উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১০]

0
303

পর্ব ১০

অধ্যায় ৬

বিদেশে চাকরির সুযোগ

“বিদেশে চাকরির সুযোগ” প্ল্যাকার্ডের ওপরে চকচকে লাল রঙে এই কথাটাই ছাপানো হরফে লেখা ছিল। সরকারি অফিসের বুলেটিন বোর্ডে, ইউনিভার্সিটি হলে, সিভিল সার্ভিসের অফিসে, বোর্ডিং হাউসে এবং ‘সরকারি মহিলা কর্মীদের’ সস্তা ডর্মিটারিগুলোতে বলতে গেলে এরকম প্রায় হাজার দেড়েক তাক লাগানো দারুণ সব সুন্দর সুন্দর কার্ড ছড়িয়ে পড়িয়েছিল। বিদেশে কাজ করার জন্য সত্বর কিছু প্রশিক্ষিত লোক চাই এই কথাটা প্ল্যাকার্ডে পরিস্কার করে লেখা; এবং কেউ যদি সত্যিই বিদেশে কাজ করতে চায় তাহলে মাইনেপত্তর খুব একটা মন্দ হবে না, প্রয়োজনে অগ্রিমও পাওয়া যেতে পারে, এবং এটা একদিক থেকে নিজের দেশের স্বার্থের পক্ষেও মঙ্গল – আর বাড়তি পাওনা হিসেবে বাইরের দেশ ও পৃথিবীর অন্যান্য চিত্তাকর্ষক অঞ্চলগুলো দেখার একটা দারুণ সুযোগও জুটে যাবে। প্ল্যাকার্ডে এ-ও বলা ছিল যে মিটিংটা হবে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফারেন্স রুমে, এবং আলোচনায় উপস্থিত থাকবেন ‘বিদেশে দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতা আছে এমন সব দুঁদে সার্ভিস অফিসারেরা’। পাশাপাশি সওয়াল-জবাবের জন্যও একটি নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ থাকবে।
মিটিং শুরুর সময় থেকেই কনফারেন্স রুমে ভিড় যেন উপচে পড়ছিল। প্রধান বক্তা হিসেবে হাজির ছিলেন খোদ মি. হ্যামিলটন ব্রিজ আপটন নিজে, তিনি সাত-সাতটি ভিন্ন ভিন্ন দেশে একজন দক্ষ বৈদেশিক বাণিজ্যদূত হিসেবে কাজ করে এসেছেন। তাঁকে ব্রুকস ভাইদের মতো দেখতে লাগছিল, ধারালো মুখ, নিটোল আত্মবিশ্বাস, রাশভারি গোছের, হলভরতি পাঁচমিশালি শ্রোতার মাঝে মুগ্ধ কথাবার্তায় তাঁর সংযোগক্ষমতা একেবারে সাবলীল, কোনও অশ্লীল কৌতুক নয়, এবং একজন যথার্থ যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি… এর সবটাই ছিল সত্যি। টেবিলের ঠিক পিছনে তন মানুষ।
তাঁর হাবভামহলের এক প্রবাদপ্রতিম ভবিষ্যৎ উপদেষ্টা, একজন চমৎকার সাংবাদিক, এবং এমন একজন মানুষ যাঁকে নিজের ভালোমন্দটা অন্য কাউকে আঙুল ধরে শিখিয়ে দিতে হয় না…
মি. হ্যামিলটন আপটন নিজের মান সম্ভ্রমের প্রতি সতর্ক খেয়াল রেখে অতি সন্তর্পণে বক্তব্য শুরু করলেন। দেখা গেল তাঁর দেওয়া তথ্যে ভুলচুক ফাঁকফোকর খুঁজে বের করা অত সস্তা নয়, উপস্থিত দর্শকদের মগজগুলো সেটা অনায়াসে আঁচ করতে পারল, এই ক্ষমতার প্রতিনিধিটিকে তারা দিব্যি বুঝে গেল … ইনি সেই ব্যক্তি যিনি যেকোনও বিদেশি সে যতই ঘোড়েল হোক না কেন তাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর মতো ক্ষুরধার বুদ্ধি রাখেন অথবা কোথাও কোনও জটপাকানো পরিস্থিতি তৈরি হলে সেটাকে চোখ বুজে তাঁর নিজের হাতের মুঠোয় আনতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না।
“আপনারই বলুন তো, আমাদের মধ্যে কে না চায় ঘরে খানিকটা সময় কাটাই, চাকরি বাকরিতে পদোন্নতি হোক, ইয়ারদোস্তদের সংখ্যা বাড়ুক আর পরিবার যাতে কোনও রকম ঝুটঝামেলা ছাড়াই ঠিকঠাক চলে যায়, তাই না,” মি. আপটনের কথার ফিতে কাটা শুরু হল এভাবেই। “কিন্তু মুশকিল কোথায় জানেন, এখন এমন একটা দুঃসময় চলছে যা আমাদের সাতপুরুষে কেউ কখনও দেখে নি, আমাদের দেশ যখন এ ধরনের এক ভয়ানক বিপদের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, তখন নাগরিক হিসেবে আমরা তো আর নিজেদের কর্তব্যকে এড়িয়ে যেতে পারি না। আর কেবল নগণ্য সাধারণ নাগরিক হিসেবেই দেখছি কেন, বলা উচিত আন্তর্জাতিক নাগরিক, সেদিক থেকে দেখলে এর দায়ভার তো কোনও মতেই ঝেড়ে ফেলা যায় না। গোটা পৃ্থিবী জুড়ে এমন কোনও জায়গা নেই যেখানে শয়তানি চক্রান্তের নাগপাশে আমাদের বেঁধে ফেলার চেষ্টা চলছে না। তাই ইঁটের বদলা পাটকেল, এই ধূর্ত ছোঁয়াচে ষড়যন্ত্রের সপাট পালটা জবাব দিতে পারে বিদেশে এরকম কাবিল জবরদস্ত লোকদের আমাদের এই মুহুর্তে ভীষণ দরকার যারা প্রয়োজনে জানপ্রান লড়িয়ে দিতে পারবেন।“
এই যে তিনি ওই সব ধড়িবাজদের কায়দা করে সরাসরি কমিউনিস্ট ছাপ্পা মারলেন না, এটা কিছুতেই তারিফ না করে পারছি না, মেরি ম্যাকইনটোস ভাবল। সে তাঁর তিন বান্ধবীকে নিয়ে সেখানে হাজির ছিল, তারা প্রত্যেকেই কাজ করত পেন্টাগন স্টেনোগ্রাফিক পুলে; রক ক্রীক পার্কের কাছে একটা কামরায় তারা ভাগাভাগি করে থাকত।
কতক্ষণ আর হবে, এই মিনিট পনেরো, ঊর্ধতন ব্যক্তিবর্গের ভেতরে আলাপ আলোচনার ধরন ধারনটা সঠিক কেমন হওয়া উচিত তার একটা পরিচিতি এঁকে দিলেন তিনি। মেরি মুগ্ধতার ছায়ায় যেন আদ্যন্ত আচ্ছন্ন হয়ে গেল আর এমনধারা আবেগ ভেজা সম্বোধন তাকে আন্তরিক ভাবে বিষয়টার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলল।
“চলুন সময় নষ্ট না করে এখন আপনাদের সঙ্গে মি. জো বিং এর পরিচয়পর্বটা সেরে ফেলা যাক”, বক্তৃতার পাততাড়ি গুটোনোর খানিক আগে মি. আপটন বলে উঠলেন। “এই যে, ইনি হলেন মি. বিং, তথ্য বিভাগের আধিকারিক এবং এর সঙ্গে বলে রাখি এশীয়দের ব্যাপারে খোঁজখবরে একজন পাক্কা সমঝদারও বটে। চাকরির সূত্রে নয় নয় করে বেশ কয়েকটা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন সেটক্যায় এবং বলাবাহুল্য সম্মানে কোনও রকম আঁচড় লাগে নি কখনও । তা, ওঁনার অনুরোধটি হল উনি সারখানে নিজের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে চান আর কে বলতে পারে আগামী বাকি জীবনটা তিনি ওখানেই কাটিয়ে দিলেন, সে সম্ভবনাও রয়েছে। সমস্ত ভেদাভেদ মুছে দিয়ে নেটিভদের সঙ্গে মিলেমিশে যাওয়ার ব্যাপারে উনি সিদ্ধহস্ত।“
এরপর মি. আপটন আর কোনও শব্দ খরচা না করে সিধে বসে পড়লেন আর মি. বিং নিজের চেয়ারটাকে সরিয়ে নিয়ে, টেনে তুললেন নিজের শরীরটাকে, পায়ে পায়ে গুটিশুটি হেঁটে গেলেন টেবিলের কাছটাতে এবং কিনার ঘেঁষে থিতু হলেন অবশেষে, এক মুহুর্তে মনে হল যেন শ্রোতারা হাঁফ ছেড়ে বেশ কিছুটা স্বস্তি অনুভব করল।
“আমি বিং, আমি সরকার আর জনগনের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের কম্মটি করে থাকি, ইচ্ছে হলে আপনারা আমাকে জো বলেও ডাকতে পারেন”। প্রত্যেকটা গলায় যেন হাসি বেজে উঠল। শ্রোতাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার হাকডাকের ছোঁ মেরে বলে উঠল “ও হে ও জো মশাই”, তৎক্ষণাৎ তিনি হাত নাড়িয়ে সাড়া দিলেন। “আমি মি. আপটনের মত গণ্যমান্য মানুষের জন্য কাজ করেছি, আর কাজ করে কতটা আনন্দ পেয়েছি তা আপনাদের বলে বোঝাতে পারবো না। বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারটা নেহাত ছেলেমানুষি তো নয়ই, ঝক্কিঝামেলাও বিস্তর। এটা আর আপনাদের আলাদা করে বলে বোঝাতে হবে না আশা করি। আমি এখন আঙ্কল সাম্মির হয়ে বিদেশে কাজ করার বিষয়ে এমন কিছু কথা ফাঁস করতে পারি যা আপনাদের ওই প্রচার পুস্তিকাতে পড়ার সৌভাগ্য হয় নি। দেখুন, ঝুটমুট বলে তো লাভ নেই , এমনকী আপনারা যখন কোনও গুরুতর বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন, তখনও খাটাখাটনির মাঝে একটু আধটু হাঁফ না ছাড়লে কী আর চলে। আর এটাও আমি জানি বিদেশ বিভুঁইয়ে থেকেও কাজ করার ঘরোয়া পরিবেশের কোমল স্বাদ উপভোগের কথা জানতে পারলে আপনারা বিলকুল খুশ হয়ে যাবেন।“
বৈদেশিক পদ লাভ করার মতো সাদামাটা ব্যাপারটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে জো মিনিট কয়েক কাটিয়ে দিলেন। “ভাববেন না বিমান হোক জাহাজ হোক যাই হোক না কেন, আপনাদের বন্দোবস্ত হবে নিঃসন্দেহে প্রথম শ্রেণিতে। সবচেয়ে ভালো যা কিছু সে সবই আপনারা পেয়ে যাবেন, এর সঙ্গে আপসের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।“ এরপর তিনি হাত নেড়ে ইশারা করতেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতারা ঝপ করে বসে পড়ল। মেরি ম্যাকইনটোস আনমনে কখন যে ইঞ্চিকয়েক এগিয়ে গিয়েছিল খেয়ালই করে নি, শুনতে শুনতে কথার অলিগলিতে যেন হারিয়ে ফেলেছিল নিজেকে।
“ দেখুন , আপনাদের ভেতরে যে কৌতুহলটা পায়চারি করছে তা আমার বিলক্ষণ জানা আছে। অন্তত কয়েকজনের মনে যে ঘুরপাক খাচ্ছে তা তো হলফ করে বলতে পারা যায়।“ জো’র আচরণে আমুদেয়ানার ছোঁয়া। “যদি খুব একটা ভুল না করি, ওখানে আপনাদের সামাজিক জীবন যাপন কেমন হবে তা নিয়ে ভেবে ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছেন না, কি তাই তো। বেশ বেশ , উত্তম প্রস্তাব, এ ব্যাপারে খানিক আলোচনা করা যেতেই পারে। বিদেশি লোকজনদের মধ্যে আপনাদের কাজ চালাতে হবে, কিন্তু তা বলে আমরা আশা করবো না যে তাদের ভেতরে কাজ করছেন বলে আগবাড়িয়ে অতি পিরিতির আবেগে তাদের গলা জড়িয়ে ধরবেন। মাথায় রাখবেন, আপনি আঙ্কল সাম্মির জন্য কাজ করতে গিয়ে কোথায় কোনখানে ঢুঁ মারছেন তাতে আমার কিছু যায় আসে না, একজোট হয়ে দলবেঁধে আপনি থাকবেন নির্ভেজাল আমেরিকানদের সঙ্গে। অবিশ্যি, এও আবিষ্কার করবেন তাদের মধ্যে অনেকেই একা এবং আপনি যদি অবিবাহিতও হন তা সত্ত্বেও দেখবেন কখনও আপনার ফাঁকা ফাঁকা লাগবে না।”
মি. আপটনের দৃষ্টি জো’র চাঁদি টপকে দূরে দেওয়ালের গায়ে একটা খুদে ফুটকির দিকে নিবিষ্ট ভাবে আটকে ছিল। অথচ তাঁর মুখে লেগে থাকা স্মিত হাসির আলাপ সবাইকেই বেশ খুশি খুশি রেখেছিল। তারা জানত জো’র তাদেরকে বলা কথাগুলো মি. আপটনও যতদূর সম্ভব রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করছেন। এতে করে বিদেশি কাজকর্মের মতো ভারি বিষয়ের গুমোট পরিবেশটা বেশ পারিবারিক হয়ে ওঠে। মি. আপটনের কোনও তুলনা হয় না কিন্তু তাঁর স্বভাব অনেকটা আগলে রাখা এক পিতার মতন; আর জো হলেন যেন সেই হুল্লোড়বাজ কাকা যাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসে খ্রিস্টমাসের দুরন্ত হুইস্কি আর স্যুটকেস ভর্তি ঠাসা উপহার।
জো ঝাড়া কুড়ি মিনিট ধরে একবগ্গা বকে গেলেন। জুতসই উদাহরণ টেনে এনে যে কোনও জলজ্যান্ত সমস্যার তুখোড় সমাধানে তিনি একেবারে হাত পাকিয়ে ফেলেছিলেন। জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ কী জানতেন না সেটাই তো আশ্চর্যের ব্যাপার, ব্রাজিলের কুমীরের চামড়ায় তৈরি জুতোর দর-দাম থেকে আরম্ভ করে জাপানি স্কচ, এমন কী কোথায় সেই ভিয়েতনাম, সেখানে চাকরবাকর পাওয়া না পাওয়া কতটা সুবিধের কতটাই বা কঠিন, আপনার প্রতি আনুগত্যের ফাইফরমাস খাটার বিশ বছর পর সে কতটা পেনসন আপনার পকেটের গলা টিপে আদায় করতে পারে, এম্নি কত কী যে তথ্য ছিল তার নখদর্পণে, একথা ওকথার ছুঁতোনাতায় সে সব বেড়ালও ঝুলি থেকে বেরিয়ে এল। এমনকী এই বিশ্বের বাজারে কোথায় কোন আমেরিকান তল্লাটে যাঁরা মার্কিন খাবার দাবার বিক্রি বাট্টা করতেন সেই সব প্রতিনিধিদের সুলুকসন্ধানও যে তার ঠোঁটের আগায় সে তথ্যও পাওয়া গেল। “খামোখা দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনারা পেওরিয়াতে ঠিক যেমনটি খাবার দাবারের কেনাকাটা করে থাকেন এশিয়াতেও ঠিক তেমনটাই হুবহু পেয়ে যাবেন হাতের নাগালে। শুধু কী তাই, সাইগনে আমেরিকান আইসক্রিম, পাঁউরুটি, কেক এটা ওটা সেটা আপনার মর্জিমাফিক যা চাইবেন তার সবকিছুই মিলে যাবে অনায়াসে”, বললেন জো বিং। “আপনাদের প্রতি যত্নআত্তির কোনও খামতি পাবেন না এটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি। নিজেদের লোকদের যাতে একতিল অসুবিধে না হয় তার জন্য কিপটেমি করব এমনটা ভুলেও ভাববেন না। খালি এখানকার কথা বলছি না, অন্য যেকোনও দেশেই আপনি থাকুন না কেন আপনার মানমর্যাদা কেতাদুরস্ত ঝকঝকে আমেরিকানদের মতোই থাকবে।“
“মানতে হবে ভদ্রলোক খাসা বলছেন কিন্তু, শুনতে খুব একটা খারাপ লাগছে না, তোমরা কী বল?” মেরি ম্যাকইনটোস বলে ওঠে।
তার ফিসফিসে মার্কা কন্ঠস্বর শুনে অন্য তিনটে মেয়েও তালে তাল ঠুকে সম্মতিসুচক ঘাড় নাড়ল। মেরি আন্দাজ করতে পারল তাদের চারজনের সবার মগজে এখন ওই কোনও রকমে গুঁতোগুতি করে ভাগ করে নেওয়া দুকামরার ঘরের চিন্তা লাট্টুর মতো পাক খাচ্ছে। তাদের মধ্যে দুজনের ঘুমুবার ঠাঁই জুটে ছিল সামনের ঘরের ফোল্ডিং খাটে, সুতরাং কী আর করা, ব্রেকফাস্টের টেবিলটা পাতার জন্য হররোজ তাদের সাত সকালেই তরিঘরি চোখ ডলতে ডলতে বাধ্য হয়ে উঠে পড়তে হত। সবেধন নীলমনি, তাদের একমাত্তর বিলাসিতা বলতে যা বেঁচে ছিল তা হল প্রতি শুক্কুরবারের রাতটুকুনিতে কিঞ্চিত হুইস্কি সেবন যেটা আবার তারা আদা মেশানো পানীয় ছাড়া সহজে গিলতে পারতো না, কারণ তার স্বাদটা এতটাই বদখত ধরনের, লা জবাব বলে ওঠাটা তাদের জিভের টাগরাতেই শুকিয়ে যেত।
অবশেষে জো বিং তাঁর বৈঠকি মেজাজের বক্তিমেতে আপাত বিরতি টেনে ঘোষণা করলেন যদি কারো মনে কোনও প্রশ্ন থেকে থাকে তাহলে অনায়াসে বিনা দ্বিধায় করতে পারেন, তিনি অথবা মি. আপটন যিনিই হোন না কেন তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে পারলে যারপরনাই খুশিই হবেন। মি. আপটনকে কেউ নিদেন একটা সওয়াল পর্যন্ত করল না ; কিন্তু জো বাড়তি আরও আধাঘন্টা গরগরিয়ে নির্বিকার সটান বকে গেলেন।
“বিদেশি ভাষা শেখার ব্যাপারে আপনার মতামতটা জানতে পারলে সুবিধে হত “বেঁটেখাট ছিপছিপে পেশিপাকানো চেহারার একটি মেয়ে জিগেস করে উঠলো। “আমি এটুকু অন্তত বুঝতে পারছি ওখানে যাওয়ার আগে ওদেশের ভাষাটি আচ্ছা মতন রপ্ত করে নেওয়া ছাড়া কোনও গতি নেই”।
“আরে দাঁড়ান দাঁড়ান এক মিনিট”, তাঁর গলায় যেন কৌতুক নেচে উঠল, “ধুর, কেউ আপনাকে ভুলভাল ছাইপাশ খবর দিয়েছে। আঙ্কল সাম্মির তো আর মাথা বিগড়ে যায় নি। আপনি কী মনে করেন এই যে আমরা যারা দেশে দেশে যত্রতত্র চক্কর কেটে বেড়াই তাদের ক’জন কম্বোডিয়ান, জাপানি কিংবা জার্মান জেনে উল্টে দিচ্ছেন হে? যাই হোক, যদি জানেনো বা, হিসেব কষলে দেখতে পাবেন মেরেকেটে সংখ্যাটা খুব বেশি দাঁড়াবে না। I don’t parlez vous very well myself, দেশের বাইরে কাজ করতে আমার কিন্তু আহামরি তেমন কিচ্ছুটি অসুবিধে হয় নি। সাদা সত্যিটা হচ্ছে , আপনি দেশীয় ভাষা জানবেন সেটা ভেবে আমরা হাপিত্যেশ করে বসে নেই। বিদেশে এমন ডজনখানেক ট্রান্সলেটর আকছার পেয়ে যাবেন। তাছাড়া, এশীয়দের ইংরাজি তালিম দেওয়াটা বেশি জরুরি। দরকারে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে ইতস্তত করবেন না। মনে রাখবেন, যে সমস্ত বিদেশিদের সঙ্গে আপনি কাজ করবেন তারা ইংরেজিতে কাঁচা তো ননই বরং বেশিরভাগের কাছেই এই ভাষাটা রীতিমতো জলভাত।“
“শুনেছি বিদেশে সব কিছুরই দাম প্রায় আকাশছোঁয়া, এবার আরেক দর্শকের কন্ঠস্বর লাফিয়ে উঠে এল। “বলছিলুম যে, ইয়ে, আমরা টাকাপয়সা কিছু জমাতে পারব তো?”
বাক্যি শুনে জো বিং এর হাসি দেখে কে। দেখুন মশাই, আপনাদের বাড়িভাড়াটারা যাবতীয় সব চুকিয়ে বুকিয়ে দেওয়া হবে। আপনার একমাত্র খরচাপাতি বলতে ওই খাইখরচটুকু যা, যদি পানদোষ থেকে থাকে তাহলে পানীয় বাবদ যেমনটা খসাবেন, আর কী পড়ে রইল, স্রেফ জামাকাপড় আর চাকরবাকর, ব্যাস এইটকুই – এবং আপনি যদি চান তবে মাসে চল্লিশ ডলারের বিনিময়ে আপনার সর্বক্ষণের খিদমতগিরি করার জন্য একটা আস্ত পরিবার কিনে নিতে পারেন”।
কুড়িয়ে বাড়িয়ে মোটামুটি সাতষট্টিটার মতো আবেদনপত্র জমা পড়েছিল, তাঁদের মধ্যে মেরি ম্যাকইনটোস, হোমার অ্যাটকিনস, একজন অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার এবং কোহলার নামে এক খবরের কাগজের লোক ছিলেন। খবরের কাগজের লোকটিকে ছেঁটে বাদ দেওয়া হয়েছিল কেননা তিনি একবার সরকারকে সমালোচনা করে কিছু বিক্ষুব্ধ আর্টিকল লিখেছিলেন। জো বিং এর নেকনজর পড়ে ছিল বেছেবুছে তিন জনের প্রতি কারণ তারা সব্বাই এশিয়ায় যাওয়ার প্রতি আগ্রহ দেখায়। কার্যত তাদের মধ্যে দু’জন আবার সারখানের নাম উল্লেখ করেছিল।
“আপনাদের কাছে ধামাচাপা দেবার মতো কিছু নেই,”, সপ্তাহখানেক পরে মি. আপটন বললেন, “আমাদের নিয়োগ পদ্ধতিতে কিছু গণ্ডগোল রয়েছে। অ্যাটকিনস নামের ওই ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া, যা দেখছি প্রত্যেকেই এখন চাকরি করার নামে যেটুকু করছে সরকার থেকে তার বেশি হিসেবকড়ি পাওনাগন্ডায় সুদে আসলে উসুল করে ছাড়বে। খোলাখুলি ভাবে বলতে গেলে আমার মনে হয় আমরা কিছু সেয়ানা গোছের কুঁড়ে লোক আমদানী করছি।“
“আর ঐ যে বুড়ো ইঞ্জিনিয়ারটা, তার কী হবে, সে সম্পর্কে কিছু ভাবলেন?”
“একথা শুনলে পড়ে তার ঘিলু না বিগড়ে যায়। তার আয় ইনকামের ব্যাপারটা সে তো আগেভাগেই জানিয়ে রেখেছিল, জমানো টাকা থেকে ফি বছর মাত্তর ১৫০,০০০ ডলার ।”

(চলবে)

Share Now শেয়ার করুন