উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৮]

0
302

পর্ব ৮

অধ্যায় – ৪

জো বিং-কে সব্বাই ভালোবাসে

ফাদার ফিনিয়ান বার্মা ভ্রমণে সবচেয়ে বেশি যার ওপর ভরসা করতে পারতেন তার নাম রুথ জ্যোতি, সেটক্যা ডেলি হেরাল্ডের সম্পাদক এবং প্রকাশক, এটি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নির্ভেজাল খাঁটি স্বাধীন খবরের কাগজগুলোর মধ্যে একটা। রুথই হলেন সেই মানুষ যিনি সবার আগে ফিনিয়ানের অ্যাডভেঞ্চারের বিষয়টা শোনেন এবং জনসমক্ষে আনেন। আর এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের খাতিরে তিনি উত্তর বার্মাতে একটা ভ্রমণেরও বন্দোবস্ত করে ফেললেন।
রুথ জ্যোতি গড়পড়তা ইউরেশিয়ানদের থেকে খানিকটা আলাদা। অ্যাংলো স্যাক্সনদের মতো তাঁর ফরসা ত্বক আর সোনালি চুল। বাদ বাকি আকার আকৃতি আর ধরন-ধারণ বিলকুল এশীয়দের মাফিক। কম্বোডিয়ান মায়ের হাত ধরেই তাঁর যাবতীয় উন্নতি ও শিক্ষা। একথা বলার অর্থ এই নয় যে ইউরোপীয় কিংবা আমেরিকানদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনের ব্যাপারটা জানতেন না তিনি। এশীয় সম্পাদক হিসেবে তাঁর খ্যাতি তাঁকে বহু বিদেশির সংস্পর্শে এনেছিল। তিনি ছিলেন সদ্য আঠাশ বছর বয়সের একজন আকর্ষণীয়, অবিবাহিত যুবতী।
রুথের সঙ্গে বহু আমেরিকানের ওঠাবসা ছিল। আসলে সেটক্যা শহরের যেখান থেকে তিনি তাঁর খবরের কাগজটা বের করতেন, সেখানকার একটা গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকান বিদেশি সেবাসংস্থায় ICA টেকনিসিয়ান, USIS সংবাদের দালাল আর সংস্কৃতির হোমড়া-চোমড়া এমন সব লোকজনের ভিড় ছিল যারা এককথায় বলা যায় একেবারে নরক গুলজার করে রাখত। এই আমেরিকানদের বেশিরভাগই সাহায্য বা পরামর্শের জন্য হামেশাই তাঁকে ডাকাডাকি করত, সুতরাং USIS যে তাঁকে আমেরিকায় আমন্ত্রণ জানাবে এটাই স্বাভাবিক।
১৯৫২-তে যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করতে মাস তিনেকের এক ভ্রমণ-প্রস্তাবে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। হাওয়াইতে পৌঁছে তিনি এই প্রথম আমেরিকার নিবিড় স্পর্শ অনুভব করলেন। অবশেষে স্বচক্ষে দেখার পর তিনি এর অনবদ্য সৌন্দর্য ও আকর্ষণে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বিদেশিদের জন্য সংরক্ষিত ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের ওয়েটিং রুমে বেশ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাঁকে। ঘরটা তেমন অপরিচ্ছন্ন কিংবা দেখতে খারাপ ছিল না; অবশ্য একথাও ঠিক যে এ সম্বন্ধে কেউ কখনও খুব একটা মাথা ঘামায়নি। এবং আধিকারিকেরা এ নিয়ে অপমানের বিষয়টাতে একরকম মুখে তালা এঁটেই ছিল।
কোনও সাংবাদিক তার প্রথম দেখার অভিজ্ঞতাটাকে নিয়ে সময় বরবাদ করবে নাকি স্রেফ পাত্তা না দিয়ে উড়িয়ে দেবে – এ বিষয়ে রুথ ছিলেন অত্যন্ত বাস্তববাদী একজন মানুষ। তিনি তাঁর নোটবইটা হাতে তুলে নিলেন।
হয়তো তারা বিশ্বাস করবে না, কিন্তু পরিদর্শকদের সুযোগ-সুবিধের ব্যাপারে আমেরিকানদের ব্যবস্থাপত্র কমিউনিস্ট চীনের থেকেও অপেক্ষাকৃত নিচু মানের, তিনি তাঁর নোটবুকে লিখে রাখলেন। চীনে কারখানা, গ্রাম অথবা ক্রীড়াক্ষেত্র যেখানেই তুমি থাকো না কেন – অন্তত একটা অতিথি নিবাস আছে। বাড়িগুলো কখনও কখনও কাঁচা হয় বটে, কিন্তু সবসময় সবচেয়ে ভালোটাই পাওয়া যায়। প্রচার হিসেবে এটা যে বেশ জুতসই- তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
যতক্ষণ না পথ-প্রদর্শক এসে পৌঁছান, তিনি সানফ্রান্সিসকোর বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে থাকেন। নিজেই Chronicle ও Examiner–এর দুটো কপি কিনে প্যান আমেরিকানের গেস্ট রুমে বসে পড়তে শুরু করলেন। যা খুঁজছিলেন সেরকম কোনও বিশেষ খবরের হদিস না পেয়ে তিনি সংবাদপত্র দুটোকে দ্রুত আদ্যোপান্ত পড়ে ফেললেন। হতাশার এক ভ্রুকুটি যেন তাঁর মুখময় ছড়িয়ে পড়ল এবং তিনি ফের তাঁর নোটবুকে ঢুকে পড়লেন।
আজ, সেটক্যায়, তিনি লিখলেন, উল্লেখযোগ্য সাতটি এশীয় জাতির প্রধানেরা সমবেত হচ্ছেন। এশীয়-আমেরিকান সম্পর্কের ওপর এই সম্মেলনের একটা গভীর প্রভাব পড়তে পারে; যদিও সানফ্রান্সিসকোর এই বড় দুটো কাগজের কোনওটিতেই সাউথ এশিয়ান ব্লক মিটিংটার একচিলতে উল্লেখ পর্যন্ত নেই।
আমি এই ভেবে আশ্চর্য হয়ে যাই কেন আমেরিকান সংবাদপত্রে এ জাতীয় এশীয় খবরগুলো ছাপা হয় না? আমি লক্ষ করেছি কাগজগুলোর শতকরা সত্তর ভাগ জায়গা খেয়ে ফেলে বিজ্ঞাপন আর কমিকস। কিন্তু একটা সাধারণ সিদ্ধান্ত নেবার আগে অবশ্যই অন্যান্য শহরের আরও কিছু খবরের কাগজ পড়ে দেখতে হবে।
এখন এয়ারপোর্টে যে গড়পড়তা আমেরিকান মহিলাদের দেখছি তাদের কথা বলি। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মহিলা স্ল্যাকস পড়েছে আর…
“মিস জ্যোতি?”
তিনি মুখ তুলে তাকালেন, “হ্যাঁ, বলুন”। প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই সৌম্যদর্শন এক ভদ্রলোক তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর কালো হোমবার্গটাকে সরিয়ে তিনি সামান্য ঝুঁকলেন।
“নমস্কার। আমি রাষ্ট্রদপ্তরের জোসেফ রিভারস। আমেরিকায় স্বাগত। ফাদার ফিনিয়ানের উপর লেখা আপনার প্রবন্ধটা সত্যি তারিফ করার মতো।”
“ধন্যবাদ, মি. রিভারস। এ আপনার মহানুভবতা।”
“কিন্তু এ কথা তো মানতেই হবে, মিস জ্যোতি, আধিকারিকের তকমা আঁটা একজন লোক আমাদের সরকারের খাতিরে যা না করতে পারত, ফাদার ফিনিয়ান সাধারণ নাগরিক হিসেবে একাই তার থেকে ঢের ভালো–ভালো কাজ করেছেন।”
“অবশ্যই, তা আর বলতে। এরকম ভাল কাজ যাতে আরও বেশি বেশি করে হয় তার জন্য আমেরিকা তার নিজের লোকজনদের বিশেষ উৎসাহিত করতে পারে, ধরে নিন আমার তরফ থেকে এটা একটা জরুরি পরামর্শ।”
মি. রিভারসের নিমেষে ধারালো হয়ে ওঠা চোখের দিকে তাকিয়ে রুথ কেবল হাসলেন। তাঁরা ফাদার ফিনিয়ানের কথা আপাতত তখনকার মতো মুলতুবি রাখলেন।
“মি. রিভারস, আপনার কাছে New York Times-এর একটা কপি হবে?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।
“নিশ্চয়ই, পেয়ে যাবেন,” ব্যস্ত-সমস্ত টারমিনালের ভেতর দিয়ে তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে মি. রিভারস বললেন। “কিছু যদি না মনে করেন, একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে ছিল মিস জ্যোতি, ঘটনাটা এখনও টাটকাই বলা যায়, আমাকে সেটক্যায় কয়েক দিনের জন্য থাকতে হয়েছিল, বুঝলেন। আচ্ছা, ওখানে
জো বিং নামের ভদ্রলোক কে তো চেনেন নিশ্চয়ই?”
উত্তরে তাঁর মাথা নাড়ানো দেখে রিভারস যেন সত্যিসত্যিই আকাশ থেকে পড়লেন।
“কী বলছেন? চেনেন না মানে, চিনতেই হবে আপনাকে! তিনি সেটক্যায় ICA-র তথ্যবিভাগের প্রধান। এইতো কয়েক সপ্তাহ আগে Life–এ তাঁকে নিয়ে একটা আর্টিকেলও বেরিয়েছে।”
“মি. রিভারস, সেটক্যায় Life ম্যাগাজিনটা যে আমাদের হাতে হাতে ঘোরে এমন ভুলেও ভাববেন না। আসলে দামটা বেশ চড়া।”
“সে যাই বলুন, জো বিং-কে কিন্তু না চিনে উপায় নেই আপনার। টানা ছ’ফুট লম্বা, মোটাসোটা চেহারার, টাটারসলের হাতকাটা গেঞ্জি পড়েন। আনন্দে ভরপুর। এক্কেবারে এলসা ম্যাক্সওয়েলের মতো মানুষ। সব্বাইকে চেনেন। এখনও মনে আছে বুঝলেন, তিনি হোটেল মোনট্যাইগনের ক্যাফেতে বসেছিলেন। সেখান দিয়ে যে যাচ্ছিল তার দিকেই হাত নাড়ছিলেন…”
“ইউরোপীয়, ককেশীয়, পাশ্চাত্য শিক্ষিত এবং মার্জিত পোশাক পরিহিত এমন মানুষদের দেখেই তিনি ঘাড় নাড়ছিলেন,” ঠাণ্ডা গলায় বললেন মিস জ্যোতি। “চিনতে পেরেছি এবার বজ্জাতটাকে, হুড খোলা যায় এমন একটা লাল গাড়ি রাস্তার ধার ঘেঁসে ফুটপাথের ওপর দিয়ে বেপরোয়াভাবে চালিয়ে যেতেন। আর হাসিটা এমনই বিচ্ছিরি বদখত ধরনের ছিল যা শুনে প্রায় প্রত্যেক এশীয়রই ভিরমি খাবার জোগাড় হত।”
“বুঝেছি, দেখুন, মিস জ্যোতি,” মি. রিভারস বললেন, “সেই ছেলেমানুষি আর নেই, জো এখন সংবাদপত্রের রীতিমতো একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি। উনি আমাদের এই সাহায্য সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে ওঁনার যাবতীয় নথিপত্র দিয়ে দেবেন।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানা আছে তিনি নিজেই চিঠি-চাপাটি পাঠাবেন নয়তো কোনও বার্তাবাহকের মারফত ওগুলো পৌঁছে দেবার একটা ব্যাবস্থা করে দেবেন,” মিস জ্যোতির কণ্ঠস্বরে কঠিন দৃঢ়তা। “আর ওঁনার তো ধরতে গেলে প্রতিমাসেই একটা না একটা বড়-সড় পার্টির তামাশা লেগেই থাকে যেখানে উনি বড়াই করে বলে থাকেন, খাবারের প্রত্যেকটা টুকরো এবং পানীয়ের প্রতিটি ফোঁটা এসেছে অদ্বিতীয় অনবদ্য আমেরিকা থেকে, এসেছে সামরিক খাদ্যসরবরাহকারী দোকানগুলো থেকে সস্তা পাইকারি দামে। গোড়ার দিকে, দু’বছর তাঁর একটা পার্টিতেও কোনও এশীয়কে দেখা যায় নি। যেখানে বৌদ্ধ এবং মুসলিম যারা কিনা পানীয় হিসেবে ফলের রস অথবা জল অথবা দুধ খায় সেখানে তাঁর প্রথম পার্টিতে ছিল শুধু মদ আর মদ। কেচ্ছাটা কিন্তু গুজবের মতো ব্যপক ছড়িয়ে পড়েছিল।”
“আসলে আক্ষেপটা কোথায় জানেন, আপনি জো-র চরিত্রের ভাল দিকগুলো দেখতে পাচ্ছেন না কারণ খুব কাছ থেকে ওঁনাকে জানার সৌভাগ্য আপনার হয় নি।” মি. রিভারস স্পষ্টতই অসন্তুষ্ট। মিস জ্যোতির চাঁচাছোলা বক্তব্যে তিনি সম্ভবত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর অবাক লাগছিল যে কীভাবে মিস জ্যোতি আমেরিকার বন্ধু হতে পারেন যিনি কিনা তখনও বয়স্ক জো সম্পর্কে নির্দ্বিধায় এমন সব যাচ্ছেতাই কথা বলে যাচ্ছিলেন। যাই হোক, প্রত্যেকেই জো বিং-কে ভালোবাসে, গোটা দপ্তরটাই ভালোবাসে। খবরের কাগজের লোকেরাও ভালোবাসে। তাঁরা নিক্সনের ভ্রমণের প্রোটোকল নির্মাণের জন্যও তাঁকেই নির্বাচন করেছে। সেই জো সম্বন্ধে এই সব বিষবাক্য উগরে দিয়ে তিনি কী তাঁকে জাহান্নমে পাঠাতে চাইছেন?”
“জানেন, আমি কিন্তু ফাদার ফিনিয়ানের কাছ থেকে জো বিং সম্পর্কে আগেই শুনেছিলাম,” সানফ্রান্সিসকোর উদ্দেশে লিমোসাইন গাড়িতে উঠে বসার সময় রুথ মিষ্টি করে বললেন। “ফাদার ফিনিয়ান তাঁকে লিখেছিলেন সেটক্যার আমেরিকান কমিশরি থেকে তাঁর জন্য বলপয়েন্ট পেন আনা সম্ভব কিনা, সেটা যদি একটু দেখে। ফাদার ফিনিয়ান আমাকে জো’র উত্তরটাও দেখিয়েছেন – ‘কমিশরির সকল সুযোগ-সুবিধা কেবল আমেরিকান সরকারি কর্মচারী এবং তাদের পরিবার পরিজনদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ’। ব্যাস এটুকুই।”
“দেখুন, আপনাকে তো কোথাও না কোথাও গণ্ডিটা টানতেই হবে, নাহলে তো প্রত্যেকেই কমিশরিতে ভিড় করবে,” মি. রিভারস বললেন।
“হুম্, আমিও তাই মনে করি। আসলে ফাদার ফিনিয়ান একটা ব্যক্তিগত উদ্দেশে পেনগুলো ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন – নেটিভদের নিজস্ব সংবাদপত্রটা যে সবচেয়ে বেশি বিলি করতে পারবে, তাকে উপহার দেওয়ার জন্য। প্রথম প্রথম এই কাগজটার নাম প্রায় শোনাই যেত না, কিন্তু পরে এটাই বার্মার অন্যতম জনপ্রিয় গ্রামীণ খবরের কাগজ হয়ে ওঠে।”
“আমরা সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে তাদের নিজেদের কাজকর্মের জন্য কমিশরির জিনিসপত্র ব্যবহার করতে দিতে পারি না, তাই নয় কী?”, মি. রিভারস একান্তভাবে বললেন।
“হ্যাঁ, আমি আপনার সঙ্গে একমত,” রুথ বললেন।
কথাবার্তার মোড় ঘুরিয়ে মি. রিভারস এবার গাড়ির পেছনের সিট থেকে আঙুল দিয়ে সানফ্রান্সিসকোর বিভিন্ন দৃশ্যের সঙ্গে রুথের পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন।

এর ঠিক দু’রাত পরের ঘটনা, সানফ্রান্সিসকোর প্রেস রুথের সম্মানে একটা জম্পেশ রকমের ডিনারের আয়োজন করে ফেলল এবং পেশাগত কারণে এশিয়ায় যে সমস্ত আমেরিকান কর্মচারীরা বসবাস করছেন তাঁদের সম্বন্ধে তাঁকে কিছু বলতে অনুরোধ করা হল। আমেরিকান আতিথেয়তা আর উপাদেয় সব খাবার-দাবার সম্পর্কে মাখন লাগানো কয়েকটা বাক্য খরচা করার পরে তিনি কোনও রকম রাখঢাক না রেখেই সরাসরি ঢুকে পড়লেন নিজের বিষয়ের গভীরে।
“শুনুন, এশিয়ায় আমেরিকানরা যে মারাত্মকভাবে সক্রিয় এমনটা ভাবার কোনও কারণ কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি না। এককথায় তাঁরা হল, যাকে বলে, ইনটেলেকচুয়াল ম্যাগিনট লাইন। আর একবার ঝাঁ-চকচকে অভিজাত, মোড়লগোছের আদমিদের নেক নজরে পড়ে গেলে তো রক্ষে নেই, তাঁরা ধরেই নেন, আহা, কী আহামরি কাজটাই না তাঁরা করছেন। দেখুন, এটুকু বোঝার মতো বুদ্ধি মনে হয় আমার মগজে আছে। আপনারা বিদেশি মুখগুলো দেখেন, অদ্ভুত ভাষাগুলো শোনেন – এই তো আপনাদের দৌড়ের বহর – সত্যি কথা বলতে কী, যদি খুব একটা ভুল না করি আপনারা প্রেসক্লাব কিংবা আমেরিকান ক্লাব আর নয়তো অফিসার্স ক্লাবেতেই নিজেদের একমাত্র স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। অথবা এমন কোনও জায়গায় যেখানে কলার ও টাই পরে শান্ত-সুবোধ সব মনুষ্য শাবকেরা ইংরেজিতে কথা বলে থাকেন। কলার ও টাই পরিহিত এশীয়রা যারা ইংরিজি বুলি কপচায় তারা তো আবার ভিন জাতের ভদ্রলোক এবং বেশিরভাগ আমেরিকানই, তাদের সঙ্গে আলাপ করতে গেলে কোনও না কোনও ভাবে হোঁচট খেতে থাকেন। এবং এটা আমার কাছে একটা চূড়ান্ত অনুতাপের বিষয় যে আপনাদের মধ্যে অধিকাংশেরই এ নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যাথা পর্যন্ত নেই। আমি এখন এখানে যদি আমেরিকানদের করে যাওয়া একের পর এক কেচ্ছাগুলো ফাঁস করতে শুরু করি তাহলে গোটা রাতটাই কাবার হয়ে যাবে। কিন্তু তার থেকে বোধ হয় একজন কর্মদ্যোগী আমেরিকান সম্পর্কে বলাটাই যুক্তিযুক্ত হবে।
“USIS-এর বব মাইল । তাঁর কথাটাই না হয় ভেবে দেখুন একবার। আমার কথা শুনে USIS-এর আগাগোড়া সব্বাই যে ভীষণ কর্মতৎপর এমনটা আবার ভেবে বসবেন না যেন। বরং তা সুদূর কল্পনামাত্র। যাই হোক, মনে রাখবেন, বব মাইল ছিলেন কিন্তু একজন সাচ্চা খাঁটি, কর্মঠ ভদ্রলোক। আমেরিকার মর্যাদা বৃদ্ধির খাতিরে এখানকার বাকিদের চেয়ে তিনি যা করেছেন তার কোনও তুলনা হয় না, নিজেকে নিঃশ্বেসে নিংড়ে দিয়েছেন – এমনকী আমি তো বলবো, রাষ্ট্রদূতের থেকেও বেশি।
“ঘটনাটা আপনাদের শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, তিনি পাঁচ মাস টানা সেটক্যায় ছিলেন, অথচ কোনও কাগজের সম্পাদকই তাঁর সম্পর্কে কিন্তু সামান্য টুঁ-শব্দটাও শুনতে পাননি। আসলে মজাটা কোথায় জানেন, যা হয় আর কী, যে কোনও আনকোরা USIS আধিকারিক এখানে এসেই সবচেয়ে আগে যে কাজটা করে থাকেন, সব কিছুর একেবারে দফারফা করে ছেড়ে দেন। মুখে ইংরিজি বকুনির ফোয়ারা – দেশের জন্য মস্তো-মস্তো সব পরিকল্পনার বাতেল্লা – কিন্তু আমাদের সম্পর্কে জানেন তো আসলে ঘোড়ার ডিম। এই ধরনের অকথ্য গলগণ্ডের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে প্রায় প্রত্যেক সাংবাদিককেই নির্দেশ দিতে দেখা যায় যে কোনও আমেরিকান যেন তাদের অফিসে সহজে পা গলাতে না পারে। আর যদি কেউ নেহাত গা জোয়ারি করে আমার অফিসে ঢুকে পরে, আমি যেন ইংরেজি বলতেই পারি না এমন একটা ভান করে মুখে কুলুপ এঁটে থাকি।
“ববের স্বভাবটা ছিল একদম আলাদা। টাইপসেটাররা তাঁর সম্মানে যে পার্টি দিয়েছিলেন সেখানে সস্ত্রীক তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। সে যাই হোক, রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে অগাধ প্রশ্রয় পাওয়া সত্ত্বেও উঁচু পদের ক্ষমতার জোর খাটিয়ে আমাদের কাজের সারে-সব্বোনাশ তো করলেনই, উপরন্তু মানুষটা আমাদের ভাষা আর দেশের সঙ্গে পরিচিত হবার আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। তিনি টাইপসেটার, রিপোর্টার, ফোটোগ্রাফার ও খবরের কাগজ বিলি করা সব ছেলেকে ইয়ার-দোস্ত বানিয়ে ফেললেন। ফোটোগ্রাফারদের দেখালেন কীভাবে তাদের ফিল্মে ASA স্পিড বাড়িয়ে ফ্ল্যাশ ছাড়াই স্পষ্ট ছবি তোলা যায়। তিনি তাদের কেমিক্যাল জোগাতে নিজেই এগিয়ে এলেন। ডার্করুমের জন্য কোথ্থেকে একটা ফ্যান জুটিয়ে নিয়ে খোদ নিজের ঘরেই আলো-আঁধারির পরিবেশ বানিয়ে ফেলেছিলেন।
“তিনি নিজের ঢাক নিজে না পিটিয়ে, সবার আড়ালে থেকে এই সমস্ত কাজ করেছিলেন। আর এর বদলে কী এমন আহামরি চেয়েছিলেন তিনি – তাঁকে আমাদের ভাষা শেখানো, ডরোথিকে আমাদের রান্নার রকম-সকম সম্পর্কে শিখিয়ে পড়িয়ে দেওয়া এবং তাঁর বাচ্চাদের আমাদের স্কুলে ভর্তি হবার জন্য সামান্য সহযোগিতা। সব বিষয়েই তাঁর এত বিনয় ছিল যে আপনারা ভাবতেও পারবেন না, তাঁর ধ্যান-ধারণা শুনে আপনাদের তাজ্জব লাগবে হয়তো, ভাবতেন, তিনি যা দিচ্ছেন তার থেকে অনেক বেশি ফেরত পাচ্ছেন।
“কী ভাবছেন আপনারা, এসব ছেলেখেলা নয়। আমি পশ্চিমি দুনিয়ার আদবকায়দা হাড়ে-মজ্জায় চিনি, বুঝতে পারি যে একজন আমেরিকান বাচ্চাকে নেটিভ স্কুলে পাঠাতে কতখানি বুকের পাটার দরকার হয়। আপনাদের মানের তুলনায় এশীয় স্কুলগুলো নোংরার অধম, নিয়ম-শৃঙ্খলার তো মা-বাপ নেই, ঝুট-ঝামেলার আখড়া এবং জীবাণুদের আঁতুর ঘর একেবারে, কী বলেন। মনে পড়ছে, ওদের কোনও একসময় এক বিশেষ ধরনের চর্মরোগ হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষে বিষে বিষক্ষয় হয়ে সেরেও গিয়েছিল – এ থেকে কিন্তু একটা ভাল শিক্ষা হয়েছিল ওদের, মন্দের ভাল বলতে পারেন, অন্য অনেক জাতের জীবাণুকে তারা চিনতে পেরে গিয়েছিল।
“আপনাদের একটা গল্প বলি, যা শুনে আমার তো মনে হয় আপনারা খবরের কাগজের লোকেরা বাহবা দিতে বাধ্য হবেন। বছর খানেক আগে এরকম একটা গপ্পো শোনা গিয়েছিল যে এক আমেরিকান সেনা মন্দিরের ভেতরে ঢুকে একটি বালিকাকে ধর্ষণ করেছে। এই মন্দিরের উল্লেখটাই পুরো ঘটনাটাকে একশ বছরের জলজ্যান্ত একটা কিসসা বানিয়ে তোলে। ধরে নিন যদি এটা খবরের কাগজের হেডলাইন হিসেবে ছেপে দিত তাহলে আমরা হয়তো আমেরিকানদের বিরুদ্ধে একটা তুমুল ধর্মযুদ্ধ বাধিয়ে বসতাম। সেটক্যার মুখ্য গণ-তথ্য আধিকারিক, যে মানুষটাকে আপনারা সম্ভবত অনেকেই চেনেন-জানেন, তিনি স্রেফ হাত-পা গুটিয়ে সেঁদিয়ে গিয়েছিলেন অফিসের ভেতরে। যেটাকে তিনি আদিখ্যেতা করে বলে থাকেন স্থানীয় কূটকচালগুলো তা তাঁকে কোনও দিন স্পর্শ পর্যন্ত করেনি। তার মানে বিষয়টাকে নিয়ে সাত তাড়াতাড়ি ওয়াশিংটনকে ব্যতিব্যস্ত করার মতো সময়ই ছিল না তাঁর হাতে।
“এমন ঢেঁকি গেলার মতো অবস্থায়, বব মাইল, সেটক্যায় সবচাইতে বড় কাগজ ও সংবাদসংস্থার সম্পাদককে দেখা করার জন্য ডেকে পাঠালেন। না, তিনি কাউকে ভয় দেখাননি, অথবা তথ্য গোপন করেননি, এমনকী এটাও বলেননি যে গল্পটা আমেরিকার পক্ষে বন্ধুত্বসুলভ হবে না। তিনি শুধু বললেন আমরা যদি আরও একবার সরেজমিনে তদন্ত করে নিই তবে কেমন হয়।
“এটা হল এমন একধরনের প্রস্তাব যা প্রবল বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছাড়া আর কারও কাছ থেকেই মেনে নেওয়াটা অসম্ভব। তাই তখন আমরা প্রায় চিরুনি তল্লাশির মতো এক অভিযান চালালাম – দেখা গেল এটা একটা বেবাক ভাঁওতাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে ঘটনাটা হয়েছিল কী, একজন আমেরিকান বেশ্যালয়ে গিয়েছিল, তা সেই বাবুটি বেশ্যাটিকে ছেড়ে আসার সময় তাকে তার পাওনা-গণ্ডা মেটাতে অস্বীকার করে, এর পেছনের কারণটা আর খোলসা করতে বলবেন না, শেষ অব্দি চিল চিৎকার, তারপর খেয়োখেয়ি মার্কা একটা ঝগড়াঝাঁটি বেধে যায়। এটা কি আদৌ কোনও খবরের কাগজের একটা অনুচ্ছেদেরও যোগ্য হতে পারে!
“বব তাঁর অফিসে কী করেন না করেন তা নিয়ে কখনওই তাঁকে খামোখা শোরগোল করতে শোনা যায় নি। করার দরকারও হতো না। আমাদের দেশে এই ভাল কাজগুলো বাঁশের তৈরি টেলিগ্রাফেও প্রচারিত হয়ে যায়। আমি দরাজ গলায় বলতে পারি, আমার দেশে বব মাইল হলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন আমেরিকান।
“আমি চাই সব আমেরিকানরাই তাঁর মতো হোক, যদি তারা ভেতর থেকে প্রকৃতই তাই হয়ে থাকে, তাহলে এশিয়ায় কমিউনিস্টদের বেশি দিন টিকে থাকার আশা বাস্তবিকই ছাড়তে হব।”

(চলবে)

Share Now শেয়ার করুন