উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১৮]

0
68

পর্ব ১৮

যতদূর মনে পড়ে, এখানে বার্মায় ভিক্টর লাসিওভস্কি বলে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তার একটা ছোটখাট পদও ছিল – আমার ধারণা সেকেণ্ড সেক্রেটারি। বাস্তবিক তিনি রাষ্ট্রদূতকে সর্বদা ছায়ার মতন অনুসরণ করতেন, নেহাত মামুলি হলেও, এই যেমন ধরুন তাঁর জন্য দরজা-টরজা খুলে-টুলে দেওয়া এই ধরনের কাজ আর কী, নিজেই করতেন। পার্টিতে বেশি সময় ব্যয় করা, নৈব নৈব চ। তিনিই ছিলেন রাশিয়ান টাস্কফোর্সের প্রকৃত মগজ, কুশলী নেতা এবং তিনি বর্মী শক্তির পুরোটাই রাশিয়ার পক্ষে কাজে লাগাতেন।

গোটা চালচিত্রটা বার্মা ইউনাইটেড নেশনসকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছিল, আমেরিকারও কোনও ওজর-আপত্তি ছিল না – তবে একটাই শর্ত, ওই সৈন্যরা যে আদপেই চীনা জাতীয়তাবাদী কিনা সেটা নিয়ে নাকি ধন্দ এখনও কাটেনি আর আমেরিকান উর্দি সম্পর্কে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হবে। যদিও, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কারোর কাছেই এটা অজানা ছিল না। আমেরিকান লোকজন ছাড়া প্রত্যেকেই ঘটনাটা জানত। কেবল তাদেরই বলা হয়নি।

যখন আমরা বললাম, এর সঙ্গে জড়িত থাকা দেশগুলোর নাম বেঁফাস হয়ে গেলে কোন এমন আকাশ ভেঙে পড়বে যে টুঁ শব্দ অব্দি করা যাবে না, এর লাভের লাভ যা হল, একটা চাপা হুমকিও শোনা হয়ে গেল তাঁদের মুখ থেকে, তাহলে আর কী, নিজেদের রাস্তা নিজেরাই মেপে নেবেন বরং, মার্কিন সাহায্য পাওয়াটা অত সস্তা নয়।

বিশ্বাস করুন, এ সবই আমাদের শুনতে হয়েছিল। একে কানাকড়ির বেহাল অবস্থা, টেকনিক্যাল দিকটাকে নিয়েও নাজেহালের একশেষ, কি করলে একটু সাহায্য পাওয়া যাবে এই ভেবে-ভেবে নাওয়া-খাওয়া-ঘুম সব লাটে উঠে গিয়েছিল, তবু আমেরিকানদের আমরা বলতে বাধ্য হয়েছিলাম, ঘাট হয়েছে বাপু আর নয়, আপনাদের সাহায্যের বোঁচকা-বুঁচকি বেঁধে মানে-মানে বিদেয় হন তো এবার। আসলে আমরা, এশীয়রা যাকে বলি, মান ও মুখ রক্ষা সেটা করতেই হত। অথচ, অবাক কারবার, আমাদের মুখের হাব-ভাব, চালচলনের ধরন-ধারন, যা আমাদের বেঁচে থাকার মূল ছন্দ, সেটা কিন্তু রাশিয়ানরা এক্কেবারে হাতেনাতে ধরে ফেলেছিলেন।

আচ্ছা, বেশ, কিন্তু এখন কী আপনারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও টেকনিক্যাল সহযোগিতাকে স্বাগত জানাতে পারবেন?

হ্যাঁ। আমার ব্যক্তিগত মতামত জানতে চান তো বলি – ইন্দোনেশিয়ায় ফোর্ড ফাউন্ডেশন যেভাবে কাজ করেছিল এখানেও টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের দিকটা ঠিক সেভাবেই তদারকি করা উচিত। ফোর্ডের লোকজন অন্ধ নয়, লক্ষ করেছিল, তাদের মোটর গাড়িগুলো ইন্দোনেশিয়ায় আনা ইস্তক গাড়ির অসুখ-বিশুখ যাই হোক না কেন ওই ডাচ গ্যারেজগুলোতে যাওয়া ছাড়া গতি ছিল না কোনও। কিন্তু কেমন করে ওইসব গাড়ি সারাই-টারাই করতে হয় তার থোরাই কিছু জানতো ইন্দোনেশিয়ানরা। পরে ফোর্ড ফাউন্ডেশন যখন একদল ইন্দোনেশিয়ানকে নিয়ে গেল আমেরিকায়, তারা কী পড়বে না পড়বে, কোন যন্ত্র কিনতে গেলে কত গচ্চা যাবে সেসব হিসেব-নিকেশ সম্পর্কে ফাউন্ডেশন কিছুই শিখিয়ে পড়িয়ে দেয়নি। বরং উল্টো বলেছিল, তোমরা নিজেরাই বরং সব ঘুরেটুরে দেখেটেখে নাও, যেটা কাজে লাগবে বলে মনে হবে, কিনে ফেলবে, এতে অ্যাতো ভাববার কী আছে। ইন্দোনেশিয়ানদের প্রথম দলটা একটা গ্যারেজ দেখিয়ে বলেছিল, এ ধরনের কোনও ব্যবস্থা হলে কিন্তু বেশ হয়। ফল একেবারে হাতেনাতে, অবিকল ওই রকমের এক গ্যারেজ তারা বানিয়ে দিয়েছিল ইন্দোনেশিয়ায়। যতদিন না পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ানরা কলকব্জাগুলোকে ঠিকঠাক নিজেদের বাগে না আনতে পারছে, অন্য কারও মদত ছাড়াই, গাড়ি মেরামতির কাজে পাকা কারিগর হিসেবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে, ততদিন মার্কিন মেকানিকেরা সমানতালে তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেটে গেছে। তারপর সময় বুঝে তারা ফিরে গিয়েছিল নিজেদের আস্তানায়। ঠিক এ ধরনের সহযোগিতাই আমরা চাই।

ধরে নিন, আপনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকানদের মান-সম্মান বাড়ানোর দায়িত্বটা যদি আপনার কাঁধে এসে পড়তো, কী করতেন তখন?

তাহলে, একটা গল্প বলি আপনাকে। এই তো বছর কয়েক আগে দুজন আমেরিকান – মার্টিন নামের স্বামি-স্ত্রীর এক পরিবার – সাময়িক উপদেষ্টা হিসেবে এসেছিলেন বার্মায়। দুজনেই কিন্তু বেশ চাপা স্বভাবের, কজন লোক আর তাদেরকে চিনতো, কোনওরকম টুঁ শব্দটিও কী শুনতে পেয়েছিল কেউ, তারা উত্তর থেকে রওনা হয়ে সোজা শান স্টেটসে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন, ভুলে গেলে চলবে না ওই এলাকাটা তখনও অব্দি কিন্তু আদিমতার বুনো খোলস পুরোপুরি ছাড়িয়ে উঠতে পারেনি। এই ধরুন কোনও প্রচার পুস্তিকা, ইস্তেহার, সিনেমা-টিনেমা গোছের তেমন কিছু কিংবা প্রেস এজেন্টদের রকমারি সাজসরঞ্জাম যা আমরা দুচোখে দেখতে পারি না আর বেশিরভাগ আমেরিকানদের যেসব জিনিস ছাড়া এক পাও নড়বার জো নেই বলেই জানতাম, সেসবের ছিঁটেফোঁটাও তাঁরা বয়ে আনেননি। সঙ্গে কোনও গাড়ি কিংবা চাকর-বাকরও ছিল না। ছোট্ট এক শহরে নেহাতই সাদামাটা বাসা তাদের, দিনগুলোও কেটে যাচ্ছিল নিয়মমাফিক যেমনটা যায় আর কী।

মার্টিনরা বর্মীতে কথা বলতে পারতেন – বার্মায় কজন এমন আমেরিকান আছেন দেখাতে পারবেন, ধরাবাঁধা ছকে এঁদেরকে মেলানো যায় না – তাই তাঁদের ঘরে বার্মিজদের আনাগোনা প্রায় লেগেই থাকত। কথাবার্তা চলত যেন নিকট আপনজনের মতোই। বাড়িতে মাঝে মধ্যে অতিথি হিসেবে যারাই আসতেন, দুটো জিনিস দেখার পর বিস্ময়ে তাদের চোখের আর পলক পড়ত না। এক, বাগানে চোখ টাটানোর মতো প্রমাণ আকারের সব ফলমূল-শাকসব্জির হৃষ্টপুষ্ট চেহারা, সেসব তারা নিজেরাই ফলিয়ে ছিল; দুই, বিশাল চৌহদ্দি জুড়ে বাগানের গোটা এলাকাটা। তারা অবাক হয়ে জানতে চাইত, মানুষ তো মোটে দুজন, এত খাবার কোন কাজে লাগে! বাস্তবিকই পুরোটা তারা খেতে পারতেন না এবং বাদবাকিটা নষ্ট হত।

মিসেস মার্টিন তাদেরকে তার রান্নাঘরে নিয়ে গেলেন, খাবার-দাবার সংরক্ষণের একটা ঘরোয়া ব্যবস্থা দেখালেন। আরে সাতজন্মেও যারা এসব দ্যাখেট্যাখেনি, তাদের তো আজব লাগবারই কথা, ইটা আবার কী জিনিস বটেক? একটা দিনেরও কামাই নেই, ফল-সব্জি সংরক্ষণের কেরামতিটা না দেখতে এলে যেন তাদের পেটের ভাত কিছুতেই হজম হত না। আর মাসখানেক কেটে গেলে তারপর, সংরক্ষণ পাত্রটি যখন খোলা হল, ভানুমতির খেল নাকি রে বাবা, বার্মিজরা দেখল খাবার-দাবার যা কিছু রাখা হয়েছিল, দিব্যি সব বহাল তবিয়তেই আছে তো, খাওয়া যেতে পারে অনায়াসে।

এই যে দুই আমেরিকানের গল্প শুনছেন, এদেরকে দেখুন একবার, গোটা শহরটার সমস্ত জনতার ভেতর ভাল জাতের বীজের বিলি ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করেই ক্ষান্ত থাকেননি, একসঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কীভাবে সংরক্ষণের পরিকল্পনাটাকে স্বার্থক রূপ দেওয়া যেতে পারে সে ব্যাপারেও এগিয়ে এসেছিলেন নির্দ্বিধায়। যদিও উৎপাদনের বেশিরভাগটা এখনও গ্রামের মানুষেরা একার ভরসাতেই করে থাকে আর ঘরে ঘরে সংরক্ষণের ব্যবস্থাতেও যত্নের কোনও খামতি নেই; তবে তফাত এটাই যে আজ তারা কেবলমাত্র নিজেদের কথাই ভাবেন না, অন্যদের চিন্তাও মাথায় রেখে দেন, বাড়তি পণ্য মজুদ করে রাখে। এখন এই গ্রামটাই জাতীয় খাদ্য সংরক্ষণ কেন্দ্র, বিশ্বাস হয় আপনার, মাংস, ফলমূল, শাকসব্জি তো আছেই, এছাড়াও কত কী যে রকমারি পছন্দের বার্মিজ খাবার দাবার ওরা তৈরি করে কী বলবো।

শান স্টেটসের এই যে এলাকাটা দেখছেন, পুরোটাই মার্কিনপন্থী, আর এর পেছনে কাদের অবদান আছে জানেন, একমাত্র মার্টিনদের। আসলে তাঁরা বার্মায় আমাদের সাহায্য করতেই এসেছিলেন, নিজেদের জীবনযাপনের স্ট্যাটাস বাড়ানোর জন্য আসেননি।

দেখুন, আপনাদের কাজকর্মের ফলাফল যদি চোখেই না দেখতে পেলাম, মানুষের কোনও ধম্মেকম্মেই লাগলো না, তাহলে বেকার ওসব প্রচার-ট্রচারের কপচানিতে কার কোন উবকারটা হবে শুনি। মাথায় রাখবেন, কোনও ভাল স্যুপের পাত্র থেকে যে ধোঁয়া ওঠে, সেটাই কিন্তু তার সেরা বিজ্ঞাপন।

আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলে কী করতাম, এটাই আপনি জানতে চেয়েছিলেন তো। আমি ঠিক এটাই করতাম : দলে দলে মার্টিনের মতো লোকজনকে পাঠিয়ে দিতাম বার্মায়। এটাই আপনাদের প্রয়োজন। ভুলে যান ওই সব তাবড় তাবড় প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব, পিএক্স, প্রতিনিধি দল কিংবা পরিষেবা বাহিনীর কথা, বাইরে আমেরিকানদের ঠেকনা দিতে ওদের কাজে লাগলেও লাগতে পারে। আপনাদের লক্ষ লক্ষ ডলার বেঁচে যাবে মশাই, সবার ওপরে ডলার সত্য তাহার উপরে নাই, আপনারা তো ভাবেন ডলারের পর ডলার খসালেই মার্কিন কর্মসূচিগুলো রোখে কার সাধ্য।

আপনি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, রাশিয়ানরা বিদেশে নাকি ঠিকঠাক ভাবেই তাদের কাজকর্ম করে থাকেন। এর কোনও ব্যাখ্যা আছে আপনার কাছে?

দেখুন, রাশিয়ানরা হল গিয়ে খাস পেশাদারের জাত। বছর পাঁচেকের মতো লম্বা একটা সময় ধরেও তাঁরা তাঁদের লোকজনকে বার্মাতেই লাগিয়ে রেখেছেন এমনটা তো দেখাই যায়। বর্মী ভাষাটাও সবার নখদর্পণে। নিঃশব্দে পড়াশোনা করে যান আর কোনরকম হম্বিতম্বি ছাড়া শান্তভাবে জীবনযাপন করেন। কোনও বর্মী চাকর রাখেন না, তাই তাঁদের নামে গুজব ছড়ানোরও কেউ থাকে না। তাঁদের চাকর বলুন বাকর বলুন, সব রাশিয়ান।

রাষ্ট্রদূতের জনপ্রিয়তা কাকে বলে যদি দেখতে চান তো রাশিয়ান সোসাইটিতে দেখে নিন, চক্ষু সার্থক হয়ে যাবে। ককটেল পার্টিগুলোতে যাওয়ার একছত্র অধিকার কেবল ওনারই আছে। তাছাড়া খোঁজ নিলে জানতে পারবেন, রাশিয়ান টিমে সবসময় এমন একজন প্রফেশনাল এক্সপার্টকে রাখা হয়, যিনি এলাকার খবরটবর যেমন রাখেন তেমনি ক্ষমতার সুতোটাও বাঁধা থাকে তার আঙুলের ডগায়। যতদূর মনে পড়ে, এখানে বার্মায় ভিক্টর লাসিওভস্কি বলে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তার একটা ছোটখাট পদও ছিল – আমার ধারণা সেকেণ্ড সেক্রেটারি। বাস্তবিক তিনি রাষ্ট্রদূতকে সর্বদা ছায়ার মতন অনুসরণ করতেন, নেহাত মামুলি হলেও, এই যেমন ধরুন তাঁর জন্য দরজা-টরজা খুলে-টুলে দেওয়া এই ধরনের কাজ আর কী, নিজেই করতেন। পার্টিতে বেশি সময় ব্যয় করা, নৈব নৈব চ। তিনিই ছিলেন রাশিয়ান টাস্কফোর্সের প্রকৃত মগজ, কুশলী নেতা এবং তিনি বর্মী শক্তির পুরোটাই রাশিয়ার পক্ষে কাজে লাগাতেন। খুব বেশি দিন হয়নি, ল্যাসিওভস্কির তো এখন বদলি হয়ে গেছেন থাইল্যান্ডে। আমার অনুমান, খুব শিগগির আমেরিকা সেখানেও পাকেচক্রে কোন না কোন ঝুট-ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে, দেখে নেবেন মিলিয়ে।

আচ্ছা, আর্থিক সাহায্যের দিক থেকে কি তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে রাশিয়া আপনার কাছে বেশি ভরসাযোগ্য বলে মনে হয়?

না, ঠিক তা বলছি না। তবে হ্যাঁ, স্বীকার করছি, তারা যাই করুক না কেন, সেটা কিন্তু সাদা চোখে দেখতে পাওয়া যায়, খালি হাত-পা ছুঁড়ে গলাবাজি করেই থেমে থাকে না, কাজটাও করে। যেমন ধরুন, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়ান পরিবহন বিমানে চড়ার ব্যাপারটা – স্তালিনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিশেষ ভেট। এমনটা মোটেও ভাববেন না, ওই উপহারটা কেবল বর্মীদের মনেই দাগ কেটে ছিল, গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর তা কতখানি ছাপ ফেলেছিল, ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয়।

রাশিয়ানরা আমাদের একটা স্পোর্টস স্টেডিয়াম তৈরি করে দেবে বলে কথা দিয়েছিল – আপনি তো জানেন খেলাধুলোর ব্যাপারে আমরা একেবারে জাত-পাগল যাকে বলে – আর হ্যাঁ, সেই সঙ্গে একটা হাসপাতাল আর ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য একটা গ্র্যাজুয়েট স্কুল। আমরা এখনও সেগুলো পাইনি। কিন্তু এই ধরনের প্রোজেক্টগুলো বুঝবার জন্য মানুষদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয় না, জলবত তরলং, আর তাই সেগুলো কবে পাওয়া যাবে, হাড়-হাভাতেদের মতো একবুক আশা নিয়ে তারা অপেক্ষা করে দিনের পর দিন। এবং যদিও আমরা সকলেই রাশিয়ান ও চীনা কমিউনিস্টদের সম্পর্কে বেশ সন্দেহ পোষণ করি, কিন্তু তবুও এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো সাধারণ লোক আর তরুণ বুদ্ধিজীবী সব্বার আলোচনার বিষয় রাশিয়া কী করছে।

কালচারের ব্যাপার-স্যাপারেও, কমিউনিস্টরা বেশ ঝানু। এই ধরুন না আমাদের স্বাধীনতার দশম বছর পূর্তির অনুষ্ঠানটি যেভাবে উদযাপন করল ওরা, সত্যিই একেবারে তাক লাগিয়ে দেবার মতো। আপনি এর সঙ্গে খ্রিস্টমাস, নববর্ষ, ইস্টার, ফোর্থ জুলাই এসবের তুলনা টানতেই পারেন, অসুবিধা নেই এই একের মধ্যেই আছে হাজারো কিসিম। কী ছিল না সেখানে আমাদের গর্বের কুচকাওয়াজ থেকে শুরু করে আগাপাশতলা সমস্ত কিছু। যত কমিউনিস্ট জাতি সক্কলেই ভেলা, মল্ল নাচিয়েদের নিয়ে এই কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করেছিল। বড় বড় পতাকায় ঔপনবেশিকতা থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিল তারা। সে এক বিশাল ব্যাপার। কিন্তু, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তো মিছিলের ম-ও ছিল না।

এই ধরুন, আপনাদের মধ্যেই যদি কোনও আমেরিকান খানিক কষ্ট করে রেঙ্গুন ছাড়িয়ে দেশের এলেবেলে জায়গাগুলোতে একটুআধটু ঢুঁ মারেন, দেখবেন, সেখানে আনাচেকানাচে রাশিয়ান সার্কাস আর চীনা আমোদ আহ্লাদের হরেক বন্দোবস্ত আছে। না, আমি অস্বীকার করছি না, আপনারা বেন্নি গুডম্যানের মতো হাইফাই সব তারকা এবং কিছু মঞ্চ-কাঁপানো গায়িকা পাঠিয়েছেন, নিঃসন্দেহে তারা স্বাগত – কিন্তু মুশকিল কী জানেন, তারা কেবল রেঙ্গুনেই গায় আর ওই হাতেগোনা গুটিকয়েক বড়লোক যাদের ট্যাঁকের জোর আছে, তারাই শুধু দেখতে পায়। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে যাচ্ছিলাম আমি, আপনারা একটা ভাঙা কাচের প্রদর্শনী করেছিলেন আমাদের জন্য। কাণ্ডটা ভাবুন, আমরা হলাম এমন জাতি যারা প্রায় গুড়িঁয়ে যেতে বসেছি, নিজেদের ধুকপুক করা অস্তিত্বটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে লড়ে যাচ্ছি আর আপনারা কিনা সেখানে আমাদের ভাঙা কাচের দেখনদারি দেখাতে ব্যস্ত।

আশা করি, আপনি আপনার জবাব পেয়ে গেছেন। শেষমেষ আমার একটাই কথা বলার আছে – দেখুন এশিয়ায় আপনাদের জন্য এমন কিছু আমেরিকান লাগবে যাদের ভালো প্রশিক্ষণ-টশিক্ষণ আছে, কাজের জন্য জানপ্রাণ দিতে পারে, এমন জনাকয়েক খাঁটি লোক। হ্যাঁ, মাথায় রাখবেন, জবরদস্ত প্রশিক্ষণ তো লাগবেই আর তার সঙ্গে ওই যে বললাম, জানপ্রাণ কিন্তু এক করে দিতে হবে। অধস্তনেরা না হয় মাঝারি গোছের হোক, কিন্ত যারা মাথায় থেকে নেতৃত্ব দেবেন তাদের মানটাও তো সেরকম হতে হবে, যাতে তারা নিজেদের পাশাপাশি তাদের নীচের তলার কর্মীদেরও বর্মী হালচাল, কালচার, অভ্যাসটভ্যাস সব কিছুর সঙ্গে মানানসই করে তুলতে পারে। সে-যোগ্যতা তাদের থাকতে হবে বৈকি।

আসলে, বেশিরভাগ আমেরিকান রাষ্ট্রদূত থেকে শুরু করে সামরিক নেতা কিংবা উঁচুপদের আর্থিক উপদেষ্টা কিংবা সাউথ এশিয়ায় যেসব মার্কিন সাংস্কৃতিক লোকজনকে পাঠানো হয় – যাদের কথাই বলুন না কেন, জানি তো সব্বাইকেই। এদের মধ্যে পেশাদার অপেশাদার দুরকম লোককজনই আছে। আমি কেবলমাত্র দুজন রাষ্ট্রদূত, একজন সাংস্কৃতিক নেতা আর একজন প্রশাসনিক মানুষ এই হাতেগোনা কয়েকজনের কথা মনে করতে পারি, যারা রীতিমতো প্রশিক্ষিত পেশাদার এবং যাকে বলে কাজ-অন্ত-প্রাণ ছিলেন। ওদিকে দেখুন, রাশিয়ান শাসন কার্যের হত্তাকত্তা তাদের মধ্যে নয় নয় করে নব্বই শতাংশই পেশাদার – এখন পরে কী হতে পারে সেসব তো ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু তাদের কাছ থেকে ভালো জিনিসটা শেখার মতো মানসিকতাই যদি না থেকে থাকে, তাহলে একথা হলফ করে বলতে পারি আপনারা প্রতিযোগিতার গোড়াতেই হেরে যেতে বাধ্য।

তবুও বলছি, আমার বিশ্বাস, আমেরিকানদের যদি সত্যি সত্যি আন্তরিক চেষ্টা থাকত আর ওই ছোট-বড় চোখে না দেখে আমাদের সঙ্গে সমানে সমানে মিলেমিশে থাকতে চাইত, তাহলে তো কোনও চিন্তাই ছিল না। স্রেফ কয়েক বছরের মধ্যে আপনারা তুড়ি মেরে এশিয়া থেকে কমিউনিস্টদের সাফ করে দিতে পারতেন। হ্যাঁ, অবশ্যই যদি আপনাদের কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতি থেকে থাকে, তবেই। আর সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল, আমরা আমেরিকানদের কাছ থেকে আমেরিকানদের মতোই আচরণ চাই। সত্যিই সেই আমেরিকানদেরই ভালোবাসি যাদের সঙ্গে একসময় আমরা আমেরিকায় মুখোমুখি মোলাকাত করেছিলাম।

রাতের খাওয়াদাওয়া মেটার পর ইউ ম্যাং স্বে আর গিলবার্ট ম্যাকহোয়াইট হাঁটতে বেরোলেন। এমন অনেক কোমল রাত আগেও এসেছে, প্রতিটি সূক্ষ্ম শব্দও যেন কোন গহীন সুদূরের ডাক বয়ে আনে, অরণ্য থেকে ভেসে আসে নাম না জানা ফুলের আশ্চর্য সুগন্ধ।

“সারখানের কী খবর ম্যাং?” হঠাৎই প্রশ্ন করে বসলেন ম্যাকহোয়াইট। “কী করা উচিত আমার?”
“কী ব্যাপারে বলুন তো?”
“এই ধরো যে-কোনো বিষয়ে, সে-বড় ছোট যাই হোক না কেন।”
মুহূর্তের জন্য থামল ম্যাং। মৃদুমন্দ বাতাসে তখন দূরে কাঁসরঘণ্টার ধ্বনি।
“গিলবার্ট, আমি একবার একজন আমেরিকানের কথা শুনেছিলাম, সারখানে গুঁড়োদুধের কারখানার কাজ করছিলেন।” ম্যাং বলল। “প্রথমে সারখানরা যাতে দুধের স্বাদ আরো বেশি করে পছন্দ করে তার চেষ্টা করেন, তারপর বেশ কিছু দুধেল গবাদি পশুর আমদানি করেন, এবং সবচাইতে নজরে পড়ার মতো বিষয় কী জানেন, আঁটঘাট বেঁধে স্বনির্ভর ব্যবস্থার ভিত্তিতে ব্যবসাটা দাঁড় করিয়ে তবে ছাড়বেন। ভাববেন না বিদেশিদের জন্য কোনো ছাড়টাড় ছিল। আগাগোড়া জিনিসটাই ছিল সাদামাটা আর চালানোও তো কিছু কঠিন ছিল না।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, দিব্যি মনে করতে পারছি। রিপোর্টগুলোতে তাঁর সম্পর্কে পড়েও দেখেছিলাম”, ম্যাকহোয়াইট বললেন। “ওই তো তিনি কী যেন একটা কেলেঙ্কারিতে ধরা পড়েছিলেন। মেয়েদের ধর্ষণ নাকি নেশার জিনিস পত্তর খাওয়ানো। এরকমই মনে হয় কিছু একটা।”
“শুনুন গিলবার্ট, ওগুলো আগাগোড়া সব মিথ্যে কথা। আমি কখনও মানুষটার সঙ্গে সামনা-সামনি দেখা করিনি, কিন্তু আমি তাঁর কাহিনির পেছনের সত্যটা খিঁচে বের করার জন্য রীতিমতো ঝামেলা বাধিয়ে দিয়েছিলাম। জানেন, ওটা কমিউনিস্টদের নিছক একটা বানানো ঘটনা, স্রেফ চোখে ধূলো দেওয়া। তিনি সারখানীয় ভাষায় কথা বলতেন, জান-লড়িয়ে কাজকম্ম করতেন, চারপাশের সব্বাই তাঁকে একেবারে নিজের মতো করে ভালোবাসত। অত্যন্ত বিচক্ষণ তিনি, ধারণাও ছিল স্বচ্ছ। নাম কোলভিন; আমার কী মনে হয় জানেন, একবার যদি তাঁকে ফিরিয়ে আনেন তিনিই পারবেন আপনার জন্য কাজ করতে, আমি নিশ্চিত।”
“তাই করব ম্যাং, দেখি যদি তাঁকে ফাঁকা পাই, তবে তো”, ম্যাকহোয়াইট বললেন।
“জিনিসগুলো সম্ভবত কিছুই না, ছোটখাট, কিন্তু কোলভিনের ধারণাগুলো বাস্তবিকই গোড়ার কথা বলে। আর যখন আমরা গোড়ার সমস্যাগুলোতে কেল্লাফতে করে ফেলি, তখন অনায়াসে মস্ত মস্ত কাজগুলোর দিকে এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু ভুললে চলবে না ছোটখাট সারখানীয় জিনিস দিয়েই আমাদের আরম্ভ করতে হবে।

তিন ঘণ্টা কখন যেন কেটে গেল, তাঁরা এইসব ঘুচঘাচ জিনিসের ওপরেই কথা বলে চললেন।

(চলবে)

এই উপন্যাসের পূর্ববর্তী পর্বগুলো পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করে পড়ে নিন >> কদর্য মার্কিন-এর সকল পর্বের লিংক

Share Now শেয়ার করুন