আসিফ সৈকত >> ‘অ্যানাদার রাউন্ড’ : মদিরা ও জীবনের জয়গান >> চলচ্চিত্র

0
189

যে-ভাবনা বা দর্শনের উপর সিনেমা শুরু হয় সেটা ফিন্স কর্দোরুর (নওরোজিয়ান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) ভাবনা থেকে উৎসারিত। কদরু বিশ্বাস করেন, মানুষ রক্তে প্রয়োজনীয় ০.০৫% অ্যালকোহল কম নিয়ে জন্মায়। এটা আসলে অনেকটাই কম। অথচ এই মাত্রার কাছাকাছি থাকতে পারলে মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে সবসময় খুশি থাকতে পারতো অথবা থাকার অনুভূতি তৈরি হতো।

কী সুন্দর একটা সিনেমা! যেন মনে হলো ডেনমার্কের ওই এলাকায়, ওই স্কুলে, ওদের সঙ্গেই ওদের জীবন দেখছি। সুন্দর একটা চলচ্চিত্র। একদম জীবনের কথা বলে। সততার সাথে সত্যকেই দেখায়। নির্মোহভাবে। যেভাবে দেখানো দরকার। চল্লিশের শুরুতে, মধ্যবয়সে ঢুকছে এইরকম চার বন্ধুর গল্প, যারা একটা স্কুলে অনেক বছর ধরে শিক্ষকতা করছিলো। কিন্তু কেমন যেন ছন্দহীন জীবন, খুঁজে পাচ্ছে না সুর ছন্দ লয়। পথটা যেন সামনে থেকেও নেই, দেখতে পাচ্ছে না রাস্তা, বুঝতে পারছে না দিক, ভাবতে পারছে না এরপরে কী ঘটবে?

নিস্তরঙ্গ জীবন ও উদযাপন

গান, নাচ, হাসি-ঠাট্টা, দারুণ রসবোধের ভেতর দিয়ে জীবন এবং জীবনবোধের কথা বলে অস্কার পুরস্কার প্রাপ্ত (বিদেশি শ্রেষ্ঠ ছবি) ‘অ্যানাদার রাউন্ড’ সিনেমাটি। এর ইংরেজি নাম ‘অ্যানাদার রাউন্ড’ রাখলেও মূল ড্যানিশ ভাষায় সিনেমাটার নাম ‘ড্রাঙ্ক’ (Drunk), যার আক্ষরিক অর্থ হতে পারে মদ্যপ বা মাতাল। তবে সিনেমাটা তারুণ্য আর জীবনের জয়গান গায়, জীবনের প্রশংসাই করে। যে-ফিজ শটে সিনেমাটা শেষ হয় (আসলে শুরুই হয়), গানে নেচে নেচে জীবনকে আবার উদযাপন করে প্রধান চরিত্র মার্টিন (ম্যাড মিকেলসন)। নিজের জীবনকে উপভোগ করে জীবনের জন্য, জীবনের কাছে, তারুণ্যদীপ্ত উদযাপনের মধ্য দিয়ে।

What a life, what a night
What a beautiful, beautiful ride
Don’t know where I’m in five
But I’m young and alive
What they are saying, what a life…

সেইরকম একটা জীবন, সেইরকম একটা রাত,
কী দারুণ সুন্দর এই পথচলা
জানিনা পাঁচ মিনিট পরে আমি কোথায় আছি
কিন্তু আমি তরুণ, আমি জীবন্ত, সেটাই আসল কথা
ভুলে যাও জীবন সম্পর্কে অন্যেরা কি বলছে।

অ্যালকোহল নিয়ে চারবন্ধুর এতো গবেষণার মধ্যেও এর মাধ্যমে জোরালো রাজনৈতিক ইমেজ, রাজনৈতিক নেতাদের বিভিন্ন সময়ে অ্যালকোহলপ্রীতির রিয়েল ফুটেজের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার , সিনেমার সাথে মিশে গেছে দারুণভাবে। আলাদা কিছু মনে হয়নি। বিশ্বনেতাদের মাতাল হিসেবে মঞ্চে থাকার ফুটেজকে রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন পরিচালক। বন্ধুরা তাদের সাহসকে একটু ধরে রাখার জন্য অ্যালকোহলকে যতটুকু না হলেই নয়, বাড়িয়ে নিচ্ছে, আবার সাথে সাথে মেপে দেখছে মাত্রারিক্ত না হয়ে যায়। একে কাজে লাগিয়ে তারা দারুণ উদ্দীপনার সঙ্গে ক্লাস নিচ্ছে, বাচ্চাদের সাথে ফুটবল খেলছে, তাদের কাজে যেন প্রাণশক্তি ফিরে এসেছে। এই সিনেমাটা পরিশেষে বলতে পারি, সেলিব্রেশন অফ লাইফ। জীবনকে উদযাপন করো। বাঁচো। নতুন করে বেঁচে-থাকার-আনন্দ উপলব্ধি আর উদযাপনের গল্প এটি।

মদ্যপানে বা আনন্দেই জীবনের স্ফুর্তি

 

ছবি সংগৃতীত

যে-ভাবনা বা দর্শনের উপর সিনেমাটা শুরু হয়, সেটা ফিন্স কর্দোরুর (নরওয়েজীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) ভাবনা থেকে উৎসারিত। কদরু বিশ্বাস করেন, মানুষ রক্তে প্রয়োজনীয় ০.০৫% অ্যালকোহল কম নিয়ে জন্মায়। এটা আসলে জীবনের জন্যে অনেকটাই কম। অথচ এই মাত্রার কাছাকাছি থাকতে পারলে মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে সবসময় হাশি-খুশি থাকতে পারতো অথবা থাকার অনুভূতি তৈরি হতো। জীবনের এই সুর, ছন্দ, প্রাণবন্ত বিষয়গুলি মানুষের থাকলে সে তার কাজে আরও ক্রিয়েটিভ বা সৃজনশীল হতে পারতো। এই নিয়ে এই সিনেমায় চার বন্ধু গবেষণা করে। অফিসের সময়ে আর কাজের মুহূর্তে অ্যালকোহলের এই মাত্রাটা ধরে রাখতে গোপনে মদ্যপান করতে থাকে আর নিজেদের পরিবর্তনটা বুঝতে শুরু করে। এরা মধ্যবয়সে পারিবারিক যে টানাপোড়নের মধ্য দিয়ে চলছে, অ্যালকোহলের আশ্রয় নিয়ে জীবনকে তারা বদলে ফেলে। এ এক মনোশারীরিক গবেষণা, নিঃসন্দেহে। দার্শনিক গবেষণাও বলা যায়। তবে এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা তারা করেছে নিজেদের ওপর।

আট বছর ধরে বউ-বাচ্চাদের নিয়ে শহরের বাইরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় নি। কিন্তু নতুন অ্যালকোহল তত্ত্বে চিন্তাটা মাথায় আসে, এবার বোধহয় ঘুরতে যাওয়া যায়। আট বছর পর সবাইকে নিয়ে ঘুরতে গেল পুরা পরিবার। রাতে, বনে, খোলা আকাশের নিচে তাদের অন্যরকম অনুভূতি হল। এরকম একটা মুহূর্তে বউ বলে, “আই হ্যাভ মিসড আস“ (আমি আমাদেরকে অনেক মিস করেছি। ফর লং টাইম (অনেক দীর্ঘ সময় ধরে)। সম্ভবত খুব বেশি বড়ো দীর্ঘ সময় ধরে এটা ঘটে গেছে।” এই যে একজন প্রিয় মানুষ পাশে থেকেও নেই, এই যে সাথে থেকেও অদৃশ্য, এই যে দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যে প্রতিদিনের অভ্যাসগত চলাফেরা, সেটা শুধুই যেন চলাফেরা, শুধুই যে অভ্যাসবশত একসঙ্গে থাকা। কিন্তু আসলে কি সেটা থাকা? না, এ থেকেও না-থাকার মতো। সেই বোধটাকে সুন্দর করে তুলে ধরেছে সিনেমাটি। দিন শেষে বাড়িতে ফেরার সময় মাছ, পটল, আলু, বাচ্চার দুধ কেনাটাই যখন হয়ে যায় প্রধান বিষয়, তখন নিজেকে খুঁজতে থাকাটাই তো স্বাভাবিক। এই খোঁজ তো আসলে নিজের খোঁজ। নিজেকে খুঁজে বের করার আকুতি। আত্ম-অনুসন্ধান। আর এ থেকেই নিজেদের মধ্যে মুক্তির আলাপ-আলোচনা শুরু হয় অ্যালকোহল তত্ত্বের প্রেক্ষাপটে। এই আলাপচারিতা, গল্প, ইত্যাদির বিশ্লেষণ জীবনের গল্পের সাথে মিশে যায়। মদ্যপানের আলাপ এভাবেই হয়ে গেল জীবনবোধের গূঢ়তত্ত্ব। উপলব্ধি আর আত্মবিশ্লেষণ। মন খারাপের সুলুক সন্ধান। সমাধান যেন এরপরও পাওয়া যাচ্ছে না।

এই সিনেমায় এরপর এই সূত্রেই এলো গান, নাচ, সুর; গল্পের সঙ্গে সবকিছু সুন্দরভাবে মিলে-মিশে গেল। কেউ কেউ হয়তো বলবেন এতো সেই গতানুগতিক গল্প। নাচে গানে ভরপুর। কিন্তু এই মুভির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পরিপ্রেক্ষিত ছাড়া কোনো কিছুই আমদানি করেননি পরিচালক। এসব এসেছে জীবনের অবশ্যম্ভাবী উদযাপনের অংশ হিসেবে। দার্শনিকতা আর মনস্তাত্বিক অবস্থাকে যথাযথভাবে পর্দায় উপস্থাপনের তাগিদে। এক্ষেত্রে ভীষণ সফল পরিচালক। দারুণভাবে নাচ-গানকে সিনেমায় নিয়ে এসেছেন পরিচালক। কী চমৎকার মেলবন্ধন।

ব্যক্তিগত শোক ও নির্মাণ

এই সিনেমার কাজ শুরুর চারদিনের মাথায় পরিচালকের ১৯ বছর বয়সী মেয়ে দুর্ঘটনায় মারা যায়। এই সিনেমার একজন পরামর্শকও ছিল সে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে। কিন্তু তার মৃত্যুজনিত দুঃখকে সাথে নিয়ে সিনেমাটিকে শিল্পে রূপান্তরিত করেছেন পরিচালক। পুরোটা সময় দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে কাজ করে গেছেন। জীবনবোধ আরো জোরালো হয়ে সিনেমার ভাষায় উঠে এসেছে। ব্যপারটা অভাবনীয়। এঁরা আসলে শিল্পী। এ প্রসঙ্গে ক্যারি ফিশারে একটা কথা মনে পড়ে গেল : Take your broken heart, make it into art. শিল্প তো এমনই। ভগ্ন হৃদয়ই শিল্পের উৎস, শিল্পের প্রেরণা, তা সে কবিতাই হোক, গান অথবা চলচ্চিত্র। বিদেশি মুভির ক্যাটেগরিতে অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘অ্যানাদার রাউন্ড’ (অথবা মদ্যপ) সিনেমাতে আরও একবার এর প্রতিফলন দেখা গেল। কিন্তু জীবনদর্শনের বিষয়টি এতটাই সূক্ষ্ণভাবে এই ছবির সঙ্গে মিলেমিশে গেছে যে, জীবন আর জীবনভাবনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ থাকে না। চলচ্চিত্রটির স্বার্থকতা এখানেই।

ফ্রিজ শট ও বেঁচে থাকা

‘অ্যানাদার রাউন্ড’ সিনেমাটা শেষ হয়েছে একটা ফ্রিজ শটের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে পরিচালক ভিনতাভেয়াহ নিজেই বলেছেন, ফ্রিজ শটের মধ্য দিয়েই তিনি সিনেমাটা শেষ করেতে চেয়েছেন, করেছেনও। কিন্তু শটটি কেমন? দেখা যাবে, এই সিনেমার প্রধান চরিত্র ম্যাডস মিকেলসন জীবনের নতুন উদ্দীপনায় নাচতে নাচতে উড়ে গিয়ে শূন্যে ঝাঁপ দেয়। কিন্তু এর পর কি হবে সে জানে না। তবে এটা সে জানে, বিশ্বাস করে, এখনো তরুণ প্রাণবন্ত একজন মানুষ হিসেবে বেঁচে আছে। এভাবেই বেঁচে থাকতে হবে। শেষ অব্দি সিনেমাটি তাই জীবনের গল্প, জীবনে ভালোভাবে বেঁচে থাকার গল্প।

এই লেখাটা সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাইলে আমাদের ফেসবুক ভিজিট করুন >> Teerandaz Antorjal

 

Share Now শেয়ার করুন