উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১১]

0
421

পর্ব ১১

অধ্যায় – ৭

নবনিযুক্ত মেয়েটি

মাত্র আঠাশ বছর বয়সী ম্যারি ম্যাকইনটোসের সপ্তাহে নিদেনপক্ষে অন্তত একবার নিঃশব্দে কান্নাকাটি করাটা প্রায় বাধাধরা হয়ে গিয়েছিল বলা যায়। সে বিষাদগ্রস্ত, সে জানতো। তার জীবনটাও যে একঘেয়ে ক্লান্তিকর, সে জানতো। তার দরকার ছিল একজন জীবনসঙ্গীর, আর আশ্চর্য এটাও সে জানতো। বিদেশে চাকরির জন্য আবেদনপত্রটাই এই গতানুগতিক জীবন পরিবর্তনের একমাত্র আশা-ভরসা ছিল।
দায়িত্বপূর্ণ চাকরি এবং অফিসে চমৎকার সব কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও ম্যারির জীবনটা ছিল বড্ড ফ্যাকাসে। বাসে স্রেফ একটা বসার জায়গা জোটাতে সকাল-সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তে হত, আর হ্যাঁ, সেই সঙ্গে ব্রেকফাস্টটাও যাতে সেরে নিতে পারে সরকারি ক্যাফেটেরিয়াতে সেটাও হিসেবে রাখতো সে। সাধারণত সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত অফিসেই থাকতো, আর ডিনারটাও মিটিয়ে ফেলত ওই ক্যাফেটেরিয়াতেই।
এই রোজকার রুটিনের পেছনের আসল কারণটা হলো, সে ভিড়ে ঠাসা বাসগুলোকে এড়াতে চাইতো; আর লোকজনভর্তি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে এখানে খাওয়ার খরচটা বেশ সস্তা, তাছাড়া খুব একটা হুজ্জোতও পোহাতে হতো না।
ম্যারির রাতগুলো ছিল এক্কেবারে বিবর্ণ, বৈচিত্র্যহীন। প্রতিদিন শেয়ার করে অ্যাপার্টমেন্ট সাফ করা আর নিজের জামাকাপড় কাচার কাজগুলো হিসেবমাফিক সামলে নিয়ে, তিনজন রুমমেটের সঙ্গে টিভির সামনে সে বসে পড়তো।
এরপর একদিন শেষমেষ ম্যারির হাতে চিঠি এসে পৌঁছায়, তার বিদেশে চাকরির আবেদনটি মঞ্জুর হয়েছে। তাকে যেতে হবে সারখানে। মাস তিনেক পরে সে পৌঁছালো হাইধোর বিমানঘাঁটিতে।
একমাস পড়ে সে তার পুরনো রুমমেটদের একখানা চিঠি লিখে লিখলো :

প্রিয় মেরি, সোয়ান আর লুইজি,

হাইধো ভ্রমণটার সত্যিই কোনও তুলনা হয় না। গোটা রাস্তাটাই আমি প্রথম শ্রেণিতে এসেছি – যাকে বলে বড়োলোকি সব ব্যাপার-স্যাপার – খরচাপাতিটাতি সব ওনারাই মিটিয়েছেন। ভাবা যায় না। (যাত্রীশ্রেণিতে শিকাগো যাওয়ার সময়টা কী মনে আছে তোমাদের, আমাদের হাতব্যাগে প্যাকেট করা দুপুরের খাবারের কথা, আর কীভাবে আমাদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল?)
হ্যাঁ, তা যা বলছিলাম, তারপর, হাইধোতে (সারখানের রাজধানী) প্লেন থেকে নামার পর আমি তো স্বাভাবিকভাবেই ভয়ে একেবারে সিঁটিয়ে গেছিলাম। চারপাশে সবকিছুই কেমন যেন নতুন নতুন লাগছিল আর আমার যে কী চাই তাও তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। যাই হোক, এয়ারপোর্টে অভ্যর্থনা পরিষদের সঙ্গে একজন ড্রাইভারসহ একটা গাড়ি আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। শুল্ক বিভাগ কিংবা অন্য কোনো ঝামেলার চক্করে আমায় পড়তে হয় নি। যখন আমি আমার জিনিসপত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, মিস্টার প্রেস্টন (ইনি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন) বললেন, খামোখা দুশ্চিন্তা করে কোনো লাভ নেই। টোঙ্কি সব সামলে-সুমলে নেবে। টোঙ্কি একজন সারখানিজ, ও এখানকার দূতাবাসে কাজ করে।
আমার সঙ্গে দেখা করতে আসা দুটি মেয়েই ছিল সেক্রেটারি আর তারা বলল যে আমার তাদের সঙ্গেই থাকা উচিত, অবশ্যই আমি যদি রাজি থাকি তবেই; আর এখন আমি তাদের সঙ্গেই আছি।
আমাদের বাড়িটা ঠিক কেমন তোমাদের একবার দেখা দরকার (ছবিটা এখানে সেঁটে দিলাম)। আমাদের প্রত্যেকের নিজেদের একটা করে শোবার ঘর আছে – এছাড়া অতিথিদের জন্যে আরেকটা বাড়তি ঘর। একটা ডাইনিং রুম, একটা লিভিং রুম আর চাকরদের জন্য আলাদা কোয়ার্টারের বন্দোবস্ত আছে।
আর সর্বক্ষণের জন্য চাকরও মজুত! সত্যি বলছি। আমাদের দেখাশোনা যত্নআত্তির জন্য তিন-তিনটে চাকর আছে। ওরা গোটা একটা পরিবার, বাবা মা আর চৌদ্দ বছরের একটা মেয়ে। তারা রান্না-বান্না, ধোয়া-মোছা, কাপড়কাচা সবকিছুই করে। ওহ্, তারা আমাদের একদম বাচ্চার মতো বানিয়ে ফেলেছে! যখন সকালে তারা আমাকে ডেকে তোলে, সঙ্গে নিয়ে আসে এক গ্লাস লেবুর রস আর এক কাপ চা। একেই না বলে বাঁচার মতো বাঁচা।
এখানকার আমেরিকানরা বেশ ইয়ারগোছের মানুষ। তারা প্রত্যেকেই পার্টি দেয় আর অনেকেই দেখি বেশ হাতখুলে খরচা করে; রোজ রাতে অন্তত একটা ককটেল কিংবা ডিনার পার্টি থাকেই। এটা করা খুব যে কঠিন, তেমন ভাবার কোনও কারণ নেই। কেননা প্রত্যেকেই সাহায্য পায়। আমার শুধু কাজ বলতে, ঘরের বন্ধুদের সঙ্গে দেখে নিই সব কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা, আর তারপর চাকরদের হাঁক দিই। “ইহিবুন,” আমি বলি, “শোনো, আসছে মঙ্গলবারের জন্য সংখ্যাটা হবে দশ, কী গো, কাজটা গোছাতে পারবে তো?”
সে জবাব দেয়, “হ্যাঁ, ম্যাম”, স্রেফ এইটুকুনি। আর দেখতে দেখতে দশজনের জন্য কী চমৎকার ডিনার যে তৈরি হয়ে যায়! অনেকটা যেন সিনেমার মতো। সরকারি মদের দোকানে মদের দাম জলের মতো সস্তা। কোনও ট্যাক্সের বালাই নেই – সুতরাং জনি ওয়াকার, ব্ল্যাক লেবেল, ওল্ড গ্র্যাণ্ড ড্যাড আর বিফইটার জিন সবকিছুর এক বোতলের দাম দু’ ডলারেরও নিচে। আর অবশ্যই আমাদের একজন প্রতিনিধিও থাকে। এখানে জিনিসপত্র হরেদরে এত সস্তা যে আমি একটা নতুন হিলম্যান কিনবো কিনবো করছি। আমেরিকার চেয়ে অনেক কম দামে আমি পেয়ে যাবো। তাছাড়া এটা ট্যাক্স-ফ্রি, আর এমন কিছু বিশেষ বন্দোবস্ত করা হয়েছে যাতে করে ইংল্যাণ্ড থেকে সরকার একেবারে বিনামূল্যে আমার জন্য আনিয়ে দিতে পারে।
এখানে সাকুল্লে হাজারখানেকের মতো আমেরিকান আছে, আমরা একসঙ্গে জোট বেঁধে থাকি। মানে বোঝাতে চাইছি, আমাদের মেয়েদের যে কতরকমের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তার কী আর ইয়ত্তা আছে। রাষ্ট্রদূতের দেওয়া পার্টিতে আমি বেশ কয়েকবার গেছি; এছাড়া বিদেশি ও মার্কিনীদের অন্যান্য পার্টিতেও প্রচুর ডিনার খাওয়া হয়েছে।
যাকগে, অফিসে যাবার সময় হলো – আমার গাড়ি দুয়ারে অপেক্ষা করছে। আমাদের গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হবে আর ফিরবো সরকারি গাড়িতে। আজ আমাকে একটু তাড়াতাড়ি অফিসে ঢুকতে হবে যাতে লাঞ্চের জন্য কিছুটা লম্বা সময় বাগিয়ে নিতে পারি, কারণ আমার আবার দর্জির কাছে একটা অ্যাপয়ন্টমেন্ট নেওয়া আছে।
এখানে থাকার সবচেয়ে ভালো দিক কোনটা জানো, এই প্রথম আমি আমার জীবনে কিছু টাকাপয়সা জমাতে পারছি। আমার তো আর কোনও বাড়তি বাড়ি ভাড়া লাগে না। আমার বেসিক স্যালারি ৩৪০০ ডলার, এর ওপরে ৬৮০ ডলার আমি পাই শুধুমাত্র এই এলাকায় থাকার সুবাদে। কেননা, ডিপার্টমেন্ট খোদ নিজেই জানে যে আমার কাজটা কতটা ঘাম ঝড়িয়ে করতে হয়।
তোমাদের সব্বাইকে অনেক ভালোবাসা

ম্যারি

অধ্যায় – ৮

রাষ্ট্রদূত এবং সোচ্চার সংবাদপত্র

প্রায় বছরখানেক পরে রাষ্ট্রদূত সীয়ারস হাইধোতে এসে পৌঁছলেন, তখন চীনা পঞ্জিকা অনুযায়ী বছরের তৃতীয় মাস চলছে, আর্দ্র ঋতুর ঠিক মাঝামাঝি। সমস্ত দিবারাত্রির চরাচর জুড়ে একটানা কেবল কর্কটক্রান্তির বৃষ্টি পতনের শব্দ। শুধু চাষাভুষোরাই বাইরে বের হতো, তারা মেঠোপথ ধরে কাদা ছেটাতে ছেটাতে হেঁটে যেত খড়ের বর্ষাতি আর বিশাল খড়ের টুপি পড়ে। একটা স্যাঁতসেঁতে সোঁদা গন্ধ – অনেকটা যেন ছত্রাকের ঘ্রাণের মতো – এখানে-ওখানে সর্বত্র। এমনকী আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরটিও খুব একটা যে শুকনো ছিল আদপেই তেমনটা নয়।
এই ভিজে মরশুমে বিদেশীরা গায়ে চড়াতো আঁটোসাঁটো পশ্চিমী পোশাক যার ফলে যথারীতি তারা নানান কিসিমের চামড়ার রোগের সমস্যায় ভুগতো, বিশেষ এক ধরনের ছত্রাকের বৃদ্ধিই এর মূল কারণ। মন-মেজাজের আবহাওয়া হয়ে যেত বেজায় তিরিক্ষি স্বভাবের। আর মোলো যা রয়্যাল সারখানিজ এয়ার বেসের কাণ্ডটা ঘটেছিল এই জোলো বর্ষাকালেই।
বলতে গেলে, তা প্রায় বছর পঞ্চাশেক আগেকার কথা যুক্তরাষ্ট্র সরকার হাইধোর সীমান্তে পঞ্চাশ একর জমি খরিদ করেছিল। এই এলাকা নিয়ে পরিকল্পনাটা যে কী ছিল, সেটা মগজ থেকে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল সব্বার; ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত জমিটা নেহাত বেকারই পড়েছিল। ওই বছর বর্ষাকালেই প্রশিক্ষণ দেবার অঞ্চল হিসেবে সম্পত্তিটাকে ব্যবহার করার জন্য সারখানিজ বিমানবাহিনী অনুরোধ করে; সারাবছর ধরে কাজে লাগাবার জন্যে এই উঁচু, শক্ত, সমতল জমিটা ছিল একেবারে জুতসই। অনুমতিও পাওয়া গিয়েছিল আর রয়্যাল সারখানিজ ট্রেজারি জমিটাকে ভদ্রস্থ করতে গিয়ে গাঁট থেকে মালকড়ি খরচা করেছিল লাখখানেকেরও ওপরে। চারপাশ জুড়ে সৌখিন শহরতলি নির্মাণই স্বাভাবিক ছিল এখানে; আমেরিকান জমিখাদকরা তাই জায়গাটাকে সারখানের অন্যতম সেরা রিয়েল এস্টেট বানাবার জন্যে একেবারে পড়ি কী মরি করে ধেয়ে এসেছিল।
ঘটনার ফিতে কাটা হয়েছিল সেইসময়, যখন এক খবরের কাগজ আমেরিকার ওপর বেমক্কা খেপে গিয়ে একটা গুজব রটিয়ে দেয় যে আমেরিকান সম্পত্তি থেকে রয়্যাল সারখানিজ এয়ার ফোর্সকে সমূলে উৎখাত করা হয়েছে, যাতে জমির মার্কিন ফাটকাবাজেরা বিল্ডিংয়ের পর বিল্ডিং বানিয়ে তা বেচে দিতে পারে। ঠিক পরের দিন বাকি সবকটা খবরের কাগজ এই গপ্পোটাকে লুফে নেয়। প্যান এশিয়া প্রেস, দ্য ইউনাইটেড প্রেস, দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস – সব সংবাদ মাধ্যম একই কাণ্ড করে। তাস, রয়টার্স আর প্রেস ফ্রান্সও এই প্রচারণার বাইরে ছিল না।
বিরোধী সংবাদপত্রটি দিনের পর দিন সংবাদের শিরোনামে ঘটনাটাকে জিইয়ে রাখে।
“আলবাত আমাদের ইঙ্গিত সত্যি হতে বাধ্য,” তারা লিখেছিল। “কারণ আমেরিকা দূতাবাসের কেউই তো এটা অস্বীকার করে না।”
ইংরেজিতে মুদ্রিত সংবাদপত্রের এক আমেরিকান সম্পাদক, মার্কিন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে তলব করলেন।
“দেখুন,” তিনি বললেন, “এই গাঁজাখুড়ি গল্পটা যুক্তরাষ্ট্রকে খামোখা জ্বালিয়ে মারছে। এটা যে স্রেফ ভাঁওতাবাজি, তা জানতে আমার আর বাকি নেই। আজ সন্ধেবেলায় খানচারেক প্রথমশ্রেণির দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের জড়ো করে সোজা রাষ্ট্রদূতের কাছে নিয়ে যাব। আমি তাঁকে এয়ারফোর্স প্রশিক্ষণ এলাকা সম্বন্ধে সরাসরি জিজ্ঞেস করব। ওই মুহূর্তে তিনি যদি বলেন ব্যাপারটা স্রেফ ভুয়ো, হাড়মাস বলে কিচ্ছুটি নেই, মামলা সেখানেই খতম। জানি, এটা এক দঙ্গল শত্তুর তৈরি করবে, প্রেস অনেকগুলো মুখ হারাবে, সেটাও মানছি। ঠিক আছে তাহলে, ঠিক দুটোর সময়?”
পাবলিক অ্যাফেয়ারসের নয়া অফিসার, জো বিং হংকংয়ে একটা সাংস্কৃতিক ভ্রমণে গিয়েছিলেন। অগত্যা কী আর করা, তার সহকারী প্রেস অ্যাটাশেকেই বলটা খেলতে হয়েছিল। ওই সন্ধেবেলা যখন তিনি সাক্ষাৎকারের সম্ভাবনার বিষয়টি রাষ্ট্রদূত সীয়ারসকে জানালেন, রাষ্ট্রদূতের মুখের দেয়াল রক্তবর্ণ ধারণ করলো আর চোখ দুটো যেন ফেটে পড়বে বলে মনে হলো।
সজোরে টেবিল চাপড়ে, “না না, ইশ্বরের দোহাই,” তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “আপনি খেলাটার এই জায়গায় আমাকে দয়া করে ঘেঁটে দেবেন না। এটা দেখেছেন?” তিনি মাথা নাড়লেন, হাতে ধরা ছিল একটা চিঠি। “এটা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে এসেছে। চারমাসের মধ্যেই একটা যুক্তরাষ্ট্রীয় বিচার প্রক্রিয়া চালু হতে চলেছে, আর আমি এর জোয়াল কাঁধে নিলে তিনি খুশি হবেন। আমি মনস্থির করে ফেলেছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, তখনকার আর এখনকার ডাঁই করে রাখা বকেয়া বিষয়গুলোকে মিলিয়ে-মিশিয়ে জগাখিচুরি করে ফেলবো না। জো বিং-কে এটা দেখতে বলো তো।”
“তিনি এখন হংকং-এ, স্যার।”
“তাহলে তুমি ওদের সামলাও।”
“ওরা যে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায় স্যার। আমি ওদের আগেই আটকাবার চেষ্টা করেছি।” রাষ্ট্রদূত ব্যর্থ হয়ে নিজের চেয়ারে ফিরে এলেন। আর তখনই নিমেষের মধ্যে তাঁর চোখে যেন একটা ধূর্ত চাউনি খেলে গেল। “ঠিক আছে,” তিনি বললেন, “আসতে দাও ওদের। এক কাজ করো, তুমি তোমার পুরনো ইয়ার-দোস্তদের নিয়ে দুটো নাগাদ এসো। আমি তৈরি থাকব।”
দুপুর দুটো নাগাদ পাঁচজন সম্পাদক রাষ্ট্রদূতের অফিসে ঢুকল।
“বসুন, ভদ্রমহোদয়েরা। বলুন কী করতে পারি আপনাদের জন্য?”
আমেরিকার সম্পাদকটি বললেন, “মাননীয় রাষ্ট্রদূত মহাশয়, চারদিকে একটা কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্টের দেওয়া জমি থেকে নাকি এয়ারফোর্সকে ধুয়েমুছে সাফ করে দেওয়া হবে। মানে, বলতে গেলে, মোদ্দা ব্যাপারটা এই দাঁড়াচ্ছে যে তাদের বাস্তুনির্মাণের লক্ষ লক্ষ ডলার বরবাদ হওয়া থেকে কেউ তো রুখতে পারবে না। মনে হচ্ছে এই গোটা সম্পত্তিটাকে ফালিফালি করে বিক্রিবাট্টার জন্য আমেরিকান রিয়েল এস্টেটের দালালদের হাতেই তুলে দেওয়া হবে।”
“হুঁ, আমি বিষয়টা পড়েছি।”
“বেশ, তাহলে বলুন স্যার এটা সত্যি না মিথ্যে?”
রাষ্ট্রদূতের মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধার দুলুনি দেখা গেল। তিনি পেন্সিলের একপ্রান্ত গুঁজে দিলেন কানে, ধূসর চুলগুলোকে খানিকটা পরিপাটি করে নিলেন, তারপর তাকালেন ছাদের দিকে।
“দেখুন”, অবশেষে তিনি বললেন। “এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।”
অবাক হয়ে হতভম্ভ চার সম্পাদক পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন, রাষ্ট্রদূতকে ধন্যবাদ জানালেন এবং মানেমানে কেটে পড়লেন। আমেরিকান সম্পাদকটি ছিলেন সবার পিছনে। তারা চলে যাবার পর তিনি চিৎকার করে বললেন, “ইশ্বরের দিব্যি, আপনাকে কিছু বলতেই হবে। যা বলা হচ্ছে সেসব তাহলে নির্জলা সত্যি। যাচ্ছেতাই ব্যাপার, গোটা পৃথিবী জুড়ে এটা ছড়িয়ে যাবে। আপনি কিন্তু জানেন উৎখাতের গল্পটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা।”
“শোনো, তোমাকে তাহলে আসল কথাটা বলি,” রাষ্ট্রদূত বললেন, “এটা সত্যি না মিথ্যে আমি জানি না।”
“তাহলে ওয়াশিংটনে তার করুন আর জানুন ব্যাপারটা নিছক কারচুপি কী না?” রাষ্ট্রদুত টেবিলের ওপরের একটা ঘন্টি বাজালেন। মুহূর্তের মধ্যে মিশনের ডেপুটি চিফ হাজির হলেন।
“বলুন, স্যার?”
“চার্লিকে বলো”, রাষ্ট্রদূত বললেন। “স্মিথের মাথায় একটা ভয়ঙ্কর ভালো চিন্তা এসেছে…”
১৩ই ফেব্রুয়ারি সারখানের মার্কিন দূতাবাস কর্তৃক এই বার্তাটি গৃহীত হল! ডেক্সটার পিটারসন
এর জন্য রাষ্ট্রদূতের ব্যক্তিগত বার্তা পাঠানো হচ্ছে এক্স আপনাকে আগাম জানানো হচ্ছে যে আপনার বিচারসত্ত্বটি রাষ্ট্রপতির দ্বারা মনোনীত হয়েছে, আপনি ফিরে এলে তা খুব শীঘ্রই কার্যকরী হবে
গিলবার্ট ম্যাকহোয়াইট আপনি আপনার পুনর্নিযুক্তিকরণের উপরে আস্থা রাখুন
অভিনন্দন
একবার তার বিচার পদ্ধতি কার্যকর হওয়ায় লাকি লউকে একরকম মনঃক্ষুণ্ণ হয়েই সারখান ছাড়তে হয়েছিল। প্রায় সেই মুহূর্তেই সে জায়গাটার প্রতি অকৃ্ত্রিম এক আন্তরিক উষ্ণ আবেগ অনুভব করলো।
অবশ্য তাঁর আবেগ এতটা লাগামছাড়া ছিল না যে বাস্তব রাজনৈতিক ব্যাপারগুলো মগজ থেকে বেমালুম উবে যাবে। হাইধোর ইতিহাসে সবচেয়ে জাঁকালো লিকুইড পার্টিটা দেবার আগে তিনি তিনটে বিষয় আগেভাগেই সেরে রেখেছিলেন।
তিনি কে না কে এক ফাদার ফিনিয়ানের জন্যে ফালতু সুরক্ষা বৃদ্ধির ব্যাপারটা গোড়াতেই খারিজ করে দেন, এর পেছনে যুক্তিটা ছিল এই যে, ফাদার নাকি “ভিন্ন ধরনের ক্ষমতা ব্যবহার করে পারিবারিক রাজনীতিতে” মাথা গলাতে চাইছেন।
তিনি আবার সারখানিজ সরকারকে মন্ত্রণা দেন যাতে তারা জন কোলভিনের ভিসা বাতিল করে দেয়, কোলভিন তখন জোন্স হপকিন্স হাসপাতাল থেকে সবেমাত্র সেরে উঠে সারখানে ফিরতে চাইছিল। তিনি এই কীত্তিটা করেছিলেন ফোনে,ফোনে, অফিসিয়াল রেকর্ডে এ ধরনের কোনও প্রমাণ থাকুক, সেটা তিনি চান নি। তারা কারো জন্য কোনও দিন ভালো কিছু করেছেন বলে মনে হয় না।
তাঁর ক্ষমতায় থাকাকালে সারখান যা কিছু অর্জন করেছিল, সেসবের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টকে বিশেষ যত্ন সহকারে একটা লম্বা-চওড়া রিপোর্ট লিখলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, “কিছু মানুষ যেমন সবসময়ই থাকেন যাঁরা একটি সুস্থ প্রণালীকে বেছে নেন আবার কারো কারো ভিতরে স্বাভাবিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে বাড়িয়ে তোলবার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। সারখান এদিক থেকে আমেরিকার চেয়ে ঢের বেশি শক্তসমর্থ।”

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্বটি (১০) পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন

https://www.teerandaz.com/%e0%a6%89%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%ae-%e0%a6%9c%e0%a7%87-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%93-%e0%a6%89%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%ac-10/

পরবর্তী পর্বটি (১২) পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন

https://www.teerandaz.com/%e0%a6%89%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%ae-%e0%a6%9c%e0%a7%87-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%93-%e0%a6%89%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%ac-12/

Share Now শেয়ার করুন