আয়শা খানম >> নারীর প্রতি সহিংসতা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ >> প্রবন্ধ

0
424
নারীর প্রতি সহিংসতা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ
আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখি যে, সংস্কৃতির ইতিহাস চর্চা, আন্দোলনের ইতিহাস চর্চা, উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রাম, সামাজিক সংস্কার, আন্দোলন, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মহীয়সী রোকেয়া সাখাওয়াতের নারীর অধিকার ভাবনা (যা শুধু উপমহাদেশ শুধু নয়, বৈশ্বিক মাত্রায়) – তা যে একটা অতি অগ্রসর নারীবাদী চিন্তা, যা আজকে বিশ্বনন্দিত এবং যেটা নারী আন্দোলনের মূল দর্শন এবং রাজনীতি – এই ভাবনা কিন্তু এখানেই বিকশিত হয়েছে। এই ইতিহাস আমাদের। আমরা এগুলো জানি এবং তখনকার সাময়িক পত্রের ইতিহাস এবং সাহিত্য থেকে আমরা জানি।
এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন প্রতিরোধের কাজটা নব্বইয়ের দশকের পর থেকে নতুন মাত্রা ধারণ করে। নারী ও কন্যা নির্যাতন প্রতিরোধ কার্যক্রম বৈশ্বিকভাবেও আফ্রিকার দেশগুলোতে, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে, এমনকি ইউরোপ এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতেও ভিন্ন ভিন্ন আন্দোলনের মাত্রা পেয়েছে। সম্প্রতিক সময়ে #মি টু’ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে আমরা বুঝলাম সমাজের গভীরে প্রোথিত নারী-পুরুষের যে একটা বৈষম্যমূলক অবস্থান যেটাকে আমরা বলি (socially constructed) একটা বৈষম্যপূর্ণ মূল্যবোধ, জীবনবোধ, একটা জীবনচর্চা, সমাজ, ব্যক্তির দেহের রক্তের সঙ্গে শ্বেতকণিকা-লোহিত কণিকার মতো ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে, এটা প্রতিভাত হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে অনেক অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে কিভাবে এই যে নেতিবাচক অবক্ষয় এবং ইতিহাসের নেতিবাচক সংস্কৃতি, সেই নেতিবাচক অভিজ্ঞতা, তার এই অভিঘাতের যে ফলাফল, সেটাকে যে কতদিন টেনে নিয়ে যেতে হবে – নারী আন্দোলন, মানবাধিকার আন্দোলন, দেশের গণতান্ত্রিক মানবাধিকারের আন্দোলন – এ সব অভিজ্ঞতাই তুলে ধরতে হবে। দীর্ঘদিনের সেই পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি, যেটা আমরা বলি নারীবাদের পুনঃনির্মাণ করতে হয়েছে। এই কাজ শুরু করেছিলেন রোকেয়া সাখাওয়াত ১৯০৫ সালে, তাঁর সেই চিন্তা-ভাবনা সমাজে নারী অবস্থানের অসাধারণ স্যাটায়ার, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, হাস্যরস, অসাধারণ স্বপ্নচারিতা (সুলতানাস্ ড্রিম) এবং নারীদের যে অধস্তন অবস্থান (অবরোধবাসিনী) এবং স্ত্রী শিক্ষা সম্মেলনে তার সুপারিশ – সেই প্রতিরোধের কাজগুলি কিভাবে সংগঠিত হয়েছিল তার সারবস্তু ও চেতনা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সম্প্রসারিত করতে হবে।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন একটা টর্চ নিজের ভিতরে জ্বালিয়ে তিনি কিন্তু সমাজকে অগ্রসর করেছেন, আলো জ্বালাবার কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছেন – অভিজাত স্বচ্ছল পরিবারেও নারীজীবনের মানবিক ন্যূনতম অধিকার, অধস্তনতা, অসহায়ত্ব ছিল। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তীব্র অনুভব ও উপলব্ধির ভিত্তিতে নারীর প্রান্তিকতা তিনি তুলে ধরেছেন। আমরা সেই দিক থেকে অনেক ভাগ্যবান এবং আমাদের সমাজ সংস্কারকগণ, এগুলো কিন্তু অ্যাক্টিভিজম পর্যায়ে শুরু করে দিয়েছেন। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নারীশিক্ষা, বিধবা বিবাহের দাবিতে সংস্কার আন্দোলন, রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে বাল্যবিবাহ বিরোধী আন্দোলন ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা এই উপমহাদেশে নারীর ব্যক্তিঅধিকারের দাবিতেও সামাজিক সংস্কার ও মানবাধিকারের আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। আমরা দেখেছি, ‘যাহা যাহা পুরুষ পারিবে তাহাই নারী পারিবে’- রোকেয়ার সুস্পষ্ট উচ্চারণ। আমরা দেখলাম ১৯৩০ সালে যে উপনিবেশবাদবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম, মাস্টার দা সুর্যসেনের সঙ্গে প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দারের আন্দোলন, আত্মদান। সুতরাং সাহস, শক্তি ও শিক্ষা এগুলো কিন্তু ইতিহাসের ভেতরেই থাকে। ইতিহাস সেসব মাল-মসলা দেয়। আমরা এমন একটা উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮০ সাল থেকে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কিভাবে নারীর প্রতি সামাজিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে, আইনগতভাবে যে বৈষম্যের জের তাকে টানতে হয়, অধস্তনমূলক অবস্থান, বৈষম্যমূলক অবস্থান সেসব কিভাবে পরিবর্তন করা যায়, সমাজে-রাষ্ট্রে-ব্যক্তির কাছে তুলে ধরা এবং ঘটনাগুলো ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে প্রতিরোধ প্রতিকারের একটা ব্যবস্থা করার জন্য সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হয়। অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিতে রাইট বেইজ অ্যাপ্রচ এবং সেবামূলক কাজের সূত্রপাত ঘটে। আমরা আইন সংস্কার আন্দোলন করছি। বস্তুনিষ্ঠভাবে, নির্মোহ-নিরেপেক্ষভাবে দেখলে যে-কোন গবেষক, যে-কোন শিক্ষাবিদ, যে-কোন ইতিহাসবিদ দেখতে পাবেন যে, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যতোগুলো আইন হয়েছে মহিলা পরিষদ চেষ্টা করেছে সেখানে অগ্রণী, উদ্যোগী, সচেতন ভূমিকা নেয়ার। সমস্যাগুকে চিহ্নিত করার। এই সমস্যার মোকাবেলার জন্য কী ধরনের আইন প্রয়োজন, তার জন্য নীতিনির্ধারকের কী ভূমিকা দরকার, নারীআন্দোলন অ্যাক্টিভিস্টদের কী ভূমিকা দরকার, সমাজ-পরিবার-ব্যক্তির কী ভূমিকা থাকা প্রয়োজন – সেসব নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছি।
শুধু নলেজ না, সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম – এনজেন্ডারিং নলেজের জন্য একটা হলিস্টিক, সামগ্রিক, সমন্বিত দৃষ্টি নিয়ে গোটা সংগঠন এবং সমাজের বৃহত্তর এনলাইটেড অংশ, সমাজের অগ্রসর আলোকিতজন – তাদেরকে যুক্ত করে নারী ও কন্যা নির্যাতন প্রতিরোধ, সামাজিক অনাচার প্রতিরোধের জন্য ১৯৮৫ সালে শ্রদ্ধেয় সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে আন্দোলনের সূচনা করা হয়েছিল। এরপর বিশেষ বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সমন্বিত কার্যক্রম শুরু করা হয়। আইনগত সহায়তা দেয়া, লিগ্যালএইড ক্লিনিক পরিচালনা করা এবং সেবামূলক সহায়তা কর্মসূচি ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু হয়, নির্যাতিত নারীদের জন্য সাময়িক একটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়, নাম দেয়া হয় রোকেয়া সদন। এটা হচ্ছে যখন মামলা পরিচালনা করা হবে, যখন একজন নারী ডেস্টিটিউট এবং সমস্ত দিক থেকে ছিন্নমূল, তার জন্য সহায়তমূলক কাজ। এটা কোন পৃথক প্রজেক্ট বা কর্মসূচি নয়, নারী নির্যাতন প্রতিরোধের কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
২.
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কাজের অতি অপরিহার্য কর্ম প্রতিষ্ঠানের উপলব্ধি তীব্রভাবে শুরুতেই অনুভূত হল। সেভাবেই শুরু ‘রোকয়া সদন’ নামক সাময়িক নিরাপত্তা বেষ্টনীর। শ্রদ্ধেয়া সুফিয়া কামালের প্রস্তাবে সাময়িক অভয় কেন্দ্রের মাধ্যমে শুরু হল নির্যাতনের শিকার, ধর্ষণের শিকার, সামাজিকভাবে পতিত, পরিত্যক্ত নারীদের সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজ, তাদের পুনর্বাসনের কাজ।
১৯৮৫ সালের ৩১ জানুয়ারি রোকেয়া সদনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। রোকেয়া সদন একটি আদর্শ সাময়িক নিরাপত্তাকেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি এমন উচ্চ দাবি আমরা করব না; কিন্তু ঐ অভয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাকারীদের একটা উচ্চাকাঙক্ষা ও মহৎ আদর্শ আছে, তা হল, যখন কোন নারীর পাশে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার সহায়ক হয়ে দাঁড়াবে না, তখন সেই নারীর পাশে সহায়তা নিয়ে সহায়ক হয়ে মহিলা পরিষদ ও রোকেয়া সদন দাঁড়াবে। রোকেয়া সদন কারো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়- তাড়িত, ব্যথিত, লজ্জিত, লুণ্ঠিত নারী সাময়িকভাবে মানসিক শান্তি সামাজিকভাবে জীবনের সামান্য ন্যূনতম নিরাপত্তা, সামান্য ক্ষুণিœœবৃত্তি, হৃত অধিকার, পরিবার পরিজন, হারিয়ে যাওয়া যাপিত জীবন পুনরায় ফিরে পাবে এমন একটা পথ করে দেওয়া। এমন একটা আশাভরসা মনে তৈরি করে দেওয়া, ভবিষ্যৎ জীবনে আর্থিকভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াবার ব্যবস্থা করে দেওয়ার মাধ্যম হল রোকেয়া সদন। এই ভরসাকেন্দ্র থেকে সমাজে ও জীবনের পথে পা বাড়িয়ে একজন তরুণী, কিশোরী বা নারী যেন এই আত্মপ্রত্যয় নিয়ে অগ্রসর হতে পারে যে, সমাজ, আইন, দেশ, পরিস্থিতির ঘূর্ণিজালে পড়ে যে জীবনে সে পড়েছিল এটাই প্রকৃত জীবন নয়; আরও উন্নত, আরও নিরাপদ, আরও মর্যাদাযুক্ত, আরও সুন্দর জীবন আছে। আর সেই জীবনের সন্ধান তাকেই করতে হবে। জীবন সম্পর্কে একটি দায়িত্বশীল, আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন আত্মপ্রত্যয়ী সমাজ গড়ে তোলা মহিলা পরিষদের কাজ। রোকেয়া সদনের বিভিন্নমুখী কাজের মাধ্যমে আত্মপ্রত্যয়ী নারী গড়ে তোলার কাজ অব্যাহতভাবে চলছে। আজ চার দশক পরে যখন আবার পুনর্মূল্যায়ন করি মহিলা পরিষদের কাজে সদনের ভূমিকা, এর সামাজিক-সাংগঠনিক প্রয়োজন, তখন পুনরায় উপলব্ধি করি রোকয়া সদন’ হচ্ছে বাংলাদেশের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর আমরা আজকাল এ-ও উপলব্ধি করছি যে এর পেশাদারী ক্ষমতা, সুযোগ, সামর্থ আরও বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতন প্রতিরোধের বহুমুখী কাজে যে বহুমাত্রিকতা প্রয়োজন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ৩৫ বৎসরের রোকেয়া সদনের ইতিহাস আমাদের সামনে তুলে ধরে হাজারো তরুণী-কিশোরী, বয়স্ক নারীর মর্মন্তুদ জীবনের অভিজ্ঞতা, যা আমাদের আবার বলে দেয়- এ ধরনের নিরাপদ বেষ্টনীর জাল আরও বাড়িয়ে দিতে হবে। শক্তিশালী বৃহৎ ছাতার মতো মাথার উপর তুলে ধরতে হবে একটুখানি সাময়িক আশ্রয়, একটুখানি নিরাপদ জায়গা, যেখানে দাঁড়িয়ে একটু দম নেবে জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত একজন বিধ্বস্ত নারী, একজন কিশোরী তরুণী অথবা বয়স্ক নারী সামনের দিকে সাহসের সাথে পা বাড়ানোর জন্য। আশি-নব্বই দশকের বাংলাদেশ আজ আর নেই। আজ ২০২০ সাল। এ সময়ে ইতিমধ্যে বৈশ্বিক নারী আন্দোলনেও অর্জিত হয়েছে বিপুল-বিচিত্র জটিল অভিজ্ঞতা। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অর্জিত হয়েছে বাস্তব বিপুল অভিজ্ঞতার সম্ভার। নারী ও কন্যা নির্যাতন প্রতিরোধ আজ বৈশ্বিক নারী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মূল কাজ। আর এ কাজে নারী নির্যাতনের ফলে যে সামগ্রিক সংকট তৈরি হয় সে দিকটির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে জাতিসংঘ ঘোষিত কর্মসূচি ও কনভেনশনসমূহ। তাই দেখা যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় এবং আঞ্চলিক বা দেশীয়-মহাদেশীয় নানামুখী বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা মূল্যায়ন, নিরীক্ষাধর্মী গবেষণা করা হচ্ছে। এসব প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সুপারিশ ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি দেশ তার নিজস্ব বাস্তব জীবন-চাহিদা অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। আর এসব ভূমিকার কী ফলাফল, তারও একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে। একে অপরের এই মূল্যায়ন থেকে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা গ্রহণ করছে। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা – দেশভেদে কখনও ভিন্ন ভিন্ন কখনও একই রকম কর্মসূচি নিচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় নারী ও কন্যা নির্যাতন এবং এইচআইভি ও এইডস-এর ভয়াবহ শিকার নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সহায়তা দিয়ে তাদের জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান তথা নারীর ক্ষমতায়নের কাজে এই সেবামূলক কাজগুলো আজ অনেক বেশি জরুরি রাজনৈতিক অধিকারভিত্তিক সাংগঠনিক কাজ হয়ে পড়েছে। বিশ্বের বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলোতে (যেখানে যুদ্ধ চলছে বা রাজনৈতিক সহিংসতা চলছে) সকল প্রকার সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতার শিকার নারী-শিশুদেরও এ ধরনের সাময়িক সহায়তা, নিরাপদ অভয় কেন্দ্রের কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে জরুরি ভিত্তিতে। নাইজেরিয়ার বোকো হারাম নারী ও কন্যাদের অপহরণ করে নিয়ে তাদের উপর যে পাশবিক অত্যাচার করে, বোকো হারামের সেই ভয়াবহ নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা ও বিশ্ব নারী, মানবাধিকার আন্দোলনের সংগঠনের অভিজ্ঞতা আজ আমাদের সকলের জন্যই বিশেষভাবে প্রাণিধানযোগ্য। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আবারও শিক্ষা দেয় যে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এ ধরনের অভয়কেন্দ্রের পরিচালনা একান্ত প্রয়োজন। সেখানকার একটি গবেষণায় দেখা যায়, একশ জনের মধ্যে আশি জন নারী ধর্ষণের শিকার এবং এদের অধিকাংশকেই দৈহিকভাবে ধর্ষণ করা হয়নি। (এদের কেউ কেউ যন্ত্রের মাধ্যমে, কাউকে বা কাঠি দিয়ে, কাউকে বন্দুকের বাট দিয়ে, কাউকে বোতল দ্বারা এটা করা হয়েছে)। আজকের এই সভ্য পৃথিবীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবিষ্কার ও অগ্রগতির এই সময়ে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও দর্শনের তথা জীবনচর্চার অগ্রযাত্রার এক হিমালয়সম উঁচু চুড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব নারী আন্দোলনের একজন সংগঠককে যখন মানবিকতার চরম বিপর্যয়ের এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হয় তখন এক্ষেত্রে প্রথমে প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় কি করে মর্মান্তিক নিষ্ঠুরতার শিকার একজনকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আয়োজন করে পাশে দাঁড়ানো যায়। কি করে প্রথমেই তাদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়। সাহস-ভরসা দেয়া যায়। তাদের বিষণœতা, তাদের অনিদ্রা, দুঃস্বপ্ন, অতীতের ভয়াবহ স্মৃতিচারণ, তাদের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময়, নানাভাবে মানসিক সহায়তা প্রদান- এসব আজ বৈশ্বিক নারী আন্দোলনে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে জরুরি কাজ। এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ- যেখানে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বিরোধ চলছে- সেগুলোর অভিজ্ঞতাও প্রায় এক। নির্যাতনের শিকার এইসব নারী শিশুদের কীভাবে আইন ও ন্যায় বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা যায় এবং সেই সময়ে সাময়িকভাবে থাকা, নারী আন্দোলনের সহযোগিতা নেয়া ন্যায় বিচার পাবার ক্ষেত্রে বাধাগুলো দূর করা, এসব নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে। অনেক নিরীক্ষাধর্মী কাজ চলছে। নির্যাতনের শিকার নারীর যে মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি হয় সেই ক্ষত দূর করার জন্য মনস্তত্ত্ববিদদের সহায়তা নেয়া হচ্ছে। যারা এসব কাজ করেন তাদেরকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। নারী ও শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের ফলে মানসিক ও শারীরিক জরুরি মানবিক সংকট হয়ে দাঁড়ায়। আর তখন এ দায়িত্ব ব্যক্তি থেকে ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। কখনও কখনও এইসব অভিজ্ঞতা আমাদের ভঙ্গুর গণতন্ত্রের দুর্বল সংস্কৃতির ইতিহাসের অবস্থানও তুলে ধরে। আমরা জড়িয়ে পড়ি আরেক বৃহত্তর কর্মবোধে। নারীকে সহায়তা দেওয়ার, নারী নির্যাতন প্রতিরোধের কাজ যেমন চলে বহুমাত্রিক পদ্ধতিতে, তেমনি এ সেবামূলক কাজেরও সৃষ্টি হয় সুদূরপ্রসারী প্রভাব, যা বহুমাত্রিক ও ইতিবাচক। রোকেয়া সদন পরিচালনার ক্ষেত্রে মহিলা পরিষদকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে এসব অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও সুপারিশসমূহের প্রতি। নিজ দেশের বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী এসব সুপারিশ পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কারণে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভেদে এক ধরনের শ্রেণী-লিঙ্গ বিভাজনের কারণে নিপীড়ন, নিস্পেষণ ও নিষ্ঠুর আচরণের শিকার যে অসহায় নারী জনগোষ্ঠী তৈরি হয় তাদের পাশে দাঁড়ানো সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা আজকের বিশ্বের অন্যতম বৈশ্বিক কর্তব্য। মহিলা পরিষদ এই কর্তব্যবোধ ও বৈশ্বিক আদর্শিক ধারণার সঙ্গে আদর্শগতভাবে একমত। রোকেয়া সদন পরিচালনার পেছনে মানবতাবাদ এই আদর্শবাদিতা ও কর্তব্যবোধ কাজ করে। এটি একটি মানবিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক দায়িত্বও বটে।
আর এজন্য গোটা সংগঠনে আমাদের শ্লোগান- ‘যেখানেই মহিলা পরিষদ সেখানেই নারী ও কন্যা নির্যাতন প্রতিরোধের কাজ’ থাকবে। চারজনের একটি প্রাথমিক আহবায়ক কমিটি থাকলেও কেন্দ্রে শুধু না, প্রত্যন্ত এলাকায়ও সেখানে তা নিয়ে প্রতিরোধ-প্রতিকার, সমাজের ভিতরে কথা বলা, বিবেকী উচ্চারণ, সমাজের ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা, অর্থাৎ নারী ও কন্যার প্রতি সকল প্রকার সহিংসতা দূর করে একটা মানবিক সংস্কৃতির আবহ তৈরি করা সেটাই প্রতিরোধের কাজ। আমরা যে কথাটি অনেক আবেগ ও অহংকারের সাথে বলি ‘আমরা আলোর পথযাত্রী Ñ রোকেয়া সদন থেকে প্রকাশিত একটি স্মরণিকার নাম রাখা হয়েছে এরকমই। প্রকৃত অর্থে আমরা ইতিহাসেরই অন্ধকার থেকে যে আলো উৎসারিত হচ্ছে, সেই আলোর পথযাত্রী। আমরা সেখানে মানবিকতার আলো, মানবিক আদর্শের আলো, যুক্তির আলো এবং ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণী নির্বিশেষে নারী-পুরুষ, লিঙ্গ ভেদাভেদ নির্বিশেষে যে একটা মানব সন্তানের সংস্কৃতি, সেই মানবিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা করছি পুনঃনির্মাণের। এমন একটা মহতি প্রচেষ্টা ও উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা করছি। এই উদ্দেশ্যে আমরা কি ধরনের কর্মকাণ্ড যত ক্ষুদ্র, তুচ্ছ হোক না- সেটি কিভাবে করছি বছরের পর বছর, দশকের পর দশক, প্রত্যন্ত এলাকার আমাদের কর্মী বোনেরা, সাধারণ সদস্য থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন অংশের বিশিষ্ট জনেরা, বিভিন্ন নারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা- সকলেই কিন্তু আমাদের এই কাজে সহযোগিতা করছেন তা বাস্তবে পরখ করে লিখিত প্রতিবেদন লেখা, করণীয় সুপারিশ (তৃণমূল ও কেন্দ্র ও জেলা) সকলের সুপারিশ লিখিত প্রতিবেদনে তুলে ধরার প্রচেষ্টাও চলছে।) সংগঠনের তো বটেই যে-কোন একজন বিবেকী মানুষ সমাজের, প্রতিষ্ঠানের যে-কোন জায়গায়, যে-কোন ক্ষেত্রে আমাদের এ কাজে সহায়তা করেন এবং আমাদের এই কর্মকাণ্ড বিশেষ করে রোকেয়া সদন আজকের দীর্ঘ চার দশকের অধিক সময় ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান সকলের সহযোগিতায় চলছে। এই কাজটা একটা মেডিক্যাল ক্লিনিক, একটা হাসপাতালের মতো, রোগ নিরাময় কেন্দ্রের মতো। সমাজের বড় একটা ব্যাধি যে নারী ও কন্যার প্রতি সহিংস আচরণ, বিশেষ একটা সংকট, মহাসংকট, ভাইরাসের যে সংকট তার মাঝেও আমরা লক্ষ্য করেছি এগুলি। অর্থাৎ এটা সামাজিকভাবে গড়েওঠা একটা অসুখ, গুরুতর ধরনের অসুখ। এটা শুধু আমাদের সমাজের না, ব্যক্তি-মনস্তত্বের গভীরে, আমাদের রক্তের মাঝে, লোহিত কণিকা, শ্বেত কনিকার মাঝে কেন প্রবাহিত হচ্ছে সেই বিষয়টিও নারী আন্দোলনকারীদের আজকে ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা এখানে লক্ষ করেছি যে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের যে পিতৃতান্ত্রিক, পশ্চাৎপদ, বিভিন্ন ধরনের গোড়ামি, প্রতিক্রিয়াশীলতা, নারীর অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা এবং সঠিক ধারণা না থাকা, নারী-পুরুষের সম্পর্কের মাঝে বিরাজমান। আমাদের প্রচলিত প্রবাদগুলো পড়লে আমরা বুঝতে পারি। যেমন- সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, সোনার সংসার ধ্বংস হয় কু-রমণীর কারণে বা নারী নরকের দ্বার। যেনো পুরো দায়িত্বটাই নারীর এবং নারীকে যে ওখানে একটা দায়বদ্ধ জায়গা না দিয়ে, অধিকার না দিয়ে প্রান্তিকভাবে রেখে দায়িত্বটা দেয়া হচ্ছে, আইনগতভাবে তার সমান অধিকারের কথা অস্বীকার করা হচ্ছে এবং আইনিভাবে যখন এটা অস্বীকার করা হয়, সেখানে কিন্তু মানুষ, ব্যক্তি অসহায় প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এই আইনগত বিষয়গুলো নারীর মানবাধিকার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইন যে কিভাবে নারীর অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, সেজন্য মহিলা পরিষদ সূচনা থেকেই আমাদের সম্মানিত পরামর্শকবৃন্দের পরামর্শ নিয়ে আমাদের সংগঠনের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবং পরবর্তী জেনারেশনের যে কর্মীরা যোগ দিলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সকলের মিলিত একটা বাস্তব অভিজ্ঞতায় আমরা এ কাজগুলো শুরু করলাম। এই কাজগুলোর ভিতর দিয়ে আমরা লক্ষ করলাম, আজকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতি সাধারণ গণমানুষ, সারা দেশের একেবারে সুদূর একটি গ্রামে পর্যন্ত যে আস্থা, যে কিছুটা ভরসা- তার অন্যতম কারণ হলো কোন ঘটনা হলে, একজন নারী ও কন্যার প্রতি কোন নির্যাতন হলে সঙ্গে সঙ্গে পাশের বাড়িতে গিয়ে বা যেখানে মহিলা পরিষদ আছে সেখানে গিয়ে বলে যে, আমার এমন একটি ঘটনা ঘটেছে আপনি একটু আসেন। এই যে একটা কমপাউন্ডার বা গ্রামে থাকলে যে একটা কমপাউন্ডারের কাছে যায়, একটা ফার্মেসি থাকলে সেখানে যায়, ফার্মেসিতে একজন লোক বসা থাকে তিনি হয়তো ডাক্তার না কিন্তু তবুও মানুষ তার কাছেই যায় একটা পরামর্শের জন্য যে আমার এই সমস্যা হয়েছে কি খাব ভাই, হয়তো এটা বৈজ্ঞানিকভাবে এতোটা সঠিক না, তবুও তারা যায়। এই মানবাধিকার সংঠনগুলোও তেমন এ ডি আর- অলটারনেটিভ ডিসপিউট রেজুলেশন, বিকল্পভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করে, যেগুলো আইনি ভিত্তি পেয়েছে দশকের পর দশক কাজের ভিতর দিয়ে। এগুলো কিন্তু নারীর মানবাধিকার আন্দোলনের দীর্ঘ কয়েক দশকের- চার পাঁচ দশকের কাজের ভিতর দিয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতার ফসল। মহিলা পরিষদ অনেক সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়ে প্রশাসন কিভাবে কাজ করবে, নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে- সেগুলো আমরা জানি যে আমাদের দেশে কতকগুলো ইতিবাচক আইন হয়েছে- নারীর সমান অধিকারের পক্ষে এগুলোকে নারী আন্দোলন টুল হিসেবে অন্ধের যষ্ঠির মতো ব্যবহার করে। অন্ধ যখন চলতে পারে না একটা যষ্ঠীর প্রয়োজন হয়, সে-রকম নারীর মানবাধিকারের জন্য আইন একটা বড় অন্ধের যষ্ঠী। সে-জন্য ঐ লাঠিটার দৃষ্টিভঙ্গি তার ভেতরের যে কনটেন্ট কতোটুকু নারীবান্ধব, কতোটুকু লিঙ্গীয় সমতার দর্শনকে ধারণ করে- সেটা আমরা অন্য নারী-পুরুষের সমতার লেন্সের চশমা দিয়ে দেখে থাকি এবং এগুলো আমরা পরীক্ষা ও নিরীক্ষণ করি, প্রস্তাব দেই। এভাবে আমাদের বহুবিধ ভাবনা, বহুবিধ অভিজ্ঞতা, ইতিহাসের পাঠ, বিভিন্ন চলমান নারী আন্দোলন এবং বিশ্ব নারী আন্দোলনের ইতিহাস থেকে আমরা দেখি যে এই কাজটা বিশেষ করে ৯০-এর দশকের থেকে অনেক জোড়ালোভাবে এবং অনেক সুনির্দিষ্টভাবে চলছে কারণ- এটা এমন একটা বিষয় যে নারী ও কন্যাদের দাঁড়ানোর জন্য, অস্তিত্বের জন্য, নিরাপদে বেঁচে থাকার জন্য একান্ত প্রয়োজন। আমাদের এই উপমহাদেশের অতীতের এত এত সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, আলোকায়নের আন্দোলন, উপনিবেশবাদ বিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলন – অতীত সংগ্রামের অভিজ্ঞতার এতো উর্বর ও শক্ত মাটি থাকা সত্ত্বেও এখনও অনেক সময়েই লিঙ্গীয় পরিচয়ের জন্য ধর্ম, গোত্র, সম্প্রদায়ভেদে নানা বিস্ময়কর অমানবিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। সেখানে যুক্তি, মানবাধিকারের নীতিমালা পরাস্ত হয়। ধর্মকে ব্যবহার করে, ধর্মীয় অনুশাসনগুলোকে ব্যবহার করে, ভুলভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে, বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মগুলোর মূল কথাগুলো না বলে অধিকাংশ সময়েই নারীর বিরুদ্ধে তা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ সম্পর্কে রোকেয়া সাখাওয়াত বলেছিলেন, যখনই কোন নারী মস্তক তুলেছে তখনই ধর্মের দোহাই দিয়ে তার মস্তক চূর্ণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা প্রতীকী অর্থে আমরা নেব। আজও আমরা দেখি, এই যে এত কিছু আমাদের অর্জন- এত অগ্রসরমানতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, প্রশাসনে. সর্বত্র নারীর একটা সক্রিয়, সরব, উজ্জ্বল ইতিবাচক উপস্থিতি, প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, সমাজ-নীতি, রাজনীতি, মানবাধিকার আন্দোলন, নাগরিক আন্দোলন, কিন্তু তারপরও আমরা যখন আইনের পৃষ্ঠা ওল্টাই, আমরা দেখি, পরিবার, বিবাহ, বিবাহ-বিচেছদ, সন্তানের অভিভাবকত্বে এই নারীরা পুরুষের সমান অধিকার ভোগ করেন না। এবং প্রতিটি ধর্মেই সেই বৈষম্যগুলো আলাদা আলাদা ভাবে আছে, কোথাও বেশি, কোথাও কম। মহিলা পরিষদ প্রস্তাবিত ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড; তথা সর্বজনীন পারিবারিক নীতিমালার কর্মসূচিতে একটা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং একটি সুপারিশ পরিষদের পক্ষ থেকে ১৯৯২-৯৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে দেয়া হয়েছে। এর আগে ১৯৮৮-৮৯ সাল থেকে ৯২ সাল পর্যন্ত এই আইনের প্রয়োজনীয় বক্তব্য ব্যাখ্যা করার জন্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উপেদেষ্টামণ্ডলীতে ছিলেন তাঁরা হলেন : মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শ্রদ্ধেয়া সুফিয়া কামাল, বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য, বিচারপতি কে এম সোবহান, বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেইন, প্রয়াত ব্যারিস্টার সালমা সোবহান, ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম, তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মালেকা বেগম, নারীনেত্রী প্রয়াত বেলা নবী, তৎকালীন তরুণ অ্যাডভোকেট জেয়াদ-আল-মালুম ও জেলা পর্যায়ের প্রথম সারীর নেতৃবৃন্দ। এই সুপারিশ রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি যার জন্য পেশ করেছি, নারীসমাজও দেখেছেন। এবং আমরা জানি এটা একটা অগ্রসর চিন্তা ভাবনা। অতি সহজে, খুবই অল্প সময়ে হয়ে যাবে সেটা আমরা আশা করি না। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক জ্ঞান, দক্ষতা, পেশাদারী দক্ষতা ও আন্তরিকতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার একান্ত প্রয়োজন। তবু এখন পলিটিকাল উইল-এর আজও তিন/চার দশক পরেও অভাব অনুভূত হয়, হচ্ছে। কিন্তু একটা অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে, জাতিসংঘের নারী প্রতি বিরাজমান সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপের দলিলকে (UN CEDAW) কেন্দ্র করে। এতে নারী-পুরুষের যে বৈষম্য, সেই বৈষম্যকে অ্যাড্রেস করা হয়েছে। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এটা একটা বড় পদক্ষেপ। সেই সিডও কমিটির অধিবেশনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এই সার্বজনীন পারিবারিক নীতিমালার সুপারিশকে সমর্থন করে। ২০০৪ সালে সিডও কমিটির ৩১তম অধিবেশনে সরকারকে পর্যায়ক্রমে সমর্থন ও বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে। সিডও কমিটির এই সুস্পষ্ট সমর্থন বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের অগ্রসর ভাবনা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দেয়। এতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ তথা বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের শক্তির দিকটিও চিহ্নিত হয়েছে।

(চলবে)

Share Now শেয়ার করুন