উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস

0
200

পর্ব ১৬

অধ্যায় ১২

সত্যি কথা বলতে কী, সেখানে বেশিক্ষণ থাকার আর কোনও কারণ ছিল না। বহুদূর থেকে পিছুহটা হেরে যাওয়া ফরাসি সৈন্যের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল।
“বেশ, চলুন এবার যাওয়া যাক”, টেক্স খসখসে স্বরে বললেন। “আরেকটা অধ্যায় খতম হল, এবং আমরা যথারীতি আবার হেরে গেলাম।”

যুদ্ধের শিক্ষা

যুদ্ধের ওপরে মাও সে তুঙের লেখা এককপি পুস্তিকার সন্ধানে ঠিক পরের দিনই ম্যাকহোয়াইট হানই ফিরে গেলেন, আর মনেট বিদেশি স্বেচ্ছাসেবক সেনাদের বিশ্রামের আদেশ দিলেন। তারা খোলা আকাশের নীচে সারবাঁধা নোংরা ছোট তাঁবুগুলোতে রাত কাটাচ্ছিল; জামাকাপড় না খুলেই, শতচ্ছিন্ন তাঁবুর ছেঁড়াফাটা ছায়ায় এলিয়ে পড়ত, এমনভাবে ঘুমাত যেন কোনও দিন জেগে উঠবে না আর।
শেষ বিকেলের দিকে ম্যাকহোয়াইট মাওয়ের পুস্তিকা নিয়ে ফিরলেন। জোগাড় করার পদ্ধতিটা ছিল একেবারে সাদামাটা। প্রথম যে-খবরের কাগজের দোকানটা দেখতে পেলেন সেখানে দাঁড়ালেন, দোকানদারকে একটা কপি দিতে বললেন। দোকানের মালিক, যথারীতি সতর্ক ভঙ্গিতে, ফস করে বলে বসল মাওয়ের এমন কোনও কাজ আছে বলে সে নাকি বাপের জন্মেও শোনেনি। ম্যাকহোয়াইট তার সঙ্গে বেকার তর্কে গেলেন না। স্রেফ বললেন, যদি ঘণ্টা দুয়েকের ভেতরে চটি বইটি তাঁর কাছে পৌঁছে যায় তার জন্য ৮০০ পিয়াসা পর্যন্ত খরচা করতে তিনি রাজি, ব্যাস, আর কোনও প্রশ্ন করলেন না। একঘণ্টাও যায়নি, ছোট আকারের বইটি তাঁর হাতে চলে এল।
তাঁরা তিনজন মনেটের তাঁবুতে জড়ো হয়েছিলেন, টানা প্রায় ঘণ্টাদেড়েক ধরে মনেট উঁচু স্বরে পড়ে গেলেন। ম্যাকহোয়াইট এবং টেক্স কেউই এই সময়টাতে মনেটকে লক্ষ করলেন না। পুস্তিকার শব্দগুলো যেন একটা জীবনযাত্রাকে, একটা ঐতিহ্যকে যার ওপর মনেটের অগাধ বিশ্বাস, তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে তছনছ করে দিচ্ছিল। পাঠ চলাকালে মনেট একটুও নড়াচড়া করেন নি। তিনি নিজের কোলের ওপর হাতদুটোকে এমন শক্তভাবে জড়ো করে বসেছিলেন, মনে হচ্ছিল যেন এরকম শারীরিকভাবে নিজেকে এক জায়গায় ধরে রাখলে তাঁর ধ্বসে যাওয়া পৃথিবীর অংশটাকেও হয়তো রুখতে পারবেন, ক্ষতিপূরণ করতে পারবেন।
ম্যাকহোয়াইট শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ একটা স্তব্ধতা নেমে এল।
“গোটা ব্যাপারটা বিচার করলে, মাও একদম সঠিক আর আমরাই ভুল,” মনেট দৃঢ় গলায় বললেন। “দয়া করে আমাদের ঐতিহ্যের সম্পর্কে আর কিছু না বলাই ভালো। বরং মাওয়ের লেখার কোন কোন অংশগুলো আমরা আমাদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করতে পারি সে বিষয়ে আলোচনা করা যাক চলুন।”
“মাও যেসব পরামর্শ দিয়েছেন তার বেশিরভাগটাই আমাদের পক্ষে ব্যবহার করা বেশ কঠিন, এসব অনেকদিন আগেকার ব্যাপার”, ম্যাকহোয়াইট বললেন। “শেষ করতে আপনার বছরের পর বছর কেটে যাবে। উদাহরণ হিসেবে ধরে নিন, যখন তিনি সেনাদের সম্মুখভাগে রাজনৈতিক সংগঠকদের পাঠানোর কথা বলেন, তখন তিনি বছরের হিসেবে বলছেন। এই সংগঠকরা কখনই নিজেদেরকে কমিউনিস্ট বলে ঘোষণা করবে না; তারা গ্রামবাসীদের সামনে স্রেফ কমিউনিস্ট ধারণাগুলোকে তুলে ধরবে। তারপর যখন যুদ্ধ শুরু হবে তারা শত্রুদলের পেছন থেকে সমবেত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে আর যতটা সম্ভব ছাড়খাড় করে ছেড়ে দেবে।”
“এর মানেটা পরিস্কার – তাই যখনই আমাদের রাতের বেলায় গুলিযুদ্ধ থাকে তখন আমরা সামনে পেছনে দুটো দিক থেকেই গুলিতে আক্রান্ত হই”, টেক্স বললেন।
“শুধু তাই নয়, এ-ও বোঝা যাচ্ছে কেন গ্রামের ওপর তাদের পাকা নজরদারি থাকে যা আমরা অবিরাম প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি”, মনেট এর সঙ্গে যোগ করলেন।
“শুনুন, মার্জনা করবেন, আপনাদের আলোচনার মাঝে একটু জ্ঞান দিচ্ছি”, ম্যাকহোয়াইট বললেন। “আমি পরামর্শ দেব – যে-কাজগুলো শেষ করতে বছরখানেক সময় লাগবে, সেসব আমাদের ভুলে যাওয়াই আপাতত ভালো। আমাদের হাতে এখন কয়েকটা দিন মাত্র সময় আছে। পরবর্তী সময়ে কিংবা অন্য কোনও দেশে সম্ভবত আমরা মাওয়ের কৌশল প্রয়োগ করতে পারব। এখন আমাদের তাঁর কার্যপদ্ধতির ওপর মনোযোগ দিতে হবে।”
ঘণ্টাখানেক ধরে তাঁরা পুস্তিকাটির ওপর তর্কবিতর্ক চালালেন। রাত নেমে এলে প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ মোড়কবন্দি ঠাণ্ডা খাবারগুলো খেলেন, হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়লেন মশারির ভেতর, ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত চলতে লাগল আলোচনা। মাওয়ের ডজন ডজন পরামর্শ থেকে তাঁরা বেছে নিলেন মাত্র দুটো।
অসমতল এলাকায় মাও বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না শত্রু তার অভীষ্ট লক্ষ্যের জন্য বেড়িয়ে না আসে ততক্ষণ পিছিয়ে যাও আর গা ঢাকা দিয়ে থাকো। তারপর একটা দুর্বল মুহূর্তের জন্য ওঁত পেতে থাকো। সময়, স্থান এবং পশ্চাদপসরণ এগুলোই যুদ্ধ-বিজেতার হাতিয়ার। যখন এমন শত্রুর সঙ্গে লড়াই যাদের সংখ্যা এবং অস্ত্রশস্ত্র বেশি, তখন জিততে হলে ক্ষিপ্রতা আর অন্ধকারকে ব্যবহার করো।
দ্বিতীয় ভাবনাটা ছিল গেরিলা যুদ্ধ নিয়ে। মাও বলেছেন গেরিলা যুদ্ধচলাকালীন, গেরিলা সেনাদের দল অনমনীয় আর পুরোপুরি এককেন্দ্রিক আদেশ মেনে চললে তবেই কেবলমাত্র সফল হতে পারে। অপারেশনের সময়, একজন মানুষ প্রকৃতপক্ষে আধঘণ্টায় টানা যতটা লড়তে পারে, সেন্ট্রাল কমাণ্ড পোস্টের থেকে গেরিলাদের প্রতি আদেশ নির্দেশ যেন তার থেকে একচুলও বেশি না হয়।
মনেট বললেন, “একদম ঠিক – যদিও কখনও আমরা এটা ব্যবহার করি নি।”
ম্যাকহোয়াইট পুস্তিকাটা নামিয়ে রাখলেন। মনেট আর টেক্সের দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি হাসলেন, তাঁরা টেবিলের ওপর হানই ভূখণ্ডের বিশদ বিবরণ সম্পন্ন একটা মানচিত্র পাততে শুরু করলেন।
যে গ্রামটা তাঁরা খুঁজবেন বলে মনস্থ করেছিলেন, সেটা একেবারে একটা ধেনো জলাভূমির মাঝখানে; দু মাইল পেছনে বাশঝাড় সমেত বিস্তৃত জায়গা জুড়ে খামার এলাকা। দেখে মনেট আর টেক্স দুজনেই মাথা নাড়লেন। কোনও ফিল্ড কম্যান্ডার নেহাত পাগল না হলে এমন বাঁশ ঝাড় ছেড়ে কম্যান্ড দেবার জন্য অন্য কোনও জায়গা বেছে নেবেন না। একটা উঁচু কাঠখোট্টা রাস্তা গাছগুলো থেকে সিধে তীরের মতো ছুটে গেছে গ্রামটার ভেতর দিয়ে। আর, সবচেয়ে ভালো, গ্রামের একটু আগেই একটা ছোট্টখাট্ট গোছের পাহাড় আছে, পাহাড়টার পেছনে সংরক্ষিত সেনাদল সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারবে।
“ঠিক আছে, সব্বাইকে বলছি, এই গ্রামটাই আমাদের জন্য ঠিকঠাক”, মনেট সন্দেহহীনভাবে বললেন। তাঁর চোখ উত্তেজনায় জ্বলছিল। “তাহলে আজ থেকে তিনদিন পরে যে কুকুর আমাদের কামড়ায় সেই কুকুরের লোম দিয়েই না হয় অসুখটা সারাবার চেষ্টা করবো।”
টেক্সই এই বিস্ময়কর অস্ত্রটার সন্ধান দিয়েছিলেন। তিনি কোরিয়ায় অস্ত্রটাকে একবার দারুণ সফল হতে দেখেছিলেন। এটা কিছু না, বরং যথেষ্ট সাদামাটা ব্যাপার। একটা পাতলা লোহার আস্তরণে ঢাকা বিশাল আকারের ট্রাকের পাটাতন যা পঁচিশ ইঞ্চি রকেট লঞ্চারের ব্যারেল বাঁধতে দরকার হয়, সেটা এমনভাবে করা হয় যাতে রকেটে আগুন লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রায় মোটামুটি একশ গজ ব্যাসের পরিধিতে যা যা থাকবে সব খসে পড়বে। টেক্স বাকি দুজনকে আশ্বস্ত করে বললেন ওই পরিধির মধ্যে কারও পক্ষে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
চতুর্থদিনে তারা গ্রামটার দিকে রওনা হলেন। অনেকগুলো সপ্তাহের মধ্যে এই প্রথমবার স্বেচ্ছাসেবক সেনাদের মুখে হাসি দেখা গেল, তারা ঠাট্টা ইয়ার্কিও মারতে লাগল। মনেট আগেভাগেই দু লরি রক্ষী নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন। আধ ঘণ্টা পড়ে ম্যাকহোয়াইট আর টেক্স প্রধান সেনাদলের সঙ্গে সঙ্গে চললেন। টেক্স রকেটের ট্রাকটার ওপরে উঠে গেছিলেন আর মনেটের সঙ্গে রেডিওতে অবিরাম যোগাযোগ রেখে চলছিলেন। ম্যাকহোয়াইট একেবারে রকেটের ট্রাকটার পেছনে একটা জিপে ছিলেন।
যে-ই গোধূলি নামল, অমনি প্রধান সেনাদল হাইওয়ে ছেড়ে ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটা ধরল। টেক্স নিজের অবস্থানে পৌঁছে খবর দেবার জন্য মনেটের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। মনেটের স্পষ্ট কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“আমরা গ্রামের দক্ষিণদিকটাতে ঘাঁটি গেড়েছি”, তিনি সংবাদ দিলেন। “আমরা অবস্থান ঠিকঠাক করলাম আর আধঘন্টা পরেই দুজন ভিয়েতনামী গ্রাম ছেড়ে রওনা হয়ে গেল। ওরা উত্তর দিকে হাঁটা ধরলো, কিন্তু আমার মনে হয় তারা চক্কর মেরে ঠিক ফিরে আসবে আর বাঁশঝাড়ের উপর নজর রাখবে। কিছু ঘটতে মনে হচ্ছে এখনও একটা ঘণ্টা লেগে যাবে।”
লরির প্রথম ভাগটা যতটা সম্ভব চুপচাপ এগিয়ে গেল। টেক্স ছোট পাহাড়টার ঠিক পেছনেই লম্বা লাইনে তাদের মোতায়েন করে রাখলেন। এই পাহাড়টাই তাদের গ্রাম থেকে পৃথক করে রেখে দিয়েছে।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর বেশ দূরে রাইফেলের গুলি চালানোর একটা হাল্কা শব্দ শুনতে পান তারা, ভারি মেশিনগানের এলোপাথাড়ি গুলির আওয়াজের ঠিক পরে-পরেই রেডিওতে মনেটের কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া গেল।
“আমার মনে হয় ওরা টোপটা গিলেছে। ওরা সম্ভবত আমাদের দুর্বলভাবে, বাঁশঝাড় থেকে সরাসরি সেনাদল সমেত উঁচু কঠিন রাস্তাটা দিয়ে নীচের দিকে নামছে। সেনাদের স্রেফ প্রথম দলটাই সাঙ্ঘাতিক আঘাত করেছে। ওরা এখনও মেশিনগান ব্যবহার করে নি, যদিও আমরা ৫০ ক্যালিবার দিয়ে আরম্ভ করেছি। চারমুখো ৫০ ক্যালিবার মেশিনগান বইবার মতো কোনও কেরিয়ার নিয়ে তৈরি থেকো। আর পথে সেনাদের নিয়ে নিজেদের রাস্তা বিচ্ছিন্ন করে নাও। আদেশ-টাদেশের জন্য সতর্ক থেকো।”
“আমরা আমাদের রাস্তাতেই আছি”, টেক্স বললেন, বলেই রিসিভারটা শব্দ করে বন্ধ করে দিলেন।
জলদি ঘুরে, টেক্স চারমুখো ৫০ ক্যালিবার মেশিনগানটাকে সারির একেবারে সামনে রাখতে আদেশ দিলেন। এর ঠিক পেছনে রাইফেলধারী সেনাদের একটা লরি ছিল। লাইনের তিন নম্বরে ছিল রকেট ট্রাক।
“যতক্ষণ না মেশিনগান চালানো শুরু হচ্ছে আলোগুলো সব নিভিয়ে রাখো”, টেক্স মৃদুগলায় নির্দেশ দিলেন। “তারপর তোমাদের কাছে যত গোলাগুলি আছে সব ছুঁড়তে শুরু করে দিও। যেই রকেটে আগুন দেওয়া হবে সঙ্গে সঙ্গে চারমুখো গাড়িটাকে ঘুরিয়ে নিও, যাতে অবস্থা বুঝে রাস্তা দিয়ে পিছিয়ে আসা যায়। যদি উপায় না পেয়ে আমাদের কোনও গাড়ি এখানে ফেলে যেতে হয় তা হলে শুধুমাত্র এই রকেট ট্রাকটা, সুতরাং আগুন দেওয়ার পরে আমি এটার ওপরে যেন কাউকে না দেখি আর।”
যতটা ধীরে গাড়ির সারি গড়াতে পারে ততটাই শ্লথ গতিতে তারা পাহাড়ের কাছে এসে পৌঁছাল। পঞ্চাশ গজ দূরে মনেটের লোকজন সীল করা ফ্ল্যাশলাইট দিয়ে রাস্তার ডানদিকে জরুরি অবস্থায় থামার লাইনটাতে ইঙ্গিত করছিল। যতক্ষণ না গ্রামে গিয়ে পৌঁছায় গাড়ির সমস্ত সারিটা গতি কমাল না, কিন্তু শুধু ছোট খড়ো ঘরগুলো পেরিয়ে যাবার সময় শক্ত করে দাঁড়িয়ে পড়ছিল।
হঠাৎই তারা গ্রাম ছাড়িয়ে সমতলভূমিতে এসে পড়লো। চারমুখো গাড়িটার ড্রাইভারের পাশেই বসে ছিলেন টেক্স, সামনের দিকে তাকিয়ে। তিনি রাস্তার ওপরে তীব্র গতিতে চলে যাওয়া একটা রেখা দেখতে পেলেন, পেছনে হেলে পড়লেন, ঠাণ্ডা মেজাজে মেশিনগান চালককে রাস্তা বরাবর গুলি চালাতে বললেন।
প্রচণ্ড শব্দে প্রায় ফেটে পড়ল চতুর্ভুজ মাউন্টটা, ট্রেসার রো-এর চারটে মুখ যেন সামনে ছুটে গেল। ওই মুহূর্তেই টেক্স অস্ত্রবাহক গাড়িটার আলোগুলো জ্বালিয়ে দিলেন। তাদের থেকে পঞ্চাশ গজ দূরত্বে সামনেই প্রায় পঞ্চাশটা ভিয়েতনামী সেনাবাহিনীর দল দেখতে পাওয়া গেল। তারা নিশ্চল, যেন আলোতে হতভম্ব হয়ে গেছে; তারপর, দ্রুত গতিতে সবাই দৌড়াল, মাথা বাঁচানোর জন্য রাস্তার ডান দিক ধরল। একদিকে মেশিন গানের তুখোড় গতিতে আক্রমণ আর অন্যদিকে কার্তুজের আঘাত। মাটির ঢেলা, ইউনিফর্মের ছেঁড়া অংশ, আর রাইফেলের ভাঙা টুকরো তুমুল বিস্ফোরণে হাওয়ায় উড়তে লাগল। লোকগুলোর শরীরগুলোকে রাস্তার পাশে গর্তটাতে ফেলে দেওয়া হল। যদিও গাড়িটা দ্রুত চলছিল , আর শূন্যস্থানটা বুজিয়ে দিতে কয়েক সেকেণ্ডের চেয়ে বেশি সময় লাগল না, তবু মনে হচ্ছিল অভিযানটা যেন প্রচণ্ড উদ্দাম কোনও দুঃস্বপ্নের মতো। তারপরেই গাড়িটার চাকা রাস্তায় পড়ে থাকা তিনটে লাশের ওপর দিয়ে পার হয়ে গেল আর শত্রুর দলকে পেছনে ফেলে ছুটে চলল। একমুহূর্ত পরেই টেক্স লরির ওপর রাইফেলের প্রস্তুতির শব্দ শুনতে পেল।
তাঁর মাথার ওপর মেশিনগানের শব্দ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। টেক্স আলোগুলোকে জ্বালিয়ে রাখলেন, আর গাড়িটা নিয়ে সংকীর্ণ রাস্তা ধরে গর্জন করতে করতে নামতে লাগলেন। তাঁর মাথায় স্রেফ দুটো ব্যাপার কাজ করছিল। প্রথমত, রাস্তাটা যেন তাদের গাড়ির সারিটাকে বইতে পারে এই প্রার্থনাই করে যাচ্ছিলেন মনে মনে। দ্বিতীয়ত, ঠিক কোনখান থেকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে হেডলাইটের আলো সবার আগে সব বাঁশগাছগুলোকে ছুঁতে পারে, সেই দূরত্বটা গত রাতেই মেপে নিয়েছিলেন। অংক কষে ফল বেরিয়েছিল ৬০০ গজ। যদি হেডলাইটের আলোয় বাঁশবাগান আলোকিত করার পর তিনি ঘণ্টায় কুড়ি মাইল বেগে পনেরো সেকেণ্ড গাড়ি চালিয়ে যান, তাহলে রকেট ট্রাকটির বাঁশবাগান থেকে ৫০০ গজ দূরত্বেই থাকা উচিত। ঠিক ওই মুহূর্তেই হেডলাইটের আলো বাঁশবাগানের সাদা আর সবুজ বাঁশের দণ্ডগুলোকে স্পর্শ করল।
“এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ…” টেক্স চিৎকার করে ডাকতে লাগল।
দশ গোনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন, আর পনেরোতে রকেট বয়ে আনা গাড়িটার দিকে সংকেত ছুঁড়ে দিলেন। দুটো ব্যাপারই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘটে গেল। ট্রাকটা আর্তনাদ করতে করতে ঘ্যাঁচ করে দাঁড়িয়ে পড়ল – ওটা আস্তে আস্তে নড়ছিল তখনও, আর দেরি না করে রকেটগুলো তখনই ছাড়া হল। এক সেকেণ্ডের জন্য মনে হল গোটা ট্রাকটা যেন আগুনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আর হিসহিস ধ্বনিতে যেন কানে তালা লেগে গেল। তারপর রকেটের জিপ থেকে একটা স্পষ্ট শব্দ বাতাস কেটে ছুটে গেল। সেকেণ্ড দুয়েক পরে তারা আঘাত হানল। বাঁশবাগানের ভেতর একটা আলোর ঝলক দেখা গেল – আর তারপর, বিশাল এক হলুদ আগুনের হলকায় বাগানটা বিস্ফারিত হয়ে গেল। কিছু সময় ধরে ত্রিভুজের মতো আগ্নেয় শিখাটা ঝুলে রইল বাগানটায়, আর তার ভেতরে আধ ডজন মানুষ পুতুলের মতো ঘুরে দাঁড়াল। তারপর আলো উধাও হয়ে গেল, আর কোনও জিনিসপত্রের মাটিতে সজোরে আছড়ে পড়ার প্রকাণ্ড কর্কশ শব্দ ভেসে এল।
“দুর্দান্ত ব্যাপার। নিকুচি করেছে শালা, গাড়িটাকে ঘোরাও,” টেক্স চেঁচিয়ে বললেন।
ত্বরিত গতিতে নির্ভুলভাবে, মরিয়া এক ঝাঁকুনি দিয়ে ড্রাইভার পেছনের দিকে গাড়িটাকে চালিয়ে নিয়ে গেল। এক মিনিটেরও কম সময়ে সে রাস্তা দিয়ে ফিরে যাবার জন্য রকেট ট্রাকটার কিনার ঘেঁষে দাঁড়াল ।
“ট্রাকটাকে ছেড়ে যাওয়ার কোনও দরকার নেই,” পেরিয়ে যেতে যেতে টেক্স রকেট ট্রাকের চালককে বললেন। “আলোগুলো বন্ধ করে আমাদের পেছনে পেছনে রাস্তায় নেমে পড়ো। আমাদের পেছন দিককার আলো দেখে তুমি বুঝতে পারবে কোথায় তুমি যাচ্ছ। গ্রামে পৌঁছে তুমি গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যেতে পারবে।”
গাড়িগুলো প্রচণ্ড গর্জন করতে করতে ফিরতি রাস্তা ধরল। গ্রাম জুড়ে গুলিগোলার যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে মনেট টেক্সকে বলেছিলেন যখন অরণ্যটি বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, ভিয়েতনামীরা তখনই গুলি চালান বন্ধ করে দিয়েছিল, তারা এখানে সেখানে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল।
তারা কেবল সম্মুখ ভাগে থাকা সেনাদের তুলে নেবার জন্য অনেকক্ষণ গ্রামে থাকল, আর তারপর পুরো দলটা হানয়ের দিকে রওনা দিল।
“আমার সমস্ত জীবনে এমন আকাট নির্বুদ্ধিতার কথা কখনও শুনিনি”, টেক্সকে আমেরিকান মেজর জেনারেল কর্কশ গলায় বললেন।
“প্রথমেই তুমি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করেছ, তোমাকে তো একজন নিরপেক্ষ পরিদর্শক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। তারপর এখানে আসা ও একগাদা অভিজ্ঞ জেনারেল অফিসারদের যুদ্ধ কীভাবে চালাতে হবে সে সম্পর্কে বলার পেছনে তোমার একটা তিক্ততা কাজ করছে।”
হানয়ের সিটাডেলের দ্বিতীয় তলার একটা ঘরে বিশাল এক আলোচনা টেবিলের একদম শেষ প্রান্তের তিনটে চেয়ারে টেক্স, ম্যাকহোয়াইট আর মনেট বসেছিলেন। টেবিলের অপর প্রান্তে ছিলেন দুজন ফরাসি অ্যাডমিরাল, চারজন ফরাসি জেনারেল আর এক আমেরিকান জেনারেল যিনি এইমাত্র কথাগুলো বললেন।
“জেনারেল, আমি ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি নি” টেক্স শান্তভাবে বললেন।
“আমি গোটাটাই স্রেফ পরিবাহক গাড়িটা করে গেছি। একটা অস্ত্রও স্পর্শ করিনি। একটাও গুলি চালায়নি। একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের যেমন নিয়ন্ত্রিত আচরণ হওয়া উচিত আমি সেই নিয়মের গণ্ডির ভেতর থেকেই সব কিছু করছিলাম।”
“দেখুন, ওলচেক, আমার সঙ্গে চালাকি করার চেষ্টা করবেন না”, জেনারেল বললেন, তাঁর গলা উঠছিল, “কিছু ফরাসি মানুষ এই রকেট ট্রাকের ধারণাটার স্বপ্ন দেখছে, আমাকে এটা বলার চেষ্টাও করবেন না। আমি এর পাশেই ছিলাম…।”
সিনিয়ার ফরাসি জেনারেল কথার মাঝেই শীতল গলায় বলে ওঠেন।
“দেখুন জেনারেল, আপনার পর্যবেক্ষক নিরপেক্ষ থাকল কী না থাকল, সেই সমস্যা নিয়ে আমাদের মাথাব্যাথা নেই। আমাদের কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হল মেজর মনেট ও রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইটের দুর্দান্ত পরামর্শ – ওই কমিউনিস্ট দস্যুর সামরিক রচনাগুলোর অনুসরণে ফরাসি সৈন্যরা তাদের ক্রিয়াকলাপ পুনর্বিবেচনা করুক।”
“জেনারেল, আপনি তো জানেন এই অধিবেশনটা অনুরোধ করার পেছনে আমি ছিলাম অন্যতম।” গিলবার্ট ম্যাকহোয়াইট শান্ত স্বরে বললেন। “১৯৪৬-এর ডিসেম্বর থেকে ফরাসিরা যে যুদ্ধে লড়ছে তাতে কমিউনিস্টরা মাওয়ের প্রচার পুস্তিকার রেখাচিত্র অনুযায়ী অবিকল সেনা পরিচালনা করেছে। আপনি সামরিক মানুষ – ক্ষমা করবেন আমার স্বল্প বুদ্ধিকে – কিন্তু মাও যে-যে ভুলগুলো করাতে চেয়েছিলেন আপনি সেই ভুলগুলোই করেছিলেন। এই ভূখণ্ডে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রত্যেকটি শিক্ষাই আপনি অবহেলা করেছেন। আপনি ভিয়েতনামীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা গ্রহণেও অবজ্ঞা দেখিয়েছেন, মাও কিন্তু অনেক আগেই প্রমাণ করে দিয়েছেন যে এশীয়রা আর কোনোভাবেই লড়াই করতে পারে না। দেখুন, আমার একটা সহজ সাদামাটা প্রশ্ন আছে – সম্ভবত আপনারা অপ্রস্তুত হতে পারেন। আপনাদের মধ্যে কেউ কী মাও সে তুঙের রচনা পড়েছেন?”
এক মুহূর্তের নীরবতা। সিনিয়র ফরাসি জেনারেল, পণ্ডিত মানুষ, চমৎকার সংযোগ ক্ষমতা, তিনিও কিছুটা যেন লাল হয়ে গেলেন। অন্য ফরাসি জেনারেলেরাও যথারীতি বিবর্ণ, ফ্যাকাসে হয়ে গেলেন। একটা উত্তর পাওয়ার জন্য ম্যাকহোয়াইট তাঁর চেয়ারে ঝুঁকে থাকলেন।
“এখন আপনি যদি পরামর্শ দেন মি. ম্যাকহোয়াইট, যে-জাতি নেপোলিয়ানের জন্ম দিয়েছে তাকে এখন সামরিক নির্দেশের জন্য আদিম চীনাদের কাছে যেতে হবে, আমি তাহলে বলব আপনি কেবল ভুলই করছেন না, যথারীতি অপমানও করছেন।” সিনিয়র ফরাসি জেনারেল শেষমেষ এই কথাগুলো বলেই ফেললেন।
“আমি তো সে কথা বলি নি,” ম্যাকহোয়াইট উত্তর দিলেন। “আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম আপনাদের মধ্যে কেউ মাও পড়েছেন কিনা?”
“আরে দূর, ফালতু যতসব, না, তাঁরা কেউ তার লেখা পড়েন নি”, আমেরিকান ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন। “এবং আমিও না।”
এবং যেন আরো কিছু বলে না ফেলেন তার জন্য ঠোঁটটা কামড়ে ধরে রাখলেন। ম্যাকহোয়াইট জানতেন তার ব্যক্তিগত ভাগ্য ও রাজনৈতিক সংযোগের জন্যই হয়তো জেনারেল এখনও তাকে সশস্ত্র পাহারায় হানয় থেকে বের করে দেবার নির্দেশ দিতে পারছেন না।
ম্যাকহওয়াইট ধিক্কার দিয়ে উঠলেন। “আপনারা মশাই, ভদ্দরলোকেরা, আপাতভাবে নিজেদের চোখ এবং কান দুটোই বন্ধ করে রেখেছেন।”
মনেট তার চেয়ারটা পেছনে ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখ পাণ্ডুর, হাতগুলো কাঁপছিল।
“দেখুন, যে কর্মকাণ্ডের কথা আমরা এইমাত্র বর্ণনা করলাম তার জন্য এক্কেবারে আমিই দায়ী।” মনেট দৃঢ় গলায় বললেন। “আমি যা শিখেছিলাম আর এই আমেরিকান জেনারেল ওয়েস্ট পয়েন্টে যা শিখেছেন, তার মধ্যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এতে কাজের কাজ হয়েছিল। আমি বলছি, এটা একদম ঠিকঠাক কাজ করেছিল। যদি আমি সুযোগ পেতাম তাহলে এই অপারেশনটা হাজার গুণ বাড়িয়ে প্রয়োগ করতাম। ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধের মাসে আমি যতগুলো যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলাম তার মধ্যে এটাই ছিল একমাত্র বিজয়। এটাই যদি সহস্রগুণ বাড়িয়ে তোলা যেত তাহলে একটা ছোটখাট মাঝারি মানের কৌশলী জয়ের পরিবর্তে এটা আমাদের হিসেবমাফিক স্থায়ী আধিপত্য এনে দিত। যদি কাউকে শাস্তি পেতে হয় তাহলে আমারই পাওয়া উচিত। কিন্তু, আমি আপনাদের কাছে ভিক্ষা চাইছি, আমার নিজের চোখ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যা করা উচিত বলে শিখেছি সে বিষয়ে আমাকে অন্তত মত পাল্টাতে বলবেন না।”
এরপর আর কিছুই বলার ছিল না, সিনিয়ার ফরাসি জেনারেলের একটা মাথা নাড়ানোই তাদের তিন জনকে খারিজ করে দিল। ম্যাকহোয়াইট, মনেট এবং ওলচেক বেরিয়ে গেলেন, কোনও কথা না বলে কাছের এক বারের দিকে এগোলেন। চড়া দামের দু বোতল উঁচু জাতের ফরাসি ব্র্যাণ্ডি কিনলেন, এবং চুপচাপ গিলতে লাগলেন। যখন প্রথম বোতলটা শেষ হল, বোতলটার সরু গলা ধরে ময়াকহোয়াইট ওপরে তুললেন এবং টেবিলের কিনারায় আছড়ে এক আঘাতেই সেটাকে খানখান করে ভেঙে ফেললেন। তারপর দাঁত বের করে সে-কি বিকট হাসি।
“এরকম কিছু ঘটবে বলেই আমার মনে হয়েছিল”, তিনি বললেন। “শুনুন, শাস্তিমূলক ব্যাপারস্যাপার নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না। আপনাদের কিচ্ছু হবে না। আমাদের কিছু বোকা লোক আছে এবং কিছু উদ্ধত লোকও আছে; কিন্তু শত্রুর কাছ থেকেও শেখা সম্ভব এই সামান্য কথাটা বলে অন্তত তারা কখনোই আপনাদের শাস্তি দিতে চাইবেন না।”

মাত্র অল্প কিছুটা সময় আর তারপরই ফরাসিরা হানয় থেকে পিছু হটতে শুরু করল। কয়েকমাস ধরে যুদ্ধ, সরবরাহের পর্বত-পরিমাণ ব্যয়, এবং বহু প্রাণ হারানোর পর ফরাসিরা শেষ পর্যন্ত ভিয়েত মিন্থের সঙ্গে সাময়িক সন্ধি করতে বাধ্য হয়। সন্ধিতে তারা নিরুপায় হয়ে হানয়ে শহরটিকে বিজয়ী কমিউনিস্ট সৈন্যদের জন্য ছেড়ে দিতে রাজি হল।
ম্যাকহোয়াইট, টেক্স ও মনেট এসব নিজের চোখে তারিয়ে তারিয়ে দেখার জন্য সেখানে হাজির ছিলেন। যেন কোনও জাঁকজমকপূর্ণ বর্ণময় কুচকাওয়াজের মহাসমারোহ হবে বলে ফরাসিরা শহরটা ছেড়ে গেছে। বাঁশি বাজল, ড্রামের আওয়াজ উঠল, তীক্ষ্ণ আদিম আদেশ-নির্দেশে বাতাস যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। সেনাবাহিনীর পোশাক-আশাক সাফসুতরো ও কড়া ইস্ত্রি করা, তাদের উঁচু প্যারাট্রুপ বুটজুতোগুলো ঝাঁ চকচক করছিল। হানয়ের প্রায় ফাঁকা রাস্তা দিয়ে সোজা লাইন ধরে তারা মার্চ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। হানয়ের বাসিন্দারা অবাক চোখে এই চমৎকার কুচকাওয়াজ দেখছিল। মনেট, ম্যাকহোয়াইট ও টেক্সও তাই করছিল। এটা বিজয়ী সেনাদের কুচকাওয়াজ।
কুচকাওয়াজ বাহিনীর পেছনে লাইন দিয়ে প্রচুর দুরন্ত গতির ট্যাঙ্ক ছিল; তারপর থামের মতো করে রাখা ছিল একগাদা স্বয়ংচালিত বন্দুক। ছিল আধুনিকতম আমেরিকান রাইফেলধারী ছোট ছোট সেনাবাহিনীতে ভরা অগুনতি ট্রাক। আর গোটা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে মাথার ওপরে চক্কর কাটছিল একের পর এক অসংখ্য ফরাসি বিমান।
“এটা তারিফ করার মতো দৃশ্য বটে”, সাধুবাদ জানালেন টেক্স ।
“সুন্দর, কিন্তু এক্কেবারে গবেটমার্কা,” মনেট বললেন। “এমন থকথকে কাদায় যে ট্যাঙ্ক চলবে না সে-কথা ট্যাঙ্কারকে জানানো কেউ জরুরি বলেই মনে করেনি। এবং এই রিকরলেস রাইফেলগুলো ঠিকঠাক গুলি করবে কী, শত্রুর অবস্থানই ঠিক মতো বুঝতে পারে না।”
কুচকাওয়াজ শেষ হবার পর, শহর জুড়ে বড় বড় বাড়ি এবং অন্যান্য জায়গা থেকে ফরাসি তেরঙ্গা পতাকা নামিয়ে ফেলা হল। শেষ ট্রাকটি মোড়ের চারপাশে ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, যে চারকোনা জায়গায় তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন সেটা ছিল নিঃশব্দ চুপচাপ। রাস্তাও ঘুমন্ত, কেউ ছিল না; শাটার ও দরজা শক্ত করে বন্ধ করা।
পুরোভাগের কমিউনিস্ট সেনারা ধোপদুরস্ত পোশাক পরে ছিমছাম বেশে রাশান ট্রাকে ছিল। তারপর তাঁরা প্রথম রেগুলার কমিউনিস্ট সেনাকে পৌঁছাতে দেখলেন – কাঁপা কাঁপা সাইকেলে-চড়া এক অফিসার, একটা প্যাডেড স্যুট, একজোড়া টেনিস জুতো এবং একটা ছোট ঘাসের টুপি পরা। তাঁর কাঁধে একটা রাইফেল ঝুলছিল। তাঁর পিছন পিছন পাঁচমেশালি ইউনিফর্ম পরা একদঙ্গল মানুষ আস্তে আস্তে দুলকি চালে এগিয়ে এল। কেউ কেউ পরেছিল ফরাসি ব্লাউজের মতো দেখতে আঁটো পায়জামা বিশেষ। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল খালিপায়ে। বোধ হয় অনেকের কাছেই রাইফেল ছিল; কিন্তু প্রায় সবারই কোমরের চারপাশে দড়ি দিয়ে বাঁধা তরতাজা হাতবোমা। প্রত্যেকেই কাঁধে একটা করে চালের বস্তা।
“ভালো করে চেয়ে দেখুন তো টেক্স, এবং যদি দেখতে পান তাহলে আমি কী দেখছি বলুন”, মনেট অবাক বিস্ময়ে বললেন। “দেখেছেন, ওদের মধ্যে তিন জন পাইপ দিয়ে তৈরি বন্দুক বয়ে বেড়াচ্ছে।”
সত্যিই তাই। তাদের তিনজনের কাছে বস্তুত বাড়ির তৈরি রাইফেল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। টেক্সের মনে হচ্ছিল সে যেন কম-সে-কম তিনশ বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনও যুদ্ধে লড়াই করা আদ্যিকালের মানুষদের দেখছে। এই মানুষগুলো পায়ে হাঁটত এবং সমস্ত জোগান পিঠে বইত। আপাতভাবে তারা নিরীহ ও সরল, দেখে মনে হত জোকার যেন। অথচ এরাই সেই মানুষ যাদের বিরুদ্ধে মনেট মাসের পর মাস লড়াই চালিয়ে গেছে, এবং মাত্র একবারই যাদের হারাতে পেরেছিল।
বাইসাইকেলে চাপা অফিসারটি হাত তুললেন। সারিবদ্ধ মানুষগুলো থমকে গেল, এবং তারপর টিকটিকি যেমন, দ্রুত হড়কে চলে, তেমন করে তারা দরজার পাশে ও নর্দমায় হাওয়া হয়ে গেল। অফিসার ছাড়া রাস্তাটা পুরো জনশূন্য হয়ে যাচ্ছিল। মনেট অফিসারকে চিৎকার করে ভিয়েতনামী ভাষায় বলে উঠলেন যে তাঁরা পিছনের সারির সেনা, এখনই চলে যাচ্ছেন। অফিসার হাসতে হাসতে হাত নাড়লেন। তিনি জোরে জোরে কিছু যেন বলছিলেন, আর ঠিক তক্ষুণি তাঁর মানুষগুলো কোথা থেকে ভেলকিবাজির মতো হাজির হল এবং খুব সতর্ক ভঙ্গিতে রাস্তা ধরে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করল।
টেক্স জানতেন গোটা হানয় জুড়ে চারদিকেই প্রচুর সেনা, মুখে রা নেই, আলাদা করে চেনার মতো কোনও বিশিষ্টতাও নেই। এর থেকে বেশি নজর কাড়ার মতো এমন কিছুই ছিল না তাদের, কিন্তু তাদের বিজিত শহরটার মধ্যে তারা কার্যত যেন উথলে পড়ছিল। সত্যি কথা বলতে কী, সেখানে বেশিক্ষণ থাকার আর কোনও কারণ ছিল না। বহুদূর থেকে পিছুহটা হেরে যাওয়া ফরাসি সৈন্যের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল।
“বেশ, চলুন এবার যাওয়া যাক”, টেক্স খসখসে স্বরে বললেন। “আরেকটা অধ্যায় খতম হল, এবং আমরা যথারীতি আবার হেরে গেলাম।”

(চলবে)

এই লেখাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাইলে আমাদের দুটি ফেসবুক আছে। এর যে-কোনো একটিতে ক্লিক করে মন্তব্য করুন
তীরন্দাজ Teerandaz
Teerandaz Antorjal

আগের পর্বগুলি পড়তে চাইলে এই লিংকে ক্লিক করুন
অনূদিত উপন্যাস

Share Now শেয়ার করুন