আসিফ সৈকত >> দিনটা সত্যজিতের >> জন্মশতবর্ষ বিশেষ সংখ্যা

0
344

আসিফ সৈকত >> দিনটা সত্যজিতের

উফ, কেমন যে লাগছে, সত্যজিতের ১০০তম জন্মদিনে ঢাকাতে তার ব্যনার নিয়ে হাটতে পারছি না। তার সিনেমা দেখানোর কোনো ব্যবস্থা করতে পারছি না। সবাইকে তার সিনেমা দেখানোর জন্য ডাক দিতে পারছি না। মহামারীর সময়ে সবাই আটকা পরে গেছি ।

এতো বড়ো মাপের বাঙালি, যিনি আমাদেরকে সিনেমার জায়গাতেও অনেক উপরে নিয়ে গেছেন, যার জন্য আমরা সিনেমাকে অন্যভাবে দেখি, যার সিনেমা দেখে আমরা সিনেমার শক্তি, গভীরতা, প্রভাব বুঝেছি, তার জন্মদিনে আমরা আনন্দিত, শ্রদ্ধায় অবনত, কৃতজ্ঞতায় ভরপুর, সিনেমাপ্রেমীরা, আমরা আর্শীর্বাদপুষ্ট যে তাঁকে আমরা পেয়েছিলাম।

আমাদের বাংলা ভাষায় তাঁর এতো কাজ। তাঁকে ভালোবাসা জানানো, শ্রদ্ধা জানানোটাকে মনে হয় যেন এ-আমার অতি আবশ্যিক একটা ব্যাপার, যেটা না করলে আমার দিন শুরু হবে না, আমার আবার সিনেমা নিয়ে কথা বলা হবে না, সিনেমা দেখা হবে না, প্রার্থনা শুরু হবে না, সিনেমা নিয়ে কথা বলাটা অসম্পূর্ণ আর ফাকা হয়ে থাকবে। আমার জন্ম আশির দশকে আর সিনেমা দেখা শুরু নব্বইয়ের দশকে। কীভাবে সত্যজিতের কাছে আসতে থাকলাম সেটা মনে পড়ছে। প্রথম ছবি সোনার কেল্লা। ভিসিআর-এ দেখেছিলাম। ক্যসেটের ফিতার মধ্যে দিয়ে চলা ছবি। সেইসময় সব থেকে জনপ্রিয় একটা মাধ্যম বাসায় সিনেমা দেখার। অনেক বার দেখলাম। একটা কিশোর ছেলে সিনেমাটা বুঝতে পারে, যদিও আমি পরে আরো অন্তত ১০ বারের বেশি দেখেছি এবং নতুন অনেক কিছু পেয়েছি যেটা সে-সময় বুঝি নাই, কিন্তু সব বয়সের জন্যই কিছু আছে সেখানে, আর এইখানেই সত্যজিত রায়ের কৃতিত্ব। কিশোরের মাথায় থেকে যায় হলুদ কেল্লা, সোনালি, ময়ূর, উট আরো অনেক ইমেজ, খাতায় আঁকা ছবিগুলো।
এসএসসি পরীক্ষার আগে-পরে দেখা শুরু ফেলুদা। আর বই হিসাবে এমনিতেই আমাদের পড়া আর জনপ্রিয়। ফেলুদা সিনেমা হবে মানে সেটা দেখতেই হবে। ফেলুদাকে আমরা সবাই চিনি। তার সিনেমা দেখাটা যেনো জীবন্ত ফেলুদাকে দেখা। আর সৌমিত্র ফেলুদা চরিত্রে, তপসে, জটায়ু। এতো অবিকল বইয়ের চরিত্রের মতো। যিনি লিখেছেন তিনিই আসলে দেখেছেন। তার চোখেই পেলাম সত্যিকারের ফেলুদা, তপসে, জটায়ু। এই অভাব হয়তো আর পূরণ হবে না। হবার নয়। স্রষ্টা স্বয়ং যাকে বানিয়েছেন তাকে অন্য কেউ বানায় সেই সাধ্য কার! সত্যজিতের ফেলুদা, তপসে, জটায়ু তাই আর আসবে না। কিন্তু সেলুলয়েডে থেকে যাবে আমাদের সাথে সারাজীবন।
চলচ্চিত্র সংসদের কাজ করতে গিয়ে, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার আরেকটু অন্য ধরনের সিনেমা দেখা শুরু। চারুলতা, দেবী, ঘরে-বাইরে, জলসাঘর এগুলো। কতো রকম সিনেমা কতো মাত্রায়। একেবারে ভাবই অন্যরকম। আমাদেরও বয়স হচ্ছে তখন ২০-এর উপরে, নতুন করে জীবনকে দেখার সময় এই সিনেমাগুলো দেখা। এখন পর্যন্ত ডিকোড করেই যাচ্ছি। এখনো এইসব সিনেমার সাথে আদানপ্রদান, বোঝাপড়া, নিরন্তর বিশ্লেষণ আত্ম-অনুসন্ধান চলছে এবং পুরোপুরি নিশ্চিত, কোনো ক্ষমা নাই, এটা সারাজীবনই চলবে। সত্যজিৎ ছাড়বেন না কথা বলা, তার সিনেমা দিয়ে, কথা একবার যেহেতু শুরু হয়েছে, এটা আর বন্ধ হবে না, কোনো পক্ষেরই সেই শক্তি নাই। এটা একসময় হয়ে যায়, স্বতঃস্ফুর্ত, অবিরাম, অব্যহত এবং অবারণীয়।
অ্যাডভেঞ্চারের বোধটা এসেছিলো দুটো সিনেমাতে – অরণ্যের দিনরাত্রি আর আগন্তুক-এ। বাঙালি যে এভাবে পারে, এইভাবে চলতে পারে, বেরিয়ে পড়তে পারে ঘর থেকে যখন তখন, দেশের বাইরে, স্বাধীন যেখানে সেখানে। চিন্তাকে নতুন মাত্রা দিলো সেগুলো। গুপি গাইন বাঘা বাইনের সিনেমাগুলো তো কোনো কথাই নাই। “মহারাজা তোমারে সেলাম, মোরা বাংলাদেশের থেকে এলাম,” এই লাইনটা তো একটা বেদবাক্য, একটা বাণী, একটা আত্মপরিচয়, একটা ভালোবাসা।

রাজনৈতিক জায়গা থেকে আসলো সীমাবদ্ধ, আসলো হীরক রাজার দেশে, আসলো গণশত্রু। গণশত্রু সিনেমাটা দেখলে আজো মনে হয় একটা সহজ কথা আজো কি আমরা অনেকেই সহজে বলতে পারি, যেখানে মন্দির, পুলিশ, প্রশাসন সবাইকে নিয়ে এসেছিন তিনি সহজভাবে সহজকথায়, সহজ ইমেজে। হীরক রাজার ডায়ালগ তো সবার মুখে মুখে।
কথায় কথায় আসল কথা বলতে ভুলে গেছি। এবং এটাই স্বাভাবিক। অপু ট্রিয়োলজির কথা। এটা এমনভাবে বাঙালির সিনেমার বোধের সাথে জড়িয়ে গেছে যে, আমি লেখার সময়েও সবার আগেই এটাই ভুলে গেছি। যেন এটা তো দেখবোই, এটা তো আমার সিনেমাই, এটা আলাদা করে ভাবার কি আছে। সিনেমার সীমানা পেরিয়ে এটা হৃদয়ে বসে গেছে, পথের পাঁচালী, অপরাজিতা, অপুর সংসার। প্রতিবছর দেখাটা আমাদের জন্য হজ করার মতো, প্রতিমাসে দেখাটা রোজার মতো, প্রতি সাপ্তাহের প্রার্থনার মতো।
আজকে মনে হচ্ছে সারাদিন লিখতে পারবো।
ঢাকাতে আজকে সত্যজিতের জন্যে জন্মদিনের বিশাল মিছিল সমাবেশ র্যা লি হলে ইশ কতো ভালো হতো। আহ্, মহামারী!
তার সিনেমার পোস্টারে ব্যনারে, বইয়ের কভারের ব্যনার নিয়ে সিনেমার চরিত্রগুলোর ব্যনার নিয়ে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জন্মশতবর্ষ পালনের অনেক অনুষ্ঠান হয়েছে। সেখানে পুরোপুরি একশো ভাগ থাকতে পেরে মনটা ভরে গিয়েছিলো। এখন পর্যন্ত এটাই বড়ো উদযাপন এই বছরে। আরো বড়ো কিছু হবে এই আশায় আছি। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর অনেকগুলো ভালো সিনেমা আবার বড়ো পর্দায় মানুষ দেখেছে। শর্মিলী ঠাকুর আর ঋদ্ধিমান চ্যটার্জি অনলাইনে দারুণ আলোচনা করেছেন। সে এক দারুণ স্মৃতিচারণ।
ইউটিউবে লিঙ্ক-এ আছে এই দুজনের স্মৃতিচারণের ভিডিও। রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির চ্যনেলে A Tribute to Satyajit Ray : 19th Dhaka International Film Festival (DIFF) 2021 যাঁরা দেখতে চান দেখতে পারেন। লিঙ্ক দিচ্ছি https://www.youtube.com/watch?v=VWsD9B76ha0

মনে হচ্ছে আগামী সাতদিন আবার শুধু সত্যজিতকে দেখি, পড়ি, জানি, বুঝি। আমার বাংলা ভাষায় যিনি সিনেমা বানিয়েছেন, আমাদের এতো কাছের তিনি। সিনেমার ভাষায় তিনিই তো বৈশ্বিক স্তরে বাঙালির হয়ে পৃথিবীর গল্প বলেছেন।
কোনো কারণ ছাড়াই সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা আবার ডাউনলোড করতে ইচ্ছা করছে। কেনো জানি মনে হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে আজকে সারাদিন সবাই ইন্টারনেটে সত্যজিতের সিনেমা ডাউনলোড করবে। ইন্টারনেট আজকে শুধু সত্যজিতের দিকে দৌড়াবে। ফেসবুকের পোস্ট সব তাঁকেই খুঁজবে। পত্রিকায় সবাই সত্যজিতের ছবি দেখতে চাইবে। বাংলাদেশ আজকে থাকবে সত্যজিতময়।

কী দারুণ ই না হতো করোনা না থাকলে। তবু আজকে উদযাপনের দিন। সত্যজিতকে জন্মদিনে মনের ভেতর থেকে শ্রদ্ধা জানানোর দিন।

প্রিয় সত্যজিৎ রায়,
আপনার প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা। বাংলাদেশ থেকে সব বাঙালির পক্ষ থেকে। সিনেমা ভালোবাসে এরকম সারা দুনিয়ার সবার পক্ষ থেকে।

ঢাকা, ০২ মে, ২০২১

Share Now শেয়ার করুন