আসিফ রহমান সৈকত >> কিম কি দুক, আরো কিছুদিন থাকতেন আমাদের জন্যে, এই পৃথিবীর জন্যে… >> চলচ্চিত্র

0
568

কিম কি দুক, আরো কিছুদিন থাকতেন আমাদের জন্যে, এই পৃথিবীর জন্যে…

১১ ডিসেম্বর ২০২০। বিশ্বচলচ্চিত্রের জন্য একটা বিষাদাক্রান্ত দিন। সমকালের, এমনকি সর্বকালের একজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা কিম কি-দুক ওই দিন মৃত্যুবরণ করেন। কিম, বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে প্রায় সব শীর্ষ পুরস্কারগুলি পেয়েছেন। তিনি এমন এক নির্মাতা, যাঁর প্রতিটি ছবিই অনন্য। আধুনিক-উত্তরাধুনিক জীবনের অন্তর্গূঢ় উন্মোচন দর্শকদের শুধু দৃশ্য দেখায় না, গভীরভাবে ভাবায়। কিম কি-দুকের মৃত্যুতে তাঁর স্মরণে প্রকাশিত হচ্ছে এই লেখাটি।

কিম কি দুককে বাংলাদেশের অনেকেই প্রথমে যেভাবে উপস্থাপন করেন, সেটাই খারাপ। আপনি কেনো আপনার বিচার আরেক জনের উপর চাপিয়ে দেবেন? আপনি সিনেমাটা আগে তো দেখতে বলবেন, তারপর তার সেটা দেখা শেষ হলে বলবেন, আসেন এবার আলাপ করি। তারঁ সিনেমা নিয়ে কথা না বলে প্রথমেই তাকে তাঁর জীবন, তাঁর চলাফেরার ঠিক নাই ইত্যাদি বলবেন! আবার অনেকে বলেন সিনেমাতে সেন্সরযোগ্য দৃশ্য অনেক (বাংলাদেশের জায়গা থেকে হয়তো ঠিক) , কিন্তু কোনো এক লেখক বলেছিলেন, একজন সুন্দরী তরুণীর কাটা হাতের কোনো সৌন্দর্য্য নাই, যখন সে তার পুরো শরীরের একটা অংশ হবে তখনই তার মূল্য, এই রকমই কিছু।

কিম কি দুক ৬৪তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের ফটোকলে [১৩ মে ২০১১ , কান, ফ্রান্স]

পুরো সিনেমাতে কিম কি দুকের ওই আলাদা আলাদা দৃশ্যগুলো সেইরকমই মূল্যবান, যে দৃশ্যগুলোকে আপনি আলাদাভাবে দেখে বলতে পারবেন না যে দৃশ্যটা এরকম হতে পারতো, কিন্তু এরকম কেনো হলো। দুকের সিনেমার কোনো দৃশ্যই অযথা নয়, অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় নয়। তাই সবগুলি দৃশ্যকে বা পুরো সিনেমাটাকে সমগ্রের বা সম্পূর্ণ সিনেমার অংশ হিসেবে দেখাই ভালো। কোনোটাকে বাদ দিয়ে তার পুরো কবিতা পড়া যাবে না। তিনি সিনেমার কবি। অনেকে, যাদের সিনেমাকে শিল্প হিসাবে দেখতে এখনো দ্বিধা হয়, তাদের তো কিম কি দুকের “স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার… অ্যান্ড স্প্রিং” দেখার পর নতুন করে ভাবতে হবে সিনেমার শিল্প আসলে কি। দুকের আর কোনো সিনেমা যদি নাও দেখেন, এই একটা সিনেমাই যথেষ্ট, তাঁকে বোঝার জন্য। আমাদের নিজেদের জীবনকে উপলব্ধি করার জন্যেও সিনেমাটি দেখা জরুরি। বই বা পেইন্টিংয়ের তুলনায় সিনেমা কোথায় গিয়ে এতো শক্তিশালী হয়, এই সিনেমা সেটা দেখায় এবং এ জন্যই সিনেমাটা অনেক অনেক কঠিন, কারণ জীবনের উপলব্ধির কথা সিনেমাতে দেখানো, এরকম একটা সিনেমা বানানোর ভাবনা, পরিশ্রম, চিন্তা, দৃশ্যায়ন, ১০টা ভালো সিনেমার চাইতেও অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী। আমিতো বলবো এটা নিঃসন্দেহে একটা কালজয়ী সিনেমা। এরকম সিনেমা জীবনে একটা বানানোই যথেষ্ট। কিম কি দুকের সিনেমা না দেখে থাকলে, এই একটা সিনেমাই দেখে ফেলেন। এটা দেখার জন্যে আমি সিনেমা যারা ভালোবাসেন তাদের অনুরোধই করবো। বাকিগুলো না হয় বাদই দিলেন। এই একটা সিনেমাই আপনার সিনেমা সম্পর্কিত ভাবনাকে সমৃদ্ধ করবে, নতুন আলো দেবে। নতুন ধারণা দেবে। নতুন করে নতুনভাবে সিনেমা দিয়ে কিছু বলার আগ্রহ বাড়াবে। বলেই ফেলবেন হয়তো, এভাবেও গল্প বলা যায়! একই লোকেশনে, ৪-৫ জনকে নিয়েই? কিন্তু এর আগে তো ড্রোন আর ভিএফএক্স ছাড়া এভাবে ভাবাই যেত না।

দুনিয়ার সিনেমাপ্রেমীদের অনেকে তো বটেই, কোরিয়ার পরবর্তী প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতারা কি দারুণভাবে তাঁর দ্বারা প্রভাবিত নয়? বং-এর ‘প্যারাসাইট’ দেখে আমার কিন্তু প্রথমেই ‘থ্রি আয়রন’-এর কথা মনে পড়েছিলো। যেহেতু দুইজনেরই দক্ষিণ কোরিয়াতে জন্ম, সেদিক থেকে, যদিও কিম কি দুক নিজেকে “চলচ্চিত্র নির্মাতা” বলতেই পছন্দ করতেন, “দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র নির্মাতা” হিসেবে নয়। সিনেমা বা শিল্প বা কবিতা তো আসলে দিন শেষে পুরো পৃথিবীর জন্যেই, যদি সেটা সেই জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করে। দরজার ঠিক যেখানে তালা থাকে, সেখানে লিফলেট লাগিয়ে দেয়া, এক যুবকের সারাদিনের জরুরি একটা কাজ, তারপর রাতে এসে দেখে যে কেউ সেটা ছেঁড়েনি। যারা ছেড়েনি তারা আপাতত বাসাতে নেই। তাই বাসাটা আজকে রাতে থাকার জন্য পাওয়া গেলো। সে থাকলো সেই বাসাতে। খেলো। ঘুমালো। বিনিময়ে বাসার কিছু জিনিস পরিষ্কার করে দিলো, কাপড় ধুয়ে দিলো। কী দারুণ ধারণা। এর মধ্যে একজনকে পেয়ে গেলো যার বসবাস এক ধনীর বাসায় একজনের স্ত্রী হিসেবে। শুধু নামেই স্ত্রী, এর বেশি কিছু না। সেখানে প্রেম, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা অনুপস্থিত। সেও খুঁজছিলো এমন কাউকেই। তারপর সে ওই ধনীর বাসাতেই থাকলো, বাড়ির মালিকের অজান্তেই। বলে বোঝানো যাবে না সিনেমাটা, এই জন্যই দুকের সিনেমা উপলব্ধির সিনেমা, শিল্পের শীর্ষেই এর অবস্থান। ‘থ্রি আয়রন’ হতে পারে আপনার দ্বিতীয় সিনেমা যেটি আপনি দেখতে চান কিম কি দুককে জানার জন্যে।

থ্রি আয়রন সিনেমার একটা দৃশ্যে প্রধান তিন চরিত্র

কিম কি দুকের সিনেমা আর তাঁর জীবন আলাদা কিছু নয়। শিল্প আর শিল্পীর আলাদা হয়ে থাকাটা, শিল্প তৈরির জন্য কোনো একটা জায়গা বা পর্যায়ে তো অবশ্যই বাধা হয়ে ওঠে। ভালো সিনেমা নির্মাতাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা একটা সমস্যা। শত বছরের বেশি সময় ধরে সিনেমার ইতিহাসের পর এখন তো তা আরো বেশি জরুরি আর সত্যি হয়ে উঠেছে; নইলে সবই হয়ে যাচ্ছে গতানুগতিক অথবা পুররাবৃত্তি মাত্র। কিম কি দুক গতানুগতিকও নন, পুনরাবৃত্তির তো প্রশ্নই আসে না।

বিস্ময় আর ধাক্কা খাওয়ার আরেকটা ছবি হলো ‘পিয়েতা’। মা, ছেলে, সমাজ, পরিবার, টাকা কি, লোন কি, ইন্সুরেন্স কি, কে কার, কে কখন কার – সব নিয়ে একটা প্রশ্নের ব্রাশফায়ারের সামনে আপনাকে নিয়ে যাবে ‘পিয়েতা’। কোথা থেকে আসলাম, কোথায় আসলে যেতে চাই, জীবনের প্রয়োজনীয় চিন্তায় অপ্রয়োজনীয়, অপ্রিয় সব কাজের মধ্যে জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার, দুঃখজনক বেদনার একটা বৈশ্বিক গল্পই বলে ‘পিয়েতা’।
লাটভিয়াতে সমুদ্রের কাছে বাড়ি কিনে কিম কি দুক থাকতে গিয়েছিলেন। সিনেমা আমরা যারা ভালোবাসি, একে জরুরি মাধ্যম মনে করি শিল্পের জায়গা থেকেই, তারা কি আর ভুলতে পারবো যে করোনাতে কিম কি দুককে আমরা হারিয়েছি। খালি মনে হলো ইশ! গদারের মতো আরো কি ২০টা বেশি বছর বাঁচতে পারতো না কিম কি দুক? আমাদের সবার মন খারাপ হয়েছে অনেক। কী শক্তি ছিল তার! সারা দুনিয়ার কতো মানুষকে সে প্রভাবিত করেছে তাঁর কাজ আর কথা দিয়ে। তাকে সবাই ঠিকঠাক বুঝতে পারি না বলেই তো বলি পাগল, বিতর্কিত। মানুষ যে একটা অন্তহীন চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে সেটা কি তিনি বলেন নি তাঁর সিনেমাতে – স্প্রিং ঘোরে-ফেরে আবার স্প্রিং ঘোরে-ফেরে… স্প্রিং স্প্রিং। আবার সাপকে মারা, তাকে বেঁধে কষ্ট দেয়া, অন্যের জীবনকে খারাপ করে দিয়ে আনন্দ পাওয়া, তারপর জীবনচক্রে অরেকজনকে আঘাত না দেওয়ার, লোভলালসা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা, তারপর আবার তার জন্ম, আবার একই অবস্থা, আবার কাউকে শিক্ষা দেওয়া, বোঝানো, এসব অন্তহীন কাজ, এই কাজ চলতেই থাকবে, যতদিন পৃথিবীতে মানুষ আসতে থাকবে। এই চক্র থেকে তার বের হবার কোনো উপায় নাই, এই চক্রকে স্বীকার করেই তার জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে।
কিম কি দুককে বলা হতো আপনি কী ইচ্ছা করে এই তর্কগুলো তৈরি করেন, উনি বলতেন , না। আমি যেটা বলার দরকার মনে করি, যেভাবে দেখাতে চাই, সেটাই দেখাই, এটা বিতর্ক তৈরি করবে কি করবে না, সেটা তো আমার ভাবনার বিষয়ই না। আমি সিনেমা বানাই। যেটা বলতে চাই সেটা বলি, যেভাবে বলতে চাই সেইভাবে বলার চেষ্টা করি, যাতে আমার প্রকাশটা হয়, আমি যাতে অন্যদের বলতে পারি।
আসলে তো তাই, আমি বুঝি না তাই বিতর্ক করি,আলাপের মাধ্যমে হয়তো বোঝার চেষ্টা করি। কিম কি দুক তো লক্ষ লক্ষ হয় না। তাঁর দর্শক, তাঁকে বোঝার দর্শকও তো লক্ষ লক্ষ না। তাই যারা বুঝবে না তাঁরা গালি দেবে, সিনেমা ধীর-স্থিরভাবে শেষ না করতে চেয়ে, টেনে টেনে দেখবে, ল্যপটপে বা প্রজেক্টরে, তাহলে তো শুধু দৃশ্য দেখা হবে, কিম কি দুকের পুরো সিনেমাটা কিন্তু দেখা হবে না।

কিম কি দুক নিজেই তাঁর সিনেমার একটা দৃশ্যে। কোন সিনেমা বলুনতো?

দরকার নাই তাঁর সব সিনেমা দেখার, যদি ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম থেকে একটু সময় বের করতে পারেন তাহলে একটা সিনেমা অন্তত দেখবেন – “স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার… এন্ড স্প্রিং”, এরপর আমাকে গালি দেবেন, সেই গালি আমার কাছে প্রশংসার থেকেও বেশি মনে হবে।
আমি এমন একসময়ে বেঁচে আছি যখন কিম কি দুক ছিলেন বেঁচে, এই সময়টাই তিনি দেখেছেন। তার গল্পগুলো তো এই সময়কে দেখেই তৈরি করা। যাদের কথা কেউ বলে না, তিনি তো তাদের কথাই বলতে চেয়েছেন। সিনেমাকে শিল্প হিসেবেই এঁকেছেন, ছবি, দৃশ্য, শব্দ, সাজানো আর প্রদর্শনে।

লেখাটা লিখতে লিখতেই মন আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আজকে আবার দেখতে বসবো তাঁর সিনেমাগুলো। একটাও বাদ দেবো না। কী একটা মন খারাপের বছর। সবাই মিলে একসাথে কোথাও তাঁকে স্মরণও করতে পারছি না, শ্রদ্ধা জানাতে পারছি না। মনটা ভরছে না! কী হতো কিম যদি আপনি আরও কয়েকটা বছর বেঁচে থাকতেন আমাদের এই পৃথিবীতে, আমাদের সময়ে? আপনার দেখাটা যে ছিল একেবারেই আলাদা। পরিশেষে, তাই আপনার মৃত্যুতে অনেক কিছু শূন্য হয়ে গেল। শ্রদ্ধা জানাই, আনত শিরে।

ঢাকা
১৫/১২/২০২০

Share Now শেয়ার করুন