উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল >> দ্য এনার্কি [পর্ব ২] >> তর্জমা : আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু >> ইতিহাসচিন্তা

0
301

উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল >> দ্য এনার্কি [পর্ব ২] 

প্রথম পর্বটি পড়ে না থাকলে নিচের লিংকে ক্লিক করুন। এরপরেই পড়তে পারবেন দ্বিতীয় পর্বটি।

https://www.teerandaz.com/%e0%a6%89%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%a1%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%87%e0%a6%b2-%e0%a6%a6%e0%a7%8d/

পর্ব ২

‘এনার্কি’ গ্রন্থের বিষয়বস্তু

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরা এই গ্রন্থের লক্ষ্য নয়; কোম্পানিটির বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণও প্রধান প্রতিপাদ্য নয়। বরং এতে এমন একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, কীভাবে লন্ডনভিত্তিক একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বিশাল উপমহাদেশে ১৭৫৬ সাল থেকে ১৮০৩ সালের মধ্যে নিজেদেরকে প্রচণ্ড ক্ষমতাধর মোগল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হওয়া সম্ভব হয়েছিল।
এই গ্রন্থে বলা হয়েছে, কোম্পানি কীভাবে তার প্রধান প্রতিপক্ষ – বাংলা ও অযোধ্যার নবাবদেরকে, টিপু সুলতানের মহীশূর সালতানাত ও বিশাল মারাঠা রাজাদের পরাস্ত করে সম্রাট শাহ আলমকে কোম্পানির পক্ষপুটে নিতে পেরেছিল। শাহ আলমের অদৃষ্টে ছিল তাঁর জীবনের পঞ্চাশ বছর ধরে ভারতের ওপর কোম্পানির একটির পর একটি হামলা এবং একটি সাধারণ বাণিজ্যিক কোম্পানি থেকে পরিপূর্ণ রাজক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা। বাস্তবিক পক্ষে শাহ আলমের জীবৎকালকে এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ বিবরণীর প্রধান দিক হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
বর্তমানে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিভঙ্গি যে, আগের প্রজন্মের ইতিহাসবিদরা অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতে “অন্ধকার যুগ” ছিল বলে যে বর্ণনা করেছেন, প্রকৃত অবস্থা বরং তার বিপরীত ছিল। মোগল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অবক্ষয়ের ফলে উপমাহাদেশের অন্যান্য অংশে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের সূচনা হয়েছিল এবং সাম্প্রতিক অনেক গবেষণায় আমাদের এ সম্পর্কিত ধারণা আরো গভীর হয়েছে। আঞ্চলিকভাবে অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের সকল জ্ঞানগর্ভ গবেষণায় যে তখনকার বিদ্যমান অরাজক পরিস্থিতির বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়েছে তা নয়। তবু সেই সময়ের অরাজ অবস্থা অষ্টাদশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় জুড়ে মোগল সাম্রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রভূমি, বিশেষ করে দিল্লি ও আগ্রার চারপাশের এলাকাগুলোকে নিঃসন্দেহে বিক্ষিপ্ত করে ফেলেছিল। ফকির খায়ের উদ্দিন এলাহাবাদী লিখেছেন, “বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির বিষয়গুলি রাখঢাক করে রাখার মতো ব্যাপার ছিল না এবং ভারতের শান্তিপূর্ণ রাজত্ব পরিণত হয়েছিল নৈরাজ্যের আবাসে (দর আল-আমান-ই হিন্দুস্থান দর আল-ফিতান গাশত)। একসময় মোগল রাজত্বের প্রকৃত সারবত্তা বলে আর কিছু ছিল না, এর অস্তিত্ব ছিল শুধু নামেমাত্র অথবা শুধু ছায়া।”
নৈরাজ্যের বাস্তবতা শুধু যে বিচ্ছিন্নভাবে ফকির খায়ের উদ্দিন ও গোলাম হুসাইন খানের মতো কয়েকজন মোগল ভদ্রলোকই লিপিবদ্ধ করে গেছেন তা নয়, ওই সময়ে ভারতে আগত প্রত্যেক পর্যটক সেসব তুলে ধরেছেন এবং আমার বিশ্বাস তখন সংশোধনবাদ হয়তো বেশ এগিয়ে গিয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ল’ এবং মোদেভ থেকে শুরু করে পোলিয়ার ও ফ্র্যাঙ্কলিন পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক প্রত্যক্ষদর্শী ভারত সম্পর্কিত মন্তব্যে বার বার ওই সময়ের সীমাহীন রক্তক্ষয় ও বিশৃঙ্খলা এবং ভারি সশস্ত্র প্রহরা ছাড়া দেশের অধিকাংশ স্থানে নিরাপদে চলাফেরা করা কঠিন ছিল বলে জানিয়েছেন। আসলে এসব প্রত্যক্ষদর্শীই সর্বপ্রথম ভারতে মহানৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বজায় থাকার ঘটনার বিবরণ সর্বসমক্ষে নিয়ে আসেন।
১৭৫০-এর দশক থেকে ১৭৭০-এর দশকের মধ্যে বহু যুদ্ধে কোম্পানি অংশগ্রহণ করেছে আর বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা লুণ্ঠনপ্রক্রিয়া এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে এবং দিল্লি থেকে দূরবর্তী প্রায় সকল এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়েছিল। এ কারণেই আমি এই গ্রন্থের শিরোনাম দিয়েছি ‘দ্য এনার্কি’ (নৈরাজ্য)।
ড্যালরিম্পেল বলেছেন, ওই সময়ের ভঙ্গুর, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এবং অতি সহিংস সামরিক ইতিহাস এবং এক ধরনের নতুন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে দীর্ঘস্থায়িত্ব দেওয়ার যে উদ্যোগকে মহিমান্বিত রূপ দেওয়ার জন্য রিচার্ড বার্নেট এবং কেমব্রিজে আমার পুরোনো শিক্ষক প্রফেসর ক্রিস বেইলি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, আমি সে বিষয়ে নিশ্চিত নই। এই ধরনের কাজ করতে গেলে বিভিন্ন পর্যায়ে যে ধরনের কাজ করতে হয় এবং তথ্য-উপাত্তকে বিন্যস্ত করতে হয়, সেই লক্ষ্যে তাদের কেউ এখন পর্যন্ত কিছু করেছেন কিনা জানা নেই।

ড্যালরিম্পেলের গবেষণার ধরন : বিষয়আশয়

‘দ্য এনার্কি’ গ্রন্থের ভিত্তি হচ্ছে প্রধানত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিজস্ব বিপুল সংখ্যক রেকর্ড, ডকুমেন্ট। কোম্পানির সদর দফতরের দলিল এবং লন্ডনের লিডেনহল স্ট্রিটে ডাইরেক্টরদের কাছে ভারতে কর্মরত কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রেরিত চিঠিপত্র, যেগুলো এখন লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরির অনেক কক্ষে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। ড্যালরিম্পেল আরো পরিপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ রেকর্ড পেয়েছেন লন্ডনে কোম্পানির ভারতীয় সদর দফতর, গভর্নমেন্ট হাউজ এবং কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে; যেগুলো স্থান পেয়েছে নয়া দিল্লির ন্যাশনাল আর্কাইভস অফ ইন্ডিয়াতে (এনএআই)। এসব জায়গাতেই তিনি তাঁর গবেষণার কাজগুলি করেছেন।

প্রথম অধ্যায়

১৫৯৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর উইলিয়াম শেক্সপিয়র যখন টেমস নদীর ভাটিতে সাউথওয়ার্কে অবস্থিত গ্লোব থিয়েটারের কাছেই নিজের বাড়িতে বসে ‘হ্যামলেট’-এর খসড়া নিয়ে ভাবছিলেন, সেখান থেকে এক মাইল উত্তরে নদীর অপর পারে বড়জোর বিশ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে অপরিকল্পিতভাবে অর্ধেকটা কাঠ দিয়ে নির্মিত টিউডর আমলের ধাঁচে খোপ খোপ জানালা শোভিত আলোকোজ্জ্বল ভবনে জড়ো হয়েছিলেন বিচিত্র রঙয়ের পোশাক পরিহিত লন্ডনের কিছু বাসিন্দা।
ওই সময়ের সেই সমাবেশকে ঐতিহাসিক বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং মুরগেট ফিল্ডসের অদূরে ফাউন্ডার্স হলে এলিজাবেথীয় যুগের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকদের সভার কার্যবিবরণী লিপিবদ্ধ করার জন্য কালি ও পাখির পালকের কলম নিয়ে উপস্থিত ছিলেন নোটারিগণ। উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে শীর্ষ অবস্থানে থাকা মোটাসোটা গড়নের ও লাল রঙয়ের পুরু সূতির জামা পরিহিত লর্ড মেয়র স্যার স্টিফেন সোয়াম, যার গলায় ঝুলতো সোনার চেইন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুই পূর্বসূরী মেয়র এবং পৌরসভার বেশ ক’জন পদস্থ প্রতিনিধি – এলিজাবেথীয় যুগের মাখনের রঙের মতো ধ্বধবে চেহারার নগরবাসী, তাদের শুভ্র-দাড়িশোভিত মুখ দেখে মনে হয় যেন গলার চারপাশে পেচানো বস্ত্রের মাঝে মুখগুলো বসানো। লোকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন ছাগুলে দাড়িবিশিষ্ট, নিখুঁতভাবে ছাঁটা গোঁফ ও মাথায় খাড়া হ্যাট পরা লন্ডন নগরীর অডিটর স্যার টমাস স্মিথ, যিনি গ্রিসের বিভিন্ন দ্বীপ থেকে কিশমিশ ও আলেপ্পো থেকে মশলা আমদানি করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছিলেন। কয়েক বছর আগে অডিটর স্মিথ তাঁর বাণিজ্যিক অভিযাত্রার চালিকাশক্তি হিসেবে লেভ্যান্ট কোম্পানি থেকে সহায়তা পেয়েছিলেন তাঁর উদ্যোগেই এই সভার আয়োজন করা হয়েছিল।
লন্ডন নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এসব নাদুসনুদুস ব্যক্তি ছাড়াও সম্পদ বৃদ্ধি করার ব্যাপারে আগ্রহী এবং বিক্ষিপ্ত ধরনের অভিলাষ পোষণকারী ও সমাজের উপরি-কাঠামোতে স্থান করে নিতে ব্যগ্র স্বল্প গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যবসায়ী, যাদের পেশাগত পরিচয় সম্পর্কে নোটারিগণ নিষ্ঠার সাথে টুকে নিয়েছেন : ‘মুদি দোকানি, বস্ত্র ব্যবসায়ী ও সেলাইয়ের উপকরণ বিক্রেতা, একজন বস্ত্র শ্রমিক, একজন মদ্য বিক্রেতা, একজন চামড়া ব্যবসায়ী এবং একজন চর্মকার। এছাড়া ওলউইচ ও ডেপ্টফোর্ড বন্দর থেকে আগত কিছু ভীরু সৈনিক, নাবিক ও সাগর ফেরা শশ্রুমণ্ডিত অভিযাত্রী, যাদের মধ্যে কেউ কেউ এক দশক আগে স্প্যানিশ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এবং তাদের গায়ে আঁটসাট জ্যাকেট ও কানে সোনার দুল, বেল্টে একটু আড়াল করে গোঁজা ছুরি। এই নাবিকদের অনেকে ফ্রান্সিস ড্রেক ও ওয়াল্টার র্যা লেকে দেখেছেন ক্যারিবীয় উষ্ণ পানিতে মূল্যবান সম্পদবাহী স্প্যানিস জাহাজের বিরুদ্ধে তাদের তৎপরতা প্রদর্শন করতে। এখন তারা নোটারিদের কাছে নিজেদেরকে এলিজাবেথীয় যুগের শোভনতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বর্ণনা করছেন ‘প্রাইভেটিয়ার’ বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নৌযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিক হিসেবে। আরো কিছু সংখ্যক অভিযাত্রী ও পর্যটক ছিলেন, যারা তাদের উদ্যোগে আরো এগিয়ে ছিলেন; সুমেরু অঞ্চলে অভিযান পরিচালনাকারী উইলিয়াম বাফিন, যার নামানুসারে গ্রীনল্যান্ড থেকে একটি জলসীমার দ্বারা বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের নামকরণ করা হয়েছে ‘বাফিন ল্যান্ড’ এবং সেই জলসীমার নাম রাখা হয়েছে ‘বাফিন বে’। সবশেষে যার বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তিনি হচ্ছেন তরুণ রিচার্ড হাকলুয়াত, যিনি নিজের পরিচয় লিখেছেন ‘ইস্ট ইন্ডিজ অভিযানের ইতিহাসবিদ’ হিসেবে। ‘স্পাইস রুটস’ বা মশলার পথ সম্পর্কে ইংল্যান্ডে তখন যা জানা যেত তা লিপিবদ্ধ করার জন্য অভিযাত্রীরা তাঁকে ১১ পাউন্ড ১০ শিলিং পরিশোধ করেছিলেন।
একই ছাদের নিচে এমন বিচিত্র ধরনের একদল লোকের সমাবেশ খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু তারা সকলে জড়ো হয়েছিল একটি উদ্দেশ্যে : ছেষট্টি বছরের বয়োবৃদ্ধা মাথায় পরচুলা পরিহিতা রানি প্রথম এলিজাবেথের কাছে ইস্ট ইন্ডিজ এবং অন্যান্য দ্বীপ ও বিভিন্ন দেশে ব্যবসা পরিচালনার জন্য একটি কোম্পানি চালু করার অনুমতি চেয়ে দরখাস্ত করা; যাতে ওইসব দ্বীপ, ভূখণ্ড ও দেশের পণ্য ক্রয় অথবা প্রস্তুত পণ্য – অলঙ্কার, তৈজসপত্র ইত্যাদি বিনিময় করার জন্য অভিযানে বের হওয়া সম্ভব হয়।
দুই দিন আগে স্মিথ ১০১ জন ধনবান ব্যবসায়ীকে জড়ো করেছিলেন এবং তাদেরকে প্রতিশ্রুতি প্রদানের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন যাতে তারা প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে ১০০ পাউন্ড থেকে ৩,০০০ পাউন্ড পর্যন্ত চাঁদা প্রদান করেন – ওই সময়ের বিচারে এই অর্থ ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ। সব মিলিয়ে স্মিথ ৩০,১৩৩ পাউন্ড ৬ শিলিং ৮ পেন্স সংগ্রহ করেন। বিনিয়োগকারীরা এটি করেন একটি চুক্তিনামার অধীনে এবং চাঁদার বহিতে প্রত্যেকে নিজের হাতে চাঁদার পরিমাণ লিখে দেন। এরপর তারা, “আমাদের জন্মভূমির মর্যাদা এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে ব্যবসা ও পণ্যসামগ্রীর উন্নয়নের” ঘোষণা দেন।
ইতিহাসকে পেছনের দিক থেকে পাঠ করলে অনেক সময় ভুল করা হয়। আমরা জানি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক সময়ে এতো বিশাল হয়ে ওঠেছিল যে তারা প্রায় অর্ধেক পৃথিবীর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতো এবং ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী কর্পোরেশন হয়ে উঠেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্পর্কে এডমন্ড বার্কের বিখ্যাত উক্তি ছিল : “ব্যবসায়ীর ছদ্মাবরণে তারা ছিল একটি রাষ্ট্র।” অতীতের পানে তাকালে মনে হয়, কোম্পানির উত্থান অনিবার্য ছিল। কিন্তু ১৫৯৯ সালে ঠিক সেভাবে বিবেচনা করা হয়নি। কারণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কয়েকটি উদ্যোগ থেকে এর সাফল্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ওই সময়ের ইংল্যান্ড তুলনামূলকভাবে দরিদ্র এবং ব্যাপকভাবে কৃষিনির্ভর ছিল, দেশটি প্রায় এক শতাব্দীকাল তখনকার সবচেয়ে বিভাজন সৃষ্টিকারী বিষয় ধর্ম নিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করেছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক বিজ্ঞ মানুষের কাছে এই যুদ্ধকে ইচ্ছাকৃত আত্মবিধ্বংসী কাজ বলে মনে হয়েছে, যার পরিণতি হিসেবে ইংরেজ জাতি ইউরোপের অধিকাংশ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদেরকে এককভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল এবং বহু ইউরোপীয়র দৃষ্টিতে নিজেদেরকে পরিণত করেছিল অনেকটা নিচু জাতিতে। ফলে তারা তাদের হতবুদ্ধি হয়ে পড়া প্রতিবেশীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন বাজার অনুসন্ধান ও বাণিজ্যিক সুবিধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিশ্ব চষে বেড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এটি তারা করেছিল জলদস্যুতার উদ্যমে।
স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক ছিলেন এদের অগ্রণী একজন দস্যু। তিনিই সবকিছু স্থির করেন। ড্রেক ১৫৬০ এর দশকের শুরুর দিকে একজন জলদস্যু হিসেবে পানামার জলাভূমির মধ্যবর্তী সরু রাস্তা দিয়ে খনি থেকে বন্দরের উদ্দেশে রূপা বহনকারী স্প্যানিশ গাধার বহরে হামলা চালিয়ে তাঁর পরিচিতি লাভ করেছিলেন। এসব হামলা থেকে অর্জিত মুনাফা দিয়ে তিনি ১৫৭৭ সালে ‘গোল্ডেন হিন্ডে’র জাহাজে তিন বছরের জন্য সমুদ্রপথে পরিভ্রমণে বের হন। এটি ছিল নৌপথে বিশ্বপরিভ্রমণের তৃতীয় উদ্যোগ এবং এটি সম্ভব হয়েছিল কম্পাস ও ভূগোলকের বিকাশের ফলে – এবং পর্তুগাল ও স্পেনের সঙ্গে ইংরেজ জাতির সম্পর্কের অবনতি ঘটার কারণে।
সোনা, রূপা, মশলা, মাদক ইত্যাদি আহরণের বিরাট আশা নিয়ে ড্রেক সমুদ্রযাত্রা শুরু করলেন এবং আইবেরীয় জাহাজের ওপর একের পর এক হামলা চালিয়েও তাঁর যাত্রা অব্যাহত রাখেন। মূল্যবান পণ্যসামগ্রী বোঝাই একটি পর্তুগিজ জাহাজ দখল করার পর ড্রেক এক লাখ পাউন্ড মূল্যের সোনা, রূপ, মুক্তা ও মূল্যবান রত্ন-পাথর নিয়ে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। আবিস্কারের জন্য সমুদ্র অভিযানের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে লাভজনক অভিযান।
ওই সময়ে সমৃদ্ধ আইবেরীয় সাম্রাজ্য দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্য আমেরিকাকে নিয়ন্ত্রণ করতো, যা ইংল্যান্ডের রাজার লাইসেন্সপ্রাপ্ত ছিল এবং এর ফলে তারা অনিবার্যভাবে এলিজাবেথীয় যুগের রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত সংগঠিত অপরাধীচক্র হিসেবে হোয়াইটহল ও চ্যারিং ক্রসের ক্ষমতাশালী অভিজাতদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। কিন্তু তারা ড্রেকের হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। ড্রেকের প্রতিদ্বন্দ্বী স্যার ওয়াল্টার র্যা লে ও তাঁর নাবিকরা যখন অনুরূপ এক অভিযান শেষ করে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন, তখন স্পেনের রাষ্ট্রদূত তাদেরকে নিন্দা করে বলেন : “জলদস্যু, জলদস্যু, জলদস্যু।”
স্প্যানিশ রাষ্ট্রদূত যাদেরকে জলদস্যু বলে বিবেচনা করেছেন তাদের অনেকেই সেদিন ফাউন্ডার্স হলের সভায় উপস্থিত ছিলেন। কোম্পানির সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা জানতেন যে, জলদস্যু হিসেবে এইসব নাবিক ও অভিযাত্রীদের মেধা যাই থাকুক না কেন, তখন পর্যন্ত তারা দূরের কোনো ভূখণ্ডে বাণিজ্যদক্ষতা প্রদর্শনে অথবা কোনো কলোনি স্থাপন করে ধৈর্যের সাথে তা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সামান্যই সাফল্য প্রদর্শন করতে পেরেছে। বাস্তবিক পক্ষে অনেক ইউরোপীয় প্রতিবেশী দেশের তুলনায় উভয় ক্ষেত্রেই ইংরেজরা অপেশাদারের পর্যায়ে ছিল।
মশলা-দ্বীপের উদ্দেশে কাহিনিতূল্য উত্তর-পশ্চিম দিকে তারা যে-পথের অনুসন্ধান করছিল, তার বিপর্যয়মূলক সমাপ্তি ঘটে গেছে। পরিকল্পনা অনুসারে তারা মালাক্কায় পৌঁছার পরিবর্তে আর্কটিক চক্রের প্রান্তে উপনীত হয়ে তাদের জাহাজসহ বরফের মধ্যে আটকা পড়ে। হিমশৈলের আঘাতে জাহাজের বহিঃগাত্রে ফাটল সৃষ্টি হয় এবং শ্বেত-ভল্লুকের থাবায় জাহাজের অনেক নাবিক ধরাশায়ী হয়। আয়ারল্যান্ডে প্রোটেস্টান্ট ভাবধারার উন্মেষ ঘটানোর যে উদ্যোগ তারা গ্রহণ করেছিল, তা রক্ষা করতেও তারা ব্যর্থ হয় ১৫৯৯ সালে ভয়াবহ হামলার কবলে পড়ার কারণে। ক্যারিবিয়ায় দাস ব্যবসার ওপর আধিপত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে ইংরেজরা যে চেষ্টা চালিয়েছিল, তাও সফলতার মুখ দেখেনি এবং উত্তর আমেরিকায় একটি ইংরেজ কলোনি স্থাপনের উদ্যোগ সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
১৫৮৪ সালে স্যার ওয়াল্টার র্যা লে চেসাপেক উপসাগরের দক্ষিণে রোনোকে’তে প্রথম ব্রিটিশ বসতি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার সম্রাটের নামে এলাকাটির নামকরণ করেন ‘ভার্জিনিয়া’। কিন্তু সেই কলোনি বড়জোর এক বছর টিকে ছিল এবং ১৫৮৬ সালের জুন মাসে সেটি পরিত্যক্ত হয় এবং উদ্বারকারী জাহাজ সেখানে পেঁছে জায়গাটি পরিত্যক্ত দেখতে পায়। জাহাজভর্তি আগ্রহী ব্যক্তিবর্গ, যারা বসতি স্থাপনে আগ্রহী ছিল, তারা জাহাজ থেকে লাফিয়ে সৈকতে অবতরণ করে এবং সম্পূর্ণ ভাঙাচোরা অবস্থায় কিছু বাড়িঘর দেখতে পায়। একটি কঙ্কাল এবং একটি গাছে ইংরেজি বড় অক্ষরে স্থানীয় ইন্ডিয়ান উপজাতির নাম CROTOAN খোদাই করা ছাড়া বসতি স্থাপনকারীদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তার কোনো ইঙ্গিত তারা পায়নি। দুই বছর আগে ওয়াল্টার র্যা লে যে ৯০ জন পুরুষ, ১৭ জন নারী, ১১টি শিশুকে রেখে গিয়েছিলেন, তাদের কোনো নিশানা খুঁজে পাওয়া যায়নি। বসতি স্থাপনকারীরা যেন বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল।
এমনকি সেদিন ফাউন্ডার্স হলের বৈঠকে যে দু’জন অত্যন্ত অভিজ্ঞ নাবিক ও লন্ডনে বসবাসকারী প্রাচ্য-অনুসন্ধানকারী উপস্থিত ছিলেন, তারাও তাদের অভিযাত্রা থেকে চমকপ্রদ কিছু কাহিনির অতিরিক্ত কিছু প্রদর্শন করতে পারেননি। তাদের জাহাজের নাবিক ও মালামাল কোনোকিছুই অক্ষত ছিল না।
প্রথম উদ্যোগটি ছিল রালফ ফিচের। ১৫৮৩ সালে তিনি ‘টাইজার’ নামে একটি জাহাজে ফলমাউথ বন্দর থেকে যাত্রা করেন। অডিটর স্মিথের নতুন ‘লেভান্ট কোম্পানি’ তাকে প্রাচ্যের উদ্দেশে প্রেরণ করে মশলা কেনার জন্য। ফিচ ল্যাভেণ্টাইন উপকূল থেকে আলেপ্পো হয়ে অগ্রসর হয়ে হরমুজ পর্যন্ত পৌঁছার আগেই গুপ্তচর হিসেবে গ্রেফতার হন পর্তুগিজদের হাতে। সেখান থেকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় গোয়া’য় পাঠানো হয়, যেখানে তাঁকে হুমকি প্রদান করা হয় যে তাঁর হাত পেছনে বেঁধে উঁচু জায়গায় তুলে সেখান থেকে মাটিতে নিক্ষেপ করার মতো শাস্তি প্রদান করা হবে, যা তখনকার সময়ে প্রচলিত কঠোর শাস্তি এবং এটি এলিজাবেথ-পন্থীদেরও পছন্দের শাস্তি ছিল।
ফ্লিচকে পালাতে সাহায্য করেন গোয়াভিত্তিক একজন ইংরেজ জেস্যুইট ফাদার থমাস স্টিভেন্স, যিনি তাঁর জামিন হন এবং ফ্লিচ মুক্তি পেয়ে দাক্ষিণাত্যের সমৃদ্ধ সালতানাত সফর করার পর ষোড়শ শতাব্দীর মোগল রাজধানী আগ্রায় পেঁছেন এবং সেখান থেকে বাংলা হয়ে মালাক্কায় যান। তিন বছর পর লন্ডনে ফিরে তিনি তাঁর কাহিনি বর্ণনা করে নগরবাসীর মন জয় করেন এবং এমন এক কীর্তিমান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন যে শেক্সপিয়র ‘ম্যাকবেথ’- এর তাঁর জাহাজের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেছিলেন : her husband is to Aleppo, master o’ th Tiger’. কিন্তু রালফ ফ্লিচ গোলমরিচের ব্যবসা সম্পর্কিত বহু মজার কাহিনি সাথে নিয়ে এলেও তিনি কোনো গোলমরিচ না নিয়েই দেশে ফিরে এসেছিলেন।
মশলার ব্যবসায়ে প্রবেশ করার জন্য লেভ্যান্ট কোম্পানির পরবর্তী উদ্যোগ ছিল সমুদ্রপথে, যা আরো বিপর্যয়কর ছিল। কেপ হয়ে প্রাচ্যে পৌঁছার জন্য ইংরেজদের প্রথম প্রচেষ্টা ছিল ১৫৯১ সালে স্যার জেমস ল্যাঙ্কাস্টারের ভারত মহাসাগরে অভিযাত্রা। এ অভিযানের জন্য তহবিল সংস্থান ও জাহাজকে অস্ত্রসজ্জিত করেছেন অডিটর স্মিথ ও তার লেভ্যান্ট কোম্পানি। কিন্তু এ উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী ল্যাঙ্কাস্টারের চারটি জাহাজের মধ্যে মাত্র একটি জাহাজ ‘এডওয়ার্ড বোনাবেঞ্চার’ ইন্ডিজে ফিরে আসতে সক্ষম হয় এবং গুটিকয়েক নাবিককে নিয়ে। জীবিত ছিল মাত্র পাঁচজন লোক এবং একটি বালক। তারা জাহাজে নিয়ে এসেছিল গোলমরিচ, যা তারা ইতিপূর্বে লুট করেছিল একটি পর্তুগিজ জাহাজ থেকে। ঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজ ধ্বংস হওয়ায় ল্যাঙ্কাস্টার স্বয়ং তাঁর নাবিকদের নিয়ে কমোরো দ্বীপে আটকা পড়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ১৫৯৪ সালে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন। পথে তিনি অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন, নাবিকরা স্কার্ভি রোগে আক্রান্ত হয়, তিনটি জাহাজ হারান এবং রুদ্ধ দ্বীপবাসীদের দ্বারা তাঁর প্রায় সকল সহ-নাবিককে বর্শাবিদ্ধ হতে দেখেন। এই অভিযাত্রা আর্থিকভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলেও সৌভাগ্যবশত লেভ্যান্ট কোম্পানির সম্পদ ছিল প্রচুর। ফলে তারা ক্ষয়ক্ষতি সামলে উঠেছিল।
দুর্দশাগ্রস্থ, জরাজীর্ণ ইংরেজ জলদস্যুদের বিপরীতে তাদের চেয়ে অধিকতর আধুনিক পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রায় একশ বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে লাভজনক ও বিশ্বজনীন সাম্রাজ্য গড়ে তোলার কাজে ব্যস্ত ছিল। ‘নতুন পৃথিবী’ থেকে বিপুল পরিমাণে সোনা আমদানির ফলে স্পেন ইউরোপের সবচেয়ে ধনী দেশে পরিণত হয়েছিল এবং পর্তুগাল সমুদ্রে ও প্রাচ্যের মশলার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা পর্তুগালকে ইউরোপের দ্বিতীয় সেরা ধনী রাষ্ট্রের মর্যাদা দিয়েছিল। ইংরেজদের জন্য স্বস্তির ব্যপার ছিল যে আইবেরীয়দের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ছোট্ট ও সদ্য স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হল্যান্ড, যার জনসংখ্যা ছিল ইংল্যান্ডের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম এবং তারা মাত্র বিশ বছর আগে ১৫৭৯ সালে স্পেনের শাসনবলয় থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করেছিল।
ওলন্দাজদের সাম্প্রতিক সাফল্য ছিল যে তারা লন্ডনবাসী বিচিত্র ধরনের এই দলটিকে এক করতে পেরেছিল। তিন মাস আগে ১৯ জুলাই ওলন্দাজদের ‘দূরবর্তী দ্বীপসমূহের কোম্পানি’র এডমিরাল জ্যাকব কর্নেলিসজুন ভ্যান নেক ইন্দোনেশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে মশলা – ৮০০ টন গোলমরিচ, ২০০ টন লবঙ্গ, প্রচুর পরিমাণে দারুচিনি ও জায়ফল নিয়ে আসেন। এই অভিযানে চারশ’ শতাংশের মতো মুনাফা অর্জিত হয়, যা ছিল নজীরবিহীন। ঈর্ষান্বিত ল্যাভেণ্ট কোম্পানির একজন পর্যবেক্ষক লিখেছেন, “আগে আর কখনো এতো সমৃদ্ধ পণ্যবোঝাই জাহাজ হল্যান্ডে পৌঁছেনি।” ওলন্দাজ জাতির নৌযাত্রার সাফল্য লাভের পর আগস্ট মাসের মধ্যে ইংলিশ ব্যবসায়ীরা আগের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দালালদের মাধ্যমে মশলা কেনার পরিবর্তে ওলন্দাজদের মতো অনুরূপ সমুদ্র যাত্রার জন্য একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। কারণ মধ্যসত্বভোগী দালালরা তাদের কমিশন তিন গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। অতএব তারা সরাসরি উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে পৃথিবীর অর্ধেকটা পথ অতিক্রম করে ইস্ট ইন্ডিজে যাওয়ার কথা বিবেচনা করে। এই উদ্যোগের প্রধান ব্যক্তিদের মধ্যে পুনরায় স্মিথের লেভ্যান্ট কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরকে দেখা যায়, যাদের উপলব্ধি সম্পর্কে গ্রীক দ্বীপ চিওস থেকে একজন লিখেছিলেন যে, ওলন্দাজদের এই ব্যবসা “ইন্ডিজে ব্যবসা পরিচালনা আলেপ্পোতে আমাদের লেনদেনের আলোচনাকে বাতিল করে দিয়েছিল।”
পানিতে আঁকড়ে ধরার জন্য শেষ খড়কুটার মতো আশা জাগলো যখন প্রাচ্যের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রার জন্য ইংলিশ জাহাজ কেনার জন্য একটি ওলন্দাজ প্রতিনিধিদল লন্ডনে আসে। এলিজাবেথীয় যুগের লন্ডনের জন্য এটি বেশ অহঙ্কারের ব্যাপার ছিল। আর্মস্টারডাম থেকে আগত প্রতিনিধিরা হামবার্গ কোম্পানির পুরোনো স্টিলইয়ার্ডে অপেক্ষা করছিলেন। তাদেরকে বলা হয়, “আমাদের লন্ডনের ব্যবসায়ীদের জন্য সবগুলো জাহাজের প্রয়োজন পড়বে এবং ওলন্দাজদের কাছে একটি জাহাজ বিক্রি করা সম্ভব নয়। আমরা অবিলম্বে ইস্ট ইন্ডিজে ব্যবসা পরিচালনার অভিযানে যেতে আগ্রহী।” ফাউন্ডার্স হলের সমাবেশের ফলাফল হিসেবেই একথা বলা হয়েছিল। তারা এলিজাবেথের প্রিভি কাউন্সিলে পেশকৃত তাদের দরখাস্তে উল্লেখ করেন যে, জন্মভূমির অভিন্ন কল্যাণের লক্ষ্যে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য তারা ওলন্দাজ ব্যবসায়ীদের চেয়ে কোনোভাবেই কম আবেগ অনুভব করেন না – “আমাদের জন্মভূমির মর্যাদার জন্য এবং বাণিজ্য এগিয়ে নেওয়ার জন্য চলতি বছরই আমরা ইস্ট ইন্ডিজের উদ্দেশ্যে অভিযান পরিচালনা করতে চাই।”
অভিযানের জন্য যারা তহবিল সংস্থান করেছিল তাদের এক-চতুর্থাংশ এবং এ উদ্যোগের মূল পনের জন পরিচালকের মধ্যে সাত জনই ছিলেন লেভ্যান্ট কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। সঙ্গত কারণেই তারা শঙ্কিত ছিল যে ওলন্দাজরা মশলার ব্যবসায়ে তাদের বিদ্যমান বিনিয়োগ বিনষ্ট করে ফেলেছিল এবং তারা শুধু বিনিয়োগের এক-তৃতীয়াংশ যোগানই দেয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ের সভাগুলো অনুষ্ঠানের জন্য অনেক জাহাজ ও অফিস ব্যবহার করেছে। লন্ডনের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা ইস্ট ইন্ডিজে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন তারা মূলত লেভ্যান্ট কোম্পানির অংশ ছিলেন এবং তাদের শেয়ার হোল্ডারদের জন্য দূরপ্রাচ্যে বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশে সমুদ্রপথের বিকাশ ও যত অধিক পরিমাণে সম্ভব পুঁজি সংগ্রহের কৌশল উদ্ভাবন করছিলেন।
এ কারণেই স্মিথ ও তাঁর সহযোগীরা নতুন একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা এবং যে কোনো ব্যক্তির নিকট থেকে চাঁদা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, যাতে শুধু তারা শুধু নিজেদের মধ্যেই একচেটিয়া মুনাফার সুবিধা সীমাবন্ধ না রাখেন। এটি ঠিক সুনির্দিষ্ট তেপ্পান্ন জন বিনিয়োগকারীর লেভ্যান্ট কোম্পানির মতো হবে না, বরং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই সকল বিনিয়োগকারীর জন্য উন্মুক্ত জয়েন্ট স্টক করপোরেশন হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা কাজ করেছে। স্মিথ ও তাঁর সহযোগীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, যেহেতু সমুদ্রপথে এ ধরনের ব্যবসায়ের ব্যয় বিপুল এবং ঝুঁকিও অধিক, সেজন্য যৌথ বিনিয়োগ ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া এতো দূরবর্তী স্থানে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। শত হলেও এ ধরনের ব্যবসায়ের ব্যয় অকল্পনীয়ভাবে অধিক। তারা যেসব পণ্য কিনতে আগ্রহী সেগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সেগুলো বড় ও দামী জাহাজে পরিবহন করতে হয় এবং প্রয়োজন পড়ে অধিক সংখ্যক নাবিক, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাগে দক্ষ গোলন্দাজ ও পেশাদার বন্দুকধারীদের। তাছাড়া সবকিছু যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হয় তাহলেও বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত বিনিয়োগ থেকে কোনো লাভ আসবে না।
জয়েন্ট স্টক কোম্পানির ধারণা টিউডর যুগের ইংল্যান্ডের উজ্জ্বল ও বিপ্লবী উদ্ভাবনগুলোর অন্যতম। মধ্যযুগীয় কারিগরদের যৌথ সংগঠনের ধারণা থেকে এভাবে সংগঠিত হয়ে ব্যবসা পরিচালনার কথা ভাবা হয়েছে, যখন ব্যবসায়ী ও পণ্য প্রস্তুতকারীরা তাদের পণ্য একসাথে জড়ো করতো বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে যেসব পণ্য কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে বাজারজাত করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু জয়েন্ট স্টক কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল যে কোম্পানির পক্ষে নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করা সম্ভব, যাদের নগদ অর্থ রয়েছে কোনো উদ্যোগে বিনিয়োগ করার, কিন্তু তারা নিজেরা সে উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন না। যে কেউ এ ধরনের শেয়ার কিনতে বা বিক্রয় করতে পারেন এবং চাহিদা ও ব্যবসার সাফল্যের ওপর এই শেয়ারগুলোর মূল্যবৃদ্ধি ও হ্রাস পেতে পারে।
এ ধরনের একটি কোম্পানি হবে যৌথ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত – অর্থাৎ এটি হবে একটি কর্পোরেশন এবং এর একটি আইনগত পরিচয় এবং একধরনের যৌথ অনৈতিকতাও থাকবে, যা কর্পোরেশনকে কোনো শেয়ার হোল্ডারের মৃত্যুর ঘটনাকে অগ্রাহ্য করার অধিকার প্রদান করবে। আইন বিষয়ক পণ্ডিত উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোন লিখেছেন, “প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনের পরও টেমস নদী এখনো যেমন একই নদী রয়ে গেছে, ঠিক একইভাবে কোম্পানিও ঠিক একই বৈশিষ্ট ধরে রেখেছে।”
এর চল্লিশ বছর আগে ১৫৫৩ সালে লন্ডনের আগের প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা পৃথিবীর প্রথম চার্টার্ড জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ‘দ্য মাসকোভি কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। এই কোম্পানির আরেকটি গুরুগম্ভীর ও ঐশ্বর্যপূর্ণ নাম দেওয়া হয়েছিল, “দ্য মিসটেরি অ্যান্ড দ্য কোম্পানি অফ দ্য মার্চেন্ট অ্যাডভেঞ্চারার্স ফর দ্য ডিসকভারি অফ রিজিয়নস, ডোমিনিয়নস, আইল্যান্ড আ প্লেসেস আননোন (The Mysterie and Company of the Merchant Adventureres for the Discoverie of Regions, Dominions and Places Unknown)। এর মূল লক্ষ্য ছিল সেরা ভূগোলবিদগণ প্রথমে যে ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন, সেই ধারণা অনুসার সমুদ্র অভিযানে বের হওয়া, যারা তাদের বিশ্বকে সমুদ্রবেষ্টিত একটি দ্বীপ বলে বিশ্বাস করতেন, যার অর্থ ছিল উত্তরের দিকে মশলা ও সোনা আহরণের জন্য দূরপ্রাচ্যে এবং কেপে যাওয়ার একটি পথ আছে এবং সেই পথকে আইবেরীয়দের সব ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে মুক্ত করতে হবে।
যদিও মাসকোভি কোম্পানির পরিচালকবৃন্দ অতি দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, উত্তরের দিকের পথের কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে তারা রাশিয়া হয়ে পারস্যের সাথে একটি সরাসরি স্থলপথ ধরে সফলতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করেন। ১৫৮০ সালে অটোমান তুর্কিদের বিজয়ের কারণে স্থলপথটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে তারা ইস্পাহান ও ওই এলাকার অন্যান্য বড় বড় বাজারে ছয়টি সফল বাণিজ্যিক অভিযান পরিচালনা করে সম্মানজনক মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
অবশেষে ১৫৫৫ সালে মাসকোভি কোম্পানি রাজ-অনুমোদন লাভ করে, যার মধ্যে তাদের সুবিধা ও দায়িত্বের বিষয়গুলো উল্লিখিত ছিল। ১৫৮৩ সালের মধ্যে অনুমোদনপ্রাপ্ত ভেনিস ও তুর্কি কোম্পানি ছিল, যে কোম্পানিগুলো ১৫৯২ সালে ‘লেভ্যান্ট কোম্পানি’তে একীভূত হয়। একই বছর দাস ব্যবসায়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সিয়েরা-লিওন কোম্পানি’। অতএব সেদিক থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চমৎকার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার সুযোগ পেয়েছে আর কোম্পানির রাজ-অনুমোদন কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই পাওয়া উচিত ছিল। তাছাড়া আর্ল অফ এসেক্সের অবাধ্য রবার্ট ডেভেরুর বিদ্রোহের হুমকির কারণে রানি চেয়েছিলেন নগরীকে তাঁর পাশে রাখতে এবং দরখাস্তের ব্যাপারে তিনি বিস্ময়করভাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিলেন।
কিন্তু অনতিবিলম্বে প্রিভি কাউন্সিল থেকে কোম্পানির গঠন ও সমুদ্রযাত্রা স্থগিত রাখার ওপর আদেশ জারি করা হয়। ১৫৯৮ সালে রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের মৃত্যুর পর স্পেনের সঙ্গে ইংল্যান্ডের শান্তি আলোচনার অগ্রগতি হচ্ছিল এবং উভয় দেশের প্রতিনিধিরা শান্তি বিঘ্নকারী কলহ-বিবাদের চেয়ে পারস্পরিক কল্যাণের জন্য শান্তি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা অধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছিলেন। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, “এই বছরের জন্য এ বিষয়ে অভিযাত্রীদের আর অগ্রসর না হওয়াই সঙ্গত।”
ব্যবসায়ীদের মধ্যে অভিজাত মহলের কেউ ছিলেন না; অতএব প্রিভি কাউন্সিলে প্রভাব সৃষ্টি করার মতো অবস্থানও তাদের ছিল না। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দীর্ঘ বারোটি মাস ধরে মনে হতে থাকে যেন প্রচ্যে বাণিজ্য পরিচালনা করার লক্ষ্যে একটি ইংলিশ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার অভিলাষ রয়ে গিয়েছিল ‘মধ্যগ্রীস্মের স্বপ্নের’ মতো।
১৬০০ সালের গ্রীষ্মকালে স্পেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রিভি কাউন্সিল মন পরিবর্তন করে এবং সমুদ্রে বিশ্বজনীন স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব প্রদান এবং সমুদ্রপথে যে-কোনো দেশে যাওয়ার অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট আস্থা অনুভব করে। দরখাস্তের খসড়া তৈরির ঠিক একবছর পর অবশেষে ১৬০০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য এই মর্মে অনুমতি প্রদান করা হয় যে : “মহামান্য রানি সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন যে তারা তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অগ্রসর হতে পারে… এবং তারা যে সমুদ্রযাত্রা করতে চায় তারা তা করতে পারে।”

(চলবে)

Share Now শেয়ার করুন