উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১২]

0
292

পর্ব ১২

অধ্যায় ৯

প্রত্যেকেরই কান আছে

সারখানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত সম্মানীয় গিলবার্ট ম্যাকহোয়াইট ছিলেন একজন কাবিল আদমি। এই চুয়াল্লিশ বছর বয়সেও তাঁকে ১৯৩৪-এ প্রিন্সটন থেকে সদ্য গ্র্যাজুয়েট করা তরতাজা যুবকটির মতো একইরকম লাগে। মাথায় লালরঙ চুল; গাঁট্টাগোট্টা পেটানো শরীর। তা সে যুক্তরাষ্ট্র হোক কী ইংল্যান্ড যেখানেই তিনি ছিলেন সপ্তাহে কমসে কম তিনবার স্কোয়াশ খেলাটা তাঁর অভ্যাসের মধ্যে এনে ফেলেছিলেন, ভিন দেশে থাকলে অবশ্য সময় পেলেই টেনিস খেলার সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইতেন না। ধুমপানের বাতিক ছিল অল্পসল্প, তবে সেটা হতো শিল্পের এক অনন্য নজির, ছিপছিপে গড়ন, হাতে পাকানো হাভানা সিগার। পানদোষ ভালোই ছিল। পছন্দের তালিকায় পয়লা নম্বরে ছিল মার্টিনিজ, তবে ওই রোজ সন্ধ্যায় বড়জোর এক কী দু পাত্তর তার বেশি নয়। কিন্তু তিনি টানতে পারতেন, কখনও -সখনও মর্জি হলে, গলা দিয়ে অনর্গল গলে যেত প্রচুর পরিমাণে ভদকা, সেক অথবা স্কচ; আর তাতে কখনও তাঁর জিভ পাতলাও হতো না কিংবা মাথাও গুবলেট হয়ে যেত না ।
ম্যাকহোয়াইট, রাষ্ট্রদপ্তরে একেবারে তাঁর পয়লা দিন থেকেই, একজন পেশাদার ফরেন সার্ভিস অফিসার হিসেবে নিজের কাজ শুরু করেন। ছুটিছাটার বায়নাক্কা থেকে তিনি ছিলেন শতহস্ত দূরে। কাজে কর্মে তাঁর জুড়ি মেলা ভার।মানতে হবে কলজের জোর ছিল কিছু আর ভদ্রলোক যেমনি ঠোঁটকাটা তেমনি ছিল তাঁর তুখোড় কল্পনাশক্তি। ১৯৫২ সাল থেকে চার চারটে বড়ো বিদেশি শহরে কনসাল জেনারেল হিসেবে কাজ করেছেন, দুটো শহরে ডেপুটি চিফ অফ মিশন, এবং সত্যি কথা বলতে কী, নতুন নতুন এসেই তাঁর ভাঁড়ারে জড়ো হয়েছিল ওপরওয়ালাদের দেদার প্রশস্তি।
১৯৫৪-তে মাননীয় শ্রীমান গিলবার্ট ম্যাকহোয়াইটকে সারখানের রাষ্ট্রদূত করা হয়। এই নিয়োগের ঘটনাটা তাকে আন্তরিকভাবে গভীর তৃপ্তি দেয়। তিনি জানতেন সারখানের সরকার একেবারে আনকোরা, অনভিজ্ঞ এবং অনেকটা অস্থির পেণ্ডুলামের মতন, আর ওই আঠারো লাখ সারখানিজের স্বস্তি বলতে কিছু অবশিষ্ট ছিল না। তিনি এ সম্বন্ধেও ওয়াকিবহাল ছিলেন যে সারখানে কমিউনিস্টরা যথেষ্ট বলিষ্ঠ, চৌকস এবং রীতিমতো জোটবদ্ধ। তাঁর ভিতরে ছিঁটেফোঁটা সন্দেহ ছিল না যে তারা যে-কোনও মুহূর্তে সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুথ্থানের চেষ্টা চালাবে। মার্কসবাদ লেনিনবাদ, এবং বিশ্বাসের ওপর টিটো বা মাওবাদী ভাষ্য সম্পর্কে তাঁর বিদ্যে ছিল অনবদ্য। সোভিয়েত নীতির জ্ঞান ও প্রয়োগতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি বেশ ভালোই পরিচিত ছিলেন।
রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইট তাঁর সযত্নলালিত মিশনারি বিশ্বাসের মহান ঐতিহ্যের ওপর আদ্যোপান্ত আস্থা রেখে এই নয়া নিয়োগের জন্য নিজেকে ঘষেমেজে তৈরি করেছিলেন। বড়জোর পনেরো হপ্তা লেগেছিল এই সারখানিজ ভাষাটাকে আয়ত্ত করতে, যা সত্যি সত্যিই একটা অবিশ্বাস্য কঠিন কাজ। সারখানিজ ইতিহাস আর রাজনীতির ওপর খুঁজেপেতে যে কেতাব-টেতাবগুলো জোগাড় করেছিলেন তার সবকটাই আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে ফেলেছিলেন। শেষের গত কয়েক বছর, পরিদর্শক হিসেবে সারখানের মাটিতে যারাই পা রেখেছেন, তা সে নৃতত্ত্ববিদ, কূটনীতিক এবং ব্যবসায়ী যিনিই হোন, তদের সব্বার সঙ্গেই আলাপ আলোচনা হয়ে ছিল তাঁর। এর আগে যিনি এখানে ছিলেন – লুইস সীয়ারস – ওঁনার রিপোর্টগুলোও উল্টেপাল্টে ঘেঁটেঘুঁটে খুঁটিনাটি যতটা সম্ভব ভালো করে খতিয়ে দেখে নিয়েছিলেন তিনি।
হাইধো ছিল যেন কল্পনার সুতো দিয়ে বোনা। শহরটা উঁচু মালভূমির ওপরে, সেখান থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের চেহারাটা দেখা যেত; যদিও অরণ্যের গাঢ় সবুজ শরীরের ছায়া যেন আগলে রেখে ছিল ঘরবাড়িগুলোকে। বাড়িগুলো সব আলাদা আলাদা এবং দিব্যি অটুট মেজাজে দাঁড়িয়ে। দৈত্যাকার এই নির্মাণগুলো সারখানের লোকেরা খাড়া করে নি। তৈরি হয়েছিল হালকা হলুদ আগ্নেয় পাথরে, সেগুলো আবার কর্কটক্রান্তির জলবায়ু এবং একঘেঁয়ে ঝিমধরা জঙ্গুলে বৃষ্টিতে অদ্ভুত আবছা সবুজ আচ্ছন্নতার মায়াবী চাদরে ঢাকা থাকতো। দেখে মনে হতো, যেন সমুদ্রের নীচ থেকে দেখা আশ্চর্য কোনও এক শহরের দৃশ্য।
হাইধোতে গরমের দাপট ছিল দজ্জাল রকমের, কিন্তু এ নিয়ে গিলবার্ট কিংবা তাঁর স্ত্রী মলির ভেতরে আতঙ্কের লেশমাত্র দেখা যায় নি। কর্কটক্রান্তির এই গরমকে হজম করার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি নিয়েই তাঁরা এসেছিলেন, এবং এ নিয়ে তাঁরা কিংবা তাঁদের ছেলেদের মুখ ফুটে কখনও ছিঁটেফোটা অভিযোগের টুঁ শব্দও শোনা গেছে এমনটা হয় নি। দূতাবাসের ওপরের দিকের জানালার চোখের ভেতর দিয়ে বাইরে সমুদ্দুর ডিঙিয়ে মালভূমি পেরিয়ে দুচোখের দৃষ্টি হেঁটে যাচ্ছিল যখন, রাষ্ট্রদূত গিলবার্ট ম্যাকহোয়াইট চেতনার গভীরে অনুভব করলেন জীবিকার জলে তাঁর এই আমগ্ন ডুবে থাকাটা নিজের অস্তিত্বের শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে কতখানি ওতপ্রোত জড়িত। সারখানে থাকা কালে সেখানকার জলবাতাস তাঁর অনুভূতির চামড়ায় তেমনভাবে আঁচড় কাটেনি কোনও দিন। ওই ছয় মাসের মধ্যে রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইট সর্পিল চাতুর্য, ধৈর্য এবং অসীম কল্পনার মিশেলে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে তাঁর সমর-কৌশলের মানচিত্রটি তৈরি করে ফেলেছিলেন, দেশীয় নেতাদের সঙ্গে প্রায় অন্তহীন আলোচনার পর জয় সম্পর্কে একটা স্বস্তির মেঘ মগজে থিতু হয় অবশেষে। পরিকল্পনাটি ছিল চূড়ান্ত গোপন, প্রকৃতপক্ষে, মার্কিন দূতাবাসের হাতেগোনা মাত্র তিনজন কর্মচারী এই তীব্র নির্মম অভিযানটি সম্পর্কে বিশদভাবে জানতেন, যা খুব শিগগিরই ঘটতে চলেছে। সুরক্ষাকে যতটা পারা যায় নিশ্ছিদ্র করার জন্য, গোপন শলাপরামর্শগুলো চালাতেন নিজের বাড়ির একান্ত ব্যক্তিগত পরিসরে।
যুদ্ধের কথা শুনলে ম্যাকহোয়াইটের রক্তের ভেতরে অদম্য এক উত্তেজনা লাফিয়ে উঠত। তিনি সারখানে কমিউনিস্টদের ক্ষমতাকে যে হতচ্ছেদ্দার নজরে দেখতেন এমনটা একেবারেই নয়, কিন্তু একইসঙ্গে নিজের শক্তি ও সক্ষমতাকেও নিছক ফেলনা বলে ভাবতেন না। স্রেফ দু-একবার নয়, বিভিন্ন সময়ে কমিউনিস্টদের সঙ্গে সাপে-নেউলের নির্ঘাত লড়াইয়ে দস্তুরমতো অংশগ্রহণ করাটা ম্যাকহোয়াইটের কাছে ছিল নিজের ক্যারিয়ারের মাইল ফলকের মতো। তাঁর কাছে যুদ্ধের অর্থ ছিল বেশ খানিকটা অন্য মাত্রার। বেনিয়ার ধারালো বিচক্ষণতা, সমর সৈনিকের দিমাগ খাটানোর অভিনব মারপ্যাঁচ, কূটনীতিকের মেধা ও অধ্যাবসায় এইসব মিলিয়ে কোনও জয়কে রীতিমতো হাসিল করা বলতে যা বোঝায় এক্কেবারে তাই, যদিও রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইটকে কক্খনও সাত মহল্লা গলা চড়িয়ে একথা বলতে শোনা যায় নি বটে, তবু এ যে তাঁর একান্ত নিজস্ব বিজয়, সেকথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
এক বিকেল বেলায় কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে তাঁর পাঁচিলের চতুর গাঁথনিটাকে আরো জবরদস্ত করতে সেটার গা-গতরে আরেক দফা সিমেন্টের পোঁচ মারতে চাইছিলেন। তিনি মাননীয় লি প্যাংয়ের অপেক্ষায় ছিলেন। মি. লিয়ের পরিচয়, তিনি সর্বাধিনায়ক চিয়াং কাইশেকের এক বিশিষ্ট প্রতিনিধি। রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইট লিকে সারখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন যাতে চীনা নেতাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা যায় সেই উদ্দেশে। স্থানীয় চীনা মানুষদের অধিকাংশেরই আস্তানার ঠিকানা ছিল এই সারখান, তাদের ধারণায় তারা একেবারে খাঁটি দেশীয় সারখানিজ এবং দেশপ্রেমেও কোনওরকম ভেজাল নেই। পাশাপাশি তারা নিজেদেরকে আবার চীনা দেশপ্রেমিক বলেও মনে করতো, আর এই দুই দায়বদ্ধতার মধ্যে টানাপোড়েনের টানাটানিতে বিন্দুমাত্র ভুগতে দেখা যায় নি তাদের, এই বিটকেলমার্কা সহাবস্থানের আজগুবি ঘোঁটটা পাশ্চাত্য মগজের ঘিলুকে ঘেঁটে ঘা করে দিয়েছিল।
লি আর ম্যাকহোয়াইটের মধ্যে ইয়ারদোস্তির সম্পর্ক বহুত দিনের। দুজনেই ছিলেন পাক্কাঝানু ব্যবসায়ী; টাকাপয়সা যা কামিয়ে ছিলেন তার পরিমাণ বেশ ভাল রকমেরই বলতে হবে, কিন্তু শেষ অব্দি এই সদাগরি কারবারটা ছেড়ে দিলেন মাঝপথেই, যদিও এর পেছনের কারণটা মোটেই এক নয়, এক্কেবারে আলাদা। দুজনেই ছিলেন সেনা জওয়ান। এবং ব্যাপারটা যথেষ্ট কাকতাল হলেও, তাজ্জব কী বাত এই যে, দুজনেই ছিলেন চার্চের বিশপ। তাঁদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার বুনোটটা ছিল চমৎকার। ম্যাকহোয়াইট অনেকখানিই নিশ্চিত ছিলেন যে যুদ্ধে দেশীয় কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে স্থানীয় চীনাদের লড়াইয়ের ব্যাপারটিতে সাহায্য করতে লি কিছুমাত্র পিছপা হবেন না। তারপর শেষমেষ যখন একেবারে নিরঙ্কুশ নিশ্চিন্ত হলেন, তখন ম্যাকহোয়াইট পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য নিজেকে তৈরি করে ফেললেন।
যখন তাঁর দূতাবাসের ঘর থেকে পুরু কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন তখন রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইট তাঁর ঘরেই একেবারে পিছনের দিকে ডোনাল্ড এবং রোজারের উপস্থিতি টের পেলেন। তাদের অনর্গল বকবকানি তাঁর ভেতরে বেশকিছুটা স্বস্তি এনে দিল। ডোনাল্ড এবং রোজার দুজনেই চিনদেশীয়, বয়স খুব একটা কম নয়। মার্কিন নিয়োগকর্তারা নিজেরা তাদের যে নামটা সেঁটে দিয়েছিলেন সেটা আর রোজকার ব্যাবহার করা ওই এটা-ওটা টুকিটাকি কয়েকটা ইংরেজি শব্দ অব্দি ছিল তাদের দৌড়, এর বাইরে এ ভাষার আর কিছু তাদের জানা ছিল না। ১৯৩৯-এ যখন থেকে সারখানের মার্কিন দূতাবাস তাদের মাইনেকরা লোক হিসেবে নিয়োগ করেছে, তখন থেকেই তারা দূতাবাসের বিশ্বস্ত লোক, তারা এমন দক্ষতা, আত্মত্যাগ, স্বার্থহীনতা এবং সহৃদয়তার সঙ্গে কাজ করত যা সবসময়ই রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইটের অন্তরকে স্পর্শ করত। দুজনেরই রান্নার হাত ছিল বাঁধিয়ে রাখার মতন আর আজকালকার বাজারে এমন খাসা খানসামা তো ভাবাই যায় না। তাঁরা ছিল, যাকে বলে, ভদ্র মার্জিত এশীয়র জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত এবং যে যুদ্ধ নিয়ে ম্যাকহোয়াইটের এত হাজার গন্ডা ব্যস্ততা, সে-ই গোটা আয়োজনটাকে অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে তাদের ভূমিকাও নেহাত কম ছিল না। তারা যেন কনফুসিয়াসের শেখানো সততা ও নৈতিকতার সাক্ষাৎ অবতারস্বরূপ ।
রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইট ঘুরে দাঁড়ালেন এবং সীঁড়ির নীচ দিয়ে এগোতে থাকা মি. লি’র দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
“আরে কী সৌভাগ্য আমার, আসুন, আপনার খাতিরে আমি গোটা একটা জার শুকনো, ঠাণ্ডা মার্টিনিজের বন্দোবস্ত আগেভাগেই করে রেখেছি।“ ম্যাকহোয়াইট হাসতে হাসতে বললেন।
“বেশ করেছেন, ওই পুরো জারটা চেঁছেপুছে সাবার করে দেবার জন্য আমিও একদম তৈরি হে,” হাসি ফিরিয়ে দিয়ে লি বললেন। “সেই ঘটনাটার কথা কি আমি কখনো আপনাকে বলেছি রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইট, কাণ্ড বলে কাণ্ড, আরে ওই যে ওই মহিলার গপ্পো, যিনি ওরডর্ফ অ্যাসটোরিয়ার পঁয়ত্রিশ তলার শৌচাগারে আটকে পড়েছিলেন, তখন মার্টিনিজই টিকে থাকার একমাত্র রসদ জুগিয়ে গেছে, কেননা কী-হোলের ফোঁকর গলিয়ে বাঁকানো নল দিয়ে স্রেফ এই তরল অমৃতই পাঠানো যেত, কী বাঁচাটাই-না বেঁচে গেছিলেন।“
রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইটের বাঁধভাঙা হাসি ঝনঝন করে উঠল, বেশ ধেড়ে ঢাউস মাপের ঠাণ্ডা গ্লাসগুলোতে মার্টিনিজ ঢালতে লাগলেন। তরলটা পেটে চালান করে দিয়ে মিনিট দশেক ধীর স্থির শান্ত মেজাজে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে থাকেন। পরের আধ ঘণ্টায় মলি তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, তারপর তাঁরা বেশ রসিয়ে রসিয়ে তোফা এক নৈশভোজ সেরে ফেলেন। মলি নেমে আসার আগেই ম্যাকহোয়াইটকে লি’র সঙ্গে কথা বলতে হল। লি’র গল্পবলাটা শেষ হবার পর, ম্যাকহোয়াইট তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়লেন।
“লি, আপনার কাছে আমি যেমন খোলামেলা, রাখঢাক লুকোছাপার কোনো প্রশ্ন নেই, উল্টো আমিও আপনার কাছে ঠিক এরকমটাই আশা করি,” ম্যাকহোয়াইট বললেন। “একটা জরুরি ব্যাপার নিয়ে বেশ চিন্তায় আছি, আপনার সঙ্গে এ নিয়ে খানিক কথাবার্তা বলতে পারলে সুবিধে হতো।“
“আরে এত দোনোমোনো করার কী আছে, আমাকে দিয়ে আপনার যদি কোনও উপকার হয়, যতটা পারি আমি করবো, নিশ্চিন্ত থাকুন,” লি বললেন। ডোনাল্ড যখন তাঁদের গ্লাসগুলোতে মার্টিনিজ ঢালছিল, তখন ম্যাকহোয়াইট একবারের জন্য একটু থামলেন, তারপর তিনি ফের বলা শুরু করলেন।
“সমস্যা বলতে ওই আর কী, আপনার তো মিলিটারির অভিজ্ঞতা আছে, ব্যাপারটা সহজেই বুঝতে পারবেন।” ম্যাকহোয়াইট বললেন। “আসলে এটা একটা মগজাস্ত্র ইস্তেমালের মামলা। আমি জানতে চাইছি কোন কোন চীনা নেতার মধ্যে কমিউনিস্টদের জন্য আবেগের দরদ উথলে উঠছে। ওগুলোকে দেশ থেকে ঘাড় ধরে খেদিয়ে দেওয়ার জন্য একটা জম্পেশ পরিকল্পনা ফেঁদে রেখেছি …”
শুনে তো লি’র হাসিই থামছিল না; কিন্তু কোনও সূক্ষ্ম কারণে তাঁর গোটা অভিব্যক্তির ভূগোলটাই গেল বদলে। হাসি তখনও অবিকল, তখনও মার্টিনিজে চুমুক মারছিলেন, আর মনের খাতায় একটা হিসেব নিকেশের আঁক কষে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর চোখগুলো হয়ে গিয়েছিল বরফ-কঠিন, তিনি ম্যাকহোয়াইটের কাঁধের পাঁচিল টপকে উঁকি মেরে ডোনাল্ড এবং রোজারকে লক্ষ করছিলেন, তারা দাঁড়িয়েছিল মাত্র পনেরো ফুট দূরে সার্ভিং টেবিলের ঠিক পাশটাতেই। তিনি মুচকি হাসলেন, কিন্তু ম্যাকহোয়াইট তাঁর হাসির কোণে সতর্কতার সিঁদুরে মেঘটিকে বিলক্ষণ চিনতে পারলেন। কথোপকথনের গোটা ছন্দটাই গেল পাল্টে, ম্যাকহোয়াইট স্পর্শকাতর মানুষ, বুঝতে পারলেন লক্ষণ বিশেষ সুবিধের ঠেকছে না।
“আমার কথাটা একটু ভাবুন, কমসে কম এটা তো অন্তত বুঝুন লি, এখানে থাকা কোনও সৎ চীনা লোকের ক্ষতি করার জন্য আমি তথ্যগুলোকে ব্যাবহার করতে যাচ্ছি না,” ম্যাকহোয়াইট বললেন। “সত্যি কি মিথ্যে জানি না, হাওয়ায় ভাসা ভাসা শুনতে পাচ্ছি কেবল, কিন্তু এদেশে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে যে লড়াইটা ঘটতে চলেছে বলতে গেলে একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে তাতে এই বিষয়টা একটা ঘোঁট পাকিয়ে তুলবে, আপনি নিজের চোখেই দেখতে পাবেন।“
“ব্যাপারটা আমার নজর এড়ায় নি গিলবার্ট,” লি বললেন। “প্রশ্নটার গুরুত্ব কতখানি তা বুঝতে আমার এক মুহূর্তও সময় লাগেনি।“
“কিন্তু এসব বলে আমি আপনাকে কোনওরকম অস্বস্তিতে ফেলে দিলাম না তো আবার?”
এক রাক্ষুসে চুমুকে লি তাঁর মার্টিনিজ খালাস করে খালি গ্লাসটা টেবিলের ওপর রাখলেন। একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে টান মারলেন গভীরভাবে, এবং তারপর অ্যাশট্রের খোদলের মধ্যে পিষে দিলেন। যখন লি তাকালেন, ম্যাকহোয়াইটের মনে হল লি’র আগের চেনাজানা মুখের গোটাটাই যেন প্রায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। ম্যাকহোয়াইট নিজের জীবনে এই প্রথম একজন সম্পূর্ণ হিংস্র প্রাচ্যদেশীয়র মুখোমুখি হলেন। আদ্যোপান্ত কেঁপে উঠলেন তিনি।
“গিলবার্ট, আপনি একজন বোকা, বোকাস্য বোকা, আপনার আক্কেলজ্ঞান কোন মাঠে চড়তে গেছে জানি না“, লি বললেন। “আমি অতি সাবধানে এমনভাবে ফিসফিসিয়ে কথা বলছি যাতে শুধু আপনিই শুনতে পান। ওদিকে নিজেকে দেখুন, এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অথচ ঘরে খুল্লামখুল্লা চাকর-বাকরের সামনে…।”
ম্যাকহোয়াইট তাঁকে কথার মাঝ রাস্তায় থামালেন, “ডোনাল্ড, রোজার ওরা কী আর আজকের লোক, ওদের ওপর অনায়াসে বিশ্বাস করা যায়। ইংরেজি বোঝে তো কাঁচকলা। আর আছে তো রান্নাঘরের পর্দার ওই ওপারে।“
“আরে রাখুন মশাই, চাকর সে পুরনো হোক আর যাই হোক, কারও ওপরেই পুরোপুরি ভরসা করা যায় না গিলবার্ট, সে আপনার কোল ঘেঁষে থাকুক কী বাড়ির বেসমেন্টেই থাকুক,“ লি বললেন।
লি’র নাকের চারপাশে ফুটে ওঠা সাদা দাগগুলো থেকে ম্যাকহোয়াইট বুঝতে পারলেন তিনি রসিকতা করছেন না।
“ব্যাপারটা আরেকটু খুলে বললে আপনার মনের এই খুঁতখুঁতে ভাবটা কেটে যাবে,” ম্যাকহোয়াইট বললেন। “ডোনাল্ড ও রোজারের ইংরেজির জ্ঞানগম্যি বলতে তো লবডঙ্কা। ওদের নিয়োগ করার আগেই সারখানের জাতীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষের চেক করা তাবৎ প্রশংসাপত্রগুলো আমি দেখে নিয়েছিলাম। আমার আগে যারা ছিলেন এদের সংহতি ও সততা নিয়ে তাঁদের মনে কোনও প্রশ্নচিহ্ন ছিল না। ওই যে ১৯৪১-এ জাপানীরা এলো, তখন এরাই দূতাবাসের মূল্যবান মালপত্তর মাটির তলায় লুকিয়ে রেখেছিল। যুদ্ধ-টুদ্ধ চুকেবুকে যাওয়ার পর সকলে ফিরে এলে পুঁতে রাখা সেসব জিনিসপত্তর তাঁদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের বুক দিয়ে আগলে রাখা এই অসাধারণ পরিষেবা কী কখনও ভোলা যায়, বলুন।
লি যখন কথা বলছিলেন তখনও তাঁর নীরস কণ্ঠস্বরে আবেগের ছায়ার ছাপটুকুও ছিল না, শীতল মুখচোখের রেখার জ্যামিতি তখনও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। “গিলবার্ট আমি আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি একটা নিরেট গবেটের মতো কাজ করে যাচ্ছেন।”
ম্যাকহোয়াইটের কাছে অসহ্য তেতো লাগতে পারে তেমন কিছুই বলেন নি লি। তিনি নালিশ ঠুকে যাচ্ছিলেন একটা ব্যাপারেই, ম্যাকহোয়াইটের না আছে যথেষ্ট মনের জোর না আছে নিরাপত্তার দিকে ঠিকঠাক খেয়াল, অবশ্য ম্যাকহোয়াইট দাবি করতেন ঠিক উলটো, তাঁর নাকি এসব ব্যাপারে নিজের কোনও খামতিই ছিল না। আসলে তিনি লি’কে এ বিষয়ে কিচ্ছুটি ফাঁস করেন নি, ডোনাল্ড আর রোজার শুধু চীনা ছাড়া আর অন্য কোনও ভাষা জানে কিনা, সেটা জানতে নিজেই বেশ আঁটোসাটো একটা ফন্দিও এঁটেছিলেন। কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই যখন তখন মালিকসুলভ আদেশের সুরে ইংরেজিতে তিনি তাদেরকে ডাকাডাকি করতেন, যখন তাদের চালচলনে বেতালা কিছু দেখতে পেতেন না, মুখের ভাবেরও কোনও হেরফের ঘটত না, তখন পরম শান্তিতে তিনি হাঁফ ছাড়তেন, যাক বাবা বাঁচোয়া, এরা দেখছি তাহলে ইংরেজির ই-টাও জানে না। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে তারা লেখার ব্যাপারেও সমান গণ্ডমূর্খ, হাতে পেন পেন্সিল দেখা তো দূরের কথা, বাড়ি থেকে চিঠিপত্তরও যে কখনও এসেছে, এমনটাও মনে করতে পারেন না।
ম্যাকহোয়াইট ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিলেন, তাঁর মুখের পর্দা জুড়ে চিন্তার কুয়াশা স্পষ্ট। এই দুজন চীনা মানুষ আমার বন্ধু। কুড়ি বছর ধরে তারা আমেরিকাকে পরিষেবা দিয়েছে। যুদ্ধের সময় তারা আমাদের জন্য জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করেছে।
লি’র মুখের অভিব্যক্তির ভেতরে এক রত্তিও রদবদল দেখা গেল না। তিনি বারের দিকে অবিচলিত হেঁটে গেলেন, মার্টিনিজের জারটা তুলে নিয়ে ম্যাকহোয়াইট ও নিজের গ্লাসটা আবার ভরে নিলেন। তারপর বসলেন, তিনি আর ম্যাকহোয়াইট এখন মুখোমুখি।
“আপনি নির্বোধ নন গিলবার্ট”, লি বললেন। “দেখুন, যদি আপনি মার্কিন দূতাবাস সম্পর্কে তথ্য চান, তাহলে চর লাগানোর সবচেয়ে মোক্ষম জায়গা কী হতে পারে?”
“রাষ্ট্রদূতের সেক্রেটারি।”
“তারপর?”
“তার পোশাকআশাক গোছগাছ করে রাখার মতো খানসামা”, বেশ অনিচ্ছুকভাবে নামতার মতো বলে চললেন ম্যাকহোয়াইট।
“আর কিছু ?”
“তার সুইচবোর্ডের অপারেটর।”
“আপনার কী মনে হয় গুপ্তচর কেমন হওয়া উচিৎ, এমন কেউ যাকে আপনি সন্দেহের নজরে দেখবেন, নাকি যে অবলীলায় মনিবের ভরসা, আত্মবিশ্বাস আদায় করতে পারবে তেমন কোনও লোক, কোনটা বলুন তো?”
ম্যাকহোয়াইট তীক্ষ্ণভাবে তাকালেন। এই প্রথমবার তাঁর মধ্যে সন্দেহের ঝিলিক খেলে গেল, উদ্বিগ্নতার খুদে কামড়। তাঁর দূতাবাসের এই পদগুলো, আরো অনেক – ট্রান্সলেটার, মেসেঞ্জার, ড্রাইভার, ক্লার্ক – যে দিকেই দেখো, এশীয় আর এশীয়তে ছয়লাপ। হঠাৎ তাঁর স্মৃতির পাত্রে আরেক বিপদের জল ছলকে ওঠে, বিশ্বের যে-কোনও মার্কিন দূতাবাস তো বটেই, এছাড়া সমস্ত মার্কিন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, অফিস, সামরিক সহায়তা থেকে শুরু করে আর্থিক মিশনগুলো, আঁতিপাঁতি কোনাঘুপচি তন্ন তন্ন করে দেখলে দেখা যাবে, এই সব সুরক্ষাহীন পদগুলোতে কত রাশি রাশি বিদেশী আছেন তার ইয়ত্তা নেই। একটা আতঙ্কের ময়াল আবহ তাঁর নিজের ভেতরে পাক খেয়ে উঠতে লাগল, তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খুবলে খেতে লাগল প্রশ্নের দাঁতালো কামড়, কীভাবে এমন ছেলেমানুষি ভুল তিনি তাঁর দূতাবাসে হতে দিলেন।
“মলি আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আগে হাতে ঠিক কতটা সময় আছে?” লি বললেন মোলায়েমভাবে।
“ধরে নিন তাও মিনিট কুড়ি তো লাগবেই”, ম্যাকহোয়াইট উত্তর দিলেন।
লি তাঁর চেয়ারের পেছন দিকটাতে ঈষৎ গা এলিয়ে দিয়ে, চীনা ভাষায় জোড়ালো বাঁজখাই গলায় মুরুব্বিয়ানার ঢঙে হুকুম ঝাড়লেন। বাক্যি শেষ হতেই যা দেরি, পড়ি কি মরি ব্যস্ততায় ডোনাল্ড আর রোজার হাওয়ার বেগে জোর কদমে এসে হাজির হল। এই রে মার্টিনির জারটা আবার গেল কোথায়, ঘরের খাঁচায় ডোনাল্ডের নজর এদিক-সেদিক দৌড়ে বেড়ালো দ্রুত শশকের গতিতে, চোখের পলকে সেটাকে খুঁজে নিয়ে হাতে তুলে নিল, ঝপাৎ করে জিন ঢালল, আর তার সঙ্গে কিঞ্চিৎ মিশিয়ে দিল ভারমাউথ। তারপর সে দুজনের সামনে দাঁড়াল এবং চুপচাপ তাদের গ্লাসগুলো ভরে দিল। লি টাটকা মারটিনির হাফটা একদমকে সাফ করে দিয়ে গ্লাসটা কফির টেবিলের ওপর রাখলেন, ঢিমে তালে উঠে দাঁড়ালেন তাড়াহুড়োহীন ভঙ্গিতে। তাঁর সেই ভঙ্গিমায় অচিন এমন একটা কিছু ছিল, মুখের চরাচরে হাল্কা হুমকিমাখানো হাওয়া, যার কারণে ডোনাল্ড আর রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইট দুজনেই গাঢ় দৃষ্টিতে ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন। এবং শেষমেষ যখন দাঁড়ালেন, তখন লি অন্য মানুষ। মুখ থেকে হাসি উবে গেছে, প্রচণ্ড চাপে তাঁর শরীর যেন কুঁকড়ে গেছে। যদিও তিনি ডোনাল্ডের থেকে ছয় ইঞ্চি বেঁটে, তবুও ডোনাল্ড এমনভাবে তড়িঘড়ি কুঁচকে গেল, যেন তাকে ভয় দেখানো হয়েছে। সারখানীয় ভাষায় লি রোজারকে ঘর ছেড়ে চলে যেতে বললেন। তারপর, কেউটে কালো কঠিন হিম শীতল ইস্পাতের মতো চোখে লি ডোনাল্ডের দিকে ঘুরলেন। তিনি চীনা ভাষায় বলতে থাকলেন, আস্তে আস্তে থেমে থেমে, এবং ম্যাকহোয়াইটও সহজেই তাদের কথোপকথন বুঝতে পারছিলেন।

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্ব (১১) পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন

https://www.teerandaz.com/%e0%a6%89%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%ae-%e0%a6%9c%e0%a7%87-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%93-%e0%a6%89%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%ac-11/

পরবর্তী পর্ব (১৩) আসছে

Share Now শেয়ার করুন