আশিক মাহমুদ শ্যামল >> ধ্রুপদী বিষণ্ণতার রাজকুমার দিলিপ কুমারের মহাপ্রয়াণ >> প্রয়াণলেখ

0
311

এই কিংবদন্তি অভিনেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অমিতাভ বচ্চন যথার্থই বলেছেন, “হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাস লিখতে হলে এইভাবে লিখতে হবে : দিলিপ-পূর্ব হিন্দি সিনেমার যুগ আর দিলিপ-পরবর্তী হিন্দি সিনেমার যুগ।”

কাল প্রয়াত রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাঁর বিষাদের পদ্ধতিমালায় লিখেছিলেন, “চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে, আমার না থাকা জুড়ে।” সেই না-থাকার বিস্তার কতদূর? কতদূর সেই অনুপস্থিতির পরিসর? চলে যাওয়া কিংবা সেই মহাপ্রয়াণের বিষাদ সিম্ফনি স্থান ও কালের সীমাবদ্ধকে অতিক্রম করে কি কখনো কখনো পৌঁছে যায় বৈশ্বিক আর মহাকালের আঙিনায়? সমকালীন থেকে হয়ে ওঠে কি সর্বজনীন, সমসময়ের তুলনায় কোনো যুগের বা প্রজন্মের কণ্ঠস্বর? যুগ-যুগান্তের সেই অনিবার্য যাত্রায় কখনো কখনো দেখা মেলে এমন কোনো কোনো ব্যতিক্রমী প্রতিভাবান মানুষের, যিনি তাঁর অনন্য সৃজনশীল স্বীকয়তার গুণে নিজেই হয়ে ওঠেন বহুনন্দিত একটি অধ্যায়, প্রতিষ্ঠান তথা ইতিহাস ও মহাকালের অংশ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রেখে যান তাঁর কাজের দীপ্ত প্রভাব, অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। হয়ে ওঠেন তারকাদের তারকা, কিংবদন্তিদের কিংবদন্তি, অথবা আরও বড় কিছু। উপমহাদেশের চলচ্চিত্র কিংবদন্তি দিলিপ কুমারের মহাপ্রয়াণে ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গন, বিশেষ করে মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আজ অনুধাবন করছে এই বাস্তবতা। সাত জুলাই ছিলো ভারতীর চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে বিষাদঘন দিন। এই দিনটিতে তাঁদের চলচ্চিত্র-আকাশ থেকে ঝরে গেছে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি। তাঁরা হারিয়েছেন তাঁদের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয়, মেধাবী ও আইকনিক অভিনেতা ট্রাজেডি কিং দিলিপ কুমারকে।

দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক তাঁর অনন্য অভিনয় দিয়ে রাজত্ব করেন হিন্দি সিনেমার জগত, পরিণত হন উপমহাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আইকনিক অভিনেতায়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অভিনয় দিয়ে পৌঁছে যান জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।

১৯২২ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারে জন্ম নেওয়া খুব সাধারণ এক ফল ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান ইউসুফ খানের দিলিপ কুমার হয়ে ওঠার গল্প রূপকথাকেও হার মানায়। জন্মভূমি পেশোয়ার ছেড়ে সপরিবারে মুম্বাই চলে চলে আসার পরেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন পারিবারিক ফল ব্যবসার সাথে। কোনো এক শুভক্ষণে সিনেমার শুটিং দেখতে গিয়ে চোখে পড়েন তখনকার প্রথিতযশা অভিনেত্রী দেবিকা রানীর। তাঁর হাত ধরেই সুযোগ মেলে ‘জোয়ার ভাটা’ ছবিতে। সেই শুরু। আর ফিরে তাকাতে হয়নি পেছনে। এরপর একে একে উপহার দেন শহীদ, আন্দাজ, আন, নয়া দৌড়, লিডার, রাম অর শ্যাম, গঙ্গা যমুনা, মশাল কিংবা শক্তির মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক তাঁর অনন্য অভিনয় দিয়ে রাজত্ব করেন হিন্দি সিনেমার জগত, পরিণত হন উপমহাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আইকনিক অভিনেতায়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অভিনয় দিয়ে পৌঁছে যান জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তখন তরুণ প্রজন্মের হার্টথ্রব তিনি। পুরো উপমাহাদেশ জুড়েই তাঁর সীমাহীন জনপ্রিয়তা। দিলিপ কুমার এমন এক ক্রেজের নাম যাঁর মতো করে উপমহাদেশের তরুণরা চুল কাটতো আর তাকে বলা হতো ‘দিলিপ কাট’! উপমহাদেশের এমন কোনো তরুণী ছিলো না যিনি দিলিপ কুমারের প্রেমপ্রিয়াসী ছিলেন না। তখন ইন্টারনেটের প্রচলন হয়নি। দিলিপ অনুরাগীরা তাদের ঘরের দেয়ালে অথবা বালিশের নিচে সযত্নে রেখে দিতো পত্রিকায় প্রকাশিত প্রিয় অভিনেতার ছবির কাটিং। বিশেষ করে মেয়েদের কাছে তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন সেটা কিছুটা অনুমান করা যাবে তাঁর সহধর্মিনী, প্রখ্যাত অভিনেত্রী, ড্রিমগার্লখ্যাত সায়রা বানুর একটি ইন্টারভিউয়ের কথা স্মরণ করলে। সেই সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, সায়রা বানু যখন মাত্র ১২ বছরের কিশোরী তখনই তিনি দিলিপ কুমারের প্রেমে পড়েন। তখন থেকেই তিনি নাকি স্বপ্ন দেখতেন দিলিপ কুমারকে বিয়ে করার। পরবর্তীকালে আমরা জানি, তাঁর সেই স্বপ্ন সফল হয়েছিলো চলচ্চিত্রে যখন তাঁর আগমন ঘটে আর তিনি নিজেও একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রীতে পরিণত হন। আসলে, শুধু সায়রা বানুই নন, সেই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভারত উপমহাদেশের লাখো তরুণীর স্বপ্নপুরুষ ছিলেন দিলিপ কুমার। অতুলনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তিনি।

হিন্দি চলচ্চিত্র ইতিহাসের খুব সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত ছবি ‘মুঘল এ আযম’। সেই ছবির সেটে তখনকার অনিন্দ্য সুন্দরী নায়িকা, ধ্রুপদী সৌন্দর্যের আঁধার মধুবালার সাথে তাঁর প্রেমকাহিনি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। সেই সময়ের প্রতিনিধি হিসেবে আজও যাঁরা বেঁচে আছেন মনের দিক থেকে নবীন হয়ে, এখনো তাঁরা স্মৃতিকাতর হয়ে যান সেই সোনালি অতীতের কথা মনে করে। হিন্দি চলচ্চিত্র-জগতে দিলিপ কুমার ও মধুবালার প্রেমকাহিনি এক ক্লাসিক ঘটনা হয়ে আছে আজও।

তিনি ছিলেন সেইসব ক্ষণজন্মা অভিনেতাদের একজন, যিনি সাধারণ মানুষের, চলচ্চিত্র দর্শকদের ভালোবাসার পাশাপাশি চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের কাছে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন তাঁর অনবদ্য অভিনয় কুশলতার কারণে। এই জনপ্রিয়তা অন্য অভিনেতার ভাগ্যে জোটেনি।

তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়, সেটা হলো, দিলিপ কুমারের সমসাময়িক পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আরো কিছু অভিনেতা সেই সময় জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছিলেন। তাঁদের মধ্যে রাজকাপুর, দেবানন্দ ও শাম্মী কাপুর ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তবে একটি জায়গাতে দিলিপ কুমার তাঁদের সবার থেকে ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি ছিলেন সেইসব ক্ষণজন্মা অভিনেতাদের একজন, যিনি সাধারণ মানুষের, চলচ্চিত্র দর্শকদের ভালোবাসার পাশাপাশি চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের কাছে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন তাঁর অনবদ্য অভিনয় কুশলতার কারণে। এই জনপ্রিয়তা অন্য অভিনেতার ভাগ্যে জোটেনি। অভিনয়ের জন্য আট বার ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারে ভূষিত হওয়া তাঁর অসাধারণ অভিনয় প্রতিভার দিকেই ইঙ্গিত করে। বলিউড তখন গর্বের সাথে উচ্চারণ করতো, তাঁদের একজন মার্লোন ব্রান্ডো আছেন আর তিনি দিলিপ কুমার। হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রথিতযশা গীতিকার ও কবি গুলজার মনে করেন, অভিনয়জীবনে দিলিপ কুমার হিন্দি সিনেমাতে হলিউডের মার্লোন ব্রান্ডোর আগেই মেথড অভিনয়ের সূচনা করেন। মেথড অভিনেতা হিসেবে ব্র্যান্ডোর আগে তাই দিলিপ কুমারের নাম উচ্চারিত হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যাঁকে মেগাস্টার উপাধি দিয়েছে, সেই অমিতাভ বচ্চনও তাঁর অভিনয়ের অনুপ্রেরণা এবং আইডল হিসেবে বারবার উল্লেখ করেছেন দিলিপ কুমারের কথা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি দ্বিধাহীন কণ্ঠে স্বীকার করেছেন, তাঁর দেখা সবচেয়ে মেধাবী অভিনেতা ছিলেন দিলিপ কুমার। আর দিলিপ কুমার অভিনীত গঙ্গা-যমুনা ছবিটি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছবিগুলোর একটি। দিলিপ কুমারকে তিনি তাঁর অভিনয় জীবনের শিক্ষকতুল্য অভিনেতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, ১৯৮২ সালে যখন তিনি (অমিতাভ) যখন তাঁর কেরিয়ারের মধ্যগগনে, তখন ‘শাস্তি’ ছবিতে দিলিপ কুমারের ছেলের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব এলে সেই প্রস্তাবে তিনি অস্বস্তিতে ভুগেছিলেন। কারণ, অমিতাভ শঙ্কিত ছিলেন এই ভেবে যে, দিলিপ কুমারের মতো জাত-অভিনেতার সামনে তিনি হয়তো ম্লান হয়ে পড়বেন। পরে ছবিটা মুক্তি পেলে, অমিতাভের সেই শঙ্কাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছিলো। অনেক চলচ্চিত্র সমালোচক বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখেছিলেন, অভিনয়-যাদুতে অমিতাভকে ম্লান করে দিয়েছেন দিলিপ কুমার। এই কিংবদন্তি অভিনেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অমিতাভ বচ্চন যথার্থই বলেছেন, “হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাস লিখতে হলে এইভাবে লিখতে হবে : দিলিপ-পূর্ব হিন্দি সিনেমার যুগ আর দিলিপ-পরবর্তী হিন্দি সিনেমার যুগ।” মূল কথাটা হলো, তিনি আসলেই ছিলেন যুগস্রষ্টা এক অভিনেতা। তাঁর অভিনয় দিয়েই দুই যুগের মধ্যে সীমারেখা টানা যায়।

উপমহাদেশের চলচ্চিত্রকে আবার হয়তো কয়েক যুগ অপেক্ষা করতে হবে এমন আরেকজন অভিনেতার আগমনের জন্যে, যাঁর অনবদ্য ব্যক্তিত্ব আর দৃষ্টির অভিজাত রহস্যময় বিষণ্ণতা আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।

সারা জীবনে অভিনয়ের কারণে জনতার হৃদয়ই শুধু জয় করেননি এই ট্র্যাজেডি কিং, পেয়েছেন অসংখ্য প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। পেয়েছেন অভিনয়ের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি স্বরূপ শীর্ষ চলচ্চিত্র পুরস্কার – ‘দাদা সাহেব ফালকে’। পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’। মুম্বাইয়ের শেরিফ হবার পাশাপাশি ছিলেন রাজ্যসভার সম্মানিত সদস্য। পাকিস্তান তাঁকে সম্মান জানিয়েছে সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক – ‘নেওয়াজ-এ ইমতিয়াজ’-এ ভূষিত করে। এইসব অসংখ্য দেশি এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার তাঁর ললাটে এঁকে দিয়েছে এক বিরল অভিনেতার সম্মান।

তাঁকে হারিয়ে ভারত তথা উপমহাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন শোকস্তব্ধ। এমন একজন সব্যসাচী অভিনেতার শূন্যতা পূরণ প্রায় অসম্ভব। উপমহাদেশের চলচ্চিত্রকে আবার হয়তো কয়েক যুগ অপেক্ষা করতে হবে এমন আরেকজন অভিনেতার আগমনের জন্যে, যাঁর অনবদ্য ব্যক্তিত্ব আর দৃষ্টির অভিজাত রহস্যময় বিষণ্ণতা আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা চলচ্চিত্র-মুঘল ট্র্যাজেডি কিং মহানায়ক প্রিয় দিলিপ কুমার।