উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৭]

0
342
কদর্য মার্কিন  [পর্ব ৭]

তর্ক-বিতর্কের পারদ যেভাবে উপর দিকে চড়ছিল তাকে সবসময় নজর করে খেয়ালে রাখা ফিনিয়ানের দ্বারা সম্ভব হচ্ছিল না। কখনও কখনও এমনটাও হচ্ছিল যে একজন অথবা দেখা গেল অনেকেই নিজেদের রাগকে কোনমতেই আর বশে রাখতে পারছিল না। তাদের মধ্যে একজন যাকে টোকি বলে সবাই চেনে, এমনিতে মাথায় সার একটু কম, চুপচাপ, চকিতে উঠে দাঁড়িয়ে হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে একটা গাছের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে সেটার ডাল ধরে সবেগে এক টান মারল, তার চিন্তার তাপ আঙুলের দ্রুত নাড়াচাড়ার ভেতর দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিল নিজের মতো করে সেও কিছু বলতে চায়। ফিনিয়ান নিশ্চিত ছিলেন, এই যে এত বাকবিতণ্ডা, তাদের মধ্যে কোথাও নতুন কিছু খুঁজে পাওয়ার উত্তেজনার পাশাপাশি বুক ফুলিয়ে গর্ব করবার মতো নির্ঘাত কিছু একটা ব্যাপার ছিল। উথালপাথাল আলোচনার ঢেউ একটা সময় থিতিয়ে এল। সকলে ইউ তিয়েনের দিকে তাকাল, তাকেই সম্ভবত তারা মোড়ল বলে ঠাউরেছে।
“আমরা ভেবে দেখলাম… কথাগুলো হয়তো আপনার পছন্দ নাও হতে পারে, ফাদার… তিনটে জিনিস।” ইউ তিয়েন ধীরে ধীরে বলল। “কমিউনিস্টরা আমাদের স্বাধীনতা দিতে রাজি নয়, কেননা ইতিমধ্যেই প্রচুর বার্মিজ কমিউনিস্ট হয়ে গেছে দুই, বার্মিজরা কমিউনিস্টদের দলে নাম লেখাচ্ছে কারণ তারা ভাবে কমিউনিস্টরা সাদা লোকেদের মানে… ওই ওয়েস্টার্নদের বিরোধী। কথাগুলো এভাবে বলতে হচ্ছে, কিছু মনে করবেন না ফাদার, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। বলাটা শক্ত, তবুও বলতে হচ্ছে, সাদা লোকেরা সবসময় সুবিধের হয় তেমনটা ঠিক মেনে নিতে পারছি না। মাফ করবেন, আপনার পক্ষে হজম করাটা খুব সহজ নয়, কিন্তু সত্যিটা এড়িয়ে যাব কিভাবে। তিন, অনেক বার্মিজই কমিউনিস্টদের পক্ষে, কারণ তাদের ধারণা কমিউনিস্টরা মানুষের ভালো করবে… বিশেষ করে যারা দিন আনে দিন খায় সেই সব হতভাগা চাষা ও পাতি মজুরদের জন্য। ওরা আমাদের জমি জিরেত দেয়, বেশি বেশি খাবার দেয়, মোটর গাড়ি, রেডিয়ো এমনকী কম দামে ওষুধবিষুধও দিতে পারে। আমরা আলোচনা করে মোটামুটি একমত হয়েছি যে, হতে পারে এসব কারণেই কমিউনিস্টরা হয়তো আমাদের পুজো-পাঠ করার অধিকার খারিজ করে দিচ্ছে।”
“খুব যে ভুল কিছু বলছ না সেটা বুঝতে পারছি”, ফিনিয়ান এমন করে বলতে শুরু করলেন, যেন তাদের কথার তালে তাল মেলাচ্ছেন। ফিনিয়ান সাবধানে বলতে শুরু করলেন, “দেখো, প্রথমত, বেঁচে থাকার অধিকার আর স্বাধীনতা আদায় করাটা আমাদের কাছে সবচেয়ে আগে জরুরি। দ্বিতীয়ত, বার্মিজদের কমিউনিস্ট হওয়াটা আটকাতে না পারলে আমাদের স্বাধীনতাটা কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে। আর কমিউনিজম কী পরিমাণ ক্ষতি করে চলেছে সবার, একবার যদি তা বার্মিজরা বুঝে যায়, তাহলে তো কথাই নেই, সদলবলে এ পথ ছেড়েছুড়ে দিয়ে ফিরে আসতে একটুও সময় বরবাদ করবে না। আর সত্যি কথা বলতে কী, কমিউনিস্টরা যে সাদা, বাদামি, কালো কোনও মানুষকেই পাত্তা দেয় না, এ ব্যাপারে আমি অন্তত নিশ্চিত। যাই হোক, আমাদের সবাইকে বিষয়টাকে নিয়ে ভাবতে হবে, দেখা যাক, কোনও উপায় বের করা যায় কিনা।” তিনি কথা বলা থামালেন আর কথা খতম হতে না হতেই যন্ত্রণার গুঁতোয় মুখটা তাঁর প্রায় বেঁকেচুরে গেল, আর দাঁতগুলো বাইরে বেরিয়ে এল।
“যদি চাও, কাল তাহলে এই এখানেই আমাদের দেখা হবে, কমিউনিস্টদের দাবি দাওয়া কী কী, কীভাবে তারা সেগুলো উসুল করতে চায় এ নিয়ে তাদের বক্তব্যগুলো খতিয়ে দেখা যাবেখন,” ফিনিয়ানের থামবার কোনও নাম নেই, “আরে অসুবিধেটা কোথায়, ওরা নিজেরা যা লেখে, যা করে সেসব দেখেটেখেই আমরা বিষয়গুলো দিব্যি খুঁজে বের করে নিতে পারব। আর কে বলতে পারে বাস্তবটা আমাদের সামনে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেলেও তো যেতে পারে, তারপর আশা করি ছক অনুযায়ী পা ফেলতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না।”
উঠে পড়লেন তিনি, ব্যাথাটা হঠাৎ এত বেড়ে গেল যে ভাবলেন বুঝি অজ্ঞানই হয়ে যাবেন। মুখটা সাদা কাগজের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেল, ঘামের দানা ফুটে উঠল ক্রমশ, ঠোঁটের কষ বেয়ে গড়িয়ে নামছে নোনতা জল। ইউ তিয়েন পরি কি মরি করে তাঁর দিকে এগিয়ে যেতে গেল, ধরে ফেলবার একটা দ্রুত ইঙ্গিত, কিন্তু ফিনিয়ান ঘাড় নেড়ে বারণ করে দিলেন। তিনি একেএকে সবার সঙ্গে করমর্দনের কর্তব্য সারবার পর আজ এখানে উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানাতে ভুললেন না।
পরের দিন ঠিক বিকেল বেলা বার্মিজদের আবার দেখা গেল সেখানে। একটুখানি কথা বলার জন্য ভেতরটা ছটফটিয়ে মরছিল যেন, উৎসাহ-উদ্দীপনা উপচে পড়ছিল, মুখের বাক্যি আর থামে না। গতকাল এখান থেকে ফিরবার পর থেকেই ভাবনা-চিন্তার পোকা তাদের মগজটাকে যেন একটানা কুরেকুরে খাচ্ছিল, ঠান্ডা মাথায় নিজেদের মতামতগুলো প্রকাশ করার জন্য তারা যেভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
“ফাদার, আমার কী মনে হয় জানেন, নতুন কিছু যখন আমরা শুরু করতে যাচ্ছি, তার আগে এই এলাকার কমিউনিস্টদের বিষয়ে যা যা তথ্য খুঁজে পাওয়া যেতে পারে মনে হয় সেসব একবার সরেজমিনে তদন্ত করে দেখে নেওয়াটা দরকারি নয় কি, আপনি কি বলেন?” ওদের মধ্যে একজন বার্মিজ বলল। “আমাদের জানা উচিত আগামী দিনে কী চাই আমরা, আর চাইলেই তো হবে না, কোন কোন বাধা বিপত্তির দেয়াল পার হতে হবে সেটাও তো আগেভাগে মাথায় রাখতে হবে, ঠিক কিনা।“
যদিও বেদম হাসি পেয়ে গিয়েছিল ফিনিয়ানের, কিন্তু অবস্থার গতিকে পড়ে কোনও রকমে তা গিলে ফেলতে বাধ্য হলেন। আসলে বার্মিজরা যা প্রস্তাব করছিল, ফিনিয়ান তাঁর তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে ঠিক সেই পরামর্শটাই দিতে যাচ্ছিলেন : সকলের বুদ্ধিগুলো গুছিয়ে একজায়গায় জড়ো করতে হবে।
বাদবাকি বার্মিজদেরও বিরোধিতা না করে ঘাড় নেড়ে বরং সমর্থনই করতে দেখা গেল। তাদের আগ্রহ আর দেখে কে, যতটা সম্ভব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে স্থানীয় কমিউনিস্ট ক্ষমতার ঘাতঘোঁত, বহরটা ঠিক কতখানি হতে পারে এ নিয়ে চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণের হাট বসিয়ে দিল। তাদের আলোচনা্র ফাঁকফোকর দিয়ে ফাঁস হয়ে গেল অনেক গোপন সব কথা, এমন কত যে আছে যাদের ব্যাবসাদার হিসেবে লোকে চেনে জানে, কিন্তু আড়ালে এক একটা কমিউনিস্ট, ছাত্রদের মধ্যে কারা কারা গোপনে নেতৃ্ত্ব দিয়ে যাচ্ছে, কেই বা গণতান্ত্রিক, প্রচার করার কাজটা কাদের দায়িত্বে আছে, হাতিয়ারগুলো কোথায় মজুদ করা হয়, গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কে তারা কতটাই বা ওয়াকিবহাল, এমনি আরো বহু কিছু। তারা দু’দিন ধরে মাথা ঠাণ্ডা রেখে কথা বলে গেল। মাটিতে বসে কত কী যে আঁক কাটল, মানচিত্রে কমিউনিস্ট ঘাঁটিগুলোকে ঢ্যারা মেরে চিহ্ন দিয়ে রাখল। তারা যে এতকিছু জানে তা দেখে নিজেরাই বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গিয়েছিল, সেই সঙ্গে আবার খানিক ভয়ও যে লাগছিল না তাও নয় – কারণ কমিউনিস্টদের ক্ষমতা কতখানি এ বিষয়ে তাদের কারও মাথায় কিছুমাত্র ধারণাই ছিল না এতদিন। এমন একটা গ্রাম খুঁজে মেলা ভার যেখানে কমিউনিস্ট ছাউনিতে যান্ত্রিক উপকরণের কোনও ঘাটতি ছিল বলা যায়, এছাড়া, এমন পাশ্চাত্য কোনও সংগঠনও ছিল না যার উপর গুপ্তচরবৃত্তি করা হয়নি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা গ্রামে তো প্রত্যেকটা বিষয়ের ওপর ষোলকলা নৃশংস প্রভুত্ব খাটাতে তারা কখনও বাছবিচার করত না। আর অন্যান্য জায়গায় তাদের দুটো বিষয়ের ওপর প্রচার ছিল অবিরাম ক্লান্তিহীন – পশ্চিমী সাদা জাতটার অশুভ উদ্দেশ্য আর উল্টোদিকে আমজনতার প্রতি কমিউনিস্টদের অকুণ্ঠ অনাবিল ভালবাসা।
“এখন আমাদের কমিউনিস্টদের চিনতে কিছু বাকি আছে বলে মনে হয় না, সবাই হাড়েহাড়ে বুঝে গেছি ওদের। বাদবাকি অন্যদের মতো আমরা প্রত্যেকেই এখন ওদের খুঁটিনাটি তথ্যগুলো সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহল,” ফিনিয়ান বললেন। “আমরা কমিউনিস্টদের মতো নই, যারা কিনা নিজেদের লোকের কাছেই তথ্য লুকিয়ে চুরিয়ে রাখে। সবাই মিলে এখন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসে গেছে – কী করা যেতে পারে। কী করব আমরা ?”
সপ্তাহ দু’য়েক রোজ বিকেলবেলাটা জুড়ে তর্ক-বিতর্ক কথা কাটাকাটি চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে কান পাতা দায় হয়ে উঠল। মিটিং চলাকালীন তাদের মতামত, বাক বিনিময়, রাগারাগি-দায়বদ্ধতা, উত্তেজনা যাই ধরা হোক না কেন, তাতে জোর জবরদস্তির লেশমাত্র ছিল না, যা কিছু উঠে আসছিল তার সবটাই ছিল নিজেদের আঁতের কথা। এবং টেনে-হেঁচড়ে খাপছাড়া ভাবে হলেও তারা এক জায়গায় এসে একে অপরের সঙ্গে সহমত হতে পারল, অবশেষে ।
বেশ কয়েক মাস কেটে যাওয়ার পর ফিনিয়ান তার নিজের হাতে তৈরি করা রিপোর্টে তারা কী করেছিল না করেছিল সে সমস্ত কিছু এক সঙ্গে নথিবদ্ধ করে রাখলেন। এর ফলে ঝাপসা ছবিটা অনেকখানি স্পষ্ট হয়ে গেল তার কাছে।
তিনি লিখলেন, “যে কোনও বিষয়ে মানুষকে বশ করার কৌশলটা আলাদা কিছু নয়, ক্যাথলিক চার্চ, লুথারীয়, কমিউনিস্ট অথবা গণতন্ত্রবাদীরাও অনায়াসে তা করতে পারে। বাস্তবিক, একটা আন্দোলনকে কেবল প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটাবার ধরন-ধারন, হিংস্রতা – এসব দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করলে মুর্খামি হবে, বেশিরভাগ সফল হওয়া বিপ্লবকেই এই একই নীতি মেনে নিতে দেখা গেছে।
বনের ভিতরে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর আলোচনা মারফত পাওয়া যেসব ভাবনা-চিন্তা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিল সেগুলো সম্পর্কে এবার একটু বলা যাক –
১. যেমন সাধারণত কী চাই আমরা, এমন এক সম্প্রদায়, যাদের জীবনযাপন এবং নিজের ধর্ম নিজে বেছে নেওয়ার অধিকারটা যেন অক্ষত থাকে।
২. অথচ এমন কত বার্মিজ আছে যারা কমিউনিজমের ওপর বিশ্বাস করে, ধোকা খায়, ফলে যা হওয়ার তাই হয়, কার্যত সবই ভেস্তে যায়।
৩. সুতরাং সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের এই সাদা সত্যিটাকে মগজে ঢোকাতে হবে যে, কমিউনিস্টদের ধ্যানজ্ঞান বলতে কেবল ক্ষমতা দখল, বাদবাকি চুলোয় যাক।
৪. তবে এর পিছনেও আমাদের কম খাটতে হয় নি, না, কোনও রকম চাপিয়ে দেওয়া নয়, কেবল বুঝিয়ে-সুজিয়ে। আর ক্রমাগত এইভাবে বোঝাতে বোঝাতে আমরা তো এতে এক-একজন প্রায় বিশেষজ্ঞ বনে গিয়েছিলাম।
৫. বার্মিজদের নিতান্তই হচপচ ঘটনাগুলোর আনাচ-কানাচ ঘেঁটে তার খেই ধরে তবেই না তাদেরকে নিজেদের দিকে টানতে পেরেছিলাম আমরা।
৬. এমন ভাষায় আমাদের কথাবার্তা চালাতে হত যাতে সবাই অনায়াসে বুঝতে পারে।
৭. যে বিষয়গুলো বুঝতে তাদেরকে ঢোঁক গিলতে হবে বলে মনে হত, সেখানে খানিকটা নাটক করার মতো, বেশ জাঁকিয়ে কাজটা করতে হত বৈকি।
৮. অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা, যারা শুনবেন তারা মন থেকে তৈরি থাকলে একমাত্র তখনই তাদের এ সমস্ত বলতে হত। আগাগোড়া সবক্ষেত্রেই এই একই বন্দোবস্ত বহাল রাখা হয়েছিল।
“আটজন বার্মিজ যখন সব একজোট হয়ে এ বিষয়ে রাজি হয়ে গেল, তখন মনে হয়েছিল এ আর আহামরি কী এমন কাজ। ভুল ধারণা, সহজ তো দূর, সবচেয়ে কঠিন ছিল ধৈর্য্য ধরে রাখা আর হ্যাঁ, তার সঙ্গে যথাযথ পরিকল্পনা। ওই ভয়ানক অস্থির সময়টাতে আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও গতি যখন ছিল না, সুতরাং তাই সই, করেছিলাম অপেক্ষা; আর রইলো পরিকল্পনার ব্যাপার, তা সেটি বাদ দিয়ে চলা যাবে নাকি, একদিকে তো হাজার তিনেক কমিউনিস্ট, অন্যদিকে মিলিয়ে-জুলিয়ে আমরা খালি হাতে গোনা ন’জন মাত্র লোক।
“আমার ওই আট কমরেড মিলে প্রথমেই একটা কাজের মতো কাজ করে দেখিয়ে দিল বটে, আমি যে পুরনো লক্করঝক্কর ঝরঝরে যন্ত্রটা সঙ্গে করে এনেছিলাম তা থেকে ছোটখাট সস্তা দামের একটা খবরের কাগজ বের করে ফেলল তারা। তারা এর নাম দিয়েছিল ‘The Communist Farmer’। আরে, আসল ভেলকিটা তো এখানেই, টাইটেলের অর্থ যা খুশি হতে পারে। গোড়ায় হয়েছিল কি, কমিউনিস্টরা পুরোপুরি ঘোল খেয়ে গিয়েছিল, কাগজটা তাদের দিকে না কাদের দিকে। আগাম কোনও খোঁজপাত্তি নেই, ভুতের খেল নাকি, সবাইকে চমকে দিয়ে একেবারে হঠাৎ, দোকান-পাট, গেরস্তের দোরে দোরে, গাঁয়ের চকগুলোতে, বাসে মায় পথে-ঘাটে সর্বত্র এটাকে হাজির দেখা যাচ্ছে, ব্যাপারটা কী। প্রত্যেক সংখ্যাতেই হোমরা-চোমরা সব কমিউনিস্টদের কারো না কারো একটা রচনা ছেপে বের হতোই – স্তালিন, মার্কস, লেনিন, মাঙ সে তুঙ, চৌ-এন-লাই, প্লেখানভ। যেমন এর মধ্যে কার্ল মার্কসের একটা লেখা যেটায় কৃ্ষকদের বোকামি এবং পশ্চাদপদতাকে তুলোধোনা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এমনই আরেক সংখ্যায় স্তালিনের এক মন্তব্য তুলে ধরা হয় যেখানে কৃ্ষির আবশ্যিক মালিকানা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি ‘kulaks’দের সমূলে ধ্বংস করার বিষয়টির ন্যায্যতা প্রমাণ করে ছেড়ে ছিলেন। অবশিষ্ট সংখ্যাগুলোতে ছিল রাশিয়ার কৃষি সমস্যা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষিকেন্দ্রিক উন্নতি, খামার উৎপাদন বৃদ্ধির পদ্ধতি, সার ব্যবহারের প্রক্রিয়া প্রভৃতি নানা বিষয়ে সাধারণ প্রতিবেদন।
“এই দুটো সংখ্যা নিয়ে তো কমিউনিস্ট পার্টির যাকে বলে ঢেঁকি গেলবার মতো অবস্থা। এরপর তারা যা করল, কী জনগণের সামনে ভাষণ দিতে গিয়ে, কী রেডিয়োর প্রচারে, আর সঙ্গে অন্যান্য তাবেদার কাগজগুলো তো আছেই, সংবাদপত্রটিকে নির্বিচারে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আক্রমণ করতে শুরু করে দেয়। তারা বুঝতে পেরে যায় ‘The Communist Farmer’ কমিউনিস্ট তত্ত্বের কেবল একটা নির্দিষ্ট অংশের উপরই রিপোর্ট করে, আর রিপোর্টেড অংশটির প্রামাণিকতা নিয়েও কার্যত অস্বীকারের কোনও জায়গা ছিল না। বেশিদিন এই আড়ালে-আবডালে লুকিয়ে থাকা সম্ভব হয় নি, তারা অচিরেই ধরে ফেলে, ‘’চাল খাটিয়ে বেছে বেছে কমিউনিস্ট তত্ত্বের একটা বিশেষ অংশকে ছেঁকে নিয়ে তার ওপরেই রিপোর্টটা পেশ করে, আর মুশকিল হল এইসব রিপোর্টেড অংশগুলোকে ধাপ্পাবাজি বলে প্রমাণ করার কোনও উপায় তাদের হাতে থাকলে তবে তো। তারা নিজেদের বগলদাবা করা কাগজে সাত তলা গলা চড়িয়ে কখনও বলতে ভুলত না, আহা, স্তালিনমশাই কৃ্ষকদের কতখানি যে ভালবাসেন। নাও এখন হল তো, ‘kullacks’দের হিসেব-নিকেষ জন্মের মতো মিটিয়ে ফেলবার ব্যাপারে তাঁর এমন অবিশ্বাস্য মন্তব্য তাদের মধ্যে কে আর আশা করেছিল। তারপর এক মাস ধরে ‘The Communist Farmer’-এর উত্তর দেওয়া ছাড়া কমিউনিস্ট প্রেস আর কিছু মহত কম্ম করে উঠতে পারে নি।
“কাগজটাকে ধামাচামা দেওয়ার জন্য তাদের সেকী তোড়জোর, যেখানে যা নজরে পড়ে সবকিছু বামাল সমেত লোপাট করে ফেলতে উঠেপড়ে লাগে তারা। কিন্তু ফল হয় উলটো, কাগজটার চাহিদা আরো বেড়ে যায়, দামও চড়তে থাকে। তারপর এই কাগজ ছাপানেওয়ালা আর যোগানদারদের দুনিয়া থেকে হাওয়া করে দেবার হুমকিও দেওয়া হল; কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা, এই প্রথম, তাদের খোঁচরের দল এদের হদিস খুঁজে বের করতে গিয়ে হাতে কী পেল, স্রেফ ফক্কা। একটা সময় এল যখন বার্মিজদের চোখের ভাষা বুঝিয়ে দিচ্ছিল, কমিউনিস্ট আবার কারা হে, জলজ্যান্ত ভাঁড় বৈ তো আর কিছু নয়। কমিউনিস্টদের জন-সমাবেশে ফিচকেমি মার্কা সব টিটকিরির খোঁচা শুনে জনতার ভিতরে হাসি-মসকরার প্রবল হুল্লোড় পড়ে যেত। আসলে বার্মায় কী হয়, হয়তো কোনও রাজনৈতিক দল বেজায় ভীতু, অথবা বিশেষ সম্মানের কিংবা ধরে নেওয়া যাক বেশ দক্ষ আবার দাপুটে হিংস্র হলেও একরকমভাবে চলে যাবে বলা যেতে পারে… কিন্তু একবার রংমাখা সং হয়ে গেলে আর রক্ষে নেই।
“উত্তর অঞ্চলে কমিউনিস্ট নেতাদের ফের নিয়োগ করা হল। পরের কাজ হিসেবে, না আর পুরনো নয়, যারা টাটকা নতুন নেতা তাদের এবার ভালকরে শিখিয়ে-পড়িয়ে নেওয়া গেল… এবং পুরনোদের পুনঃস্থাপনের জায়গায় পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া হল। শুধু কি তাই, একটা মজার রসিকতা বাতাসে ক্রমে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, যদি খুব তাড়াতাড়ি অক্কা পেতে চাও তাহলে কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চ আধিকারিক হয়ে যাও।
“অতঃপর, এবার সেই চূড়ান্ত মুহূর্তটা শেষঅব্দি এসেই পড়ল। মস্কো থেকে আন্থকাটায় একজন ব্যক্তি পৌঁছালেন, বার্মার উপরে একজন রাশিয়ান বিশেষজ্ঞ। লম্বা-চওড়া, শক্তপোক্ত পেটানো চেহারা, নিরেট পাথরকোঁদা মুখ, সংশোধনে-ষড়যন্ত্রে-চক্রান্তে-পাল্টা চক্রান্তে একেবারে ঝানু মাল। ব্যর্থতা কাকে বলে তিনি জানেন না। নাম তাঁর ভিনিচ।
“আন্থকাটায় নিজেকে চালান করার আগে ভিনিচ এটা ওটা সেটা অনেককিছু পরিকল্পনা করেছিলেন। ‘Communist Farmer’-এর একেবারে গোড়া থেকে শেকড়টা উপড়ে ফেলার জন্য তিনি মনেমনে একটা জবরদস্ত ফন্দি এঁটেছিলেন। এবং আন্থকাটায় তিনি যে আছেন সেটা যাতে লোক জানাজানি না হয়, আঁটঘাট বেঁধে সে ব্যাপারটাও নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর সরেস মগজে অনেক আগেই এ ধারণাটা ঢুকে গিয়েছিল যে নেটিভগুলো নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিজেরাই দম ফেলবার ফুরসত পাবে না… বিদেশিরা এর মধ্যে আলবাত আসবে তবে অনেকটা তাদের নিরুপায় শেষ ভরসার মতন, আর এজন্যে সর্বদা ঋষিসুলভ শান্ত ভাব বজায় রাখাটা বেজায় জরুরি হে।
“তাঁর পরিকল্পনা ছিল সত্যিসত্যি তারিফ করার মতো, আর একটু হলেই তিনি খুব সহজেই টেক্কা মেরে বেড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু হিসেবের স্রেফ একটা ভুলই সব বারোটা বাজিয়ে দিল। টোকি নামে এক গুপ্তচরের মাধ্যমে কমিউনিস্ট মালমশলা এখানকার মগজবাসায় ঠেসে ঢোকানো হচ্ছিল। টোকি মৃদু স্বভাবের, বিবেচক, তার স্মৃতিও অভ্রান্ত।
“ভিনিচের পৌঁছানোর সপ্তাহ তিনেক পরে ‘The Communist Farmer’ প্রায় প্রত্যেকদিন বারে, চায়ের দোকানে, পাবলিক টয়লেটে, নৌকায়, গোরুর গাড়িতে, গ্রামে, গঞ্জে, আদালতে সর্বত্র হাজির হতে শুরু করল । এবং তারা একটা বিজ্ঞাপন দিত যে আগামী জুনের ১০ তারিখে দুপুর দুটোয় মাইতকিনা থেকে রেডিয়োয় একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রচার হবে, যা অকমিউনিস্টদেরও এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দেবে।
“জুনের দশ তারিখে, আন্থকাটায় কম বেশি প্রায় সবাই রেডিয়োতে নিজের কানে খবরটা শুনেছিল। ঠিক কীভাবে এই সম্প্রচারটি অভাবিত এক জটিল ঘটনার জন্ম দিয়ে ফেলেছিল কে জানে… আসলে সব্বাই এটাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছিল।
“১০ জুন ঘড়ির কাঁটা দুটোর ঘর ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘোষকের যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বেজে উঠল – পরের আধঘণ্টা কিনে নিয়েছে বার্মিজ এডুকেশনাল লীগ বলে একটা সংগঠন। এরপর আন্থকাটা উচ্চারণে চাঁচাছোলা এক কর্কশ নেটিভ গলা ভেসে এল।
“ ‘আমাদের ধারনা, আন্থকাটার বার্মিজরা সোভিয়েত রাশিয়া এবং কমিউনিস্ট পার্টির দ্বারা পরিচালিত অসৎ প্রচারের জালে বিভ্রান্ত হয়ে আজ একটা অত্যন্ত জঘন্য ভুল পথ বেছে নিয়েছেন,’ স্থানীয় কণ্ঠস্বরটি ধীরে ধীরে বলতে থাকল। ‘আমাদের মনে হয়, পরিস্থিতি খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আজ আমরা আন্থকাটা কমিউনিস্ট পার্টির সরকারি মুখপাত্রকে এ বিষয়ে ওনার মতামত জানানোর একটা সুযোগ দেওয়া হবে বলে স্থির করেছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রাশিয়ার মস্কো থেকে আগত স্বয়ং ভ্লাদিমির ভিনিচের বক্তব্য আমরা আপনাদের শোনাতে চলেছি। আন্থকাটায় কমিউনিস্ট পদ্ধতি কী হবে এ নিয়ে গত সপ্তাহে স্থানীয় কমিউনিস্টদের একটা মিটিং ডেকেছিলেন তিনি। সেখানে কমিউনিজমের ভূমিকা কী, কতখানি দেশের এবং দশের উপকারে লাগছে তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বারমিজ এডুকেশনাল সোসাইটির সদস্যদের উদ্যোগে ওই সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল। তারই কিছু অংশ এখন আপনাদের সামনে সম্প্রচার করতে চলেছি। কোনও খারাপ উদ্দেশ্য অথবা নিছক কেবল নিন্দে করার লক্ষ্য নিয়ে নয়, কমিউনিস্টরাও তাদের নিজস্ব সংগঠনের মুখে নিজেদের মূল্য সম্পর্কে জানার অধিকারটুকু রাখেন বলে মনে করি। সুতরাং বন্ধুগণ, কমিউনিজম কী চায়, কোথায় পৌঁছতে চায় তারা, এসব নিয়ে ভ্লাদিমির ভিনিচ কী বলছেন এখন তাঁর নিজের কণ্ঠেই শুনতে চলেছেন আপনারা।’
“শুরু শুরুতে টেপ রেকর্ডারের একটানা ফ্যাসফ্যাসে শোঁ শোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না, খানিক বিরতি দিয়ে তারপর জোরালো, রসকষহীন গলায় রাশিয়ান উচ্চারণে বার্মিজ ভাষায় বলা কথাগুলো কিন্তু আর কোনও যন্ত্রণা ছাড়াই চমৎকারভাবে সবাই শুনতে পেল।
“ ‘আপনারা টানা তিন ঘণ্টা ধরে সমানে যে তর্ক-বিতর্ক চালিয়ে গেলেন, আমি কোথাও তাতে কোনও রকম নাক গলিয়েছি বলে তো মনে পড়ছে না’ যে কোনও কারণেই হোক, ভিনিচের গলা শোনাচ্ছিল যেন অনেকটা ক্লান্তিগ্রস্ত একজন মানুষের মতন। ‘এখানে কী ঘটছে তা নিয়ে মাথা খারাপ করার কোনও দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।আর তাছাড়া আপনাদের উপদেশ কে চেয়েছে, ওটা নিজেদের কাছেই রাখলেই বোধহয় ভাল হবে। তার চেয়ে বরং আমি ঘটনাগুলো আপনাদের সামনে একে একে বলে যাচ্ছি. . .সমস্তটা ভাল করে শুনলে হয়ত একটা সিদ্ধান্তে আসা সহজ হবে। প্রথম কথা, রাশিয়ান ট্রাকটার নিয়ে অযথা গুজব ছড়ানো আর সেটা যে এখানে পাঠানো হবে এমন ভিত্তিহীন প্রতিশ্রুতিটাকে সবার আগে বন্ধ করুন। এটা আমাদের পক্ষে কোনও মতেই সম্ভব নয়। ভিয়েতনামের হো চি মিনে যে সমস্ত মিলিটারি হার্ডওয়ার আমাদের পাঠাতে হবে সেগুলো সবই আমরা পেয়ে গেছি। দ্বিতীয় কথা, সম্পত্তির মালিকদের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে “জমির সামাজিক মালিকানা” দখল করার প্রসঙ্গে কোনও আলোচনা আপনাদের কাছ থেকে শুনতে চাই না। এসব কথা কৃষকদের শুধু আতঙ্কিতই করে। এটা কীভাবে অস্বীকার করবেন বলুন তো, কৃ্ষকরা কী আজও পিছিয়ে নেই। যৌথ খামার নয়, তারা চায় নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। আশা করছি একদিন তারা যৌথ মালিকানার গুরুত্বটা অনুভব করতে পারবে, তবে এখনও সেই চেতনাটা তাদের মধ্যে আসে নি বলেই আমি জানি।’
“ ‘কমরেড, আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রচার চালানো নিয়ে আপনি কি কিছু বলতে চান?’ একটা কণ্ঠ শোনা গেল।
“ ‘আপনারা এটা নিয়ে তো প্রায় একটা হেস্তনেস্তই করে ফেলেছেন বলা যায়, আমি আর কী বলবো,” ভিনিচের কণ্ঠে ব্যঙ্গ ফুটে উঠল। মেজাজ ঠিক রাখা তাঁর পক্ষে বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ‘এই হয়েছে এক, আমেরিকা বিরোধিতা, ব্যাপারটাকে ঠেলেঠুলে এতটাই উঁচুতে নিয়ে গেছেন যে সেটা প্রায় উগ্র জাতীয়তাবাদের আকার নিয়েছে এবং বার্মিজরা নিজেদের সরকারের দোষ-ত্রুটিগুলোকে দেখতেই পাচ্ছে না এমন ভাব করছে, যেন এগুলো পাত্তা দেবার মতো এমন কিছু নয়। আর সব কিছুতে আমেরিকার দোষ ধরার বাতিকটা এবার ছাড়ুন তো, আপনাদের স্থানীয় বিরোধীরা কেউ তো আর ধোয়া তুলসিপাতা নয়, তাদের ফাঁকফোকরগুলোর দিকেও একটু নজর দিন।‘
“ ‘দেখুন, ঠিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সরকারের সমালোচনা করাটা খুব একটা সহজ বলে মনে করবেন না যেন…’ এক বার্মিজ কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল।
“ ‘অস্বীকার করছি না, হ্যাঁ, কঠিন তো বটেই’, ভিনিচ মাঝপথে থামালেন। ‘আপনারা এ কথাটা মনে করতে পারবেন বলেই আমার ধারণা, কোনও জিনিস মাত্রাধিক মন্দ যেমন হতে পারে তেমনি সেই একই জিনিস অবস্থা বিশেষে অতিশয় উত্তমও হয়ে উঠতে পারে। স্বয়ং লেনিন এমনটাই বলেছিলেন। তার মানে এখানকার তুঁত আর ধানের ফসলকে ঝরে যেতে দিতে হবে। সোজাকথায় বুঝে নিন, এখানকার সড়ক পরিকল্পনাটা বাতিল করে দেওয়া ছাড়া আমি তো আর উপায় দেখতে পাচ্ছি না কোনও।’
“টেপ রেকর্ডারের শোঁ শোঁ আওয়াজটা আকস্মিক এরপর বেড়ে গিয়ে একসময় চুপচাপ হয়ে গেল একদম। স্থানীয় বার্মিজদের সহজ-সরল তোষামুদে গলা তখন হই হই রই রই আহ্লাদে একদম টইটম্বুর।“
“ ‘আমাদের বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না, উচ্চপদস্থ রাশিয়ান মুখপাত্রের মুখে কমিউনিজমের আদর্শ এবং আন্থকাটার জন্য রাশিয়ার পরিকল্পনার সংবাদ শোনার পর আপনারা নিশ্চয়ই আন্তরিকভাবে কৃ্তজ্ঞতা অনুভব করছেন”, রাশিয়ান কণ্ঠস্বরটিতে কিন্তু কোনও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ছিল না। “আশা করব কমিউনিজম সম্পর্কে শত্রুদের ছড়ানো ফালতু সব মিথ্যা কথায় আপনারা আর বিশ্বাস করবেন না, কেননা আপনাদের হাতেও এখন অস্ত্র আছে।’ ”

এর ঠিক একদিন পর বনের ভিতরে সেই নির্দিষ্ট ফাঁকা জায়গাটাতে ন’জন মানুষকে ফের জড়ো হতে দেখা গেল। এই প্রথম টোকি গাছ থেকে একটা ছোট পাতাও ছিঁড়ল না। এর মধ্যেই সে যেন অনেকটা পরিণত হয়ে উঠেছে, বন্ধুদের রং-তামাশা, কথাবার্তায় অল্প-স্বল্প হাসাহাসিও যে করছিল না তা নয়।
“বার্মার অন্যান্য এলাকাগুলোতেও আমাদের সমানভাবে এই একই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, কোনও রকম ফাঁকি দেব না।” দৃঢ় ভাবে বলল টোকি। “আর তার সঙ্গে বার্মার বাইরেও। যেমন সারখান, ওখানেও সমস্যা ঘোঁট পাকিয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। তাদের ভাষার সঙ্গে আমাদের ভাষার খুব একটা ফারাক নেই। শত্রু যতই বড় হোক না কেন, হাতের পাঞ্জার থেকে ছিটকে যাওয়ার আগেই গলার টুঁটি চেপে ধরে কীভাবে তাদের জানেপ্রানে নিকেশ করে দিতে হয়, সেটা এবার হাতেনাতে শিখিয়ে ছাড়বো।”
সে ঘুরে ফাদার ফিনিয়ানের দিকে তাকাল। কোনও রকম অনুমোদন পাবার জন্য সে আর অপেক্ষা করছে বলে মনে হল না। বরং দেখা গেল টোকি আর তার বন্ধুরা তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারছে, অবশ্যই তাদের স্বকীয় পদ্ধতিতে। টোকির দৃষ্টিতে জ্বলজ্বল করছিল বন্ধুত্ব আর সাম্যের অনির্বচনীয় এক বার্তা।
ফাদার ফিনিয়ানের মধ্যে আনন্দের এক ঝলক খেলে গেল। তার অন্ত্রের বিকট যন্ত্রণাটা যেন আশ্চর্য এক যাদুতে বেমালুম হাওয়া হয়ে গিয়েছিল, আর তিনি ইতিমধ্যেই মনে মনে সারখানের দূরত্ব মাপতে শুরু করে দিয়েছিলেন, তাকে আর দেখে কে, এখান থেকে সারখানের দূরত্ব কতটা হতে পারে, এই নিয়ে ইতিমধ্যেই আপন মনে মাপজোকও করতে শুরু করে দিয়েছিলেন। আশা করছিলেন বার্মার এই জায়গা থেকে সারখানের খাবার নিশ্চয়ই খুব একটা আলাদা কিছু হবে না ।
বার্মা ছাড়ার আগে, ফাদার ফিনিয়ান তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে আরেকটা অনুচ্ছেদ যোগ করলেন। “যা মানবিক, এবং যথাযথ তা সবসময়ই দূর্বার গতিতে মানুষকে কাছে টানতে থাকে, এটা সত্যিই একটি শিখবার মতো বিষয়”, তিনি লিখলেন। “কমিউনিজমের মূল গলদটা হল, তারা তাদের নিজেদের মানুষের কাছেও অতি সাধারন ঘটনাগুলোকেও মুখোসের আড়ালে লুকিয়ে রাখে যা তাদের ধংসের মুখে ঠেলে দিতে একপ্রকার বাধ্য করে। আমেরিকানদের সঙ্গে রাশিয়ানদের পার্থক্য হল- আমেরিকানরা নির্ভুলভাবে যেটা করা প্রয়োজন, সেটাই শুধুমাত্র করে থাকে, অন্যদিকে রাশিয়ানরা যখন যেটা কার্যকরী বলে মনে হয় তা-ই করে, তা ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারে না।”
(চলবে)

Share Now শেয়ার করুন