আহসান হাবীব >> খুশি >> অগ্রন্থিত দুষ্প্রাপ্য গদ্য

0
294

আজ কবি আহসান হাবীবের ৩৭তম মৃত্যুদিন। এ উপলক্ষ্যে তাঁর একটি গদ্যরচনা প্রকশিত হলো। এটি একটি দুষ্প্রাপ্য লেখা। এই লেখাটি তাঁর কোনো গ্রন্থেও ছাপা হয়নি, অর্থাৎ লেখাটি একটি অগ্রন্থিত লেখা।

এই যে খুশি হতে পারা, খুব সামান্য নিয়েই খুশি হওয়ার ক্ষমতা, এ কিন্তু মুহূর্তের খুশির জন্যেই নয়। জীবন এ থেকেই আহরণ করে ভালো করে বাঁচবার ক্ষমতা, সুষ্ঠু জীবনযাত্রার উপকরণ। জীবনকে ঐশ্বর্যময় করে তোলে এই ক্ষমতা। আর সবচেয়ে বড় কথা কণা কণা করে আহরিত খুশির সেই অফুরান ঐশ্বর্য জীবনে যৌবনের দীপ্তিকে রাখে অম্লান।

বিকেল পাঁচটা থেকে ছ’টার মধ্যে আব্বা ফিরে আসেন। আপিস থেকে ক্লান্তি নিয়েই ফেরেন, কিন্তু যেদিন কিছু হাতে নিয়ে ফেরেন, যেমন কিছু ফল বা কারো জামার কাপড় বা দু একটা বই কি কিছু খেলনা… সেদিন তিনি এসেই জামাকাপড় বদলান না। আগে সব ক’টা জিনিস নেড়েচেড়ে আমাদের দেখান, কখনো বসে, কখনো বা দাঁড়িয়ে থেকেই। একটার পর একটা প্যাকেট খোলেন আর কোনটা কেমন পছন্দ হল, কোনটার কি দাম হতে পারে, এমনি সব প্রশ্ন করেন আমাদের সবকটি ভাই-বোনদের, আম্মিকেও। আমরা যে যেমন বুঝি, জবাব দিয়ে যাই। জবাব দিতে বেশি দেরি যদি হয় বা কারো যদি উৎসাহের অভাব বুঝতে পারেন, আব্বা রাগ করেন; অভিমানে মুখটা তার থমথমে হয়ে ওঠে। অনেকক্ষণ আর কথা বলেন না আব্বা, হয়তো তাড়াতাড়ি জামাকাপড় বদলে সামনের দিককার বারান্দায় গিয়ে বসে পড়েন। চুপচাপ বসে থাকেন একা। আম্মি যদি চা আর নাশ্তা নিয়ে যান, কথা বলেন না, চুপচাপ তুলে নিয়ে নাশ্তা খান, চা খান খুব খানিকটা সময় নিয়ে।

আমরা তখন বুঝি সব, বুঝতে পারি কি ব্যাপার; কিন্তু কেউ কিছু বলতে সাহস পাইনে। আম্মিও না, কেননা আব্বা যখন রাগ করেন বা অভিমান করেন, তখন তার বিমর্ষ আর ক্লান্ত চেহারায় এমন একটা কাঠিন্যের ছাপ এসে পড়ে যে তাকে তক্ষুণি ভেদ করবার কোন আশাই আমরা আর করতে পারিনে। আমরা ভয়ে ভয়ে থাকি।

একদিন দু’দিন বা কখনো কখনো তিন দিনে আবার চেহারা থেকে সেই কাঠিন্যের ছাপটা মুছে যায়। আবার তিনি নিজেই সহজ হয়ে যান, নিজেই কথা বলেন স্বাভাবিক নম্র গলায়। মনে হয়, একটা দুঃস্বপ্নময় মেঘলা সকালের ঘুম যেন আচমকা ভেঙে গেল।

আব্বাকে নিয়ে বিপদ নেই… কিন্তু ভাবনা থাকে।

সেদিনও প্রায় ছ’টায় বাড়ি ফিরলেন আব্বা। এসে প্রথমেই ঘড়িটা হাত থেকে খুললেন, খুলে শেলফের ওপরে রাখলেন। মনে হলো সেটা রাখতে গিয়ে আব্বা যেন একটু বেশিই দেরি করলেন। চট্ করে না রেখে একটু যেন এখান-ওখান করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরে এক জায়গায় রেখে দিলেন। অফিসের পোশাক বদলে লুঙ্গি আর শার্ট পরলেন, তারপর হাতমুখ ধুতে বেরিয়ে যেতে যেতে আবার হঠাৎ ফিরলেন তিনি। চট্ করে ঘড়িটা তুলে নিয়ে সোজা আমার কাছে সরে এসে ঘড়িটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, দেখ তো মা ব্যান্ডটা কেমন হলো। আম্মি আমার ডান ধারে বসেছিলেন। কিন্তু আম্মির হাতে দিলেন না। অবশ্য আমি বুঝি এখন। এতদিনে আব্বার চালাকি ধরে ফেলেছি আমি। বলছি না, আব্বা ভীষণ অভিমানী। আম্মি জানতেন না। আব্বার ঘড়ির ব্যান্ডটা ছিঁড়ে যাচ্ছে, আমি লক্ষ করেননি। কিন্তু ও জন্যে আব্বার কোন নালিশ নেই। তবে নতুন ব্যান্ডটা কিনে নিয়ে এলেন, আর সেটাও আম্মির চোখে পড়ল না, এজন্যে তাঁর যে কতখানি অভিমান হতে পারে তা এখন বুঝতে পারি আমি। আর এও বুঝতে পারি, ঘড়িটা আমার হাতে দিলেও পরোক্ষে ওটা আম্মির কাছেই দেওয়া। সরাসরি দিতে তাঁর বাঁধছে মানে আর কি!

পরে শুনেছিলাম ব্যান্ডটার দাম এক টাকা মাত্র। কিন্তু ফিনিশিং এত ফাইন যে এটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে আব্বা মনস্থির করে ফেললেন, ওটাই কিনবেন বলে। না হয় একটু কমই টিকবে, তবুও।

শুধু এই ব্যান্ডই নয়। একটা ডেকচি, এক বান্ডিল সুতো, একটা জুতোর কালি সবকিছু নিয়েই তাঁর সমান উৎসাহ। কিছু উল, কারো নতুন জামা বা একটা নতুন ধরনের খেলনা হলে তো কথাই নেই। এক গজ লং ক্লথও যদি আনেন কখনো তার দাম সম্পর্কে প্রশ্ন বা দামটা শুনে আমাদের কিছু কিছু মন্তব্য না শোনা পর্যন্ত আব্বা স্বস্তি পান না।

আমরা পারিনে; ঠিক অতটা উৎসাহ দেখাবার কথা মনে থাকে না আমাদের সব সময়; বিশেষ করে অতি সাধারণ এইসব জিনিসপাতি নিয়ে। তাই মাঝে মাঝে এমন হয়, আব্বা হঠাৎ বিমর্ষ হয়ে যান। কিছু সময় বা এমন কি কয়েক দিনের জন্য কথা কম বলেন। তারপর আবার যখন কথাবার্তা বলতে শুরু করেন, যখন তিনি মনে মনে আমাদের সব ত্রুটি একসময় ক্ষমা করে দেন তখন তিনি বলেন। অনেক কথা বলেন, এতো বেশি বলেন যে মনে হয় যেন দুদিন কথা না বলে তিনি মরে যাচ্ছিলেন। আর এসব ব্যাপার নিয়েই বলেন তিনি।

আমরা যদিও প্রতিবাদ করিনে, অভিযোগ করিনে কিছু নিয়ে… আব্বা নিজেই কিন্তু আমাদের হয়ে প্রশ্ন করেন; তারপরে আবার নিজেই জবাব দিতে থাকেন। আর তখন আপনার কণ্ঠস্বরে যে স্নেহ, যে ভালোবাসা ক্রমেই নিবিড় হয়ে আসতে থাকে তার স্পর্শে আমাদের সবার… সব ভাইবোন আর আম্মির মাথা নুয়ে আসতে থাকে; আমাদের কান্না পেয়ে যায়; আমরা তখন লজ্জাবোধ করি; গভীর দুঃখে আমাদের কণ্ঠ যেন বারবার বুঁজে আসতে থাকে।

আব্বা বলেন, তোমরা হয়তো মনে মনে ভাবো, এমনি সব অতি সাধারণ সামান্য সব জিনিস নিয়ে এত উৎসাহের কি আছে? হ্যাঁ, ভাবতে পারো। কেননা এ দেশের প্রায় সবগুলো পরিবারই যখন এ প্রশ্ন করতে পারে বলে… এমন কি করবে বলেই জানি; তখন তোমাদের আর দোষ দেবো কেন, কোন কিছুতেই যেন খুশি হতে চায় না এরা।। খুশি না হওয়ার একরকম বিলাসে মগ্ন থাকতে ভালোবাসে।

বুক টান করে হাঁটতে নেই, পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকতে নেই, কড়া ইস্তির জামা নয়, মুখ মোছার রুমাল নয়, জুতোর পালিশ নয়। এসব যদি থাকলো, আমার বয়সটা যে লুকিয়ে থাকে! আমরা তাড়াতাড়ি বয়স্ক হতে ভালোবাসি… তাই বয়সের চাইতেও বয়সের ভড়ংটা আমাদের বেশি।

হঠাৎ কিছুতে খুশি হয়ে ওঠার সামান্য খুশিতে প্রাণ খুলে হেসে ফেলায় বা ছলছলে ভাষায় মনের খুশি ব্যক্ত করায় লজ্জার যেন অবধি নেই। তিরিশোত্তর পুরুষ আর আঠারো পেরিয়ে মেয়েরা যদি খুশি হয় আর সে খুশি যদি চোখেমুখে বা সারাদেহে আভা ছড়ায় তার চাইতে লজ্জার আর কিছুই নেই। কিছুতেই নেই এমন ছেলেমানুষি।

আব্বা এসব কথা বলতেন আর দেখতে দেখতে তার চোখমুখ রাগে আর উত্তেজনায় যেন ফুলে ফুলে উঠতো। তিনি বলতেন, এদেশের পুরুষদের গর্ব আছে ক্রমেই বিমর্ষ আর মলিন হয়ে যাওয়ায়; দিনদিন দ্রুতগতিতে শুকিয়ে যাওয়ায়। আর মেয়েদের কথা যদি বলো, (পঞ্চাশে যারা ভ্রূ কামায় তাদের তুমি দেখতে যেও না) সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েদের দেখো, বিশের পর থেকে ওরা ওদের রূপ আর স্বাস্থ্য মা ভাই-বোন, দেবর ননদ শাশুড়ি এমন কি স্বামীর কাছ থেকে পর্যন্ত লুকিয়ে রাখবার জন্য যে সদাসতর্ক সাধনায় রত থাকে তা দেখবার মতো। সুন্দর উজ্জ্বল মুখখানাতে গোটাতিনেক কালির পোচ যদি না থাকে, এক সন্তানের মা শরমে ঘামতে থাকে; মুখ লুকোবার জায়গা খুঁজতে থাকে।

বুক টান করে হাঁটতে নেই, পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকতে নেই, কড়া ইস্তির জামা নয়, মুখ মোছার রুমাল নয়, জুতোর পালিশ নয়। এসব যদি থাকলো, আমার বয়সটা যে লুকিয়ে থাকে! আমরা তাড়াতাড়ি বয়স্ক হতে ভালোবাসি… তাই বয়সের চাইতেও বয়সের ভড়ংটা আমাদের বেশি। যারা বয়সে ছোট, তারা সামনে পড়লেই আমার মূর্তিমান বয়স্কতার সামনে সংকোচে ভয়ে এতোটুকু হয়ে যাক, এই আমরা চাই। সহজ গলায় দুটো মনের কথা বলে যাবে ছেলেটা, এ আমরা বরদাশত করতে পারিনে।

আমরা যদি কেউ বলতাম… বলতাম না অবশ্যি… ভয় হতো কথা বলতে। আব্বা নিজেই বলতেন, তোমরা হয়তো প্রশ্ন করবে, খুশি হওয়া আর রূপচর্চায় লজ্জাবোধ এর মধ্যে সম্পর্ক কি?

তাহলে বলি শোনো : সবকিছুর মূলে ওই নিরাসক্তি। নিরাশক্তিতে আমাদের গৌরববোধ। তাই রূপ যেমন দেখতে নেই, সুন্দর হয়ে যেমন থাকতে নেই, তেমনি খুশিও কাউকে দেখাতে নেই। তারও বেশি। আমাদের বিশ্বাস, খুশি কিছুতে হতেই নেই। খুশি হতে আমরা কেবল লজ্জাই পাইনে ভয়ও পাই। দেখনি, কোথাও কোথাও ছেলেমেয়েরা হঠাৎ খুব হাসতে যদি শুরু করে, মা-বাবা তাদের ভবিষ্যৎ অমঙ্গল আশঙ্কায় আঁতকে ওঠেন; সঙ্গে সঙ্গে ধম্কে ধম্কে ওদের থামিয়ে দেন।

নিজে যে খুশি হতে জানে না, পারে না যখন তখন যাহোক কিছু নিয়ে খুশি হতে, সে কি করে অপরকে খুশি করবে!

আব্বা এই সেদিনকার সেই ঘড়ির ব্যান্ডটা নিয়েই কথা বলছিলেন আজ চারদিন পর। সমস্ত সমাজেরই চেহারাটা দিন দিন কেমন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

এই ধরো, সেদিনকার সেই ঘড়ির ব্যান্ডটা। সামান্য একটা ঘড়ির ব্যান্ড, এক টাকা দাম… বিশেষ কিছুই নয়; কিন্তু তবু যে বিশেষ সেটাই আমরা ভুলে থাকি। একটা মানুষের পোশাক থেকে একটা পুরনো অংশ বাদ গেলে, নতুন একটা তার জায়গা নিলে, একটা পরিবারের নতুন একটা জিনিসের আমদানি হয়েছে। কাল থেকে অনেকের চোখে পড়বে এই নতুন জিনিসটা। সময় দেখতে গিয়ে মালিকেরও যেমন বার বার চোখে পড়বে, তার হাতের কব্জিতে একটুখানি নতুন আভা আর নতুন শোভা, তেমনি অন্যের যখন চোখে পড়বে সেটা, সে জানবে না কেন, কিন্তু অজান্তেই তারও ভালো লাগবে ওই হাতখানা। আর এই যে ভালো লাগাটুকু এই-ই শুনলে আশ্চর্য হবে, একটা পঞ্চাশ হাজার টাকার ব্যবসায় বা একটা মনের মতো চাকরির একমাত্র কারণ হতে পারে।

তোমরা হয়তো বলবে, আব্বা এবার নিজেই আমাদের হয়ে একটা প্রশ্ন তুললেন। বললেন, তোমরা হয়তো বলবে, সে তো খুশি করবার ব্যাপার; খুশি হওয়ার কথা তাহলে আসছে না তো!

আসছে। আব্বা প্রশ্ন শেষ করে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে শুরু করলেন। বললেন, নিজে যে খুশি হতে জানে না, পারে না যখন তখন যাহোক কিছু নিয়ে খুশি হতে, সে কি করে অপরকে খুশি করবে! ঘড়ির নতুন ব্যান্ড আমাকে খুশি করে, পালিশ করা জুতো পড়ে আমি খুশি হই, হোক সে জুতো পুরনো তবুও।

আর এই যে খুশি হতে পারা, খুব সামান্য নিয়েই খুশি হওয়ার ক্ষমতা, এ কিন্তু মুহূর্তের খুশির জন্যেই নয়। জীবন এ থেকেই আহরণ করে ভালো করে বাঁচবার ক্ষমতা, সুষ্ঠু জীবনযাত্রার উপকরণ। জীবনকে ঐশ্বর্যময় করে তোলে এই ক্ষমতা। আর সবচেয়ে বড় কথা কণা কণা করে আহরিত খুশির সেই অফুরান ঐশ্বর্য জীবনে যৌবনের দীপ্তিকে রাখে অম্লান।
তোমার পোশাকে, তোমার চলার আর কথা বলার ভঙ্গিতে তখনই আসে জড়তা, যখন মনে এসেছে ক্লান্তি – সেই মানসিক ক্লান্তিকে যতদিন সম্ভব দূরে সরিয়ে রাখবার সাধনাই মানুষের সাধনা হওয়া উচিত। আর সে সাধনা কি করে করব আমরা? পৃথিবীতে আমার জন্যে এখনো অনেক অনেক উজ্জ্বল মুহূর্ত অপেক্ষমান, এ-কথাটি সবসময় মনে রেখো।

উৎস

সমকাল, ৫ম বর্ষ, ৫-৬ সংখ্যা, ১৩৬৮