উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৫]

0
319

পর্ব ৫

অধ্যায়-৩

নয় সাকরেদ

ফাদার জন এক্স. ফিনিয়ান, এস জে – জন্ম ১৯১০ ওরসেস্টর, মাস। পিতা জন এক্স এবং মাতা মেরি ফিনিয়ান। তিন বোন, তিন ভাই। স্নাতক এ.বি., বোস্টন ইউনিভার্সিটি। এম. এ. ক্যাথলিক কলেজ, রোম, ১৯৪১। অ্যাপোলোজেটিকসের প্রোফেসর, সেন্ট মেরি’র, ১৯৪৩-৪৪। যাজক, ইউনাইটেড স্টেটস নেভি, ১৯৪৪-৪৭। ডি. ফিল. অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ১৯৪৭-৫০। গবেষণাপত্র- সেন্ট থমাস অ্যাকুইনাসের সামাজিক তত্ত্ব। বোস্টনের বিশপের অব্যবহিত ঊর্ধ্বতন যাজকের বিশেষ সহযোগী, ১৯৫০-৫১।
প্রকাশিতের তালিকা
নিবন্ধ – “The Agony of St. Therese : An Essay on the Modernity of Humanity”; “The Visions of St. Bernard: The Insights of Modern Psychology”; “The New Deal and Catholic Social Theory”; “Some Thoughts on the Strengths of Godlers Communism”; “Is Communism Godlers?”; “The Rising Threat of Communism”.
পুস্তক – “The Medieval Religious Vissions: A Social Interpretation; The Challange of Communism” 1951 ।
সাল ১৯৫২, সমস্ত দায়-দায়িত্ব কাঁধে চাপিয়ে, খ্রিস্টীয় সমাজের আমজনতার উকিল হিসেবে তাঁকে সটান বার্মায় পাঠিয়ে দেওয়া হল।
নিউ ইংল্যান্ডের এই অনাবিল আরাম ছেড়ে, দশ হাজার মাইল দূর বার্মায় পাড়ি দেবার জন্য প্রামাণ্যপত্রের নির্দেশক বাক্যগুলো পড়ে ওঠার পরেই, ফাদার ফিনিয়ানের মুখের হাসিতে নেমে এল এক নিবিড় প্রশান্তির ছায়া।
শরীর স্বাস্থ্যের দিক থেকে বিচার করলে ফাদার ফিনিয়ানকে হেলাফেলা করাটা নেহাত মুর্খামি হবে – টানা ছ’ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা; ফিনিয়ানকে বেঁটেখাটো লোকজনদের সঙ্গে কথা চালাতে গেলে সামনের দিকে ঠিক এতটাই ঝুঁকতে হত যে পিঠে প্রায় একটা কুঁজ গজিয়ে ফেলেছিলেন বলা যায়। তাঁর হাতদুটো নজরে পড়ার মতো, বেশ দীর্ঘকায়; এখন পেশি বেশ কিছুটা শিথিল হয়ে এলেও তাতে সামর্থের কোনও অভাব আছে বলে মনে হয় না। সেই ছেলেবেলা থেকে কী করেন নি উনি, আইসক্রিম বেচা থেকে শুরু করে রেলরোড এক্সপ্রেস থেকে বাক্স বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ, এমনকী সামান্য কিছু সেলেটের আশায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টনের পর টন কয়লা তুলে গেছেন মুখবুজে। আবার অক্সফোর্ডে থাকার সময়টাতে মারটন নাবিক দলের হয়ে যেভাবে দাঁড় টানতেন সবাই জানতো তার কোনও তুলনা হয় না। এই তো ছিলেন তিনি সবার কাছে।
নশ্বর মানব জীবন সম্পর্কে যাঁর হৃদয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, সেই ফাদার ফিনিয়ান, বার্মায় যাবার এই নিয়োগ বার্তাটিকে মনেপ্রাণে মেনে নিলেন। ধর্মীয় আনুকুল্যে সামান্য জলপানি বলতে যা বোঝায় তা নিয়মমাফিকই পেয়ে যেতেন, খ্রিস্টান সমাজের সদস্যদের মধ্যে উপযুক্ত সম্ভাবনাময় বুদ্ধিজীবী হিসেবে যে তাঁকে দেখা হয় সে তথ্য তাঁর অজানা নয়, উপরন্তু তিনি যাজক তিনি বুঝতে পেরেছেন এশিয়ায় শুধুমাত্র তাঁর জন্যই কোনও বিশেষ কাজ অপেক্ষা করে আছে। তাই বাঁধভাঙা উদ্যমে স্বাভাবিকভাবেই তিনি বিষয়টাকে আঁকড়ে ধরতে চাইলেন , অবশ্য উদ্দীপনার বেশিরভাগটাই ছিল শারীরিক।
তিনি আগে থেকেই জানতেন সেখানে সমস্যার কোনও খামতি নেই, ক্ষুধা, দারিদ্র্য অথবা রাজনৈতিক পারস্পরিক মতবিরোধে সংবেদনশীল মানুষজনকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছে রাজনীতির মহামারী। রাজনৈতিক মড়ক সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার স্মৃতি তখনও টাটকা, প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি ঘটনা সমুলে গেঁথে আছে মনে।
ভাবতে বসলে মনে হয় এইতো সেদিনকার ঘটনা, তখন তিনি নেভির যাজক। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রাসেল আইল্যান্ড নামের এক ছোটখাটো পাহাড়ে একজোট হওয়া নৌ সেনাদের সঙ্গে খানিকটা কথাবার্তা হয়েছিল তাঁর। নিচে নারকেল গাছের সারি আর আধফালা চাঁদের মতো দেখতে বালির মাঝে রাখা এল সি আই-এর নীলচে ধূসর রঙের সাবেক আমলের জম্পেশভাবে ঢাকাঢুকি দেওয়া একটা জাহাজ ওই রাতেই সেনাদের নিউ জর্জিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।
তাদের ভিতরে এক যুবক নৌ সেনা অসাধারণ আগ্রহ নিয়ে একমনে যাজকের বাণী শুনে যাচ্ছিল। আধখোলা ঠোঁট, ঘাড় কাত করে প্রত্যেকটা বাচন শুনবার জন্য ঠায় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। ফিনিয়ানও গড়পরতা আর পাঁচদিনের তুলনায় স্বাভাবিক ভাবে যেন একটু বেশিরকমেরই উৎসাহ বোধ করছিলেন। ঈশ্বরের প্রতি আত্মত্যাগ, অহংকারহীনতা এবং বিশ্বাস ছাড়া জীবনের আর কোনও চিরস্থায়ী নিশ্চয়তা নেই – এসব নিয়ে একটানা অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিলেন।
বক্তব্য শেষ হতে দেখা গেল, সাধারণত তিনি যতটা না আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন তার থেকে ঢের বেশি তৃপ্তি নিয়ে নৌ সেনাদের মাঝ বরাবর সটান দ্রুত পায়ে হেঁটে গেলেন। যেতে যেতে বলে গেলেন-“এই বহিরাক্রমণের সময় ঈশ্বর আপনাদের সহায় হন।”
ছেলেটি প্রায় চমকে উঠে, তীক্ষ্ণ এক হ্যাঁচকা টানে নিজের মাথাটাকে টেনে তুলল। যাজক এক মুহূর্তে ভাবলেন, নাহ্, তেমন কিছু নয়, হতে পারে সে প্রোটেস্ট্যান্ট, এবং আকস্মিক একজন ক্যাথলিকের ডাকে নিতান্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে কেবল।
এরপর সেনাটি ঠান্ডা হিম চোখে তাকিয়ে উদ্ধত ভঙ্গিমায় মুখ থেকে একদলা থুথু ছুঁড়ে দিল মাটিতে। ফিনিয়ান আগাগোড়া গোটা ব্যাপারটাই যে বুঝতে ভুল করেছেন, গলদটা এক নিমেষে টের পেয়ে গেলেন। ছেলেটির চোখ কঠিন বরফের মতো; সে ঠোঁট টিপে কথা বলছিল –
“এই এল সি আই-এ আমাকে কিংবা অন্য কাউকে যত্নআত্তি করার জন্য কোথাও যে কোনও ইশ্বর নেই এটাই সত্যি। একথা আপনিও যেমন ভাল করে জানেন, আমিও জানি।”
নৌ সেনাটি তার আঙুলের ডগা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের যাজকের সোনার ক্রসটার ওপর হালকা একটা টুসকি মারল। “শুনে রাখুন ফাদার, আমি একজন সাচ্চা কমিউনিস্ট। আমি সেই ঈশ্বর-অভিশপ্ত হাড়হাভাতে আইল্যান্ডে যাব এবং জাপানিগুলোর হাড়মজ্জা চেবানোর পর একেবারে সিধে নরকে চালান করে ছাড়ব… তবে হ্যাঁ, না আপনার খাতিরে, না রাষ্ট্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ওইসব পেটমোটা নাদুশনুদুশ রোটারিয়ানদের কথা ভেবে যাব, যেতে হবে কারণ, কমিউনিজমের কাছে এটা কতটা জরুরি আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না।”
“ একবারটি শোনো বাছা, কমিউনিজম…”
“যে কথাটা আমাদের বলা উচিত ছিল আপনার, ফাদার, দ্বিতীয় ফ্রন্ট খুলবার জন্য আমরা এখনো কিসের অপেক্ষায় বসে আছি। সোভিয়েত রাশিয়া দিনের পর দিন রক্ত ঝড়াতে ঝড়াতে সাদা ফ্যাকাশে না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ছিনেজোঁকের মতো বেশিরভাগ লোভী পুঁজিপতিরা কেউ কেন ইউরোপ ফিরে যেতে চায় না, এর কারণ কী? আপনার মুখেই শুনি। ওসব ঈশ্বরে টিশ্বরে বিশ্বাস আপনার কাছেই রাখুন, আমাদের বলবেন না, তিনি কী সাহায্য করবেন ভাল করে জানা আছে। আমাদের নিজেদের সাহায্য নিজেদেরকেই করতে হবে”।
এর আগে ফিনিয়ানের সঙ্গে তো কম লোকজনের আলাপ পরিচয় হয় নি, কিন্তু কাঠখোট্টা মুখের এই ছেলেটি যেন বয়সের তুলনায় অনেক বেশি প্রবীন, প্রাজ্ঞ আর অদম্য ঋজু। কই কোথাও তো ঠিক এমনটি তাঁর নজরে কখনও পরে নি। সে যেন শব্দ, যুক্তি, আবেগের আবেদন এই সব সাদামাটা জগতের থেকে ঢের ঢের বেশি উর্ধে।
ঘটনাটা ভুলে যাওয়া ফাদারের পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। ছেলেটির চোখমুখ জুড়ে ফুটে ওঠা ওই উদ্দীপনা ওই আত্মত্যাগ চিনতে তাঁর কোথাও কোনও ভুল হয় নি, এই তো সেই লক্ষণ যা মানুষকে প্রকৃ্ত সন্ন্যাসের পথে নিয়ে যায়। তবু ছেলেটি কেন যেন এক শয়তানের প্রতিই উৎসর্গীকৃত ছিল।
নৌ সেনাদের সঙ্গে ওই মিটিংটার পর একজন ধর্মযাজক হিসেবে তাঁর ক্ষমতার গুরুত্বটা ঠিক কতখানি তা মনে মনে একবার যাচাই করে নিলেন। তিনি কমিউনিস্ট সাহিত্য নিয়ে রীতিমতো পড়াশোনা শুরু দিলেন। নিজেদের অশিষ্ট আচরণ, অস্বচ্ছ মানসিকতা, অন্তরদর্শনের অভাব সম্পর্কে কোন জুতসই সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না তিনি। অগত্যা তাই কী আর করেন, হাতের নাগালে যা পেলেন পুরোনো খবরের কাগজে ছাপা স্তালিন, বুলগানিয়ান আর ঝাকভের প্রকাশিত বক্তৃতাগুলো দিয়েই শুরু করলেন। ফাদার ফিনিয়ানের মতো সুদীক্ষিত খ্রিস্টান যাজক তাঁদের মতাদর্শকে নিছক যুক্তিহীন মনে করে অন্তরে ব্যাথা বোধ করলে কী হবে, লাখ লাখ মানুষের হৃদয়ে এর আবেদন ছিল অগাধ গভীর।
অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা ভাবনার করার পর শেষমেষ যাজকের বিচারব্যাখ্যা এই দাঁড়াল যে কমিউনিস্ট বক্তৃতাগুলো ধর্মীয় বাহ্যিক আচার-আচরণেরই একটা বিশেষ ধরনমাত্র। তাদের চিল-চিৎকার করা কর্কশ স্লোগানের অনেকটাই ধর্মান্তরিতদের প্রতীক ছাড়া আর কিছু নয়। ক্যাথলিকদের ক্রসকে সম্মান করার মতোই তারা স্বর্গীয় ভবিষ্যতের ভিত্তিহীন হাতছানিটাকে অবিকল সত্যি বলে ধরে নেয়। ফিনিয়ান স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন নারকীয় বিচারের সংবাদে ক্যাথলিক বিশ্বাসের শিকড় যেমন ভেতর থেকে কেঁপে ওঠে সেই তুলনায় কোনও ‘ডান পাখা গজানো ভুঁইফোরদের’ ছুঁড়ে ফেলে দিতে কমিউনিস্ট বিশ্বাস কিন্তু একচিলতেও টাল খায় না।
ছল কপটের মুখোশের আড়াল থেকে তিনি প্রকৃ্ত সত্যটাকে টেনে বের করে এনেছিলেন। শয়তানের মুখ চিনতে যাজকের কোনও অসুবিধে হয় নি। চার্চের নিজস্ব সংস্কার, ত্যাগ, আবেগ, উৎসাহকে কমিউনিস্টরা কী নিপুণ অভিনয়ে যে নিজেদের আয়ত্তে এনে ফেলেছিল ভাবা যায় না। সেখানেও শিক্ষা বিতরণের সময়, প্রচারক ব্যক্তিদের আধ্যাত্মিক কর্মযোগ, ঘটনাসমুহের আড়ালে যে আরও এক মহত্তর সত্য বিরাজমান তাকে দেখতে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হত। তফাত বলতে একটাই – কমিউনিস্টরা ছিল সব শয়তানের উপাসক। তাদের এই পূজা-প্রার্থনায় তেমন কোনও খুঁত খুঁজে না পাওয়া গেলে কী হবে, যাজকের নজর এড়ানো মুশকিল, তিনি জানতেন এই পৃথিবীতে একইসময়ে একসঙ্গে দুই ভিন্ন ধরনের বিশ্বাসের টিকে থাকাটা একেবারেই অসম্ভব।
এরপর তিনি একে একে পড়ে ফেললেন লেনিনের What is to be done? স্তালিনের History of the Communist Party, এঙ্গেলসের Anti-Dubring, এবং এবং শেষ অব্দি মার্ক্সের Das Kapital শেষ করেও খান্তি দিলেন না, আরও কত কি যে পড়লেন তার ইয়ত্তা নেই। ক্রমাগত অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব, দর্শনের ভারিক্কি সব ক্লান্তিকর পাঠ তাঁকে কাবু করা তো দূ্রস্ত, তাঁর নিজের অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্রও নড়াতে পারল না। যে কেউ একথা ভেবে নিতেই পারেন যে কমিউনিজমের মানে হল আসলে শ্রেণিদ্বন্দ্ব, সুদূরপ্রসারি অর্থনৈতিক বিবর্তন এবং রাজনৈতিক গোঁড়ামির ফসল; কিন্তু ফাদারের চোখে কমিউনিজম স্রেফ এক শয়তানের মুখ, অতি চালাকি করে নিজেকে বদলে ফেলে, শয়তানের মুখ চিনতে কিছু বাকি নেই তাঁর, এই পৃথিবীর মানুষের নৈতিকতা পরখ করে দেখার অজুহাতে নানা ফন্দিফিকিরে ছদ্মবেশ ধারন করে সে ফিরে আসে বারবার। ফিনিয়ান সরাসরি সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন, যদিও খুঁজেপেতে আর কাউকে তাঁর পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় নি।
ফিনিয়ান ছিলেন নিরেট বাস্তববাদী, কঠোর মানসিকতার চিন্তাশীল মানুষদের একজন। বার্মার জন্য যখন বেরোলেন তখন তিনি ভাল ভাবেই অস্ত্রে সজ্জিত ছিলেন। বার্মা পথটাতো খুব একটা কম নয়, একে একে ম্যানিলা, সায়গন, ব্যাংকক পার করে শেষে যখন রেঙ্গুনে এসে পৌঁছলেন, ততক্ষণে লড়াইয়ের কৌশলটা কীরকম হলে ঠিক যুতসই হবে তা মনেমনে ছকে ফেলা হয়ে গিয়েছিল তাঁর। রেঙ্গুনে হপ্তা দু’য়েক থাকার দরুণ আর ইরাওয়াদ্দি নদীতে হাজার মাইল রাস্তা গদাইলস্করি চালের লঞ্চটাতে চেপে যেতে যেতে বারমিজদের ধাতটা তাঁর বেশ চেনা হয়ে গিয়েছিল। দেশটির সংস্কৃতি হোক, কী ইতিহাস কী নৃ্তত্ত্বই হোক না কেন এসবের ব্যাপারে যাতে কোনও ফাঁক না থেকে যায় তাই নিজের মতামতকে নেড়েচেড়ে বারবার যাচাই করে দেখে নিতে কোনওরকম কসুর করেন নি তিনি। ফিনিয়ানের এ সমস্ত কিছুই ছিল নিপাট সাজানো গোছানো পরিকল্পনামাফিক যাকে এককথায় বলা পারে একেবারে ছকে বাঁধা।
বার্মায় গরম চড়া বললে খুব কমই বলা হবে, মোকথুতে যাজকদের ঊর্ধ্বতন শ্রেণির আবাসনের সমস্ত জানলার কাচ বাধ্য হয়ে খুলে ফেলতে হয়েছিল। রাতের কথা আলাদা, সরু তারের জালি দিয়ে যতই ঢাকাঢুকি দেওয়া হোক না কেন , ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে তো একটা ব্যাপার আছে, তার জন্য আবার বাঁশের চাঁচের তৈরি পর্দা ঝুলিয়ে দিতে হতো। পর্দার ভিতর দিয়ে ফিনিয়ান কত অজানা অচেনা বিচিত্র পোকামাকড় যে দেখলেন তার হিসেব মেলা ভার, তারের জালের ওপর ওরা ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছিলো। চোখের ভুলই হবে হয়তো কে জানে, পতঙ্গমালার সঙ্গে তার মধ্যবর্তী ব্যবধান কোন এক অদ্ভুত জাদুবলে ক্রমশ কমে আসছিল যেন, ওদের শরীর পেরিয়ে চোখের ওপরে ভেসে উঠছিল মোকথু উপত্যকার টাটকা সবজে রং-এর ঢালু জমি। মোকথু শহরটার কোল ঘেঁসা ওই তো সার দেওয়া সব টিনের কুঁড়ে ঘর, ওই যে সেই রাস্তাটা, আর তারপরেই নর্দমার সরু আঁকাবাঁকা কিনারগুলো পেরোলেই শুরু হয়ে যাবে অরণ্য, সবুজে সবুজ গহীন রহস্যময় ভয়াল অরণ্য। দেখে কেন জানি না মনে হয়, শহরটা যেন উদ্বর্তনের প্রচণ্ড ঠেলায় নিতান্ত অবহেলায় এককোণে কোনও রকমে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বেঁচেবর্তে আছে। যে কোনও মুহুর্তে এই অসীম শক্তিশালী অলস অরণ্য ঝড়ের গতিতে আস্ত শহরটাকে পিষে দিতে পারে। কোমল, ক্রান্তীয় পম্পেই শহরটার মতো চিরতরে গুঁজে দিতে পারে কবরের গভীরে।
“আর বেশি দেরি করাটা ঠিক হবে না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশ ছেড়ে বাইরে বেড়িয়ে পড়াটাই উচিৎ বলে মনে হচ্ছে আমার।“ যাজক বললেন শান্ত স্বরে। “আপনার যতটা সাধ্যে কুলায়, সেটুকু সাহায্য করলেই আমি নিজেকে ধন্য বলে মনে করবো। দেখুন কোনো জিপের ব্যবস্থা করতে পারেন কিনা; এছাড়া বেশি কিছু লাগবে না, একটা তাঁবু, ঘুমানোর জন্য দড়ির ঝুলবিছানা একটা, আর সঙ্গে কিছু খাবার দাবার হলেই বেশ চলে যাবে আমার।“
“আপনি যাচ্ছেন কোথায়, কয়েকটা রাত বাইরে কোথাও কাটাবেন বলে স্থির করে ফেলেছেন নাকি?” প্রশ্ন করলেন যাজকের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিত্ব।
“আজ্ঞে হ্যাঁ, ওই মাস কয়েক লাগতে পারে ধরে নিন।“
“ফাদার আপনি কি জানেন, এখানে আমরা তিন-তিনটে চিনা মিশন বন্ধ করে দিতে একরকম বাধ্য হয়েছি। এর মধ্যে একটা তো কমিউনিস্টরা পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে, বাকী অন্য দুটোর ওপরে ছুঁড়ে মেরেছে ফসফরাস বোমা। তাই এই অবস্থায় এর বাইরে যাবার চিন্তা মাথা থেকে সম্পূর্ণ দূর করে দিন।“
“বুঝতে পারছি সবই, আপনি কি কোনও ভাবেই আমায় একটু সাহায্য করতে পারবেন না?”
“পারি না তা নয়,” আর্চবিশপ বেশ কঠিন স্বরে বললেন। “যদি একান্তই মনস্থির করে ফেলে থাকেন তাহলে সাহায্য করতে হবে বৈকি। এছাড়া উপায় আছে কোনও?”
“আপনার অনুমতি একবার পেয়ে গেলে এই সপ্তাহের শেষের দিকে একেবারে মাস তিনেকের জন্য বেরিয়ে পড়ব ভাবছি” সংযমের আগল ভেঙে তিনি আরো যোগ করে ফেললেন, “আসলে মোদ্দা কথাটা হল, অসম্ভব বলে কিছু নেই”, আচমকা মুখ ফসকে মন্তব্যটা বেরিয়ে যেতেই অপরাধবোধের এক তীব্র যন্ত্রণা যেন তাঁকে ভিতর থেকে প্রবল ধাক্কা দিল। কেননা, অকারণে কেবলমাত্র ঠেস দেওয়ার জন্যই তিনি আর্চবিশপকে লক্ষ্য করে কথাগুলো উচ্চারণ করে ফেলেছিলেন।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গরুর গাড়ি যাওয়ার মতন রোগাসোগা আঁকাবাঁকা পথ ধরে প্রায় লাফাতে লাফাতে এপাশে ওপাশে টাল খেতে খেতে ফিনিয়ানের গাড়ি এগিয়ে চলল সোজা উত্তর দিক বরাবর। তিনি ভাল করেই জানতেন হিসেব মতো তিনটে কাজ তাঁকে চটজলদি মিটিয়ে ফেলতে হবে। পয়লা কাজ যেটা করতে হবে, নিদেনপক্ষে অন্তত একজন নেটিভ ক্যাথলিককে খুঁজেপেতে বের করা। দুই, তার সেই ভাষাটাকে আচ্ছামতন শিখেপড়ে নেওয়া আর তিন নম্বর তাঁকে ওইসব খানাপিনা গেলার অভ্যেসটাকে রপ্ত করে ফেলা… তার মানে তাঁকে কয়েক সপ্তাহ ধরে রক্ত আমাশার যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে যতক্ষণ না তাঁর অন্ত্রের ক্রিয়াপ্রণালী এখানকার খাবারের ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধকারী ক্ষমতা তৈরি করে ফেলতে পারে।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের (পর্ব ৪) লিংক

https://www.teerandaz.com/%e0%a6%89%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%ae-%e0%a6%9c%e0%a7%87-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%93-%e0%a6%89%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%ac-4/

Share Now শেয়ার করুন