উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১৩]

0
352

কদর্য মার্কিন >> [পর্ব ১৩]

আগে পড়া না থাকলে নিচের লিংক থেকে পূর্ববর্তী পর্বটা (পর্ব ১২) পড়ে নিন

https://www.teerandaz.com/%e0%a6%89%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%ae-%e0%a6%9c%e0%a7%87-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%93-%e0%a6%89%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%ac-12/

পর্ব ১৩

“আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে আকছার শুনতে পাই যে এই দূতাবাস থেকে এটাওটা মালপত্তর সব ফুসমন্তর হয়ে যাচ্ছে।” লি নীচু কঠিন স্বরে বললেন। “কথা নেই বার্তা নেই একটা দামি ঘড়ি বেমালুম উধাও। চার বোতল স্কচ হুইস্কির কোনও পাত্তা নেই। যে লোকটা এ ধরণের এলোপাথাড়ি  চুরিচামারির কারবার অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে তাকে ধরতে রাষ্ট্রদূত একেবারে উঠে পড়ে লেগেছেন,  আর তোমরা  যে মহাধড়িবাজ  তা জানতে আমাদের আর বাকি নেই,  হ্যাঁ ঠিকই বলছি সেয়ানা মাতাল, তুমিই  ব্যাটা চোর।”
ডোনাল্ড তীব্র প্রতিবাদ জানালো। সে কোনও দিন কিছু চুরি করে নি,  ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে, মিনতি  মাখা চোখে ম্যাকহোয়াইটের দিকে তাকালো। লি সামনে এগিয়ে এল আর  ডোনাল্ডের গালে সজোরে আছড়ে পড়লো বিরাশি সিক্কার এক ঝোড়ো থাপ্পড়।
ম্যাকহোয়াইট স্তম্ভিত। লি-র চার আঙুলের  ছাপ্পা ডোনাল্ডের গালে  দাগড়া কেটে বসে গেল।  ডোনাল্ডের বুড়োটে  করুণ মুখ বিস্ময়ে হতভম্ব। তার চোয়াল ঝুলে হাঁ হয়ে গেছে।
যেন কিছুই হয় নি এমন ভাবে লি ম্যাকহোয়াইটের দিকে ফিরলেন। একেবারে অপরিচিত  আগন্তুক  গলায় ম্যাকহোয়াইটকে ইংরেজিতে বলে চললেন।
“ও মশাই এ যে দেখছি ঘড়ি আর হুইস্কি হাফিসের ব্যাপারটাকে মানতেই চাইছে না”, লি বললেন “কিন্তু সাফ মিথ্যে কথা আউরে যাচ্ছে। একবার যদি আমরা প্রমাণ করতে পারি এই হাতসাফাইয়ের কম্মোটি ওরই কীর্তি তাহলে ওকে টাইপরাইটার আর ব্রিফকেস নিয়ে জেরা করতে আর বাধা কোথায়, ওগুলো খুঁজে বের করা ভীষণ  জরুরি।“
ম্যাকহোয়াইট মাথা নেড়ে লি’র চালাকিটা মেনে নিলেন, কিন্তু মনের ভেতরে একটা চাপা রাগ যে গোঙাচ্ছিল না তা নয়। এছাড়াও লি’র এই পরিবর্তনটা দেখে তিনি চমকে গেছিলেন। লি’র ইংরেজদের মতো, খোলামেলা, অকপট ব্যক্তিত্বটি তাঁকে  আকর্ষণ করতো। লি’র আমেরিকান রসিকতা, ইংরেজি গাথা কবিতা, আইরিশ উপভাষাগুলোর ওপর দখল ছিল, তা-ও জানতেন। আগে তাঁকে দেখে মনে হতো যেন ট্রাক্টর কেনাবেচার সাধারণ কারবারি। কিন্তু এখন তাকে ভীতিপ্রদর্শনকারী  কোনও ফলওয়ালা কিংবা নিষ্ঠুরতায় ঠাসা একজন মানুষের মতো দেখতে লাগছে। প্রত্যেকটা শব্দ যেন চাবুকের সপাং আওয়াজে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
ম্যাকহোয়াইটের ঝোলায় তদন্তপ্রক্রিয়ার ঢের অভিজ্ঞতা ছিল। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে তদন্তকারী হিসেবে সুখ্যাতিও পেয়েছেন। কিন্তু পেটের কথা মুখে আনার অ্যায়সা মারাত্মক তরিকা  কস্মিনকালেও তিনি দেখেন নি। এটা যতটা না তদন্তক্রিয়া তার থেকে অনেক বেশি এক সূক্ষ্ম নিপুণ  ধ্বংসপ্রণালী যেখানে একটা গোটা মানুষকে স্থির মস্তিকে সুচিন্তিত উপায়ে ভেঙেচুরে গুঁড়োগুঁড়ো করে দেওয়া যায়। লি যা করছিল তাতে ডোনাল্ডকে শারীরিক নিগ্রহে যেন নিংড়ে শেষ করে ফেলাই তার লক্ষ্য ছিল। আস্ত এই মারণ ক্রিয়া চালানোটা  ম্যাকহোয়াইটের কাছে খুব একটা কঠিন ছিল কি, মনে হয় না তাঁর।
এই মিথ্যে বলার জন্য নিয়ম বিধির বাইরেও ডোনাল্ডকে  কী কী শাস্তি পেতে হবে সে সব নিয়েই লি আগাপাসতলা একটা ফিরিস্তি দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি এক সারখানিজ পুলিশ সার্জেন্টের কথা বললেন যার মুন্সিয়ানাই আলাদা, মারের চোটে বিচি চটকে দিতে তার জুড়ি মেলা ভার, এক পুলিশ কর্পোরালের খবর দিলেন সে মক্কেল তো একটা ছিঁচকে চোরকে সারাজীবনের জন্য অথর্ব করে দিয়েছে। তিনি কাহানিগুলো এমন ভাবে বলে চললেন যেন কোনও  ছেঁদো পাতি ব্যাপারে কথা বলছেন; আর এটাই তাদের ভেতরে  জলজ্যান্ত আতঙ্ক চারিয়ে দিচ্ছিল।
“তাহলে ডোনাল্ড, গাঁজাখুরি বকার জন্য কী খেসারত দিতে হতে পারে আশা করি তুমি বুঝতে পারছো”, লি শান্তস্বরে বললেন। “আমি তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি। নাও এবার সত্যি কথাটা চটপট বলে ফেলো তো চাঁদু। না আর কোনও ন্যাকামি  নয়… স্রেফ সত্যি কথা। বললেই ছেড়ে দেবো।“  তাঁর কথাগুলো মসৃণভাবে শেষ হল, কিন্তু তারপর আচমকা  ডিগবাজি খেল  এক কর্কশ আদেশের সুরে।
“তুমি বলো যে তুমি মৌকুং থেকে এসেছো “, লি কথা চালিয়ে গেলেন।
“যদ্দুর জানি এটা তো পশ্চিমে জিবওয়ান এলাকার মধ্যে পড়ে। তা তুমি পেঙ তে-হুয়াই সম্পর্কে কখনও কোনও  কিছু শোনোটোনো নি নাকি? বোবা মেরে থেকো না, জবাব দাও জলদি।“
ডোনাল্ড ইতস্তত করলো এবং মুখ খুললো।
“হ্যাঁ, আমি তার কথাশুনেছি”, ডোনাল্ড বললো।
“১৯৩৪-এ শেন সি অব্দি পেঙ আর তার কমিউনিস্টরা যে পদযাত্রা করেছিল তুমি কী তাদের সঙ্গে ছিলে?”  লি জিজ্ঞাসা করলো।
“না, কই না তো।”
“১৯৩৪-এ কোতায় ছিলে বাপ? ইস্কুলে ছিলে। তোমার উচ্চারণে শিক্ষাদীক্ষার ছাপ স্পষ্ট কিন্তু খটকাটার কাঁটাটা এইখানে যে তুমি হলে এক শুয়োর চাষার ব্যাটা আর একটা শুয়োর চাষার চেও এলাকায় গরীবের হদ্দ আর হয় না। তা  স্কুলে যাবার টাকাটা জোগাড় করলে কোথ্থেকে বুড়ো খোকা?”  লি বললো,   কণ্ঠে তাঁর  ঘৃ্ণার গরল।
রাগে ডোনাল্ডের গা রি রি করে উঠলো।
“এমনকী একজন শুয়োর পালকের সন্তানও স্কুলে যেতে পারে…“ ডোনাল্ড শুরু করলো কিন্তু লি হঠাৎ এক হ্যাঁচকায় তার কথার সুতো ছিঁড়ে দিল।
“ হ্যাঁ, যদি সে স্কুলে যাবার টাকাটা কমিউনিস্টদের কাছ  থেকে পায়, কী বলো?”
“আমি তা বলি নি, আমি বলতে চাইছিলাম…”
“চোখে ধুলো দিতে চেষ্টা করছিলে। তুমি রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইটকে বলেছো যে তুমি লিখতে পারো না, কিন্তু ইতিমধ্যেই স্বীকার করেছো তুমি মৌকুংয়ে স্কুলে যেতে।”
বিস্মিত মাংসপেশির অনৈচ্ছিক দ্রুত  প্রতিক্রিয়ায়, ডোনাল্ডের চোখ পিটপিট করে উঠল।
লি হঠাৎই প্রসঙ্গ পালটে ডোনাল্ডের পরিবার সম্পর্কে প্রশ্নের গর্ত খুঁড়তে শুরু করলেন। তিনি কখনও ডোনাল্ডের কথা শেষ করার মওকাটাই দিচ্ছিলেন না। যখনই ডোনাল্ড আমতা আমতা করছিল, লি নিজেই উত্তর দিয়ে ভরাট করে দিচ্ছিলেন; আর লি’র প্রতিটি উত্তর ডোনাল্ডকে নিছক ফালতু প্রতিপন্ন করছিল। লি ডোনাল্ডকে পদে পদে অপমান করছিলেন এবং ক্রমাগত  তাকে কমিউনিস্ট বলে খুঁচিয়ে যাচ্ছিলেন; তারপর তিনি মতামত জানালেন যে প্রত্যেক সৎ চীনা ব্যক্তির একজন উপযুক্ত কমিউনিস্ট হওয়া উচিৎ। নির্বাক ডোনাল্ডের নীরবতাকে সম্মতি ধরে নিয়েই ডোনাল্ডকে ফের আক্রমণ করলেন। ডোনাল্ডের পরিবারের পূর্বপুরুষদের নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করতে লাগলেন, আর  চিয়াং-এর দালালেরা যে তার বাচ্চাদের যমের দক্ষিণ দুয়ারেও পাঠিয়ে দিতে পারে এসব নিয়েও ভয় দেখাতে ছাড়লেন না।  ডোনাল্ডের উত্তরগুলো উদ্বিগ্নতার ভাপে তালেগোলে খেই হারিয়ে ফেললো, প্রতিরোধের মরিয়া চেষ্টাতে হাঁসফাঁস করতে থাকলো। ম্যাকহোয়াইটের মনে প্রথম প্রথম একটা  ধন্দ্ব কাজ করছিল লি  যেভাবে ব্যাপারটার ইতি টানছেন সেটা ঠিক হলেও হতে পারে ।
এরপর লিকে আকস্মিক ভীষণ ক্লান্ত লাগল। তাঁর শরীরটা বেশ কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে গেল বলে মনে হল, নিতান্ত গোবেচারা যেন। তাঁর গলা অনুনয়ে ভেজা। জিজ্ঞাসাবাদ পর্বের ব্যাপারটা যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি মিটিয়ে ফেলার এক ব্যতিব্যস্ত ভাব তাঁর মধ্যে ফুটে উঠতে দেখা গেল যেন।
“যা কিছু জানো সব চটপট বলে ফেলে সাহায্য করো আমাদের, ডোনাল্ড”, লি মাখন মাখানো  স্বরে বললেন।
“হুইস্কি আর হাতঘড়িটা কোথায় আছে বলে দাও। ব্যাস ওটুকুই তো আমরা  জানতে চাই। তারপর তুমি যেতে পারো।”
ডোনাল্ড টানটান হয়ে  দাঁড়ালো। দেখে মনে হল লি’র দুর্বলতা যেন তার ভেতরে একটা শক্তি এনে দিয়েছে। ডোনাল্ডের পরিবর্তনে ম্যাকহোয়াইট বুঝল ডোনাল্ডের ভেতর  নেতিয়ে পরা সাহস গা-ঝারা দিয়ে উঠেছে। বুড়ো মানুষটার হিম্মত আছে বটে, মনে মনে তারিফ ঝলসে উঠল – কেয়া বাত। এমনকী ডোনাল্ডকে মৃদু হাসতেও দেখা গেল।
“দেখুন আমি হুইস্কি বা হাতঘড়ি সম্পর্কে কিছুই জানি না”, সহজ ভাবে সে বললো। “কিন্তু আমি জানি টাইপ রাইটার অথবা ব্রিফকেস কোনওটাই চুরি হয় নি। ও দুটো  ম্যাকহোয়াইট স্যারের  পড়ার ঘরেই  আছে। আমি তো ওখানেই দেখেছিলাম।”
লি একঝটকায় বোঁ করে ঘুরলেন, ঠিক বুনো বেজির মতো ক্ষিপ্র আর তীব্র গতিতে, শিকার ধরার আগে মানুষখেকো  বাঘ যেমন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে ঠিক তেমন।
“টাইপ রাইটার বা ব্রিফকেস নিয়ে তোমাকে কে কখন কী বলেছে ডোনাল্ড?”  চিৎকার করে বললেন তিনি । “কে? কোথায় শুনেছো তুমি এটা ?”
ডোনাল্ডের মুখ যেন এক ধাক্কায় নিথর ভোঁতা পাথর হয়ে গেল।
“কথাটা তুমি আঁচ করতে পেরেছো কারণ আমি রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইটকে বলেছিলাম, তবে ইংরাজিতে,” লি বললেন, এবং এখন তিনি ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করলেন। “ইংরেজিতে তুমি খুব একটা কাঁচা নও, রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইট কী বলেন না বলেন সেসবই গত কয়েকমাস ধরে চুপিসাড়ে আড়ি পেতে শুনেছো কেননা মার্টিনি পরিবেশন করা থেকে শুরু করে, ট্রে-ফে তুলে নিয়ে যাওয়া, পোড়া সিগারেটের ফিল্টার সাফ করা, এসব তো তুমিই করে থাকো।“ তিনি ডোনাল্ডের কাছাকাছি মুখটা নামিয়ে আনলেন, তাঁর সেই প্রখর হিসহিসে শ্বাপদ উপস্থিতি এতটাই ভীতিজনক ছিল, যে ডোনাল্ড সেই  ত্রাসের হিমে জমে অসাড় হয়ে গেল।
“হ্যাঁ, স্বীকার করছি আমি মিথ্যে বলেছি”, ডোনাল্ড ইংরেজিতে বলে উঠল। ইংরেজিটা নড়বড়ে হলেও,   ইংরেজিই ছিল। তার স্বরধ্বনিতে ভয় আর অপমান যেন  জট পাকিয়ে গেছে। “কী করবো আমি, আমার বাচ্চারা মৌকুংয়ে কমিউনিস্টদের কব্জায়, কাজটা করা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় ছিল না। আমি যদি তাদের তথ্য পাচার না করি তাহলে বাচ্চাগুলোকে জানে খতম করে  ফেলবে ওরা ।”
“তার মানে সারখানে কমিউনিস্টদের নিকেশ করার জন্য রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইট যে পরিকল্পনা  করছেন, সেটা ইতিমধ্যেই তুমি উগরে দিয়েছো, কী বলো?“ লি বললেন, অবশ্য এটা আর কোনও প্রশ্ন হতে পারে না।
ডোনাল্ড নিঃশব্দে মাথা নাড়লো।
“বেশ, শোনো, তুমি এখন এই ঘর থেকে যেতে পারো কিন্তু বাড়ি ছেড়ে যাবার ধান্দা মাথাতেও না আসে যেন”, লি বললেন। “তোমার সঙ্গে পরে কথা হবে, দরকার আছে।“
ডোনাল্ড চলে গেল, ম্যাকহোয়াইটের দৃষ্টি তার চলে যাওয়াটা অনুসরণ করলো। ম্যাকহোয়াইট জানতেন তাঁর দিনের পর দিন তিল তিল করে গড়ে তোলা যাবতীয় কাজকম্ম, এর পেছনে লাখের পর লাখ ডলার খরচ করা, কলাকৌশলের আগাগোড়া সবটাই, বানচাল হয়ে গেছে।  তিনি জানতেন এই যে এই  স্বয়ং মাননীয় গিলবার্ট ম্যাকহোয়াইট, একটা বিচ্ছিরি ভুল করে ফেলেছেন। তাঁর প্রশিক্ষিত মগজে, তাঁর পোড়খাওয়া কঠিন অতীতে, মিশনারী গভীর অনুভূতিতে কীভাবে কোথায় একটা চোরা ফাঁক থেকে গেছে। তিনি যেন ভেতর থেকে একটা ঝাঁকুনি খেলেন। অপমানবোধকে  গিলে ফেলে  তিনি সবসময় সচেতনভাবে চরিত্রের খোসাটাকে ধুয়েমুছে সাফসুতরো করে রাখতেন এবং এটা তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল সামাজিক মানুষের তাগিদ থেকে নয়, কেবল গ্রহণযোগ্য মনের পূর্বশর্ত রূপে নয়, নিজের অপরিহার্য বাস্তবতা হিসেবেও – আর ওই অপমানবোধের নীচে থাকতো ইগোর এক কঠিন স্তর যা চূড়ান্ত পরিমাণ আত্মবিশ্বাস  এবং অসমর্থিত বিচারবোধকে অনুমোদন করতো। তিনি জানতেন না এ সমস্যা কোথায়  ঘাপটি মেরে বসেছিল বা কীভাবে পাওয়া গেল অথবা কীভাবেই বা এই জঞ্জাল  দূর করা যায়। কিন্তু তিনি জানলেন এটা ছিল আর লি তাকে সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ায় তিনি লিকে ঘৃণা করতে শুরু করলেন। তবে তিনি এতটাই কঠিন মনের ও বিশ্লেষক প্রকৃতির ছিলেন যে  চুপ করে থাকাটাও মুশকিল।
তিনি মাথা তুললেন ধীরে। লি জানলার সামনে দাঁড়িয়ে সারখানের গ্রামীণ সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন, সারখানের আকাশে বরফ-সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল। লি চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ম্যাকহোয়াইটের মুখোমুখি হলেন।
“মাফ করবেন, গিলবার্ট”, নরম গলায় বললেন । “একজন বয়স্ক মানুষের প্রতি নির্মম হওয়াটা নেহাত মুখের কথা নয়। যে-মানুষ  কাজেকম্মে করিতকর্মা এবং আপনার বেশ বাধ্য, তাকে সন্দেহ করাটাও রীতিমতো কঠিন কাজ। তবে হ্যাঁ, কাজটা খুব জরুরি ছিল। কিন্তু সমস্যা কোথায় জানেন, জরুরি বিষয়গুলো যে সবসময় পছন্দসই হবে এমনটা নয়। এটাও তেমনি  খুব, খুবই জঘন্য একটা ব্যাপার।“ এর কিছুক্ষণ পরে যতক্ষণ না মলি সাকস ফিফথ এভেন্যু থেকে কেনা হালকা নীল, ছিমছাম, দামী পোশাক পরে সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নীচে নেমে, বেশ ফূর্তির মেজাজে মার্টিনির জন্য হাঁকডাক শুরু করে দিলেন, সেই সময়টুকু তাঁরা সেখানেই দুজনে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে বাইরের নিসর্গ দৃশ্য দেখে যাচ্ছিলেন।
ম্যাকহোয়াইট অনেকদিন আগেই একটু একটু করে টের পাচ্ছিলেন পালটা অভিযোগ করাটা  একধরনের ভেতো বিলাসিতা বৈ আর কিছু নয়, আর এমন অহেতুক আমোদ পাবার জন্য তিনি কোনদিনই চেষ্টা করেন নি। তিনি জানতেন যে তিনি একটা ভুল করেছেন, জানতেন বিচার আর তথ্য দুয়েরই ক্ষেত্রে একটা ভুল ছিল। দুদিন টানা নিজের অফিসে চুপচাপ বসে থাকলেন, মগজ খোঁড়াখুঁড়ি করে ভাবতে লাগলেন তাঁর ভ্রান্তিটা  ঠিক কোনখানে, তার সমস্যার চরিত্রটা ঠিক কেমন ধরনের, এবং আস্তে আস্তে তাঁর সামনে বিকল্প  রাস্তাটা খুলে যেতে থাকল।
দিব্যি বুঝতে পারলেন এশীয় মানসচরিত এবং সেখানকার রাজনীতির ঘোঁতঘাত জানতে এখনও ঢের বাকি আছে তাঁর। গোটা ব্যাপারটা জুড়ে কাজ করছিল একটা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা চাপ, একটা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির মতো কোনও কিছু, তিনি তাঁর গোটা  জীবনে কখনও এ সবের সম্মুখীন হন নি। এশীয় রাজনীতি পুরো পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি। তিনি এও বুঝলেন যে অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকেও অনেককিছু শেখার আছে।
দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যায় ম্যাকহোয়াইট রাষ্ট্রদপ্তরে একটা তার পাঠালেন।
অভ্যন্তরীণ কমিউনিস্টকেন্দ্রিক সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা গেছে কিনা, সে বিষয়ে প্রাথমিকভাবে জানতে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামে যাবার অনুমতির জন্য অনুরোধ
এশীয় সমস্যার বিস্তৃত জ্ঞানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট
একটা গুরুতর ভুল হয়ে গেছে এবং আশা করা যায় আর হবে না
আমার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব নির্বাহের জন্য জর্জ সুইফট সম্পূর্ণ উপযুক্ত মানুষ
সারখান ফরেন অফিসে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং এই যাত্রায় তাদের সমর্থন আছে।
বারো ঘণ্টা পর এই যাত্রায়  রাষ্ট্রদপ্তরের সবুজ সংকেত পাওয়া গেল।
ফিলিপাইনে ম্যাকহোয়াইটের সঙ্গে প্রথম যার সাক্ষাৎ হলো তিনি হলেন র‍্যামন ম্যাগসাইসাই। ফিলিপাইনসের কমিউনিস্ট অধিকৃত হাকসের বিরুদ্ধে ম্যাগসাইসাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি জোট সরকার গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যা খুব দক্ষতার সঙ্গে বিশাল দ্বীপপুঞ্জকে শাসন করতে পেরেছিল।
ম্যাগসাইসাই এবং ম্যাকহোয়াইট দীর্ঘক্ষণ ধরে আন্তরিকভাবে কথাবার্তা বললেন, এবং কথোপকথনের ওপরে ম্যাকহোয়াইটের নোটই হয়ে দাঁড়ালো রাষ্ট্রদপ্তরকে পাঠানো রিপোর্টের দীর্ঘ (এবং বেশ অবহেলিত) সারাংশ বিশেষ। কিন্তু ম্যাগসাইসাই একটি বিষয় বলেছিলেন যা ম্যাকহোয়াইট লেখেন নি ঠিকই,  তবে ভোলেন নি কোনও দিন।
“সোজাসাপ্টা ভাবে বললে, দেখুন রাষ্ট্রদূত মশাই, এই খাড়া বড়ি থোড় সাদামাটা আমেরিকানরা তাদের স্বাভাবিক অবস্থায়, এই শব্দাংশটিকে মার্জনা করে দিলে, তারাই একটা দেশের পক্ষে সবচেয়ে ভালো রাষ্ট্রদূত”, ম্যাগসাইসাই বললেন। “তারা সন্দেহজনক নয়, তাদের দক্ষতাগুলো নিজেদের মধ্যে বিনিময়ের ইচ্ছেও আছে ষোলোআনা, তারা উদারও বটে। কিন্তু যখন তারা বাইরে যায়, তখন অধিকাংশ আমেরিকানদের মাথায় কী যে ভীমরতি চাপে, কে জানে। এদের অনেকেই বাকি আর পাঁচটা গড়পড়তা মানসিকতার থেকে বাইরে… এরা বলতে পারেন দ্বিতীয় সারির। অনেকেই আবার,  নিজেদের বিবেককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, মনে করে যে তারাও নির্দ্বিধায় চোখ ধাঁধানো মিলিটারি মার্কেট, বড়সড় গাড়ি, ককটেল পার্টি – এই সব নিয়েই  মৌজমস্তিতে তুড়ি  মেরে জীবনটাকে কাটিয়ে দেবে। কিন্তু স্যার, যদি আপনি  প্রভাবিত হয় নি এমন একজন  আমেরিকানকেও  খুঁজে পান, ভাববেন একটা রত্ন পেয়েছেন। যদি এমন কাউকে আপনি হাতের নাগালে পেয়ে যান কখনো, সঞ্চয় করে রাখবেন তাকে – এই ককটেল বৃত্তের বাইরে রাখবেন, ব্যুরোক্রাটদের থেকে দূরে, এবং তাকে নিজের মতো করে কাজ করতে দেবেন। “
“আপনার চেনাজানা এমন কোনও বান্দা আছে নাকি?“ ম্যাকহোয়াইট বাঁকা সুরে বললেন। ”তাহলে জনাকয়েক আমার কাজে লাগতো।“
“হুঁ, আছে বৈকি। ম্যাগসাইসাই বললেন। “র‍্যাগটাইম কিড (পদযাত্রার সংগীত) – কর্নেল হিলানডেল। তিনি যা খুশি করতে পারেন। তার অভিধানে  অসম্ভব বলে কিছু নেই, কিন্তু আশা করছি আপনি এখান থেকে তাকে চুরি করবেন না।”
ম্যাকহোয়াইট নামটা টুকে  নিলেন।
“আমার জায়গায় আপনি থাকলে কী করতেন শুনি?” ম্যাকহোয়াইট জিজ্ঞাসা করলেন। “পরের মুখে ঝাল না খেয়ে, আমি সোজা ভিয়েতনামে গিয়ে দিয়েনবিয়েন ফু’কে নিয়ে যে ধুন্ধুমার লড়াইটা চলছে সেটা নিজের চোখে একবার দেখে আসতাম।“ দ্বিধাহীনভাবে বললেন ম্যাগসাইসাই। “আমি জানি আপনি একজন কূটনীতিবিদ এবং যুদ্ধটুদ্ধ হয়তো আপনার বিষয় নয়; কিন্তু আপনি খুব শীঘ্রই আবিস্কার করবেন যে রাষ্ট্রনায়কত্ব, কূটনীতি, অর্থনীতি এবং যুদ্ধবিগ্রহ – এসবের কোনোটিকেই একটা আরেকটা থেকে আলাদা করা যায় না। এবং যদি আপনি আপনার চোখকান খোলা রাখেন, তাহলে এগুলোর মধ্যে কোনও না কোনও যোগসূত্র খুঁজে পেয়ে যাবেন। কোনও পাঠ্যপুস্তকে এর হদিস পাবেন না।  এটা ভেতর থেকে বুঝতে হবে।

(চলবে)

পরবর্তী পর্ব আসছে

Share Now শেয়ার করুন