উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১৭]

0
295

পর্ব ১৭

অধ্যায়- ১৩

অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকানদের যেমনটা দেখেছিলাম, আর এখানের আমেরিকানদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাদের যেটুকু বুঝতে পারছি, দুটো অভিজ্ঞতাকে আমি যেন কিছুতেই মেলাতে পারছি না। বিদেশের মাটিতে পা রাখতে না রাখতেই তাদের যেন মাথাখানা বিগড়ে যায়। আচার-আচরণে ভদ্রতার সামান্য জ্ঞানটুকু পর্যন্ত নেই।

আপনি প্রেসিডেন্ট হলে কী করতেন?

গোটা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সাংবাদিক হিসেবে না মেনে নিলেও, যদি একান্তই বার্মার কথা ওঠে তাহলে ইউ ম্যাং স্বে’র নামটা যে সবচেয়ে উপরে থাকবে এ নিয়ে সন্দেহ পুষে রাখার মতো লোক বাস্তবিক খুব কমই আছে। ওয়ার্ল্ড প্রেস সম্পর্কে যেখানেই কথা হোক না কেন, যখনই হোক না কেন, তাঁর নামটা সেই ঠোঁটের গোড়ায় চলেই আসে।
ইউ ম্যাং স্বে কলেজ গ্র্যাজুয়েট, জীবনের মূল্যবান সময়ের বেশ খানিকটা খরচ করেছেন আমেরিকায়। মুখে আমেরিকান বুকনির অভাব ছিল না, বরং কথাবার্তায় একটু বেশি রকমেই তা টের পাওয়া যেত। ধর্ম পরিচয়ে তিনি একজন রোমান ক্যাথলিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টাতে ও.এস.এসের সক্রিয় সদস্য, আমেরিকার হয়ে উত্তর বার্মা এবং দক্ষিণ চিনে যুদ্ধে যাওয়ারও তাঁর একটা ইতিহাস আছে। কমিউনিজমের প্রতি ঘৃণা তাঁর রক্তে, প্রতিটি শিরায়।

একবার রেঙ্গুনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ম্যাকহোয়াইটের সম্মানে দেওয়া এক ডিনার পার্টি চলছিল, এটা ১৯৫৪ সালের ঘটনা, কেউ একজন কথায় কথায় ইউ ম্যাং স্বে’কে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন, “দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ব্রিটিশদের মান-সম্মান বলে তো আর কিছু রইল না দেখছি, তা আমেরিকার হালচাল কেমন বুঝছেন?”

ইউ ম্যাং স্বে বলেছিলেন, “আর আমেরিকা! এশিয়ায় ব্রিটিশদের বেইজ্জত হতে তবু তো শ’খানেক বছর সময় লেগেছে, এদিকে মাত্র দশটা বছর যেতে না যেতেই আমেরিকা নিজের হাতে সে ব্যবস্থা পাকা করতে একটুও কিপটেমি করে নি। তবে হ্যাঁ, অসম্ভব কিছুই নয়, যদি সে চায়, সামনের বছর দুয়েকের মধ্যে হয়তো হারানো সবকিছুই ফিরে পেলেও পেতে পারে।” আলোচনা যেভাবে এগোচ্ছিল তাতে তিনি এই উত্তরগুলোই দিয়েছিলেন।

এখানে আমেরিকার সম্মান এতটা নিচে নেমে গেল কেন বলুন তো? এমনিতে কী মনে হয় আপনার?

যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলাম, আমার মনে একটা ধারণা জন্মে গিয়েছিল, আমেরিকানরা দারুন ইয়ার-দোস্ত স্বভাবের হয়, তাদের মধ্যে ওসব ভান-টান কারচুপি করার কোনও বালাই নেই, জগতের সব কিছুকে জানবার এক প্রবল ইচ্ছা তাদের ভিতরে সবসময় কাজ করে। এটা তো মানবেন যারাই আমেরিকায় গেছেন, দেশটাকে চিনেছেন বুঝেছেন তাদের কেউই কিন্তু তার জনগণকে শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস না করে থাকতে পারেন নি।

অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকানদের যেমনটা দেখেছিলাম, আর এখানের আমেরিকানদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাদের যেটুকু বুঝতে পারছি, দুটো অভিজ্ঞতাকে আমি যেন কিছুতেই মেলাতে পারছি না। বিদেশের মাটিতে পা রাখতে না রাখতেই তাদের যেন মাথাখানা বিগড়ে যায়। আচার-আচরণে ভদ্রতার সামান্য জ্ঞানটুকু পর্যন্ত নেই। ভিতরে মালমশলা না থাকলে কী হবে, দেখনদারির বাহার আর লাগামছাড়া নাক উঁচু ভাবটা তো আছে ষোলআনা। কে জানে হয়তো ভিতরের ভয় আর নিজেকে বাঁচানোর তাগিদ থেকেই তারা এমনটা করছে, আবার প্রশিক্ষণের অভাবও এর একটা কারণ হতে পারে, আর তা না হলে ধরে নিতে হবে এসব ভুলের জন্য তাদের নির্বোধ বোকামিটাই দায়ী, তাছাড়া আর কী।

রাশিয়াতেও তো আমাকে একসময় থাকতে হয়েছিল। মানুষ হিসেবে তাঁদের প্রতিও মোটামুটি আমার অল্প-বিস্তর শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু অবাক হয়ে গেছি কোথায় জানেন, বার্মায় যেসব রাশিয়ানদের সঙ্গে আমার কিছুটা হলেও ব্যক্তিগতভাবে মেলামেশার সু্যোগ হয়েছে, সত্যি বলছি তাঁদের আচরণের কোনও তুলনা হয় না। তাঁদের চালচলনে আলাদা করে নজর করার মতো এমন কিছুই নেই যে রাস্তাঘাটে কেউ একবার ফিরেও তাকাবে, স্থানীয় এলাকার মতিগতি কেমন সে সম্পর্কে বলতে গেলে তাঁদের নাড়ীর জ্ঞান বেশ টনটনে, আর সেই মানুষগুলোর আন্তরিক বিশ্বাসের ওপর কোনওভাবে যেন আঁচড়টিও না লাগে, সে ব্যাপারটা নিয়ে তাঁরা কিন্তু চোখ-কান সবসময় খোলা রাখে। তাঁদের যে কাউকে আমাদের ভাষা বলে দেখাতে কী পড়েই দেখাতে বলুন না, দেখবেন, দুটোতেই একেবারে সমানভাবে ওস্তাদ। কোনও বার্মিজ দোভাষী, ট্রান্সলেটার, চাকর-বাকরের দিকে তাকিয়ে হা-পিত্যেশ করে বসে থাকতে হয় না। আর সেই জন্যই তো বার্মার লোকজনদের চোখে তাঁদের রোজকার করা ভুলচুকগুলো কেমন দিব্যি ছাড় পেয়ে যায়।

আপনি কি আরেকটু পরিষ্কার করে বলতে পারবেন, আমেরিকানদের ঠিক কোন ব্যাপারটা বার্মার লোকজনদের কাছে অসহ্য বলে মনে হয়?

শুনুন, আপনাকে আমি খোলাখুলি ভাবেই বলছি, এখন না হয় আপনাদের কাছ থেকে আর সাহায্য-টাহায্য কিছুই নেওয়া হচ্ছে না, সবটাই খারিজ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এটা তো কেবল হালফিলের ঘটনা নয়, এর আগেও বার্মায় প্রত্যেকদিন ছাপোষা মার্কিন মধ্যবিত্তদের জীবনযাপনের যে রকম-সকম আমাদের দেখতে হয়েছে সেটা বরদাস্ত করা কতটা কঠিন ছিল তা আমরাই জানি। তাদের হাবভাব চলাফেরা দেখে মনে হত সব্বাই যেন স্বয়ং রাষ্ট্রদূতের মতো কেউকেটা গোছের এক একজন। যাকেই দেখবেন কেউ বাদ নেই, সব মাতব্বর, রদ্দিমার্কা ভারতীয়দের মতো অত সস্তা ভেবেছেন নাকি তাদের, মানে ব্যাপারটা এরকমই আর কী, যেভাবেই বলুন। এমনকী পাতি কেরানি যে কেরানি, তাদের মেজাজ দেখে মনে হত তারাই যেন আপনাদের গোটা কর্মকাণ্ডের হত্তাকত্তা বিধাতা। আপনাদের চাকরদের যা বেতন, বাড়ির যা ভাড়া, গোলাপের যা বাহার তাতে মনে হয় আপনাদের চাকর-বাকরদের মোটা মাইনেপত্তর, বাড়িভাড়ার পেছনে অ্যাতো খরচাপাতি, সখের বাহারি গোলাপ ঝাড়ের দৃশ্য প্রতিমুহূর্তে মনে করিয়ে দেয় আপনাদের সবচেয়ে নিচু তলার কর্মচারীরাও আমাদের থেকে কত বেশি সুখে আছে, আর এটাই আমাদের আঁতে সপাটে চাবুক চালিয়ে যায়।
সত্যি বলতে কী, আমরা যা দেখেছিলাম সমস্তটাই আসলে চোখ ধাঁধানো ধাতুর পাত্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। এই তো কয়েক বছর আগে পর্যন্তও বার্মাকে কীভাবে সাহায্য করা হবে না করা হবে তাই নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কত কী জল্পনা-কল্পনা শুনতে পাওয়া যেত। আমেরিকান প্রেস এজেন্টের একটা বড়দল – দেখেশুনে তো সব সরকারি বেতনখোর বলেই মনে হয়েছিল – কাতারে কাতারে এসে ভিড় জমিয়ে দিয়েছিল রেঙ্গুনে – সুযোগ পায়নি এই যা বাঁচোয়া নইলে বাড়ির টঙে উঠে বার্মার প্রতি প্রেমকাতুরে আমেরিকার অবিশ্বাস্য সাহায্য বিষয়ক কথার ঠেলায় চিল-চিৎকারে আকাশ ফাটিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কসুর করত না। যাই হোক, ব্যাপারটাকে আমি মোটেও হাওয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছি না, সাহায্য-টাহায্য বলতে যা বোঝায় তা হয়তো ছিল, হতে পারে একটু বেশি রকমেরই ছিল, কিন্তু তাতে কী, এখানকার লোকজনেরা ইহজন্মে ওসব কখনও চোখে দেখেছে না কানে শুনেছে, মাথামুন্ডু কিছুই তো ছাই বুঝতে পারে নি; এবং যে কয়েকটা ক্ষেত্রে প্রেসের দালালরা ঘ্যানঘ্যান করে ঘিলুর দফারফা করে ছেড়েছিল, ভস্মে ঘি ঢালা ছাড়া আর কোন কাজে ওগুলো লেগেছিল শুনি।

আচ্ছা, এ ধরণের কোনও ঘটনা কি আপনি মনে করতে পারেন?

আলবাত, মনে থাকবে না আবার। কয়েক বছর আগেকার কথা, দশ লক্ষ ডলারের থেকে বেশি বই কম নয়, তার প্রায় তিনের চার ভাগ দামের একটা ড্রেজিং মেশিন (যার মাধ্যমে জল সেঁচে নিয়ে সমুদ্র বা নদীর তলা থেকে নানান ধরনের উপাদান উপরে তুলে আনার কাজ করা হয়) আমেরিকা থেকে বার্মায় আসছে, এই খবরটা শুনতে শুনতে কান একেবারে ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিল আমাদের। আর প্রেস এজেন্টদের যা গলাবাজি, রক্ষে করুন, বাপরে বাপ, ভাসমান এই চক্কর কাটা যন্ত্রটা নাকি বার্মার কাছে সাক্ষাত আশীর্বাদ স্বরূপ হয়ে উঠতে চলেছে। এটা নদীর পেটটাকে নাকি সাফসুতরো করে গভীরতাটাকে অনেকখানি বাড়িয়ে দেবে যাতে সমুদ্র থেকে দূর হওয়ার ফলে আমাদের বাজার যেসব এলাকাগুলোকে এতদিন কব্জা করতে পারছিল না, সেখানে জলপথে যোগাযোগটাও যেমন সহজ হয়ে যাবে, ব্যাবসা-বানিজ্যের মালপত্তর নিয়ে হাজির হতেও তেমন আর অসুবিধে হবে না।

বাস্তবিক, আমাদের দেশের জন্য এটা যে কতখানি জরুরি ছিল তা আমরাই জানি। আর এই সম্ভাবনাটির দিকে তাকিয়ে আমাদের বুক আশার এক অনাবিল আনন্দে কানায়-কানায় ভরে উঠেছিল। মাঝ-গেরস্ত চাষীরাও সাবেক আমল থেকে চলে আসা সেই একঘেয়ে ধ্যান-ধারণা ঝেরে ফেলে একটা নতুন কিছু করার স্বপ্নে মশগুল হয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল তাদের উৎপাদিত দ্রব্য এইবার বাইরের দুনিয়ায় মুখ দেখানোর একটা সুযোগ পাবে, নৌকা তৈরির কারিগরেরা তো যাতে আরো গভীর জলে চলতে পারে এমন সব নৌকার নকশা পর্যন্ত মনে মনে বুনে ফেলতে আরম্ভ করে দিয়েছিল। এইসা নৌকা বানাতে হবে, যাতে আগের চেয়ে ভার বেশি হলেও কখনও যেন বেতাল-বেচাল না হয়।

অবশেষে অপেক্ষার নটে গাছটি মুড়লো, যন্ত্রটার সম্প্রদানের দিন এসে উপস্থিত। আহা, যন্ত্রটা এখানে এসে পৌঁছাবে আর এই বিরল দৃশ্যটার কেউ সাক্ষী থাকবে না সে আবার হয় নাকি, ওহে যত পারো গাদাগুচ্ছের লোকজনকে ডেকে এনে হাজির করাও আগে, আমেরিকানদের সত্যি জবাব নেই ভাই, প্রধানমন্ত্রীকেও ছাড়ে নি, বুঝিয়েসুঝিয়ে কীভাবে জানি না ওনাকেও রাজি করিয়ে ফেলেছিল তারা। লোকাল প্রেসগুলো তাদের রিপোর্টার ও ফোটোগ্রাফারদের পাঠিয়ে দিয়েছিল। পুরো ঘটনাটা যাতে রেডিয়োয় সম্প্রচারিত করা যায় তার জন্য USIS তো টেপ রেকর্ডার নিয়েই হাজির।
এরপর যা হল সে এক বৃত্তান্তই বটে, যন্তরটাকে গুন টেনে যখন বন্দরে তোলা হল, দেখা গেল এর চেহারার যা ছিরি, কমসেকম পঁচিশ বছরের বুড়ো মাল বললে খুব একটা ভুল হবে না। জং-ধরা ওই ঝুনো চিজটা আসলে জাপানের, ঘসে-মেজে খানিক ভোল পাল্টিয়ে হাতফেরতা হয়ে তারপর এখানে এসে পৌঁছেছে। গোদের ওপর বিষের ফোঁড়া, ল্যান্ড কানেকশন ছাড়া এর নাকি আবার নিজের গতরটাকে নাড়ানো-চাড়ানোরও দম নেই। এসব দেখেটেখে লোকজনের মন একেবারে চুপসে গেল। কিন্তু কিসসা এখানেই খতম নয়, তাদের কপালে আরো কিছু ভোগান্তি তখনও বাকি ছিল। যন্ত্রটার সঙ্গে যে সমস্ত আমেরিকান বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও ওটাকে চালু তো করতে পারলেনই না, এমনকী জাপানি দল যাদেরকে আকাশপথে উড়িয়ে এনে এই কাজে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, হাল ছেড়ে দিল তারাও। ফলে অবস্থার গতিক যেভাবে একটা বিচ্ছিরি মোড় নিল, তাতে সারা মুখে চুন-কালি পরবার জোগাড়। এই যে আমেরিকান সহায়তা নিয়ে রঙ চড়ানো গাদাগুচ্ছের এত সব বুকনিবাজি, আর তারপর চোখের সামনে কী দেখা গেল, স্রেফ জলজ্যান্ত একটা প্রহসন, স্বাভাবিক, বার্মিজদের মনটা তেতো হয়ে গিয়েছিল, কারো কারো মধ্যে তো আবার সন্দেহের ধোঁয়াও ক্রমশ পাকিয়ে উঠছিল।

১৯৫৩ সাল নাগাদ একদিকে বার্মার অর্থনীতি যেমন টালমাটাল অন্যদিকে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের ক্ষেত্রে অভাবটাও ছিল ভয়াবহ। তা সত্ত্বেও আপনারা, মার্কিনদের সমস্ত সাহায্য ছাঁটাই করে দিয়েছিলেন। কেন বলুন তো? মানে, এর পিছনে কী কোনও কারণ ছিল?

প্রথম কারণ, আপনাদের ওই যে কলার-তোলা ফক্কা গেরামভারি ভাবটা, ওটা ঠিক আমাদের হজম হত না। এমনকী আপনারা মানে আমেরিকানরা বার্মাটাকে মৌজমস্তি করার এক মোক্ষম জায়গা ছাড়া আর কিছু ভাবতেন বলে তো আমার মনে হয় না। দ্বিতীয়ত, ওই ভাগাড় থেকে জোগাড় করে আনা ড্রেজিং মেশিনটার মতন আরও কত যে বেয়াক্কেলে খেলকুঁদ দেখিয়েছিলেন আপনারা তার তুলনা হয় না। আমরা তো আকছার একথা শুনতে পেতাম, খোলামকুচির মতো মার্কিন রেস্ত-র রমরমায় বার্মা নাকি ভেসে যাচ্ছে, কিন্তু কোথায় কী, কোমর বেঁধে সাহায্য করার মতো তেমন কিছু তো আমাদের নজরে পড়ে নি। কী জানি আমাদের চোখেই কোনও ব্যামো হয়ে থাকবে হয়তো! তৃতীয়ত, KMT-র ঘটনাটা আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই, ওটা আমাদের মেজাজ বিগড়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।

KMT-র আবার কী ঘটনা? কিছু জানি না তো!

১৯৪৭ সালের ঘটনা, চীনা লাল ফৌজ জাতীয়তাবাদীদের গো-হারান হারিয়ে দেওয়ার পর বলতে গেলে চিয়াং কাই শেকের প্রায় হাজার দশেকের মতো সেনা-সামন্ত চীন থেকে পাততারি গুটিয়ে সদলবলে পালিয়ে এসেছিল আমাদের এই বার্মায়। ঘাঁটি গেড়েছিল দেশটার ওই উত্তর-পশ্চিম দিকটাতে। আমরা নিজেরাই তো তখন জাতি হিসেবে নতুন, কী আর এমন অভিজ্ঞতা, নিজেদেরই হাজার-গন্ডা সমস্যা নিয়ে আমাদের যাকে বলে একেবারে ল্যাজেগোবরে অবস্থা, তা এই সব ভিনদেশি সেনাদের নিয়ে যে মাথা ঘামাবো তার আর সময় কোথায়। তবে, চীনা জাতীয়তাবাদী সেনাদের বরাতে দানাপানি যাই জুটুক না কেন তারা কিন্তু এখানকার মাটি কামড়েই পড়েছিল, একচুলও নড়েনি কোথাও। এইভাবে যদি সেনাদের দেশের বাইরে বিদেশ বিভুঁইয়ে বেঁচেবর্তে থাকতে হয় তাহলে অত ভাবনা-চিন্তা করলে কী আর চলে, সোজা পথে হোক বাঁকা পথে হোক টাকা-পয়সার জোগাড়-যন্ত্র তো কিছু করতে হবে নাকি, কী বলেন। অগত্যা ওই চিনা জাতীয়তাবাদী সেনারা প্রথম প্রথম আফিমের ব্যবসা ফেঁদে বসল, কিন্তু তাতে আর জুত করতে পারল কোথায়, শেষে আর কোনও উপায় হাতের সামনে না পেয়ে তারা বেছে নিল ডাকাতির রাস্তা। তখন ১৯৫২ চলছে, চিয়াং কাই শেক বিমান বোঝাই করে তাদেরকে ঢালাও পরিমানে পাচার করতে শুরু করে দিলেন। ওঁনার ওইসব প্যাঁচ-পয়জার বুঝতে একটুও দেরি হয়নি আমার – আসলে তিনি চিনা কমিউনিস্টদের ভরপেট্টা নাকানি-চোবানি খাওয়াতে চেয়েছিলেন। আর এটাও অবশ্যি হক কথা, এই যে আমাদের দেশে তাঁর সেনারা থাকছে, সেই অধিকারটা তিনি কোথ্থেকে আদায় করলেন শুনি, মামদোবাজি নাকি? এমন সময় বলা নেই কওয়া নেই একটা খবর যেন চিলের মতো ভেসে এল, এই সব সেনারাই কিনা মার্কিন লটবহর সঙ্গে গায়ে মার্কিন উর্দি চড়িয়ে টহলদারি করে বেড়াচ্ছে। আমি জানতাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, ওদের পাঠাচ্ছে আসলে, চিয়াং কাই শেক, নিজে।

(চলবে)

এই লেখাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাইলে আমাদের দুটি ফেসবুক আছে। এর যে-কোনো একটিতে ক্লিক করে মন্তব্য করুন

তীরন্দাজ Teerandaz
Teerandaz Antorjal

আগের পর্বগুলি পড়তে চাইলে এই লিংকে ক্লিক করুন
অনূদিত উপন্যাস

Share Now শেয়ার করুন