেটা ফুটলো না তেমন। তারচেয়ে তার সরে যাওয়াই ভালো- পা চালিয়ে এগিয়ে গেল পাড়ার মুখে। চামড়া ছাড়ানো উদোম সজারুগুলোকে ঘিরে থাকা জটলা এড়িয়ে ঢুকে পড়ল গুহায়। শিকারভাগের আগে একটু ঘুমিয়ে নেবে।

২.

বেড়ার নিচ দিয়ে বাতাস ঢুকছে হু হু করে। দুটো চামড়া গায়ে জড়িয়েও ওম জমছে না। এপাশ ওপাশ করছে হু। হঠাৎ মনে হলো কেউ যেন আসছে এদিকে। এত রাতে এদিকে আসার কথা না তো কারোর। ঝরণার দিকে যাওয়ার আওয়াজ সে চেনে, কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। আর এটা যে এগিয়ে আসছে নাক বরাবর! মাথার কাছে থাকা অস্ত্রটা হাতে নিলো। কে হতে পারে? দ্রুত খেলে যাচ্ছে চিন্তা। ভালুক না তো? আগের বনে প্রায়ই ঢুকত তারা, কতজনকেই না টেনে নিয়ে গেছে! এখানেও কি এলো? গুহার মুখে আগুন জ্বলছে কিনা, বা তার কুকুরটা ডেকে উঠল না কেন, এসব ভাবনা ভাবার আগেই দেখল- ভালুক না সে, লোক।

পারাটা যে ওর প্রতি মগ্ন, তা তার চাহনী দেখেই বোঝা যায়। আগে যেমন পছন্দ করত হু, তেমন না করলেও এখন অপছন্দও করে না তাকে। ভালো শিকারী, দেখতে ভালো, বুদ্ধি আছে, অপছন্দ করার কিছু নেই। একসময় তারা মিশতোও খুব। তা সে তো বহু চাঁদের অতীত। কথা হয় না এখন, মেশা তো দূরের ব্যাপার। হুট করে তাহলে ঢুকে পড়ল কেন? নাকি বিপদ হলো কোনো? তা দেখল, বিপদটিপদ কিছু না, পাশে বসেই ওর বুকে হাত রাখল সে। অন্যহাত এগিয়ে যাচ্ছে কোমর থেকে নিচে। হতভম্ব হু তখন দিয়েছে একটা লাথি। ধাক্কা সামলাতে না পেরে পারা গিয়ে পড়েছে সামনের বেড়ায়। বেড়ার সঙ্গে সঙ্গে কঁকিয়ে উঠেছে পারাও। চেঁচিয়ে উঠেছে কুকুরটা তখন। তারপর আর কী, দে দৌড়। কে বলবে যে এই ছেলেই গোত্রের পরবর্তী সর্দার!

তখন বোধহয় মাঝরাত। উত্তেজনা কমে আসতেই ঠান্ডা বোধ হলো আবার। পরনে একটা ছেঁড়াখোঁড়া চামড়া; পা-মাথা আলগা, শীতে টেকা দায়। তার মধ্যে পারা এবার ভেঙে গেল বাঁ পাশের বেড়া। মেরামত করতে হবে, কিন্তু শরীরটা যে খারাপ। কী করা যায় কী করা যায় ভাবছে, আর রাতের ব্যাপারটা পাকাচ্ছে ভেতর ভেতর। সবাইকে ডেকে কি ও বলে দেবে না সব? রাতের আঁধার ওকে রেখে গেল এই ভাবনার ভেতর, দিনের আলো এসেও দেখে ডুবে আছে এতেই। বললে পারার ক্ষতি হবে। তাতে ওর কোনো লাভ নেই। আবার না বললেও কোনো ক্ষতি নেই। হুট করে হয়তো চলে এসেছে। তা হুট করেও বা আসবে কেন? ও না চাইলে ওর গায়ে হাত দেওয়ার সাহস কেউ করবে কেন? না, এর শাস্তি ওকে পেতেই হবে। সাঁই করে বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে, শিকারে যাওয়ার আগেই বলে দেবে। কিন্তু ততক্ষণে সবাই রওনা করেছে।

অনেকগুলো বাঁশ শুকিয়ে আছে। কিছু ভেঙে পড়েছে বাতাসের তোড়ে। সেগুলো থেকেই বেছে নিল কয়েকটা ও। কাটাকুটির জন্য যে পাথরটা আছে ওর, সেটা ছোট। মাছ কাটা যায়, মাংস কাটা যায়, কলা গা কচুগাছের মতো নরম সরল গাছ কাটা যায়। কিন্তু বাঁশ কাটার মতো কাজ করতে তো বড় কিছু লাগবে। তেমন একটা খুঁজছে বহুদিন, গোত্রের পুরুষেরা যেমনটা ব্যবহার করে, পায়ই না। যা আছে তা দিয়েই তাই লেগে পড়ল ও। কিছুটা মুচড়ে নিয়ে যখন নরম হয়ে আসছে বাঁশ, বেরিয়ে আসছে ফাটা ফাটা চিকন চিকন আঁশ, বড় একটা পাথর তার নিচে দিয়ে নরম জায়গায় আঘাত। কিছুটা অমন কেটে কিছুটা বাঁশের গোড়ায় পা বাঁধিয়ে টেনে ছিঁড়ে নিলো দুটো। কঞ্চি ছাড়াচ্ছে যখন, হঠাৎ একটা ধারালো চোঁচে কেটে গেল হাতের তালু। কোথাও অমন কেটে ছিঁড়ে গেলে তুব গাছের পাতা চিবিয়ে লাগিয়ে দিত মা। তবে তা পাওয়া গেল না ধারে কাছে। বাঁশবনের পাশ ঘেঁষে হেঁটে যেতে হলো কিছুদূর। পাহাড়ের সামনে সেদিকে হাতির কানের মতো বড় বড় পাতার গাছ। তার নিচে তুবঘাসের বিছানা। যতক্ষণে পৌঁছল, ততক্ষণে বেশ খানিকটা ঝরে গেছে রক্ত। ফিরবার সময় দেখা গেল বেশ একটা রক্তরঙা চিহ্ন রেখে রেখে এগিয়েছিল সে!

ক’টা ঘাসপাতা দাঁতে পিষে তার রসালো শাস হাতে দিতেই জ্বলে উঠল একটু। তবু তা চেপে ধরে ও বাঁশপাতা জড়িয়ে বেঁধে দিল লতা দিয়ে। যাক, একটু ব্যবস্থা হলো। পাড়ায় ফিরে এরপর খানিক হলুদ চিবিয়ে দিলেই হবে। ভেবে সে লেগে পড়ল কাজে আবার।

কাজ বেশি আর ছিল না বাকি। ভেঙে নিতে হবে, আর হবে পুঁততে। কাটা হাতের কারণে তাতেই লেগে গেল সারাটা দিন প্রায়। নিচের দিকটা তবু বন্ধ হলো না পুরো। থাক, যা হয়েছে চলবে আপাতত।

শেষ করেই মনে পড়ল সকালের খাওয়াটাও হয়নি। তা খাবেই বা কী? ঘরে ক’টা কাঁচা কলা ছিল, দুটো দুটো করে পুড়িয়ে খাচ্ছিল কদিন ধরে, আজ দেখে পেকে গেছে! কয় সূর্য আগে একটা কাছিম ধরেছিল। একটুখানি বেঁচে আছে মাংস তার, কিন্তু গন্ধ ছুটে গেছে। গা গরম গরম; মাথা তুলে দাঁড়ালেই কেমন যেন দোলে। এই অবস্থায় বনে গেলে বিপদ, আবার ঘরে থেকেও এই অবস্থা। গাছের ছায়ায় বসে হু তার বাগানের দিকে তাকালো। কাঁটাগাছের মাথাটা এখনও লাউয়ের লতার দখলে। তবে তার সবুজ পাতা কমে এসেছে, বেড়েছে শুকনো পাতার ঝনঝনি। বড় একটা ফল ঝুলে আছে তাতে, চাইলে কেটে খাওয়া যায়। তবে ওর বীজ মনে হয় পোক্ত হয়নি এখনও। ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল হু’র। তাতেই যেন জ্বলে উঠল আগুন। যুত মতো একটা কাঠিতে গেঁথে নিলো পচাপ্রায় মাংসটুকু। পুড়ছে, এমন সময় ফিরে এলো পারারা।

আজ আবার দুটো সজারু! এই জন্যই লোকে পারার দলে যেতে চায় এত। একটু অবাক, আর একটু প্রশংসায় বড় হয়ে থাকা চোখ পড়ল ছেলেটার চোখে। সে-চোখে অপরাধবোধ। দেখেই সব মনে পড়ে গেল আবার। দৃষ্টিও বদলে খানিকটা চিকন হয়ে গেল হু’র। তাতে এবার বেশ অপ্রস্তুত লাগল পারাকে। তারপর ওকে এড়াতে পারা যখন লেজ গুটিয়ে ঘরে গিয়ে ঢুকলো, তখন কেমন ভালোও লাগল একটু। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে গিয়েই দেখে পুড়ে গেছে মাংস। আহারে! ওদিকে ওরা যখন তাজা শিকার নিয়ে সোরগোল করছে, হু তখন প্রায়-পোড়া মাংস খাবে! তা হোক, এমন করেই তো চলে গেল এতগুলো দিন। না চিবিয়ে গপাগপ গিলতে লাগল সে। কিন্তু পচা হলেও না হয় খাওয়া যায়, পোড়াকয়লা খাবে কী করে? থু থু করতে করতে হু কুলি করল খানিক। তারপর পানি খেলো ঢকঢক।

তা পানি খেয়ে কি আর খিদে মেটে? কী খাবে কী খাবে করতে করতেই দেখলো ফিরে এলো আফা, সঙ্গে রাবার দল। ওদের হাতে দুটো খরগোশ, কটা বেজি আর ফলমূল। সবার পেছনে তাতা, তার হাতে মাছ। দেখেই হাসি ফুটল হু’র।

৩.

পাড়ায় ঢুকেই আফা গেল বউয়ের কাছে। বউটার মুখ কুঁচকে আছে, কাতরানি বেড়ে হয়ে গেছে আর্তনাদ। পাশে বসে তার গায়ে-মুখে হাত বুলাতে বুলাতে সে বলল শিকার ভাগ করতে পারবে না আজ। তার হয়ে বয়োজ্যোষ্ঠ হাবাই করুক কাজটা। মাংস তো কাটাই সব। ভাগগুলোও নির্দিষ্ট- দেবগাছের অংশ, সর্দারের অংশ, শিকারী দলের সঙ্গে সর্দার বসে খাবে তার অংশ, আর অন্যদের। ভাগ করতে তাই সময় লাগে না। বিশেষ কোনো বিবাদও হয় না সচরাচর। হলেও হাবা সামলাতে পারবে। তার বুদ্ধি খুব। বলল বটে, কিন্তু কী মনে করে সে উঠেও এলো আবার। সজারু খরগোশ আর অন্যান্য শিকারের চামড়া ছাড়াতে ছাড়াতে দেখে সাপ গোছানো হয়নি তখনও।

‘এইটুকু কাজ’ ফাঁকা দাঁত দিয়ে খানিকটা থুতু ছিটিয়ে বলল সর্দার, ‘কতদিন থেকে করছো। তাও শিখলে না।’ বলে সে বসল নিজের আসনে। সাপের বিষথলি ফেলা, বড় শিকারের নাড়িভূড়ি আর মাছ পরিষ্কারসহ যাবতীয় কাজ সাধারণত মুমুই করায় মেয়েদের দিয়ে। তা গত কদিন ধরে সে পড়ে আছে ব্যথায়। মিতি তিতি পিপি আর আরও যারা করে কাজগুলো, তাদের আসলেই এতদিনে শিখে ফেলার কথা। তবু কেন এত দেরি। ‘অকাজের সব!’
তবে মাংস ভাগ করতে করতে যেন কমে এলো রাগ তার। পড়ে থাকা সাপের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রক্ত ফেলে দাও, না?’ মাথা নাড়ল শিকারী দল। আফা বলল, ‘আমরা ফেলতাম না। খেয়ে নিতাম ‘ বেশ একটা শোরগোল উঠে গেল এ কথায় তখন। সাপের রক্তও খাওয়া যায়! বিষ থাকে না? থাকেই তো কিন্তু সেটা তো আর রক্তে মিশে থাকে না। বলতে বলতে সে ফিরে গেল পুরোনো পাড়ায়।

শিকারে যাওয়া কেবল শুরু করেছে সে। পারা বা রাবার তুলনায় ছোট তুবা আর ফারার দিকে ইশারা করে বলল, ‘ওদের মতো আমি। বাবার সঙ্গে যেতাম। সে তো শুকনো অঞ্চল।’ দাদারা যেখানে থাকত সেখানে আরও শুকনো। চারপাশে বালি আর পাথর। ঝোপ ঝোপ ঘন কাঁটাগাছ ঘেরা এক জায়গায় থাকে। এক এক বড়চান্দে এক আধবার পানির দেখা পাওয়া যায়। গাছের গোড়া তুলে পাথরে ছেঁচে রস ঢালে গলায়। বড় শিকার পেলে তার রক্তই পানি, ফলে সাপের রক্তও তা-ই। তা পানির খোঁজেই তো পাড়াসুদ্ধ তারা ঘুরে বেড়াত এদিক থেকে সেদিক। শেষে যেখানে এসেছিল তারা, সেখানে একটা নিচু জায়গা ছিল বৃষ্টি হলেই জমে যেত মাটিমাটি ঘোলা ঘোলা পানি। পশুপাখির সাথে ভাগ করে তা-ই খেত তারা। আগের চেয়ে সেও ভালো, তবে রক্ত খাওয়ার অভ্যাস যায়নি। সে-সময়েই এক পাহাড়ি সাপের রক্ত খেতে গিয়ে মারা গেল একজন আর একজন অসুস্থ হলো খুব। তারপর থেকে আর সাহস করেনি অন্যরা।

বড় শিকারগুলো ভাগ হয়ে গেছে। সাপ ব্যাঙ আর মাছ ভাগ হবে এখন। আফা বলল, ‘সাপ ধরার একটা। মজার গল্প আছে। এখানে এসেছি কেবল। নতুন বন। নতুন শিকার। আমি নতুন সর্দার। শিকার হয় না। তার মধ্যেই সেদিন..’ এমন সময় সর্দারের গুহা থেকে চিৎকার ভেসে এলো। রানীমার ব্যথা উঠেছে। অমনি আফা ছুটলো সেদিকে। গুহার ভেতর পাড়ার মেয়েদের ভীড়। না ঢুকে তাই বাইরেই দাঁড়ালো সে। ‘কী খবর’ ‘কতদূর’ ‘জ্যান্ত হবে তো?’ প্রশ্নের সাথে চলতে লাগল অস্থির পায়চারি। এর আগেও বেশ ক’বার পোয়াতি হয়েছে মুমু। কিন্তু একবারও বাচ্চার কান্না শোনেনি। এবারেরটা যেন ভালোয় ভালোয় আলোয় আসে।

বাকি শিকারগুলো ভাগ করে ফেলল হাবাই। তারপর সব গুছিয়ে নিচ্ছে যখন, তখনই আওয়াজ শোনা গেল বাচ্চাটার! শুনেই ‘হো হো’ বলে শ্বাস ছাড়ল আফা। জড়িয়ে ধরল পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আভা আর তাতাকে। তারপর কী করবে ভেবে পাচ্ছে না এমন করে একবার ছুটে গেল পাড়ার মুখে, পরক্ষণেই ছুটে এলো গুহায়। মিতি তার কোলে তুলে দিলো বাচ্চাটাকে। আহা! আলোর মতো মুখ মেয়েটার। হয়েছেও সন্ধ্যার লাল আলো গায়ে মেখে। আলোর নামেই নাম রাখল সর্দার তার- বুবা। মানে আলো। পুরো নাম মুমু-বুবা। মুমুর মেয়ে বুবা।

আজ আর আলাদা না, সকলকে নিয়ে খেতে বসেছে সর্দার। পাড়ার মুখে গোল হয়ে বসেছে তারা, মাঝে আগুন। মাংস পুড়ছে, উড়ছে খোশগল্প। ওদিকে খাওয়া শেষ হয়েছে মেয়েদের। বাদ পড়া নাড়িভূড়ি আর হাড়গোড় সব নিয়ে গিয়ে তারা ফেলল খালের পারে। বাইরে ফেললে এর গন্ধে গন্ধেই আবার কোন না কোন জন্তু আসে, এসব তাই পাড়ার ভেতরেই ফেলা নিয়ম। তাতে লাভ হয় হু’রও।
আবছা আঁধার গায়ে মেখে হু এগিয়ে গেল সেদিকে। হাড়ের ভেতর থেকে পায়ের নলি মতো পাওয়া গেল যেগুলো, কুড়িয়ে নিতে নিতে তাকালো

গুহার দিকে। সর্দারের মেয়েকে নিয়ে মশগুল সবাই। শিকারিদের ভোজনের আসরের দিকে তাকালো- না কেউ দেখছে না। টুপ করে সে তাই নেমে পড়ল পানিতে, এ পাথরে সে পাথরে চড়ে চলেও এলো এপারে। তারপর দ্রুতপায়ে ওর বেড়া। ঢুকেই বসল খেতে। একটা পাথরের ওপর একটা নলি, তারপর একটা পাথরের আঘাত। পুড়িয়ে নিয়ে ওরা বাইরে লেগে থাকা মাংস খেয়েছে। কিন্তু ভেতরের মজ্জা আর শাস তো থেকে গেছে সেদ্ধ! নলিটা ফেটে যেতেই সেগুলো খানিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। বাকিটুকু আঙুল দিয়ে খানিক, খানিক মুখ দিয়ে ও টেনে নিচ্ছে সুড়ুত সুড়ুত। এমন সময় হঠাৎ দেখে পিপি আসছে। অমনি লেগে গেল তোড়জোড়, নলিগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলল নিজের আড়ালে। মেঝেতে বিছানো পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা তরলটুকু মুছে নিলো হাতে। মুছতে হলো মুখটাও। তারপর বসে থাকল সরল বোকা একজন।

কোনো কাজে আসেনি, এমনিতেই হেঁটে বেড়াচ্ছে এমনভাবে এসে, একটুকরো মাংস ফেলে দিয়ে গেল পিপি। ফেলল এমনভাবে, যেন কিছুই জানে না সে। নিয়ে সেটুকু ধুয়ে ফেলল হু। তারপর কেটে কেটে কাঠিতে গেঁথে নিলো ত্বরিত। মাংস রসুন মাংস পেঁয়াজ মাংস। আগুনের ওপর ধরতে সেটার সুবাস ছড়ালো যত, তত ভিজে গেল তার জিব, আর তত গিলল সে ঢোক!

খেতে শুরু করেই হঠাৎ প্রশ্ন জাগল, মাংসটুকু ফেলে গেল কেন পিপি?

বড়চান্দের সেই রাতের কথা মনে এলো তার। সর্দার সেদিন ছিল পারার দলে। রাবার দল একটা মহিষের বাচ্চা এনেছে। নিয়ম অনুযায়ী দিনের সবচেয়ে বড় শিকারের মাথা রেখে আসার কথা দেবগাছের গোড়ায়। কাজটা শিকারী দলের নেতার। তা রাবার তখন মাথাব্যথা, উঠতেই পারছে না। ফলে সন্ধ্যায় যাওয়ার কথা থাকলেও যেতে পারেনি। অন্য কেউ গিয়ে দিলে তো হবে না। তা সন্ধ্যা পার হলে একটু সুস্থ বোধ করল রাবা। তাই রওনা, সঙ্গে তাবা আর রাতা। একটা টিলা আর দুটো গর্ত পার হতে হলো। তারপর বেশ খানিকটা খালি জায়গা। তারপর কালোটিলা, তারপরেই দেবগাছ। টিলাটার কাছেই নাকি পৌঁছে গিয়েছিল ওরা। তখনই দেখে সেই বাঘ। বেশ দূরে যদিও, ওরা তো দেবগাছের কাছে, নদীর এপারে, আর বাঘটা ওপার থেকেও দূরে। কী একটা শিকার ধরেছে, খাচ্ছে একমনে। তা ওদের যদি দেখে, ছুটে আসতে কতক্ষণ? মাথাটা ফেলে তাই পালানো ছাড়া পথ ছিল না। ফিরে এসে বলতেই সবাই ঢুকে পড়েছিল গুহায়।
তার পরিণাম যে এত খারাপ হবে, তা বোঝা যায়নি তখন।

পরদিন সারা জঙ্গল ঘুরেও কিছু মাছ ব্যাঙ আর সাপ ছাড়া কোনো শিকারই জোটেনি। পারার দলও সেদিন ফিরে এলো খালি হাতে প্রায়। কিছুই মিলল না তার পরের দিনও। প্রতিদিন শিকারে যায় আর কলার থোড় বাঁশের মোথা শিকড় বাকড় নিয়ে ফিরে আসে। পুড়িয়ে নিয়ে তা মুখে ধরে যখন, গলা দিয়ে নামে না। একদিন দু’দিন তবু তাতে পেট চলে বটে, কিন্তু কতদিন? মাংস না খেলে কি পেট ভরে, না শক্তি থাকে গায়? বৃদ্ধরা বলল এসব ওই দেবগাছের অভিশাপ। তাঁর জন্য নিয়ে যাওয়া ভোগ যে-বাঘ খেয়েছে তাকে হত্যা না করতে পারলে আর শিকার মিলবে না। পরের কয় সূর্য কাটলো বাঘটাকে খুঁজে। আর এদিকে না খেয়ে থাকার যোগাড়। বড়রা তবু যাহোক এটা সেটা খায়, সমস্যা হলো ছোটদের। দুধ পায় না পিপির বাচ্চা। খিদেয় ছেলেটা কাঁদতেই থাকে সারাবেলা। পিচ্চিটার কথা বলেই হু’র কাছ থেকে মাংস নিয়ে গিয়েছিল। তা এর মধ্যে আর এত শিকার হয়নি যে তাকে ফেরত দিয়ে যাবে। কালকে ধরা ভেড়ার রগের মাংস ছিল কিছুটা, আবার আজ এত মাংস, হু-কে তাই শোধ দিয়ে গেল পুরোনো মাংস দিয়ে।
তা এই মাংসটুকুও শেষ করতে পারল না হু। কেমন যেন লাগছে। নষ্ট হয়ে গেছে বলেই কি এমন? নাকি শরীর খারাপ বলে?

ভাবতে ভাবতে হু ধোঁয়াকাঠ জ্বালিয়ে দিলো। তারপর তার আঁকাবাঁকা ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে তাকিয়ে থাকল বাইরে। সেখানে হইহুল্লোড়, উৎসবের আয়োজন। সবচেয়ে কাছের মানুষের বাচ্চা হলো, খুশি হওয়া উচিৎ হু’রও। অথচ তার চোখ ভেজা।
এর মধ্যেই চোখ বুজল মুমু।

আলো ঝলমল পাড়াটা অন্ধকার হয়ে গেল হঠাৎ।

(চলবে)

এই উপন্যাসটি সম্পর্কে লেখকের কথা শুনুন এই ভিডিওতে  ক্লিক করে : “স্বরূপকথা” উপন্যাসটি সম্পর্কে বলছেন ঔপন্যাসিক আশান উজ জামান 

Share Now শেয়ার করুন