উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১৫]

0
320

“শেষ রাতে”, মনেট স্পষ্ট স্বরে বললেন, “দিয়েন বিয়েন ফু-র পতন হয়েছে। উদ্ধারের চেষ্টা বৃথা, সমস্ত বেতার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এটা হাই কম্যাণ্ডের সিদ্ধান্ত, আমারও একই মত, আমরা সত্যিই যুদ্ধটায় পুরোপুরি হেরে গেছি।”

কারো পড়া না থাকলে এই বাক্যটিতে ক্লিক করে পূর্ববর্তী পর্বটি (১৪) পড়ে নিয়ে বর্তমান পর্বটি পড়ুন

পর্ব ১৫

অধ্যায় ১১

যুদ্ধের ইস্পাত

মেজর জেমস (টেক্স) উলচেক, জন্ম মার্চ ১২, ১৯২৪, ফোর্টওয়ার্থ, টেক্সাস। মি. ও মিসেস সলোমন উলচেকের পুত্র।
স্যাম হিউসটন হাইস্কুল থেকে স্নাতক, ১৯৪১। মার্কিন সেনাবাহিনির সঙ্গে যুক্ত, ১৯৪২। প্যারাট্রুপারদের দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট পিএফসি, প্রথম শ্রেণি। ফোর্ট বেনিংয়ে পঁয়ত্রিশবার অনুশীলন ঝাঁপ।
দু’বার বাঁ দিকের গোড়ালি ভেঙেছে। নরম্যাণ্ডির যুদ্ধের সময়ে আর দক্ষিণ ফ্রান্স আক্রমণকালে তিন বার ঝাঁপ দিয়েছেন। অর্জন করেছেন সিলভার স্টার আর একগুচ্ছ পার্পল হার্ট সম্মান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেনাবাহিনিতে নিয়মিত হয়েছেন। কম্যাণ্ড এবং জেনেরাল স্টাফ কলেজে নিয়োগ, ১৯৪৭-৫০। ১৯৫০-এর নভেম্বরে কোরিয়ায় যাবার নির্দেশ। পল্টন, সেনাদলের অধিনায়ক, সেনাবাহিনির কার্যনির্বাহী অধিকর্তা। অর্জিত সম্মাননা : পার্পল হার্ট; ব্রোঞ্জ মেডেল।
স্থায়ী ঠিকানা : ১১৮৯৭ সাউথ লেন, ফোর্টওয়ার্থ, টেক্সাস।
“মেজর জেমস উলচেক, ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি, বিশেষ সেনাবাহিনি নিয়ে অ্যাম্ফিবির অবজার্ভার হিসেবে ডিউটির জন্য রিপোর্ট করছি, Le`gion Etrenge`re”। মেজর উলচেক চটপট বলে উঠলেন।
ডেস্কের পিছনে বসে থাকা ফরাসি অফিসারদের সামনে তিনি ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট করলেন। মেজর মনেট আকারে নিতান্তই একজন ছোটখাট মানুষ, চোখে মুখে লেগে থাকা ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তিনি ডেক্স থেকে মুখ তুলে তাকিয়ে, উলচেককে ভালো করে মেপে নিলেন। তারপর একগাল হাসলেন।
“মেজর, আপনাকে টেক্সানরা ‘চামড়ার চাবুক’ বলে ডাকে শুনেছি, এখন দেখছি তারা খুব যে একটা ভুল করে তেমন নয়। আশা করি, কথাটা অপমান হিসেবে গায়ে মাখবেন না। আর মাখবেনই বা কেন, খারাপ বলতে তো কিছু নেই এর মধ্যে।” মেজর মনেট চমৎকার ইংরেজিতে বললেন।
মেজর উলচেক হাসলেন। “ধন্যবাদ, স্যার। হতেও তো পারে আমি টেক্সাস থেকেই আসছি।”
“হ্যাঁ, সে আর বলতে, আর এটাও জানি, আপনার ডাকনাম টেক্স,” মনেট বললেন।
মাথা নাড়েন উলচেক। কয়েক সেকেণ্ডের জন্য এ-ওর দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেললেন। আর তারপরই উলচেকের অর্ডারগুলো যে তাঁর কাছেই আছে, এ কথা বলতে বলতে মনেটের একটা হাত ড্রয়ারের ভেতরে ঢুকে গেল।
টেক্স অপেক্ষা করার গোটা সময়টা জুড়ে খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকেন। মনেটের অফিসটা হানয়য়ের বাইরে, টেক্স দেখতে পাচ্ছিলেন লম্বা সারি সারি ট্রাক; জিপ আর আধখানা রাস্তাটা গড়িয়ে গেছে নীচু জমিটার দিকে, ডেল্টার জন্য যুদ্ধটা ওখানেই হয়েছিল। নেটিভ ভিয়েতনামিদের লাইনগুলোও নজরে আসে। তারা শহরে পালাচ্ছিল।
মনেটের বলা ‘চামড়ার চাবুক’ কথাটা ভাবামাত্রই তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল। নিজের সম্পর্কে ওই শব্দবন্ধ তিনি যে আগে শোনেননি তা নয়, তবে হ্যাঁ ফরাসিদের মুখে এই প্রথম। ক্রমশ, তাঁর ভাবনা গড়াতে থাকে, তিনি দেখতে যেন অনেকটা টেক্সাসের কাল্পনিক মূর্তির মতোই – এর মধ্যে কোথাও একটা আয়রনি আছে। টেক্সের জন্মের বছর দুয়েক আগে লিথুয়ানিয়া থেকে তাঁর বাবা মা ফোর্টওয়ার্থে চলে এসেছিলেন; তাঁদের গড়ন বেঁটে, কালো, শরীরটা দুবলা পাতলা।
সবসময় তাঁদের চোখে ভাসতো আমেরিকান সীমান্তের স্বপ্ন; টেক্সাসে তাঁরা সেই আমেরিকান যাদুটা খুঁজে পেয়েছিলেন। রোদ্দুর, খাবার কিংবা আবহাওয়ার ভেতরে কিছু একটা ছিল নিশ্চয়ই, যার জন্য তাঁদের বাচ্চারা গায়ে-গতরে বেশ লম্বা চওড়া হয়ে উঠছিল। শুধু তাই নয়, টেক্সানদের চোখে একজন টেক্সান যেমন দেখতে হওয়া উচিত, তারই মডেল হয়ে উঠেছিল উলচেকের ছয় ছেলেমেয়ে। বাবা উলচেক সঞ্চয়ের সমস্তটাই লাগিয়ে দিয়েছিলেন ফোর্টওয়ার্থের রিয়েল এস্টেটে, কপাল খুলে গিয়েছিল তাঁর। সুঁই সুতোর সেই সাবেকি কাজকম্ম ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাছাড়া তাঁর বড়ছেলে যে একজন মস্ত অফিসার, একজন সাহসী যোদ্ধা, এ নিয়ে কোনও রাখঢাক না রেখে রীতিমতো বুক ফুলিয়ে বলে বেড়াতেন তিনি। পরিবারের প্রতি তাঁর ভালবাসা আর সমর্থন করার প্রবণতাটা টেক্সকে অনেক অসহ্যকর পরিস্থিতিতেও ঠেকা দিয়ে আগলে রেখেছে, বাঁচিয়ে দিয়েছে।
দুটো যুদ্ধের লোহার টুকরো টেক্সের শরীরে বিঁধেছিল।
প্রথম আঘাতটা পান নরম্যাণ্ডিতে থাকাকালীন। ডি-ডের সেই মারাত্মক দিনে অন্ধকার কাটতে না কাটতেই, যেসব প্যারাট্রুপারকে নরম্যাণ্ডির বীচের পেছন দিকটাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, তিনি তাদেরই একজন। একটা জার্মান ফ্লেয়ার ঠিক তার প্যারাশুটারের ওপর ফেটে পড়ে, নামবার সময় সাতটা মেশিন গানের ধাতব টুকরো একের পর এক তার পাগুলোকে ঝাঁঝরা করে দেয়। মাটিতে আছড়ে পড়েন তিনি, রক্তে ভেসে যাচ্ছিল বুট জোড়া। হেঁটে যাবার মতো কোনও ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল না আর। কিন্তু তিনি বুকে হাঁটতে পারতেন; পরের পাঁচঘন্টায় শুধু বুকে ভর দিয়ে তিন মাইল পথ পার হয়েছিলেন।
ওই দিনই, জার্মানদের এক ছন্নছাড়া পল্টন এলোমেলোভাবে, একটা ছোট রাস্তা ধরে ফিরছিল, এক গাছের গায়ে এমনি এমনি ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো এক আমেরিকানের কাছে এগিয়ে এল। ওই আমেরিকানই টেক্স। মুখে আত্মবিশ্বাসী চাউনি, আর দু হাতে বন্দুক। পল্টনটির সঙ্গে একটা কথাও খরচা করেননি তিনি – কেবল ইশারায় তাদের বন্দুকগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাত ওপরে করতে বলেছিলেন। জার্মান অফিসারটি পালাবার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু তিন পা এগোনোর আগেই টেক্স তাঁকে গুলি করেন। আধ ঘণ্টা পরে জার্মান পল্টনটি বুঝতে পারল – যে আমেরিকানটি এতক্ষণ তাদের বন্দি করল সে আসলে তার ক্ষত বিক্ষত পা দুটোকে একটুও নাড়াতে পারছে না, কোনও উপায় না পেয়ে তাই ঠায় গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বুঝতে বুঝতে তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। ডাক্তারেরা পরে তাঁর পা থেকে ছটা ধাতুপিণ্ড বের করে, তবে সাত নম্বরটার আশা ত্যাগ করতে হয়েছিল, ওটা হাড়ের একেবারে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। এই সাহসী কর্মকাণ্ডের জন্য টেক্স সিলভার স্টার সম্মানে ভূষিত হন।
দ্বিতীয় বার তিনি আহত হয়েছিলেন কোরিয়ার পর্কচপ পাহাড়ে। যখন তিনি আমেরিকান এবং চীনা সীমানার মধ্যবর্তী উঁচু সরু পাঁচিলের গা ঘেঁষা আবছায়া কুয়াশাচ্ছন্ন জমিটাতে বেশ জোশের সঙ্গে খোস মেজাজে পাহারা দিচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়। কোনও কিছু ঠাহর করা তখন প্রায় অসম্ভব, কিন্তু যুদ্ধের একটা অস্পষ্ট শব্দ তাঁর কানে এসে পৌঁছেছিল। একশ গজ দূর থেকেই বুঝে ফেলেছিলেন চীনারা একটা সাংঘাতিক আক্রমণ করে বসেছে। জানতেন, প্রতিরোধী দূর্গ যতই পাহাড় চূড়োর মতো হোক, এত লোকের সামনে এক ফুঁয়ে গুঁড়িয়ে যাবে। তাই চৌকি সমেত সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং আক্রমণে তছনছ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। টেক্স টাটকা সবুজ ক্ষেতে ঘাস নিড়ানি যন্ত্রের মতো চীনাদের ভেতর তাঁর টহল গাড়িটাকে চালিয়ে দিলেন। পৌঁছে গেলেন চীনা সীমান্তের বিভাগীয় কেন্দ্রস্থলের বাঙ্কারে, প্রচণ্ড গ্রেনেড আক্রমণের মধ্য দিয়ে সব কিছু কব্জা করে নিলেন। একজন জেনারেল ও দুজন কর্নেল সমেত; বাঙ্কারের সবকটা লোককেই মেরে ফেলেছিলেন; আরো ১২০ জন চীনাকেও খতম করে দিয়েছিলেন। সমস্যা হল নিড়ানি যন্ত্র কখনও পিছন দিকে ছুটতে পারে না, টেক্সও পাহারা দেওয়া গাড়ি সমেত পিছন দিকে ফিরে আসতে পারেন নি। চীনদের আক্রমণ তিনি ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর কী হল, টেক্স সমেত টহল বাহিনির সব্বাই হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন।
টেক্সের পিঠে দু’ ডজনের মতো গ্রেনেডের তীক্ষ্ণ স্টিলের সুঁচ বিঁধে গিয়েছিল। নিজেই মরফিন নেন তিনি। নরম গলায় চীনা অফিসারদের কাছে বারবার অনুমতি চাইতে থাকেন, তাঁদের নিজেদের কোনও লোক যেন স্প্লিন্টারগুলো বের করে দেয়। শেষপর্যন্ত সমাজে আর পাঁচ জন লোকের কাছে কসাই বলে কুখ্যাত এক আমেরিকান ভদ্রলোক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজটা সেরেছিলেন, তবে বলা বাহুল্য, খুব একটা আরামদায়কভাবে নয়। ফলে টেক্সের পিঠটা জটিল ক্ষতের বিচ্ছিরি দাগে ভরে গিয়েছিল। আনাড়ি সার্জনের হাতে পড়ে ইস্পাতের কিছু টুকরোও তাঁর চামড়ায় থেকে গিয়েছিল। তীব্র শীতের রাতে মনে হত যেন খচখচে বরফের মতো কোনও কিছু বিঁধছে। ওগুলোকে খুঁচিয়ে বের করে দিতে খুব ইচ্ছে করত টেক্সের।
টেক্স শেষমেষ কমিউনিস্ট চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে আমেরিকান সীমানায় পালিয়ে এসেছিলেন। তার সেনাদলের প্রধান হানয়য়ের বাইরে ফরাসি সেনাবাহিনির সঙ্গে একসাথে নজরদারির কাজে তাকে সুপারিশ করেছিলেন, কোরিয়ানদের লড়াইটা খণ্ডযুদ্ধের মতো তখন চলছিল, টেক্স চলে যান ভিয়েতনামে।
ফরাসি মেজর হেসে উঠলে উলচেক তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।
“টেক্স, একদম গোড়া থেকেই আপনার ডাকনাম ধরে ডাকছি, কিছু মনে করবেন না,” মনেট বললেন, “এমন চমৎকার ঘরোয়া পরিবেশে আমরা ডাকনাম ব্যবহার করতেই পারি। অবশ্য আপনার জন্য একটা খারাপ খবর আছে। আপনার অর্ডারগুলো আমার কোম্পানির সঙ্গে আপনাকে জুড়ে দিয়েছে, দিয়েন বিয়েন ফু-তে নামবার ডাক এসেছে আপনার, আমরাও যাব।”
“তাতে সমস্যাটা কোথায়?” টেক্স জিজ্ঞাসা করলেন।
“খবরের কাগজগুলো জানে না যে গতকাল দিয়েন বিয়েন ফু-কে পুরোপুরি ঘিরে ফেলা হয়েছিল। সমস্ত এলাকা জুড়ে মুক্তির কথা উঠছিল, কিন্তু এটা কী করে মানা যায়? অসম্ভব, তাই ও নিয়ে আর মাখা ঘামানো হয় নি। আমার সেনারা আকাশ পথে যাচ্ছে, ওরা পরশুই নামবে। যদি আমাদের হাই কম্যাণ্ডের ইচ্ছে হয় যে কোনও বিদেশি পর্যবেক্ষক আমাদের সেনাদলের সঙ্গে নামবে, তবুও আমার নিশ্চিত ধারণা দিয়েন বিয়েন ফু-র এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আপনি এখানেই থেকে যেতে চাইবেন, এখান থেকে নড়তে চাইবেন না।”
“মেজর”, টেক্স বললেন, “আপনি ঠিক কতবার লাফ দিয়েছেন বলুন তো?”
মনেট কাগজপত্তর নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, না তাকিয়েই উত্তর দিলেন, “তা ডজন দুয়েক হবে।”
“এর মধ্যে কতগুলো শত্রুপক্ষের গুলির আওতার ভেতরে ছিলেন?”
“একটাও না। তেমন সুযোগ কখনও হয় নি।”
“মেজর আমার লাফ দেওয়ার প্র্যাকটিসটা কিন্তু শ-এর সীমা ছাড়িয়ে গেছে, আর শত্রুর গুলির ভেতর দিয়ে তো পাঁচ পাঁচ বার”, টেক্স নরম স্বরে বললেন। “দেখুন, আপনার পাশে এরকম একটা অভিজ্ঞ লোকের দরকার হলেও হতে পারে।”
মনেট ডেক্স থেকে মুখ তুলে তাকালেন, তার চোখ চলে গেল টেক্সের বাঁ দিকের বুক পকেটের ওপরে। প্যারাশুটারের সম্মানসূচক পদকগুলো খুঁজতে লাগলেন, শার্টে কোনও মেডেলই ছিল না, মনেটের মুখের হাবেভাবে অপমানজনক চাউনিটা ফুটে উঠল, নিজের ডেক্সের দিকে দৃষ্টিটা নামিয়ে নিলেন।
“অত্যন্ত দুঃখিত”, মনেট বললেন, তার কণ্ঠস্বরে প্রায় লাগাম ছিল না বললেই চলে। “আপনি কবার লাফ দিয়েছেন কী দেননি সেসব জানার তো কোনও উপায় নেই। হ্যাঁ, যদি আমাদের সঙ্গে লাফ দেন খুশি হব; তবে যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের প্লেন আকাশে থাকবে, ততক্ষণ আপনার ঝাঁপ দেওয়ার ব্যাপারে কোনও নোটিফিকেশন হেড কোয়ার্টার্সে পাঠানো হবে না, ওটা এই অফিসেই থাকবে।”
টেক্স আর মনেট পরবর্তী দুটো দিন হানয়তে একসঙ্গে কাটালেন। প্রায় সব দিক থেকেই তাঁরা ছিলেন পরস্পরের বিপরীত; কিন্তু একটা জরুরি ব্যাপার দুজনের মধ্যেই ছিল – তারা পরস্পরকে সহসেনা ও যোদ্ধার মতো দেখতেন। মনেট এমন একটা পরিবার থেকে এসেছিলেন যেখানে সব সময় অন্তত একজন ছেলে পড়াশোনায় স্নাতক; শেষ তিন শতক ধরে এমন কোনও যুদ্ধ ফ্রান্স লড়েনি যেখানে একজ়ন মনেটও জেনারেল হিসেবে ছিল না। যুদ্ধের কলাকৌশল সম্বন্ধে মনেটের যথেষ্ট বাস্তব বুদ্ধি ছিল। তাঁরা দু’জন যেন হেনেসের বোতল খুঁজতে খুঁজতে বার থেকে বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যুদ্ধ-উপকরণের এক স্তূপ থেকে আরেক স্তূপে খুঁজে যাচ্ছিলেন নানান যন্ত্রপাতি, যুদ্ধে নামতে কাজে লাগবে এমন সব টুকরো টুকরো উপকরণ। মনেট ইতিহাসের একজন বিদগ্ধ পণ্ডিতের মতো কথা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। টেক্স মুগ্ধ। চলছিল তত্ত্ব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক; দুজনেই দিয়েন বিয়েন ফু-তে নামার ব্যাপারে বেশ চিন্তিত ছিলেন।
দ্বিতীয় দিন মনেট বিদেশি স্বেচ্ছাসেবক সেনাদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাতে টেক্সকে নিয়ে গেলেন। পুছতাছের জন্য তার লোকেরা সার দিয়ে দাঁড়াল। টেক্স এক নিমেষেই বুঝতে পারলেন, এরা সব পেশাদার দল; মুহূর্তের মধ্যে মাথায় খেলে গেল – এরা নিশ্চয়ই মনেটকে প্রচণ্ড সম্মান করে। প্রত্যেক ভাল অফিসারের মতো মনেটও নিজের খাওয়া অথবা ঘুমের আগে তাঁর লোকেদের খাওয়া-দাওয়া ও মাথা গোঁজার ঠাঁই জুটেছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতেন; কিন্তু এর থেকেও বড় ব্যাপার হল, মানুষগুলো মনেটের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করত, তারা হাড়ে হাড়ে জানত যে তিনি যথেষ্ট সাহসী এবং স্থির বুদ্ধির লোক তিনি।
স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে একমাত্র মনেটই ছিলেন সাহসী। সোনালি চুলের কটা কটা দেখতে মাঝবয়সীরাও ছিল, তারা আগে হিটলারের সেনাদলে অফিসার হিসেবে কাজ করেছে। অবশ্য পাশাপাশি, পোল, ইউক্রেনীয়, রুশ, আর্জেন্টেনীয়, এমনকি কিছু কিছু ব্রিটেনের লোকও ছিল। দীর্ঘ সারির ঠিক মাঝখানে একজন লম্বা হাড্ডিসার নিগ্রো দাঁড়িয়েছিল; তার মুখে কী ছিল কে জানে, টেক্সকে বেশ আকর্ষণ করে। তিনি থামলেন, লোকটিকে আগাপাশতলা জরিপ করলেন, তারপর ফিরে গেলেন মনেটের কাছে।
“মেজর মনেট, আপনাকে অসম্মান করার কোনও অভিপ্রায় আমার নেই, তবে একটা কথা জানিয়ে রাখি, আপনার এই দলের ভেতরে অন্তত একজন আমেরিকান তো আছেই আছে,” তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন টেক্স। “হতে পারে লোকটা আপনাকে বলেছে সে একজন আফ্রিকান বা এই ধরনের কিছু, কিন্তু আমি এখনই বাজি ধরে বলতে পারি ও একজন নির্ভেজাল আমেরিকান ছাড়া অন্য কিছু নয়।”
লম্বা নিগ্রো লোকটা হাসল, কিন্তু তার ঠোঁট দুটো শক্ত করে টেপা। টেক্স এক নজরেই বুঝেছিলেন তার ধারণায় কোনও ভুল নেই। “আমি জানতাম না, মেজর উলচেক”, সেনাদের সামনে দাঁড়িয়ে খুব দ্রুত এবং ফর্ম্যালি বললেন। “আমি তো জানি এই মানুষটা একজন সেনা হিসেবে খুব ভাল। আসলে আমাদের সেনাবাহিনির ঐতিহ্য হল আমরা কোনও ব্যক্তিরই পেছনের ইতিহাস নিয়ে খোঁজখবর করি না।”
“ভালো তো, থাক না, আবার কী জানেন আমেরিকানদের মধ্যে একটা রীতি চালু আছে – যখনই তাদের একে অপরের সঙ্গে দেখা হয় তারা করমর্দন করে,” টেক্স বললেন।
তিনি নিগ্রো মানুষটার দিকে তার হাত বাড়িয়ে দিলেন, উত্তেজনাময় টানটান এক মুহূ্র্ত, দুজন মানুষ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে, তারপর নিগ্রো ব্যক্তিটি হেসে তার হাত বাড়িয়ে দিল। যখন বাকি সেনাদল কঠিন অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, দুজন আমেরিকান খুব উৎসাহ নিয়ে বাকি কথা সেরে নিলেন। সৈন্যটির নাম জিম ডেভিস, সে লস এঞ্জেলস থেকে এসেছে। তিন বছরের জন্য উকলাতে গিয়েছিল, তারপর এই সেনাদলটাতে কী উত্তেজনা চলছে সেটা খুঁটিয়ে সব দেখবার জন্য সে এখানে যোগ দিয়েছে। টেক্স তখনই বুঝতে পারলেন সেনা হওয়ার ইচ্ছেই টেক্সের মতো তাকেও এখানে টেনে এনেছে। সম্ভবত মিনিট দুয়েক কথা চলল। এর পরেই ফরাসি মেজর ঘুরে দাঁড়ালেন আর তৎক্ষণাৎ ডেভিস অ্যাটেনসনের ভঙ্গিতে ফিরে গেল, স্যালুট করল, তার মুখে আবার সেই নিশ্চল কাঠিন্য।
টেক্স আর মনেট আবার সারিবদ্ধ সেনাদের ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলেন। টেক্সের মনে হল ডেভিসের আমেরিকান পরিচিতি নিয়ে মনেটকে জানানোটা নির্ঘাত ছেলেমানুষি হয়ে গেছে। তিনি লক্ষ করেছেন, যখন ডেভিস উলচেকের টেক্সান উচ্চারণ শুনছিল তখন তার মুখে লেগে ছিল অবন্ধুসুলভ বাঁকা হাসির রেখা। টেক্স চমকে দাঁড়িয়ে পড়ে, ভেবেছিল পরের হাসিটা নিশ্চয়ই বন্ধুত্বপূর্ণ হবে।
“ডেভিস একজন ভাল মানুষ,” ছাউনিতে ফেরাকালে মনেট টেক্সকে বললেন। “পাহারায় সে দুর্দান্ত। নেটিভ ভিয়েতনামীরা আমাদের ফরাসি, উত্তর আফ্রিকান সেনাদের ঘৃণা করে বটে, কিন্তু তাকে খুব ভালোবাসে। আমাদের কাছে সেনাদলের পথপ্রদর্শক হিসেবে দু’জন ভিয়েতনামী আছে বটে, তবে একমাত্র ডেভিসের সঙ্গেই তারা রাত-বিরেতে পাহারা দিয়ে বেড়ায়। সে কখনও কোনও ভিয়েতকে খুইয়ে বসেনি, বারবার ঠিক বুদ্ধি দিয়ে বাজিমাত করে ফিরে এসেছে।”
পর দিন সকালে বাইরে থেকে আনা যে প্লেনটা তাদের দিয়েন বিয়েন ফু-র ওপরে নামাবে, সেটাকে বিমানঘাঁটি থেকে আনতে পুরো সৈন্যদলটা লড়িতে চড়ে বসল। যে-মুহূর্তে তারা গার্ড পোস্টটা পেরিয়ে যাচ্ছিল, টেক্স বুঝতে পারলেন কিছু একটা গোলমাল চলছে। গার্ডেরা বেশ উদ্বিগ্ন, অফিসারেরা উত্তেজিত, অসংখ্য প্লেন সার বেঁধে দাঁড়িয়ে হার্ডটপের ওপরে, অনেক লোকজন ঘিরে ছিল তাদের। টেক্স মনেটকে কিচ্ছু বললেন না, কিন্তু তিনি জানতেন সমস্যার আঁচ ফরাসি অফিসারটিও পেয়েছেন।
আধঘন্টা পরে মনেট আবিষ্কার করল, ভুলটা কোথায় হয়েছে। তিনি হেড কোয়ার্টার বিল্ডিং থেকে হেঁটে ফিরে এলেন, সঙ্গে খাকি পোশাক পরা এক আমেরিকান। তাঁর মুখ পাশুটে। লরির ছাউনির তলায় হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকা স্বেচ্ছাসেবক সেনাদের সব্বাই, তার দিকে একবার তাকিয়েই, পায়ের পাতাগুলো কোনরকমে জড়ো করার চেষ্টা করল, এমনকি অ্যাটেনসনের ভঙ্গিও নিল। মনেট তার দলের লোকজনের কাছে হেঁটে গেলেন এবং দৃঢ় অ্যাটেনসনের ভঙ্গিতে দাঁড়ালেন।

“শেষ রাতে”, মনেট স্পষ্ট স্বরে বললেন, “দিয়েন বিয়েন ফু-র পতন হয়েছে। উদ্ধারের চেষ্টা বৃথা, সমস্ত বেতার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এটা হাই কম্যাণ্ডের সিদ্ধান্ত, আমারও একই মত, আমরা সত্যিই যুদ্ধটায় পুরোপুরি হেরে গেছি।” টেক্স মনে মনে তারিফ করলেন, আবার করুণাও হল তার। সত্যি বলতে কী, মনেটের তেজ ছিল। বেশির ভাগ অফিসারের তো পিলেটাকে সুগার কোটেড করে রাখতে হয়। অবশ্য হাই কম্যাণ্ড থকে উড়ে আসা এই দুঃখজনক খবরটার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলার মতো মেধা এবং একাগ্রতা মনেটের ছিল। এসব দেখেটেখে টেক্সও শিখে নিলেন, যে-অফিসারেরা হাই কম্যাণ্ড থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখে তারা সাধারণত সব সময়ই নীচু মানের অফিসার।
মনেট টেক্সের কাছে এগিয়ে গিয়ে ঢ্যাঙাগোছের লোকটার সঙ্গে আলাপ পরিচয় করিয়ে দিলেন।
“মেজর উলচেক, ইনি হলেন গিলবার্ট ম্যাকহোয়াইট, সারখানের আমেরিকান রাষ্ট্রদূত,” মনেট আড়ষ্ট হয়ে বললেন। টেক্স মনেটের চাপা উৎকণ্ঠাটা পরিস্কার বুঝতে পারলেন। “রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইট কমিউনিস্টদের কাজকম্মের ধরনধারন খোদ নিজের চোখে দেখবেন বলে সাময়িকভাবে দায়িত্ব নিয়ে সারখান থেকে সোজা এখানে চলে এসেছেন। আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে একটা অবাধে চলাচলের পরিচয়পত্র জোগাড় করেছেন, আর দিয়েন বিয়েন ফু-তে যাবার পরিকল্পনাও করছেন। আমরা কেন এই যুদ্ধটায় হেরে গেলাম সে সম্পর্কে আমাদের নিজেদের মতামতটা জানতে পারলে ওঁনার কিছুটা সুবিধা হত।”
টেক্স ক্ষিপ্র অথচ নিপুণ নজরে রাষ্ট্রদূতকে দেখে নিলেন। তাঁর ভেতরে একঝলক রাগ খেলে গেল, তারপর বুঝলেন সব ভিত্তিহীন… লোকটার জানার তো আর কোনও উপায়ই নেই।
“মেজর”, টেক্স বললেন, “আপনি যতক্ষণ দলের লোকজনকে নিয়ে ফেরার বন্দোবস্ত করবেন ততক্ষণ আমি না হয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে একটু কথাবার্তা বলে নিই, আপনার অনুমতি আছে তো?”
মনেট কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে মুহূর্তের মধ্যে একবার টেক্সকে দেখে নিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে স্রেফ জুতোর হিলের উপর ভর দিয়ে চট করে ঘুরে গেলেন। চীৎকার করে আদেশ নির্দেশ দিতে শুরু করলেন। বিদেশি স্বেচ্ছাসেবক সেনারা আবার লরি ভর্তি করে উঠে পড়ল, একের পর এক লরিগুলো গর্জন করতে করতে পিছন দিকে ফিরে আসা সারিবদ্ধ গাড়িগুলোর ভেতরে আস্তে আস্তে ঢুকে গেল।
(চলবে)

Share Now শেয়ার করুন