এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> মন্দিরা এষ >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
483

মন্দিরা এষ >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

শুক্রবার

হঠাৎ পাপসে পা মুছে সটান বেডরুমে ঢুকে পড়ে শুক্রবার
মাংসের পাতে কেন জুঁইফুল ফোটে; জানালা জানে না তা।
পুরোনো বইয়ের ভাঁজে একটু আদর তুলে রাখে যারা
তারাই দুপুরঘোর; সকালের গালে লাগা বৃষ্টি ফোঁটা।
আচমকা কদম পেরিয়ে ভাতঘুম বিকেল নামায়।
যেসব বিকেল জানে না ফালি ফালি বাতাসের বাইক,
অথবা বেসুরে গেয়ে ওঠা গলায় কি করে চুমু খেতে হয়।

জুন

অন্য এক সন্ধ্যা—
যার কোনো রঙ নেই, গন্ধ নেই;
গত বা আগামি নেই,
মৃদু বা তীব্র কোলাহল নেই;
ঘুমিয়ে নেই, জেগেও নেই…

করোটির প্রাচীর ঘেঁষে ছুটছে; কেবলই ছুটছে
অন্ধকার পেরিয়ে আরও তীব্র অন্ধকারে…

জুনের বৃষ্টি আঁকছে সে, অবিরাম!
আর আঁকছে বৃষ্টির ঘরদোর
এভাবে যতটা দেখা যায়
দূর থেকে দূরের বিন্দু
তারও অধিক দূরত্বে;

বৃষ্টি থেমে গেলে,
আধভেজা তুমি-আমি
শ্মশানঘাটে গিয়ে বসি।

শিশু বৃষ্টির গান

বাদামওয়ালার কুপি নিভে গেল
এখান থেকে হাঁটা যেতে পারে; ভাবছি।
গন্তব্য –
পৃথিবীর শেষ বৃষ্টি।

রাস্তার পুলিশ ভিজছে,
আইল্যান্ডের পাগল ভিজছে,
স্কুল ফেরত বালক ভিজছে,
কর্পোরেট সাহেব ভিজছে,
শহরে আজ কোনো ছাতা নেই কারো।

আমি হাঁটছি
তুমুল পাল্লা দিয়ে মেঘমল্লারে
পায়ের তলায় গলে যাচ্ছে মেঘ।

নিথর মৃতের মতো বাসভর্তি চিৎ রাস্তা ভিজছে
দূরে কোথাও__ চায়ের তৃষ্ণা জমেছে;
অথচ কেউ
দোকানের ঝাপ খোলা পাবে না।

মা, আর কখনও আমার অপেক্ষা করো না গ্রিলে দাঁড়িয়ে;
আমি বৃষ্টির সাথে বৃষ্টি হয়ে
দূরে কোথাও যাচ্ছি…

চিঠি

এইখানে কোলাহল ঘুমিয়ে থাকে—
অচল ট্রেনের কামরায়
কেবল কবিতা দুপুর মনে রাখে,
মনে রাখে অর্থহীন চোখের প্রলাপ।
আমাদের মনে পড়তে পারে
কোনো পুরনো ছবির অ্যালবাম—
বেণিদোলানো মেয়েটি যেখানে উধাও…
কোনো পুকুরঘাটে আমরা তাকে খুঁজতে থাকবো
খুঁজে দেখবো আতাবনে, ঘোলা রোদের মাঝে;
আমরা খুঁজতে থাকবো সময়হীন…
একটা চিঠির তেরো নম্বর পৃষ্ঠায় মেয়েটির বাড়ি
আমরা চিঠিটি খুঁজতে থাকবো, উন্মাদের মতো
যদিও আমরা জানি চিঠিটি মৃত।

প্রতিভাস

জঙ্গলে বা সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া কেউ বা কেউ না হতে গিয়ে, ক্যামেরার লেন্স বদলেছি বহুবার। আস্তিনে মুছে দিয়ে ঘর, পকেটে আলুথালু জানালা গুঁজে হন্তদন্ত আমি, ঠায় দাঁড়িয়ে রই…
তোমরা জাহাজের গল্প বলতে বলতে যখন আমার সামনে দিয়ে কোনো বাস হয়ে যাও, আমি তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে। পায়ের বৃদ্ধাঙুলে আকাশ গুলতে গুলতে ভাবি একটা তালগাছ হই; প্রবল ঝড়ের কথা ভেবে হলেও একটা ধনেশ আশ্রয় খুঁজুক বুকে।
যেসব ভাঙা পুল ধরে রেললাইন পার হয় ট্রেন কোলে করে—ভাবি, বিকাল হলে নদীকে নিয়ে তাদের কাছে যাই; সন্ধ্যা-অব্দি রেডিও শুনতে শুনতে তাস পেটাই।
আমার মায়ের শিশির রোগ। তোমাদের কারো রোদ জানা থাকলে জানিও; আর নয়তো মায়েতে-ছায়েতে মাথায় কিছুটা শিশির লেগে থাক।
এখানে অসময়ে বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই এমন যে নদীও ছাতা মাথায়। হাত ভিজলো, আঙুল কাঁপছে থরথর অথচ কড়কড়ে শুকনো চোখদ্বয়। আর আমি এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে।

কবিতাভাবনা

লিখতে হবে এটুকু জানি। জীবনে কোন কাজই গুছিয়ে করে ঊঠতে না পারা আমি কেবল এই একটি ক্ষেত্রেই নিজেকে পরিপূর্ণ খুঁজে পাই, মেলে ধরি এবং মনে হয় আমার জন্মই হয়েছে লেখার জন্য। তো লিখি।

কবি পরিচিতি

জন্ম : ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬, জামালপুর। কবিতাগ্রন্থ : ভোরগুলো অন্যরকম (২০১৫), অরণ্য মিথের পৃষ্ঠা (২০১৮), স্বীকৃতি : ‘অরণ্য মিথের পৃষ্ঠা’-র জন্য মাহবুবুল হক শাকিল পুরষ্কার (২০১৯)। বর্তমানে ‘অকালবোধন’ সাহিত্যপত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।

Share Now শেয়ার করুন